সাক্ষাৎকার ।। কেনজাবুরো ওয়ে ।। অনুবাদঃ জেলিস খান

কেনজাবুরো ওয়ে | The Art of Fiction No. 195

(কেনজাবুরো ওয়ে নিবেদন করেছেন নিজেকে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর – এটম বোমাক্রান্ত হিরোশিমা, ওকিনাওয়ার সংগ্রামী জনগণ, শারীরিক-মানসিক অক্ষম মানুষের প্রতিকূলতা, জ্ঞানী মানুষের সংযম – যদিও তিনি নিজে এ ব্যাপারে ছিলেন উদার। কিন্তু জাপানের লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই ভবঘুরে লেখককে মানুষ চিনে ভিন্ন কারণে, শাসকশ্রেণীকে প্রতিনিয়ত তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিব্রতকারী গোষ্ঠীর প্রাণস্পন্দন রূপে। রুচিবান, হাস্যপ্রিয় এই মানুষটি সব সময় অবসরে পরার জামা গায়ে, সহজিয়া হাসিতে, চঞ্চল হরিণের মতো ঘুরে ফিরে বেড়াতেন। হেনরি কিসিঞ্জারের একনিষ্ঠ সমালোচক ও বিরোধী ছিলেন বলেই কিসিঞ্জার, ওয়ের এই অফুরান হাসির ধারাকে ‘শয়তানের হাসি’র সমতুল্য মনে করতেন। ওয়ে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাতেন তাঁর বাড়ির বসার ঘরে, বিভিন্ন কাগজপত্র ঠেকা দিয়ে রাখা চেয়ারে, ঐতিহ্যবাহী গানের সিডি আর জ্যাজের অগুনতি সংগ্রহের পাশে জড়াজড়ি করে – ওয়ের মতই সাধারণ, সহজবোধ্য হয়ে, কখনই নিজের জ্ঞানের জাহির না করেই। ওয়ের এই পাশ্চাত্য ধাঁচের বাড়ির নকশা করেছেন তাঁর স্ত্রী ইউকারি এবং টোকিওর উপশহরে এমন জায়গায় যেখানে বসবাস করতেন বিখ্যাত মানুষ আকিরা কুরোসাওয়া এবং তোশিরু মিফিউন। রাস্তা থেকে দূরে, হাজারো পদ্মফুল, ম্যাপল গাছ আর একশরও বেশি রকমের গোলাপ ফুলের গাছ নিয়ে আড়ালে থেকে গেছেন ওয়ে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। তিন ছেলেমেয়ের মাঝে ছোট দুই ভাইবোন বড় হয়ে আলাদা হয়ে গেলেও, ওয়ে আর ইয়াকুরি চুয়াল্লিশ বছরের মানসিকভাবে পঙ্গু বড় সন্তান হিকারিকে নিয়ে একই বাসায় রয়ে গেছেন আজো।

লেখকের কাজ হচ্ছে টিভিতে দেখানো কমেডিয়ান বা ভাঁড়ের মতোন, যে কিনা আবার দুঃখের কথাও বলে থাকে। ওয়ে তাঁর বেশিরভাগ আখ্যানকেই আদতে জানা বিষয় থেকে কোন অজানা বিষয়ে পদার্পণ হিসেবে দেখেন, যা বিশেষ করে বিধৃত করেছেন তাঁর দুইটি বইয়ে, যার একটা হচ্ছে A Personal Matter (1964), যাতে তিনি একজন বাবার তাঁর বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মানো ও তাঁর পরবর্তী ঘটনা নিয়ে লিখেছেন আর আরেকটি বই The Silent Cry (1967), যুদ্ধপরবর্তী জাপানে শহর ও গ্রামের সামাজিক বৈষম্যতার নির্মোহ চিত্র। ওয়ের লেখার দুটি ভাগ ধরলে প্রথম উপন্যাসটির আদলে লেখা অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ও গল্প ছিল, Aghwee the Sky Monster(1964), Teach Us to Outgrow Our Madness (1969), The Pinch Runner Memorandum (1976), Rouse Up O Young Men of the New Age! (1986), এবং A Quiet Life (1990)। এইসব লেখার বিষয়বস্তু গাঁথা আছে মূলত ওয়ের নিজের ছেলের জন্মানো আর বেড়ে উঠা থেকে। গল্পের চরিত্রগুলো যদিও বাস্তবে ওয়ে নিজেই, কিন্তু বাস্তবজীবনে ওয়ে আর উনার স্ত্রীর ভূমিকার সাথে উপন্যাসে বা গল্পে ভিন্ন চিত্রই ফুটে ওঠে। কেনজাবুরে ওয়ের দ্বিতীয় ধারার উপন্যাস বা গল্পগুলো হচ্ছে, Prize Stock(1958), Nip the Buds, Shoot the Kids (1958) এবং Somersault (1999), যেসব আসলে The Silent Cry এর সংযোজন।

‘সাম্রাজ্যবাদই ঈশ্বর’ এমন বিশ্বাস আর সংস্কার নিয়েই ছোট দ্বীপ শিকোকুতে ১৯৩৫ সালে কেনজাবুরে ওয়ে জন্ম গ্রহণ করেন এবং বেড়ে উঠেন। ওয়ে নিজেকে সাদা কোন এক পাখির মতই ভাবতেন, যতক্ষণ না তিনি রেডিওতে জানতে পেরেছিলেন জাপান দ্বিতীয় ইউরোপিয়ান যুদ্ধে হার মেনেছে। একই ঘটনা তাকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ভাবতেও শিখিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে ওয়ে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করলেও একই সময়ে জাপান সরকারের দেয়া সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার The Order of Culture নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন শুধু এই কারণে যে, জাপান একদিন সাম্রাজ্যবাদী ছিল আর সেই সম্পর্কের সূতো এখনও তারা ধরে রেখেছে। এমন সিদ্ধান্তে তাঁর দেশের বড় একটা অংশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি অনেকের সমর্থনের যে বাদানুবাদ ছিল, একই বিষয় তাঁর লেখায় প্রতিনিয়ত ছাপ রেখেছে। ১৯৬১ তে লেখা Seventeen গল্পটি, ডানপন্থী একজন ছাত্রের হাতে সমাজতন্ত্রী দলের একজন নেতার খুন হওয়া আর পরবর্তীতে তাঁর আত্মহত্যা’ থেকে নিঃসৃত, তা মূলত সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরোধিতা থেকে লেখা। ওয়ে দুই পক্ষ থেকেই তীব্র সমালোচনা পেয়েছিলেন এই গল্পটির জন্য; চরমপন্থী ডানরা গালমন্দ করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদকে কলঙ্কিত করার জন্যে, অন্যদিকে সমাজতন্ত্রী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা একচোট ঝেড়েছিলেন তাঁদের নেতাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে না পারার জন্য আর সেই ঘাতককে জিতিয়ে দেবার জন্য। তখন থেকেই ওয়ের জীবনচলা আর সাহিত্যচর্চা মূলত পাশাপাশি হেঁটেছে, কিংবা বলা যায় তাঁর ‘সাহিত্য ও জীবন’ একই বিষয়। এই অগাস্টেও যখন আমি ওয়ের সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, তখনও আমাকে তিনি বলছিলেন, ‘চারদিন তো হয়ে গেলো, তাড়াতাড়ি করা যায় না? নাগরিকদের পক্ষের একটা বৈঠকে আমার বসা খুব জরুরি ছিল’।

ওয়ে’র বিয়ের তিনবছর পরে তার সন্তান হিকারির জন্ম। ততদিনে তাঁর উপন্যাস ও বেশ কয়েকটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে, তিনি পুরস্কারও পেয়ে গেছেন। সেসবের মধ্যে অন্যতম ছিল, Lavish Are the Dead(1957) এবং Prize Stock যার জন্য তিনি জিতে নেন ইপ্সিত ‘আকুতাগাওয়া পুরস্কার’। সমালোচকরা সেসময় তাকে ইউকিয়ো মিশিমা পরবর্তী সেরা তরুণ লেখক হিসেবে প্রভূত প্রশংসা করেন। যদিও সমালোচক তাকাশি তাচিবানা বলেছিলেন, ‘হিকারি ছাড়া ওয়ের কোন সাহিত্যসৃষ্টি হতে পারে না’। জন্ম থেকেই হিকারির মস্তিষ্কে হার্ণিয়া ছিল। দীর্ঘ, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা শেষে ডাক্তাররা ওয়েকে বলেছিলেন, হিকারি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েই বেঁচে থাকবে। ওয়ে তখনই জানতেন তাঁর এই সন্তানকে আজীবন একঘরে হয়েই থাকতে হবে। এমনকি কখনও বাইরে বের করলেও তা হবে লজ্জ্বাজনক, তবুও ওয়ে আর তাঁর স্ত্রী তাঁদের নতুন জীবনকে আনন্দের সাথেই গ্রহণ করে একসাথে থাকা শুরু করলেন।

‘হিকারি’ শব্দটি জাপানি ভাষায় ‘আলো’র সমার্থক। ছোটবেলায় হিকারি কথা বলত কম, আর পরিবারের কেউ তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তাঁর জবাব ছিল সীমিত, বেশিরভাগ সময়েই তিনি বুঝে উঠতেন না। ওয়ে প্রায়শই হিকারির বিছানার পাশে রেকর্ড করা পাখিদের ডাকের বাজনা অথবা মোজার্ট কখনও বা চপিন শোনাতেন, যেন সে শান্ত থাকে আর ঘুমিয়ে যেতে পারে। কোন এক পারিবারিক ছুটির দিনে, ওয়ের হাত ধরে হাঁটতে থাকা বালক হিকারি পাখির কান্না শুনে থমকে দাঁড়ায়। স্পষ্ট করে সেদিন তিনি সঠিক উচ্চারণ করেন, ‘এটা ওয়াটার রেইল পাখি’ (ওয়াটার রেইল দেখতে কিছুটা চড়ুই পাখির মতোন)। শীঘ্রই ওয়ে ছেলের ধ্রপদী সঙ্গীতে আগ্রহ দেখে পিয়ানো ক্লাশে ভর্তি করে দেন। আজকের দিনে জাপানের নাম করা সুরকারের মধ্যে হিকারি অন্যতম। হিকারি তাঁর জীবনে শোনা যেকোন গানের যেকোন অংশ, দ্বিতীয়বার শুনলেই মনে করতে পারেন। হিকারি মোজার্টের যেকোন কাজকেই চিহ্নিত করতে পারেন অনায়াসে, এমনকি সেগুলোকে সঠিক Köchel (যিনি মোজার্টের সমস্ত কাজের ভাগ করে তাকে ক্রমানুসারে সাজিয়েছিলেন) নাম্বারের সাথেও মিলিয়ে দিতে পারেন। হিকারির প্রথম গানের সিডি, Music of Hikari Oe  সমস্ত ধ্রুপদী সঙ্গীত জাপানে, বিক্রির ইতিহাস ভেঙ্গে দিয়েছিল। বসার ঘরে ওয়ে তাঁর বেশিরভাগ সময় কাটান হিকারির সাথে। একদিকে বাবা পড়েন আর লিখেন, অন্যদিকে হিকারি গান শুনেন আর নতুন সুর তৈরি করেন।

কথোপকথনের সময় ওয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই জাপানি থেকে ইংরেজি (যেটাতে যে বিষয়টা ফুটে ওঠে) আবার মাঝে মাঝে ফ্রেঞ্চও বলতে থাকেন। কিন্তু সাক্ষাৎকারের বিষয়টা যখন এলো তখন একজন দোভাষি নেয়া হলো, যার নাম শিওন কোনো, যার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থেকে গেলাম, যিনি ক্ষিপ্রতার সাথে, নিয়মনিষ্ঠভাবে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন আমাকে। ওয়ে’র ভাষার প্রতি যে আগ্রহ, প্রতিটি শব্দের প্রতি যে দখল, বিশেষ করে লিখিত শব্দের ব্যাপারে, সেটা তাঁর জীবনযাপনেও পরিব্যপ্ত হয়ে আছে। একটা বিষয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ওয়ে তার লেখা ‘জীবনী’র উল্লেখ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিছু মনে করতে পারছেন না বলেই কী সেই বইটির উল্লেখ করেছিলেন? তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, “তা কেন হবে, এই বইটি আমার নিজের লেখা, আমার নিজের পর্যবেক্ষণ, আমার সমস্ত জীবন ও সাহিত্য নিয়ে। আমি আমার নিজেকেই অক্ষরের মধ্যে তুলে ধরেছি”।)

আপনার কর্মজীবনের শুরুতে আপনি অনেকেরই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাহলে কী ধরে নেবো আপনি ভালো সাক্ষাৎকারিক?

