দক্ষিণের দেশ II জেলিস খান

১ II আরেকটা দিন

মিষ্টি একটা গন্ধ ঠেকছে নাকে। মিছরির মতো স্বাদ হতো। ভেজা জলের গন্ধ, তাতে মিশে আছে সকাল বেলার রোদ্দুরের ছোঁয়ায় মাছের চোখে লাগা উষ্ণ আলোর স্পর্শ, আছে মেঘ আর জলের নিয়ত কানাঘুষোয় আছড়ে পড়া জলকণা, দূরে কোন গাঁয়ের মেয়ের জলকেলি করা ভেজা সিঁথির ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ। আমি বুঁদ হয়ে থাকি। লঞ্চের ছাদে বসে চারিদিকে দেখি। দেখিও আবার গিলেও খাই, যখনই দেখি একটা মাঠ যেন তেপান্তর, জলের ধারে হিজল গাছ, হাজার পাখির কলতান, তখন গিলি আর যখন দেখি তার পাশেই ইটের ভাটা, তখন হজম করি, দেশের উন্নতির অত্যাচার মেনে নিয়ে স্বপ্ন দেখি বিদেশের মতই হবে আমার দেশ। দেশের বড় নদ-নদীগুলো যেমন তিস্তা আর আত্রাই উত্তর পশ্চিম থেকে এসে যমুনায় মিশেছে, সুরমা, কুশিয়ারা আর ব্রহ্মপুত্র এসে মিশেছে মেঘনায়, অন্যদিকে প্রমত্তা পদ্মা একা একাই নিজেকে টেনে নিয়ে চলেছে বহুদূর, মাঝে একবার মধুমতি নদীকে পাশে নিয়ে মেঘনার সাথে গাল ফুলিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটেছে দিকহারা যেন। চাঁদপুর এর কাছাকাছি হয়ে নিরাপদ দুরত্ব রেখে চলেছে মেঘনা-পদ্মা বহুদূর। পদ্মার ছটফটানি কমে গেলে, মেঘনাকে বিশ্বাস করে এক হয়ে বাদবাকি পথ পাড়ি দিয়েছে, একসাথে জলের স্রোত সমুদ্রে মিশবে বলে। তারপর উন্মত্ত মেঘনা, আশেপাশে জানা অজানা কত চর, আর বিশাল বিশাল ঢেউ, ভাঙ্গছে গড়ছে অবিরাম। নোয়াখালী এসে আরও বিশাল আরো প্রশস্ত হয়ে ত্রিপুরা, মিজোরামপুর, মেঘালয় আর যশোরের থেকে আসা সমস্ত জল নিয়ে সমুদ্রকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে আরো দূরে। মেঘনা আর সমুদ্রের প্রতিনিয়ত এই ঝগড়া যেখানে এসে ক্লান্ত হয়ে হাতে হাত ঠেকিয়ে হলুদ সবুজ রংয়ের উপর শুয়েছে চিত হয়ে, সেখানেই নিঝুম দ্বীপ, আমাদের গন্তব্য।

আধুনিক হবার অপেক্ষায় থাকা নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলার একসময়কার ছোট্ট গ্রাম-দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশ্যে এম ভি ফারহান ৪ নামের এক লঞ্চে করে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ঢাকা সদরঘাট থেকে আমরা সাতজন রওনা দিয়েছিলাম। একজন ছাড়া আর কাউকেই চেনা ছিল না। ঘাটে সবাই পরিচিত হয়ে কিছু শুকনো খাবার কিনে নিয়ে লঞ্চে চড়ে বসলাম। দুএকজনের লঞ্চের অভিজ্ঞতা ছিল না আগে, তাই নানা প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা নিয়ে আলোচনা চলল বেশকিছু সময়। আশেপাশের দৃশ্য দেখার আকাঙ্ক্ষায় সবাই লঞ্চের ছাদে উঠলেও, কালো নোংরা পানির গন্ধে কেবিনে ফিরে যেতে সময় লাগেনি বেশি। রাতে আড্ডা দিতে একটা ভিআইপি কেবিন নেয়া হয়েছিলো, সেখানে ফিরে কেবিন সহকারির সাথে রাতের খাবারের ব্যাপারে আলোচনা করে সবাই হাত মুখ ধুয়ে সোফা আর খাটে বসলাম আয়েশ করে। রুমের সাথে একটা বারান্দাও ছিল, তাতে চেয়ার পেতে রাতে মুগ্ধ হয়ে নদী দেখবো এই আশা নিয়ে সবাই মশিউর ভাইয়ের লঞ্চ নিয়ে বলা খুঁটিনাটি আত্মস্থ করলাম। লঞ্চে কোন অংশে কি থাকে, বয়া কি, লাইফ জ্যাকেট কেন দরকার, যদি কোন কারণে লঞ্চ ডুবে যায় তবে লাফালাফি না করে কিকরে বয়া ধরে বা লাইফ জ্যাকেট নিয়ে বাঁচা যায় – ইত্যাকার নানা ধরনের তথ্য দিয়ে আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে উনার আলোচনা শেষ করতেই, আমরা এবার সবার কুলজি-ঠিকুজি নেয়া শুরু করলাম।

এবারের ভ্রমণে আমরা সাতজন। মশিউর, জিল্লুর, পলাশ, হাবিব, ফেরদৌস, হামিদ আর আমি। আমাদের সবাই প্রায় কাছাকাছি বয়সী। একজন বাদে বাকি সবাই বস্ত্রব্যবসার সাথে জড়িত। পাঁচজনই একটা ব্রিটিশ রিটেইলারে চাকুরি করে, আমার চাকুরি আরেক আইরিশ রিটেইলারে, আর সবেধন নীলমণি পলাশ ভাই চাকুরি করেন আগারগাঁও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এইসব আলাপ-পরিচয়ের ফাঁকে কখন যেন লঞ্চ, পানগাঁও কন্টেইনার ডিপোর সামনে এসে গেলো, জায়গাটা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এ পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যেমন ছোট জাহাজে করে বিভিন্ন পণ্য পরিবাহিত হয় বড় জাহাজে, সেখান থেকে সারাবিশ্বে, তেমনি পানগাঁওয়ের এই ছোট ছোট ফিডার জাহাজগুলো কখনও গভীর সমুদ্রে গিয়ে পন্য খালাস করে নয়ত সিংগাপুর বা কলম্বো গিয়ে উগরে দিয়ে আবার ছুটে আসে এই বন্দরে। এর পাশেই মায়েরস্ক লাইনের আরেকটা ডিপো। আমাদের অর্থনীতির যাত্রাপথ মসৃণ করতে এ ধরনের কাঠামোর কোন বিকল্প নেই।

