মলিয়েরের নাটক ছলনাময়ী। প্রথম অঙ্ক । রূপান্তর অনীক রহমান

সৈয়দ আলী আহমেদ: ধনাঢ্য ব্যবসায়ী

সৈয়দা নিগার চৌধুরী: সৈয়দ-পত্নী

সৈয়দা অন্তরা জামান:  আসিফের স্ত্রী

আসিফ জামান: তরুণ শিল্পপতি

খাজা কাইয়ুম:  তরুণ রাজনীতিবিদ

কুলসুম: অন্তরার পরিচারিকা

লতিফ: কাইয়ুমের গাড়িচালক

প্রথম অঙ্ক ।। প্রথম দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ; স্থান- আসিফের বাসার লিভিং রুম)

আসিফ- উফ! অভিজাত পরিবারে বিয়ে করার এতো জ্বালা। আগে জানলে একটা টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত পরিবারে বিয়ে করতাম। আশা করি, আপনাদের মধ্যে যেসব তরুণ “তথাকথিত অভিজাত” পরিবারে বিয়ে করে জাতে উঠতে চান, আমাকে দেখে তাঁদের এ জীবনের মতো শিক্ষা হয়ে যাবে।

আভিজাত্য জিনিসটা এমনিতে মন্দ নয়, কিন্তু এর সঙ্গে বেশ কিছু কুৎসিত ব্যাপার জড়িত, যার সংস্পর্শে না আসাই ভালো।

এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই আমার যথেষ্ট পরিমাণে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। অভিজাতরা মনে করেন, আমাদের মতো তরুণদের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিয়ে যেন আমাদের ধন্য করে ফেলেছেন। তাঁরা কেবল আমাদের টাকা-পয়সার সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতে পারলে বোধহয় আরও খুশি হতেন। কারণ, আমার স্ত্রীর ধারণা “জামান” পদবীটি তাঁর উপযুক্ত নয় এবং আমিও ঠিক তাঁর স্বামী হবার যোগ্য নই, কিন্তু ক্রেডিট কার্ড হিসেবে আমি চলনসই।

পৃথিবীর সেরা মূর্খতাটা আমি করে বসেছি। এখন নিজের বাড়িতে ঢুকতে আমি ভয়ে ভয়ে থাকি, কেননা ঢুকলেই রীতিমত বিরক্ত হয়ে যাই।

প্রথম অঙ্ক ।। দ্বিতীয় দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ ও লতিফ; স্থান- আসিফের বাসার লন)

আসিফ- (তাঁর বাসা থেকে লতিফকে বের হতে দেখে) এই নতুন মক্কেলটা আবার কে?

লতিফ- ওই ব্যাটা তো আমাকে দেখে ফেলেছে।

আসিফ- শালা নিশ্চয়ই আমাকে চিনতে পারেনি।

লতিফ- লোকটা কী কিছু বুঝতে পেরেছে ?

আসিফ- ব্যাপারখানা কী? গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।

লতিফ- আমাকে বাসা থেকে বেরুতে দেখেনি তো?

আসিফ- গুড মর্নিং।

লতিফ- গুড মর্নিং, স্যার।

আসিফ- আপনি কি এ বাসার গেস্ট নাকি?

লতিফ- আসলে আগামীকাল এখানে একটা পার্টি হবে। আমি সে ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছিলাম।

আসিফ- তাই আপনি বাসায় গিয়েছিলেন?

লতিফ- শশশ…

আসিফ- কী হলো?

লতিফ- প্লিজ, চুপ করুন স্যার। আমাকে এই বাসা থেকে বেরুতে দেখেছেন এটা কাউকে বলবেন না।

আসিফ- কেন ?

