লেকসিটি রাঙ্গামাটি : মাহবুব আলম

মেয়েকে নিয়ে রাঙ্গামাটি যাওয়ার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন ধরে। কিন্তু যাই, যাচ্ছি করেও যাওয়া হয়নি; এমন কি পরপর দুই ঈদে বাসের টিকিট কেটে, হোটেল বুকিং দিয়েও যাওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১২’র ২৭ অক্টোবরে ঈদের দিন সত্যি সত্যি রাঙ্গামাটি গেলাম আমার মেয়ে অরণী, ছোট ভাই রনি ও তার স্ত্রী মালা এবং বন্ধু শাহীন চৌধুরী ও তার স্ত্রী পুত্র-কন্যার সঙ্গে। রাত দশটায় বাসে কলাবাগান থেকে যাত্রা শুরু। নন এসি বাস। কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি। জানালা খুলে মধ্যরাতে শান্তির সুবাতাস গায়ে মেখে শান্তিতে আর স্বস্তিতে রাত তিনটার আগেই পৌঁছে গেলাম চৌদ্দগ্রাম। চৌদ্দগ্রামে একটা হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে চা-নাস্তা করে ভোর হবার আগেই চট্টগ্রাম। তারপর দু’ঘণ্টার আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে ৭টার মধ্যে রাঙ্গামাটি। আমাদের হোটেল বুকিং ছিল রাঙ্গামাটির কেন্দ্রস্থল রিজার্ভ বাজারের হোটেল গ্রীণ ক্যাসেল। বাসস্ট্যান্ড থেকে তিন চার মিনিটের পথ। যাবার পথে বাসের জানালা দিয়ে পাহাড়ে ভোরের সূর্যোদয় দেখেছি। মেয়ে অরণী শুরু থেকে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ছিল। ও বাসের জানালা দিয়ে পাহাড়ে সূর্যোদয়ের ছবি ক্যামেরাবন্দি করলো। আর আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম ভোরের সূর্যোদয়। বাসের জানালা দিয়ে সকাল দেখতে দেখতে পুরনো দিনে ফিরে গেলাম। সেই সব দিনে- যখন ভোরে উঠে এক দৌড়ে নারিন্দা থেকে ধূপখোলা মাঠে গিয়ে কয়েক চক্কর দিতাম। মনে পড়লো মাঝে মধ্যে ধূপখোলা মাঠে না গিয়ে ফরাশগঞ্জের কাছে কাঠপট্টিতে গিয়ে বুড়িগঙ্গায় নামতাম, সাঁতার দিতে। এই সব পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বাস রিজার্ভ বাজার বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেলে ড্রাইভার ইঞ্জিন বন্ধ করে বলে এটাই শেষ সীমানা, আর যাবে না।
বাস থেকে নেমে হোটেলে পৌঁছে চোখে মুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে সবাই এক সঙ্গে নেমে মক্কা রেস্টুরেন্টে গিয়ে নাস্তা করলাম। নাস্তা করে দু’ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়ে প্রথমে গেলাম বিখ্যাত রাজবন বিহার। তারপর রাজবাড়ি।

রাঙ্গামাটি রাজবন বিহার অত্যন্ত নামকরা বৌদ্ধবিহার। কিন্তু এ বৌদ্ধবিহারে ঢুকতেই হোঁচট খেলাম একটা সাইনবোর্ড দেখে। সাইনবোর্ডে লেখা আছে- বৌদ্ধবিহারের পবিত্রতা রক্ষার্থে জুতো খুলে ভেতরে ঢুকবেন ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করে চলবেন। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এরপরই লেখা রয়েছে- মাথায় টুপি দিয়ে, বোরখা পরে বিহারে প্রবেশ নিষিদ্ধ। টুপি আর বোরখার সাথে বিহারের পবিত্রতা রক্ষার কি সম্পর্ক তা আমার বোধগম্য নয়। অবশ্য আমাদের কারো এ সমস্যা ছিল না। ভেতরে গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। নিঃসন্দেহে দেখার মতো স্থান। কিন্তু মনের ভেতর ওই সাইনবোর্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেল। মনে মনে ভাবলাম কই কক্সবাজার, রামু বা ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধবিহারে, বৌদ্ধ মন্দিরে তো এমন নির্দেশ নেই। এমন কি বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের কোনো বৌদ্ধবিহারে, বৌদ্ধ মন্দিরে তো এমন নিষেধাজ্ঞা দেখিনি। বরং দেখেছি অসংখ্য টুপি দাড়িধারী মাওলানা আর বোরখা পরা অসংখ্য নারী স্বয়ম্ভুনাথ (মানকি টেম্বল) সহ অন্যান্য মন্দির ঘুরে দেখছে।
