লেনিন।। পর্ব দুই।। আশানুর রহমান

পর্ব গোল্ডফিঞ্চ।।

ক্লাসিক্যাল জিমনেঝিয়া স্কুলের দোতলা ভবনটি এ্যালমন্ড রঙের। কিছুদিন আগেই ভবনটিতে রঙের কাজ করানো হয়েছে। তাই রঙের গন্ধটা যেন এখনো বাতাসে মিশে আছে। ভবনটির প্রতিটি কক্ষে বড় বড় জানালা। ভবনটির সামনে সারি করে লাগানো গাছগুলির গোড়ায় সদ্য চুন লাগানো হয়েছে। সেই মাঝারি উচ্চতার গাছগুলি ছোট ছোট পাতায় ভরে গেছে।  মুল রাস্তা থেকে স্কুল চত্বরটি সামান্য উঁচু। এমনই উঁচু যে নীচের ক্লাসের ছেলেদের বা বয়স্কদের ছোট ছোট চারটি সিঁড়ি ভাঙতে হয় আর স্কুলের দুষ্টু ছেলেরা সেই সিঁড়িটুকু এক লাফেই টপকে পার হয়। টানা লম্বা স্কুল ভবনটির সামনে বিশাল খেলার মাঠ। মাঠ পেরোলেই স্কুল মিলনায়তন। মিলনায়তনটির সামনে একটি আপেল গাছ। গাছটিতে এখন ফল ধরতে শুরু করেছে। ভবনের দক্ষিণ দিকের নীচতলায় অফিস ও শিক্ষকদের কক্ষগুলি পাশাপাশি। হেডমাস্টার থিডোর কেরেনেস্কি বসেন ভবনের নীচতলার একেবারে শেষ মাথায়। তিনি অত্যন্ত কড়া ধাঁচের মানুষ। সে কারণে স্কুলের শুধু ছাত্ররাই নয়, শিক্ষকরাও তাঁকে যথেষ্ট সমীহ করে চলে। হেডমাস্টারের কক্ষটির সামনে দেয়াল বরাবর মেহগনি কাঠের হাতলওয়ালা একটি লম্বা বেঞ্চ । আজ সকালবেলাতেই সেই বেঞ্চে বসে আছে ভলোদিয়া। স্কুলে তাকে সবাই ডাকে ভ্লাদিমির নামে। পিয়ন পাঠিয়ে তাকে ক্লাস থেকে ডেকে আনানো হয়েছে আধ ঘন্টা আগে। পিয়ন দিয়ে কোন ছাত্রকে ক্লাস থেকে ডেকে আনার অর্থ হয় সে কোন গুরুতর অপরাধ করেছে অথবা তার বাড়ী থেকে জরুরি কোন খবর এসেছে। ভ্লাদিমিরকে এখানে বসে থাকতে দেখে ছাত্রদের কেউ কেউ তাই উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে বিশেষতঃ অন্য ক্লাসের ছাত্ররা। ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কানাঘুষাও শুরু হয়েছে। ভলোদিয়ার ক্লাসের ছেলেরা অবশ্য তাকে ডেকে নেবার কারণটি জানে। তাই তারাও নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করেছে। ভলোদিয়ার ফিরতে দেরী হতে থাকায় তাদের ভাবনাগুলোও ততক্ষণে ডালপালা মেলতে শুরু থাকে।  অথচ যাকে নিয়ে ছাত্রদের নিজেদের মধ্যে এত কানাঘুষা সেই ভ্লাদিমির যেন নির্বিকার। সাদা শার্টের উপর গলাবন্ধ কোট, কোটের সবগুলো বোতাম লাগানো এবং ব্যাক ব্রাশ চুলের ভলোদিয়া তখন অডিটরিয়ামের সামনে আপেল গাছটিতে সদ্য উড়ে এসে বসা একটি পাখি দেখছিল। দূর থেকে দেখেও ভলোদিয়া বুঝতে পারলো পাখিটি গোল্ডফিঞ্চ। এটি ভলোদিয়ার খুব পছন্দের পাখি। গত বছর সে ছোট ছিল বলে মা তাকে পাখি ধরার অনুমতি দেয়নি। কয়েকদিন ধরে সে আর নেফেদেভ ভাবছে পাখি ধরতে যাবে। মায়ের সাথে তার কথা হয়েছে, অনুমতিও পাওয়া গেছে । ভাই- বোনদের বাইরে নিকোলাই নেফেদেভই ভলোদিয়ার সব থেকে কাছের মানুষ। সাইকেলে করে ঘুরে বেড়ানো, গাছে উঠা, সাঁতার কাটা, পাখি ধরা এসব কাজে নেফেদেভই ভলোদিয়ার প্রধান সঙ্গী। ভলোদিয়াদের বাগান দেখাশুনা করে যে মালী তার নাম ল্যাশপিন। সে বলেছে খুব অল্প টাকায় তাদের কাছে পাখি ধরার জাল বিক্রি করবে। মালীর কাজটির পাশাপাশি বাড়তি কিছু আয়ের জন্য পাখি ধরার জাল, মাছ ধরার ছিঁপ ও জাল বিক্রির কাজগুলো সে করে থাকে। জালটি তার হাতে এলেই সে জানাবে বলেছে। নেফেদেভেরও অবশ্য দু’একদিনের মধ্যেই খবরটি নিয়ে আসার কথা।