আরে না। একটা ভালো সাক্ষাৎকার আসলে এমন কিছু বিষয় তুলে আনে যা আদৌ তিনি বলেন নি। তবে আমি নিজে আসলে তেমন ভালো ছিলাম না যে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে খুব দারুণ কিছু খুঁড়ে বের করব।

১৯৬০ সালে আরো চারজন তরুণ জাপানি লেখকের সাথে, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল চেয়ারম্যান মাও এর সাথে দেখা করার। আমরা ছিলাম আমেরিকা-জাপানের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত। সবার মধ্যে বয়সে ছোট ছিলাম। রাত একটার দিকে উনার সাথে সাক্ষাৎ হল। একটা ঘন গভীর বাগানে আমাদের নিয়ে আসা হল, বাগানটা এমন সবুজের আঁধারে ছিল যে, খুব কাছে থাকা জুঁই ফুলের গন্ধ পেলেও ফুল দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমরা আবার মজা নিচ্ছিলাম এই বলে যে, “ফুলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে মাওয়ের কাছে পৌঁছে যাওয়া যাবে। মাও সততই একজন মুগ্ধকর মানুষ ছিলেন, লম্বা চওড়া, এশিয়ানদের তুলনায় কিছুটা বেঢকই বটে। আমাদের কোন প্রশ্ন করার অধিকার ছিল না, যা বলার উনিই বলবেন কিন্তু তাও বলবেন তার প্রধান দলনেতা ঝো এনলাইয়ের মাধ্যমে। মাও একের পর এক তাঁর লেখা বই থেকে উদ্বৃতি করলেন, মিনিটের পর মিনিট একটানা, দীর্ঘক্ষণ। অসহ্য রকমের সময় ছিল সেটা। সেটা বাড়িয়ে দিয়েছিল বিশাল দেখতে সিগারেট রাখা বাক্স থেকে অনর্গল সিগারেট টেনে যাওয়া। মজার বলতে এটুকুই ছিল যে ঝো এনলিন কথার ফাঁকে ফাঁকে সিগারেটের বাক্সটা দূরে ঠেলে দিচ্ছিলেন আর মাও কী করে যেন আবার পাকড়াও করে সিগারেট জ্বালাচ্ছিলেন।

পরের বছর সার্ত্রের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। প্যারিসে আমার প্রথম পদার্পণ। সেইন্ট জার্মেইন ডেস প্রেস-এ একটা ছোট রুম নিয়ে ছিলাম আর প্রথম যে শব্দগুচ্ছ আমার কানে এলো তা হলো, “পেইক্স এন এলজিরি”। সার্ত্রে আমার জীবনে বেশ প্রভাব রেখেছিল। মাওয়ের মতই সার্ত্রে একই বিষয় বারবার করে বলতেন, সেটা অস্তিত্ববাদ, মানবতাবাদ অথবা পরিবেশ সংক্রান্ত আলোচনাই হোক। আমি একটা সময় তথ্য রাখা বাদ দিলাম। আমি শুধু বইয়ের নামগুলোই লিখে রেখেছিলাম। অনেক কথার মাঝে এটাও বলেছিলেন মানুষের আনবিক শক্তির বিরোধিতা করা উচিত, কিন্তু চায়নার এই শক্তি অর্জনকে তিনি বাহবাও দিয়েছেন। আমি খুব দৃঢ়তার সাথে আনবিক শক্তির কুফল বয়ান করেছিলাম, তবে সার্ত্রে তাতে খুব একটা মনোযোগ দেন নি। বরং আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “পরের প্রশ্ন বলো”।

আচ্ছা, আপনি কী জাপানি টেলিভিশনের পক্ষ থেকে কুর্ট ভনেগাটের সাক্ষাৎকার নেন নি?

একদম, তিনি যখন ১৯৮৪ সালে পেন সম্মেলনে জাপানে এসেছিলেন তখন, তবে মজার বিষয় ছিল দুজন লেখকের মুখোমুখি হওয়া আলোচনা। ভনেগাট খুব সূক্ষ্ণ চিন্তাবিদ ছিলেন, গূঢ় ভাবনা নিয়ে ভনেগাতিয় হাস্যরসে সেসবের উপস্থাপন করতেন। আমি নিজেও তাঁর কাছ থেকে তেমন কিছুই বের করতে পারিনি।

আমার সৌভাগ্য বলতে, খুব সৎ মতামত পেয়েছি লেখকদের সাথে, আলাপচারিতার ফাঁকে। নোয়াম চামস্কি একবার আমাকে বলেছিলেন, যখন তিনি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে সাবালক হচ্ছেন তখন সেখানে ঘোষণা হচ্ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র এটম বোমা ফেলছে আর তাঁর মিত্ররা বিজয়োল্লাসে মেতে উঠেছে। সেদিন তারা চড়ুইভাতিও করেছিল, আর নোয়াম চামস্কি ছুটে চলে গিয়েছিলেন বনের ধারে, রাত না হওয়া পর্যন্ত আর ফিরে আসেন নি। আমি এমনিতেও চামস্কিকে শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু সেদিন তাঁর কাছ থেকে ওই কথা শোনার পর শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গিয়েছিল।

তরুণ থাকতে আপনি নিজেকে ‘অ্যানার্কিস্ট’ দাবী করতেন। এখনও কী তাই মনে করেন?

নীতিগতভাবে আমি একজন অ্যানার্কিস্ট। কুর্ট ভনেগাট একবার বলেছিলেন তিনি যিশুকে শ্রদ্ধা করেন কেননা তিনি অজ্ঞেয়বাদী। আর আমি একজন অ্যানার্কিস্ট যে কিনা গণতন্ত্র ভালোবাসে।

আপনার এই রাজনীতি সচেতনতা বা কর্ম কী আপনাকে কোন বিপদে ফেলেছিল?

এই মুহুর্তে এমন একটা পরিস্থিতিতেই আছি, ওকিনাওয়া লেখাগুলোর জন্য আমাকে অবমাননার মামলায় ডাকা হয়েছে। আমার স্মৃতিতে থাকা দ্বিতীয় ইউরোপীয় যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে এটম বোমার ব্যবহার আর ১৯৪৫ সালে ওকিনাওয়ায় গণ আত্মহত্যা। হিরোসিমা নিয়ে পূর্বের আর ওকিনাওয়া নিয়ে আমার পরের লেখাগুলো আছে। ওকিনয়াওয়া যুদ্ধের সময়ে, জাপানি সৈন্যরা স্থানীয়দের নির্দেশ দিয়েছিলেন ওকিনাওয়ার কাছাকাছি দুটো দ্বীপে আত্মহত্যা করতে। সৈন্যরা বলেছিল, আমেরিকান সেনারা এত নৃশংস ও ভয়াবহ যে, তারা মেয়েদের ধর্ষণ করবে, খুঁচিয়ে মারবে। তারা এও বলেছিল, আমেরিকানরা আসার আগেই আত্মহত্যা করা ভালো। সেসময় প্রতিটা পরিবারকে দুটো করে গ্রেনেড দেয়া হয়েছিল। আর যেদিন আমেরিকান সৈন্যরা এসেছিল, সেদিন পাঁচশরও অধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছিল। দাদার হাতে নাতি, স্বামীর হাতে স্ত্রী সেদিন খুন হয়েছিল, মরে তারা নিজেদের বাঁচাতে চেয়েছিল।

আমি তখন তর্ক করেছিলাম দ্বীপের এই মানুষদের মৃত্যুর জন্য দায়িত্বরত প্রতিরোধকারী সৈন্যদলই দায়ী। ওকিনাওয়া নোটস, প্রকাশ হয়েছিল বছর চল্লিশেরও আগে, কিন্তু দশ বছর আগে একটা জাতীয়তাবাদী চেতনা দানা বেঁধে উঠতে থাকে জাপানের লিখিত ইতিহাস বদলানোর জন্য, যেখানে ইতিহাস বই থেকে জাপানের বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এশিয়াতে করা নানজিং গণহত্যা আর ওকিনাওয়ার আত্মহত্যাকে মুছে দিতে বলা হয়েছিল। অনেক লেখাই ততদিনে বেরিয়ে গিয়েছিল ওকিনাওয়া গণ আত্মহত্যা নিয়ে, কিন্তু আমার বইটি তখন প্রিন্ট হচ্ছিল মাত্র।

ডানপন্থী উপদলগুলোর দরকার ছিল যেকোন একটা লক্ষ্যবস্তু, আর আমি হয়ে গেলাম সেই উদ্দেশ্য। এখনও যখন সেই সত্তরের দশকের সাথে আজকের দিনের তুলনা করি, দেখি এখনকার ডানপন্থীরা আগের চাইতেও বেশি জাতীয়তাবাদী আর সাম্রাজ্যবাদের পুনরুত্থানের পূজাকারী। তারা এটাই নিশ্চিত করতে চায় যে সেসময়ে দ্বীপের মানুষেরা সাম্রাজ্যবাদের মহত্ত্বে উদ্বেলিত হয়েই আত্মহত্যা করেছিল।

আপনার কী মনে হয় ১৯৯৪ সালে Order of Culture পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের আরাধনার বিপরীতে আপনি প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন?

পুরস্কার প্রত্যাখান আসলে চিনিয়েছে আমাকে সেইসব শত্রুদের, যারা আক্ষরিক অর্থেই দুষ্কর্মকারী, যারা জাপানের সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে লাভবান হয়েছে। তবে ভবিষ্যতের লেখকদের এমন কাজ করার ব্যাপারে আমার এই প্রত্যাখান কোন কাজে আসে নি যদিও।

আপনি ‘হিরোশিমা’ লেখাটি আর উপন্যাস A Personal Matter কাছাকাছি সময়ে ছাপিয়েছিলেন। কোনটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে?

হিরোশিমা নোটসই বলতে গেলে অর্থবহ ভূমিকা রেখেছে A Personal Matter থেকে, যদিও উপন্যাসটির ভূমিকা আমার কাছে বেশিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল – যদিও সেটা কল্পকাহিনী। আদতে এগুলোই ছিল আমার সাফল্যের শুরুতে প্রথম পদক্ষেপঃ হিরোশিমা নোটস ও A Personal Matter লেখা। মানুষের অভিযোগ আছে যে আমি আমার ছেলে আর হিরোশিমা এই দুইটি বিষয় নিয়েই বারবার লিখে যাচ্ছি। আমি খুবই বিরক্তিকর একটা মানুষ নিঃসন্দেহে। আমি অনেক সাহিত্য পড়েছি, কত কত বিষয় নিয়েই না ভেবেছি, কিন্তু আমার সমস্ত চিন্তার ভিত্তি যেন আমার সন্তান হিকারি আর হিরোশিমা।

হিরোশিমা নিয়ে যদি বলতে হয়, তবে আমি নিজে এই অভিজ্ঞতার মুখোমখি হয়েছিলাম, শুনেছিলাম ১৯৪৫ সালে যখন আমি মাত্রই শিশু আর বড় হচ্ছি শিকোকুতে, আর তারপর তো পারমাণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকেদের সাক্ষাৎকারই নিয়েছিলাম।

আপনার নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস কী লেখায় উঠে আসে?