লঞ্চ কাটুয়াইল, কোন্ডা পেরিয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ কোল্ড স্টোর ডানে রেখে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যায় ভেসে মেঘনায় পড়বে বলে চলেছে। দুপাশে ইটের ভাটা হাহা করে আছে, নদী এখানে এসে বড় হতে শুরু করেছে। দুপাশের বিস্তৃতি অবাক করার মত। কত হাজার লক্ষ কোটি টন জলরাশি প্রতি মুহুর্তে ছুটে চলেছে সমুদ্রে পানে আর আমাদের লঞ্চকেও জড়িয়ে নিয়ে যেন চলেছে গন্তব্যে। পড়ন্ত বেলায় শতশত পাখি তাঁদের নীড়ে ফিরছে। শালিক, চড়াই, বক, ফিঞ্চে, আরও কত রকমের পাখি কিচিরমিচির করে ফিরে আসছে রাতের সময়টুকু একসাথে কাটাবে বলে। পাখিদের কোলাহল পেরোতেই টিমটিমে আলো জ্বলা নৌকায় রাতের আয়োজনে থাকা বেদে, জেলেদের কাঁচের মতো চোখে চোখাচোখি হতে থাকে আমাদের। ক্লান্ত দেহের সাথে সে চোখের ভাষায়, আমাদের এই যাত্রার কোন মিল থাকে না। আরো একবার তাকাতেই ক্রমেক্রমে অপসৃয়মান হতে থাকা মুখের রেখাগুলো মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। মেঘলা আকাশ, গুমোট বাঁধা আবহাওয়া, তবুও অফুরন্ত বাতাস, ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে, কচুরিপানার গন্ধ মিশে কেমন যেন সোঁদা হয়ে আছে। বামে তাকিয়ে দেখি অনেক দূরে গাঢ় রং দিয়ে আঁকা অস্পষ্ট গ্রামেদের ছবি, নদীর ধারে গাছের সারি, মিলিয়ে যেতে থাকে। আমরা নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকি। বাতাসেরা আমাদের মাঝে খেলা করে, কখনও মাথার টুকরো কাপড় উড়িয়ে নিয়ে যায়, কখনও ফাঁকা জায়গায় গোল করে, আবার কখনও কারো ছোঁড়া ময়লা তীব্র গতিতে গায়ে এনে ফেলে, কেউ আফসোস করে, কেউ গালাগাল করে আবার কেউবা হাসে। আমরা কেবিনে ফিরে এসে গল্পগুজব করি, নিরীহ তাশগুলোকে পেটাই আর অন্য সময়ের, ভিন্ন কোন ভ্রমণের গল্প বলি। আমাদের হৃদ্যতা বাড়তে থাকে, রাত গভীর হতে থাকে, পানির স্রোতে তীব্রতা বাড়ে, আমাদের লঞ্চের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে। আবার কোন এক সময় লঞ্চ কোথাও থামে, আমরা বসে থাকি নিশ্চুপ। অপেক্ষা করি আবার ভাসার। দৌলতখান ঘাট ছেড়ে আমরা আবার ভেসে যাই সমুদ্রের আবাহনে।

২ II জানা অজানা

১৬৩ বর্গকিলোমিটার নিঝুম দ্বীপের মাত্র ৩৮ বর্গকিলোমিটার ভূমি আর গাছপালা, বাদবাকি ৭৬ ভাগই জল। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূবে নোয়াখালী জেলার একটি দ্বীপ এটি। একসময় চর ওসমানী, বালুয়ার চর, কমলার চর, স্বর্ণচর নামেও এ দ্বীপকে মানুষ চিনত। বালুর চর বা বাল্যার চর এর নামকরণ আন্দাজ করা যায়, স্বর্ণচর বা সোনার চর ভাবা যায়, কোন মাঝির বা রাখালের নাম ওসমান ছিল হয়তো সেই প্রথম নেমেছিল বলে নামকরণ হয়েছে চর ওসমানি আর কোন এক জাহাজ নদীর বিশাল ঢেউয়ে উলটে গেলে জাহাজে থাকা কমলারবাক্স এসে দ্বীপে পড়ে থাকে; কোন এক জেলেদের দল সে থেকে নিঝুম দ্বীপকে বলে কমলার চর। আর সত্যি হোক কিংবা মিথ্যে, এ চারটি চর আসলে একে একে জোড়া লেগে আজকের নিঝুম দ্বীপকে এক করেছে, গড়ে উঠেছে পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ বন, সমুদ্রের একেবারে কাছে, এক টুকরো ভূমি প্রতিদিন শ্বাস নেয় বেঁচে থাকে তাঁর শেকড়ের মধ্য দিয়ে পুরো দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে রেখে। এছাড়াও আরো একটি চর যা পরে যুক্ত হয়েছে নিঝুম দ্বীপে, ধীরে ধীরে এ  দ্বীপ জেগে উঠেছিল, নাকি প্লাবন ভূমির জলকাঁদা জমে জমে নতুন ইতিহাস গড়ছিল কে জানে! চর মুরি নামে আরেকটি দ্বীপও আজ নিঝুম দ্বীপের অংশ হয়ে আছে। মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত নিঝুম দ্বীপকে সত্যি সত্যিই চার ভাগে ভাগ করা যায়। হাতিয়া থেকে সিবোট, স্পীডবোট, ট্রলার বা নৌকায় এসে নিঝুম দ্বীপে নেমে শুধু বামে তাকালে দেখা যায় চর ওসমান আর বালুয়ার চর, ডানপাশে বাকি অংশ চর মুরি, স্বর্ণচর, কমলার চর যেখানে হরিনদের অভয়ারণ্য। বঙ্গোপসাগরের এই দিকটা বেশ উত্তাল, বিক্ষুদ্ধ, বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে, নৌকা ভেড়ানো সত্যিই অসম্ভবের এক কাজ। পূবের শান্ত সমাহিত প্রবহমান নদীর সাথে দক্ষিণের কোন মিলই নেই, আর পশ্চিম দিক যেন এক সবুজের লীলাভূমি। দূর দূরান্তে তাকালে শুধু সবুজ ঘাস, আর মহিষ, গরু ভেড়াদের পাল চরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে মিঠাপানির খাল, পুকুর। ওরা এখানেই থাকে, এখানেই মরে, তবুও ঝড়জলের দিনে অথবা মানুষেরা তাড়া করলে দল বেঁধে ভাটার সময় দ্বীপান্তর করে।