ভলোদিয়ার চিন্তায় বাঁধা পড়ে পিয়নের ডাকে। প্রায় আধা ঘন্টা ওভাবে বসে থাকার পর তার ডাক পড়লো। বেশ সাবলিলভাবেই সে হেডমাস্টারের ঘরে ঢুকলো। বেশ বড়সড় একটি হাতলযুক্ত কাঠের চেয়ারে তিনি বসে আছেন। সামনে অনেকগুলো ফাইল। টেবিলের ডানদিকে একটি চমৎকার ফুলদানিতে ফুল সাজানো। ফুলের গন্ধটি খুব মিষ্টি। ঘরে ঢুকলে প্রথমেই এই মিষ্টি গন্ধটা নাকে লাগে। ভলোদিয়াও বড় করে একটা শ্বাস নিলো। টেবিলটার বাম দিকটায় একটি চমৎকার কলমদানিতে হরেক রকমের কলম ও পেন্সিল রাখা। টেবিলের সামনে চারটি চেয়ার সুন্দর করে সাজানো। যে চেয়ারটিতে হেডমাস্টার বসে আছেন তার পিছনের দেয়ালে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার নিকোলাসের একটি বড় ছবি ঝুলছে। ছবিটি ঝক্ ঝক্ করছে। দেখলেই বোঝা যায়, প্রতিদিনই সেটা যত্ন করে পরিস্কার করা হয়। ভলোদিয়ার চোখ আটকে গেল জারের ছবিটির দিকে। একটি বড় কাঠের টেবিলের সামনে ডানদিকে একটু বেঁকে একটি খাড়া তরবারির উপর প্রথমে ডান হাত, তার উপর বাম হাত রেখে তিনি ছবিটি তুলেছেন। গলাবন্ধ কোটের বুকে অনেকগুলো মেডেল ও ব্যাচ লাগানো। কোটের দুই কাঁধ বরাবর ও হাতের কব্জির কাছে সোনালী রঙের কাজ করানো, দেখতে অনেকটা পর্দার ঝালরের মতো। চুল ছোট করে ছাঁটার কারণেই সম্ভবত: জারের মাথার দু’দিকের শুরু হওয়া টাকটি বোঝা যাচ্ছে। সেই সাথে মুখে চাপা দাঁড়ি আর বড় সড় গোঁফটি থাকার কারণে ছবিটি যেন বাড়তি সমীহ আদায় করে নিচ্ছে। ভলোদিয়ার চোখ আটকালো জারের গোঁফে। ভলোদিয়ার মনে হলো গোঁফটা শুধু সমীহ নয়, ভয়ও জাগিয়ে তুলছে। ছবিটি এমনভাবে তোলা দেখে মনে হচ্ছে জার নিকোলাস ভলোদিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছেন। মেহগনি কাঠের লম্বা টেবিলটির দু’পাশের দেয়ালে দু’টি বড় জানালায় লম্বা পর্দা টাঙানো। পর্দাগুলো এখন গুটিয়ে রাখা হয়েছে ঘরে আলো প্রবেশের জন্য। ভ্লাদিমির কয়েক পা এগিয়ে সুপ্রভাত বলে সম্ভাষণ করে। হেডমাস্টার থিডোর সম্ভাষণের উত্তর না দিয়ে ফাইল থেকে মুখ তুলে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভাল করে দেখতে লাগলেন।

