লেনিন ।। পর্ব এক ।। আশানুর রহমান খোকন

(ভূমিকা: একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা ছিল অনেকদিনের। একটি মানুষ, যিনি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, যিনি নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য প্রথম একটি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিলেন। সেই মানুষটিকে অর্থাৎ লেনিনকে জানতে চেয়েছি বহুদিন ধরেই বহু দিক থেকে। তাঁর জন্মের প্রতীক্ষার দিনগুলিতে ভলগা নদীর উপরে বরফের স্তুপ জমে ছিল। সেই শক্ত বরফের নীচে খুঁজলে হয়তো পানি পাওয়া যেতো। দেখা যেতো সেই পানিতে মাছ নিঃশ্বাস নিচ্ছে, সাঁতার কাঁটছে। বিপ্লবের মতো কঠিন ও জটিল কাজটির যিনি নেতৃত্ব দিলেন, সেই মানুষটির ভিতরের মানুষটি, মানবিক মানুষটিকে খু্ঁজতে গিয়ে ভলগার সিমবিরস্কির ৬৪ নম্বর মস্কো স্ট্রিট থেকে শুরু করে সেন্ট পিটার্সবার্গ, সাইবেরিয়া, জার্মানী, লন্ডন, প্যারিস, ফিনল্যান্ড, প্রাগ, জুরিখ, স্মোনলি ভবন কত জায়গায় না তাঁর সাথে ঘুরতে হয়েছে। সব সময় যে তাঁকে পুরোপুরি ছোঁয়া গেছে, ধরা গেছে, বোঝা গেছে এমন তো নয়! তবে মানবিক লেনিনকে খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি। এই বিশাল যাত্রাপথে তিনি বন্ধু পেয়েছেন, বন্ধু হারিয়েছেন, অনেক মানুষের ভালবাসা যেমন পেয়েছেন, ঘৃণাও তো কম জোটেনি তাঁর। কখনো কখনো তিনি হতাশ হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আঘাত পেয়েছেন, আঘাত করেছেনও। তাঁর এই বন্ধুর যাত্রাপথে সব সময় তিনি যাদেরকে পাশে পেয়েছেন সেটা তাঁর পরিবার। পেয়েছেন তাঁর মা, ভাই-বোন, স্ত্রী এমনকি প্রেমিকাকেও। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারিয়েছেন, সতের বছর বয়সে ভাইয়ের ফাঁসি হতে দেখেছেন, একুশ বছর বয়সে ছোট বোনের করুণ মৃত্যু দেখেছেন, পরিণত বয়সে মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনেছেন নির্বাসনে বসে, শত শত কর্মী আর বন্ধুর মৃত্যু দেখেছেন অথচ কোনদিন তিনি এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেননি। যে মানুষটি শত দুঃখ, শত কষ্টেও কাঁদেননি, সেই তিনিই কিনা কাঁদলেন একজন নারীর জন্য, যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ। তিনি তখন পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রটির কর্ণধার। তাঁর কাছ থেকে সেই কান্নাটুকু পেতে অবশ্য সেই নারীকে সেদিন সমাহিত হতে হয়েছিল।

এই বিশাল মানুষটি, যার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে শত শত বই লেখা হয়েছে, আরো শত শত বই লেখা হবে ভবিষ্যতে, যাঁকে নিয়ে একশো বছরেরও বেশী সময় ধরে বিতর্ক হয়েছে, হবে আগামীতেও, তাঁর জীবনকে আশ্রয় করে মানবিক লেনিনকে এই উপন্যাসে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।)

 

পর্ব এক।। ভলগার তীর।
———————-

১৮৬৯ সাল। হেমন্তকাল শেষ হতে আর দেরী নেই। গাছেরা অবিরাম পাতা ঝরাচ্ছে। দু’পাশের বড় বড় গাছ থেকে ঝরে পড়া  হলুদ পাতায় রাস্তাগুলো ঢেকে গেছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতি কাউকে স্বাগত জানাতে হলুদ গালিচা পেতে অপেক্ষা করছে। একটু জোরে বাতাস বয়ে গেলে পাতাগুলো এমনভাবে ঝরতে থাকে দেখে মনে হবে গাছগুলো যেন দারুণ রোষে পাতাগুলোকে ফেলে দিচ্ছে। ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যায় শীতের আগমন নিয়ে বাতাসও যেন কানাকানি শুরু করেছে। ভলগার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহর সিমবিরস্কি। শহরটি সুন্দর। অন্তত: প্রথম যারা এই শহরে আসে তাদের এমনটাই মনে হবে। কিছুদিন থাকতে শুরু করলে তারা বুঝতে শুরু করে সিমবিরস্কি শহরটা সুন্দর সেটা ভলগার জন্য। ভলগা নদীকে বাদ দিলে সিমবিরস্কি উনবিংশ শতাব্দীর রুশ সাম্রাজ্যের আর পাঁচটি শহরের মতোই। ১৮৬৯ সালে হেমন্তের শেষ দিকে এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে স্কুল পরিদর্শক ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উলিয়ানভ তার সন্তানসম্ভাবনা স্ত্রী মারিয়া আলেকজান্ড্রভানা, আট বছরের কন্যা আন্না উলিয়ানভা ও ছয় বছরের ছেলে আলেকজান্ডার উলিয়ানভকে নিয়ে শহরে এক প্রান্তে স্ট্রীলেটস্কায়া স্ট্রীটের একটি বাড়ীতে এসে উঠলেন।