বৌদ্ধবিহার দেখে গেলাম রাজবাড়ি দেখতে। বৌদ্ধবিহারের ঘাট থেকে নৌকায় করে রাজবাড়ি ঘাটে গিয়ে দীর্ঘ উঁচু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠার উপক্রম। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলেই হাতের ডান দিকে রাজার কাচারি বাড়ি, কাচারি বাড়ির সঙ্গে রয়েছে জেলখানা। কাচারি বাড়ি আর জেলখানা দেখে রাজবাড়ি আর কাচারির সামনের মাঠে দেখলাম চাকমা মেয়েরা নানান পসরা সাজিয়ে বসেছে বিক্রির জন্য। ঘুরে ঘুরে দেখলাম ওরা লুঙ্গি, থামি, চাদর, কামিজের কাপড় আর সুন্দর সুন্দর ওড়না বিক্রি করছে। নিজেরা হাতে বুনে নিজেরাই বিক্রি করছে। তাই দামও কম, ডিজাইনও মনকাড়া। সেই সাথে বাড়তি পাওনা চাকমা সুন্দরীদের মিষ্টি হাসি। কিছু কেনা-কাটা করে রাজবাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতেই একটি মেয়ে বলল- ওদিকে রাজবাড়ি ছিল কিন্তু এখন নেই, পুড়ে গেছে, ২০১০-এ আগুনে পড়ে গেছে চাকমা রাজবাড়ি। তারপর আর পুননির্মাণ করেনি রাজা তার বাড়ি। তাই রাজাবাড়ির বদলে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাড়ির প্রাঙ্গণ দেখেই সন্তুষ্ট হতে হলো। আবার ফেরা একই নৌকায়। আসা ও যাওয়ার ভাড়া জনপ্রতি ৬টাকা।
ইতিমধ্যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর কাঠফাটা রোদে হাঁটাহাঁটি করে সবাই ক্লান্ত। কিছু খেতে হবে, কিন্তু কোথায়? জিজ্ঞেস করে জানা গেল রাজবন বিহারের সামনের সেতু পেরিয়ে মেইন রোডে উঠলেই রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা একটা রেস্টুরেন্ট দেখে ঢুকে পড়লাম। চাকমাদের রেস্টুরেন্ট। কিন্তু খাবার দাবার বাঙালি। ছেলে-মেয়েরা মুরগির মাংস আর আমরা লেকের আইড় মাছ দিয়ে ভাত খেলাম। অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ। মাঝে মধ্যে মনে হয় এখনো মুখে লেগে আছে ওই মাছের স্বাদ।
লাঞ্চ করে কিছুক্ষণ রেস্টুরেন্টেই রেস্ট নিয়ে গেলাম পর্যটনে। শহরের আর এক প্রান্তের পর্যটন কমপ্লেক্সকে বলে পর্যটন। এখানে আছে লেকের ওপর ঝুলন্ত সেতু। সেতুর এপারে উঁচু পাহাড়ে বড় বড় গাছের ছায়াঘন চমৎকার পরিবেশ। পর্যটকদের বসার জন্য আছে কিছু বেঞ্চ। বেঞ্চে বসে যে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেকের সৌন্দর্য আর ওপারের পাহাড় দেখতে পারে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ২৮ অক্টোবর (২০১২ সালের) ঝুলন্ত সেতু ছিল পানির নিচে। তাই সেতুতে ওঠা নিষেধ ছিল। কিন্তু তারপরও দেখলাম অনেকে হাঁটুপানি ভেঙে সেতু পারাপার হচ্ছে। রাঙ্গামাটির দর্শনীয় স্থাপনা ঝুলন্ত সেতু পানির নিচে হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ সেতু পারাপার হওয়া থেকে বঞ্চিত হলেও সেতুর সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