হেডমাস্টার লক্ষ্য করলেন, প্রাদেশিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উলিয়ানভের এই ছেলেটি তার বড় ছেলে আলেকজান্ডার উলিয়ানভের মত হয়নি। বড় ছেলেটি যেমন ভাল ছাত্র, তেমনি বিনয়ী এবং নম্র। সে শুধু তার ক্লাসের সেরা ছাত্রই নয়, বার্ষিক পরীক্ষায় গোটা স্কুলের মধ্যে সে বরাবরই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে থাকে। হেডমাস্টার থিডোর তাঁর এত বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন অসাধারণ ছাত্র আর একটিও দেখেননি। তারই ছোট ভাই ভ্লাদিমির সম্পর্কে গতকাল অভিযোগটি পাবার পর তাই তাকে সরাসরি কোন শাস্তি না দিয়ে তিনি সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্কুলের শৃঙ্খলার দিক থেকে চিন্তা করলে ভ্লাদিমিরের অপরাধটি গুরুতর। কয়েকটি বিবেচনায় তিনি তাকে কঠিন কোন শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকার কথা ভেবেছেন। ভ্লাদিমিরের বাবা একজন সম্মানিত ব্যক্তি ও শিক্ষাবিভাগের পরিচালক। এছাড়া, ভ্লাদিমির আলেকজান্ডার উলিয়ানভের ছোট ভাই, যে তার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। উপরন্তু, ক্লাস টিচার জানিয়েছে যে, ভ্লাদিমিরও ছাত্র হিসাবে খুব ভাল। ক্লাস টিচার এটাও জানিয়েছে যে, তার পড়াশুনার পদ্ধতিটি চমৎকার এবং সে খুব দ্রুত সব কিছু আয়ত্ব করতে পারে। তার হাতের লেখা নিঁখুত ও পরিস্কার এবং তার হোমওয়ার্কের খাতাটি অন্যদের থেকে বিশেষভাবে আলাদা। আজ সকাল থেকেই তাই তিনি ভ্লাদিমিরের ব্যক্তিগত ফাইল ও হোমওয়ার্কের খাতাগুলো পরীক্ষা করছিলেন। তার হোমওয়ার্কের খাতা পরীক্ষা করতে গিয়ে হেডমাস্টার একটি জিনিষ লক্ষ্য করে চমৎকৃত হলেন। ছেলেটি প্রত্যেক বিষয়ের উত্তরপত্র তৈরীতে একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। যে প্রশ্নটি তাকে দেয়া হয়েছে সে একটি পৃষ্ঠায় সেটা প্রথমে লিখেছে, সেই একই পৃষ্ঠায় ঐ বিষয়ের উপর ছোট ছোট কতকগুলো পয়েন্ট বা নোট লিখে রেখেছে। পরের পৃষ্ঠায় মাঝামাঝি করে লম্বা একটি দাগ টেনে বামপাশে সেই বিষয়ের উপর আগের পৃষ্ঠায় লেখা পয়েন্টগুলোর উপর ভিত্তি করে ভুমিকা ও উপসংহার লিখেছে। দাগের ডান পাশে প্রয়োজনীয় হিসাব বা সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে। তৃতীয় পৃষ্ঠায় সে তার লেখাটি চূড়ান্ত করেছে। তিনি রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন। একই সাথে প্রশাসনিক বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সজাগ বলে তাকে সতর্ক করতে চাইলেন। তাছাড়া শৃঙ্খলার অভাবে বড় প্রতিভাও তিনি নষ্ট হতে দেখেছেন। তাই কোন ভণিতা না করে তিনি সরাসরি জানতে চাইলেন,

-ভ্লাদিমির, তুমি ছেলেটাকে মারধোর করেছো কেন?

ভ্লাদিমির মাথাটা নীচু করে বললো, ‘সে আমার পেন্সিল ভেঙেছিল’।

-সে কারণে তুমি কি তাকে মারতে পারো?

এবার ভলোদিয়া হেডমাস্টারের চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,

-তাকে আমি মারতে চাইনি তো! এই কাজ সে আগেও করেছে। আমি তাকে অনেকবার নিষেধ করেছি কিন্তু সে শোনেনি। গতকালও আমি যখন ক্লাসের ফাঁকে আমার হোমওয়ার্কের কাজ করছি, সে আমার হাত থেকে প্রথমে পেন্সিলটি কেঁড়ে নেয়। আমি তাকে বারণ করি। সে শোনেনি বরং আগের মতোই আমার পেন্সিলটি ভেঙে ফেলে। আমার ভীষণ রাগ হয়, তাই তার গায়ে হাত তুলে ফেলি।

একটানে কথাগুলো বলে ভলোদিয়া থামে। হেডমাস্টার থিডোর কেরেনেস্কি লক্ষ্য করলেন ছেলেটার ‘র’ উচ্চারণে একটু সমস্যা আছে। তার কথা শেষ হলে তিনি জানতে চাইলেন,

-তুমি তোমার শিক্ষককে বলতে পারতে, নিজে কেন তার গায়ে হাত তুলতে গেলে? তুমি যে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছো সেটা তুমি জানো? শৃঙ্খলাভঙ্গের সর্বোচ্চ শাস্তি স্কুল থেকে বহিস্কার। এটা যেহেতু তোমার সম্পর্কে প্রথম অভিযোগ তাই আমি তোমাকে এবারের মতো রেহাই দিচ্ছি।

ভলোদিয়ার চোখ ততক্ষণে হেডমাস্টারের মাথা ছাড়িয়ে জার দ্বিতীয় নিকোলাসের গোঁফের উপরে গিয়ে পড়লো। আবার গোঁফ থেকে তার চোখটা দ্রুত সরে গেলো জারের চোখের দিকে। মনে হলো জার নিকোলাস তখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। হেডমাস্টারের কথা শুনেই হোক অথবা জারের বিশাল গোঁফজোড়া ও চাহনীর কারণেই হোক ভলোদিয়া একটু ভয়ই পেলো। ভয়টি বাড়লো যখন হেডমাস্টার আরো বললেন,

-দ্বিতীয় কোন অভিযোগ যেন আমি আর না শুনি। ভবিষ্যতে এমন কোন ঘটনা ঘটলে আমি তোমার বাবাকে সোজা চিঠি লিখে জানিয়ে দেবো। কথাটা মনে থাকবে?

-জ্বি। আমি কি এখন চলে যাবো?

-হ্যাঁ। আর এটাও মনে রেখো, আলেকজান্ডার উলিয়ানভ তোমারই বড় ভাই। তার মতো হতে চেষ্টা করো!

