পশতু সাহিত্য ও আফগান লোককাহিনি ।। আলোচনা ও অনুবাদ:গৌরাঙ্গ হালদার

সাহিত্য যেহেতু মানুষের বাস্তব জীবন প্রক্রিয়ারই ভাষিক উৎপাদন ও তার প্রকাশ, সেহেতু তার উৎস এবং বিকাশের গতিধারা অনুধাবন করতে হলে মানুষের বিবিধ কর্ম ও জ্ঞানকাণ্ডের  বস্তভিত্তি  অর্থাৎ তার ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ-সংঘাত, তার ধর্ম-দর্শন, সংস্কৃতি, উৎপাদন, বিপনন, ভোগ, বিনিময়, জলবায়ু, ভূগোল, বানিজ্য প্রভৃতির গতি প্রকৃতি এলেমে রাখা জরুরী। তার চরিত্র বিশ্বকোষীয়। কিন্তু সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তার প্রাপ্তি নেহায়েত বিন্দুবৎ হলেও আমাদের অন্তত নজর দিতে ক্ষতি নেই। আর সেই নজরের আওতায় আসবে প্রথমত পশতু ভাষার বিভিন্ন সাহিত্য ব্যক্তিত্বের নাম। তাদের কাজ নিয়ে আলাপের এটা বরং ভবিষ্যতের সূত্রপাত।

লিখিত পশতু সাহিত্যের ইতিহাস খুব প্রাচীন না হলেও ‘মুখ থেকে মুখে ফেরা’ পশতু লোককাহিনী, কবিতা বা অন্যান্য সাহিত্যকর্মের ইতিহাসের হদিস পাওয়া যাবে তার ভাষা বিকাশের মাঝে। পশতু ভাষার ঠিকুজি বিচার করলে তার পূর্বপুরুষের সন্ধান মেলে অন্তত হাজার চারেক বছরের পুরনো পূর্ব ইরানের জেন্দ আভেস্তার ভাষায়। এবং শুধু তাই নয়, তার সাথে সংযোগ পাওয়া যাবে বৈদিক সংস্কৃতেরও। পশতু লোকসাহিত্যে ‘টপ্পা’র ঐতিহ্য এবং ঋগ্বেদে শ্লোকের গঠনপ্রণালির চেহারা প্রায় সহোদরার মত। ভাষা যেহেতু মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ আর বাস্তব বিনিময়ের মাঝ দিয়ে বিকশিত হয়, তাই দুনিয়া জুড়ে মানুষের সকল জীবিত ভাষাই আসলে কোন না কোন ভাবে সম্পর্কসূত্রে গ্রথিত। হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো মানুষের জন্য আজ এক  মূল্যবান স্মৃতি। তবে যতটা সে সংরক্ষন করতে পেরেছে।

প্রাপ্ত সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে বর্তমানে সারা পৃথিবীতে সব মিলিয়ে পশতুভাষী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৫-৬০ মিলিয়ন বা সাড়ে চার থেকে ছয় কোটি। এদের বেশিরভাগেরই বাস আফগানিস্তানের পূর্ব, দক্ষিন, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং কিছু পরিমানে পূর্ব-উত্তরের জেলাগুলোতে এবং পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া, বালুচিস্তান, সিন্ধ সহ পূর্ব এবং পূর্ব-উত্তরের জেলাগুলোতে। এছাড়া পশতু ডায়াসপোরার দেশসমূহেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশতুভাষী মানুষের বসবাস আছে। আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫-৬০ ভাগের মাতৃভাষা পশতু। পাকিস্তানের F A T A   বা ‘ফেডার‍্যালি এডমিনিস্ট্রেটেড ট্রাইবাল এরিয়া’য় জনসংখ্যার প্রায় শতভাগই পশতুভাষী। পশতু আফগানিস্তানের দুটি সরকারি ভাষার একটি। অন্যটি দারি।

