আনসারনামা: মিজানুর রহমান নাসিম

এমন ধুলোবালিতে মাখামাখি করতে ঘুরেফিরে আসতে হয়। চল্লিশ বছর থেকে নানা জনের যাওয়া আসা। তারও আগে এসেছে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, কারবারী, পালাকার, ফকির-ফাসেক, বেশ্যা, নুলা কত জনে কত কাজে, কত ফিকিরে! মহাজনী নাও-লঞ্চও এসেছে উজান-ভাটি থেকে। ওরাও এলো।
তখন ভর সন্ধ্যা। থানাহাট বাজার থেকে চারকিলো পথ। হকের ফার্মেসীর সামনে থেকে ওরা রিক্সা ফুরালো। সরকারপাড়া মোড়ের আগেই বাঁয়ে ঢুকে আড়াআড়ি পূবে রমনা বাজার। সরু পাকা রাস্তা, খুব বেশি দিন হয় নি। প্রায় পুরো পথটাই ছড়ে গেছে। ব্যাটারি রিক্সা তবু এগিয়ে চললো খোয়া খানাখন্দে লাফাতে লাফাতে। মফস্বলের রিক্সা বা অটো চালকরা কিছুই মনে করে না এসব। ভাঙ্গাচোরা ওদের বেশ সয়ে গেছে।
সামনে উঁচু বাঁধের রাস্তা। সেখান থেকে তাকালে এপাশের সব জমি ঘরদোর নিচু মনে হয়। তারই একটু আগে রমনা নতুন বাজার। বাজার তো নয়, আড়াআড়ি দু’তিন সারি দোকান। যেন গ্রামের গাছপালা ঘরদোরেরই অংশ।
বাঁশের বেড়ার ঝাঁপ খোলা চায়ের দোকানের পাশে ওরা রিক্সা ছেড়ে দিলো। বাজারে গুটি কয়েক লোক। দোকানে দোকানে জটলা করছে। কেউবা ঘুরঘুর করছে এ দোকান থেকে ও দোকান। কেনাকাটা বলে তেমন কিছু নেই। কাজও নেই। দোকানের সামনে পাতা বাঁশের টঙে বসে আলসে আলাপ জমিয়েছে। বেশিরভাগই চা পান বিড়ির খরিদ্দার। সাদেকুল রিক্সা থেকে নেমে চায়ের দোকানে উঁকি দিতে থাকে। পরিচিত লোক খুঁজছে সে। সব কি আর মুখস্ত থাকে!
ভেতরে টঙে বসে বসন্তমুখী শ্যামলা লোকটি। লম্বাটে একহারা পাতলা গড়ন। বয়স ষাটসত্তুর হবে। তবে সে তুলনায় হাড়ের বাঁধন শক্ত। পাঞ্জাবির ওপর চাদর জড়িয়েছে। চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে বসে তিনি বিড়ি ফুঁকছিলেন। ‘এদিক আসিস ত আবুল ভাই।’ ডাক পেয়ে আবুল হোসেন ফিরে তাকালেন। এরপর সাদেকুলকেই উল্টো হাঁক দিলেন। উঠে এসে জোরাজুরি করে ওদেরকে স্টলে ঢুকালেন। সাদেকের তাড়া দেখেও বললেন, ‘এ্যাত তাল দেখাছিস কেনে? মেহমান ধরি আচচিস। আগোত চা খা। তারপরে তর কতা শুনা যাইবে।’
এলা ক কি তর কাম। হঠাত করিয়ে কেনে আলু? আবুল ভাই জিজ্ঞেস করেন।
আনোয়ারকে দেখিয়ে সাদেকুল বলে, হামার দোস্ত। ওয়ের এডা কাম গো। আনসার আলীর বাড়ি যাইবে।
হয় ওমরাই ত বাসন্তীক দেখে দিছিলো। ‘হোক তা। আইসেক’ বলে আবুল ভাই টর্চ জ্বেলে আগাতে লাগলো। ওরা পিছু পিছু।
অঘ্রাণের শেষ সন্ধ্যা। কুয়াশার পাতলা পর্দা চারপাশকে ঢেকে রেখেছে। ওরা তিনজনে হাঁটা দিলো। প্রায় অন্ধকার পথ। আবুল হোসেন মাঝে মধ্যে টর্চ মেরে আগাচ্ছে। আর তাকে অনুসরণ করছে ওরা। টর্চের আলো পড়তেই মৃতপ্রায় পথটা যেন নড়েচড়ে ওঠে। মাঝেমাঝে ধূলোর নিচে বিটুমিনের কালো আস্তর কাছিমের পিঠের মতো ভেসে উঠছে। তীর্যক আলোটা যেন কাছিমের পিঠে ফলার মতো গেঁথে যাচ্ছে। টর্চের আলোটাই অন্ধকার ঠেলে পথ বের করে নিচ্ছে। নতুবা অন্ধকারে সব একাকার।