-জ্বি।

ভলোদিয়া হেডমাস্টারের কক্ষ থেকে বের হলো ভীষণ মন খারাপ নিয়ে। মনে মনে ভাবলো, ‘আমি তো সব সময় সাশার মতোই হতে চাই। কেন পারিনা? সাশার মত হওয়া কি খুব কঠিন? আর সবাই আমাকে সাশার মতোই বা হতে বলে কেন?’ ক্ষুব্ধ ভলোদিয়া কারো দিকে না তাকিয়ে ক্লাসরুমে ফিরে আসে। সতীর্থ দু’একজন তার কাছে এসে জানতে চাইলো, ‘হেডমাস্টার কি বলেছেন’। সে তাদের কৌতুহল মেটানোর কোন আগ্রহ তো দেখালোই না বরং সেদিন ক্লাসে কারো সাথে আর কথাই বললো না।

সাশা ভলোদিয়ার থেকে চার ক্লাশ উপরে পড়ে। ভলোদিয়া ছোটবেলা থেকেই প্রায় সব বিষয়েই সাশাকে অনুকরণ ও অনুসরণ করে। সেটা নিয়ে বড় বোন আন্না মুখ টিপে হাসে। এটা নিয়ে মারিয়াও কখনো কখনো আন্নার সাথে চোখে চোখে কথা বলে,যদিও আন্নার মতো হাসে না। একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে মারিয়া বললো,
-ভলোদিয়া, তোমাকে কি দেবো? সিরিয়াল না বাটার-রুটি?
ভলোদিয়া মাকে পাল্টা প্রশ্ন করে,
-সাশা কি খাবে?
-সিরিয়াল।
-আমাকেও সিরিয়াল দাও।
আন্না মুখ ফিরিয়ে হাসলো। মারিয়া হাসিমুখে ভলোদিয়াকে সিরিয়াল দিলো। ভলোদিয়া বোঝে না এতে আন্নার হাসির কি আছে।
পরেরদিন সকালে মা আবার জানতে চাইলো,
-ভলোদিয়া, তুমি কি খাবে?
-সাশা কি খাবে?
-বাটার-রুটি।
-আমাকেও তাই দাও।
সেদিনও আন্না হাসলো। ভলোদিয়ার রাগ হলো। রাগটা আরো বাড়লো যখন সে দেখলো মা নিজেও আন্নার সাথে হাসিতে যোগ দিল।

ভলোদিয়া সাশার মতো খুব ভাল ছাত্র না হলেও সে যথেষ্ট ভাল করতে থাকে। বাবা ইলিয়া অবশ্য ভলোদিয়ার পড়াশুনায় কখনো সন্তোষ প্রকাশ করেন না। ভলোদিয়া বাসায় সাধারণত: কোন হোমওয়ার্ক করে না, সে স্কুলেই শেষ করে আসে। ফলে তার হোমওয়ার্ক বাসায় আনার দরকারও পড়ে না। কিন্তু বাবা ভাবেন ছেলেটা অলস, পড়াশুনা ঠিকমত করছে না অথচ অল্প পড়েই সে ভাল গ্রেড পাচ্ছে। এটা তো তার জন্য ভাল হচ্ছে না। একদিন তাই স্ত্রী মারিয়াকে বললেন,
-তোমার এই ছেলেটি তো ঠিক মতো মানুষ হবে না।
-কেন?
-এত কম পড়ে রেজাল্ট ভাল করলে, ওতো  কোনদিনই পরিশ্রম করার মর্যাদা বুঝবে না।
মারিয়া হাসে। বলে, ‘সবাই কি একরকম হয়? ভলোদিয়াটা একটু অন্যরকম’।

সে যে অন্যরকম তার প্রমাণ দিল কয়েক দিন বাদেই। সেদিন দুপুরবেলা ইলিয়া বাসায় ফিরলেন বেশ রাগান্বিত হয়ে। তিনি সাধারণত: রাগ করেন না। মারিয়া স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কারণটি বুঝবার চেষ্টা করে। ইলিয়া বিয়ের পর থেকে নানা বিষয়ে মারিয়ার উপর নির্ভরশীল। সব বিষয়ে তিনি মারিয়ার সাথে পরামর্শ করে থাকেন। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও বোঝাপড়াটা তাদের চমৎকার। তবু মারিয়া জানে ইলিয়া রেগে গেলে চুপ থাকাই ভাল। ইলিয়ার হাতে একটি চিঠি। চিঠির উপরে ক্লাসিক্যাল জিমনেঝিয়া স্কুলের ছাপ মারা। মারিয়া ভাবে নিশ্চয় স্কুল থেকে কোন খারাপ খবর এসেছে। মারিয়া অনুমান করার চেষ্টা করে-কি হতে পারে? সাশা কিছু করেছে? কিন্তু সাশা তো তেমন ছেলে নয়। তবে কি ভলোদিয়া? এই ছেলেটি তার বড় দু’টি সন্তানের মতো হয়নি। বড় দু’টো শান্ত, চুপচাপ। কিন্তু সে তাদের উল্টো। হৈচৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি করে সে বাড়ী মাতিয়ে রাখে। ভাল-মন্দ, রাগ-ক্ষোভ সে নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারে না। সব কিছু বলে ফেলে। এদিকে সে আবার ভীষণ একগুঁয়ে ও রাগী। তাই মারিয়ার বুকটি ধক্ করে উঠলো। ভলোদিয়া হয়তো সাংঘাতিক কিছু করে থাকবে। কি হতে পারে? তবু ইলিয়া নিজে থেকে না বললে মারিয়া কিছু জানতে চাইবে না বলে ঠিক করলো। রাগে গজগজ করতে করতে এক সময় ইলিয়া নিজ থেকেই বললেন,
-তোমার গুনধর ছেলে কি কাণ্ড করেছে জানো?
মারিয়ার বুঝতে বাকী থাকে না যে ভলোদিয়ার কথাই বলা হচ্ছে। তাই সে শান্তভাবে জানতে চাইলো,
-কি করেছে?
-তোমার ছেলে তার ফ্রেঞ্চ টিচার এ্যাডলফ পোরকে নকল করে ক্লাসের বন্ধুদের দেখিয়েছে। পোর কিভাবে হাঁটে, কথা বলে, ক্লাসে কিভাবে নাক খোটে সব। ওর ক্লাসের এক ছেলে আবার পোরকে তা বলে দিয়েছে। তিনি আবার বিষয়টি হেডমাস্টারকে লিখিত আকারে জানিয়েছেন। আজ হেডমাস্টার আমাকে চিঠি লিখে এই ঘটনা জানালো। আমি তো ভাবতেই পারছি না আমার ছেলে এমনটা করতে পারে। আন্না আর সাশাকে নিয়ে আমি তো কখনো এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়িনি। স্কুল থেকে ফিরলে সে যেন সোজা আমার সাথে দেখা করে। কথাটা বলেই ইলিয়া রাগে গজগজ করতে করতে পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

