জলের তলে ভালোবাসা ।।ওয়াহিদ সুজন

২০১৭ সালে হলিউড তথা দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমার তালিকার দুই নাম্বারে আছে ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’। অতি পরিচিত গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। এবারই প্রথম না, নানা ফর্মেটে বারবার হয়েছে। সৌন্দর্যের বাধাধরা দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর গল্পটি প্রতিবার পেয়েছে দর্শক আনুকূল্য।

সময়ের নিরিখে পাল্টাছে প্রযুক্তি। পুরনো থিমকে নতুন রুচির ছাঁচে হয়তো ফেলা যায়। তবে চেতন বা অবচেতনে কিছু ব্যাপার তো প্রায় একই-ই। আর বর্ধিত বাজারে ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এর সর্বশেষ সংস্করণটি আয় করেছে সোয়া এক বিলিয়ন ডলারের বেশি।

যদিও এ আলোচনা ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ নিয়ে নয়। সৌন্দর্য খোঁজার তরিকাও নয়। সৌন্দর্য কী— তাও নয়। এটা ঠিক, ঘটনা যা-ই হোক প্রেমই এখানকার মূল বিষয়। প্রেম ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি থাকার বাধাধরা কাঠামো অপরাপর দিকগুলোতে দৃষ্টিভঙ্গিগত বা রুচিগত ফারাক আকারে হাজির করে কি-না সে দিক থেকে বোধহয় এমন তুলনা। মনে মনে। আর প্রেমই তো ‘কুৎসিত’ (নাকি পশু) হওয়ার মতো অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয়!

এটা আমার চিন্তার দুর্বল দিকও হতে পারে। কিন্তু তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ এর মুগ্ধতা বিষয়ক আলোচনা থেকে ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’কে আলাদা করতে পারিনি।

এমনটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠল কেন? এটা নিশ্চিত নই যদিও। ‌‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ নিয়ে ভাসাভাসা মনে পড়ার ভেতর হাজির হয়ে যায় ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ বা হানা দেয় ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’। বিজ্ঞাপন তো আমাকে আত্মবিশ্বাস যোগায়। নয় কি? বলে ভেতরের সৌন্দর্য খোঁজো, মূলত বলে— বাইরে বাইরে আমাকে কেমন হতে হবে! এরপরই ভেতরে খবর। আর এই খবর কয়জনেই বা রাখে।

মেক্সিকান পরিচালক গিয়ের্মো দেল তোরো পরিচালিত ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায় ১ ডিসেম্বর। যার মূল চরিত্র বাক প্রতিবন্ধি নারী এলিসা (এলিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ডের এলিস নয়)। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধকাল তখন। ১৯৬০ এর দশক। এলিসা যুক্তরাষ্ট্রের অতি গোপনীয় সরকারি গবেষণাগারের ক্লিনার।

ওই গবেষণাগারে রাখা হয়েছে মাছ-মানুষ বৈশিষ্টের এক বিশেষ প্রাণীকে। দেখতে ভয়ঙ্কর, চাল-চলনে কুৎসিত। সাধারণত ভয়ংকরই কুৎসিত। সেই প্রাণীর সঙ্গে এলিসার প্রেম। হৃদয়ের-শরীরের। পরস্পরকে আবিষ্কারের তাড়না যেটাকে বলে, প্রথম দেখায় প্রেম। তা যেন হয়ে যায় এলিসার মাঝে। সে প্রেমের মর্ম বুঝতে পারে প্রাণীটিও। আর প্রেমই দিতে পারে মুক্তি। এলিসা চায় প্রাণীটি ফিরে যাক নিজের ঘরে। অন্যদিকে আমেরিকান সিনেমায় ভালো একজন সোভিয়েত এজেন্টকেও দেখা যায়— যে কি-না নিজ রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীতে গিয়ে প্রাণীটিতে বাঁচাতে এলিসাকে সাহায্য করে। এজেন্টের এ আচরণকে কাজের প্রতি ‘ধ্যান’ আকারে দেখা যায়। যা মূলত প্রেম। হয়তো বা!

