লেনিন ।। পর্ব এক ।। আশানুর রহমান খোকন

ভূমিকাঃ একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা ছিল অনেকদিন ধরে। একটি মানুষ, যিনি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, যিনি নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য প্রথম একটি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিলেন, সেই মানুষটিকে অর্থাৎ লেনিনকে জানতে চেয়েছি বহুদিন ধরে, বহু দিক থেকে। তাঁর জন্মের প্রতিক্ষার দিনগুলিতে ভলগা নদীর উপরিভাগে বরফের স্তর জমে ছিল। সেই শক্ত বরফের নীচে খুঁজলেই পানি পাওয়া যেত। দেখা যেত সেই পানিতে মাছ নিঃশ্বাস নিচ্ছে, সাঁতার কাঁটছে। বিপ্লবের মতো কঠিন ও জটিল কাজটির যিনি নেতৃত্ব দিলেন, সেই মানুষটির খুব ভিতরের মানুষটি, রক্ত-মাংসের মানুষটিকে খু্ঁজতে গিয়ে ভলগার পাড়ে সিমবির্স্কির মস্কো স্ট্রিট থেকে শুরু করে সেন্ট পিটার্সবার্গ, সাইবেরিয়া, জার্মানী, লন্ডন, ভিয়েনা, প্যারিস, ফিনল্যান্ড, প্রাগ, জুরিখ, স্মোনলি ভবন কত জায়গায় না তাঁর সাথে ঘুরতে হয়েছে। সব সময় যে তাঁকে পুরোপুরি ছোঁয়া গেছে, ধরা গেছে, বোঝা গেছে এমন তো নয়! তবে মানুষ লেনিনকে খুঁজে পেতে, বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি। ভলগার তীরের সিমবিরস্কি গুবেরনিয়ার মস্কো স্ট্রীটের ৬৪ নম্বর বাড়ির ‘ভলোদিয়া’ থেকে ১৯১৭ সাল বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া ‘লেনিন’ হয়ে ওঠার এই বিশাল যাত্রাপথে তিনি বন্ধু পেয়েছেন, বন্ধু হারিয়েছেন, অনেক মানুষের ভালবাসা যেমন পেয়েছেন, ঘৃণাও তো কম জোটেনি তাঁর। কখনো কখনো তিনি হতাশ হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আঘাত পেয়েছেন, আঘাত করেছেনও। তাঁর এই বন্ধুর যাত্রাপথে সব সময় তিনি যাদেরকে পাশে পেয়েছিলেন সেটা তাঁর পরিবার। পেয়েছিলেন তাঁর মা, ভাই-বোন, স্ত্রী এমনকি প্রেমিকাকেও। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারিয়েছিলেন, সতের বছর বয়সে বড় ভাইয়ের ফাঁসি হতে দেখেছেন, একুশ বছর বয়সে ছোট বোনের করুণ মৃত্যু দেখেছেন, পরিণত বয়সে মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনেছেন নির্বাসনে বসে, শত শত কর্মী আর বন্ধুর মৃত্যু দেখেছেন খুব কাছ থেকে, অথচ কোনদিন পরিনত লেনিন এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেননি। যে মানুষটি শত দুঃখ, শত কষ্টেও কাঁদেননি, সেই তিনিই কিনা কাঁদলেন একজন নারীর জন্য, যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ। তিনি তখন পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রটির কর্ণধার। তাঁর কাছ থেকে সেই কান্নাটুকু পেতে সেদিন অবশ্য সেই নারীকে সমাহিত হতে হয়েছিল।

সেই বিশাল মানুষটি, যাঁর জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে শত শত বই লেখা হয়েছে, আরো শত শত বই লেখা হবে ভবিষ্যতে, যাঁকে নিয়ে একশো বছরেরও বেশী সময় ধরে বিতর্ক হয়েছে, হচ্ছে, হবে আগামীতেও, তাঁর জীবনকে আশ্রয় করে মানুষ লেনিনকে এই উপন্যাসে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

পর্ব এক।। ভলোদিয়া।
——————————-
হেমন্তকাল। এক বৈচিত্র্যময় সোনালী এবং হলুদ রঙে প্রকৃতি যেন নিজেকে সাজিয়েছে। সেই রঙ ক্রমশ ফিকে হয়ে হলুদ বিবর্ণ হয়ে আসছে, আর সেই সাথে অবিরাম পাতা ঝরছে গাছের ডাল থেকে ডালে। হেমন্তকাল শেষ হতে দেরী নেই, গাছগুলোও যেন ক্লান্তিহীনভাবে শেষ পাতাটাও ঝরিয়ে দিতে চাচ্ছে। কেবল ঝাউ গাছগুলোই যেন কিছুটা নির্বিকার-তবু আসন্ন শীতের আগমনে তাদের কান্ডগুলোও যেন বিষন্ন হতে শুরু করেছে। দু’পাশের বড় বড় গাছ থেকে ঝরে পড়া বিবর্ণ হলুদ পাতায় রাস্তাগুলো ঢেকে আছে। হঠাৎ করে কেউ দেখলে মনে করতে পারে প্রকৃতি যেন কাউকে স্বাগত জানাতে হলুদ গালিচা পেতে অপেক্ষা করছে। একটু জোরে বাতাস বয়ে গেলে পাতাগুলো এমনভাবে ঝরতে থাকে দেখে মনে হয় গাছগুলো যেন দারুণ রোষে পাতাগুলোকে ফেলে দিচ্ছে। এদিকে ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যায় শীতের আগমন নিয়ে বাতাসও যেন কানাকানি শুরু করেছে।