পশতু ভাষায় সাহিত্যের লিখিত রূপের প্রাপ্ত হদিস থেকে এর প্রথম পর্ব চিহ্নিত করা হয় বায়েজিদ আনসারি- ইতিহাসে যিনি পীর রৌশান নামে সমধিক পরিচিত- তার  (১৫২৬-১৫৭৪) লেখা থেকে। যদিও প্রখ্যাত আফগান ঐতিহাসিক আবদুল হাই হাবিবি তার(১৯১০-১৯৮৪) “ দ্য হিডেন ট্রেজার” বা “পাতা খাজানা” গ্রন্থে পশতু সাহিত্যে কবিতার লিখিত ইতিহাস অষ্টম শতকের বলে নির্দেশ করেছেন। তবে হাবিবির তত্ত্ব আনচ্যালেঞ্জড নয়। বায়েজিদ আনসারি ‘খায়ের-আল-ব্যয়ান’ গ্রন্থে তার চিন্তাধারা প্রকাশ করেন যা তখন তিক্ত সমালোচনার শিকার হয়। তৎকালীন মুঘল বাদশা আকবর প্রবর্তিত ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ এবং তার শাসনের বিরুদ্ধে আনসারি আন্দোলন ও যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, ফলে বাদশা আকবর তার মতাদর্শ এবং যুদ্ধ উভয়েরই মুকাবিলা করেছিলেন। আকবর তার মতাদর্শ মুকাবিলা করতে গিয়ে অনেক ধর্মীয় নেতাদের সমাবেশ ঘটান। যার মাঝে উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন আখুন্দ দারোয়াজা(১৫৩৩-১৬১৫)। তিনি পশতু ভাষাতেই পীর রৌশানের চিন্তাধারার জবাব দেন, ফলে পশতু ভাষা ও সাহিত্য এখানে গতিলাভ করেছিল। পীর রৌশানের অনুসারীদের মধ্যে আরজানি, মুখিলস, মীর্জা খাঁন আনসারি, দৌলত এবং ওয়াসিল প্রমুখ বিশিষ্ট কবি, লেখক, পণ্ডিত এবং সূফী সাধকদের কাজেও পশতু সাহিত্যে ঘটেছিল উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বহু ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে বায়েজিদ আনসারি এবং তার পাঁচ পুত্রের চারজন শেষতক ইউসুফজাই মিলিশিয়াদের সহায়তায় মুঘল সাম্রাজ্যের হাতে নিহত হন। প্রসঙ্গত, আনসারি সংগঠিত রোশনিয়া বা রোশনাই আন্দোলনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। বায়েজিদ আনসারি শিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এমন কি যুদ্ধ সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারী এবং পুরুষের সমান অংশগ্রহন বা সমান অধিকারের কথা বলেছেন এবং জন্মসূত্রে ধর্মীয় নেতা ও রাজা হওয়ার অধিকারের বিরুদ্ধে ছিলেন।

পশতু ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে উজ্জল ব্যক্তিত্ব হিসাবে মনে করা হয় খুশাল খাঁন খাত্তাক কে (১৬১৩-১৬৮৯)। তিনি পশতু সাহিত্যে নবতর ধারা প্রবর্তন করেন। এই পর্বে পশতু সাহিত্যের অধিকাংশ কবি, সাহিত্যিক এবং এর সাহিত্য সম্ভার ফার্সি গজল, রুবাই ও মসনভি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। খুশাল খাঁন খাত্তাকের সমকালীন আরেক প্রখ্যাত কবি রহমান বাবা’র (১৬৫৩-১৭০৬) কবিতার বাগানে তাই তো কখনো বা দেখা যায় হাফিজ শিরাজির ফুল। একইভাবে ফার্সি কবিতার ঐতিহ্য ছুঁয়ে গেছে আব্দুল কাদির খাঁন খাত্তাক, মউজউল্লা খাঁন, আশরাফ খাঁন হিজরি, কাদিম খাঁন সাইদা, আহমেদ শাহ আবদালি (১৭২২-১৭৭২) প্রমুখের কাজে। সতেরো শতকের পশতু সাহিত্য মূলত কবিতার যুগ হলেও, এই সময়ে পশতু গদ্য সাহিত্যেরও বিকাশ  শুরু হয়। রোম্যান্টিক গল্প এবং কাহিনিকাব্যের মধ্য দিয়ে গদ্য সাহিত্যের জনপ্রিয়তা বর্ধিত হলেও, একাধারে যোদ্ধা, দুরানি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং কবি আহমেদ শাহ আবদালির মৃত্যুর সাথে, শতকের শেষ পর্যায়ে এই ধারাটি প্রায় নিঃশেষিত হয়ে তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে। রাজশক্তির উত্থান পতনের ইতিহাসে একদিকে  মুঘল সাম্রাজ্যের পতন, অন্যদিকে মারাঠা ও  শিখদের উত্থান, দক্ষিন পূর্ব ভারতে ব্রিটিশের সুচতুর অগ্রাভিযান, মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব, এই সবকিছু মিলিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যার প্রভাব তৃতীয় পর্যায়ের পশতু সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ছিল অনিবার্য ।