পরদিন সকালে গেলাম লেক ভ্রমণে। মসজিদ ঘাট থকে ট্রলার নিয়ে কিছু দূরে যেতেই মনে হলো আমরা এখন পাহাড় আর পানির দেশে। ৫৪ হাজার একরের (২২০ বর্গ কিলোমিটার) এই বিশাল লেকের মধ্যে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়। এর কোনো কোনোটিতে জনবসতি আছে, আবার কোনো কোনো পাহাড় একেবারে জনশূন্য। এ রকম জনমানবশূন্য পাহাড়ে এখন রেস্টুরেন্ট কটেজ মোটেল গড়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে শুভলং ঝর্ণার কাছে চাং পাই রেস্টুরেন্টে বাঙালি খাবারের পাশাপাশি পাহাড়ি খাবারও পাওয়া যায়। পরিবেশনাও ভিন্ন। জনচৌকিতে হাঁটু মুড়ে আসন গেড়ে খেতে হয়। আর খাবার দেয়া হয় কলাপাতা বাঁশপাতায় মুড়ে। এই রেস্টুরেন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নামকরা রেস্টুরেন্ট পেদা টিং টিং। রাঙ্গামাটি শহরের খুব কাছে চমৎকার একটা রেস্টুরেন্ট ‘স্বর্গ ছেড়া’ যে কোনো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। স্বর্গ ছেড়ার সঠিক অর্থ আমার জানা নেই। তবে স্বর্গ ছেড়া রেস্টুরেন্টের মনোরম পরিবেশ যে কারোরই ভালো লাগবে। অনেক দূর থেকে এই স্বর্গ ছেড়া চোখে পড়ে। সেই সঙ্গে চোখে পড়ে রেস্টুরেন্টের দেয়ালে চের বিশাল পোস্টার আর এক অনিন্দ্য সুন্দরী চাকমা তরুণীর নিপুন পরিবেশনা। এই স্বর্গ ছেড়া রেস্টুরেন্টের খুব কাছে দুই রুমের একটা ছোট্ট কটেজ রয়েছে। এক হাজার টাকার বিনিময়ে যে কেউ লেকের ভেতর পাহাড়ের চূড়ায় নিরিবিলি এক রাত কাটিয়ে আসতে পারে।
স্বর্গ ছেড়া থেকে শুভলং ঝর্ণা ট্রলারে ঘণ্টাখানেক সময় নেয়। যাওয়ার পথে দু’পাশের উঁচু উঁচু পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য রীতিমতো হৃদয়ে দোলা দেয়। ইচ্ছে হয় ট্রলার থামিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে দেখি কী আছে ওই পাহাড়ে। মাঝে মধ্যে ঘাট দেখে বুঝা যায় এখানে বসতি আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চাকমা বসতি।

তারপর কাক্সিক্ষত গন্তব্য শুভলং ঝর্ণা। উঁচু পাহাড় থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। অত উঁচুতে যাওয়ার কোনো পথ নেই। কিছু দূর উঠলেই সিঁড়ি শেষ। তারপর গাছের ডালপালা ধরে খুব সাবধানে চ্যালেঞ্জ নিয়ে উঠতে হয়। বয়সের কারণে চ্যালেঞ্জ নেইনি। কিন্তু আমার কন্যা দস্যি মেয়ে অরণী চ্যালেঞ্জ নিয়ে উঠবেই। উঠে দেখবে কী আছে ওপরে। আর কিভাবে কোত্থেকে গড়িয়ে পড়ছে এই পানি, যা এই বিখ্যাত ঝর্ণার জন্ম দিয়েছে। শুধু আমার মেয়ে নয়, রনি আর ওর স্ত্রী মালাও চ্যালেঞ্জ নিয়ে উঠল। এই ঝর্ণার জায়গাটা খুবই স্বল্প পরিসরের, তাই হাত-পা ছড়িয়ে গাছতলায় বা পাহাড়র ঢালে বসে অনেকক্ষণ ধরে এ ঝর্ণার সৌন্দর্য দর্শন বা রেস্ট নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ একের পর এক দল আসছে। ওদেরও তো সুযোগ করে দিতে হবে। তবে এখানে চা-পানের সুব্যবস্থা আছে। আছে জলযোগ ও জলবিয়োগের সুবন্দোবস্ত। শুভলং ঝর্ণা দেখে ট্রলারে উঠতেই চোখে পড়ল ঝর্ণার খুব কাছে গহীন বনে পাহাড়ের ওপর একটা বিল্ডিং নির্মাণ হচ্ছে। ট্রলার চালক জানালো বরকল উপজেলা পরিষদ পর্যটকদের থাকার জন্য কটেজ করছে।