উপন্যাসগুলোতে আমি সচেষ্ট থেকেছি কোন ভাষণ না দেয়া থেকে, কোন শিক্ষামূলক কথা প্রচার না করতে। কিন্তু গণতন্ত্র নিয়ে রচনাগুলোতে আমি চেষ্টা করেছি সেসব নিয়ে আসার। আনবিক অস্ত্রের ব্যবহারের প্রশ্ন আমার কাছে মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা। আনবিক অস্ত্র বিরোধী কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত ধরণের আনবিক অস্ত্রের বিপক্ষে। তেমন কিছুই আমরা করে উঠতে পারিনি, এমনকি আমার সম্পৃক্ততাও কাজে দেয়নি। অন্য কথায় বলতে গেলে এই আন্দোলন ব্যর্থ এক আন্দোলন।

এ বিষয়ে ষাটের দশক থেকেই আমার চিন্তাভাবনা একই রকম রয়ে গেছে। আমার পিতাদের প্রজন্ম আমাকে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে বেকুব ভাবত। সেই যুদ্ধের পঁচিশ বছর পরের ছেলেমেয়েদের মাঝে যুদ্ধ পূর্ব বা পরবর্তী গণতন্ত্র নিয়ে কোন ধারণাই নেই। তারা নিশ্চয়ই টি এস ইলিয়টের সেই লেখার সাথে একাত্মতা পোষণ করবে, “বুড়োদের বিজ্ঞতার কথা আমাকে শুনিয়ো না”। ইলিয়ট নিরিবিলি মানুষ ছিলেন, কিন্তু আমি তো তা নই – অন্তত আমি সেরকম ভাবি না।

লিখনশৈলীর ব্যাপারে আপনার কোন মতামত কী আছে?

আমি কাঁটাছেঁড়া করা লেখক। আমি সবসময় মুখিয়ে থাকি লেখাকে ঠিক রাখতে। আমার যেকোন পাণ্ডুলিপি দেখলেই বুঝবেন যে আমি কত বেশি কাটাকুটি করি, নতুন করে লিখি। তো আমার একটা সাহিত্যিক পদ্ধতি হচ্ছে, বারবার একই জিনিস লিখে লিখে আগের চাইতে ভিন্নতা আনা। লেখা শুরু করার ক্ষেত্রে আমার সতর্ক দৃষ্টি থাকে যেন আগের লেখাগুলোই ভিন্নভাবে লেখার, যেন কোনটার সাথে না মিলে যায় – এটা আসলে একই প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে আরেকবার ভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করে দেখার মতো। তারপর সেই খসড়ার উপরে আমার ব্যাখ্যা সাজাতে থাকি, যতক্ষণ না পুরানো লেখার কিছু অবশিষ্ট থেকে যায়। পুনারাবৃত্তির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন লেখা দাঁড় করানোই আমার ইচ্ছা থাকে।

এই জাতীয় বিশ্লেষণ, পুরানোকে ভেঙ্গে একদম নতুন কিছু বানানোই একজন ঔপন্যাসিকের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বলে আমি ভাবতে অভ্যস্ত। এডওয়ার্ড সাঈদ এ বিষয়ে দারুণ একটি বই লিখেছেন Musical Elaborations নামে, যেখানে তিনি এই ধরণের Elaboration বা ব্যাখ্যাকে বিবেচনা করেছেন, দেখিয়েছেন এই ব্যাখ্যা কী করে অসাধারণ সব সঙ্গীতজ্ঞ বাখ, বিটোফেন ও ব্রাহমে আছে। এই ব্যখ্যার মধ্য দিয়েই তারা নতুন সঙ্গীর রচনা করে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত দিতে পেরেছেন।

আপনি কী করে বুঝতে পারেন যে এই elaboration বা ব্যাখ্যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়ে পড়ছে?

এটা একটা সমস্যা বটে। এই elaboration বা লেখার সম্প্রসারণ, আমি বছরের পর বছর ধরে করে যাওয়ায়, আমার পাঠকও তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আমার লেখা জটিল থেকে জটিলতর হয়ে পড়ে, নানা বাঁক দেখা দেয়, লেখার রীতিটাই শেষে দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। এমনকি পনেরো বছর আগেও আমি সন্দিগ্ধ ছিলাম এই পদ্ধতি কোন ঔপন্যাসিকের কাজে দেবে কী দেবে না এই ভেবে, কিন্তু এটা করা আমার জন্য জরুরি ছিল, আমার লেখার নতুন পরিপ্রেক্ষিত দাঁড় করাতে, যাতে করে আমার লেখার উত্তরণ ঘটে।

প্রত্যেকটা লেখক বা লেখিকারই তাঁর লেখার ধরণের একটা নিজস্ব মৌলিকতা থাকে। এখানে এমন একটা গভীর বোধ থাকে, যেই বোধ পাণ্ডুলিপির শুরু থেকেই উপস্থিত। যখনই লেখক-লেখিকারা বিস্তৃত পরিসরে পাণ্ডুলিপির কাজ শুরু করেন, সেই গভীর জীবনবোধ আরো শক্তি নিয়ে, সহজবোধ্য হয়ে ধরা দেয়। ১৯৯৬/১৯৯৭ সালে আমেরিকার প্রিন্সটনে চাকুরি করার সময়, আমি মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিনের মূল পাণ্ডুলিপি দেখতে যেতাম। একশ কী তারও বেশি পৃষ্ঠা পড়ার পর ধীরে ধীরে অনুধাবন করলাম, টোয়েন মূলত প্রথম থেকেই একই কায়দায় লিখতেন। এমনকি যখন তিনি ভাঙ্গা ইংলিশে লিখতেন, তার মাঝেও সঙ্গীত থাকত। এটাই সবকিছু খোলামেলা করে দিতো। এই elaboration বা ব্যাখ্যা বা সম্প্রসারণ, একজন ভাল লেখকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আসে। একজন ভাল লেখক সাধারণত  তার এই দক্ষতা নষ্ট করতে চান না, কিন্তু আমি আমার বেলায় সবসময় সেটাকে নষ্ট করে দিতে চেয়েছি।

আপনি কেন এই গভীর কণ্ঠস্বর কিংবা বোধকে ধ্বংস করতে চান?

আমি জাপানি সাহিত্যের একটা নতুন ধারা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। ১২০ বছরের আধুনিক জাপানি সাহিত্য, কখনই এই elaboration বা সম্প্রসারণের দিকে মোড় নেয়নি। জাপানি সাহিত্যিকদের দিকে দেখলে, যেমন তানিজাকি ও কাওয়াবাতা, ধ্রুপদী সাহিত্যরীতিতেই লিখে গিয়েছেন। জাপানি সাহিত্যের স্বর্ণযুগের সাথে মিলিয়ে, ঐতিহ্যবাহী জাপানি পদ্যের নিখুঁত সৌন্দর্য ছোট ছোট স্তবকে লেখার যে ঐতিহ্য – টংকা এবং হাইকুর রীতি অনুসরণ করে তারা লিখে গিয়েছেন। আমি এই ঐতিহ্যকে সম্মান করি, যদিও আমি চেয়েছিলাম কিছুটা ভিন্নমত করে লিখতে।

বাইশ বছর বয়সে, ফরাসি সাহিত্যের ছাত্র থাকা অবস্থায়, আমার প্রথম উপন্যাস লেখা হয়। যদিও আমি জাপানি ভাষায় লিখি, তবুও আমার ফরাসি এবং ইংরেজি উপন্যাস ও কবিতার প্রতি ঝোঁক ছিল, যেমনঃ গাসকার ও সার্ত্রে, ওডেন আর ইলিয়ট। প্রতিনিয়ত আমি ফরাসি ও ইংরেজি সাহিত্যের সাথে জাপানি সাহিত্যের তুলনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় তখন আট ঘন্টা পড়তাম, আর জাপানি ভাষায় দুই ঘন্টা লিখতাম। ভাবতাম, কী করে একজন ফরাসী লেখক এই বিষয়কে প্রকাশ করবেন? কীভাবে একজন ইংরেজ লেখক এর ব্যাখ্যা করবেন? বিদেশি ভাষায় পড়ে, মাতৃভাষায় লিখে, আমি আসলে একটা জাপানি সাহিত্যের সাথে অন্য সাহিত্যের সেতুবন্ধন করতে চাইতাম। কিন্তু দিনে দিনে আমার লেখা অবোধ্য হতে লাগলো।

ষাট বছর বয়সে এসে আমার মনে হলো, আমার পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে, সাহিত্য সৃষ্টি নিয়ে আমার ধারণা ভুল হতে পারে। আমি এখনও, কাগজে সামান্য জায়গা থাকলেও ভাব সম্প্রসারণ করতে থাকি। তবে আমি এখন দ্বিতীয় ধাপে যে কাজটা করি তা হচ্ছে, পুরো সম্প্রসারণটার একটা স্পষ্ট ভাষ্য তৈরি করে ফেলি। Celine এর মতো যেসব লেখক আছেন, তাদের সবাইকে আমি শ্রদ্ধা করি, যারা একই সাথে জটিল পদ্ধতি ও সহজবোধ্য রীতিতে লিখতে পারেন। আমার বই, Pseudo-Couples Trilogy: Changeling, The Child of the Sorrowful Countenance এবং Goodbye তে, এই পদ্ধতিতে লিখেছি। সহজবোধ্য রীতিতে আমি লিখেছি Rouse Up O Young Men of The New Age, যদিও এটা অনেক পুরনো গল্প সংকলন। এখানে আমি মনের গভীর হতে উঠে আসা নিজস্ব বোধ (Deep Voice) শোনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সমালোচকরা তবুও আমার এই জটিল কাঠামো বিন্যাস ও কঠিন বাক্যের জন্য ভর্ৎসনা করেছেন।

এ তিনপর্বের বইটিকে ‘ছলনাময়ী দম্পতিরা (Pseudo-Couples )’ নামকরণ করার কারণ কী?

একজন স্বামী ও একজন স্ত্রী হচ্ছে সত্যিকার দম্পতি, কিন্তু আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি, Pseudo-couples। এমনকি আমার কাজের শুরুতেও, পূর্ণ দৈর্ঘের উপন্যাস Nip The Bud, Shoot the Kids বইয়ে বর্ণনাকারী ও তার ছোট ভাইও কিন্তু ছলনাময়ী দম্পতি। এইসব অদ্ভূত জোড়ার যে পারস্পরিক আকর্ষণ বিকর্ষণের বৈশিষ্ট্য আছে, তা আমি আমার প্রায় সবকটি সাহিত্যকর্মেই নিয়ে এসেছি বলে অনুভব করি।

আপনার কিছু বইতে আপনি অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায়, আপনারই পড়া কবিদের মোহমুগ্ধ কবিতার বিস্তৃত পরিপ্রেক্ষিত, গদ্যে এনে হাজির করেছেন। In Rouse Up O Young Men of the New Age উপন্যাসে কবি ব্লেইক; Somersault উপন্যাসে কবি আর এস টমাস এবং An Echo of Heaven উপন্যাসে কিম চি হাই এর কবিতা থেকে গদ্যে রুপান্তর হয়েছে। এটা কী কোন প্রয়োজনে লেগেছে?