স্থানীয়দের মধ্যে এ ধারণা আছে যে পঁচাত্তর হাজার মানুষ বসবাস করে নিঝুম দ্বীপে। ইন্টারনেট ঘাঁটলে সর্বোচ্চ চল্লিশ হাজার থেকে সর্বনিম্ন পনেরশো মানুষের বসবাস আছে বলে অনুমিত হবে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে পঁয়তাল্লিশ হাজার ভোটার প্রমাণ করে দেয় কেমন হতে পারে জনসংখ্যা। একই ব্যাপার এখানকার হরিনদের নিয়ে। ১৯৫০ সালের দিকে, নোয়াখালির দক্ষিণে নদীর যেখানে এসে সমুদ্রে মিশেছে সালে সরকারি প্রণোদনায় নিঝুম দ্বীপের বড় একটা অংশ নিয়ে শুরু হয় বনায়ন প্রকল্প। ২০০১ এর ৮  এপিল তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার নিঝুম দ্বীপের জাহাজমারা রেঞ্জের ৪০,৩৯০ একর জমি সহ নিঝুম দ্বীপের প্রায় দশ হাজার একর জমিও “জাতীয় পার্ক” হিসেবে ঘোষণা করে। যদিও সংরক্ষিত বন হিসেবে সরকার ঘোষণা করেছে তথাপি আর সব কিছুর মতোই এখানেও তাদের দেখভাল রুটি রুজিতেই আটকে আছে। তবুও ধীরে ধীরে একটা গভীর বনভূমি এখানে গড়ে উঠতে থাকে আর নানা জাতের নানা রং বেরংয়ের প্রাণির অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে নিঝুম দ্বীপ। ষাটের দশকে চারজোড়া হরিন এনে নিঝুম দ্বীপে ছেড়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে এ দ্বীপে প্রাণিদের অভিয়ারণ্য তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়। বর্তমানে দুরকমের হরিন, ষোল রকমের স্তন্যপায়ী প্রাণি, আর আট প্রজাতির সাপসহ বিশ পঁচিশ প্রজাতির পাখিদের আনাগোনায় সরগরম নিঝুম দ্বীপ। কিছু নেকড়ে দেখতে পাওয়া যায় অনেকে বলে, আমার মতে এগুলো বিভিন্ন রকমের শিয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। আর অবশ্যম্ভাবী ভাবে কিছু জোঁকও আছে এখানে। গাছেদের মধ্যে কেওড়া, গেওয়া, কঙ্করা, বাইন, বাবলা, করমজা, পশুর আর নাম না জানা উদ্ভিদে আর আশি রকমের দুর্লভ গুল্মে ভরে আছে নিঝুম দ্বীপ। প্রাক্তন মন্ত্রী আমিরুল ইসলাম কালাম ১৯৭৯ সালে প্রকৃতির অপরুপ এই সৃষ্টির নিরবতা ও সৌন্দর্য দেখে নামকরণ করেছিলেন “নিঝুম দ্বীপ”। ধীরে ধীরে সভ্য মানুষের পদচারণায় মুখরিত হতে থাকে নিঝুম দ্বীপ। ধীরে ধীরে কমতে থাকে হরিনের সংখ্যা, আর সিডর আইলায় মৃত্যু ঘটে হাজার হাজার হরিনের, দ্বীপ ছেড়ে ভেসে যায় অগুনতি প্রাণি। বনভূমির একটা বড় অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ।

৩ II মনপুরা

আগেই বলা ছিল রাত নয়টায় খাবার দিতে। লঞ্চে যাদের খাওয়ার অভ্যাস নেই, তারা একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন, আমাদের কাছে বেশ সুস্বাদু লাগল। দেশি মুরগী আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে কিছু সময় আবার হাঁটাহাঁটি করে আসলাম। অস্পষ্ট কিছু তারা দেখা গেলো আকাশে, চাঁদের দেখা নেই। নদীর হাওয়ায় নিজেদের শীতল করে কেবিনে এসে গল্পের ফাঁকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সকালবেলা বেশ হুড়োহুড়ি করে উঠে হাত মুখ দিয়ে পাউরুটি আর জ্যাম দিয়ে নাস্তা সেরে, ডেকে এসে বসলাম। স্থানীয় এক ভদ্রলোক আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবেন বলে আমাদের জানানো হয়েছিল, তিনি আমাদের রিসোর্টে নিয়ে যাওয়া থেকে বাকি সব বিষয়গুলো বিশদ করে বলে রাখবেন বলেই আমরা জানি। ভদ্রলোকের নাম নুরুল আফসার কাঞ্চন। আমাদের সাথে উনার দেখা হবে হাতিয়া লঞ্চঘাটে। ভদ্রলোক শিক্ষক, হাতিয়ার ওছখালি বাজারের পিছনেই থাকেন। মনপুরা ঘাটে এসে উনাকে ফোন দিতে হবে। সকাল সাতটায় আমাদের নিয়ে লঞ্চ রামনেওয়াজ ঘাট, মনপুরায় এসে থামে। আমাদের সবার মুখে তখন মনপুরা ছবির দৃশ্য, আর অপরুপ প্রকৃতিকে হজম করতে সবার হাতের বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো ঘনঘন নড়ে চড়ে ওঠে। আমরা মুঠোফোনে, ডিএসএলআরে বন্দী করি ঘাটে ভেড়ানো লঞ্চ, অনেক দূরের কোন চর, সূর্যের আলো আমাদের চোখের তারায় প্রতিভাত হয়ে পড়ে স্থানীয় অধিবাসীদের চোখে। আমরা বিবশ তাকিয়ে থাকি একে অপরের দিকে। তারপর দৃষ্টি এক নিমিষেই চলে যায় সারবাঁধা নারকেল গাছ আর কিছু পরপর নোঙ্গর গেড়ে রাখা নৌকায়। আমরা লঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকি, বাম দিক থেকে উঁকি দেয় আরেকটি লঞ্চ, তারপর একে একে উদয় হয় যাত্রীবাহী ট্রলার, মাছ ধরা নৌকা, ডিঙ্গি – একের পর এক। আমরা ভুলে যাই যন্ত্র দিয়ে সুন্দর ধরে রাখার কথা, আমাদের ডিএসএলআরে শাটার স্পীড বাড়ে-কমে না, হাতেই ধরা থাকে, আর মোলায়েম রোদের পরশে আমাদের মন ভরিয়ে দেয় ‘মনপুরা’।