মাল পরিবহণ করা হতো বলে পথটি বেশ চওড়া। মাটির এই পথটি কোন এক কালে হয়তো পাকা করা হয়েছিলো। ভরপল্লী হলেও মোকাম বলে একটা আলাদা গুরুত্ব পেয়েছিলো। আশপাশে গড়ে উঠেছিলো খানিকটা শহুরে ধাঁচের বসতি। স্কুলঘর, বাজার, খেলার মাঠ। রমনাই হয়ে উঠেছিলো চিলমারী থানার কেন্দ্র। যদিও ফের নদী ভাঙনের ভয় সব সময় তাড়া করতো। এই বুঝি চাপ দেয়! এই বুঝি ঝুপঝাপ শুরু হয়ে যায়! নিমেষে চারপাশ টানতে থাকে তলে! ব্রহ্মপুত্রের কোন বিশ্বাস নাই। আর সে এলে তাকে রুখবে কে? এই ভয় না থাকলে বসতিটা আরও যুতসই হতো। কয়েক দশকে পয়সাওয়ালারাই শুধু নয়, অনেকে বাপদাদার ভিটেমাটি ছেড়ে জমিজিরোত কিনে আবাস গেড়েছে উলিপুর, রাজারহাট বা জেলা শহর কুড়িগ্রামে। নদীর পেটে আর কত যায়!
অন্ধকারের ফাঁকে ফাঁকে দু’পাশে বাড়ি ও দোকানঘরে টিমটিমে হারিকেনের মতো করে দু’একটা বাল্ব জ্বলছিলো। আলোটুকু সবটাই তার চারপাশকে ঘিরে। রাস্তা পর্যন্ত খুব একটা আসে না। ফলে টর্চ জ্বেলে পথ চলতে হয়। দূর থেকে অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে টেলিভিশনের আওয়াজ। কোনো চায়ের দোকানে বোধহয় সিনেমা জুড়ে দিয়ে খরিদ্দার জমিয়েছে। আজকাল চায়ের সাথে ছবি গান না দিলে দোকান জমে না।
আর একশো গজ যেতেই পুরাতন রমনা বাজার। এককালের নামকরা পাটের মোকাম ছিলো রমনা বাজার। বিশাল বিশাল পাটের গোডাউন ছিলো। এখান থেকে মোষের গাড়িতে রমনা ঘাটে নিয়ে পাট বোঝাই হতো হাজারমণি নায়ে। পাশের থানা উলিপুর থেকে ঘাট চৌদ্দকিলো। সেখান থেকেও সারি বেঁধে ভিড়তো মাল বোঝাই গাড়ি। এরপর নায়ে তুলে ব্রহ্মপুত্র ধরে চলে যেতো দেশ দেশান্তরে।
পাটের কদর কমে যাওয়ায় সেই দিন কি আর আছে! তবে তার ধূলোমলিন চিহ্ন এখনও বেশ চোখে পড়ে। আর এই প্রশস্ত রাস্তা। জংধরা খয়েরি টিনের চালের গুদাম। এর আশপাশে কারবারের সেই ব্যস্ততা, শ্রমিকের ছুটাছুটি, পথের ধারে মাল বোঝাই মোষের গাড়ি কোনটিই নেই। সেসবের কোনকোনটি এখন মুরগির খামারঘর বা চাতাল বা ধান শুকানোর জায়গা। শুধু কি গুদাম? দেখে মনে হয় অবহেলায়, পুরো মোকামটিই সবার চোখের আড়ালে ধুঁকছে। পুরোনো ফাঁকা সিন্দুকের মতো এখন এর কানাকড়িও মূল্য নেই।
এরও কয়েক কদম এগোলে বেশ কটি দোকানঘর। খুচরো পয়সার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। দোকান ক’টাই মোকামের জিউটা ধরে রেখেছে।
ওরা রমনা পুরাতন বাজার এলো। খোপ খোপ মুখোমুখি কয়েকটি দোকানঘর। আধো আলো আধো অন্ধকার। পুরাতন সোঁদামাটির গন্ধ। এককালের জমজমাট বাজারের অবশিষ্ট হাড়গোড়। পাট গেছে তো এর জৌলুসও গেছে। যৌবন খুইয়ে নেড়ি কুত্তার মতো ধুঁকছে আর মৃত্যুর প্রহর গুনছে। বরং দুইশো গজ পেছনের নতুন বাজারটিই এখন তুলনায় সচল যেখানে বসে একটু আগে ওরা চা খেয়েছে।

২.