অন্য আর পাঁচ দিনের মতোই ভলোদিয়া ও সাশা একসাথে বাড়ী ফিরলো। মা ভলোদিয়াকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
-ভলোদিয়া, তুমি তোমার ফ্রেঞ্চ টিচারকে নিয়ে কি করেছো?
ভলোদিয়া বুঝতে পারে ঘটনাটি নিশ্চয় বাবা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।  তা না হলে এই কথাতো মায়ের জানার কথা নয়। হেডমাস্টারকে দেয়া প্রতিশ্রুতি সে রাখতে পারেনি কিন্তু হেডমাস্টার তাঁর কথা রেখেছেন। শিক্ষক এ্যাডলফ পোর ঠিকঠাক মতো পড়াতে পারেন না। আবার ক্লাসে তিনি ফাঁকিও দেন। ছাত্ররা বুঝতে না পারলে উল্টো ছাত্রদের নানারকম শাস্তি দিয়ে থাকেন। এমনও হয়েছে যে তিনি চক পর্যন্ত ছু্ঁড়ে মেরেছেন। আবার তিনি অনেক সময় ক্লাসে আসেন দেরীতে। সেদিনও যথারীতি তিনি ক্লাসে আসতে দেরী করছিলেন। ভলোদিয়া তখন ক্লাসের অন্যদের সামনে এ্যাডলফ পোর যেভাবে কথা বলেন, যে সব ভঙ্গি করেন, সেসব অনুকরণ করে দেখাচ্ছিল। ক্লাসের সবাই সেটা নিয়ে মজাও করছিল। কিন্তু সেটাই পরে হয়তো কেউ পোরকে বলে দিয়েছে। ভলোদিয়া মাকে সব খুলে বলে। মা তাকে বাবার পড়ার ঘরে নিয়ে যাবার আগে বললো, ‘তোমার বাবা কিন্তু খুব রেগে আছেন’।
তারা রুমে ঢুকতেই বাবা জানতে চাইলেন,
-ভলোদিয়া, তুমি এমন আচরণ কেন করেছো?

মাথাটা একটু নীচু করে ভলোদিয়া উত্তর দিলো,
-আমি তাঁকে পছন্দ করি না।

ভলোদিয়ার  কথা শুনে ইলিয়ার রাগ আরো বেড়ে গেল। তিনি রাগত স্বরে বললেন,
-কাউকে পছন্দ না করলে তুমি কি তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে পারো? আমি তোমার আচরণে অত্যন্ত মর্মাহত। আমি কোনদিনই ভাবিনি তুমি এমনটি করতে পারো। থিডোর কেরেনেস্কির কাছ থেকে আমাকে এমন একটি চিঠি পেতে হবে সেটা আমি কল্পনাও করিনি। তুমি আমাকে কতটা অসম্মানের মধ্যে ফেলেছো সেটা বুঝতে পারছো?

ভলোদিয়া চুপ করে থাকে। কোন কথা বলে না। বাবা বলে চললেন,

-এটাই প্রথম ও শেষ। আমি আর কখনও যেন তোমার সম্পর্কে কোন অভিযোগ না শুনি। কথাটা মনে থাকবে?
ভলোদিয়া এবার মায়ের দিকে তাকালো। মায়ের চোখের ভাষাতেও সে যেন বাবার কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পেলো। বাবার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে সে বললো,
-আর এমন হবে না, বাবা।