আর তারই ধারাবাহিকতায় এর পরের পর্ব চিহ্নিত হয় বিংশ শতকের শুরু থেকে। খিলাফত এবং হিজরত আন্দোলন এই সময়কার পশতু সাহিত্যে প্রভাবক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কবিতায় পরিলক্ষিত হয় স্বাধীনতার আকাঙ্খা। আমির হামজা খাঁন শিনওয়ারি (১৯০৭-১৯৯৪) এবং দোস্ত মোহাম্মদ কামিলের (১৯১৫-১৯৮১) মত তরুণ কবিরা এ সময় নতুন আদর্শবাদের সংযোগে পশতু সাহিত্যের উন্নতি ঘটান। আবদুল আকবর খাঁন আকবর, খাঁন আবদুল ঘানি খাঁন, খাদিম মোহাম্মদ আকবর, খালিক, সামন্দর খাঁন, রাহাত জাখেলি, খাঁন মীর হিলালি, মাখফি, সানোয়ার হুসেইন কাকাজি, খাঁন কামিল প্রমুখ সাহিত্যিকগণ পশতু পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশ শতকে পশতু সাহিত্যের অন্যান্য ধারা-নাটক, ছোট গল্প, উপন্যাস, চরিত্র-চিত্রণ, ভ্রমণসাহিত্য, প্রতিবেদন, স্যাটায়ার, আজাদ নযম, হাইকু বা অণুকাব্য প্রভৃতি বিকশিত হয়। এই শতকের চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে সানোয়ার হুসেইন কাকাজী, দোস্ত মোহাম্মদ কামিল এবং আমির হামজা খাঁন শিনোয়ারির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় পশতু ভাষার প্রথম সাহিত্য সংগঠন ‘ওলাসি আদাবি জিরগা’। বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ওলাসি আদাবি জিরগা’র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে কালান্দর মুমান্দ, মুরাদ শিনওয়ারি, সাইফ উর রাহমান সেলিম, হামিশ খলিল প্রমুখ সাহিত্য ব্যক্তিত্ব বেরিয়ে এসেছেন। কলন্দর মুমান্দ ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দা সাহু লিকুনকিউ আদাবি মারাকা’ যার মাধ্যমে পশতু ভাষা এবং সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়। কলন্দর মুমান্দ সর্বপ্রথম পশতু ভাষার অভিধান (দরব) সংকলন করেন। পাশাপাশি হামিশ খলিল পশতু ভাষার তিন হাজারেরও বেশি কবি, লেখক, সাহিত্যিকের তথ্য সম্বলিত লেখকপঞ্জি (দা কালাম খান্দান) সংকলন করেন। পশতু ভাষা এবং সাহিত্যের বিকাশে কাবুলের ‘আদাবি তোলানা’ এবং পশতু একাডেমীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পশতু ভাষার বর্তমান কবি এবং সাহিত্যিকেরা মূলত তাদের পূর্ববর্তী সাহিত্যকদের ঐতিহ্য বহন করেই সামনের দিকে এগুচ্ছেন।

গুল বাচ্চা উলফাত, আবদুল হাই হাবিবি, আবদুর রউফ বিনাওয়া, কাইউমুদ্দিন খাদিম, আবদুল শাকুর রাশেদ, সাদিকুল্লাহ রাস্তিন প্রমুখ সাহিত্য ব্যক্তিত্বের কাজে যেমন পশতু ভাষা এবং সামগ্রিক প্রেক্ষিত থেকে আফগান সাহিত্য বিকশিত হয়েছে, তেমনই সাম্প্রতিক কালের খালেদ হোসেইনি, আতিক রহিমি, নাদিয়া আঞ্জুমান, রাজিক ফাআনি, আবদুল হামিদ ভাইজ, সুলায়মান লায়েক, পারভিন পাজভাক, ওয়াসেফ ভাকতারি, সাঈদ আসকার মৌসাভি প্রমুখ আফগান লেখক, কবি, ঔপন্যাসিক এবং গল্পকারগন বিভিন্ন ভাষায় লেখার মধ্য দিয়েও মূলত আফগান সাহিত্য সংস্কৃতিকে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

আফগানদের বহু পুরানো গোত্রদ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিক বিশ্বের একাধিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের চাপিয়ে দেয়া আগ্রাসী যুদ্ধ একদিকে যেমন তাদের জীবনে নিয়ে এসেছে নতুন সংকট, অন্যদিকে এই সংকট আফগানিস্তানের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অভূতপূর্ব অভিঘাত তৈরি করছে, যার ফলে সাহিত্যে সৃজিত হচ্ছে নতুন স্বর। প্রথাগত মূল্যবোধের যায়গায় প্রভাব তৈরি করছে নতুন মুল্যবোধ। প্রথাগত ক্ষুদ্র বলয় ভেঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে বৃহত্তর নতুন বলয়। মানুষের মুক্তির পথে, মানুষের সাথে মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে তাও তো কম কিছু নয়! যুগ-যুগান্তের অচলায়তন ভাঙ্গতে আঘাত লাগে বৈকি! কিন্তু সেই আঘাত রক্তপাতবিহীন নয় মোটেই। তাই অধুনা আফগান সাহিত্যও আসলে রক্তস্নাত সাহিত্য। অশ্রুর দাগ হয়তো হাতের উল্টোপিঠে সহজে মোছা যায়, কিন্তু রক্তের দাগ সহজে বিস্মৃত হয় না। তাই আফগান সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে ঝাড়বাতি না হলেও সে ছোট প্রদীপ। তবে তার আলো নীল।

উঠানের পাঠকদের জন্য এখানে আফগান লোককাহিনীর দুটো গল্প পেশ করা হল। গল্প দুটি ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত।