মাছবাজারের পরিত্যক্ত শেডের পাশ দিয়ে গলিতে পঞ্চাশ গজ এগোলেই আনসার আলীর বাড়ি। আনসার চেয়ারম্যান ওরফে আনসার ব্যাপারী। পঁচাত্তুরে কয়েক মাসের জন্য মেম্বার থেকে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন লোকটি। পাটের কারবার ছিলো আর ছিলো দুটি ইটভাটা। সব খুঁইয়েছে অনেক আগেই। এখন বাড়িভিটেটাই সম্বল। ভিটেটা বেশ বড়ই। পুরোনো বিষন্ন টিনের চৌয়ারি। চালা দেখে বুঝা যায় কমছে কম অর্ধশতক কাল পার করেছে। পাশে অবশ্য নয়া ঘর উঠেছে। আনসার আলীর বউ পুরোনো ঘরেই থাকে। বৃদ্ধার মাথায় গোলমাল। বাড়ির সকলে তাঁর শেষ প্রহর গুনছে।
স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়েরও মাথাটা প্রায় বিগড়ে গেছে। বাপের বাড়ির অনুগ্রহই তার ভরসা। বড় ছেলে বাড়ি ভেঙ্গে নিয়ে নদীর ওপারে রাজিবপুরে শ্বশুরের আশ্রয় নিয়েছে। ঐ জায়গাটি খালি পড়ে আছে বলে উঠানটা আরও ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মেঝ ছেলে দুটি বাড়িতে। তাদেরই বউবাচ্চায় কয়জন এই পরিবারে।
খানিক আলো ও খানিক আঁধার জমাট বেঁধে আছে ভিটেটার গায়ে। পড়োজমির মতো কেমন একটা শীতল নীরবতা। মনে হয় এর আশপাশেও জনমানবের চিহ্ন নেই। হয়তো আনসার আলী এখন নেই বলে।
২০০১ সালে তিনি গত হয়েছেন। কিন্তু তার কেচ্ছাটি এখনও লোকমুখে বেশ চাউর দেখে মুশকিলে পড়তে হয়। দেখা যায়, আনসার আলী মারা যান নি। তিনি বহাল তবিয়তে আছেন।
এই পুরাতন বাজারের এক চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে এককাপ চা খাওয়ার ছল করছিলেন। এরপর কোত্থেকে শুরু করা যায় কার কাছেই বা পাওয়া যায় ভেতরের কিছু তথ্য এমন মতলব করছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। লোকে তাঁর নাম দিয়েছে চারণ সাংবাদিক। কেননা পথ থেকে পথে ঘুরে বেড়িয়েই তিনি রসদ খবরের যোগাড় করেন। একেবারে সরাসরি জ্যান্ত খবর। যাকগে, সেটি চার দশক আগের অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের কথা। চিলমারীর খাদ্যসংকট নিয়ে সরেজমিন একটি প্রতিবেদন করতে হবে। সেজন্য সুদূর রংপুর থেকে এসেছেন। রংপুর থেকে সড়কপথে পঞ্চাশ কিলো পথ কুড়িগ্রাম। তারপর ট্রেনে তিরিশ কিলো পেরোলে রমনা স্টেশন। প্লাটফরম বলে কিছু নেই। পাদানি থেকে ঢেঙ্গা সাংবাদিককে পা ঝুলিয়ে নামতে হয়েছিলো নিচে বালুতে। সাথে আর এক সাংবাদিক মুকুল মোস্তাফিজ।
রমনাই শেষ স্টেশন। এরপর বিস্তৃত নদী। নদীর ওপারে ভুরি ভুরি চর। ঢুঁশমারী, কোদালকাঠি, অষ্টমীর চর, নয়ারহাট, খেউড়িয়া, ঘুঘুমারী, পাখিওড়া, চর শৈলমারী, কর্তিমারী, চর নেওয়াজী কত কি! তারপর দুই থানাসদর। তারপর সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে আসাম।