উপন্যাসের বেলায় আমার ধারণাগুলো, একই সময়ে পড়তে থাকা বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের বোধের সাথে লীন হয়ে যায়। এই পদ্ধতিতে আরেকটা ব্যাপার ঘটে; আমি আমার পছন্দের লেখকদের কথা পাঠকদের জানাতে পারি। আমার কুড়ি বছর বয়সে আমার গুরু কাজৌ ওয়াতানাবে বলেছিলেন যে, তুমি যেহেতু সাহিত্যের প্রভাষক হতে চাচ্ছ না, তখন তোমার একটাই কাজ নিজেকে জানতে থাকা। আমার দুই ধরণের পাঠ ছিল – একটা পাঁচ বছর মেয়াদি আরেকটা তিন বছর মেয়াদি। পাঁচ বছর মেয়াদি পাঠের বিষয়বস্তু ছিল বাছাই করা কোন লেখক বা চিন্তাবিদের উপর গবেষণা, আর তিনবছর মেয়াদি পাঠের বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট কোন বিষয়। পঁচিশ বছর বয়স থেকেই আমি এসব করছি। বারোবার আমি তিন বছর মেয়াদি পাঠ শেষ করেছি। এই একক কাউকে নিয়ে কাজ করার সময় আমি উদয়াস্ত পড়েছি। সেই লেখক বা চিন্তাবিদের সমস্ত বই, সমস্ত বক্তব্য, সব ধরণের সমালোচনা, স্বীকৃতি, অস্বীকৃতির পূর্ণ পাঠ শেষেই আমি সন্তুষ্ট হয়েছি।

যদি আমার ভিন্ন ভাষায় কিছু পড়তে হয়, ধরো ইলিয়টের ‘ফোর কোয়ার্ট্রেস’ – তাহলে একটা পরিচ্ছদ ইংরেজিতে পড়তে আমি প্রথম তিনমাস সময় নেবো, যেমন ‘ইস্ট কুকার’ পরিচ্ছদটা আমি বারবার পড়তে থাকব যতক্ষণ না এটা আমার ইংরেজিতে সম্পূর্ণ মুখস্থ হয়। তারপর জাপানে অনুবাদ হওয়া সবচেয়ে সেরা অনুবাদটা পড়ে পড়ে সেটাও নিজের ভাষায় মুখস্থ করে নেবো। তারপর আমি একবার ইংরেজি, আরেকবার জাপানি ভাষায় কবিতার রস আস্বাদন করতে থাকব ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না আমার স্বতঃউৎসারিত ভাবনা, জাপানি ভাষায় অনূদিত কবিতা আর কবির লেখা ইংরেজির ভাবের সাথে খাপে খাপে মিলে যাবে। আর তা হলেই, ইলিয়ট এসে নিজেকে প্রকাশ করবেন আমার লেখায়।

এই বিষয়টা দারুণ যে, আপনি আপনার পড়াশোনা ও সাহিত্যতত্ব, আপনার পাঠ প্রক্রিয়ায় যোগ করেছেন। আমেরিকাতে সাহিত্য সমালোচনা আর মৌলিক লেখা, দুটোরই প্রায় সব জায়গাতেই আলাদা আলাদা করে, আকাশচুম্বী কদর।

আমি প্রায় সমস্ত পণ্ডিতদেরই সম্মান করি। যদিও উনাদের কাজের জন্য জায়গাটা খুব ছোট হয়ে গিয়েছে, তথাপি উনারা নির্দিষ্ট কিছু পন্থা বের করে ফেলেছেন অল্পকিছু লেখককে বিবেচনা করার ব্যাপারে। একজন প্রসারিত চিন্তাভাবনা ও প্রবল অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ঔপন্যাসিকের, এমন এক শাণিত বিবেচনাবোধ তৈরি থাকে যাতে করে, আরেকজন লেখকের লেখা সহজবোধ্যভাবে সে বুঝতে পারে।

আমি যখন ব্লেইক, ইয়েটস, দান্তে পড়াশোনা করছি, তখন আমি তাদের সমস্ত লেখায় মনোযোগ দিয়েছি, এমনকি তাদের বিষয়ে বিভিন্ন পণ্ডিতজনের লেখা, মতৈক্য-মতানৈক্যের বিতর্কগুলোও যোগাড় করেছি। সেখান থেকেই আমার প্রায় সব শেখা। প্রতিবছরই কেউ না কেউ দান্তেকে নিয়ে পড়ে, ভিন্ন পদ্ধতিতে বিচার করে ডিগ্রি নিয়ে বেরোচ্ছে, আর সেই বিষয়ে বই প্রকাশ করছে। আমি এদের সবার লেখাই বছর জুড়ে পড়তাম – একজনের পর একজন, প্রতিজনের লেখা এক বছর করে করে।

আপনি যে বিষয়টা নিয়ে পড়বেন সেটা বেছে নিতেন কী করে?

মাঝে মাঝে বিষয়টা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতই, স্বাভাবিকভাবে হয়ে যেতো, যেমন – ব্লেইককে আমি পছন্দ করি, উনাকে পড়তে পড়তেই জানতে পারি ইয়েটস এর কথা, আর ইয়েটস আমাকে পথ দেখান দান্তের। অন্যসময় এটা অনেকটা কাকতালীয় ব্যাপারই বটে। আমি একটা প্রচারণায় গ্রেট ব্রিটেনে গিয়ে, তিনদিনের জন্য ওয়ালশে থামতে হয়েছিল। সাথে আনা বই ফুরিয়ে গেলে, আমি কাছের একটা বইয়ের দোকান গেলাম। সেখানে কাজ করা একজনকে বললাম, আমাকে কিছু ইংরেজি লেখকের লেখা পড়ার ব্যাপারে পরামর্শ দেবেন কী না! তিনি আমাকে আশেপাশের এলাকার এক কবির একটা সংগ্রহ ধরিয়ে দিলো, কিন্তু এই বলে সতর্ক করে দিলো যে এর লেখা খুব একটা বেচা যাচ্ছে না। আমি দোকানে থাকা, সেই কবি আর এস টমাসের, সমস্ত বই কিনে ফেললাম। আমি পড়া শুরু করার পর বুঝতে পারলাম, এই কবি আমার সেই সময়কার জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কবি। ওয়াল্টার বেনজামিনের সাথে উনার অনেকগুলো বিষয়ে মিল পেলাম, যদিও তারা দুজন ভিন্নধারার কবি। দুজনই পার্থিব-অপার্থিবের মধ্যে একটা দরজা খুঁজে পাওয়ায় সচেষ্ট ছিলেন। আমি বেনজামিন ও টমাসের সাথে ত্রিমাত্রিক সম্পর্কে বাঁধা পড়লাম।

শুনে মনে হচ্ছে আপনি যখন ভ্রমণে থাকেন, বেশিরভাগ সময় হোটেলেই কাটিয়ে দেন!

হ্যাঁ, এটা সত্য। আমি সামান্য ঘোরাফেরা করি, আর আমার ভাল খাবারের প্রতি মোহ নেই। পানাহারও আমার পছন্দ, কিন্তু আমি বারে যাই না, সেখানে আমার মেজাজ ঠিক থাকে না, পরিণতি ঝগড়ায় গড়ায়।

কী করে আপনি ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন?

জাপানে যখনই কোন বুদ্ধিজীবীর সাথে আমার দেখা হয়ে যায়, আর তাদের কথায় সাম্রাজ্যবাদের বন্দনা শুনি, সেই মুহূর্ত থেকেই আমি তাকে বিরক্ত করতে থাকি, বিষয়টা যতক্ষণ না সহ্যের সীমা ছাড়ায়। তবে অবশ্যই প্রচুর মদ্যপান করলেই এমন ঘটে।

জাপানের বাইরে ঘুরতে যেতে ভাল লাগে আপনার?

কোন লেখা পড়ার সবচাইতে সেরা উপায় হচ্ছে, যেখানটা নিয়ে সেই লেখাটা আবর্তিত হয়েছে সে জায়গায় গিয়ে পড়া। সেন্ট পিটার্সবুর্গে বসে দস্তয়ভয়স্কি পড়া। বেকেট আর জয়েসকে ডাবলিনে বসে পড়া। বিশেষত Unnameable Needs অবশ্যই ডাবলিনে থেকে পড়া দরকার। যদিও বেকেট দেশের বাইরে থেকেই লিখতেন, কিন্তু পটভূমি তো ডাবলিন। এই দিনগুলিতে আমি যখনই ভ্রমণ করি, সাথে করে বেকেটের তিনখণ্ড নিয়ে যাই, যার শেষটা ঘটে Unnameable Needs দিয়ে। আজ পর্যন্ত এই বইটি আমার, একঘেয়ে লাগে নি।

এখন আপনি কী বই পড়ছেন?

১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে লেখা, ইয়টসের শেষ সময়কার কিছু কবিতা পড়ছি। ইয়েটস পৃথিবী ছেড়েছিলেন তিয়াত্তর বছর বয়সে। আমার বয়স বায়াত্তর আর আমি এখন খুঁজে খুঁজে পড়ি, আমার বয়সে তিনি কেমন ভাবতেন। ইয়টসের একাত্তর বছর বয়সে লেখা আমার একটা প্রিয় কবিতা হচ্ছে, An Acre of Grass। আমি বারবার সে কবিতা পড়েছিলাম, যেন সেখান থেকে আরো প্রসারিত চিত্তে, আরো নিমগ্ন হয়ে ভাবতে পারি। আমার পরের উপন্যাসটা হবে কিছু পাগল বুড়োদের নিয়ে, একজন লেখক আর একজন রাজনীতিবিদও থাকবে, আর থাকবে, তাদের কিছু উদ্ভট কিছু চিন্তাভাবনা।

ইয়েটসের একটা বিশেষ লাইন আছে, যেটা আমাকে ধাক্কা দেয়, ‘কোন প্রলোভনে আর আমি নেই” (My temptation is quiet)।  জীবন নিয়ে অনেক প্রলোভনই হয়ত আমার ছিল, কিন্তু ওই যে ইয়েটস বলেছিলেন, ‘বুড়ো মানুষের ক্ষ্যাপামি (An Old Man’s Frenzy)। ইয়েটস অস্বাভাবিক কিছু করার মানুষ ছিলেন না, জীবনের শেষে এসেও উনি নিৎসেকে আবার পড়তে শুরু করেছিলেন। নীৎসে, প্লেটোকে উদ্বৃতি করতেন, যেখানে তিনি বলতেন, প্রাচীন গ্রীকের সমস্ত চমৎকার বিষয়গুলো এসেছে – প্রবল উত্তেজনা বা সাময়িক উন্মত্ততা অথবা স্রেফ পাগলামি থেকে।

আগামীকাল আমি নিৎসেকে নিয়ে দুই ঘন্টা পড়ব, যেন বুড়োদের পাগলামো নিয়ে নতুন কোন পরিপ্রেক্ষিত জানতে ও জানাতে পারি, তবে সেটা আমি করব নিৎসেকে পড়তে গিয়ে তার মাধ্যমে ইয়েটসকে অনুধাবন করতে। নীৎসের দর্শন দিয়ে ইয়েটসের কাব্যকে বুঝতে গিয়ে, নতুন এক নিৎসেকে বোঝা যাবে।

আপনি যেভাবে লেখকদের ত্রিমাত্রিক প্রিজমে এই পৃথিবীকে দেখেন, আপনার পাঠকেরাও কী আপনার লেখায় একই জিনিস ধরতে পারে?

আর এস টমাস, ইয়েটস অথবা ওডেন যখন আমি গভীর উত্তেজনা নিয়ে পড়ি, তখন আমার পৃথিবীকে বোঝার একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু যেটা বললেন লেখকদের এমন কোন প্রিজম আসলে থাকে না যেটা দিয়ে আপনি পৃথিবীকে বুঝে ফেলবেন। একজন ঔপন্যাসিক খুবই সাধারণ মানুষ। এটা অনেকবেশি পার্থিব অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। পার্থিবতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। উইলিয়াম ব্লেইক এবং ইয়েটস – তারা অসাধারণ।

আপনি কি হারুকি মুরাকামি বা ব্যানানা ইউশিমতোর সাথে কোন প্রতিযোগীতা অনুভব করেন?