ভলগার তীর ঘেষে গড়ে ওঠা শহর সিমবিরস্কি। শহরটি সুন্দর। অন্তত প্রথম যারা এই শহরে আসে তাদের এমনটাই মনে হয়। কিছুদিন থাকতে শুরু করলে তারা বুঝতে শুরু করে সিমবির্স্কি শহরটা সুন্দর সেটা প্রধানত ভলগার জন্য। ভলগা নদীকে বাদ দিলে সিমবির্স্কি উনবিংশ শতাব্দীর রুশ সাম্রাজ্যের আর পাঁচটি শহরের মতোই। ১৮৬৯ সালে হেমন্তের শেষ দিকে এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে স্কুল পরিদর্শক ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উলিয়ানভ তার সন্তানসম্ভানা স্ত্রী মারিয়া আলেকজান্ড্রাভানা, আট বছরের কন্যা আন্না উলিয়ানভা এবং ছয় বছরের পুত্র আলেকজান্ডার উলিয়ানভ, যাকে আদর করে পরিবারের সবাই ডাকে ‘সাশা’ নামে, তাদের নিয়ে শহরে এক প্রান্তে স্ট্রীলেটস্কায়া স্ট্রীটের একটি বাড়ীতে এসে উঠলেন।

ভলগা এবং ওকা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা নদী বন্দর নিজ্নি নভ্গরদ এর শিক্ষক ইলিয়া নিকোলায়েভিচ পদোন্নতি পেয়ে সিমবির্স্ক গুবেরনিয়ার (জেলার) স্কুল পরিদর্শক হিসাবে এলেন সিমবির্স্ক শহরে। একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া ইলিচ নিকোলাভিয়েচ অল্প বয়সে পিতৃহীন হয়ে বড় ভাইয়ের সাহায্যে কোনরকমে লেখাপড়া করা সুযোগ পেয়েছিলেন। শিক্ষক হিসাবে পরিশ্রমী, মেধাবী এবং পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের ছুটির দিনেও বিনে পয়সায় পড়াতেন বলে তিনি কর্তৃপক্ষের সুনজরে পড়েন। তাই অনেককে টপকে তাঁকে যখন স্কুল পরিদর্শক হিসাবে পদোন্নতি দেয়া হলো তিনি ঈশ্বরের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তিনি ভাবলেন স্ত্রীর সহযোগিতা এবং ধৈর্য্য ছাড়া পেশা জীবনে তিনি এই সাফল্যের মুখ দেখতে পেতেন না। তাঁর স্ত্রী মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ছিলেন কাজান অঞ্চলের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে মেয়ে। স্ত্রীর বাবা আলেকজান্ডার ব্লাঙ্ক ছিলেন পেশায় ডাক্তার। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ফরাসী, জার্মান ও ইংরেজি ভাষা জানেন, একই সাথে ভীষণ সঙ্গীতানুরাগী। কিন্তু পর পর কয়েকটা সন্তানের মা হবার পর তিনি সব চর্চায় ছেড়ে দিলেন। তিনি এখন সমস্ত সময়টাই ব্যয় করেন সন্তানদের দেখাশুনা এবং বাড়ীর কাজে-কর্মে।

বছর দুয়েক আগে টাইফয়েডে মারিয়া আলেকজান্ড্রাভানার তিন মাস বয়সী একটি ফুটফুটে মেয়ে মারা যায়। তাঁরা তখন নিজনি নভগরদে। মেয়েটির নাম রেখেছিলেন ‘ওলগা’। ওলগা নামের অর্থ পবিত্র। সেই নিষ্পাপ মেয়েটির মৃত্যুতে মারিয়া আলেকজান্ড্রাভানার থেকে যেন বেশী কষ্ট পেয়েছিলেন ইলিয়া নিকোলায়েভিচ। মেয়েটির মৃত্যুতে তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা তখন নিজের শোক ভুলে স্বামীর জন্য বেশী চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, কেননা এমন গম্ভীর, চুপচাপ স্বভারের মানুষটি ছোট্ট একটি মেয়ে মারা যাওয়ায় শিশুর মতো কাঁদবে, সেটা মারিয়ার ধারণারও বাইরে ছিল। আসলে এই মানুষটি তার সন্তানদের বড্ড ভালবাসেন, অথচ বাইরে থেকে সেটা কাউকে বুঝতে দিতে চান না। সব বাবারাই বোধ হয় এমন, মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা সেরকমই ভাবেন। এবার সন্তানসম্ভবা হয়ে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা তাই অনেক বেশী সাবধানতা অবলম্বন করছেন। ইলিয়া নিকোলাভিয়েচ নিজেও যতটা সম্ভব মারিয়ার খোঁজ খবর রাখছেন। সিমবির্স্কে নতুন বাসা গোছ-গাছ করতে করতে শীতকাল চলে এলো যেন হামাগুড়ি দিয়ে।