মোনাজাতউদ্দিন সঙ্গীকে নিয়ে নদীঘাটের দিকে খানিকটা এগিয়ে ডানে মোচড় দেন। পাঁচশ গজ এগোলেই রমনা বাজার। সেখানে সাতমিশেলী লোকের দেখা মিলবে। খবরের নাড়িনক্ষত্র যোগাড় হবে সহজেই। লোকটার কায়দাকৌশলের ধাঁচই আলাদা। নিমেষে হাঁড়ির তলার খবরও পুছে আনবে।
তখন রমনা বাজারে পাটের কারবারটা নিভু নিভু করছে। টিনের চালার কয়েকটি পাটগুদাম ঘর। পাশে ছোট্ট মুদিখানা, মনিহারি দোকান। চাঁটাইয়ের আয়না ঝুলানো সেলুন। যে আয়নায় তাকালে চেহারাটা বিকৃতভাবে ধরা দেয়। ভাঙ্গা নড়বড়ে বেঞ্চপাতা চায়ের দোকান। কিছু ব্যবসায়ী, পাটের দালাল, ফড়িয়া, বেকার যুবক। কোমরবাঁকা কর্মহীন মানুষ বসে আছে এলোমেলো। হাতে কাজ নেই বলে কেউ কেউ গুদামের পাশে দলা হয়ে বসে ষোল পাইত খেলছে। কেউ বিড়ি, সিগারেট ফুঁকছে। বেকার মজুররা বসে আছে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে।
বাজারের এক চায়ের দোকানে বসে চৌকষ দৃষ্টিতে আশপাশ পরখ করছিলেন মোনাজাত। আর ইতিউতি করছিলেন আলাপটা জমানোর। মতলব বুঝতে পেরে ঘুরঘুর করা আনসার আলী কেউ মুখ খোলার আগেই ইশারা করলেন। কে কোন মতলবে এমন জায়গায় আসে তা বুঝতে আনসার আলীর সময় লাগে না। রাজনীতি করা মানুষ তিনি। দশের চেয়ে চোখকান বেশি চলে। মাথাটাও কাজ করে লাফিয়ে লাফিয়ে।
তাড়াতাড়ি চায়ে চুমুক দিয়ে মোনাজাত তাকে অনুসরণ করেন। পরিচয়ে জানতে পারেন এই সেই আনসার আলী যার কথা তার আগেই জানা। তার মানে থলে বোঝাই করতে বেগ পেতে হবে না। এ ভাবনায় খুশিতে পথের সব ক্লান্তি নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন সংবাদকাতর লোকটি। এবারও বুঝি যুতসই একটা কিছুর সন্ধান দিয়ে দিবে লোকটি। আর তিনি তা পরিবেশন করবেন নিখুঁত করে। এরপর যথারীতি কুম্ভকর্ণরা জাগবে। হুলস্থূল পড়ে যাবে। টিকটিকি এড়াতে হয়ত আত্মগোপনেও থাকতে হতে পারে দুইচারদিন। তিনি ওসব পরোয়া করেন না। এমন প্রত্যাশায় আর ভাবনায় একটি কথাও না বলে মোনাজাত লোকটির পিছু নিলেন। বেটে কালো লোকটি হনহন করে পা ফেলতে লাগলেন। মুহূর্তে একেবারে তার বাড়ির বারান্দায়। বারান্দা থেকে ঘরের ভেতরে। ওদেরকে বসতে দিয়ে নিজে আসন নিলেন চৌকির কোণায়।
মোনাজাত প্রত্যাশাটি কেনই বা করবেন না। তিনি কি জানেন না এমনি করে অঘটন ঘটন পটিয়সী আনসার আলী ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক আফতাবউদ্দিন আহমেদকেও ইশারা করেছিলেন? সেটি ছিলো দুর্ভিক্ষের মহামারীতে আক্রান্ত চিলমারী। ১৯৭৪ সন। চুয়াত্তুরের মন্বন্তর। যদিও খোদ আনসারই ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন মাঠপর্যায়ের নেতা। তবু কেন এমন কাজ করেছিলেন তার উত্তর দিতে দিতে তিনি বেশামাল হয়ে পড়েছিলেন।
এদিক আইসেন সাংবাদিক সাব।
আপনি কে?