এবার আমাদের গন্তব্য শুভলং বাজার। শুভলং ঝর্ণা থেকে খুব কাছে। এখান থেকে যাওয়ার পথে লেকের দু’পাড়ে খাড়া পাহাড়। অনেক উঁচু। ট্রলার চালক এগুলোর উচ্চতা সম্পর্কে কিছুই বলতে পারল না। তাই জানা হলো না পাহাড়ের ইতিহাস-ভূগোল। কিন্তু চোখ তো খোলা। দুচোখ দিয়ে দূর থেকে কাছে দেখলাম পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে যাদুর খেলা, লেকের মাঝে ট্রলার থেকে প্রথমে মনে হলো পাহাড়ের ওপর কোনো প্রাচীন দুর্গ নয় তো কোনো পুরনো পরিত্যক্ত রাজবাড়ির সীমানাপ্রাচীর। সোজা খাড়া পাহাড়ে পাথরের উপর কোনো শিল্পী যেন মনের সুখে ইচ্ছেমতো কারুকাজ করেছে। এবং কোনো কাজই শেষ করেনি। দেখে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদাই করতে করতে শিল্পী ক্লান্ত ক্ষান্ত দিয়েছে। কিন্তু না, এ প্রকৃতির আপন নিয়মে গড়ে ওঠা পাথরে পাহাড়। এই পাহাড়, এ সৌন্দর্য, এ ভূ-প্রকৃতি যে আমার দেশে আছে ভাবতেই অবাক লাগে। যা আমরা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে দেখি আর বিভিন্ন সময় বিদেশি পোস্টারে, এ তাই। তাই কিছুটা ধাক্কা লাগে- আমরা দেশের ভেতর আছি তো, না অন্য কোনো দেশে ঢুকে পড়েছি। শুভলং বাজারে ট্রলার ভিড়ল সেনা ক্যাম্পের পাশের ঘাটে। খুব যতœ করে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ঘাট। ঘাটের বাঁ দিকে সেনা ক্যাম্প পাহাড়ের ওপর আর ডান দিকে পাহাড়ের পাদদেশে সমতল স্থানে শুভলং বাজার। ঘাটে উঠে কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে সাবধানে বাজারে ঢুকলাম। অবশ্য বাজারের আগে সরু রাস্তার দুই ধারে একটা ছোট পাহাড়ি বসতি। এখানে বড়–য়া, চাকমা, মারমাদের বসবাস। কথা হলো মোনালিসা চাকমার সাথে। নাম শুনে চমকে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার এ নাম কে রেখেছে? বলল ওর বাবা। মোনালিসাদের বাড়ি বাজার থেকে দূরে এক গাঁয়ে। রাঙ্গামাটি কলেজে পড়ে। শুধু কলেজ নয়, প্রাইমারি শেষ করার পর থেকে শুরু হয়েছে ওর হোস্টেল জীবন। এখন ও অভ্যস্থ হোস্টেল লাইফের সঙ্গে। কারণ শুভলং বাজারে হাইস্কুল নেই। প্রাইমারি স্কুল আছে। প্রাইমারি স্কুল শেষ করে হাইস্কুলে পড়তে হলে ওদের যেতে হয় অনেক দূরের হাইস্কুলে। ট্রলারে যেতে সময় লাগে অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। তবে সুখের কথা, এখানকার প্রায় আশি শতাংশ শিশু এখন স্কুলে যাচ্ছে। ওদের স্কুলে ভর্তির জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ওদের খুব সাদাসিধে জীবনযাপন। বড়–য়া, চাকমা বসতির ঘরের মাঝ দিয়ে মেইন বাজারে ঢুকে দেখলাম সারি সারি দোকানপাট, ইউপি অফিস, আরো কিছু অফিস। হাতে একদম সময় নেই। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইউপি অফিস দূর থেকে দেখেই ক্ষান্ত হলাম।
ইতিমধ্যে সবার খিদে পেয়েছে। একটা খাবার হোটেল খুঁজে বসে পড়লাম। সৌদিয়া হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। বাঙালি মালিকানা ও পরিচালনায় হোটেলের পরিবেশনা মনে রাখার মতো। আর খাবার বিশেষ করে মাছের স্বাদ মনে থাকবে অনেক দিন। কালি বোয়ালের বিশাল পিস্ খুবই সুস্বাদু। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে দেখলাম একটা দোকানে সারি সারি কলার কাঁদি ঝোলানো রয়েছে। দাম জিজ্ঞেস করলাম। বলল ৮ টাকা হালি। বললাম, রাঙ্গামাটি শহরে ৮ টাকা হালি, এখানেও ৮ টাকা! এ কেমন কথা। ভাই, আপনারা কেনেন কত করে? ভদ্রলোক বললেন, আগে এক টাকা পড়ত। এখন দেড় টাকা- দুটাকা পড়ে। তাহলে তো আপনার অনেক লাভ।
লাভ না হলে চলবে কি করে?