বছর দুয়েক আগে টাইফয়েডে মারিয়ার কয়েক মাস বয়সী একটি ফুটফুটে মেয়ে মারা গিয়েছিল। মেয়েটির নাম ছিল ওলগা। ওলগা নামের অর্থ পবিত্র। সেই নিষ্পাপ মেয়েটির মৃত্যুতে মারিয়ার থেকে যেন বেশী কষ্ট পেয়েছিলেন ইলিয়া নিকোলায়েভিচ।  তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন। মারিয়া তখন নিজের শোক ভুলে স্বামীর জন্য বেশী চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। এমন গম্ভীর, চুপচাপ স্বভাবের মানুষটি ছোট্ট একটি মেয়ে মারা যাওয়ায় শিশুর মতো কাঁদবে সেটা মারিয়ার ধারণারও বাইরে ছিল। আসলে মানুষটি তার সন্তানদের বড্ড ভালবাসেন। অথচ বাইরে থেকে সেটা বুঝতে দেন না। সব বাবারা বোধ হয় এমনই হয়! এবার তাই গর্ভে সন্তান আসার পরপরই মারিয়া অনেক বেশী সাবধানতা অবলম্বন করছে। ইলিয়াও যতটা সম্ভব মারিয়ার খোঁজ খবর রাখছেন। নতুন বাসা গোছ-গাছ করতে করতে শীতকাল চলে এলো। মারিয়ার শরীর ক্রমশঃ ভারী হয়ে এসেছে। ইলিয়া ও মারিয়া দিন গুনতে থাকে। ১৮৭০ সালের ২২ শে এপ্রিল।  রৌদ্রোজ্জ্বল সেই দিনটির তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। মারিয়ার তীব্র ব্যথা ওঠে। ধাত্রীরা এলো। ইলিয়া অফিসে গেলেন না। তিনি মেয়ে আন্না ও ছেলে সাশাকে নিয়ে বসার ঘরে চিন্তিত মুখে আতুর ঘরের খবরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। আতুর ঘরে প্রস্তুত ধাত্রীরা প্রসব করাতে রীতিমত গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছিল। কারণ শিশুটির শরীরের তুলনায়  মাথাটি ছিল বেশ বড়। অনেক কষ্টে শিশুটিকে যখন ভুমিষ্ঠ করা হলো মারিয়া তখন শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। ধাত্রী এসে ছোট-খাটো শিশুটিকে মায়ের পাশে শুইয়ে দিলো। সদ্যপ্রসূত বাচ্চাটি তার ছোট ছোট মঙ্গোলিয়ান চোখ দু’টো দিয়ে মা’কে দেখছিল। মারিয়া ভাল করে ছেলেটিকে দেখলো। সত্যিইতো ছেলেটির মাথাটা একটু বড়। মারিয়া ভাবলো ছেলেটি সুস্থ তো! কথাটা মনে হতেই মারিয়ার মন খারাপ হয়ে গেলো। সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটির জন্য মারিয়া বুকের মধ্যে এক প্রগাঢ় টান অনুভব করলো। নিজের শরীরের ব্যথা ভুলে গিয়ে সে ছেলেটিকে বুকের মধ্যে টেনে নিলো। সেই শীতের দিনটিতে, মায়ের বুকের মধ্যে ছোট্ট শিশুটি যেন খুঁজে পেলো সত্যিকারের ওম।