এটেই হামার বারি। নাম আনসার আলী। করিমিলি চলিফিরি খাই বাহে। এরপর পাশটা চোখ বুলিয়ে ফিশফিশ করে বলেন, সেই কতা বাদ দেন। এটির আগোত অটি যাও। বুঝেন নাই? অল্প এহনা ঢাল পার হয়্যা জালিয়ে পাড়াত যান।
জালিয়ে পাড়া!
হয় বাহে।
আকালে তো চিলমারীর সব জায়গায় একই কাহিল অবস্থা। ওখানে বিশেষ কী?
নোয়ায় আবার আছে। রহস্যের আনসার আলীর কথায় স্বভাবসুলভ প্যাঁচ। তার পেট তখনো বসে যায় নি। কন্ঠার হাড়ও কাধ ফুঁড়ে বেরোচ্ছিলো না। পাটের কাঁচা পয়সা সামান্য কিছু জমা ছিলো। কিন্তু গোটা চিলমারী অঞ্চলে অধিকাংশ জনের গতর চিমড়ে লেগে গিয়েছিলো। তিন তিনবারের বন্যায় আবাদ ফসল সব গেলো। হাটে খায় খাদ্যির দাম চড়া। দেখা যায় তো ছোঁয়া যায় না। কিনবে কি দিয়ে। ফলে দেখতে দেখতেই নিরন্ন বানভাসী মানুষের গোঙানি আর হাহাকারে আকাশ ভারি হয়ে উঠলো। আর নদী কাছাড়ে দরিদ্র জেলেপাড়ায় যেন মড়ক লাগলো।
আমি তো কিছু চিনি না। যাবো কিভাবে? আনসার আলী এরপর আফতাবউদ্দিনকে নিয়ে তিনকিলো হাঁটা দিয়েছিলো দক্ষিণে জোড়গাছ ঘাটের দিকে। নদী পার হয়ে ফের হাঁটা শুরু। আরও দক্ষিণে জেলেপাড়া। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙ্গাগড়ার সাথে সাথে জেলেপাড়ার নড়ানড়ি। আর শুধু জেলেপাড়া কেন, গোটা চিলমারী এলাকার মানুষই নড়ানড়ি করেছে। গত চল্লিশ বছরে চৌদ্দ পনেরবার পশ্চিমে সরতে হয়েছে। আসল চিলমারী বহু আগে নদীতে গেছে। এক সময় ছিলো ঘাঘরারহাটে। ময়মনসিংহ জেলার দেওয়ানগঞ্জের অধীনে। এরপর বিয়াল্লিশ কি তেতাল্লিশে সালিপাড়া। এরপর জিতুরহাট হয়ে বোলমন্দিয়া খাতা। আব্বাসউদ্দিন ঐ বোলমন্দিয়া খাতায় গিয়ে তাঁর গানের ডায়েরিতে তুলে নেন ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ গানটি। বোলমন্দিয়া খাতা থেকে উনসত্তুর-সত্তুরে আজকের থানাহাট। চিলমারী নামে আছে কেবল একটি ইউনিয়ন।