‌‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ হলো আকারহীন প্রেমের গল্প। যাকে কল্পনার সাথে মিলিয়েই একটা আকার দেওয়া যায় মাত্র। প্রেম-ভালোবাসার মায়া-আর্দ্র্তা-উষ্ণতা আসলে কোথায় বাধা পড়ে, তার অনুসন্ধানও করা। কিন্তু তার সবই জলের তলে ঢাকা পড়বে। যার পর্দা স্বচ্ছ, তবুও তো পর্দা।

এইভাবে বললে, আমাদের দেখার টুলসগুলো কি বদলে যায় বা আমি কি ভাবালুতায় আচ্ছন্ন হই। হয়তো কিছুটা হয়েই যাই। সুন্দরী তরুণী হলে তার সাথে যদি বিস্টের সঙ্গে দেখা হয়- সে তো রাজপুত্তর। আবার গরীব ছেলের সঙ্গে রাজকন্যার দেখা হলো, সেও কিন্তু দেখতে রাজপুত্তুরের মতোই। মানে রাজপুত্তুর বলতে একটা ‘আবয়ব’ আঁকা আছে মনে। এমনকি দেখেন আমাদের ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’র বেদের মেয়েটিও মূলত রাজকন্যাই, ঘটনাচক্রে বড় হয় বেদে পল্লীতে। নইলে রাজপুত্রের সনে তার বিবাহ কীভাবে হবে?

‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ হয়তো তার বিপরীত নয়। একটা সঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে। তারা কেউ ‘দেখা’ অর্থে ‘সুন্দর’ নয়। তাদের মনের খবরও কেউ রাখে না। আচানকই নিজেদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। অথচ এ দেখাদেখি এতদিন ‘অনুধাবন’, ‘দর্শন’ বা ‘আস্বাদন’ হিসেবে ছিল না। সুন্দরে-সুন্দরে, জাতে-জাতে মিলের মতো তাদেরও কিছু মিল আছে। আফসোস, তাদের গল্প কেউ বলে না।

সিনেমার জাদু বাস্তবতা আমাদের সামনে জাদু হিসেবেই থাকে বলে— একে স্বস্থিকর বলতে বাধা নেই। কিন্তু দৃশ্যমান জগতে শব্দের খেলার ভেতর যেখানে শব্দই বাস্তবকে নির্মাণ করে সেখানে বাকপ্রতিবন্ধী নিজেই খাবি খাওয়া মাছের মতো, ফলত সে সন্ধানও করে তেমন জোড়ের। যে তাকে অনুধাবন করতে পারে। ঠিক যে মন-ই নয়, শরীরের ব্যাপারও।

এটাকে এক অর্থে আধ্যাত্ম বলা যায় কি? জোড় নির্ধারিত হয়ে আছে— অপেক্ষা বা খুঁজে নেওয়ার বিষয় তা! দুনিয়াকে বা তার গড়ে উঠার অন্তর্গত সঙ্গতি বটে। এটা রূপকথাও। এবং এই গল্পগুলো আমি শুনব না কেন? আর অবশ্যই চ্যালেঞ্জ আছে ছকে বাঁধা গল্পকে অবজ্ঞা করার। ফ্যান্টাসির মাধ্যমে তা-ই সম্ভব হচ্ছে। হোক তবে!

হৃদয়ের ক্ষমতা বা সৌন্দর্য হাজির হয় বিস্ময় সমেত। সেই বিস্ময়টুকু গোপন না করেই উপভোগ করা যায়।

সিনেমা বা সংস্কৃতিতে খারাপ বা ভিলেন চরিত্রগুলোকে কুৎসিতভাবে না দেখানোর উদাহরণ বিরল। কিন্তু এ দুনিয়া তো একটা সমন্বয়ের ব্যাপার। বৈচিত্র্য তার সৌন্দর্য। এ বোঝাপড়ার ভেতর আধ্যাত্নিকতা আছে। ফলত দানবীয় অর্থে আপনি যা কিছু বিচার করুন না কেন, ফিরে আসতে হবে হৃদয়ের কাছে। যার কোনো আকার আমাদের জানা নেই। যেমন পানিরও নেই।

ফলে এ গল্প যতটা কি-না যুক্তিহীন ও লুপহোল যুক্ত, ততটাই দেখিয়ে দেয় এমন একটি গল্পকে ধারণ করার জটিলতা। আবার তা এমন একটা সময়ে নির্মিত হয়েছে যখন ঘৃণা ও ভয়ের প্রতি আশকারা দেখবেন সব দিকে। আমিও অপর একটা মন্ত্রের মতো দাঁড়িয়েছে। তুমি আমার মতো নও বা আমার মতের মধ্যে পড়ো না, তবে তুমি শত্রু। সেই সময়ে বসে জলের তলে ভালোবাসা শান্তি শান্তি ভাব নিয়ে আসে। আমাদের অবহেলার দুনিয়া নিজ নিজ অস্তিত্বের তাগিদে ভালোবাসার নতুন গল্প বানাচ্ছে।

(এই লেখার শুরু বেশ আগে। শেষ হতে হতে চলে আসে অস্কার মৌসুম। ‘দ্য শেপ অব ওয়াটার’ জিতে নেয় সেরা সিনেমা ও পরিচালক’সহ চার ক্যাটাগরিতে পুরস্কার।)

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top