দিন দিন মারিয়া আলেকজান্ড্রাভানার শরীর ভারী হয়ে আসতে থাকে। ইলিয়া নিকোলাভিয়চ এবং মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা শুভ দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এই শহরে তাঁরা নতুন, সদ্য পরিচিত মানুষগুলোর সাথে এখনও তেমন ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। তাই ইলিয়া নিকোলাভিয়চ আগে থেকেই ধাত্রী ঠিক করে রাখলেন। সেদিন ১৮৭০ সালের ২২ শে এপ্রিল। রৌদ্রোজ্জ্বল সেই দিনটির তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বাড়ির সামনে রাস্তায়, গাছের ডালে জমে থাকা তুষার কিছুটা গলতে গুরু করেছে। সকাল বেলাতেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার তীব্র ব্যথা উঠলে ধাত্রীদের খবর দেয়া হলো। ইলিয়া নিকোলায়েভিচ অবস্থা বুঝতে পেরে সেদিন আর বাইরে গেলেন না। মেয়ে আন্না এবং ছেলে সাশাকে নিয়ে বসার ঘরে চিন্তিত মুখে আতুর ঘরের খবরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ওদিকে আতুর ঘরে ধাত্রীরা এই শীতের দিনেও যেন রীতিমতো ঘেমে উঠছেন। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, ধাত্রীরা তাদের জানা সব কৌশল প্রয়োগ করতে লাগলেন কিন্তু কোনভাবেই প্রসব করাতে পারছেন না। কম বয়সী এক ধাত্রী বলে উঠলো,

-আমাদের মনে হয় ইলিয়া নিকোলায়েভিচকে জানানো উচিত।

চিন্তিত মুখে বয়স্কা ধাত্রীটি বললেন,

-কি জানাবো? আমরা পারছি না, হাসপাতালে নিয়ে যান! ততক্ষণে পেটের শিশুটি বাঁচবে?

-এমন হচ্ছে কেন?

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার মাথার দিকে দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ধাত্রীর প্রশ্নের উত্তরে বয়স্কা বললেন,

– কারণ শিশুটির মাথাটি বেশ বড়। এখন দয়া করে চুপ করো। আর ওদিকে দাঁড়িয়ে না থেকে এদিকে এসে দু’পায়ের মাঝখানটা যতটা সম্ভব ফাঁক করে ধরো।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার আগেও তিনটি সন্তান হয়েছে। তিনি নিজেও অভিজ্ঞ তবু ধাত্রীদের কথোপকথনে যেন একটু ঘাবড়ে গেলেন। তিনি নিজেও ঘামছেন এবং বারবার চাপ দেয়াতে নিজেও হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। এমন সময় বয়স্কা ধাত্রীটি বলল,

-মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা, দয়া করে একটু জোরে চাপ দিন, আরেকটু জোরে। এইতো, আরেকটু জোরে…!

ধাত্রীর কথাগুলো মারিয়া অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো বটে কিন্তু মনে হল তাঁর শরীরের সমস্ত শক্তিটুকু যেন শেষ হয়ে গেল, আর তক্ষুনি ‘এইতো বেরিয়ে গেছে’ বলে বয়স্কা ধাত্রীটি জোরে চিৎকার করে উঠলো। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। কিন্তু ধাত্রীদের একজন চিৎকার করে বলতে থাকলো ‘ছেলে হয়েছে, ছেলে’।

শিশুটির নাড়ী কেটে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা শেষে ধাত্রীটি যখন মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার পাশে তাকে শুইয়ে দিল, মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা তখন শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। সদ্যপ্রসূত শিশুটি তার ছোট ছোট মঙ্গোলিয়ান চোখ দু’টো দিয়ে মা’কে দেখছিল। মারিয়া যতটা সম্ভব ঘাড়টি বাঁকা করে, চোখগুলো নীচে নামিয়ে শিশুটিকে দেখতে লাগল। ‘সত্যিইতো, ছেলেটির মাথাটা একটু বড়’। মারিয়া ভাবলেন ছেলেটি সুস্থ তো! কথাটা মনে হতেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার মন খারাপ হয়ে গেল। দু’বছর আগে তিনি জন্ম দিয়েও তার কন্যাটিকে হারিয়েছেন। তাই সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটির জন্য মারিয়া বুকের মধ্যে এক প্রগাঢ় টান অনুভব করলেন। নিজের শরীরের ব্যথা ভুলে গিয়ে তিনি শিশুটিকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। সেই শীতের দিনটিতে, মায়ের বুকের মধ্যে ছোট্ট শিশুটি যেন সত্যিকারের ওম খুঁজে পেল।

কয়েকদিন হয়ে গেল, তবু শিশুটি শুধু কাঁদে, কখনো কখনো সেই কান্না যেন রুপ নেয় চিৎকারে। শান্ত উলিয়ানভ পরিবারটি এই ছোট্ট ছেলেটির চিৎকার ও কান্নায় সবসময় সরব থাকে। ছেলেটির নাম তখনও ঠিক করা হয়নি। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা শিশুটিকে আদর করে ডাকেন ‘ভলোদিয়া’ নামে। ‘ভ্লাদিমি’র থেকে ভলোদিয়া। ভ্লাদিমির নামের অর্থ হলো ‘মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি’। উলিয়ানভ পরিবার সিদ্ধান্ত নিল ছেলেটির পুরো নাম ঠিক করা হবে ব্যাপ্টিজমের মাধ্যমে। ইলিয়া নিকোলায়েভিচ ধর্মীয় পরিচয়ে ক্রিশ্চিয়ান হলেও, তিনি ছিলেন অর্থোডক্স। অন্যদিকে মারিয়ার বাবা ডা: আলেকজান্ডার ব্লাঙ্ক ক্রিশ্চিয়ান হয়েও বিয়ে করেছিলেন আন্না নামের এক জার্মান বংশোদ্ভূত ইহুদি নারীকে। তিনি ছিলেন লুথেরিয়ান ক্রিশ্চিয়ান। আর এই কারণে ইলিয়া নিকোলায়েভিচ এবং মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা দু’জনেই ক্রিশ্চিয়ান ধর্মালম্বী হয়েও ভিন্ন ভিন্ন গীর্জায় যান। শিশুটির জন্মের সাতদিন পর অর্থাৎ ২৯শে এপ্রিল ব্যাপ্টিজমের মাধ্যমে তার নাম রাখা হলো ‘ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ’।