সদুদ্দেশ্য

গল্প সঙ্কলকঃ গুলাই

লোকে বহুদিন আগের এক আফগান বাদশাহ সম্পর্কে বলতো যে, তিনি রাজ্য শাসনের কাজে ব্যয় করতেন তিনদিন। তারপর তাকে পরের তিনদিনের জন্য আর খুঁজে পাওয়া যেত না। এরপর তিনি ফিরে আবার তিনদিনের জন্য তার দায়িত্ব পালন করতেন। এবং এভাবেই অনেক বছর ধরে চলছিল।

কিন্তু কেউই তার এই অদ্ভুত আচরণের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে সাহস করত না, যদিও এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্দাজ অনুমান চালু ছিল। কিছু লোকে বলতো যে, তিনি ছিলেন গুহাবাসী এক তপস্বী। অন্যরা বলতো যে, তার কোন নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড ছিলো। তবু কিছু লোক এটাও বললো যে, তার আসলে মজ্জাগতভাবে পাগলামির বাতিক ছিলো…

তারপর একদিন উত্তর দিক থেকে বর্বরদের আগ্রাসন শুরু হলো। যেটা আগেও প্রায়শ হতো। বাদশাহ তার সংগ্রাম পরিচালনার জন্য সপারিষদ সেনাপতি এবং সৈনিকদের নিয়ে উঁচু পর্বতের দিকে উঠে গেলেন। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল খুবই কঠিন। অমাত্যগণ এবং এমন কি যোদ্ধারাও এই ধরনের অনভ্যস্ত জীবন পরিস্থিতিতে প্রায়ই মনোবল হারিয়ে ফেলছিলেন এবং শুধুমাত্র বাদশাহর উৎসাহে-যিনি এক উল্লেখযোগ্য সহনশীলতা এবং নমনীয়তা দেখিয়েছিলেন- তাদের অগ্রাভিযান পরিচালিত হয়েছিলো।

এরপর যখন শত্রুরা বিতাড়িত হলো এবং রাজদরবার তার নিয়মমাফিক কাজে ফিরে গেল, প্রধান উজির বাদশাহর প্রশংসা করে বললেন যে, তিনি যেভাবে আয়েশবঞ্চিত অবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন এবং অন্যদের উৎসাহকে ধরে রেখেছিলেন তা সত্যিই অতুলনীয়!

“এটা কঠিন কিছু ছিল না”। বাদশাহ ব্যাখ্যা করে বললেন। “যেহেতু অনেক বছর ধরে- যখন আমি আমার রাজদরবারের কর্তব্য থেকে প্রায় অর্ধেক সময় অনুপস্থিত ছিলাম- আমি অত্যন্ত দরিদ্র আর সমস্যাগ্রস্ত সাধারণ মানুষের মতই জীবন যাপন করেছিলাম। সর্বোপরি, কোন বাদশাহ যদি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবন যাপন সম্বন্ধে অবগত না থাকেন, তাহলে কিভাবে তিনি তার রাজ্য শাসন করতে পারেন?”

আদম খাঁন দুরখাঁনাই  

গল্প সঙ্কলকঃ গুলাই

আদম খাঁন এবং দুরখাঁনাইয়ের কাহিনি পশতু ভাষায় রোম্যান্টিক প্রেমের এক ক্ল্যাসিক উপাখ্যান বলে বিশ্বাস করা হয়। ধারনা করা হয় এই গল্প মুঘল শাসনামলে আকবরের সময় থেকে লোকমানসে জায়গা করে নিয়েছে। লোকমুখে এবং লেখার মধ্য দিয়ে এই গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এখনো প্রবহমান।

আমার কাছে এই গল্পের বৃহত্তর মানে আছে। শুধুমাত্র এই কারনে নয় যে এটা সোয়াতে জায়গা করে নিয়েছিলো, বরং এই কারনে যে, আমরা আদম খাঁনের সাথে সম্পর্কিত এবং তার রক্ত আমাদের শিরায় প্রবাহিত। বারিকোটে একটা হুজরা আছে। সেখানে তরুন সংগীতপিপাসুরা এক ধরনের ঝোপ জাতীয় হলুদ ফুলগাছের ছোট ডাল সংগ্রহ করতে যান। ধারনা করা হয় যে, বহুশতাব্দী আগে আদম খাঁন এগুলো ব্যবহার করে তার রবাব বাজাতেন।

আদম খাঁনের বাস ছিলো নিম্ন বাজদারার কুজা এলাকায় এবং দুরখাঁনাইর বাড়ি ছিলো উঁচু  বাজদারা এলাকায়। হাসান খাঁনের পুত্র আদম খাঁন ছিল অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক। এবং সব দিক থেকেই তাকে দেখে মনে হত বখে যাওয়া এক যুবক, যার বন্ধুদের সাথে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর চাইতে ভালো আর কিছু  করার ছিলো না।