জেলেপাড়ার চারপাশ দেখে আফতাবউদ্দিন ভড়কে গেলেন। নিরন্ন মানুষে ঘিরে ধরলো তাকে। ময়লা চিমসে শরীর। মলিন শতচ্ছিন্ন পোষাক, উলঙ্গপ্রায় মানুষ। শুধু খানিক নড়াচড়াতেই বুঝা যায় প্রাণটা এখনও নিভু নিভু জ্বলছে। অল্পবয়সী যুবক-যুবতী। তবু অনাহারে চোখ কোটরের চোঙের ভিতরে ঢুকে গেছে। মনে হয় আর কোনকালেই বের হবে না। এরপর তোলা হলো সেই ছবি। বাসন্তী-দুগার্তির জাল পরা শরীরের ছবি। ছবিটা দেখতে দেখতে ছড়িয়ে পড়লো দেশবিদেশে। চুয়াত্তুরের মরণঘাতী দুর্ভিক্ষের এমন দৃশ্যে স্তম্ভিত হয়ে পড়লো বিশ্ববাসী। সরকার পড়লো বেকায়দায়। কাকে কি দিয়ে সামাল দিবে, ঘটনা এড়ানোর উপায় থাকলো না।
প্রশাসনে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। কর্তাবাবুরা পায়ে ধূলো লাগালেন। জরুরি ত্রাণ এলো। বৈদেশিক সাহায্য এলো। এনজিও ছুটে এলো। কত কিছু এলো! এতিম শিশুদের আশ্রয়ের জন্য ছিন্নমুকুল নামে বিদেশী এনজিও ক্যাম্প বসালো। হুড়োহুড়ি করে মায়েরা এতিম বলে সন্তানদের রেখে আসলো ছিন্নমুকুলে। দু’বেলা খেতে পারবে এই আশা।
সবকিছুই হলো ঐ ছবির কল্যাণে। ছবির নেপথ্যের মানুষটি সেই আনসার আলী। রাশি রাশি ত্রাণ আর সরকারি ও বিদেশী সহায়তায় আবার কত জনের পোয়াবারোও হলো। ফলে সরকার দলের হোমরাচোমরারা ওদের ইউনিয়ন পর্যায়ের ঐ পাতিনেতা আনসার আলীকে মিষ্টি করে বকে দিয়ে মাফ করে দিলো। তবু পয়লা পয়লা ঝড় উঠেছিলো।
কে বাহে আনছার চা। নিজে আমিলীগ হয়্যা তুমরা কেনে এদুন কাম করনেন?
মুই কি করছো। একটা মানুষ ঘাটা পুছ করলে তুমরা কবান নন?
কমো ত। কিন্তুক নদী পার হয়্যা ওমার সাত সাত সোগ করা নাগব্যে?
ওমরাই ত ছবি করছে। হামরা খালি দেকছিনু।
ইয়েক খালি দেহা কয়?
হামরা আর কি করছং বাহে!
বাহে, তুমরা পরশাসনের গুয়াত পিয়েজ কাটছেন। পরশাসন তুমাক ছেচিঁ ফেলাইবে।
তোরা খালি পাগলা কতা কন বাহে। ওমরা ঘাটা পুছ করিল। হামরা খালি দেখি দিছোং।
খালি দেখি দেছেন? নাও বনে দেন নাই? হইস। খালি তায়? সাথোত নিগেছেন বাসন্তীর বারি তক। অসিকের করবার পাইমেন?
আরে জ্বালা! নয়া মানুষ। ঘাটা চেনে না। হাত ধরি কইলো, ভাই ঘাটাখান দেহি দিয়ে তুমরা চলি আইসেন। তুমরা কন মুই কি করিম?
তুমাকই খালি পুছে? আর মানুশ নাই?
সামনে মোক দেখি মোক কছে। তুমরা থাকলে তুমাক কলো হয়।
মানলেম। কিন্তু তুমরা বুজমান মানুশ হয়্যা সাথোত গেইলেন কেনে?
মুই শেক সাবের লুক নও? সেই সাহসেই ত গেছিলং। মোক ফির এ্যাত কতা কইস তোরা! মুই ত সবাকে একি কতা কছো। যা সত্যি তাই।

৩.