লতিফ- আস্তে বলুন। কেউ শুনে ফেলতে পারে।

আসিফ- না, না। কোন ভয় নেই।

লতিফ- আসলে আমি এই বাসার ম্যাডামকে একটা খবর দিতে এসেছি। আমার স্যার এই ম্যাডামকে ভালবেসে ফেলেছেন। ব্যাপারটা টপ সিক্রেট, জানাজানি হলে বিপদে পড়বো। আপনি প্লিজ কাউকে বলবেন না, স্যার।

আসিফ- ঠিক আছে, বলবো না।

লতিফ- যাক, এবারের মতো বাঁচলাম। শুনেছি এই বাসার সাহেব নাকি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত লোক। কোন ভদ্রলোককে নিজের বৌয়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখলেই ভাবে পরকীয়া। খেয়াল রাখবেন, উনি যেন কোনমতেই ব্যাপারটা না জানেন।

আসিফ- এবার পুরোপুরি বুঝেছি। আচ্ছা, আপনার স্যারের নামটা কী ?

লতিফ- তিনি এই এলাকার বড় নেতা। নাম খাজা কাইয়ুম। বাসা তিন নম্বর রোডে।

আসিফ- (একান্তে) তাহলে খাজাবাবা একারণেই এই এলাকায় বাসা নিয়েছেন।

লতিফ- স্যারের মতো ভালো মানুষ আমার জীবনে দেখিনি। তাঁর কথাগুলো ম্যাডামকে বলার জন্য আমাকে দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা, যেখানে পুরো মাস গাড়ি চালিয়ে পাই ১৫ হাজার টাকা।

আসিফ- সত্যি তিনি মহান ব্যক্তি। তাঁর বার্তাটা ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন তো?

লতিফ- হ্যাঁ। বাসায় ঢুকতেই কুলসুম নামে কাজের মেয়েটাকে পেয়ে গেলাম। এক ইশারাতেই বুঝে গেল আমার উদ্দেশ্য। সেই আমাকে ম্যাডামের কাছে নিয়ে গেল।

আসিফ- (একান্তে) ঘরের শত্রু বিভীষণ।

লতিফ- কুলসুম মেয়েটি দারুণ সুন্দরী। আমার সঙ্গে বেশ আলাপ-সালাপ করলো। ভাবে মনে হলো আমি বিয়ের প্রস্তাব দিলে সে রাজী হয়ে যাবে।

আসিফ- তো ম্যাডাম কী বললেন?

লতিফ- তাঁর স্বামী খুবই সন্দেহবাতিকগ্রস্ত লোক। ম্যাডামও আমার স্যারকে পছন্দ করেন, কিন্তু বিষয়টা গোপন রাখতে হবে আর খুব দ্রুত স্যারের সাথে একদিন ডিনার করতে চান। স্বামী ব্যাটা তাঁর সন্দেহ নিয়ে জাহান্নামে যাক। আর আমি তো টাকা পেলেই খুশি। চলি ভাই।

আসিফ- ঠিক আছে। খোদা হাফেজ। (লতিফের প্রস্থান)

আসিফ- (একান্তে) এই সুযোগটা কোন মতেই হাত ছাড়া করা যাবে না। এই মুহূর্তেই আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে ঘটনাটা জানাতে হবে। বাহ, ওনারা একেবারে ঠিক সময়েই এসে পড়েছেন দেখছি।

প্রথম অঙ্ক ।। তৃতীয় দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ, সৈয়দ, সৈয়দা; স্থান- আসিফের বাসার লিভিং রুম)

সৈয়দ- কী ব্যাপার আসিফ, তোমাকে দেখে খুব অস্থির মনে হচ্ছে ?

আসিফ- কিছু কারণ আছে। আর সেটা বলতেই…

সৈয়দা- দাঁড়াও। তুমি দিনে দিনে ভদ্রতাও ভুলে যাচ্ছ দেখছি। তোমার বাসায় মুরুব্বিরা এলে কি সালাম-আদাবও দাও না ?