বাচ্চাটি কাঁদে, চিৎকার করে। শান্ত উলিয়ানভ পরিবারটি ছোট্ট ছেলেটির চিৎকার ও কান্নায় সব সময় সরব থাকে। ছেলেটির নাম তখনও ঠিক করা হয়নি। মারিয়া আদর করে ডাকে ভলোদিয়া। ভ্লাদিমির থেকে ভলোদিয়া। ভ্লাদিমির নামের অর্থ হলো ‘মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি’। উলিয়ানভ পরিবার সিদ্ধান্ত নিল ছেলেটির পুরো নাম ঠিক করা হবে ব্যাপ্টিজমের মাধ্যমে। ইলিয়া নিকোলায়েভিচ ধর্মীয় পরিচয়ে খ্রীষ্টান হলেও, মারিয়ার বাবা ডা: আলেকজান্ডার ব্লাঙ্ক এক সময় ইহুদি থেকে খ্রীষ্টান হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন লুথারিয়ান। যে কারণে ইলিয়া ও মারিয়া দু’জনেই খ্রীষ্টান ধর্মালম্বী হলেও ভিন্ন ভিন্ন গীর্জায় যেতেন। শিশুটির জন্মের সাতদিন পর অর্থাৎ ২৯শে এপ্রিল ব্যাপ্টিজমের মাধ্যমে তার নাম রাখা হলো ‘ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ’।

ভলোদিয়ার বয়স যখন দেড় বছর তখন মারিয়া আবার মা হলো। ইতোপূর্বে যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল তার প্রতি ভালবাসা থেকেই সম্ভবত: ইলিয়া এই মেয়েটিরও নাম রাখলেন ওলগা। মারিয়ার খুশী হবার কথা, হয়েছিলোও। তবে মারিয়ার মন খারাপ হতো ভলোদিয়ার কথা ভেবে। সে ওলগার যত্ন নেবে না ভলোদিয়ার? স্বাভাবিকভাবেই ওলগাকে বেশী যত্ন নিতে হচ্ছিল। মারিয়ার মন ভলোদিয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। ভলোদিয়াকে দেখাশুনার জন্য তাই ‘বারবারা সারবাতরোভা’ নামের একজন ন্যানী রাখা হলো।

ভলোদিয়ার বয়স দু’বছরের বেশী হয়ে গেলেও সে হাঁটতে শেখে না। মায়ের চিন্তা বাড়ে। দাঁড়াতে গেলেই সে পড়ে যায়, মাথাটা কাঠের পাটাতনের উপর পড়ে, সে ব্যথা পায়। পড়ে যাওয়া অবস্থায় সে তখন পাটাতনের উপর মাথা দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করতে থাকে। মারিয়া ভাবে ছেলেটির মাথায় কোন রোগ নেই তো? ইলিয়া নিকোলায়েভিচ অবশ্য বলেন অন্য কথা। তিনি একদিন মারিয়াকে বললেন, ‘তোমার এই ছেলেটি অলস। এ কারণেই হাঁটা শেখে না’। ন্যানী বারবারা অন্য একদিন ভলোদিয়ার বড় বোন আন্নাকে বললো, ‘তোমার এই ভাইটি হয় খুব বুদ্ধিমান হবে অথবা হবে নিরেট গবেট’। ওলগা কিন্তু হাঁটা শিখলো এক বছর বয়সেই। মারিয়ার দু:শ্চিন্তা আরো একটু বাড়লো বৈকি। ওলগা হাঁটতে শুরু করার কিছুদিন বাদে ভলোদিয়াও অবশ্য হাঁটতে শুরু করে। মারিয়ার বুক থেকে দুঃচিন্তার একটি পাথর যেন নেমে গেলো।