চার বছর পর ডিসেম্বরের এক শীতার্ত দুপুরে মোনাজাত রমনা ঘাট বরাবর ছোট খাড়িটি পার হয়ে চরে ছুটলেন। আনসার আলী তার সাথে। বিরাণ চর। পাড় ঘেঁষে উলুখাগড়া আর কাশিয়ার ঝোঁপ। ঝোঁপের চারিদিকে মাটিয়া বালু। তারপরে লোকালয়। ঢিপির মতো ছোট্ট চরটিতে এক দেড়শ ঘর। ছোট ছোট শণের নিচু চালা। সেই চালার উঠানে বসে যুবক নুরালম ক্যাজাই চিবিয়ে খাচ্ছে। ভীষণ খিদের জ্বালা কাবু করে ফেলেছে তাকে। আর একটু হলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে।
বন্যায় আবাদফসল ঘরদোর সব গেছে। চরজুড়ে ভয়ানক আকাল। কোনো ঘরে একমুঠো চাল নেই। অথচ বন্যার পর এখানে কোনো ত্রাণসাহায্যও পৌঁছেনি। মানুষ অখাদ্যকুখাদ্য মুখে ঢুকাচ্ছে। দুর্ভিক্ষ নয়া করে ফিরে এসেছে তাদের জীবনে। ফি বছরই দুর্ভিক্ষ।
মোনাজাতের ক্যামেরা ক্লিক করতে থাকলো। তার পাশে ততক্ষণে ভিড় করেছে হাড় জিরজিরে উলঙ্গ শিশুর দল। ভিড় গলিয়ে উঁকি দিচ্ছে অর্ধ-উলঙ্গ বয়সী মানুষগুলো। দূর থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেঁড়ামলিন বসনা মহিলারা। তালু শুকিয়ে যাওয়া মুখ হা করে আছে কোনকিছু ঘটে কিনা তা দেখতে। চোখের কোটর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিলো কিছু একটা পাওয়ার আশা। কয়দিনের উপবাসী মানুষ কে জানে! চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে মোনাজাত ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকেন।
সংবাদের পাতায় ক্যাজাই ডাঁটি চিবিয়ে খাওয়ার ছবি ছাপতেই শুরু হলো সোরগোল। গ্রামে এত আকাল! মানুষ ফিসফাস শুরু করলো। এ কেমন কথা মানুষ ঘর বান্ধে যে শুকনা ক্যাজাই শণ দিয়ে সেই ক্যাজাইতো গরুও খায় না! অথচ খিদের জ্বালায় তা খেতে হচ্ছে মানুষকে! সরকার কি দেশে নাই? সরকার কি করে?
সেবারও কুম্ভকর্ণরা দাপাদাপি শুরু করে দিলেন। অফিসে শুনিয়ে শুনিয়ে বাণীও ছাড়তে লাগলেন। আহারে মানুষের কষ্ট! চোখে জল এসে যায়। আর আমরা কিনা ফাইল সামনে নিয়ে আরাম কেদারায় বসে ঢুলি! হাজার হলেও জনগণের সেবক আমরা। তবু পদে পদে ঝামেলা বাধে। জনগণই আমাদের নানা সেবা দেয়। কিন্তুক চক্ষুলজ্জা বলে কথা। চলো তো সবাই ময়দানে!
ত্রাণ নিয়ে ছুটাছুটি শুরু হলো। জেলা প্রশাসক নিজে রমনা চরে নুরালমের ঝুঁপড়িতে গিয়ে ত্রাণ দিলেন সবার চেয়ে বেশি। তাকে পটাতে লাগলেন।
দেখলে তোমাদের কষ্টের কথা শুনামাত্র আমরা কেমন চলে এলাম! তুমাকে কত বেশি দিলাম! দেখলে। পাবে, আরও পাবে বুজলে। আরও দিবো তোমাকে। এবার বলো তো সত্যি করে, সবার সামনে খিদের জ্বালায় তুমি ওসব চিবাওনি। ঐ ব্যাটা সাংবাদিক চালাকি করে তুমার হাতে ওটা ধরিয়ে দিয়ে ঐ ছবিটি করেছে। তুমাকে জোর করে করিয়েছে। ঘটনা মিথ্যা। বলো বলো।
নুরালম নির্বিকার। শেষে ফের কর্তাবাবুর চ্যালাদের চাপাচাপিতে মুখ খুললো।
হুজুর উপরে আল্লা সামনে তুমরাগুলেন। মুই মিছে কতা কবার পাবান্নই। ঐ সাংবাদিক সাব আমাক শিখি দেয় নাই। ঐদিন সত্যিই মুই ভুখতে ক্যাজাই খাছিনু ছার। কি খাইম? ঘরোত কিছু নাই। মোর কুনো একটা কামাই নাই। পেটের জালা কি দি মিট্যেইম? কাশিয়া খায়া পেট ভরাছোং। সাংবাদিক সাব দেখি সেইটে ছবি করছে। ঘটনা সত্যি ছার।
কি বিপদ সবার সামনে এমন নিমকহারামি কথা। সবার সামনে নাজেহাল। এরপর জেলা প্রশাসক মশাই আর কোন কথা না বলে রাগে দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে স্পিডবোটে গিয়ে ওঠেন। হওয়া প্রমোশনের ফাইলটা এবার নিশ্চিত আটকে যাবে। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাবে ওপরআলারা। সাংবাদিক লোকটাকে শাপশাপান্ত করতে করতে তিনি জেলায় ফিরলেন।

৪.