আসিফ- আমার মাথায় অন্য চিন্তা রয়েছে, আম্মা।

সৈয়দা- আচ্ছা, তুমি এই সোহাগ করে “আম্মা” ডাকাটা বাদ দিতে পারো? তোমাকে আগেও কয়েকবার বলেছি, আমাকে ম্যাডাম ডাকবে। তুমি যে ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর, আমি সেই ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান।

আসিফ- আমি আপনার মেয়ের জামাই, আমি তো আপনাকে আম্মা বলেই ডাকবো।

সৈয়দা- সে ঠিক আছে। কিন্তু তোমার আর আমাদের বংশমর্যাদার পার্থক্যটা ভুলে যেও না।

সৈয়দ- আহা। নিগার, এবার বাদ দাও না।

সৈয়দা- কী বলছো তুমি? এজন্যেই লোকে তোমার প্রাপ্য সম্মান তোমাকে দেয় না।

সৈয়দ- দেখো। দয়া করে এ বিষয়ে আমাকে জ্ঞান দিও না। জীবনে বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমি এতদূর এসেছি। আসিফ, তুমি কী যেন বলতে চাচ্ছিলে?

আসিফ- দেখুন সৈয়দ সাহেব আমি আপনাকে বলতে চাচ্ছিলাম যে…

সৈয়দা- থামো আসিফ। তোমার চেয়ে উঁচু বংশের লোকদের নাম ধরে ডাকাটা রীতিমতো অভদ্রতা। কাজেই “সৈয়দ সাহেব” না বলে “স্যার” বলবে।

আসিফ- জী, ম্যাডাম। সৈয়দ সাহেব বাদ, “স্যার” আমার বৌ যেসব ঘটনা ঘটাচ্ছে…

সৈয়দা- থামো, আমাদের মেয়েকে “আমার বৌ” বলে সম্বোধন করবে না তুমি।

আসিফ- এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আমার বৌকে “আমার বৌ”

বলবো না তো কী বলবো?

সৈয়দা- এটা বলতে পারতে তুমি যদি তোমার কাছাকাছি স্ট্যাটাসের কাউকে বিয়ে করতে।

আসিফ- দয়া করে, আপনার বংশগরিমা এক পাশে সরিয়ে রাখুন আর এটিকেট ক্লাস করানো বাদ দিয়ে মূল কথাটা বলতে দিন। আপনার মেয়ে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

সৈয়দ- কেন?

সৈয়দা- যে মেয়েকে বিয়ে করে তুমি জাতে উঠেছো তাঁর সম্পর্কে এভাবে কথা বলতে তোমার লজ্জা হওয়া উচিৎ।

আসিফ- কী বলছেন ম্যাডাম? আপনাদের ব্যবসার চরম দুঃসময়ে আমি আপনাদের ব্যাঙ্ক লোন শোধ করে দিয়েছি। নাহলে আপনাদের মর্টগেজ রাখা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি নিলামে উঠতো। বিনিময়ে আমি পেয়েছি দেনাগ্রস্ত সৈয়দ গ্রুপের এমডি এবং পুকুর চুরি হওয়া একটি ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর পদ। ডিলটাতে আপনারাই লাভবান হয়েছেন।

সৈয়দ- সৈয়দ বংশের সঙ্গে আত্মীয়তার কোন মূল্যই নেই তোমার কাছে?

সৈয়দা- আর চৌধুরী বংশের সঙ্গে আত্মীয়তার, যে বংশের রক্ত আমার শরীরে? সেই  অভিজাত বংশের নাতজামাই হলে তুমি।

আসিফ- “চৌধুরী বংশের নাতজামাই” কথাটা শুনতে বেশ ভালো। কিন্তু এখনি আপনারা ব্যবস্থা না নিলে “দ্বিচারিণীর স্বামী” পদবীটাও আমি পেয়ে যেতে পারি।

সৈয়দ- কী বলতে চাইছো তুমি, আসিফ?