তাউস খাঁনের কন্যা দুরখাঁনাই ছিলো অপূর্ব সুন্দরী এক সদ্য যুবতী। অধিকন্ত সে ছিল  খুবই বুদ্ধিমতী। পুত্র সন্তান না থাকায় তাউস খাঁন তার সময়ের প্রেক্ষিতে অভাবনীয় উদারতা দেখিয়েছিলেন। তিনি তার ইচ্ছাপূরণে মেয়ের জন্য জাননেওয়ালা শিক্ষক নিযুক্ত করে তখনকার সময়ে শেখার যা কিছু ছিলো তার প্রায় সবকিছুরই ব্যবস্থা করেছিলেন। দুরখাঁনাই স্থানীয় রীতি রেওয়াজ মেনে  কঠোর পর্দাপ্রথা পালন করত। সে যে শুধুমাত্র পর্দায় অবগুণ্ঠিত থাকত তাই নয়, তার জন্য ঘরে পর্দার পিছনে বসার একটা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল এবং তাকে সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য একজন বয়স্ক পরিচারিকাও রাখা হয়েছিল।

পাইউ খাঁন নামের একজন লোক দুরখাঁনাইর রূপ এবং জ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসার কথা শুনে, তাকে কখনো না দেখে বা তার সাথে কোন সাক্ষাত ছাড়াই তার প্রেমে পড়ে গেলো। তার প্রেম তাকে পাণ্ডুবর্ণ করে তুললো এবং সে বিছানায় পড়ে থেকে শুধু এক নারীর কল্পনাই করতে পারল। তার বাবা তার বেহাল অবস্থা দেখে চিন্তিত হলেন এবং  অনুসন্ধানে তৎপর হলেন যে, কী তাকে এমন বেদনাগ্রস্ত করলো।

পাইউ খাঁন অবশ্য তার গাত্রবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া এবং নাড়ি দ্রুতগতি হওয়ার কারন উদ্ঘাটন করতে পেরেছিল। তার বাবা তার দুর্দশা দেখে হেসে ফেললো এবং তাকে বললো যে, তার চিন্তার কোন কারন নেই এবং দিন শেষ হওয়ার আগেই তাকে সে ব্যক্তিগতভাবে কথা দিলো যে, দুরখাঁনাই শুধুমাত্র তার এবং তারই বাগদত্তা হবে।

দুরখাঁনাইকে বধূ হিসাবে চেয়ে তাউস খাঁনের গৃহে রীতিমাফিক প্রস্তাব পাঠানো হলো। পাইউ খাঁনের পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন তাই প্রত্যুতরে ইতিবাচক সাড়া পেতে দেরি হল না। এভাবেই দুরখাঁনাই নিজেকে খুঁজে পেল একজন পুরুষের বাগদত্তা হিসাবে। যদিও সে নাকি পাগলের মত তার প্রেমে পড়েছে, তবে দুরখানাইও তাকে দেখেনি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়ে গেল।

উঁচু বাজদারায় দুরখাঁনাইর এক খালা থাকতেন যার মেয়ের বিয়েও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। শৈশবে তারা একসাথে অনেক দিন খোলাচুলে রাস্তায় হেসে খেলে বেড়িয়েছে সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক যে, দুরখাঁনাই তার বিয়েতে থাকতে চাইবে। কিন্তু তাউস খাঁন তাকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। যেহেতু সে এখন একজনের বাগদত্তা।  দুরখাঁনাইর খালা চলে যাওয়ার সময় যথেষ্ট হৈচৈ করে দুরখানাইকে তার সাথে করে নিয়ে গেল, এবং কথা দিলো যে তার কন্যারত্নটির উপরে কোন প্রকার বালা মুসিবত আসবে না।

বিয়েবাড়িতে সকলেই দুরখাঁনাইয়ের রূপ লাবন্যে মোহিত হয়ে গিয়েছিল এবং সবাই বলছিল যে, পাইউ কত ভাগ্যবান যে এমন বুদ্ধিমতি বউ পেয়েছে! সেই সন্ধ্যায় নারীরা বাড়ির বাইরের দেয়ালের কাছে ভিড় জমিয়েছিল যেটা ছিলো হুজরার লাগোয়া। সেখানে বরের বন্ধুরা সবাই মিলে রবাবের মোহন সুরের সাথে গাঁথা এবং দ্বিপদী গাইছিলো। রবাবের ছন্দ দুরখাঁনাইর হৃদয়ের গভীরে এমনভাবে স্পর্শ করল যে সে সম্মোহিত হয়ে গেল। সে অনুভব করলো যে সে সঙ্গীতের ভেতরে ডুবে গেছে এবং বলে উঠল, “ আহ! কিভাবে এই সুর আমার হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রিতে দোলা দিয়ে যায়।” তার চাচাতো বোন তার কথায় হেসে বললো- “ ওহ দুরখাঁনাই, তোর তো এক পলকের জন্য হলেও ওই লোকটাকে দেখতে হবে। তার নাম আদম খাঁন এবং যেমন তার সঙ্গীত সে তেমনই সুদর্শন!”