বাবার পড়ার ঘর থেকে বের হয়ে ভলোদিয়ার মন খারাপ হলো। রাগ হলো সেই বন্ধুটির উপর, রাগ হলো এ্যাডলফ পোর উপর, এমন কি নিজের উপরও। সপ্তাহখানেক পরে ভলোদিয়া যখন তার রিপোর্ট কার্ডটি হাতে পেলো, দেখলো সে সব কিছুতেই খুব ভাল গ্রেড পেয়েছে শুধু ফ্রেঞ্চে ছাড়া। ভলোদিয়ার মনটা একেবারে খারাপ হয়ে গেলো। সে ফ্রেঞ্চ শিখতে আগ্রহ হারাতে শুরু করলো।

দিন পনের বাদে এক শনিবার বিকালবেলা নেফেদেভ ও ভলোদিয়া সাইকেল চালাচ্ছিল ভলগার তীরে। ভলোদিয়া খুব ভাল সাইকেল চালায়। সে ঘন্টার পর ঘন্টা সাইকেল চালাতে পারে। কোন কোন দিন সাইকেল চালাতে চালাতে তারা শহর ছেড়ে অনেকটা দূর চলে যায়। সে ও নেফেদেভ একদিন চলে গিয়েছিল ১৬৬৮ সালে নির্মিত সিমবিরস্কি ফোর্টে। আজ ভলগার তীর ঘেষে সরু পথটা দিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে নেফেদেভ বললো,

-ভলোদিয়া, মি. ল্যাশপিন বলেছেন পাখি ধরার জালটা আগামী শুক্রবার পাওয়া যাবে। টাকাটা তাকে সেদিনই কিন্তু দিতে হবে। তুমি পারবে তো?

সাইকেল চালাতে চালাতেই ভলোদিয়া বলে,

-হ্যাঁ, পারবো। আমি মাকে বলে রেখেছি।

-তাহলে আমরা কবে যাবো পাখি ধরতে?

-শুক্রবারে যদি জালটা হাতে পাই, তাহলে পরের শনিবারেই যেতে পারি।

দু’জনেই বাঁকটা পার হতেই নেফেদেভ প্রশ্ন করে,

-আমরা রবিবারে যেতে পারি না?

-না, রবিবারে বাবার সাথে আমি ও সাশা গির্জায় যাই। ঐ দিন হবে না। এসো এখন পাল্লা দেই। দেখি কে আগে বাড়ী পৌঁছাতে পারে।

-আমি তোমার সাথে পারবো না।

-হাল ছেড়ো না, বন্ধু। চলো শুরু করি।

পরের শুক্রবার বিকাল চারটা নাগাদ ভলোদিয়া ও নেফেদেভকে দেখা গেলো মালি ল্যাশপিনের ঘরের দিকে যেতে। তাদেরকে দূর থেকে দেখেই সে ঘরের ভিতর থেকে জালটি নিয়ে বের হয়ে এলো। নেফেদেভ বললো, ‘ ল্যাশমিন, আমরা কালকেই পাখি ধরতে বের হবো বলে ঠিক করেছি। আমাদেরকে কৌশলটাও একটু শিখিয়ে দিন না’।

ল্যাশপিন মুচকি হেসে বললেন, ‘সেটা দেবো। আগে টাকাটা দাও দেখি’।

ভলোদিয়া পকেট থেকে টাকাটা বের করে তার হাতে দিল। ল্যাশপিন ভলোদিয়ার কাছে জানতে চাইলো, ‘পাখি ধরে কি করবে?’

-এ বছর পুষবো। আগামী বছর শীত আসার আগে আবার ছেড়ে দেবো।

-তোমার বাবা জানেন তো?

-মা, জানে।

-আর নেফেদেভ, তুমি কি করবে?

-আমিও ভলোদিয়ার মতোই।

মি. ল্যাশপিন আর কোন কথা না বাড়িয়ে জাল পেতে পাখি ধরার কৌশল শিখিয়ে দিতে দিতে জানতে চাইলো,

-পাখি যে ধরবে, বড় গাছের মগডালে উঠতে পারো তো?

‘আমরা দু’জনেই খুব ভাল গাছে উঠতে পারি।’ হেসে নেফেদেভ উত্তর দিল।

-সেটা তো খুবই ভাল, কিন্তু দেখো আবার পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলো না!

 সেদিন জাল হাতে পেয়ে দু’জনেই মহা খুশী। ঠিক হলো পরেরদিন বিকাল তিনটা নাগাদ তারা বাড়ী থেকে রওনা দেবে। সেই মতো ঠিক সময়েই রওনা দিয়ে তারা যখন ভলগার শাখা নদী স্ভিয়াগার দক্ষিণ দিকের বাগানটায় গিয়ে পৌঁছালো তখনো রোদ বেশ কড়া। ল্যাশপিনের শেখানো কৌশল মতো গাছের মগডালে জাল পেতে তারা অপেক্ষা করতে লাগলো নীচে। প্রায় দেড় ঘন্টা বসে থাকার পরও জালে কোন পাখি ধরা পড়লো না। নেফেদেভ আর ধৈর্য্য রাখতে পারছিল না। বললো,

-ভলোদিয়া, আজ কোন পাখি ধরা পড়বে না। চলো, ফিরে যাই।

-আরেকটু দেখি। আলোটা কমে আসছে। এসময় পাখিরা সাধারণতঃ ফিরে আসে।

তারা অপেক্ষা করতে লাগলো। এক ঝাঁক সারস উড়ে গেলো অনেক উপর দিয়ে। নেফেদেভ বললো, ‘আগামী শনিবার আমরা কি করবো?’