আপনি ডাব, পান-সুপারিসহ আরো অনেক কিছু বিক্রি করছেন ওগুলোতে কি রকম লাভ করেন?
আমি এক টাকায় জিনিস কিনে আট টাকায় বেচি।
তার মানে এক টাকায় সাত টাকা লাভ করেন?
তা না করলে চাঁদপুর থেকে এখানে আসলাম কেন! এখানে এই পাহাড়ে এসেছি তো লাভ করতেই।
লাভের অঙ্ক আর অ্যাটিচুড দেখে বিস্মিত হলাম। ডাব বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। রাঙ্গামাটিতেও ওই একই দাম। এমন কি খোদ রাজধানী ঢাকাতেও, তাও আবার অভিজাত ধানমন্ডি এলাকায় ডাবের দাম ত্রিশ টাকা। শুভলং থেকে ফেরার পথে ট্রলারে উঠে দেখি সবাই উঠেছে; কিন্তু অরণী নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কোথাও পাওয়া গেল না। রীতিমত ভয় পাওয়ার অবস্থা। শেষ পর্যন্ত রনি গিয়ে দেখে অরণী আর এক ঘাটে যেখানে নেমেছিলাম ওইখানে গিয়ে দিব্বি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এরপর গেলাম চাং পাই দেখতে। পাহাড়ের ওপর এই রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছে দুই আদিবাসী চাকমা। তবে পাহাড়ের মালিক বাঙালি। ওখানে থাকতে কেমন অচেনা একটা ডাক শুনে জিজ্ঞেস করলাম- এ কীসের ডাক। একজন জানাল টক্কর। কিন্তু টক্কর কি? এ নাম তো শুনিনি। ভদ্রলোক বললেন টক্কর এক ধরনের প্রাণী, গিরগিটির মতো কিন্তু গিরগিটির চেয়ে একটু বড়। সেই সাথে আরো বলল, এর অনেক দাম, কোটি টাকা। বিদেশিরা এ জিনিস খোঁজে। পুরো পাহাড়ে কোথাও ছাগল দেখিনি। এই পাহাড়ে এক সাথে অনেকগুলো ছাগল দেখলাম। চরে বেড়াচ্ছে। এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে আরো তিনটি স্পট দেখানোর কথা। ট্রলার চালক বললেন তিনটে কেন আরো বেশি স্পট দেখতে চাইলেও দেখতে পারেন। কিন্তু না, সঙ্গে ছেলে-মেয়েরা রয়েছে, ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাই ফেরার পথে তিনটি স্পট দেখেই সোজা মসজিদ ঘাট।
সন্ধ্যায় হোটেলে অথবা কারো বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দেয়া আর খাওয়া-দাওয়া ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। পর্যটনের জন্য সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচার হলেও এখানে কোনো বার নেই। নেই কোনো নাইট লাইফ। আমি আর শাহীন চৌধুরী হোটেলে বসে থাকার লোক নই। খুঁজে বের করলাম সন্ধ্যাটা কাটানোর এক চমৎকার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা হলো এক বাড়িতে গিয়ে দোচুয়ানি পান। কিন্তু ওই দিন পূজা-জনিত কারণে শেষ পর্যন্ত বাতিল হয় ওই কর্মসূচি। কিন্তু আমরা হালছাড়ার পাত্র নই। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাংবাদিক শামসুর স্মরণাপন্ন হলাম। শামসু আমাদের জন্য চমৎকার পরিবেশে দোচুয়ানি ও ডিনারের ব্যবস্থা করেন। শহরের বনরূপা এলাকায় একটা চাকমা রেস্টুরেন্টে দোচুয়ানি ও ডিনারের আয়োজন করে শামসুল ইসলাম ও মনসুর আহমেদ। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি চমৎকার একটা রেস্টুরেন্ট। লেকের ওপর তিনতলায় বসে রাতের লেক দেখতে দেখতে আমি ও শাহীন চৌধুরী দোচুয়ানি পান করতে শুরু করি। সঙ্গে লেকের কাচকি মাছের চপ। আর এক ধরনের ডাল ফ্রাই ও সবজি। খুব মজা করে চপ খেলাম। সত্যি কথা বলতে কি ব্যাংক লেভেলের চাইতে নরম এই দোচুয়ানি।