মুরাকামি খুব সহজ, স্বচ্ছ জাপানি ভাষায় লিখেন। তাঁর লেখা বিদেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে এবং বিশেষ করে চায়না, ইংল্যান্ড আর আমেরিকায় সেই লেখার একটা বড় পাঠকশ্রেণি রয়েছে। বিশ্বসাহিত্যে মুরাকামি এমন একটা জায়গায় রয়েছে, যেখানে ইউকিউ মিশিমা বা আমি পৌঁছাতে পারিনি। আর এটা জাপানি সাহিত্যে এই প্রথম ঘটেছে। আমার লেখাও মানুষ পড়েছে, কিন্তু এখন যখন পিছনে ফিরে তাকাই দেখি, আমি তেমন কোন পাঠকশ্রেণি তৈরি করতে পারিনি, এমনকি সেটা জাপানেও না। এটা কোন প্রতিযোগিতা নয়, তবুও আমি চাই আমার লেখাও ফরাসি, ইংরেজি আর জার্মান ভাষায় অনূদিত হোক, সেসব দেশগুলোতেও আমার একটা পাঠকশ্রেণি তৈরি হোক। সব মানুষের কাছে পৌঁছাবার ধৃষ্টতা আমি করি না, তবুও চাই কিছু মানুষ আমাকে পড়ুক, সাহিত্য নিয়ে, জীবন নিয়ে যে সমস্ত চিন্তাভাবনা সুগভীরভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে, তা সবাই জানুক। কেউ যদি সারাজীবন সাহিত্য নিয়ে সাধনা করে, তবে আমি ধরে নিতে পারি – আমার চোখে গুরুত্বপূর্ণ লেখকেরাও তাদের চোখে গুরুত্বপূর্ণ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আমি প্রথমে বাছাই করে নেবো এডওয়ার্ড সাঈদকে, অন্তত তার শেষের রচনাগুলোর ব্যাপারে। যদি দেখো আমি কারুর কথা শুনছি না, তবে জেনে রেখো তখন আমি সাঈদকেই ভাবছিলাম। তাঁর ভাবনাগুলোর আমার লেখায় একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের সবার ভাব এবং চিন্তাধারা জাপান ও জাপানি ভাষায় নতুন করে প্রয়োগ করতে আমাকে সাহায্য করেছে। সাঈদকে আমি ব্যক্তিগতভাবেও পছন্দ করি।

মিশিমার সাথে আপনার সম্পর্ক তো  বিপরীতমুখ।

তিনি আমাকে ঘৃণা করতেন। আমি যখন Seventeen প্রকাশ করি, তখন মিশিমা আমাকে ‘ভালো লেগেছে’ বলে চিঠি লিখেছিলেন। কারণ গল্পটা ছিল একটা ডানপন্থী ছাত্রকে নিয়ে, আর মিশিমা ভেবেছিলেন আমি এতে করে শিন্টোইজম, জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পথে আগাচ্ছিলাম। আমি কোনদিনও মনে প্রাণে সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেই নি। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম, বুঝতে চেয়েছিলাম সেই আচরণগুলোকে যে, কেন একজন ছাত্র বাড়িঘর ছেড়ে সন্ত্রাসের পথে চলে যেতে পারে। আমি এখনও এটা নিয়ে ভাবি।

মিশিমার এক চিঠিতে যেটা তার পত্র সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তিনি আমি দেখতে কুৎসিত বলে তার বিস্মিত হবার কথা পাওয়া যায়। সাধারণত কেউ এমন করে কাউকে অপমান করে না। উদাহরণের জন্য বলি  নবোকভের পত্রগুলোতেও, যাদের অপমান করে লেখা হয়েছে, সেসব দুইপক্ষের মৃত্যুর পরেই ছাপানো হয়েছিল। মিশিমা আসলে প্রকাশকদের কাছে এক ধরণের ঈশ্বরের জায়গায় ছিলেন, তিনি যা চাইতেন তাই ছাপানো হতো।

আপনি নাকি একবার মিশিমার স্ত্রীকে ‘একটি শাউয়া’ বলে সম্বোধন করেছিলেন কোন অনুষ্ঠানে, এটা কী সত্যি?

পুরাই সাজানো নাটক। জন নাথান Teach Us to Outgrow Our Madness বইয়ের ভূমিকায় এই বিষয়টা নিয়ে লিখেছেন। তিনি একজন রাগী, কলঙ্কময় তরুণ বয়সী লেখকের প্রতিচ্ছবি আঁকতে চেয়েছিলেন। মিশিমা আর আমার দু’বার প্রকাশনা উৎসবে দেখা হয়েছিল, সেখানে খানসামারা মদ হাতে ছোটাছুটি করছিল, কোন লেখকই আসলে সেরকম পরিবেশে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারেন না। আর মিশিমা তখন আমাদের সবচাইতে প্রধান লেখক। সুতরাং তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আসা ছিল অসম্ভব। জন নাথানের কথা মতে, সেই গালিটা আমি শিখেছিলাম নোমান মেইলার এর কাছ থেকে। কিন্তু আমি এই শব্দটা আগে থেকেই জানতাম – কারণ আমি বড় হয়ে উঠেছি আমেরিকানদের আশেপাশে, আর তারা এই শব্দটা জাপানি মেয়েদের দেখলেই বলত। একজন আত্মনির্ভরশীল দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে আমি এমন শব্দ উচ্চারণ করতেই পারি না। আর তারপরেও যদি আমি কাউকে ঘৃণা করেও থাকি, তবুও সে কারণে তাঁর স্ত্রীকে আমি আক্রমণ করে এমন কথা বলতে পারি না। প্রয়োজনে আমি তার মুখের উপর যা বলার বলবো। এই ঘটনার জন্য আমি জন নাথানকে কখনই ক্ষমা করিনি, যদিও তাঁর করা সেই বইটির অনুবাদ আমার পছন্দ।

নাথান তো আপনার অনেকগুলো বই অনুবাদ করেছেন। একজন লেখকের লেখা কী সত্যিই অনুবাদ করা যায়?

এখন পর্যন্ত হওয়া সবগুলো অনুবাদই আমার ভাল লেগেছে। প্রত্যেক অনুবাদকের একটা নিজস্ব স্বর আছে, কিন্তু আমি দেখেছি উনারা আমার লেখায় একাত্ম হতে পেরেছেন। আমি নাথানের অনুবাদ পছন্দ করি, কিন্তু ফরাসী ভাষার অনুবাদই সর্বাধিক ভাল লেগেছে।

এই ভাষাগুলো একজন পাঠক হিসেবে আপনি কতদূর বুঝতে পারেন?

ফরাসি আর ইংরেজি আমি বিদেশি হিসেবেই পড়ে থাকি। ইটালিয়ান ভাষায় পড়তে আমি দীর্ঘ সময় নেই, কিন্তু যখন আমি পড়তে থাকি তখন মনে হয় আমি ধীরে ধীরে অর্থগুলো আয়ত্ত করতে পারছি। ইতালি ভ্রমণের সময় আমি রেডিওতে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম, আর আমাকে দান্তে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি দান্তের Divine Comedy এখনও পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে। সাক্ষাৎকারীক দাবী করেছিলেন, কোন জাপানিজের পক্ষেই এই রচনার মর্মোদ্ধার করা বা অন্তর্নিহিত সঙ্গীতকে বোঝা সম্ভব নয়। আমি ‘না’ বলেছিলাম, বলেছিলাম পুরোপুরি না হলেও কিছু বিষয়ে আমি দান্তের কণ্ঠস্বর বুঝতে পারি। সাক্ষাৎকারীক আমার উত্তর শুনে খুব অখুশি হয়েছিলেন, আর বলেছিলেন এটা অসম্ভব। তিনি আমাকে দান্তে থেকে আবৃত্তি করতে বলেছিলেন। আমি মনে হয় পুরগাতরীয় থেকে প্রথম পনেরো লাইন আবৃত্তি করেছিলাম। তিনি রেকর্ডপ্লেয়ার বন্ধ করে দিয়ে বলেছিলেন, আপনি হয়ত বিশ্বাস করেন এটা ইতালিয়ান, কিন্তু আসলে তা নয়।

এমন অনেক লেখক আছেন যারা লেখালেখির জন্য নিঃসঙ্গতার ঘোরে থাকেন, কিন্তু আপনার রচনায় যারা বর্ণনায় থাকেন, তারা নিজেরাও লেখক, দেখা যায় বসার ঘরে সোফায় বসে বসে লেখা ও পড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনি কী বাসার কাজে সহযোগিতা করেন?

আমার কাজ করার জন্য নির্জনতা মুখ্য নয়। আমি যখন কিছু পড়ছি বা লিখছি, তার জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকার অথবা নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি না। সাধারণত আমি আমার বসার ঘরে যেখানে হিকারি গান শোনে, সেখানে বসেই কাজ করি। আমি যেহেতু লেখায় বারবার কাটাকুটি করি, তাই হিকারি বা আমার স্ত্রীর উপস্থিতি কোন সমস্যা তৈরি করে না। উপন্যাস অপূর্ণাঙ্গই থাকে, কারণ আমি জানি, আমি সেটাকে ঘষামাজা করেই চূড়ান্ত করব। যখন আমার প্রথম খসড়া লেখা হয়, এমন না যে তা নিয়েই পুরোটা লিখতে হবে। কিন্তু যখন আমি ঘষামাজা করতে থাকি তখন শব্দগুলো আমার সাথে এক সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, আর আমার একাকী থাকার প্রয়োজন পড়ে না।

দ্বিতীয় তলায় আমার একটা পড়ার ঘর আছে, কিন্তু সেখানে আমার খুব একটা কাজ করা হয় না। তখনই আমি সেখানে কাজ করি, যখন একটা উপন্যাসে শেষ তুলির আঁচড় দিতে হয় – অনেকের কাছে যেটা ‘অহেতুক উৎপাত’ ছাড়া আর কিছু নয়।

আপনার একটা রচনায় আপনি লিখেছিলেন, মাত্র তিন ধরণের মানুষের সাথে আলাপচারিতায় যাওয়া যায় – সেই মানুষ যিনি অনেক বিষয় সম্বন্ধে সম্যক ধারণা রাখেন, বা, সেই মানুষ যিনি কোন নতুন জগতে গিয়েছিলেন, অথবা এমন মানুষ যাদের অদ্ভূত, অভূতপূর্ব কোন অভিজ্ঞতা হয়েছে। এদের মধ্যে আপনি কোন মানুষ?

আমার একজন বন্ধু আছে, যিনি অসাধারণ একজন সমালোচকও – যিনি বলতেন আমার সাথে সংলাপের সম্পর্ক নেই। তিনি বলেছিলেন, ওয়ে, কখনও কারো কোন কিছু শুনে না, সে শুধু তাই করে যা তার মস্তিষ্কজাত। আমি অবশ্য এটা বিশ্বাস করি না। আবার এও সত্যি যে, আমি এমন কেউ নই যে, কেউ আগ্রহ নিয়ে আমাকে শুনবে। আমি তাৎপর্যপূর্ণ অনেক কিছুই দেখিনি। আমি নতুন কোন জগতেও যাই নি। আমার অদ্ভূত, উদ্ভট কোন অভিজ্ঞতাও নেই। তবে আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতাই আমি লিখি, বারবার ঘষামাজা করি, তারপর নতুন করে সেইসব অভিজ্ঞতা হৃদয়ঙ্গম করি।

আপনার বেশিরভাগ সাহিত্যকর্ম আপনার ব্যক্তিজীবনকে ঘিরে। আপনি এটাকে কী জাপানি I-Novel (জাপানি সাহিত্যের ধরন, যেখানে লেখক তার নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া বিষয়কে লেখায় যুক্ত করেন) এর ধারাবাহিকতা বলবেন?

I-Novel এর ক্ষেত্রে, জাপানে উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, হোমেই ইওয়ানো নামে একজন লিখতেন, তিনি আমার প্রিয় লেখকদের একজন। একটা প্রবাদ ছিল, যা তিনি প্রায়শই ব্যবহার করতেন, “আশাহীনতাই বর্বর সাহস যোগান দেয়”। কিন্তু I-Novel আসলে সেইসব অনাকাঙ্ক্ষিত, অস্বাভাবিক ঘটনা, যা একজন লেখকের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাঁধা দেয়, যেমন – সুনামি, ভূমিকম্প, মায়ের মৃত্যু কিংবা স্বামীর মৃত্যু। কোন ব্যক্তিমানুষের সমাজে কী জাতীয় অবস্থান হবে, তা নিয়ে I-Novel কোন প্রশ্ন উত্থাপন করে না। আর আমার লেখা শুরু হয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে, যা শেষাবধি সামাজিক সমস্যা দেখানোয় এগিয়ে চলে।

ডিকেন্স ও বালজাক, পৃথিবীকে বিষয়গত ধরে নিয়ে লিখেছেন। তারা অনেক মহত্ত্ব নিয়ে, খোলামনে লিখেছেন। আমার বেলায় জগতকে আমি দেখি আমার চোখ দিয়ে, সেখানে গুরুত্ব নিয়ে আসে কীভাবে আমি গল্পকে বর্ণনা করব, আর কী করেই বা আমি সঠিক কণ্ঠস্বরকে খুঁজে পাবো। এরপর আসলে আমার চরিত্ররা আসে।

আপনার সমস্ত উপন্যাসগুলোই কী তাহলে আপনার ব্যক্তি অভিজ্ঞতার টানাপোড়ন?