উড়ে যাওয়া সারস পাখির ঝাঁকটির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ভলোদিয়া উত্তর দিলো,

-ভলগায় সাঁতার কাটা যায়।

-তোমার মা নিষেধ করবেন না তো?

-না, সাঁতার কাটায় বারণ নেই।

কথা বলার মাঝখানেই হুটোপুটি শব্দে তারা একসাথে তাকিয়ে দেখে একটি পাখি জালে আটকা পড়েছে। পাখিটি নিজেকে মুক্ত করতে জোরে জোরে ডানা ঝাঁপটানোর চেষ্টা করছে। জাল থেকে বের হতে যতই সে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে জালের মধ্যে সে আরো বেশী করে জড়িয়ে পড়ছে। ভলোদিয়াকে নেফেদেভ তাড়া দিল। ‘দেখছো কি? তাড়াতাড়ি চলো, না হলে পাখিটি আবার জাল ছিঁড়ে বের হয়ে যেতে পারে’। দু’জনেই গাছে উঠে খুব সাবধানে জালটা নীচে নামিয়ে আনলো। জাল একটু একটু করে সরিয়ে পাখিটি দেখে ভলোদিয়া জোরে একটা চিৎকার দিলো। একটি গোল্ডফিঞ্চ ধরা পড়েছে। পাখিটিকে খুব সাবধানে খাঁচায় পুরে ভলোদিয়া পাখিটিকে দেখতে লাগলো। পাখিটির মুখটি টুকটুকে লাল। মাথাটা সাদা-কালো। পিছনের দিকটি বাদামী অনেকটা যেন কাজু বাদামের রঙ। কালো দুটি ডানার উপরে ও নীচে হলুদ রঙের চওড়া রেখা টানা। লেজটা কালো। পায়ের মাঝামাঝি জায়াগাটুকু আবার সাদা। দেখতে অসম্ভব সুন্দর এই পাখিটির দিক থেকে ভলোদিয়া যেন চোখ ফেরাতে পারছিল না। প্রথম দিনেই গোল্ডফিঞ্চ। এতো মেঘ না চাইতেই জল। ভলোদিয়ার এমন অবস্থা দেখে নেফেদেভ বলে,

-ভলোদিয়া, তোমাকে একটা কথা বলবো?

-কি?

-আমরা তো আরো পাখি ধরবো, না? তুমি যদি অন্য পাখিগুলো আগামী শীতে ছেড়েও দাও, এটাকে তুমি রেখে দিও।

-তুমি বলছো?

-হ্যাঁ।

-হুম, দেখি মাকে রাজী করাতে হবে।

কথাটা বলেই ভলোদিয়া পাখিটির মুখটা খুব ভাল করে খেয়াল করতে লাগলো। নেফেদেভ বললো,

-তুমি এমন করে কি দেখো?

-পাখিটা বোধ হয় মেয়ে!

-কি করে বুঝলে?

-পাখিটার মুখের এই যে লাল অংশটি দেখছো, এটা কিন্তু পুরো মুখ জুড়ে নেই। দেখতে পাচ্ছো?

-হ্যাঁ।

-পুরুষ গোল্ডফিঞ্চের মুখের এই লাল অংশটি থাকে পুরো মুখ জুড়ে।

সেদিন বেলা ডোবার পরপর স্বল্প আলোয় পথ দেখে দেখে দুই বন্ধু খুশীতে আটখানা হয়ে বাড়ীর পথ ধরলো। ভলোদিয়া যখন বাড়ী ঢুকলো, মা তখন রান্নাঘরে। আন্না ও সাশা উপরের ঘরে। বাবা বাড়ীতে নেই। ওলগা ও মারিয়া দিমিত্রিকে নিয়ে এক পাশে খেলছিল। ভলোদিয়ার হাতের খাঁচায় গোল্ডফিঞ্চ দেখে মা একগাল হেসে বললো, ‘ওমা, এটা তো দেখছি গোল্ডফিঞ্চ’।

মায়ের কথা শুনে ছোট বোন মারিয়া দৌঁড়ে এসে বললো, ‘বাহ্ কি সুন্দর! ভলোদিয়া, এটা কিন্তু আমার’।

ভলোদিয়া পাখিসমেত খাঁচাটা ছোট্ট মারিয়ার হাতে দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে তার মনের ইচ্ছেটা বলতেই মা হাসিমুখে রাজী হয়ে গেলো। মা বললো, ‘যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এসো, আমরা ডিনার করবো।’ হাত-মুখ ধোবার জন্য ভলোদিয়া যখন পাশের ঘরে যাচ্ছে সে দেখে গোল্ডফিঞ্চকে ঘিরে ওলগা, মারিয়া ও দিমিত্রি যেন উৎসবে মেতে উঠেছে। ভলোদিয়ার মনটা আনন্দে ভরে গেলো।

 পরের শনিবারে ভলোদিয়া ও নেফেদেভ সাঁতার কাঁটছিল ভলগা নদীর ভদোভজনি সেতুটা থেকে একটু দূরে। হঠাৎ করে ভলোদিয়া দেখে সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে তাদেরই সমবয়সী কিছু ছেলে জাল দিয়ে মাছ ধরছে। ভলোদিয়া বললো, ‘নেফেদেভ চল, মাছ ধরবো’।

-জাল লাগবে তো।

-চল বাড়ী যাই। জাল নিয়ে আসি।

বাড়ী থেকে জাল নিয়ে বের হতেই ওদের সাথে দেখা হয়ে গেলো ওদের স্কুলেরই এক সহপাঠীর সাথে। সে একটু ব্যঙ্গ করে বললো, ‘মাছ ধরতে যাচ্ছো? কোথায়?’