মনপুরায় আমাদের আর নামা হয় না, লঞ্চ আবার ছোটে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বিশ্রাম করবে বলে। আশেপাশে দৃষ্টিসীমা ফ্যাকাশে হয়ে আসে, ফিতের মত কি যেন দেখা যায়, সবই দ্বীপ, ছোট ছোট। আর নানাদিক থেকে মেঘনার জলরাশি সারা পৃথিবীর ষোলভাগ মিঠাপানিকে হিমালয় থেকে সাগরে পৌঁছে দিতে থাকে। আমাদের দেখার পালা শেষ হয়, উপলব্ধির পাল্লা ভারি হতে থাকে। লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে এক পৃথিবী বিস্ময় নিয়ে এই অপার জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকি। ভেঁপু বেজে ওঠে, ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি আটটা বাজতে চলল। দূরে গাছপালা ভরা মাটির ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। কতগুলো গাঙচিল অথবা আমাদের এলবাট্রেস পাখি দুপাশে সম্বর্ধনা দিয়ে নিয়ে চলে ঘাটে। গাঙচিলগুলো আমাদের দিকে তাকায় না, বিরক্ত হয় কি আমাদের দেখে! হতেও পারে! সার বাঁধা ডিঙ্গি নৌকা, দুটো স্পীডবোট আর জনা পঞ্চাশেক মানুষ ভীড় করে থাকে ঘাটে। আমাদের এইবারের ভ্রমণের ব্যবস্থাপক ফেরদৌস ভাই মুঠোফোনে কাঞ্চন ভাইকে আমাদের হাতিয়া আসার খবর দেন। ঠিক আটটায় আমরা তমরদ্দি লঞ্চঘাট, হাতিয়ায় এসে পৌঁছাই।

৪ II হাতিয়া

আমাদের জন্য তমরদ্দি ঘাট হলেও এখানকার মানুষ হাতিয়া লঞ্চ ঘাট নামেই চিনে। আমাদের জন্য ট্যাক্সি (ঢাকায় যাকে সিএনজি বলে) বলা ছিল, এখানে গ্যাস নেই, তেলে চলে। আমরা হাতিয়ায় যেখানে নেমেছি সেখান থেকে পরবর্তী গন্তব্য চল্লিশ কিলোমিটার। প্রায় দুইঘন্টা লাগবে যেতে, উপকূল ধরে চলে যাবো একটানা, তবে রাস্তা কোথাও কোথাও ভাঙ্গা আছে, মেরামতের কাজও চলছে। ঘাট থেকে নেমে ট্যাক্সি ছাড়াও, মটর বাইক আছে, চাঁদের গাড়ি আছে, অল্প দূরে যেতে রিক্সাও আছে। হাতিয়ার লঞ্চঘাট থেকে পরবর্তী গন্তব্যের নাম চরছেঙ্গা বাজার, জাহাজমারা ইউনিয়ন। নিঝুম দ্বীপ একসময় এই জাহাজমারা ইউনিয়নের একটা অংশই ছিল, আজ নিঝুম দ্বীপ নিজেই আলাদা ইউনিয়ন।
হাতিয়াতে এখন চাষবাসের পাশাপাশি মোটর বাইক চালিয়ে জীবিকা উপার্জন করে আনুমানিক দশ হাজার মানুষ। নানারকম মাছ পাওয়া যায়, উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কোরাল, বাটাল, ইলিশ, চেউয়া। কৃষিকাজও হয়, আলুর চাষ হয়, আষাঢ় শ্রাবণে ধানের চাষ হয়। হাতিয়া নানাকারণেই বিখ্যাত। নিজেদের প্রয়োজনে ওরা একাট্টা। হাতিয়াকে জেলা করার দাবীও কমদিনের নয়। আমাদের এই চল্লিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চৌদ্দটি বিদ্যালয়, চারটি বড় মাদ্রাসা আর দুটি কলেজ চোখে পড়ল। কমলা, নীল, সাদা কত রংয়ের ইউনিফর্ম পরা ছোট ছোট বাচ্চাদের রাস্তার পাশে মেটে পথ দিয়ে যাওয়া দেখে আমাদের মনটাও কেমন হুহু করে উঠল। কিছু বড় ছেলেরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, কেউ কেউ আবার পাশের বাড়ির কোন মেয়েকেও পৌঁছে দিচ্ছে বিদ্যালয়ে। অবস্থাপন্ন বা গেরস্ত ঘরের মেয়েরা সবাই বোরখা পরে। মেয়েরা নেকাব ঝুলিয়ে চলে। কিন্তু খেটে খাওয়া মেয়েরা ম্যাড়মেড়ে শাড়ি পরেই কাজ করে যায়। হাতিয়ার মানুষের মাঝে তাদের নিজেদের প্রতি, মাটির প্রতি যে ভালোবাসা এর সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছি, তার প্রতিফলন পেয়েছি দেয়াল লিখনে “হাতিয়াকে জেলা হিসেবে দেখতে চাই” এই দাবীতে।

হাতিয়ার লঞ্চঘাট তমরদ্দি নেমে বুড়িরচর হয়ে সোনাদিয়াকে হাতের বামে রেখে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার চললে জাহাজমারা ইউনিয়ন। পুরো রাস্তাই একেবারে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে। জাহাজমারার কাছাকাছি হওয়া মাত্রই মেঘনার বাতাসে গায়ে ঠাণ্ডা ধরিয়ে দিতে পারে শরীরে। আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের মনজুড়ানো পরশ আপনাকে ভুলিয়ে দেবে অতীত। চরছেঙ্গা বাজারে এসে নাস্তা করে নিলাম সবাই মিলে। এখানকার জলের স্বাদ মিঠা। চা পর্ব শেষ করে আবার ট্যাক্সিতে করে দুপাশে সবুজ রেখে দিয়ে ছুটে চললাম নিঝুম দ্বীপে। ট্রলারে জাহাজমারা ঘাট পেরিয়ে দশটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে এসে নিঝুম দ্বীপ নামলাম।