আসিফ- বলতে চাইছি আপনার মেয়ে একজন আদর্শ স্ত্রীর যে আচরণ করা উচিৎ, তা মোটেও করে না। বরং সে আমার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর এমন সব কাজ করে যাচ্ছে।

সৈয়দা- সাবধান! মুখ সামলে কথা বলবে। তুমি যে অভিযোগ করছো বিগত ৩০০ বছরে চৌধুরী বংশের কোন মেয়েকে নিয়ে এমন কথা কেউ উচ্চারণ করেনি।

সৈয়দ- সৈয়দ বংশের কেউ কখনো মিডল ক্লাস প্রেম-ভালোবাসা জাতীয় খুচরো কাজ করে না। এ বংশের ছেলেদের বীরত্ব এবং মেয়েদের সতীত্ব- দুটোই অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রবাদতুল্য ছিল।

সৈয়দা- চৌধুরী বংশে জেরিন নামে এক মেয়ে ছিল। সে ব্রিটিশ আমলে এক জমিদারের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।

সৈয়দ- সৈয়দ বংশে মেহরিন নামে এক মেয়ে ছিল। নবাব ফিরাদুনজার এক সেনাপতি তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সেই আমলে বিশ হাজার টাকার উপঢৌকন নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মেহরিন দেখা করতে রাজী হননি।

আসিফ- আপনাদের মেয়ে সেরকম সতী-সাবিত্রী নয়। বিয়ের পর থেকেই সে রীতিমত উদ্দাম জীবন যাপন করছে।

সৈয়দ- বিষয়টা খুলে বলো দেখি। অন্তরার অনৈতিক কাজ আমরা কোনভাবেই সমর্থন করি না। ব্যাপারটা সত্যি হলে বাবা-মা হিসেবে আমরা অবশ্যই ওকে শাসন করবো।

সৈয়দা- অন্তরাকে আমরা কঠোর অনুশাসনের মধ্যে মানুষ করেছি। মানহানিকর কোন কাজ আমরা একেবারেই সহ্য করবো না।

আসিফ- এই এলাকায় একজন তরুণ রাজনীতিবিদ নতুন এসেছেন। তাঁকে আপনারাও দেখেছেন। তাঁর সঙ্গে অন্তরা গভীর প্রেমে মত্ত।

সৈয়দা- খোদার কসম! একথা সত্যি হলে আমার মেয়েকে আমি নিজে গলা টিপে মারবো।

সৈয়দ- কী বলছো! অন্তরাকে আর ওর প্রেমিক ব্যাটাকে আমার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে গুলি করে মারবো।

আসিফ- আমি যা জানি আপনাদের বললাম। এবার আপনারা কী করবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার।

সৈয়দ- বাবা আসিফ, তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না। নয়া লাইলি-মজনু সিনেমা বন্ধ করে দেবো আমি। কিন্তু যা বলছো পুরোপুরি সত্যি বলছো তো?

আসিফ- শতভাগ সত্যি।

সৈয়দ- নিগার তুমি ভিতরে গিয়ে অন্তরার সাথে কথা বলো। আমি আর আসিফ প্রেমিক সাহেবের বিষয়টা দেখছি। এসো আসিফ। (সৈয়দার প্রস্থান)

আসিফ- ওই তো লোকটা আসছে।

প্রথম অঙ্ক ।। চতুর্থ দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ, সৈয়দ, কাইয়ুম; স্থান- আসিফের বাসার লন)

সৈয়দ- আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। আমি সৈয়দ আলী আহমেদ।

কাইয়ুম- ইটস নাইস মিটিং ইউ, স্যার।

সৈয়দ- ক্যাবিনেটের অনেকেই আমার ভালো বন্ধু। তরুণ বয়সে আমি মোনায়েম খানের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমার বাবা সৈয়দ আলী আকবর ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নেতা। আমার দাদা সৈয়দ কেরামত আলী ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জুনিয়র লইয়ার।

কাইয়ুম- বাহ! আপনার ফ্যামিলি ট্রি তো অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

সৈয়দ- ধন্যবাদ। দেখুন, ইনি হচ্ছেন আমার জামাতা, আসিফ জামান। এদেশের একজন শীর্ষ তরুণ শিল্পপতি। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, আপনি আমার অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়েটিকে প্রেমের জালে জড়াবার চেষ্টা করছেন।

কাইয়ুম- কে? আমি?

সৈয়দ- হ্যাঁ। এ ব্যাপারে আপনার যা বলার আছে পরিষ্কারভাবে বলুন।

কাইয়ুম- এ তো রীতিমত চরিত্রহানিকর অপবাদ। আপনাকে কে বললো?