সেখানে অন্যান্য নারীরাও একই রকম সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল এবং তারা ছোটখাটো একটা ফন্দি আটলো যে, তারা যদি পালাক্রমে একজন আরেকজনকে ঠেলে জাগিয়ে ধরে তাহলে তারা সবাই অন্তত এক পলক হলেও সেই রোমাঞ্চকর বাজিয়েকে দেখতে পারবে! তাদের শোরগোলের কারন অশ্রুত রইলো না এবং তারা যেহেতু পালাক্রমে দেখছিলো, দুরখাঁনাই যখন তার মাথা দেয়ালের উপরে তুললো তখন শুধু আদম খাঁনই নয় তাদের পুরো দলই তাকে দেখার সুযোগ পেল। তাদের সবার দেখার আকাঙ্খা তাদেরকে বাইরে নিয়ে এলো এবং তারা অপলক চোখে দুরখানাইর সৌন্দর্য দেখছিলো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হলফ করে বললো যে, সারা দুনিয়ার সব সৌন্দর্যের নিরানব্বই ভাগই আছে দুরখাঁনাইর ভ্রূর উপরে ছোট ওই তিলটায়! কিন্তু দুরখাঁনাইর চোখ খুঁজছিলো শুধু আদম খাঁনকেই। সে এই অপ্রত্যাশিত আকর্ষণে বিস্ময়াভিভূত হয়ে নিচে পড়ে গেলো। এরপর যখন তাকে ধরাধরি করে একটা বিছানায় নিয়ে যাওয়া হলো, সে কাঁপতে কাঁপতে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল কিন্তু তার এই অনুভূতির সে কোন ব্যাখ্যা করতে পারলো না। তার চাচাতো বোনের বিয়ে হয়ে গেল কিন্তু সে আর বিছানা থেকে উঠতে পারলো না। আদম খাঁনকে এক পলক দেখার স্মৃতি নিয়েই চললো তার দিন আর রাতের গুজরান।

অন্যদিকে আদম খাঁনও অনাক্রান্ত ছিলো না। সেও প্রেমজ্বরে পড়ে বলতে লাগলো যে, তার জন্য একমাত্র যে নারী সে হলো দুরখানাই। কিন্তু এটা প্রকাশ করা এখন একটা লজ্জার বিষয়। কেননা সকলেই জানে যে, পাইউ খাঁনের সাথে দুরখাঁনাইয়ের বাগদান সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং পাখতুনরা কখনো কথার খেলাফ করে পিছিয়ে যায় না। আদমের বাবা হাসান খাঁন তার ছেলের হিতাহিত জ্ঞানশুন্য এইসব কথাবার্তা শুনে অনতিবিলম্বে তার কাছে গিয়ে তাকে কিছু সদুপদেশ দিলেন।

দুরখাঁনাই যদিও তার বাড়িতে ফিরে গেলো কিন্তু তারা উভয়েই পেরেশান, বিশেষ করে আদম খাঁন। সে খাবার পানি ছেড়ে দিয়ে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং  নিজেই এখন নিজের সাথে কথা বলে। সে তার প্রিয়াকে কখনো কখনো তুলনা করছে সূর্যের সাথে কখনো কখনো বা চাঁদের সাথে। এবং সে দুঃখীভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলছে, ওই যে দূরে চাঁদ, সূর্য এবং তারায় তারায় দুরখাঁনাইকে দেখা যাচ্ছে! সে এমনভাবে বিলাপ করতে লাগলো যে তার শ্বাস নেয়াও দায় হলো এবং দুরখাঁনাইর কথা ভাবতে ভাবতে তার হৃতকম্পন এতোটা বেড়ে গেল যে সে আর বেশি সময় দাড়িয়ে থাকতে পারলো না।

আদম খাঁনের বন্ধুরা তার এই দুর্দশা দেখার যন্ত্রণা সইতে না পেরে তাদের প্রেমে পাগল বন্ধুর জন্য দুরখাঁনাইয়ের সাথে দেখা করানোর একটা উপায় বের করলো। তারা সেই পরিচারিকাকে যথেষ্ট পরিমানে উৎকোচ দিলেন যেন তিনি একটা দরজা খোলা রাখেন, যাতে করে আদম খাঁন সেই রাতে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এটা ছিলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটা অভিযান। কারন ধরা পড়ার মানে হলো তাদের উভয়েরই নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। সে রাতে সেই প্রেমিক যুগলের মাঝে কি কথা হয়েছিলো, আমরা শুধু তার অনুমানটুকুই করতে পারি। তা সত্বেও সে রাত দ্রুতই ভোর হয়ে গেল, এবং আদম খাঁনের বন্ধুরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সংকেত দিলেও তা হলো শ্রবনে বধির। পরিচারিকা নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন তাই আদম খাঁন কে জোর করে কোনমতে শেষ মুহূর্তে বের করে দিলেন। তবে তারা তাদের উপহার বিনিময় করতে পেরেছিল। আদম খাঁন তার অঙ্গুরীয় রেখে এসেছিলো। ফিরতি উপহার হিসাবে পেয়েছিলো দুরখাঁনাইর নিজ হাতে নকশা করা রুমাল।