৫ II নিঝুম দ্বীপ

জাহাজমারা ঘাট থেকে ট্রলারে করে যখন নিঝুম দ্বীপে রওনা দিই, তখনও মন বলছিল, ভুল করিনি তো! খুব কাছেই হাতিয়া, জলের স্রোতের তোড়ে হারিয়ে গেলে একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কিনা কে জানে! কিন্তু নিঝুম দ্বীপ যেন আমাদের এই ভ্রমণের বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা। ঘাটে নেমেই মনে হলো বামপাশের সবুজ ঘোনা ঘাসের আভা যেন সদ্যখোলা কোন বইয়ের ফ্ল্যাপ। ডান পাশের একটানা ম্যানগ্রোভ বন যেন সে বইয়ের প্রথম পাতা। আমরা মটর বাইকে করে “নিঝুম রিসোর্টে” চলে এলাম। বইয়ের ফ্ল্যাপই আগে দেখে নেই ভেবে দুপুরের আয়োজন সেরে বেরিয়ে পড়লাম নিঝুম দ্বীপের সৌন্দর্য দর্শনে। আমাদের থাকার জায়গা হলো নামাবাজার যাওয়ার আগে। রিসোর্ট থেকে হেঁটেই যাওয়া যায়। আট কিলোমিটার দীর্ঘ আর আট কিলোমিটার প্রশস্ত নিঝুম দ্বীপের মূল ভূখণ্ডের প্রায় মাঝের দিকে আমাদের আস্তানা গাড়লাম। নানা প্রশ্নে কাঞ্চন ভাই আর রিসোর্টের ব্যাবস্থাপককে জর্জরিত করে গোসল গা ধুঁয়ে চেউয়া মাছ, ডালের চর্চরী আর মুরগীর মাংস দিয়ে জম্পেশ খেয়ে পেট ফুলিয়ে ঘড়ি ধরে তিরিশ মিনিট জিরিয়ে বের হলাম পরিচিত হতে নতুন পরিবেশে। কোন রিক্সার টুংটাং নেই, ট্যাক্সির ভেঁপু নেই, গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ নেই, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নেই, সারা বাংলাদেশ থেকে নিমিষেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম যেন সবাই। দূরে হুট করে কোন পাখির উঁউউউই কিটকিটকিট শব্দ, বুনো সারসের গলা চেপে ধরা চিৎকার, কচিত কদাচিৎ ট্রলার ভটভট ইঞ্জিনের শব্দ আর গোঁ গোঁ করে আচানক মটর বাইকের বিটকেলে আওয়াজ বাদ দিলে আমরা বিচ্ছিন্ন ছিলাম সারা দুনিয়া থেকে। নিঝুম দ্বীপের আর পর নেই, মেঘনা এখানে যৌবনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, তার বিশালত্ব, তীব্রতা, বল্গাহীন ঢেউ, কাউকে তোয়াক্কা না করে নির্লজ্জের মতো সমুদ্রে লীন হয়ে যাওয়া দেখে যদি কেউ সেই টানেটানে সমুদ্রে মিশে যায়, তবে স্রষ্টা ছাড়া তাকে কোন যুক্তি, প্রযুক্তিও বাঁচাতে পারবে না অসহ্য সুন্দর মৃত্যু থেকে।

রিসোর্টের কাছেই খাল, সমুদ্রে মিশেছে গিয়ে। ট্রলার আমাদের জন্যই অপেক্ষা করে ছিলো। আমাদের যাত্রা শুরু হলো দুপাশের সবুজকে দেখে, রবাহুত সমুদ্রের গর্জনে আর দূর থেকে মেঘনার আয় আয় ডাকে। আঁকাবাঁকা দুপাশের কিনারা ধরে, জলপথে দুলতে  দুলতে এসে পড়লাম মোহনায়। থৈথৈ জল, গাঙচিলেরা উড়ে বেড়ায় চারপাশে, অফুরন্ত জলের সম্ভারে দিশেহারা হই আমরা। ট্রলার ধীরে ধীরে বাঁক নিতে থাকে বাঁয়ে, উন্মুক্ত হতে থাকে কাঁচা সবুজ ঘাসের মাঠ, অনতিদূরে উঁকি দেয় ডোমার চর। হলদে সবুজের রং দেখে ট্রলার থামিয়ে নেমে পড়ি সবাই। এখানকার ঘাস ধারালো, শরীরে ফুটে যাবে মনে হয়। আমরা ছবি তুলি, বসি খানিক আর কেন যেন মনে হয় এই যে প্রকৃতির রুপলাবণ্য – এ সমস্ত রং স্রষ্টা এখান থেকেই নেন যেন! তুলির পরশে হিমালয় আঁকেন, সুইডেন আঁকেন, বরফসাদা আইসল্যান্ড আঁকেন, আঁকেন গাঢ় সবুজ, নীলজলের ভেলা আঁকেন, আর সব রং নিয়ে রাখেন নিঝুম দ্বীপে। বাংলাদেশ যেন রংদানি আর সেই রংয়ের ধারা শুরু হয় নিঝুম দ্বীপের রংয়ে, মেঘনার জলে মিশিয়ে।

তারপর আবার ছুট। সকালবেলার ঘাট পেরিয়ে আমরা ভাসতে থাকি হরিন দেখব বলে। নিঝুম দ্বীপের চারটি অংশ। নামাবাজার যেতে যে রাস্তাটি পড়ে, নিঝুম দ্বীপের প্রায় আধাআধি অবস্থানে থেকে চলে গেছে নিঝুম দ্বীপ সমুদ্র সৈকতে। আমরা যাইনি সমুদ্র দেখতে। উল্টোপাশে এসে স্থানীয় নাম মধ্যপাড়া দ্বীপের মাঝামাঝি বরাবর ট্রলার থামিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দেখি ম্যানগ্রোভ বন। এক শেকড়ে বাকড়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছে পুরো দ্বীপ। আইলার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে আমরা প্রকৃতি উপভোগ করি। বনের ভেতর ঢুকে হরিন দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে চলতে শুরু করি। আচমকা বেগুনি-হলুদ-সবুজ রংয়ের মেলামেশায় ভ্রম হয় প্রেমিকা যেন দাঁড়িয়েছে শতরঙ্গা শাড়ি পরে। বুকের ধুকপুকানি বাড়ে, নদীর রেখা অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যায়। চারিপাশে কেওড়া, বাবলা, গেওয়া আর কঙ্করা গাছেদের নিস্তব্ধতা আমাদের ভীতচকিত করে তোলে। কোন প্রার্থনাগারে যেমন নিজেকে শুদ্ধ করে যেতে হয়, এখানে বনও যেন নীরব থেকে সেকথা মনে করিয়ে দেয়। চারিদিকে শ্বাসমূল আর রংয়ে রংয়ে ভরা পাতা, প্রজাপতি। আমাদের ভ্রমণ ব্যবস্থাপক সবাইকে ইশারা করে চুপ করতে বলেন। সদ্য ছুটে যাওয়া হরিনের ছাপ দেখে আমাদের একেকজনের চোখাচোখি হয়, রুদ্ধশ্বাস তাকিয়ে আবার পায়ের ছাপ হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি, ইশান, অগ্নি, নৈর্ঋত কোণে কোণে খুঁজি সদ্য চলে যাওয়া হরিনের খুরের ছাপ। আছে কাছাকাছিই আছে ওরা। কেওড়ার কচি পাতা মুখে দিয়ে সব বসে আছে কোথাও গোল হয়ে। আমরা নিশ্চুপ থাকি, প্রকৃতি নিশ্চুপ থাকে, জলের শব্দ শুনিনা, কারো যেন শ্বাসের শব্দ শুনি বহুদূর থেকে। তারপর একেবারে একসাথে পাখিরা ডেকে ওঠে, ঝিঁঝিঁ পোকাদের একটানা কলরবে আমাদের বিষণ্ণতা ঝরে পড়ে। ঠিক তখনই মনে পড়ে জিম করবেটের লেখা, পাখিরা তখনই ডাকে যখন হরিন দৌড়ে যায়। আমরা একমত হয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ি।