ছেলেমেয়েরা বড় হতে থাকে। ইতোমধ্যে মারিয়ার আরো তিনটি সন্তান হয়। নিকোলাই নামের একটি ছেলে সন্তান মারা গেলেও মারিয়া এবং দিমিত্রি নামের তার অন্য দুটি সন্তান বড় হতে থাকে।  হৈ চৈ, খেলা-ধুলা, এবং চিৎকারে বাড়ীটি সব সময় সরগরম। ইলিয়া বড় বাড়ী খোঁজ করতে থাকেন। একদিন সবাইকে নিয়ে ৪৮ মস্কো স্ট্রিটের একটি বাড়ীতে উঠে যান। তখন ভলোদিয়ার বয়স মাত্র আট বছর। অনেকগুলো শোবার ঘর, বসার ঘর, পড়ার ঘর, বাগান, বাগান দেখাশুনার জন্য মালী সব মিলিয়ে শহরের প্রাণ কেন্দ্রের এই বাড়ীটি ছেলেমেয়েরা খুব পছন্দ করে। দোতলার সিঁড়ির কাছে পাশাপাশি দু’টি ঘরে থাকে ভলোদিয়া ও সাশা। মারিয়ার সব ছেলেমেয়ে শান্ত হলেও ভলোদিয়া খুবই অশান্ত। সে এটা ভাঙে, ওটা খুলে রাখে। এক জন্মদিনে বাবা-মা ভলোদিয়াকে কাগজের তৈরী খুব সুন্দর একটি ঘোড়া উপহার দিলো। আধঘন্টার মধ্যে দেখা গেলো খেলনাটি পড়ে আছে, ছেঁড়া অবস্থায়। কাজটি যে ভলোদিয়ার সেটা বুঝতে অবশ্য কারো কষ্ট হলো না। ছেলে-মেয়েরা অবাধ্য হলে মারিয়া মাঝে মাঝে তাদের শাস্তি দিতো। তাদের বাবার পড়া ঘরে একটি চেয়ার ছিল। যখন কেউ অবাধ্য হতো বা বেশী দুষ্টুমি করতো মারিয়া ‘টাইম আউট’ দিয়ে সেই চেয়ারে গিয়ে না ডাকা পর্যন্ত বসে থাকতে বলতো। ছেলে-মেয়েরা সেই চেয়ারটির নাম দিয়েছিল ‘ব্ল্যাক চেয়ার’। একদিন ভলোদিয়াকে টাইম আউট দেয়া হলো। মারিয়া ভুলে গেলো তাকে ডাকতে। সারাদিন পর বিকাল বেলা মারিয়ার খেয়াল হলো। অন্য ছেলে-মেয়েরাও খেয়াল করেনি যে ভলোদিয়া তাদের সাথে নেই। মারিয়া পড়ার ঘরে গিয়ে দেখে ভলোদিয়া সেই চেয়ারটিতে চুপচাপ বসে আছে। মারিয়ার এত মন খারাপ হলো! কাছে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইলো, ‘এই ভলোদিয়া! আমি না হয় ভুলে গেছি, তাই বলে তুমি বের হবে না? গত চার/পাঁচ ঘন্টা এখানে ঠাঁই বসে আছো?’ ভলেদিয়া মা’কে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মা, তুমি না বললে আমি কিভাবে আসি? তুমি না ডাকলে যে যেতে বারণ করেছিলে’। মারিয়ার বুকটি গর্বে ফুলে ওঠে। মনে হয়, তার সব ছেলেমেয়েগুলোই ভাল, কিন্তু ভলোদিয়া অন্যরকম ভাল। সে দোষ করে, আবার সেটা স্বীকারও করে। কোন কিছুই গোপন করে না। ভলোদিয়ার চরিত্রের এই দিকটি মারিয়ার খুব ভাল লাগে।

দেখতে দেখতে গরমের ছুটি চলে এলো। এই প্রথম ভলোদিয়াকে বড় বোন অান্না ও ভাই সাশার সাথে ‘কাজানে’ খালা বাড়ীতে বেড়াতে যাবার অনুমতি দেয়া হলো। ভলোদিয়াও শুরুতে বেশ উত্তেজনা দেখালো। স্টিম চালিত নৌকায় ভলগা ধরে তারা কাজান যাবে। কিন্তু যাবার দিন যত ঘনিয়ে আসে ভলোদিয়ার মন খারাপ হতে থাকে। তার কেবলই মনে হতে থাকে মাকে ছাড়া এতদিন সে কিভাবে থাকবে? যাবার দিন সকালে বাড়ীর সামনে ঘোড়ার গাড়ী প্রস্তুত। আন্না ও সাশা বাড়ী থেকে বের হয়ে গাড়ীতে উঠলো। ভলোদিয়া দেরী করছে। কিছুক্ষণবাদে আন্না দেখে ভলোদিয়া চোখ মুছতে মুছতে মায়ের হাত ধরে আসছে। মারিয়া ছেলে-মেয়েকে বিদায় দিয়ে বাড়ীতে ঢুকতে ঢুকতে ভাবে ভলোদিয়াটা এমন হলো কেন? ভাবে এই ছেলেটিকে কী আমি বেশী ভালবাসি? নাকি সাশাকে? আবার নিজের মনের এমন ভাবনার জন্য নিজেই লজ্জা বোধ করে। মানুষ কোন কোন সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, তাকে এড়িয়ে চলে। মারিয়াও কি তেমন একটি সত্যকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইলো?