এক বোতল দোচুয়ানি সাবাড় করে রাত ৯টা নাগাদ হোটেলে ফিরলাম। হোটেলে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে গেলাম ডিনারের জন্য। ডিনারের পর ফিরে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়ে কাটালাম হোটেলের বারান্দায়। এই বারান্দা একেবারে লেকের ওপর। বারান্দা থেকে রাতের লেক দেখা যায়। এ সময় শাহীন চৌধুরী বলছিল- ইচ্ছা করলে রাঙ্গামাটিকে আমরা বাংলাদেশের ভেনিস বানাতে পারি। আমি ভেনিস শহর দেখিনি। শুনেছি, পড়েছি। কিন্তু শাহীন দেখেছে। ওকে বললাম তা কী করে সম্ভব! ও বলল রাঙ্গামাটি শহর পুরোটাই লেকের ওপর। প্রতিটি বাড়ির পেছনের অংশ লেকের একেবারে ভেতর। তাই অনেকে রান্নাঘরে বসেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরে। আবার অনেকে রান্নাঘর অথবা বারান্দা থেকে মই দিয়ে নেমে স্নান করে। এই শহরকে শুধু ভেনিস নয়, তার চাইতেও সুন্দর শহর করা যায়। আর এটা করতে পারলে এই রাঙ্গামাটি থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় হবে। শাহীনের কথা শুনে মনে পড়লো অনমিত্র চট্টপাধ্যায়ের কথা। কলকাতার নামকরা সাংবাদিক। আনন্দবাজার পত্রিকার আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান। এ বছরের শুরুতে রাঙ্গামাটি ঘুরে মন্তব্য করে তার দেখা সেরা লেক রাঙ্গামাটি। এ লেক থেকে ইচ্ছে করলেই কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা যায়। অনমিত্র স্ত্রী, পুত্র-কন্যা নিয়ে রাঙ্গামাটি লেক দেখেছে। এর আগের বছর অনমিত্র স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে গিয়েছিল চেন্নাইয়ের একটি বিখ্যাত লেক দেখতে। ওর এবং ওর স্ত্রীর ভাষায় চেন্নাই-এর লেক থেকে রাঙ্গামাটি লেক শতগুণ সুন্দর ও আকর্ষণীয়। এমনকি কাশ্মীরের বিখ্যাত ডাল লেক থেকেও অনেক সুন্দর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এ লেক থেকে আয়ের কোনো চেষ্টা নেই। নেই পর্যটক আকর্ষণের কোনো ব্যবস্থা। অনমিত্রের এ মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই।
শাহীনের ভাষায় কক্সবাজারে কমবেশি কয়েকটা ভালো হোটেল হয়েছে। হয়েছে বেশ কটা বার কিন্তু এই শহরে একটা বারও নেই, লোকে আসবে কেন? কক্সবাজারে মানুষ রাতে সী-বীচে যেতে পারে। কিন্তু এখানে রাতে মানুষ কী করবে, লেকের পাড়ে হোটেল হলেও ঠিকমত লেক দেখার ব্যবস্থা নেই। তবে এটা ঠিক যে, এখানে বৈচিত্রপূর্ণ খাবার আছে। বাঙালি খাবারের পাশাপাশি চাকমা, মারমাসহ পাহাড়িদের বিভিন্ন খাবার। এ ছাড়া রাঙ্গামাটির কলা আর ডাবের টেস্টই আলাদা। একটা ডাবে এত পানি থাকে যে একা খেয়ে শেষ করা যায় না। কলা ছোট ছোট। পাহাড়ের গায়ে পাহাড়ের ওপর হয়। কোনো সার কীটনাশকের ব্যাপার নেই। প্রকৃতির আপন নিয়মে গাছ হচ্ছে, গাছে কলা হচ্ছে। খুব ভালো। আমার মেয়ে এ কলা খেয়ে ঢাকায় এসে আর কলাই ধরছে না। ওর কথা- ঢাকার কলার কোনো স্বাদ নেই। স্বাদ থাকবে কি করে? কৃষক যতœ নিয়ে কলা করছে, সেই কলা ব্যাপারি কিনে ওষুধ স্প্রে করে পাকাচ্ছে। শুধু ডাব, কলা কেন এখানকার পেঁপে, আনারসও খুব সুস্বাদু। আর ওই একই ঘটনা, কোনো ধরনের সার কীটনাশকের ব্যবহার নেই এসবে। পেঁপে, কলা, আনারস সুস্বাদু হলেও কমলালেবু খুব টক।