-’ভলগায়, ভদোভজনি সেতুর কাছে।’ উত্তর দিলো নেফেদেভ। ছেলেটি তখন বিদ্রুপের স্বরে বললো,

-পারলে স্ভিয়াগাতে যাও না। নাকি ভয় পাও?

ভলগার এই শাখা নদীতে এর আগে ভলোদিয়া ও নেফেদেভ কয়েকদিন সাঁতারও কেঁটেছে। কি মনে করে ভলোদিয়া ভলগার দিকে না গিয়ে স্ভিয়াগার দিকে যেতে শুরু করে। নেফেদেভ কিছুটা অবাক হয়ে বললো,

-আমরা এদিকে যাচ্ছি কেনো?

-স্ভিয়াগাতেই মাছ ধরবো বলে।

বেশ একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে ভলোদিয়া উত্তর দিলো। নেফেদেভ একটু উসখুশ করতে করতে বলে,

-কিন্তু ঐ নদীতে তো প্রচুর কচুরীপানা। তাছাড়া পাড়টাও অনেক উচুঁ।

-জানি। তবু আজ ওখানেই মাছ ধরবো।

 দুই বন্ধু জাল ও মাছ রাখার একটি পাত্র নিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ালো স্ভিয়াগা নদীর পাড়ে পানি শোধনাগারটির খুব কাছে। এখান দিয়ে ঢালু পথ ধরে নদীটির কিনারে পৌঁছানো যায়। সেদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় লোকজন কম। সেখানে পানি শোধনাগারের এক শ্রমিকের সাথে দেখা হলো। লোকটি জানতে চাইলো, ‘তোমরা কোথায় মাছ ধরবে?’ ’এই তো কাছেই’- বলেই মানুষটির দিকে ভাল করে না তাকিয়েই তারা হন হন করে হাঁটতে শুরু করে। নদীর পাড় বেশ উচুঁ। সেই উচুঁ পাড় থেকে ঢালু পথ ধরে ভলোদিয়া ও নেফেদেভ নামতে থাকে। ভলোদিয়ার ঘাড়ে মাছ ধরার জাল। জালটি যদিও তেমন ভারী নয়। পিঠের উপর ফেলা জালটার অন্য প্রান্তটি শক্ত করে ডান হাত দিয়ে ধরে সামনে সামনে হাঁটছিল ভলোদিয়া। তার পিছনে পিছনে মাছ রাখার পাত্রটি নিয়ে অনর্গল কথা বলতে বলতে নামছিল নেফেদেভ। হঠাৎ ব্যাঙের ডাক শুনে ভলোদিয়া থমকে দাঁড়ালো। ব্যাঙের ডাকটি বড্ড কাতর এবং গোঙানীর মতো শোনাচ্ছিল। শব্দটি ভেসে আসছে কাছের ঝোঁপটি থেকে। ভলোদিয়া ভাবলো নিশ্চয় সাপে ব্যাঙ ধরেছে। ডানদিকের যে ঝোঁপটি থেকে শব্দটি আসছিল, একটু ঝুঁকে ডান পা’টা তুলে সামনে ফেলতেই হঠাৎ করে তার পাটা পিঁছলে গেলো। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই ভলোদিয়া নিজেকে আবিস্কার করলো নদীর পানির গভীরে। সাঁতার জানা ভলোদিয়া দ্রুত উপরে উঠতে গেলো। কিন্তু তার পা আটকে গেলো পানির নীচে থাকা কচুরীপানার লতায়। সে যতই চেষ্টা করছে পা ছাড়াতে, তার পা আরো বেশী করে আটকে যাচ্ছে। নিজেকে তখন সদ্য ধরা গোল্ডফিঞ্চ মনে হলো। একটা অস্পষ্ট শব্দ কিছুটা যেন কোলাহলের মতো ভলোদিয়ার কানে বাজতে লাগলো। সে চিৎকার করে কিছু বলতে গেলো কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ তো বের হলোই না বরং অনেকটা পানি খেয়ে ফেললো। ক্রমশ: ভলোদিয়া শরীরের সব শক্তি হারাতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছে ডুবে যাচ্ছে এবং নিজের উপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। তার চোখের সামনে একবার চকিতের জন্য ভেসে উঠলো সদ্য ধরা গোল্ডফিঞ্চের মুখটা। পাখির ছবিটা অবশ্য দ্রুত মিলিয়ে গেলো আর তার জায়গায় ভেসে উঠলো মায়ের মুখটি। সেই শান্ত, সুন্দর মুখচ্ছবিটি দেখতে দেখতে ভলোদিয়া স্ভিয়াগা নদীতে ক্রমশঃ তলিয়ে যেতে থাকলো!

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top