উপন্যাস লেখার আগে থেকেই আমি কোন চরিত্র বা সংলাপ বা ধারণার বশে নির্ধারণ করি না। সেসব আসে যেটাকে আমি বকি সম্প্রসারণ বা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই ভাব সম্প্রসারণ আর ঘষামাজার মধ্য দিয়েই, নতুন নতুন পরিস্থিতি আর চরিত্ররা তৈরি হতে থাকে। এটা স্বাভাবিক জীবনের চাইতে ভিন্ন একটা তল। এই তলে ঘটনা আর চরিত্ররা নিজেরাই বেড়ে উঠতে থাকে।

তবে, আমার লেখায় আমার ব্যক্তিজীবনের কিছু অংশ তো এসেই যায়। আমি একজন তরুণ হিসেবে, একজন মধ্যবয়সী মানুষ হিসেবে, একজন প্রৌঢ় হিসেবে, একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত ছেলের বাবা হিসেবে যা ভাবি সেগুলোও আমার লেখায় আসে বৈকি। আমি উত্তম পুরুষের বিপরীতে, প্রথম পুরুষে বর্ণনার ধারা বজায় রাখি। এটা বেশ বড় একটা সমস্যা। একজন সত্যিকার ঔপন্যাসিক উত্তম পুরুষে লিখতে পারেন, কিন্তু আমি এই বিষয়টায় কখনও স্বাছন্দ্য বোধ করিনি। সেদিক থেকে আমি, শিক্ষানবিশ ঔপন্যাসিক।  যদিও অতীতে আমার কিছু লেখা আছে উত্তম পুরুষে, কিন্তু সেগুলোতে ঘুরেফিরে আমার কথাই এসেছে। এর কারণ আমি আমার ভেতরের বোধগুলোকে প্রথম পুরুষেই পূংখানুপুংখভাবে ব্যক্ত করতে পারি।

আমি, Aghwee the Sky Monster বইতে, উদাহরণ হিসেবে বলছি, এমন একজনকে নিয়ে লিখেছি যেখানে হিকারি আর আমি দুজনেই উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু হিকারিকে নিয়ে আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সে তার চাইতে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। Aghwee’র বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি তার মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুকে বাঁচাতে কোন সাহায্য করবেন না। আবার A Personal Matter বইতে, প্রধান চরিত্র – বার্ড, সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সে এরকম প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়েই বাঁচতে চায়। দুটো বই প্রায় একই সময়ে লেখা হয়েছিল। এইক্ষেত্রে বলা যায়, এটা পশ্চাৎপদতা ছিল। Aghwee আর Bird কে নিয়ে লেখার সময়, আমি স্পষ্টতই আমার জীবনধারা Bird এর মতোই পরিচালিত করেছিলাম। এটা আমি ইচ্ছে করে করিনি তখন, কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারি সেসময় আসলে আমি কী করেছিলাম।

হিকারি আপনার লেখায় প্রায়শই চরিত্র হিসেবে এসে উপস্থিত হয়!

চুয়াল্লিশ বছর ধরে আমি হিকারিকে নিয়ে থাকছি, তাকে নিয়ে লেখা আমার সাহিত্য প্রকাশের অন্যতম স্তম্ভ। এর কারণ হচ্ছে মানসিকভাবে একজন মানুষ কী করে নিজেকে বুঝতে পারে, আর সেটা কতটুকু জটিল ও কষ্টসাধ্য, আমার লেখায় তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। খুব ছোট থাকতেই সে তার নিজেকে, তার মানবিক দিকগুলোকে সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করত। একটা নির্দিষ্ট বয়সে, সে তার দুঃখবোধ সঙ্গীতের মাধ্যমে বোঝাতে পারত। সে তার মত করেই একরকম আত্মোপলব্ধিতে পৌঁছেছিল। আর সে সেই পথে তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।

আপনি একসময় বলেছিলেন, হিকারির সমস্ত কথাই আক্ষরিক অর্থেই আপনি লিখেন, কিন্তু প্রকাশটা ভিন্ন থাকে।

হিকারির বলা প্রতিটা পূর্বাপর শব্দের, আমি হুবহু অনুলিপি করি। তাতে আমি বিষয়ানুগ পরিস্থিতির পাশাপাশি, অন্যেরা কী করে তাকে সাড়া দেয় সেই বিষয়গুলো সাজাই। আর এভাবেই হিকারির কথাগুলো সহজবোধ্য একটা রূপ পায়। আমি তার কথা বোঝাতে গিয়ে কোন শব্দকেই আগুপিছু করিনি কখনও।

আপনার উপন্যাসে হিকারির এমন সরব উপস্থিতিতে আপনার অন্য সন্তানেরা কী মনে করে?

আমার ছেলে ও-চান এবং মেয়ে নাৎসুমিকে নিয়েও আমি লিখেছি। এর মধ্যে শুধু নাৎসুমিকুই হিকারিকে নিয়ে লেখাগুলো পড়ে। আমাকে অত্যন্ত সাবধানে এসব করতে হয়, কারণ হিকারি আমাকে ফিরতি কিছু জিজ্ঞেস করবে না ঠিকই, কিন্তু নাৎসুমিকু আমাকে ছেড়ে কথা বলবে না।

আপনি কেন চরিত্রদের সত্যিকার নাম ব্যবহার করেন, এই যেমন – হিকারির নাম?

প্রথমদিকে আমি তার নাম লিখতাম না। Eeyore নামেই আমার উপন্যাসে হিকারি উল্লেখ থাকত। কিন্তু বাস্তবজীবনে আমি তাকে  Pooh বলে ডাকি।

কেন?

Winnie-the-Pooh গল্পটি ছিল, আমার স্ত্রীকে বিয়ে করার কারণ। যুদ্ধ শেষ হবার ঠিক এক বছর আগে Winnie-the-Pooh অনুবাদ বাজারে আনেন অত্যন্ত বিদ্বান ব্যক্তি ইওনামি সোতেনের প্রকাশনা। কয়েক হাজার বইই এসেছিল বাজারে। উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই আমি আমার স্ত্রীর বড় ভাই জুজোকে ইটামি স্কুল থেকেই চিনতাম। তাদের মা আমাকে পুহ কর্ণার থেকে The House বইটি যোগাড় করে দিতে বলেন। যুদ্ধের সময় তিনি বইটা পড়েছিলেন, তারপর হারিয়ে ফেলেন। পুরানো বইয়ের দোকানের ব্যাপারে টোকিওতে আমাকে বিশেষজ্ঞই বলা যায়, আমি ঠিকই পুহ কর্ণার থেকে  Winnie-the-Pooh এবং The House বই দুটো খুঁজে পেয়ে উনাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, আর তারপরেই আটকে পড়ে গেলাম উনার মেয়ের প্রশ্নবাণে। এভাবেই আমাদের পরিচয় শুরু হয়েছিল। Pooh চরিত্র হিসেবে আমার কাছে যুতসই মনে হয় নি। আমি বলতে গেলে আসলে Eeyore ধরণের চরিত্র পছন্দ করি।

নোবেল পুরস্কার জেতার পর, আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

তাতেও আমার ব্যাপারে তাদের ধারণার কোন পরিবর্তন হয় নি। আমি এখানেই বসে ছিলাম। হিকারি ওখানে বসে সঙ্গীত শুনছিল। আর খাবার টেবিলে বসে ছিল টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়নের ছাত্র, আমার ছেলে আর সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার মেয়ে। তারা আশা করেনি যে আমি জিততে পারি। একটা ফোন কল এসেছিল সকাল নটার দিকে। হিকারি ফোন ধরেছিল; ফোন ধরা ওর একটা শখ। সে ‘হ্যালো’ বলতে পারে। ফরাসি, জার্মান, রাশিয়ান, চাইনিজ এবং কুরিয়ান ভাষায় সে পরিষ্কার ‘হ্যালো’ বলতে পারে। তো সে ফোনটা ধরল, দুবার ইংরেজিতে না না বলল। তারপর আমার কাছে ফোনটা ছেড়ে দিল। এটা সুইডিশ একাডেমির এক সদস্যের থেকে আসা ফোন ছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কী কেনজাবুরে’? আমি তাকে উলটো জিজ্ঞেস করলাম, হিকারি কী আমার পক্ষ থেকে নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছে? যদি দিয়ে থাকে, আমি দুঃখিত, আমি নিতে চাই। ফোনটা রেখে দিলাম, সোজা এসে এই চেয়ারে বসলাম, তারপর পরিবারকে সুসংবাদটা দিলাম যে, ‘আমি জিতে গেছি’। আমার স্ত্রী শুধু বলেছিল, “তুমি ঠিক বলছ তো?”

শুধু এটুকুই বলল?

হ্যাঁ তাই। আর আমার ছেলেমেয়েরা কিছুই বলল না। নীরবে উঠে ওদের ঘরে চলে গেলো। হিকারি নির্বিকার ওর সঙ্গীত শুনছিল। ওকে আমি কখনই পুরস্কার পাবার ব্যাপারটা জানাই নি।

আপনি কী এ ঘটনায় মর্মাহত হয়েছিলেন?

আমি আমার পড়ার ঘরে চলে এলাম। ভাবতে পারছিলাম না, আর কোন পরিবার এই ঘটনায় এমন আচরণ করবে কী না! তারপর একের পর এক ফোন এলো। পরিচিত অপরিচিত ফোন কলে, পরের পাঁচঘন্টা কাটিয়ে দিতে হলো। ছেলেমেয়েরা চাচ্ছিল সাংবাদিকেরা চলে যাক। আমি এমনকি জানালার পর্দা টেনে দিয়েছিলাম যাতে একটু অন্তত নিজেদের মত কিছুক্ষণ থাকা যায়।

এই রকম একটা স্বীকৃতির কী কোন চাপ আছে?

হ্যাঁ বা না দুটোই। ভালোমন্দ মিলেমিশে। বিশেষ কোন মন্দ কিছু নয়, আবার খুব আহামরি কিছুও নয়। যে সময় আমার এই স্বীকৃতি জোটে সেসময় থেকে টানা তিনবছর আমার বাড়ির পাশে সাংবাদিকদের ভিড় ছিল। জাপানি মিডিয়া নোবেল বিজয়ী বিষয়টাকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে প্রচার করছিল। এমনকি যারা আমার লেখা আগে পড়েননি, অথবা আমার রাজনৈতিক মতামত গুরুত্ব দিতেন না, তারাও নোবেল পুরস্কারে মনোনীত হওয়াতে আমার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।

সাহিত্য চর্চার জন্য নোবেল পুরস্কার আদৌ কোন বিষয় নয়, কিন্তু এটা আপনাকে, আপনার সামাজিক অবস্থানকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়। আর যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায়, তাতে করে কেউ চাইলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে অনেক কাজ করতে পারে। কিন্তু লেখকের ক্ষেত্রে অবস্থান একই থাকে। আমার নিজেরই নিজেকে নিয়ে করা বিবেচনা তাতে বদলায়নি। অল্প কজন লেখকই নোবেল পুরস্কারের পর ভাল কিছু দিতে পেরেছেন টমাস মান তাদের মধ্যে একজন। ফকনারও আছে।

আচ্ছা, হিকারি যখন জন্ম নেয়, ততদিনে আপনি প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। আপনি ও আপনার স্ত্রী তো দারুণ ব্যস্ত সময় কাটানোর  কথা। সেখানে হিকারি কী আপনাদের আরো উঁচুতে ওঠার সময়টুকু কেড়ে নেয়নি?

আমার তখন আটাশ বছর বয়স। আকুতাগাওয়া পুরস্কারের মত পুরস্কার পেয়েছি পাঁচ বছর আগে। আমার মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে আমার কোন ভয় না লজ্জা ছিল না। A Personal Matter উপন্যাসে যে Bird চরিত্র আছে, সে তার মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে অস্বস্তিতে থাকে – আখ্যানের কাঠামোকে তৈরি করতে গিয়ে আমাকে এটুকু করতে হয়েছে – তাতে করে আমার নিজের জীবনে উদ্বিগ্ন হতে হয় নি। আমার গন্তব্য আগেই জানা ছিল, যেমন ছিল হাকলবেরি ফিনেরও।

হিকারির জন্মের পরে কী আপনি নিশ্চিত ছিলেন সে আর বাঁচবে না?