এদিকে ভলোদিয়ার বয়স যখন দেড় বছর তখন মারিয়া আবার মা হলেন। ইতোপূর্বে যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল তার প্রতি ভালবাসা থেকেই সম্ভবত: ইলিয়া নিকোলাভিয়েচ এবং মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা এই মেয়েটিরও নাম রাখলেন ‘ওলগা’। যদিও পরিবারের সবাই আদর করে ডাকে ওলিয়া। ওলিয়ার জন্মে মারিয়ার খুশী হবার কথা, তিনি সেটা হয়েও ছিলেন। তবু মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার মন খারাপ হয় ভলোদিয়ার কথা ভেবে। তিনি ওলগার যত্ন নেবেন না ভলোদিয়ার? ওলিয়া ছোট, ফলে ওলিয়াকে বেশী যত্ন নিতে হচ্ছিল। ওদিকে ভলোদিয়ার জন্য মারিয়ার মন ব্যকুল হয়ে থাকে। উপায় না দেখে ইলিয়া নিকোলায়েভিচ ভলোদিয়াকে দেখাশুনার জন্য ‘বারবারা সারবাতরোভা’ নামের একজন ন্যানী (ধাই মা) রাখলেন।

ভলোদিয়ার বয়স দু’বছরের বেশী হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে হাঁটে না। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার চিন্তা বাড়ে। দেখা যায় সে দাঁড়াতে গেলেই পড়ে যায়। পড়ে গেলে মাথাটা কাঠের পাটাতনের উপর পড়ে। সে ব্যথা পাই, তবু সেই পড়ে যাওয়া অবস্থায় পাটাতনের উপর মাথা দিয়ে জোরে জোরে সে আঘাত করতে থাকে। এসব দেখে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা

ভাবেন ছেলেটির মাথায় কোন সমস্যা নেই তো? একদিন সে কথা তুলতেই ইলিয়া নিকোলায়েভিচ বললেন,

-আরে না। সেরকম কিছু না। তোমার এই ছেলেটি অলস। আর এ কারণেই সে হাঁটতে শিখছে না।

মারিয়া কিছু বলেন না। চুপ করে থাকেন আর শুধু ভাবেন। আর তাঁর সেই ভাবনার মধ্যে অমূলক ভাবনায় থাকে বেশী। একদিন বসার ঘরে আন্না উলিয়ানভা সোফায়, নীচে ভলোদিয়াকে নিয়ে ন্যানী বারবারা বসে আছে। বারবারা হঠাৎ করে আন্নাকে বললো, ‘তোমার এই ভাইটি হয় খুব বুদ্ধিমান হবে অথবা নিরেট গবেট হবে’।

আন্না উলিয়ানভা বারবারার একথায় রাগ করে। সে তৎক্ষনাৎ গিয়ে কথাটা মাকে বলে আসে। ন্যানীর এই কথা শুনে মারিয়ার দুঃশ্চিন্তা আরো বাড়ে। ছেলেটি কি গবেটই হয়?

ওলগা এক বছর না যেতেই হাঁটা শিখল। মারিয়ার দু:শ্চিন্তা তখন উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠাই রুপ নিল। কিন্তু দিন কতকবাদে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভলোদিয়া হাঁটতে শেখে। হাঁটার সময় সে টলতে থাকে। আর সে কারণে হাঁটতে শিখলেও মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার দুঃশ্চিন্তা কমে না। তিনি সব সময় ভাবেন ‘ভলোদিয়া আছাড় খেল বলে’।