চারবছর পরে সাংবাদিক হাজির। ফের বারো বছর পর। তার কি ঘরসংসার নাই? তায় কি বৈরেগি? লোকটা চিলমারীত খুঁজে কী?
মোনাজাত বুঝালেন ফলোঅপ রিপোর্ট করতে এসেছি আনসার ভাই। এই একযুগ পরে এখনকার অবস্থা কি, আপনাদের কতটুকু উন্নতি হলো তার উপর প্রতিবেদন পাঠাবো। তাতে সরকারেরই বুঝতে সুবিধা হবে। আপনাদের এলাকার দিকে নজর দিবে সরকার।
তা না হয় হলো কিন্তু ততদিনে নির্বাচন আর ব্যবসায় আনসার আলীর সব গেছে। ধুঁকে ধুঁকে দিন পার করছে। তবু পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে যেন লাফিয়ে উঠলো আনসার আলী। সাংবাদিক তাকে বুকে টেনে নিলো। কাজের ব্যস্ততা বুঝানো গেলো না। তাঁকে টেনে নিয়ে গেলো বাড়িতে। বাড়ির চড়াই জবাই করা হলো। না খাওয়িয়ে এমন গুণী মানুষটাকে ছাড়া যাবে না।
এখন কি করছেন আনসার ভাই?
দিনকাল ভাল নাই ভাই। তাই আল্লার পথে চলি গেচি।
মোনাজাত তার ঘরের কোণায় স্তুপ করে রাখা চট-থালা দেখলেন। আনসার আলী জাকের পার্টির গোলাপফুল মার্কা বেড়ায় ঝুলিয়ে রেখেছে। প্রতি সপ্তায় তার বাড়িতে জেকের বসে। জেকেরের পর সবার আনা চালডালে খিচুৃড়ি। সাংবাদিক এক মুহূর্ত আনমনা হয়ে রইলেন। এরপর আচমকা প্রশ্ন-
আচ্ছা বলেন তো আনসার ভাই আপনি কেন আফতাব ভাইকে নিয়ে বাসন্তীর ছবিটা তুলিয়েছিলেন? আপনি নিজেই তো তখন সরকারি দল করতেন। সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছিলেন কেন? আর আমাকেই কেন চরে নিয়ে গিয়েছিলেন?
ভাই ভিত্রের জালা। দল করি বুলি সত্য কতা কওয়া যাইবে না? আসলেই দুর্ভিক্ষে চিলমারীর মাজরা ভাঙ্গি গেছলো। চিন্তে করলে এলাও গাওখান শিংরি ওঠে। হায়রে মানুশের অবস্থা। কিয়ামত। আমি চাছিলেম গরমেন সত্যডা জানুক। পরশাসনের টনক নড়ুক। বুজলেন ভাই, আর তারপরেও কি মঙ্গা আকাল গেইছে! হামারগুল্যের বারোমাসি আকাল। বারোমাসি মঙ্গা।
মোনাজাতউদ্দিন এরপর আর কথা বাড়ায় নি। শুধু উঠার আগে বন্ধুর একটা অনুরোধে সম্মতি দিয়ে মাথা ঝুৃঁকিয়েছিলেন।
ভাই চিলমারী আসলে হামাক এহনা দেহি যাবেন।
সাংবাদিকের সেই মন ছিলো। সাক্ষাত পাবার জন্য যোগ্য ছিলো লোকটি। এমনকি চিলমারীর নদী ভাঙনের শিকার উপদ্রুত মানুষগুলোও। কিন্তু ঢেঙ্গা লোকটি আর এদিকে পা ফেলার সুযোগ পান নাই। পরের বছরের শেষাশেষি গাইবান্ধার কালাসোনায় ব্রহ্মপুত্র তাঁকে বুকে টেনে নিয়েছিলো। আর তার বছর পাঁচেক পর আনসার আলীও ব্রহ্মপুত্রের বাঁধের পাড়ে চোখ বুজেছে। ভারতে আশ্রিতা দুর্গাতী বেঁচে আছে কি না জানা নেই কিন্তু বোবাকালা বাসন্তী বালা ভাইয়ের ঝুঁপড়ির এককোণে এখনও নিরন্তর উপবাসসংগ্রাম করে যাচ্ছে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top