শুকনো পাতা, ছোট বড় ডাল মুচমুচ করে ভেঙ্গে যায় আমাদের অনভ্যস্ত চলায়। একসময় চারিদিকে ভাঙ্গা গাছেদের মাঝে আর শ্বাসমূলের ধারালো শেকড়ে চলতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়ি। সবাই বসে আবার জিরিয়ে নেই।  হাবীব ভাই উঠে গিয়ে আরেকটু এগিয়ে যান, আমরা পিছুপিছু চলি। চারিদিকে সাতজোড়া চোখ খুঁজে ফিরি হরিনের দল। হাবীব ভাইয়ের হাতের ইশারা পেয়ে থেমে গিয়ে দেখি একটা, দুইটা, তিনটা দে ছুট! হরিনের একটা দল দৌড়ে পেরিয়ে যায় দূরে। আমাদের কথা কেউ বিশ্বাস করে না। জিল্লুর ভাই আর ফেরদৌস ভাই সিদ্ধান্ত নেয়, অজানা অচেনা জায়গা বেশি ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না। আমরা নদীর ধারে গিয়ে পশ্চিমে চলে যাব। সেখান থেকে দেখতে পেলে পাব, নয়ত কতক্ষণ বসে বিকেল নাগাদ নদীর পাড়ে বসলে এমনিতেই হরিনের দল এসে দাঁড়াবে কিনারায়। প্রায় আধাঘন্টা সোজা উত্তরে হেঁটে ফিরে আসি ট্রলারে। মাঝিরা আমাদের দেখেই বুঝে নেয় হরিন দেখিনি আমরা। সন্ধ্যায় দেখবেন বলে আশা দিয়ে আমরা ট্রলার ভেড়াই মধ্যপাড়া দ্বীপ, তেপান্তরের মাঠে। স্থানীয়রা এ নামেই ডাকে।

এখানে ঘন্টাখানেক বসে মহিষের পালের পাশে জিরিয়ে নিয়ে ফিরে যাই আবার ম্যানগ্রোভ বনে। আগের জায়গায় যখন ফিরে আসি তখন দেখি নদীর কিনারায় হরিনের দল, নিদারুণ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে। হয়ত অপাংক্তেয় মনে করে, নয়ত আশরাফুল মাখলুকাতকে দেখে ভক্তি করে। একটা হরিন ঠায় আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আমরা চোখ ফিরিয়ে নেই। আরেকটু এগোতেই দেখা হয় খেঁকশিয়াল এর সাথে। জানে সন্ধ্যা নামলেই হরিনেরা আসে নদীর কিনারায়, আর মানুষ আসে শিয়াল আসে একই উদ্দেশ্যে, হরিনের খোঁজে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। সেই অপরাধী মন নিয়ে সাতটায় ফিরে আসি রিসোর্টে। মন ভাঙ্গা মন আমাদের তখন। রাতে সব ভুলে আবার আড্ডা হয়, যিনি সময় চালিয়ে দিয়েছেন তার সাথে বিস্তর অভিমান জমে থাকে বুকে। চিনা হাস, মাখামাখা করে রাঁধা এখানকার জনপ্রিয় চেউয়া মাছ সেইসাথে নিয়মিত ডালের চর্চরী দিয়ে ভরপেট খেয়ে বাঁশকাঠের বেঞ্চিতে বসে গান ধরি,

“ও চাঁদ, সুন্দর রুপ তোমার
তারচেয়ে রুপে রাঙ্গা পিয়া আমার”

ঘুমঘুম চোখে প্রিয়ার মুখ ভেসে ওঠে দৃষ্টির স্মৃতিপটে। হলদেসবুজে ভরা হরিণের চোখে কেওড়া পাতার শাড়িপরা নিঝুম দ্বীপ তাড়ায় সারারাত।

৬ II আবার হাতিয়া

বেশ সকাল সকাল উঠে পুকুরের জলে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা সেরে তৈরি হয়ে নিলাম সবাই। নিঝুম দ্বীপ ছেড়ে যেতে যেতে মনে হলো থাকুক এরা এমনভাবেই, সংগ্রাম চলুক মানুষের। দুমুঠো অন্নের জোগাড় করুক এরা এমনি করেই, তবুও প্রকৃতি থাকুক প্রকৃতির মত করেই। দীর্ঘশ্বাস, ক্লান্তি অথবা ভেতরে ভেতরে থাকা কোন অবদমিত ইচ্ছেরা খালি আকুলিবিকুলি করে ওঠে, থেকেই নাহয় যাই। তা তো আর হয় না, আমরা যে সভ্য হয়ে গেছি! এখানে একদিনের বেশি থাকার পরিস্থিতি নেই। ইন্টারনেট নেই, ভারতীয় টিভি চ্যানেল নেই, প্রধানমন্ত্রী কে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই, রিজার্ভের টাকা বাড়ল না কমল সে চিন্তা নেই, তবুও ঢাকায় বসে নিঝুম দ্বীপের হরিনের মাংস খায় অনেকে, হাতিয়ার মাছ ভেড়ে না নদীর কূলে, গুলশান বনানীর সুসজ্জিত ফ্রেমে আঁটা ফ্রিজারে আমাদের লোভের পসরা সাজানো থাকে, আমরা পরিতৃপ্ত হই এখানকার মানুষদের ঠকিয়ে। এমন যদি হয়, যে প্রতিটি জেলাভিত্তিক আয়ের উপর সেখানকার মানুষদের চলতে হবে, তবে হাতিয়া নিঝুম দ্বীপ আর নোয়াখালী যে মুখ টিপে আমাদের নিয়ে হাসবে নিশ্চিত করেই বলা যায়।