সৈয়দ- যে-ই বলুক, সে পুরো ঘটনা জেনেই বলেছে।

কাইয়ুম- সে নির্জলা মিথ্যে বলেছে। আমি একজন ভদ্রলোক। আপনার মতো আরেকজন সম্ভ্রান্ত মানুষের বিবাহিত মেয়ের সঙ্গে প্রেম করবো আমি? এতো নিম্নরুচির কাজ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। যে বলেছে সে একটা আস্ত গাধা।

সৈয়দ- এখন কী বলবে, আসিফ?

আসিফ- কী আর বলবো?

কাইয়ুম- ওই ব্যাটা একটা উজবুক, মর্কট।

সৈয়দ- জবাব দাও।

আসিফ- জবাবটা আপনিই দিন না, বাবা।

কাইয়ুম- যদি জানতাম লোকটার পরিচয়, তাহলে আপনার সামনেই ব্যাটাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিতাম।

সৈয়দ- এবার প্রমাণ দাও, আসিফ।

আসিফ- প্রমাণ অবশ্যই আছে।

কাইয়ুম- তাহলে আপনার জামাতাই…

সৈয়দ- হ্যাঁ, সে-ই অভিযোগটা করেছে।

কাইয়ুম- আপনার জামাতা না হলে মিথ্যে বদনাম রটানোর উপযুক্ত শিক্ষা তাঁকে আজই দিয়ে দিতাম।

প্রথম অঙ্ক ।। পঞ্চম দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ, অন্তরা, সৈয়দ, সৈয়দা, কাইয়ুম, কুলসুম; স্থান- আসিফের বাসার লিভিং রুম)

সৈয়দা- আমি অন্তরাকে নিয়ে এসেছি পুরো ঘটনাটা সবার সামনে পরিষ্কার করে বলার জন্য।

কাইয়ুম- ম্যাডাম, আপনি কি আপনার স্বামীকে একথা বলেছেন যে আমি আপনাকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছি?

অন্তরা- আমি? আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন একথা সত্যি হলে আমি খুবই আনন্দিত হতাম। আপনি চেষ্টা করলে আমি নিজে আপনাকে সাহায্য করবো। আসিফের অনুপস্থিতিতে লোক মারফত আমার কাছে প্রেমের প্রস্তাব পাঠান বা আমার সেলফোনে মিষ্টি প্রেমের টেক্সট করুন। কথা দিচ্ছি, সাদর অভ্যর্থনা পাবেন।

কাইয়ুম- আমাকে-আপনাকে জড়িয়ে স্ক্যানডাল ছড়ানোর জন্য একেবারে মুখিয়ে আছেন দেখছি।

অন্তরা- আমি কেন মুখিয়ে থাকবো? আমার মা বললেন, আসিফ নাকি এরকম অভিযোগ করেছে তাঁদের কাছে।

কাইয়ুম- তিনি যা খুশী বলুন। কিন্তু আমরা দুজনেই জানি এরকম কোন প্রেম-ভালোবাসা আমাদের মধ্যে বাস্তবে তো নেই-ই, এমনকি আমার চিন্তাতেও নেই। আর সুন্দরী মহিলা দেখলেই প্রেমে পড়ার রোগ আমার নেই।

সৈয়দা- তাহলে তো কোন সমস্যাই নেই, আসিফ।

সৈয়দ- আশা করি, ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে।

আসিফ- ওরা দুজনেই মিথ্যে বলছে। কিছুক্ষণ আগেই খাজা সাহেবের ড্রাইভার আমার বাসায় এসে তাঁর বসের কাছ থেকে প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে অন্তরার কাছে।

অন্তরা- কুলসুম, কুলসুম। (কুলসুমের প্রবেশ)

কুলসুম- জী, ম্যাডাম।

অন্তরা- এই কুলসুম বলো তো, আজ খাজা সাহেবের ড্রাইভার এসেছিলো নাকি?