ডাক্তাররা আমাকে ক্ষীণ আশার কথা শুনিয়েছিলেন। আমার মন বলছিল ও বাঁচবে না। হিকারির জন্মের কয়েক সপ্তাহ পরে আমি হিরোশিমা গিয়েছিলাম। সেই বিভীষিকাময় পরমাণু বোমার পর বেঁচে যাওয়া অনেককেই তখন দেখেছি নিহত কারুর নাম লিখে, আলোর প্রদীপ জ্বেলে নদীর জলে ভাসিয়ে দিতে। সেগুলো ধীরে ধীরে নদীর ওপারে চলে গেলো আর সবাই অনুভব করলো মৃতদের আত্মারা যেন, ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে গেলো। আমার ইচ্ছা করছিল ওদের সাথে যোগ দিতে। আমি তখন হিকারির নাম লিখে একটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম সে বেশিদিন বাঁচবে না। সেই সময়টায় আমার নিজেরি বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছিল না।

পরে এই বিষয়টা আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছে বলেছিলাম, যার মেয়ে হিরোশিমার ঘটনায় নিহত হয়েছিল। সে আমাকে বলল এতটা আবেগী হবার কিছু নেই। তোমার কাজ তুমি চালিয়ে যাও। পরবর্তীতে আমি একমত হয়েছিলাম যে সেরকম আচরণ আমার চরমতম ভুল ছিল। তারপর থেকেই আমার আচরণ বদলে ফেলি।

কী করে মনে হলো এটা ‘ভাবালুতা’?

এই বিষয়ে সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ফ্ল্যানারি ওকোনোর। তিনি বলেছিলেন ‘ভাবালুতা’ এমন একটি আচরণ যা বাস্তবের মোকাবেলা করতে পারে না। যারা মানসিক প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে করুণা করে, তারা আসলে নিজেরা কিছু লুকোতে চায়। দ্বিতীয় ইউরোপীয় যুদ্ধে, নাজিরা যেভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী বা দুর্বলদের হত্যা করেছিল, তার সাথে ওকোনার এই ভাবালুতাকে সম্পর্কিত করতে চান।

Rouse Up উপন্যাসে একটা অধ্যায় ছিল, যেখানে ডানপন্থী এক ছাত্র গল্পের বর্ণনাকারীর অক্ষম ছেলেকে অপহরণ করে, একটা ট্রেন স্টেশনে লুকিয়ে রাখে। এমন কিছু কী আদৌ ঘটেছিল?

সে সময়কার ছাত্ররা আমার লেখার সমালোচনা করেছিল যে, কেন আমি তাদের নিয়ে লিখছি না, তাদের সমস্যার কথা না লিখে শুধু আমার প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়েই লিখছি কেন। ওরা আরো বলেছিল, আমার কাছে আমার পরিবার আর সন্তান ভিন্ন, সমাজের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। ওরা আমার ছেলেকে অপহরণ করবে বলে হুমকি দিলেও, আসলে কখনই তা করা হয়নি। তবে একটা প্রসঙ্গে উপন্যাসের ঘটনা সত্যি, কারণ হিকারি সত্যিই একদিন টোকিও স্টেশনে হারিয়ে গিয়েছিল, আর দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা পর ওকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম।

হিকারিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে, তার যৌন সত্ত্বা নিয়ে লিখতে গিয়ে, আপনি কোন প্রতিবন্ধকতা বোধ করেছেন? Rouse Up O Young Men of the New Age এবং A Quiet Life উপন্যাসে, কথক, তার নিজের যৌন চাহিদার অধিকারের সাথে, তার প্রতিবন্ধী সন্তানের যৌন চাহিদার সামঞ্জস্য নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন।

হিকারির কোন ধরণের যৌন চাহিদার দেখা আমি এখনও পাইনি। টিভিতে স্বল্পবসনা নারী দেখলেও সে চোখ বন্ধ করে রাখে। আরেকদিন একজন টাকলু পিয়ানোবাদককে টিভিতে দেখাচ্ছিল, সম্ভবত শরীরে কাপড় না থাকা আর মাথায় চুল না থাকা নিয়ে হিকারির কোন ধারণা আছে, হিকারি সে অনুষ্ঠানটা দেখলই না। এতটুকু পর্যন্তই তার যৌনজীবন নিয়ে আমার জ্ঞান বলতে পারেন। আপনি অবশ্য বলতে পারেন, সে এই বিষয়টায় বেশ সংবেদনশীল, কিন্তু অন্য আরো দশটা লোকের চাইতে তার এই অনুভব ভিন্ন। পুহ-চান (হিকারির ডাক নাম), সেই টাকলু মাথার পিয়ানোবাদকের নাম কী তুমি মনে করতে পারো?

হিকারি: Christoph Eschenbach

ইনি একজন বিখ্যাত পিয়ানোবাদক এবং পরিচালক। তার এলব্যামগুলোতে মাথাভর্তি কালো চুল দেখা যায়। কিছুদিন আগে তিনি জাপানে এসেছিলেন, আর পুরো মাথাই ন্যাড়া ছিল। আমরা একসাথেই টিভি দেখছিলাম, হিকারি তার মাথার দিকে মোটেও তাকাচ্ছিল না। আমি সিডির উপরের কভারটা টেলিভিশনের পর্দায়, পিয়ানোবাদকের টেকো মাথায় সাঁটিয়ে দিয়েছিলাম যেন, হিকারি অনুষ্ঠানটা উপভোগ করতে পারে।

হিকারিকে মূল চরিত্র নিয়ে পাঠকদের সামনে হাজির হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন কেন?

দশ বছর আগে থেকেই আমি সরাসরি হিকারিকে লেখার মূল বিষয়বস্তু থেকে বাদ দিয়েছি, কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে এখনও সে লেখায় চলে আসে। সে আমার লেখার সবচাইতে অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের মধ্যে এখন অন্যতম। হিকারি যেমন আমার সত্ত্বার একটি অংশ, তেমনি আমিও চাই আমার প্রতিটি লেখায় কোন না কোন প্রতিবন্ধী মানুষের কথা আসুক। কিন্তু উপন্যাস সবসময়ই পরীক্ষা নিরীক্ষার জায়গা – এ প্রসঙ্গে দস্তয়ভয়স্কির রাশকলনিকভ চরিত্রটি তাই। ঔপন্যাসিক নানা ধরণের চরিত্র আর তাদের ভিন্নভিন্ন পরিস্থিতিতে করা প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেন। কখন কী বলবে বা করবে, এই জাতীয়! হিকারিকে নিয়ে এখন আর আমি এসব করি না। যেহেতু হিকারি আর আমি, দুজন দুজনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই হিকারিকে নিয়ে পরীক্ষা করার চাইতে, আমার জীবনের একটা সহায়ক শক্তি বা স্তম্ভ হিসেবে দেখতেই পছন্দ করি। সে আমার বাস্তবতাও। আমার ভাবনায় এখন শুধু এই বিষয়টাও ঘুরে, যে আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু হিকারি কীভাবে ব্যাপারটা নেবে, কী করে মেনে নেবে।

পাঁচ ছয় বছর আগে, আমাকে বিষাদগ্রস্ততার সাথে লড়তে হয়েছিল। প্রতি দুতিন বছর অন্তর অন্তর এই ব্যাপারটা ঘটে – সচরাচর আনবিক অস্ত্রের ক্রম ব্যবহার, অথবা ওকিনাওয়ার ঘটনা, কিংবা পরিচিত সমবয়সী কারুর মৃত্যু বা এটা মনে হওয়া যে আমার উপন্যাস বোধহয় আর চলবে না, তখনই আমি এই বিষাদগ্রস্ততায় আটকে থাকি। এই অবস্থা তাড়াতে আমি কোন সিডি বারবার চালিয়ে শুনতে থাকি। গত বছর এই অভিজ্ঞতাটুকু আমার উপন্যাসে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। বিটোফেনের ৩২তম সোনাটার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হলেও ভুলে গিয়েছিলাম কে বাজিয়েছিল। আমাদের বাসায় এত বেশি সিডি ছিল! হিকারিকে জিজ্ঞেস করলাম, বলতে পারো সেসময় আমি কার বাজনা শুনেছিলাম,  সে ফ্রেডেরিখ গুল্ডার নাম মনে রেখেছিল। আমি আবার জিজ্ঞেসস করলাম, এটা কবের ১৯৬৭’র দিকে! সে বলল – ৫৮ সালের।

বলতে গেলে, আমার জীবনের তিনভাগের এক ভাগ কেটেছে পড়ায়, একভাগ লেখায়, আর একভাগ হিকারিকে নিয়ে।

লেখালেখি নিয়ে আপনি কী কোন সময়সূচী মানেন?

আমি যখন উপন্যাস লেখা শুরু করি, তখন প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখতে থাকি, যতক্ষণ না শেষ হয়। সচরাচর আমি সকাল সাতটায় উঠে, বেলা এগারোটা পর্যন্ত কাজ করি। নাস্তা করি না। শুধু একগ্লাস জল পান করি। আমি মনে করি এটাই লেখার জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতি।

লেখালেখিকে কী আপনি পরিশ্রমসাধ্য বলে ভাবেন?

ফরাসি ভাষায় কাজ করা মানে হচ্ছে Travail, প্রসব বেদনার মতো। এটা এই মানে রাখে যে, একটি কাজ করতে যে বেদনা, যে পরিশ্রম, একাগ্রতা ও সাবধানতা প্রয়োজন, যেমন প্রয়োজন হয় সন্তান উৎপাদনে, আর সেই সন্তানকে প্রসব করা পর্যন্ত। প্রুস্তের কাছে, অতীতের সমস্ত ঘটনাকে মনে করে বর্ণনা করা এবং সে প্রচেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসা ফলাফল,  আসলে একই বিষয়। লেখালেখিতে যে সংগ্রাম আছে এটা আমি টের পাইনি। প্রথম অংশটা লেখা সবসময়েই অনেক আনন্দের। তারপর তো আমি ঘষামাজা চালাতেই থাকি। এইটা একটা শ্রমসাধ্য ব্যাপার, কিন্তু শেষ করতে পারাটাও অনেক আনন্দের।

আপনি বলেছেন যে, আপনার এই উপন্যাস আসলে আপনার সেই বনের ধারে গ্রামে ফিরে যাবার মতোন, সেই গ্রাম যেখানে আপনি বড় হয়েছেন।

এখানে দুইটি বিষয় জড়াজড়ি হয়ে গেছে – আমার কল্পিত বন আর আমার শৈশবের গ্রাম। আমি অসংখ্যবার আমার শৈশবের কথা লিখেছি, আর সেসবই বনের ধারের গ্রামের সাথে মিলেমিশে গেছে।

একসময় আমি বনের ভেতর বসে গাছেদের স্কেচ করছিলাম আর প্রত্যেকটা গাছের নাম জানার চেষ্টা করছিলাম। ব্যস ঠাণ্ডা লেগে গেলো। বিছানায় কাতর হয়ে শুয়ে মনে হচ্ছিল, বেশিদিন বাঁচব না। তবে কী আমার মৃত্যু নিশ্চিত? মা বলেছিলেন, যদি তুমি সত্যিই মরে যাও, তবে আমি আবার তোমার মতোন একটি সন্তান জন্ম দেবো। আমি পালটা প্রশ্ন করেছিলাম, মা, সেকি ভিন্ন কোন শিশু হবে না? মা বলেছিলেন, তুমি যা জানো, তার সমস্ত কিছুই আমি তাকে শেখাব, এমনকি তুমি যেসব বই পড়েছ তাও সে পড়তে শিখবে।

আপনার বাবা কেমন ছিলেন?