আমাদের তৃতীয় দিনের ভ্রমণসূচিতে ছিল কাপ্তাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাপ্তাই ভ্রমণ বাতিল করতে হয়। এদিন সকালে নাস্তা করে শাহীন, ভাবী আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বের হয় কিছু কেনাকাটার জন্য। ওদের অনুসরণ করে রনি-মালা ও অরণী। ওরা তবলছড়ি বার্মিজ মার্কেট থেকে সস্তায় চমৎকার বিছানার চাদরসহ নানান পোশাক কেনে। এ সময় হোটেলে একের পর এক বেশ কজন স্থানীয় সাংবাদিক ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলি। এদের মধ্যে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হারুন মাতুব্বর, সাধারণ সম্পাদক প্রজেস চাকমা এবং সন্তু লারমার এক সময়ের লড়াকু নেতা প্রভাবশালী ব্যক্তি দেবি প্রসাদ দেওয়ান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত প্রত্যেকের সঙ্গে স্থানীয় সমস্যা, পাহাড়ি বাঙালির সম্প্রীতি, স্থানীয় উন্নয়ন, বিশেষ করে পর্যটনের সম্ভাব্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পরে হারুন মাতুব্বর আমাদের সকলকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করেন। এবং এই মধ্যাহ্নভোজ পূর্বনির্ধারিত। রাঙ্গামাটির সাবেক ছাত্র নেতা, বর্তমানে ঢাকার একটা জাতীয় দৈনিকে কর্মরত সাংবাদিক সুজন দে আমাকে আগেই বলেছিলেন হারুন ভাই আপনাদের সম্মানে ডিনার দেবে। প্রায় সার্বক্ষণিক আমাদের দেখাশুনা করেছে রাঙ্গামাটির প্রভাবশালী সাংবাদিক শামসু ও তরুণ সাংবাদিক মনসুর। এদের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা ভোলার নয়। এদের আতিথ্য শেষে রাত ৯টায় আবারো বাসে ঢাকায় ফেরা। পথ যথারীতি চট্টগ্রাম ও চৌদ্দগ্রাম হয়ে। ফেরার পথে বার বার লেকের সৌন্দর্যের কথা মনে হচ্ছিল আর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই সব মানুষদের ছবি যারা এ লেক জন্মের জন্য ঘর-বাড়ি, ভিটে-মাটি ছাড়া হয়েছে। যাদের ঘর-বাড়ি, ভিটে-মাটি তলিয়ে গেছে এ লেকের একশ দুশ তিনশ এমনকি চারশ ফুট পানির নিচে। সেই মানুষদের একজন ষাটোর্ধ্ব দেবি প্রসাদ যখন বলেন, বাপ-দাদার ভিটে-মাটি, ঘর-বাড়ি গেছে দুঃখ নেই, দুঃখ এত ত্যাগ-তিতীক্ষায় গড়া লেকের পরিচর্যা হচ্ছে না, সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না, আর এ লোক পাড়ের মানুষের কথা কেউ ভাবছে না। সত্যিই তো ওই মানুষদের কথা কেউ ভাবছে না। না সরকার, না স্থানীয় প্রশাসন না নেতৃত্ব। কেউ না…। তারপরও আশায় বসতি। তাই দেবি প্রসাদরা আজো স্বপ্নের জাল বুনে। সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত রেখা খোঁজে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top