ছেলেমেয়েরা বড় হতে থাকে। ইতোমধ্যে মারিয়ার আরো তিনটি সন্তান হলো। নিকোলাই নামের একটি ছেলে সন্তান মারা গেলেও মারিয়া এবং দিমিত্রি নামের আরো দু’টি সন্তান আসে সংসারে। মারিয়াকে সবাই আদর করে ডাকে মিত্তিয়া। পাঁচ সন্তানের বাড়িটাই হৈ চৈ, খেলা-ধুলা, কান্নাকাটি, চিৎকার-চেঁচামেচি লেগেই আছে। বাড়ীতে এখন সদস্য সংখ্যা আট জন। এই বাড়ীটা আটজন মানুষের জন্য বড্ড ছোট হয়ে গেল। কিছুদিন ধরেই ইলিয়া নিকোলায়েভিচ একটি বাড়ী কেনার কথা ভাবছিলেন। তাই তিনি বড় বাড়ীর খোঁজ করতে থাকেন। খুঁজতে খুঁজতে সিমবির্স্কের মস্কো স্ট্রীটে তিনি একটি বাড়ীর খোঁজ পেলেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বাড়ীটি দেখেও এলেন। রাস্তার সাথে একতলা কাঠের বাড়ী। দেখতে দোতলা বাড়ির মত লাগে কারণ উপরে চিলেকোঠা। গেট দিয়ে ঢুকলে সামনে বেশ বড় একটা ঘাসের সবুজ লন। লনটির ডান দিকে বড় একটি বড় ঘর। খুব খোলা মেলা। ইলিচ নিকোলাভিয়েচ ভাবলেন এই ঘরটিতে একটা লাইব্রেরি বানানো যেতে পারে। অনেকদিন ধরে তাঁর লাইব্রেরি করার শখ। লনের বাম পাশেই বড় বসার ঘর। রান্না ঘরটি দেখে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা ভীষণ পচ্ছন্দ করলেন। এতগুলো ছেলে-মেয়ের জন্য একটা বড় রান্নাঘর লাগেই। সাথে লাগোয়া ডাইনিংরুমটিও বেশ বড়। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলে চিলেকোঠায় চারটি ঘর। ছাদের এক পাশে সিঁড়ির কাছেই পাশাপাশি দু’টো ঘর। ছাদ থেকে দু’দিক থেকেই নীচতলায় নামা যায়। ছাদের অন্য প্রান্তেও দু’টো ঘর আছে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা ভাবলেন সাশা ও ভলোদিয়াকে আলাদা দু’টো ঘর দেয়া যাবে। আবার অন্যদিকের যে দু’টো ঘর আছে, সেখানে একটি ঘরে আন্না আর অন্য ঘরটিতে ছোট ছেলেমেয়েরা থাকতে পারবে। নীচে নামার জন্য তারাও আলাদা সিঁড়ি পাবে। নীচতলায় বড় শোবার ঘর ছাড়াও একটি গেষ্ট রুম আছে। বাড়ী পিছনে সুন্দর ঘাসে ভরা এক টুকরো জমি সমেত একটা উঠোন আছে। ইলিয়া নিকোলায়েভিচ ভাবলেন সেখানে ছেলেমেয়েদের ব্যায়ামের জন্য কিছু যন্ত্র বানিয়ে দেবেন। উঠোনটি পার হলেই বেশ বড় একটি বাগান। বাগানটি ঘেরা বেড়া দিয়ে। বেড়ার গায়ে একটি ছোট্ট ফটক। এই ফটক দিয়ে বের হলেই পক্রভস্কায়া স্ট্রিট। পক্রভস্কায়া স্ট্রিট ধরে গেলে স্তিয়াগা নদীটি খুব কাছে। ইলিয়া নিকোলায়েভিচ ভেবে দেখলেন শীতকালে ছেলেমেয়েরা স্কেটিং করতে চাইলে বা গ্রীষ্মকালে স্তিয়াগা নদীতে গোসলের জন্য এই ফটকটি ব্যবহার করতে পারবে। ফটকের সাথে সেই বড় বাগানটি ফলের গাছে ভরা। এক দিকে আপেল গাছগুলি, পাশেই চেরিফলের গাছ। বেশ কয়েকটি লেবু গাছ। অন্যদিকে বেরি’র ঝোপগুলি। বাগানের একটা দিকে চমৎকার ফুলের বাগান। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ফুল খুব ভালবাসেন। মায়ের দেখাদেখি ছেলেমেয়েরাও। মুল বাড়ীর রান্না ঘরের পিছন দিয়ে সেই বাগানে যাওয়ার জনঢ় একটি দরজা আছে। বাগান সংলগ্ন একটা ঘর আছে, চাইলে ষ্টোর রুম হিসাবে ব্যবাহার করা যায় বা অন্য যে কোন কাজে। সব কিছু মিলিয়ে বাড়িটি তাদের ভীষণ পছন্দ হলো। তাই দেরী না করে বাড়টি ইলিয়া নিকোলায়েভিচ কিনে ফেললেন।

একদিন সবাইকে নিয়ে তিনি ৬৪ নম্বর মস্কো স্ট্রিটের সেই বাড়ীতে উঠে এলেন। তখন ভলেদিয়ার বয়স মাত্র আট বছর। নতুন বাড়ীতে এসে অনেকগুলো শোবার ঘর, বসার ঘর, পড়ার ঘর, বাগান, বাগানের ফল-ফুল, পানির জন্য কুয়ো, বাড়ির দু’দিকেই রাস্তা, সদর দরজা দিয়ে বের হলে ভলগা নদী, পিছন থেকে গেলে স্তিয়াগা নদী, সব মিলিয়ে শহরের প্রাণ কেন্দ্রের এই বাড়ীতে এসে ছেলেমেয়েরা ভীষণ খুশী হলো।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার অন্য সব ছেলেমেয়েরা শান্ত হলেও ভলোদিয়া খুবই অশান্ত। সে এটা ভাঙে, ওটা খুলে রাখে। সারাদিন ওলিয়া এবং দিমিত্রির পিছনে লেগে থাকে। এক জন্মদিনে বারবারা ভলোদিয়াকে কাগজের তৈরী খুব সুন্দর ত্রোইকা অথার্ৎ তিন ঘোড়ার গাড়ী উপহার দিল। আধঘন্টার মধ্যে দেখা গেল খেলনাটি ছেঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। কাজটি যে ভলোদিয়ার সেটা বুঝতে কারো কষ্ট হলো না। আন্না ও সাশা স্কুলে যায়। ভলোদিয়া এক বছর পর স্কুলে যাবে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা সেই পাঁচ বছর বয়স থেকেই ভলোদিয়াকে নিয়ে বাড়ীতে পড়তে বসান। নতুন বাড়ীতে এসে ভলোদিয়া একটি ছড়া মুখস্থ করে। ছড়াটি সে এতই পছন্দ করে যে ছড়াটি যখন তখন আবৃত্তি করতে থাকে। ছড়াটির নাম ‘গরীব কৃষকের গান’। ইলিয়া নিকোলায়েভিচ হয়তো অফিস থেকে ফিরে বসার ঘরে বসতে বসতে বললেন,

-ভলোদিয়া, ছড়াটা শোনাও তো!