কুলসুম- না তো, ম্যাডাম।

আসিফ- চুপ কর, বেহায়া। ওই ড্রাইভারকে অন্তরার কাছে পৌঁছে দিয়েছিস তুই।

কুলসুম- কী বলছেন, স্যার?

আসিফ- হ্যাঁ, তুই। ন্যাকামিটা এবার বাদ দে।

কুলসুম- তুমি এর বিচার কোরো আল্লাহ! এতোদিন কাজ করে এই ছিল আমার কপালে।

আসিফ- একদম চুপ, বদমাশ মেয়েছেলে কোথাকার। এখন আবার সাধু সেজেছে। তোর চৌদ্দ গুষ্টি ক্রিমিনাল।

কুলসুম- ম্যাডাম, আপনিই বিচার করুন।

অন্তরা- স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ততার এই প্রতিদান। এর জবাব দেবার রুচি হচ্ছে না আমার। চলে এসো কুলসুম।

কুলসুম- আসলেই তাই, ম্যাডাম। চলুন। (অন্তরা ও কুলসুমের প্রস্থান)

সৈয়দা- অন্তরার মতো ভালো মেয়ের স্বামী হবার কোন যোগ্যতাই নেই তোমার।

সৈয়দ- তোমার আচরণ ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করেছে।

সৈয়দা- সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়েদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করতে হয় ভবিষ্যতে মাথায় রাখবে।

আসিফ- বিশ্বাস করুন ম্যাডাম, সত্যি বলছি আমি।

কাইয়ুম- দেখুন সৈয়দ সাহেব, আসিফ সাহেব বেশী বাড়াবাড়ি করছেন। তিনি পুরো ব্যাপারটার জন্য ক্ষমা না চাইলে আমি দুই কোটি টাকার মানহানির মামলা করবো।

সৈয়দা- আসিফ, খাজা সাহেবের কাছে ক্ষমা চাও।

আসিফ- ক্ষমা চাইবো কেন?

সৈয়দ- মিথ্যে অভিযোগ এনেছো সেজন্যে।

আসিফ- অন্তরার সঙ্গে খাজা সাহেবকে এক বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখলেও উনি সেটা অস্বীকার করলেই মিথ্যে হয়ে যাবে?

সৈয়দ- কূটতর্ক বন্ধ করে আমি যা বলছি তা-ই করো।

আসিফ- আমি পারবো না।

সৈয়দ- (চিৎকার করে) খবরদার। শেষ বারের মতো বলছি। আমার সঙ্গে বলো- “খাজা সাহেব আপনার বিরুদ্ধে যে মিথ্যে অভিযোগ এনেছি সেজন্যে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী”।

আসিফ- (অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে) “খাজা সাহেব আপনার বিরুদ্ধে যে মিথ্যে অভিযোগ এনেছি সেজন্যে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী”।

সৈয়দ- “কারণ আপনার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল না”।

আসিফ- “কারণ আপনার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল না”।

সৈয়দ- “আমি জানতাম না আপনি একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক”।

আসিফ- আসলেই শেষ জমানায় চলে এসেছি। আমার বৌয়ের বয়ফ্রেন্ড নাকি “বিশিষ্ট ভদ্রলোক”।

সৈয়দ- (চিৎকার করে) কী বলতে চাইছো?

কাইয়ুম- যথেষ্ট হয়েছে, সৈয়দ সাহেব।

সৈয়দ- না, না। অ্যাপোলজিটা শেষ করতে দিন। বলো আসিফ- “আমি জানতাম না আপনি একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক”।

আসিফ- “আমি জানতাম না আপনি একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক”।

কাইয়ুম- ধন্যবাদ, আসিফ সাহেব। আর আমি সৈয়দ সাহেবের কোন বিরক্তির কারণ হয়ে থাকলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

সৈয়দ- আপনি সময় পেলে মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে গলফ খেলতে পারেন।

কাইয়ুম- অনেক ধন্যবাদ, স্যার। এবার তাহলে আসি।

দ্বিভীয় অঙ্কের লিঙ্ক: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4037

তৃতীয় অঙ্কের লিঙ্ক: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4285

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top