এভাবেই তারা দুজন দুজনের কথা অনুক্ষণ ভাবতে লাগলো এবং তাদের উপহার পাওয়ার আনন্দ তাদের আপাতত যেতে দিলো। যদিও এইটুকুই তাদের কাছে যথেষ্ট ছিলো না, তাই তারা পরস্পরকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলো। দুরখাঁনাইর বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছিলো এবং এটা থেকে তার পালানোরও কোন উপায়ও ছিলো না। দুরখাঁনাই না পারবে তার বাবাকে বলতে, আর তার বাবারও না সাধ্য আছে কথার খেলাফ করার। এবং হাসান খাঁনও না পারবে তার ছেলের জন্য কিছু করতে।

দুরখাঁনাইয়ের সাথে পাইউ খাঁনের বিয়ে হয়ে গেলো। তবে দুরখাঁনাই পাইউ খাঁনকে তখনো দাম্পত্য জীবনে প্রবেশাধিকার দেয়নি। পাইউ খাঁন ধৈর্য ধরে ভাবলো যে নতুন ঘরে দুরখাঁনাইর  মানিয়ে নিতে হয়তো একটু সময় লাগবে। পাইউ হতাশ না হয়ে শিকারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। এই সুযোগে দুরখাঁনাই বুদ্ধি করে আদম খাঁন কে অবিলম্বে খবর পাঠালো এবং আদম খাঁন তাকে তার ঘোড়ার পিঠে তুলে দ্রুত সেখান থেকে পলায়ন করে পাশের একটি গ্রামে গিয়ে সেখানকার বর্ষীয়ান গ্রাম প্রধানের কাছে ক্ষমা চেয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলো। পাখতুনদের রীতি অনুযায়ী গ্রাম প্রধান আশ্রয়প্রার্থীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না তাই আদম খাঁন এবং দুরখাঁনাইর কাছ থেকেও পারলো না। এবং এমন কি পাইউ স্বয়ং আসলেও শরণার্থী আদম খাঁন এবং দুরখাঁনাইকে গ্রাম প্রধান তাদের আশ্রয় এবং নিরাপত্তা দিতে বাধ্য।

পাইউ তার স্ত্রীর লজ্জাস্কর অপহরণের কথা শুনে শিকার বাতিল করে দ্রুত ঘরে ফিরে এলো। সে তার গ্রামের মুরুব্বিদের নিয়ে বসে তার ঘটনা জিরগায় তুললো। এবং সকলেই সম্মত হলো যে, দুরখাঁনাই নিশ্চিতভাবেই পাইউ খাঁনের স্ত্রী, সুতরাং তাকে ঘরে ফেরত আনতে হবে।

ঘটনাক্রমে আদম খাঁনের বন্ধু এবং পাইউ খাঁনের লোকজনের মধ্যে মারামারি লেগে গেলো। খুন হয়ে গেলো আদম খাঁনের সবচাইতে ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু। ঘটতে থাকলো অনেক অঘটন। দুরখাঁনাইকে পাইউ খাঁনের ঘরে ফেরত আনা হল কিন্তু সে তার চারপাশে তৈরি করে নিলো এক কঠিন খোলস। সে খাবার ছেড়ে দিলো।পাথরের মত নির্বাক হয়ে বসে রইলো একই জায়গায়। মাথার চুল ধোয়া, চুল আঁচড়ানো অথবা খোঁপা বাঁধা প্রত্যাখ্যান করলো। মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া কোন নারীর মতই সে সবকিছু প্রত্যাখান করলো এবং তার চুলে পাখি বাসা বাঁধা শুরু করে দিলো।

আদম খাঁনের অবস্থাও ভালো কিছু ছিলো না। বন্ধুর মৃত্যুতে অপরাধবোধ এবং দুরখাঁনাই কে হারানোর আঘাত তাকে উন্মাদ করে তুললো। লক্ষ্য বিহীন ভাবে সে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। একদিন একদল হিন্দু যোগী তাকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থায় খুঁজে পায়। তারা এইরকম একজন সুদর্শন যুবকের পাগল হয়ে যাওয়ার প্রতি সদয় হন এবং সিদ্ধান্ত নেন তাকে সুস্থ জীবনে  ফিরিয়ে আনতে তারা তাদের সর্বোত্তম সেবা দেবেন।

আদম খাঁন তার মাথা কামিয়ে যোগীদের মত বেশভূষা গ্রহন করলো এবং কিছু সময়ের জন্য বিস্ময়াভিভূত হয়ে রইলো। শেষ পর্যন্ত আদম খাঁন তার কাহিনী তাদের কাছে সবিস্তারে বলায়   যোগীগণ তাকে সাহাজ্য করার সিদ্ধান্ত নিলো। এরপর তারা সবাই একসাথে বাজদারায় ফিরে গেলো কিন্তু কেউই আদম খাঁন কে চিনতে পারলো না। একসময় তাদেরকে পাইউ খাঁনের দুয়ারে দেখা গেলো এবং পাইউ খাঁন তাদেরকে খাবারের জন্য আমন্ত্রন জানাল। যোগীগণ তাকে বললো যে তারা তার গভীর বেদনার কথা বুঝতে পারেন এবং অন্য কারো থাকলে তাও বুঝতে পারেন। চমৎকার খাবার প্রদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ যোগীগণ পাইউ খাঁনের গৃহের সবার বেদনা বিদূরিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