ভলোদিয়া গড়গড় করে আবৃত্তি করে,

“বড়লোকে সারা রাত্রির ভয়-ভাবনায় ভোগে

ঘড়া ঘড়া টাকা আগলে পাশে,

আর ছেঁড়া কাঁথায় খুশির গানে মাতে গরীব লোকে-

ছেঁড়াফাঁড়া পোশাকে তার কী বা যায় আসে।”

মাঝে মাঝে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ছেলে-মেয়েদের দূরন্তপনায় অতীষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে ভলোদিয়া এবং ওলিয়া বেশী দূরন্ত। ছেলে-মেয়েরা অবাধ্য হলে মারিয়া আলেকজান্দ্রভানা মাঝে মাঝে তাদের শাস্তি দেন। তাদের বাবার পড়া ঘরে একটি চেয়ার ছিল। যখন কেউ অবাধ্য হয় বা বেশী দুষ্টুমি করে তিনি ‘টাইম আউট’ দিয়ে সেই চেয়ারে গিয়ে না ডাকা পর্যন্ত বসে থাকতে বলেন। ছেলে-মেয়েরা সেই চেয়ারটির নাম দিল ‘ভয়ংকর চেয়ার’।

সেদিন ভলোদিয়া ভীষণ দুষ্টামী করছিল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা কয়েকবার নিষেধ করলেও সে কথা শোনে না। সে ওলিয়াকে বললো সোফার নীচে ঢুকতে। ওলিয়া সোফার নীচে ঢুকতে চেষ্টা করতেই মাথায় ব্যথা পেল। ব্যথা পেয়ে কাঁদতে শুরু করলে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা রেগে গিয়ে ভলোদিয়াকে টাইম আউট দিলেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেলেন তাকে ডাকতে। সংসারের কাজে ব্যস্ত মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার বিকাল বেলা খেয়াল করলেন যে ভলোদিয়াকে তিনি অনেকক্ষণ দেখেননি। অন্য ছেলে-মেয়েরাও খেয়াল করেনি যে ভলোদিয়া তাদের সাথে নেই। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা পড়ার ঘরে গিয়ে দেখলেন ভলোদিয়া সেই চেয়ারটিতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার এত মন খারাপ হলো! কাছে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে, আস্তে আস্তে তার ঘুম ভাঙিয়ে বললেন,

-‘হ্যারে ভলোদিয়া! আমি না হয় ভুলে গেছি, তাই বলে তুমি বের হবে না? গত চার/পাঁচ ঘন্টা এখানেই আছ?’

ভলেদিয়া মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

‘মাম্মাচুকা (রুশ ভাষায় মা), আপনি না বললে আমি কিভাবে যাই? আপনি না ডাকলে যে যেতে বারণ করেছিলেন’।

ছেলের কথায় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার একদিকে কষ্টে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো, অন্যদিকে বুকটি যেন গর্বে ফুলে ওঠে। মনে মনে ভাবলেন তাঁর সব ছেলেমেয়েগুলোই ভাল, কিন্তু ভলোদিয়া যেন অন্যরকম। এই তো কয়েকমাস আগে আপেলের পুর দেয়া পিঠা বানানোর জন্য তিনি রান্নাঘরে আপেল কুচি করে সেগুলো ডাঁই করে টেবিলের উপর জমা করছিলেন। ভলোদিয়া তখন রান্নাঘরে ঢোকে। সে আপেল-কুচো খাবে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা বলেছিলেন, ‘না, এখন আপেল-কুচো খাওয়া ঠিক হবে না, তাহলে পিঠা বানাতে ডাঁই কম পড়ে যাবে।’ এমন সময় ইলিয়া নিকোলায়েভিচ ডাক দিলে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা রান্না ঘর ছেড়ে যেতেই ভলোদিয়া পুরো আপেল-কুচি নিয়ে রান্না ঘরের পিছন দিয়ে বাগানে পেতে রাখা টেবিলে বসে গ্রোগ্রাসে সেগুলো খাওয়া শুরু করে। রান্না ঘরে ফিরে এসে ভলোদিয়াকে দেখতে না পেয়ে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে তিনি দেখতে পেলেন ভলোদিয়ার কান্ড। রেগে গিয়ে তিনি তাকে প্রচন্ড বকা দিলে উত্তরে ভলোদিয়া বলেছিল, ‘মাম্মাচুকা, আর কখনো না বলে আমি কিছু নেব না।’ মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ভেবে দেখলেন সে দিনের পর থেকে ভলোদিয়া না বলে কিছুতেই হাত দেয় না। তিনি আরো ভাবলেন-ভলোদিয়া দোষ করে, আবার সেটা সে স্বীকারও করে। কোন কিছুই গোপন করে না। ভলোদিয়ার চরিত্রের এই দিকটি মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানার খুব ভাল লাগে।