তাঁর সম্পর্কে আমি খুব কমই জেনেছি। একাকী, রহস্যময় একটা চরিত্র ছিলেন তিনি। বাচ্চাদের সাথে কখনও কথা বলতে দেখিনি তাকে। তিনি একটা টেক্সটাইলে চাকুরি করতেন, আর শুধু পড়তেন। এমনকি গ্রামের অন্য কারো সাথেও তিনি মিশতেন না।

আমরা শিকোকুর পাহাড়ে থাকতাম। আশেপাশে প্রতিবেশিদের এলাকায় যাওয়া মানে একদিনের হাঁটার পথ। শুনেছিলাম পাহাড়ের অপর পাশে চীনা সাহিত্যের একজন পণ্ডিত শিক্ষক থাকতেন, যার কাছে বাবা প্রায় যেতেন। মাকে বলতে শুনেছি, বাবা ফি বছর দুবার করে উনার সাথে দেখা করতে যেতেন।

আপনার দাদীমা, আপনার মা শুনেছি গ্রামে শিন্টোর পবিত্রচিহ্ন যত্ন আত্তি করতেন?

এটা মূলত তাওয়ের পবিত্রচিহ্ন ছিল, যা আসলে শিন্টোর তুলনায় অনেক বেশি মূলে প্রোথিত, যা আসলে মাটির কাছাকাছি লোককাহিনির সাথে যুক্ত। অন্যদিকে আমার বাবা শিন্টো ভাবনা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করতেন। জাপান, শিন্টো জাতি হবে ওরকমই ধারণা ছিল। কিন্তু তারা বেশি সাম্রাজ্যবাদের দিকে ঝুঁকে গেছে। ছয় বছর বয়সে আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই, আর দশ বছর হল যখন সবেমাত্র দ্বিতীয় ইউরোপীয় যুদ্ধ শেষ হয়েছে। সেইসময় আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনায় পড়ানো হতো – জাতীয়তাবাদ সংযুক্ত ছিল শিন্টো মতবাদ, সম্রাটপূজা আর সামরিকীকরণের দিকে। আমাদের শেখানো হতো, সম্রাট হচ্ছেন খোদার মতই, তারই জন্য আমাদের বাঁচা, তারই জন্য জীবনাবসান। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই বিশ্বাসই ছিল।

আজো জাপানের সাহিত্যের মূলধারায় শিন্টো উপস্থিত। এটা খুব সাধারণ একটা বিশ্বাস, যা সবাইকে একটা বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে। এটাতে না আছে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষাদান, না আছে কোন ধর্মতত্ত্ব। যারাই এটা থেকে বেরিয়ে এসেছে, তারাই বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান মতবাদকে বেছে নিতে প্রলুব্ধ হয়েছে। আবার কেউ কেউ স্বাধীন চিন্তার উপরও গুরুত্ব দিয়েছেন, যেমন বুদ্ধিজীবীরা। আমি হচ্ছি এমন এক দলের, যে কী না ধর্মকে একপাশে সরিয়ে রেখে স্বাধীন চিন্তার পথে হাঁটব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আপনার নাকি ঘুমের ব্যারাম আছে?

ঘুমের এ সমস্যা সব সময়ই ছিল। এই জন্যেই কলেজে ছাত্র থাকার সময় হতেই আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি। দুই বছরের মত ঘুমের বড়ি খেয়ে কাটিয়েছি, তারপর এক সময় রাতে মাথায় পরার টুপি চেপে চোখে অন্ধকার দিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা চালিয়েছি। রাতে আমি রান্নাঘরে গিয়ে চার পেগ হুইস্কি টানি, কখনও কখনও ডাবল পেগ, তারপর দুই থেকে চারটে ক্যান বিয়ার শেষ করে ঘুমোতে যাই। একটাই বড় সমস্যা, আগে যে পরিমাণ পড়াশোনা করতে পারতাম, এর ফলে এখন সেটা অনেক কমে এসেছে।

Rouse Up উপন্যাসের কথক বলছে, আমাদের জীবনটা, মৃত্যু যাত্রার আগে যেন দারুণ একটা অর্ধেক দিন যা আসলে প্রস্তুতি পর্ব ভিন্ন কিছু নয়। আপনার কাছে বাকি অর্ধেক দিন কী করে দারুণ হয়ে উঠতে পারে?

আমি আদৌ জানি না সে বাকি অর্ধেক দিনটা কেমন হতে পারে, তবে আমি চাইব আমি যেন সেসময় সর্বোচ্চ সচেতন থাকি। সত্তরের অধিক এই জীবনে আমি, অগুনতি বিষয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েছি। শেষ বেলায় আমি কিছু কবিতা মনে রাখতে চাই। এই মুহুর্তে এমন একটি কবিতার নাম হচ্ছে, East Coker।

এই একটাই মাত্র!

শুধু এই মুহুর্তের জন্য।

এখন যখন আপনার জীবনের শুরুর দিকে তাকান, আপনার কী মনে হয় সঠিক পথ বেছে নিতে পেরেছিলেন?

আমার জীবন ঘরে বসেই আমি কাটিয়ে দিয়েছি, বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে, গান শুনতে শুনতে আর হিকারিকে নিয়ে। আমার মনে হয়, আমি জীবিকা উপার্জনের জন্য সঠিক পথই বেছে নিয়েছি, উত্তেজনাময় একটা জীবিকাই বটে। ‘পড়ার মতো বইয়ের আমার কোন অভাব হবে না’ এটা জেনেই প্রতিদিন আমি জেগে উঠি। আমার জীবন বলতে তাই।

একটা লেখা শেষ করার পর মরে যেতে কোন বাঁধা নেই – তবে লেখা শেষ করার পর পড়তে পারারও একটা ইচ্ছে থাকে। ঔপন্যাসিক নাৎসেমি সোসেকির লেখার সময়কাল ছিল ক্ষীণ দৈর্ঘের, ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত। তার সম্বন্ধে চালু গল্প হচ্ছে এরকম যে মৃত্যুর কিছু আগেও তিনি বলেছিলেন, এই মুহুর্তে মরে গেলে কিছুটা সমস্যাই হয়ে যাবে। তিনি কখনই মরতে চাইতেন না। জাপানে কোন লেখক মারা গেলে, তার আধা কোন পাণ্ডুলিপি থাকলেও সবাই জানে প্রকাশক তা বাজারে আনবেন। আমার মৃত্যুর আগেও আমি চাইব আমার শেষ না হওয়া পাণ্ডুলিপি আর যত নোটবই আছে সব পুড়িয়ে ফেলতে। সম্ভব হলে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে যেগুলোর পুনঃপ্রকাশ প্রয়োজন, সেগুলো আলাদা করে ফেলব, আর বাকিগুলো যেমন আছে থাকুক।

বেশিরভাগ লেখকই তা বলেন না! কিন্তু কজন এই কাজটি করেন?

সত্যিকার অর্থে যারা লেখক, তাদের ওরকম আধা আধা লেখা থেকেও আপনি অনেক কিছুই নিংড়ে বের করতে পারবেন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে, এমনকি যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোও তো আসলে ঠিকঠাক শেষ করতে পারিনি। অল্প কয়েকবার কাটাকুটি করেই আমার লেখা লেখা হয়ে যায় না, এই জন্য দীর্ঘ ঘষামাজারর মধ্য দিয়ে আমি যাই। আর ওইরকম ঘষামাজা ছাড়া কাজ, আমার কাজ হতেই পারে না।

আপনার কাছে আপনার কোন লেখাটায় মুগ্ধ হয়েছেন?

The Silent Cry । আমার তরুণ বয়সে লেখা, যাতে অনেক ভুল বিদ্যমান। আমি মনে করি এইসব ভুল নিয়েও এটাই আমার সবচেয়ে সেরা কাজ।

আপনার উপন্যাসে কথকেরা অতীন্দ্রিয়কে ধরে রাখতে চায়, কিন্তু সেসব কেমন হাত ফসকে বেরিয়েও যায়, তারা ব্যর্থ হোন।

অতীন্দ্রিয় বিষয়কে নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা দ্বিতীয় শ্রেণির। যারা এই অতীন্দ্রিয়কে, বিমূর্তকে ধরতে পেরেছেন, যেমন – ইয়েটস বা ব্লেইক, আমি তাদের মাধ্যমে এই বিষয়টা বোঝার ও অনুধাবন করার চেষ্টা করি। শেষপর্যন্ত এই জগতের বাইরের কিছু নিয়ে আমি এগুতে পারিনি, কিন্তু পড়তে পড়তে আমি সেই বিষয়ের কিছুটা স্বাদ আমার হয়েছে, আর হয়েছে বলেই আমি এখনও বেঁচে আছি।

কিছুতে বিশ্বাস স্থাপন করায় কী লেখকের কোন ক্ষতিবৃদ্ধি বা চাপে থাকতে হয়?

জাপানে, এই দায়িত্ব বা চাপ নেয়ার বিষয়ের সাথে ‘ভারী’ বৈশিষ্ট্যটা রয়েছে। ধর্ম – বিশ্বাস এইসব নিয়ে চাপে থাকার কিছু নেই, আমি যেসব লেখকের সাথে অন্তরঙ্গ, তাদের সাথে এইসব নিয়ে, উপলব্ধি নিয়ে আলোচনা করি। লেখকদের কাছ থেকে জানার অভ্যাসটা আমি তৈরি করে নিয়েছি। এছাড়াও আরো অনেক লেখক আছেন, যাদের সাথে একাত্মতা বোধ না করলে আমার উপলব্ধির বিষয়টা নিয়ে মতামত দেই না। টলস্টয় এমন একজন লেখক, যার সাথে আমার এ বিষয়ে একাত্মবোধ জাগে না।

আজো আমার অদৃষ্টে বিশ্বাস নেই, না হবেও কোনদিন, কিন্তু আমি নাস্তিক নই। আমার বিশ্বাস অনেকটা উদারতাবাদের মতো। আপনি এটাকে নৈতিকতাও বলতে পারেন। এত বছরের জীবনে অল্প কিছু জ্ঞান আমার হয়েছে, আর সেটাও হয়েছে যুক্তির মধ্য দিয়ে, অভিজ্ঞতায় আর চিন্তার পথে। আমি যুক্তিবাদী মানুষ, আর আমার চলায় আমার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষার পরিমাণই বেশি। আবার আমার জীবনযাত্রা ধর্মনিরপেক্ষ, আর সেই নিরপেক্ষতা দিয়েই আমি মানুষকে বুঝতে শিখেছি। আর অতীন্দ্রিয় কিছুর সাথে আমার পরিচয় যদি বলেন, তবে সেটা হচ্ছে আমার ছেলে হিকারির সাথে কাটানো গত চুয়াল্লিশ বছর। এই বোধ আমার সাথে হিকারির চলমান সম্পর্ক আর তার সঙ্গীত বোঝার মধ্য দিয়েই ঘটে।

আমি প্রার্থনা না করলেও প্রতিদিন নিয়ম করে দুটো জিনিস করি। একটা হচ্ছে সকাল বেলায় নিয়ম করে দু’ঘন্টা আমার পছন্দের চিন্তাবিদ ও লেখকদের লেখা পড়ি, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে হিকারিকে রাতের বেলায় বাথরুমে যেতে জাগিয়ে দেই। কখনও কখনও ফিরে এসে অনেক সময় হিকারি গায়ে কম্বল দিতে ভুলে যায়, তখন আমি তার গায়ে কম্বল তুলে দেই। হিকারিকে বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার সময়টা একটা ধর্মীয় আচারের মত লাগে, এটাই আমার কাছে ধর্মীয় বিষয়। তারপর মাথায় টুপি পরে, চোখ ঢেকে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।

Facebook Comments

comments

২ Replies to “সাক্ষাৎকার ।। কেনজাবুরো ওয়ে ।। অনুবাদঃ জেলিস খান”

  1. Avatar খোকন বলেছেন:

    ওয়ের সন্তান হিকারি শারিরীক প্রতিবন্ধী, আর আমরা বোধ করি মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। সাক্ষাতকারটি যদিও দীর্ঘ। তবুও পড়লাম। ভাল লেগেছে।

    1. Avatar Jalis Kham বলেছেন:

      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় করে পড়েছেন। কোন পরামর্শ থাকলে জানাবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top