পাইউ খাঁন তার বুদ্ধিমত ভাবলো যে, একবার চেষ্টা করলে দুরখাঁনাই ভালো হতেও তো পারে! তার আর হারানোর কি আছে। দুরখাঁনাই কে যখন নিয়ে আসা হলো তখন সে ছিল একেবারে বদ্ধ উন্মাদিনীর মত কিন্তু আদম খাঁন কে দেখার অল্প কিছু সময়ের মধ্যে একেবারে শান্ত হয়ে গেল। সে আদম খাঁন কে তার পরিবর্তিত অবস্থায়ও চিনতে পেরেছিল। পাইউ খাঁন দুরখাঁনাইর এই দ্রুত ভাবান্তরে খুব চমৎকৃত হল এবং সে যোগীদেরকে তার বাগিচায় থেকে যেতে নিমন্ত্রণ জানালো।

আদম খাঁন এবং দুরখাঁনাই উভয়েই সেরে উঠলো এবং সেটা যোগীরা তাদের যোগসাধনা ও ধ্যানে ফিরে যেতে চাওয়ার খুব বেশি আগে নয়। আদম খাঁন তার পিতৃগৃহে ফিরে যাওয়ার জন্য তখন যদিও যথেষ্ট সুস্থ, তথাপি সে দুরখাঁনাইর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার অল্প সময়ের মধ্যে আবারো পূর্বাবস্থায় পতিত হল। আদম খাঁনের বাবা কাল বিলম্ব না করে গুলনাজ নামের এক পরমা সুন্দরী মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক করলেন এবং বিয়ের পরে অনেক দূরে গুলনাজদের গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করলেন।

গুলনাজ, যে কিনা তার স্বামীর নিদারুণ বেদনার ব্যাপারে সচেতন ছিল এবং ধৈর্যের সাথে সে তার সেই বেদনার কথা শুনতো যাতে আদমের যন্ত্রণার উপশম হয়। তবে এটা কেউই বলতে পারে না যে গুলনাজ সেই সম্পর্কের ব্যাপারে কি ভাবতো। কিন্তু এটা দেখে মনে হত যে, সে সেই সম্পর্ককে সম্মানের সাথেই নিয়েছে  অথবা পিতৃগৃহে ফিরে যাওয়া অবধি যত দিন সে পারে।

অন্যদিকে আদম খাঁন ছাড়া দুরখাঁনাইও ভালো ছিল না। পাইউ খাঁন পুনরায় বিয়ে করে এবং দুরখাঁনাইকেও বিয়ে করার অনুমতি দেয়। কিন্তু আদম খাঁন বাজদারার উদ্দেশে বের হয়ে দুরখাঁনাইর জন্য কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অন্ধ হয়ে গেল। আদমের মিনতিতে তাকে দুরখাঁনাইদের বাগান প্রাচীরের কাছে নিয়ে যাওয়ার পথে সেখানে পৌঁছানোর সামান্য আগেই আদম খাঁন মারা যায়। দুরখাঁনাইও তার বেদনার ভার সইতে না পেরে মারা গেল। পাইউ খাঁন এক মুহূর্তের জন্য হলেও নিজেকে অপরাধী বোধ করে এবং দুরখাঁনাইকে আদম খাঁনের পাশে কবর দেয়ার জন্য বলে।

অনেক বছর পরে যখন কবর একদম সমান হয়ে গেল, লোকেরা ভুলক্রমে সেখানে খনন করতে গিয়ে প্রেমিকযুগলের মত আলিঙ্গনাবদ্ধ দুটো দেহ দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল! তাদের আলাদা করে পুনরায় কবর দেয়া হল। এর এক শতাব্দী পরে আবারো তাদের একত্রিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এবারে তাদেরকে একত্রে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। কেউ চাইলে সেই কবর এখনো খুজে পেতে পারে। কবরস্থানে সেই কবরটা প্রস্থে সবচাইতে বড়।

বাজদারায় পাইউ খাঁনের গৃহসংলগ্ন বাগানে কিছু পাথর ছড়ানো ছিল। এটা শোনা যেত যে, দুরখাঁনাই সেখানে বসে আদম খাঁনের জন্য করুন সুরে ট্যাম্বোরিন বাজাতো। আর এখন লোকবিশ্বাস এই যে, কোন প্রেমিকজন সেখানে গিয়ে যদি যাচনা করে তাহলে তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।

গল্প সূত্রঃ afghanliterature.blogpost.com

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top