নিঝুম দ্বীপ ছেড়ে আমরা হাতিয়ায় নেমে বাইকে করে চলে এলাম সূর্যমুখী ঘাট। আমাদের জন্য প্রতি পদেপদে বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল এই ভ্রমণে, তার আরেকবার প্রমাণ পেলাম হাতিয়ায় এসে। তমরদ্দি, বুড়িরচর, সোনাদিয়া, জাহাজমারা হয়ে আসার সময় গিয়েছিলাম নিঝুম দ্বীপ, এবার বাকি ইউনিয়নগুলোও পেরোবো বলে চরকিং, চরইশ্বর, নলচিরা, সুখচর, চানন্দী, হরণী এর মাঝ দিয়ে ছুটে চললাম। নলচিরার সূর্যমুখী ঘাটেও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হবো হবো করা নতুন সমুদ্র সৈকতের দেখা পেয়ে আমাদের ভালো লাগল। সিডর আইলার ধ্বংসযজ্ঞ নিজের চোখে দেখে দেখে প্রকৃতির বৈরিতার নাকি শাসনের ছোঁয়া পেলাম যেন। রোদ পড়েছে বেশ। ঝাউবনের ভেতর দিয়ে মটরবাইকে করে ছায়াছায়া পরিবেশ থেকে এঁকেবেঁকে বেরিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্য কমলামুখী ডিহি, তারপর ওছখোলা বাজার।

কমলামুখী ডিহি এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার। এখানেও ম্যানগ্রোভ বন, তবে গাছগুলো আরো উঁচু, ঘাসগুলো আরো সবুজ, খালি পায়ে হাঁটতে আরাম। দূরে একটা ডিঙ্গি পড়ে আছে জোয়ারের অপেক্ষায়। ঝিরঝিরে বাতাস তীব্র হতে থাকে আমরা সবাই প্রাকৃতিক হৃদের পাশে বসে থাকি উদাস, আমাদের হিংসে হয়, আমাদের বাড়ি তো এখানেও হতে পারতো! নিয়তির উপর বেজায় রাগ হয়, একসময় দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্ন হয়ে এলে আমরা উঠে পড়ি, পরিতৃপ্ত মনে, মননে, শরীরে। আমাদের সব লাঞ্চনা, না পাওয়া, হতাশাটুকু ম্যানগ্রোভ বন রেখে দেয় তার কাছে। আমাদের মুক্তি দেয় যেন নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে। আমাদের চোখে না হলেও মনে আবেগের কোন ঝরনাধারা ভাসিয়ে নিতে থাকে পুরো সত্ত্বাকে। একটা রুপান্তরের সম্মুখীন হই আমরা। আমাদের অভিজ্ঞতায় একটা সংগ্রামী গুণ যুক্ত হতে থাকে। আমরা আবার পা বাড়াই অতীতে।

চল্লিশ কিলোমিটার পথ, বাইকে করে তিন ঘন্টায় ঘুরলাম। পুরো হাতিয়ার বুক চিরে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়ে দেখে নিলাম বৈপরীত্য বৈচিত্র আর অপার সম্ভাবনার সংগ্রামের প্রতীক হাতিয়া। পাখিদের কলতান, থেকে থেকে ঝোঁকা হাওয়া আমাদের বিদায় জানিয়ে দিল যেন হাতিয়া থেকে। শেষে ওছখোলা বাজারের আগে বাইক থেকে সবুজ মাঠে চোখ যায়। সামনে মিষ্টি আলুর ক্ষেত। কচি সবুজের অগুনতি ডগা থেকে একটা আভা বেরিয়েছে, সেই আভায় গভীর ধ্যানে এক চাষী চোখ তুলে তাকায় আমার দিকে। আমি আটকে পড়ে যাই সেই উদাসী হাসির প্রশ্রয়ের আঁশে, তার দৃষ্টির প্রখরতায় যেন জিজ্ঞাসা লুকিয়ে থাকে, “কেমন ছিলে তোমরা! কেমন দেখলে আমাদের!” আমি নয়ত সে যেন চোখে স্বপ্ন বুনে দেয়, মনে হয় ‘এমন ভাবেও বেঁচে থাকা যায়’।

৭ II ভূরিভোজন ও বিদায়

বাকি ছিল নোয়াখালী মানুষের আতিথেয়তা দেখা। দুপুরে নুরুল আফসার কাঞ্চন ভাই নিয়ে গেলেন তার বাড়িতে। এখানে উনাদের ষোলতম বাড়ি, বারবার ভেঙ্গে ভেঙ্গে পৈত্রিক ভিটা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে হয়ে আজ এখানে এসে ডেরা বেঁধেছেন। উনার বাড়ির পুকুর পাড়ে বসলাম খানিকক্ষণ। তারপর জিল্লুর ভাই আমাদের চিনিয়ে দিলেন কাঞ্চন ভাইয়ের বাগানে করা গাছেদের পরিচিতি। জামরুল, গোলাপজাম, সফেদা, ক্রিসমাস ট্রি, পামগাছ, মেহেন্দি, করমচা, নারকেল, গাবগাছ, পেয়ারা, কাগজী লেবু, আতা আরও কত কি! ফুলেদের মধ্যে হাস্নাহেনা আর গন্ধরাজ দেখলাম, আর বাগানবিলাসও রইলো আমাদের জন্য। আতা ফল পাকে নি তাই খেয়ে আসতে পারলাম না। দুপুরের আয়োজনে ছিল করলা ভাজা, আদমকুনি পাতার শাক, টমেটো দিয়ে ছোট মাছের ভাজি, ডালের চর্চরী আর চেউয়া, তেলাপিয়া, কোরাল, বাটা মাছ। খাবার শেষে ছিল বিখ্যাত মহিষের দই। কিন্তু রসনাবিলাসীদের আরাধ্য হাতিয়ার গরুর মাংসের স্বাদ অতুলনীয়। খেয়েদেয়ে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘাটে। ট্যাক্সি নিয়ে আধাঘন্টায় পৌঁছে গেলাম। আরেকবার চমক এলো। সিবোটে বা ট্রলারে না গিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে স্পীডবোটে যাবো। চল্লিশ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ঢাকায় ফেরাও সহজ হবে। কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, এটা কক্সবাজার নয়, শান্ত কোন রিসোর্টের ভেতরের কোন হৃদ নয়, ছোট্ট কোন নদী নয় – আমরা পাড়ি দিবো হাতিয়া চ্যানেল, প্রমত্তা মেঘনা, এক ঢেউয়ে খড়কুটোর মত উড়ে যায় কত বড় বড় জাহাজ। ভাগ্য ছিল, মেঘনার ভালোবাসা ছিল, নিঝুম দ্বীপের হরিনদের মায়াভরা চোখে আমাদের জন্য ভালবাসা ছিল, আর ছিল ম্যানগ্রোভ বনের উচ্ছ্বাস। আমরা ভিজে গেলাম, দুবার উলটে যেতে যেতে বেঁচে গেলাম, মুঠোফোন ক্যামেরা সবই ভিজে গেল, কিন্তু আমরা বেঁচে গেলাম। এসে পৌঁছলাম চেয়ারম্যান ঘাট, সোনাপুর, নোয়াখালী। সেখান থেকে আবার ট্যাক্সি নিয়ে সোনাপুর বাজার এসে হিমাচল বাস কাউন্টারে নেমে চড়ে বসলাম ‘বাধ্য হয়ে থাকা’ রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে। মাইজদি, বেগমগঞ্জ পেরিয়ে কুমিল্লার লাকসামে এসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পড়লাম। তারপর তো আর কিছু বলার থাকে না। রাত আটটা বাজে তখন স্মৃতিরা ম্রিয়মাণ হতে থাকে, আমার আবার মনে পড়ে সেই চাষীর নিরব দৃষ্টির মর্মাথ, “এমনি করে আমাদের মত হয়েও জীবন উপভোগ করা যায়, এভাবেও বেঁচে থাকা যায়”।