কাজানে খালা আন্না ব্লাঙ্কের বাড়ীতে প্রথম প্রথম ভলোদিয়ার মন খারাপ থাকতো মায়ের জন্য, ছোট বোন মারিয়া, ভাই দিমিত্রি এমনকি পোষা বেড়ালটার জন্যও। ভলোদিয়ার মনে হচ্ছিল সিমবিরস্কের সব কিছু ভাল আর কাজানের সব কিছু খারাপ। আস্তে আস্তে অবশ্য কাজানও ভাল লাগতে শুরু করে। দিনের বেলা হৈ চৈ, খেলাধুলা, ঘোড়ায় চড়া শেখা এসব করে কখন যেন সময়টা কেটে যায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর যত রাত বাড়ে ভলোদিয়ার মন খারাপ যেন তার সাথে পাল্লা দিতে শুরু করে। আন্না ও সাশা অবশ্য তাদের এই ছোট ভাইটিকে সবসময় আগলে রাখার চেষ্টা করে। একদিন খেলতে খেলতে খালার সুন্দর কাঁচের একটি ফুলদানি ভলোদিয়ার হাত থেকে পড়ে যায়। অন্য ভাইবোনরাও আশে পাশেই খেলছিল। ভাঙার শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে খালা চলে আসেন। তিনি সবাইকে জিজ্ঞাসা করেন।  ভলোদিয়াও বাদ যায় না। তবে সে অস্বীকার করে। পরের দিনগুলো ভলোদিয়ার অসহ্য লাগতে থাকে। বারবার কবে বাড়ী যাবো, কবে বাড়ী যাবো বলে বড় দুই ভাইবোনকে অতীষ্ট করে তোলে। প্রায় তিনমাস পর তিন ভাই-বোন সিমবিরস্কে ফেরে। ছেলেমেয়েদের পেয়ে মারিয়া খুব খুশী। অন্য ভাই-বোনেরাও। ছোট বোন মারিয়া হাত বাড়িয়ে ভলোদিয়ার কোলে ওঠে। রাতের বেলা ছেলে মেয়েরা ঘুমোতে গেলো। মারিয়া সাধারণত: সব কাজ শেষ করে, ঘুমোতে যাবার আগে ছেলেমেয়েদের ঘরগুলোতে একবার করে ঘুরে আসে। সেদিন দেখে সবাই ঘুমিয়ে গেছে শুধু ভলোদিয়া ছাড়া। মারিয়া যেন ভলোদিয়ার ঘর থেকে কান্নার শব্দও শুনতে পেলো। কাছে গিয়ে দেখে ভলোদিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পাশে বসতেই ভলোদিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। মা জানতে চায়, ‘কি হয়েছে ভলোদিয়া?’
-মা, আমি খালার কাছে মিথ্যা বলেছি।
-কী মিথ্যা বলেছো?
-খালার ফুলদানিটি আমি ভেঙে ফেলেছিলাম। খালা জানতে চাইলে আমি মিথ্যা বলি। মা, আমি কেন মিথ্যা বললাম?
-তুমি তো আমার কাছে সত্যটিই বললে। ঠিক আছে, মন খারাপ করো না, আমি তোমার খালাকে বলে দেবো।
-আমার খুব খারাপ লাগছে, মা।
-আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে এক কাজ করলে কেমন হয়? আগামীকাল তোমার খালাকে একটি চিঠি লিখি। তুমিও একটি চিঠি লেখো।
-আমি?
-হ্যাঁ। তুমি। আমি তোমাকে মজা করে চিঠি লেখার উপায় শিখিয়ে দেবো।
– কি রকম?
-ধরো, তুমি তোমার খালাকে চিঠিটি লিখলে এমন কালি দিয়ে যে অন্য কারো হাতে পড়লেও তারা বুঝতে পারবে না এটা সাদা কাগজ না চিঠি।
-সত্যি?
-হ্যাঁ। আমি তোমাকে শিখিয়ে দেবো কিভাবে অদৃশ্য কালি তৈরী করতে হয়, আর সেই কালি দিয়ে কিভাবে চিঠি লিখতে হয়।
-মা, সেই চিঠি তাহলে খালা পড়বেন কিভাবে?
-মোমবাতির আলোয় তাপ দিলে সেই অদৃশ্য লেখাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করবে।
-বাহ্! দারুণ তো!

সেই রাতে মায়ের সাথে কথা বলে ভলোদিয়ার মনটা ভাল হয়ে গেলো। মিথ্যা বলার বোঝাটা যেন তার ছোট্ট বুকের উপর পাষাণের মতো চেপে ছিল। অনেকদিন বাদে গভীর আনন্দ নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়লো।

পর্ব দুই পড়তে ক্লিক করুন

পর্ব তিন পড়তে ক্লিক করুন

পর্ব চার পড়তে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top