দেখতে দেখতে গরমের ছুটি চলে এলো। এই প্রথম ভলোদিয়াকে বড় বোন অান্না ও ভাই সাশার সাথে ‘কাজানে’ খালা আন্না আলেকজান্দ্রাভানার বাড়ীতে বেড়াতে যাবার অনুমতি দেয়া হলো। ভলোদিয়াও শুনে শুরুতে বেশ উত্তেজনা দেখাল। ষ্টীম চালিত নৌকায় ভলগা ধরে তারা কাজান যাবে। কিন্তু যাবার দিন যত ঘনিয়ে আসে ভলোদিয়ার মন খারাপ হতে থাকে। তার কেবলই মনে হতে থাকে মাকে ছাড়া এতদিন সে কিভাবে থাকবে? যাবার দিন সকালে বাড়ীর সামনে ঘোড়ার গাড়ী প্রস্তুত। আন্না ও সাশা বাড়ী থেকে বের হয়ে গাড়ীতে উঠলো। ভলোদিয়া দেরী করছে। স্টিমার ঘাট এখান থেকে চার মাইল দূরে। এখনই বের না হলে দেরী হয়ে যাবে। আন্না ও সাশা উসখুস করতে থাকে। এমন সময় আন্না দেখল মন খারাপ করে ভলোদিয়া মায়ের হাত ধরে এগিয়ে আসছে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা ছেলে-মেয়েকে বিদায় দিয়ে বাড়ীতে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলেন ভলোদিয়াটা এমন হলো কেন? এটাও ভাবলেন এই ছেলেটিকে কি আমি বেশী ভালবাসি? নাকি সাশাকে? আবার নিজের মনের এমন ভাবনার জন্য নিজেই লজ্জিত হলেন। মানুষ কোন কোন সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাই, তাকে এড়িয়ে চলে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানাও কি তেমন একটি সত্যকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইলেন?

কাজানে খালা আন্না আলেজান্দ্রাভানার বাড়ীতে প্রথম প্রথম ভলোদিয়ার ভীষণ মন খারাপ হলো। সেই মন খারাপ মায়ের জন্য, ছোট বোন মিত্তিয়া, ভাই দিমিত্রি এমনকি সাশার পোষা বেড়ালটার জন্যও। ভলোদিয়ার মনে হতে থাকে সিমবির্স্কের সব কিছু ভাল আর কাজানের সব কিছু খারাপ। আস্তে আস্তে অবশ্য কাজানও তার ভাল লাগতে থাকে। দিনের বেলা হৈ চৈ, খেলাধুলা, ঘোড়ায় চড়া শেখা এসব করে কখন যেন সময়টা কেটে যায়। কিন্তু সন্ধা নামার পর যত রাত বাড়ে, ভলোদিয়ার মন খারাপ যেন তার সাথে পাল্লা দিতে শুরু করে। আন্না ও সাশা অবশ্য তাদের এই ছোট ভাইটিকে সবসময় আগলে রাখার চেষ্টা করে। একদিন খেলতে খেলতে ভলোদিয়া একটা টেবিলে ধাক্কা খেল। সেই ধাক্কায় খালার সুন্দর কাঁচের একটি ফুলদানি পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। অন্য ভাইবোনরাও আশে পাশেই খেলছিল। ভাঙার শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে খালা দৌঁড়ে এলেন। তিনি একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘কে ফুলদানিটি ভেঙেছে?’। অন্যরা সবাই ভলোদিয়ার থেকে বড়। সবাই বলল, ‘আমি না, আমি না’। সবাই যখন বলছে ‘আমি না, আমি না’, তখন ভলোদিয়ার পক্ষে ‘আমি ভেঙেছি’ বলাটা বোধ হয় কঠিন হয়ে গেল। সেও অন্য সবার মতোই বললো, ‘আমি না’। কেউ যখন স্বীকার করলো না তখন খালা কাউকে কিছু বললেন না। কিন্তু পরের দিনগুলো ভলোদিয়ার যেন কাজানে অসহ্য লাগতে থাকে। বারবার ‘কবে বাড়ী যাবো?’ ‘কবে বাড়ী যাবো?’ বলে বড় দুই ভাইবোনকে সে অতীষ্ট করে তুললো।

প্রায় তিনমাস পর কাজান তিন ভাই-বোন সিমবিরস্কে ফিরছে। কাজান ষ্টীমার ঘাট থেকে সিমবির্স্ক। ষ্টীমারে উঠে ভলোদিয়া জোরে জোরে কথা বলতে থাকলে আন্না তাকে আস্তে করে বলল,

-ভলোদিয়া, এত জোরে চিৎকার করে না। আস্তে কথা বলো!’

উত্তরে ভলোদিয়া আরো জোরে বললো,

-কিন্তু স্টীমারটা তো জোরে চ্যাঁচাচ্ছে, তার বেলা তো কিছু বলছো না?