৮ II তথ্যাবলি

ঢাকা থেকে লঞ্চে হাতিয়া পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া তিনশো টাকা। আর কেবিন ভাড়া নিলে দেড় হাজার টাকা। হাতিয়ায় নেমে জাহাজমারা ঘাট যেতে হলে মটর বাইকে খরচ পড়বে জনপ্রতি দুইশো টাকা আর ট্যাক্সিতেও তাই, কিন্তু চারজন বসতে পারলে ভাড়া পড়বে এক ট্যাক্সি ছয়শ টাকা। দামাদামি করার সুযোগ থাকলে পাঁচশো টাকায়ও রাজি করানো যাবে। অনুরোধ কেউ দামাদামি করবেন না।

জাহাজমারা ঘাটে দুটাকা ঘাটভাড়া আর দশটাকা ট্রলার ভাড়া দিলেই আপনি পৌঁছে যাবেন নিঝুম দ্বীপে। সেখান থেকে আপনি কোথায় থাকবেন জানলে মটরবাইক নয়ে তিরিশ অথবা সর্বোচ্চ ষাট টাকা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবেন। রিসোর্টের ভাড়া এক হাজার থেকে দেড়হাজার টাকা রুমপ্রতি। চাইলে গাদাগাদি করে থাকতে পারেন। খাবারের খরচও খুব বেশি নয়, নির্ভর করবে আপনি কী কী খেতে চান। তবে মাথায় রাখবেন এখানে কোন শাকসবজি নেই।

সরাসরি সৈকতে গেলে পঞ্চাশ ষাট টাকা লাগবে মটর বাইকে। আর যদি ট্রলার ভাড়া করে ঘুরে দেখতে যান তবে খরচ পড়বে একহাজার টাকা থেকে তিনহাজার টাকা পর্যন্ত। যদি নিঝুম দ্বীপের ঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করেন তবে খরচ পড়বে একহাজার টাকার মতো।

পরদিন চলে আসলে মটর বাইকে করে ঘাটে নামবেন, তিরিশ বা ষাট টাকা নেবে দূরত্ব অনুযায়ী। তারপর আবার ঘাটভাড়া দুটাকা, পারাপার দশটাকা। সেখান থেকে আমাদের মত যদি সূর্যমুখী সৈকত আর কমলার ডিহি দেখতে চান তবে মটর বাইকে জনপ্রতি তিনশো টাকা করে ঘুরে দেখতে পারেন। দুপুরে হাতিয়ায় খেতে পারেন অথবা নোয়াখালি এসে ভূরিভোজ করে নিতে পারেন।

হাতিয়া থেকে যদি সিবোটে আসেন, তবে জনপ্রতি তিরিশ টাকা পড়বে আর যদি ট্রলারে আসেন তবে একশো টাকা আর যদি স্পীডবোটে আসেন তবে খরচ হবে মাথাপিছু চারশো টাকা করে। চেয়ারম্যান ঘাট থেকে সোনাপুর ট্যাক্সির ভাড়া নির্দিষ্ট চারশো টাকা প্রতি ট্যাক্সি। এভাবে হয়েও আসতে পারেন ঢাকা অথবা যেতে পারেন মাইজদি হয়ে। ঢাকা আসতে জনপ্রতি তিনশো পঞ্চাশ টাকা খরচ হবে নন এসি বাসে।

৯ II কৃতজ্ঞতা স্বীকার

পুরো ভ্রমণে সার্বক্ষণিক আমাদের খোঁজ নিয়েছেন নাহিদ পারভীন আপু এবং দেশের বাইরে থেকে উনার জীবনসঙ্গী বকুল ভাই। আমার সাথে পরিচিয় না থাকলেও একজন মানুষ হিসেবে উনার উপস্থিতি টের পেয়েছি প্রতিটা যাত্রায়, খাবার বেলায় আর পরবর্তী সিদ্ধান্তে। স্পীডবোটে ওঠা নিয়ে উনি রাগও করেছেন। মায়ের মত মমতায় আমাদের যত্ন আত্তি করেছেন ঢাকায় বসেও।

যেচে এসে আমাদের সহযোগিতা করেছেন নুরুল আফসার কাঞ্চন ভাই। কাঞ্চন ভাই না থাকলে এত অল্প সময়ে নিঝুম দ্বীপ আর হাতিয়ার সবগুলো ইউনিয়ন ঘুরে দেখা সম্ভব হতো না।

নিঝুম রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আমাদের বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন যতদূর সম্ভব। মাঝিদের, মটর বাইক চালকদের আর ট্যাক্সি চালকদেরও ধন্যবাদ আমাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে সহযগিতা করার জন্য।

আসার সময় আমাদের যে তাড়াহুড়ো ছিল, তাতে আমার মনে হয়েছে যে প্রবাদ চালু আছে নোয়াখালীর মানুষদের নিয়ে, সে প্রবাদ আসলে আমরাই সত্য করেছি, আমরাই খেয়ে দেয়ে চলে এসেছি আমাদের প্রয়োজনে, বরংচ নোয়াখালীর মানুষদের এই সংগ্রামী জীবনের ঘাত প্রতিঘাতেও যে সুন্দরের সাধনা চলে এ যাত্রায় না এলে অজানাই থেকে যেত সেসব।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top