প্রায় একদিন স্টীমার যাত্রা শেষে ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরলে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা খুব খুশী হলেন। ছোট মিত্তিয়া হাত বাড়িয়ে অনেকটা যেন লাফিয়ে ভলোদিয়ার কোলে উঠলো। দিমিত্রি এসে আন্নাকে জড়িয়ে ধরে। সাশার পোষা বেড়ালটি আদর নিতে মিত্তিয়ার দেখাদেখি সেও লাফ দিয়ে সাশার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সেদিন রাতে ছেলেমেয়েরা ঘুমোতে গেল দেরী করে। মারিয়া সাধারণত: সব কাজ শেষ করে, ঘুমোতে যাবার আগে চিলেকোঠায় ছেলেমেয়েদের ঘরগুলো একবার ঘুরে আসেন। সেদিন উপরে গিয়ে দেখলেন সবাই ঘুমিয়ে গেছে শুধু ভলোদিয়া ছাড়া। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা যেন ভলোদিয়ার ঘর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। কাছে গিয়ে দেখলেন ভলোদিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পাশে বসতেই ভলোদিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা জানতে চাইলেন,

‘কি হয়েছে ভলোদিয়া? তুমি কাঁদছো কেন?

মায়ের কথায় ভলোদিয়ার কান্নার বেগ যেন আরো বেড়ে গেল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা তাকে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আদর করতে থাকলেন। একটু শান্ত হয়ে সে উত্তর করে,
-মা, আমি আন্না খালাকে মিথ্যা বলেছি।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা বুঝতে পারলেন না, ভলোদিয়া কি বলছে, কেন বলছে। তাই তিনি জানতে চাইলেন,
-কিসের জন্য মিথ্যা বলেছো?

মায়ের প্রশ্নে সে বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল,
-খালার ফুলদানিটি আমি ভেঙে ফেলেছিলাম। খালা জানতে চাইলে আমি মিথ্যা বলি। মা, আমি কেন মিথ্যা বললাম?

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা কিছুক্ষণ ভলোদিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন। তিনি জানেন যে তার এই ছেলেটি মিথ্যা বলে না। ঘটনাচক্রে বা তাৎক্ষণিক ভয় পেয়ে সে হয়তো নিজের দোষ স্বীকার করতে পারেনি। আর সে কারণে আট বছর বয়সের এই ছোট্ট ছেলেটি কষ্ট পাচ্ছে। অথচ মানুষ প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে কত মিথ্যাই না বলে! তাই তিনি নরম গলায় বললেন,
-তুমি তো আমার কাছে সত্যটিই বললে! ঠিক আছে, এটা নিয়ে মন খারাপ করো না। আমি তোমার খালাকে জানিয়ে দেব।

তবু ভলোদিয়া চোখ মুছতে মুছতে বলে,
-মাম্মাচুকা, আমার খুব খারাপ লাগছে।

ছেলের কথা শুনে তার চুলের মধ্যে আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে তিনি বললেন,
-আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে এক কাজ করলে কেমন হয়? আগামীকাল তোমার খালাকে একটি চিঠি লিখে দিই। আর তুমিও একটি চিঠি লেখ।
-আমি?
-হ্যাঁ। তুমি। আমি তোমাকে মজা করে চিঠি লেখার উপায় শিখিয়ে দেব।

ভলোদিয়া মায়ের কথায় বেশ উৎসাহবোধ করে জানতে চাইলো,
– মাম্মাচুকা, কি রকম মজা?
-ধর, তুমি তোমার খালাকে চিঠিটি লিখলে এমন কালি দিয়ে যে, যতক্ষণ না তুমি তোমার খালাকে জানিয়ে দিচ্ছ কিভাবে সেটার পাঠ উদ্ধার করতে হবে, তোমার খালা চিঠিটি পড়তেই পারবে না। আর বুঝতেও পারবে না এটা সাদা কাগজ না চিঠি।

ভলোদিয়া চোখ বড় বড় করে বলল,
-সত্যি?
-হ্যাঁ। আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব কিভাবে অদৃশ্য কালি দিয়ে চিঠি লিখতে হয়।

উত্তেজিত ভলোদিয়ার মনে তখনও অনেক প্রশ্ন। সে আবার জিগ্যেস করে,
-মাম্মাচুকা, সেই চিঠি তাহলে খালা পড়বেন কিভাবে?
-হুম। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। সেই চিঠিটি মোমবাতির আলোয় তাপ দিলে সেই অদৃশ্য লেখাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করবে।

ভলোদিয়া হাত তালি দিয়ে বলে ওঠে,
-বাহ্! দারুণ তো!

সেই রাতে মায়ের সাথে কথা বলে ভলোদিয়ার মনটা সত্যি ভাল হয়ে গেল। মিথ্যা বলার বোঝাটা যেন তার ছোট্ট বুকের উপর ভারী পাথরের মত এতদিন চেপে বসে ছিল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভানা নীচে নেমে গেলেন আলোটা বন্ধ করে। চারিদিকে শুনশান নিরবতা। ভলোদিয়ার কানে আসে অদূরে ভলগার পাড়ে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ। সেই অগুনিত ঢেউয়ের আছড়ে পড়া শব্দ যেন সঙ্গীতের মত একটা সুর তুলে তার এসে এসে লাগে। তার চোখের পাতাদু’টো বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। অনেকদিন বাদে সেই রাতে এক গভীর আনন্দ নিয়ে ভলোদিয়া ঘুমিয়ে পড়ে।

পর্ব দুই পড়তে ক্লিক করুন

পর্ব তিন পড়তে ক্লিক করুন

পর্ব চার পড়তে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top