লেনিন।। পর্ব তিন ।। আশানুর রহমান খোকন

লেনিনপর্ব আঙ্কেল টমস্ কেবিন।।

 

ভলগার শাখা নদী স্ভিয়াগা । প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি পশ্চিমে কাজান পর্যন্ত বিস্তৃত। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নদীর পানি জমে বরফ হয়ে থাকে। অথচ এই নদীটিই সিমবিরস্কি বাসীর পানীয় জলের প্রধান উৎস। দিন দিন শহরের পরিধি বাড়ছে, বাড়ছে সুপেয় পানির চাহিদাও। শহরটিতে এখন প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোকের বাস। গোটা শহর জুড়ে তাই শুরু হয়েছে পানির লাইন বসানোর কাজ। স্ভিয়াগার তীরে অবস্থিত পানি শোধনাগারটিতে তাই ছুটির দিনেও কাজ চলে। কয়েকজন শ্রমিক আজকেও কাজ করছে। সেই শ্রমিকদেরই একজন পানি শোধনাগারটির পাশে নদী পাড়ের বড় পাইন গাছটির নীচে এসে দাঁড়িয়েছে একটু বিশ্রামের জন্য। সূ্র্য এখন মাথার উপরে। মানুষটার ছায়াটা এখন তার নিজের পায়ের নীচে লুটাচ্ছে। কিছুটা দূরে নদীর তীর ঘেঁষে যে মাঝারি আকারের পাইন গাছটি, তারই নুঁয়ে পড়া একটি ডালে একটা মাছরাঙা বসে আছে। পানির দিকে চোখ রেখে পাখিটা চুপচাপ বসে আছে মোক্ষম সময়টির জন্য। পাখিটার দিকে একনজর তাকিয়ে লোকটা শার্টের বুক পকেট থেকে সিগারেট বের করে। সিগারেটের কিছুটা অংশ ঘামে ভিজে গেছে। ফুঁ দিয়ে ঘামে ভেঁজা জায়গাটা সে একটু শুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। বিরক্ত মুখে প্যান্টের পকেট থেকে ম্যাচটা বের করে আগুন জ্বালাতে গিয়ে দেখে ম্যাচের বারুদগুলোও ভেজা ভেজা। পরপর দু’টো কাঠি নষ্ট করে তৃতীয়টা জ্বেলে কোনরকমে সে সিগারেটটি ধরাতে সক্ষম হয়। ভেজা থাকার কারণে সে সিগারেটে জোরে জোরে টান দিতে থাকে। অনেকক্ষণ ক্ষুধা পেটে থাকায় এবং জোরে জোরে ভেজা সিগারেটে টান দেবার কারণেই হয়তো তার মাথাটা একটু চক্কর দিয়ে ওঠে। সে তখন এক পায়ের উপর ভর দিয়ে, অন্য পা’টি হাঁটু বরাবর মুড়ে পাইন গাছটার গুড়িতে নিজের শরীরটা হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। সিগারেটটা বড় বিস্বাদ লাগছে। সেটা যেমন সিগারেটটা ভেজা হবার কারণে হতে পারে আবার গত কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগে মুখের রুচি নষ্ট হওয়াতেও হতে পারে। দিনে চৌদ্দ-পনের ঘন্টা কাজ করেও তার এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মজুরী কম কিন্তু গাধার খাঁটুনি। মজুরী বাড়ে না অথচ জিনিষপত্রের দাম লাগামছাড়া। তাই শরীরটা পুরোপুরি সুস্থ না হলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই তাকে কাজে আসতে হয়েছে। মাঝে মাঝে ভেজা সিগারেটের মতো জীবনটাকেও বড় বিস্বাদ লাগে। স্বাদহীন, গন্ধহীন এই জীবনটা আর ভেজা সিগারেটের স্বাদ যেন তার কাছে এই মুহূর্তে একাকার হয়ে ওঠে। তবু জীবন ধারণের মতোই অভ্যস্ততার কারণে সেই বিস্বাদ সিগারেটটিতে আবারো টান দিয়ে সে গোল গোল বৃত্ত তৈরী করে ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিল। ধোঁয়ার একটি বৃত্ত আরেকটির পিছনে যেন ধেয়ে যাচ্ছে, তাকে ছুঁতে চাচ্ছে। কিন্তু সেটাকে ছোঁয়ার আগে, ধরে ফেলার আগেই সামনেরটা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ার বৃত্ত তৈরীর নিজের কীর্তিটুকু নিজেই যখন মুগ্ধ হয়ে দেখছে ঠিক সেসময় খল খল হাসি আর দুপ-দাপ পা ফেলে দ্রুত হেঁটে আসা এগার-বারো বছর বয়সী ছেলে দু’টিকে সে প্রথম দেখতে পেল।  সামনের ছেলেটি চুপচাপ হেঁটে আসছে। গায়ে হাফ শার্ট,  পরণে হাফ প্যান্ট। তার হাঁটার মধ্যে বেশ একটা দৃঢ়তা ও আত্মমগ্নতা আছে। পিছনে হেঁটে আসা ছেলেটি অনর্গল কথা বলছে। তার পরণেও হাফ প্যান্ট আর গায়ে টিশার্ট। সামনের ছেলেটির কাঁধে জাল আর অন্যজনের হাতে মাছ রাখার পাত্র। মাছ ধরার জাল আর পাত্র দেখে লোকটার অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে ছেলে দু’টি মাছ ধরতেই এসেছে। এই দিকটায় সচারাচর কেউ মাছ ধরতে আসে না। তাছাড়া ছেলে দু’টোর বয়স দেখেও সে কিছুটা অবাক হয়। বর্ষা এখনও শেষ হয়নি। নদীর পানি এখন অনেক উপরে। খুব ভাল সাঁতার না জানলে ঝুঁকি আছে। ছেলে দু’টোকে তাই তার একটু ইঁচড়ে পাঁকা মনে হলো। ওরা যখন তার পাশ কেটে এগিয়ে যেতে থাকে তখন সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘এই, তোমরা কোথায় মাছ ধরবে?’ সামনে হেঁটে যাওয়া ছেলেটি যেন শুনতেই পেলো না। লোকটার মনে হলো ছেলেটি বোধহয় তার নিজের জগতে ডুবে আছে। পিছনে থাকা ছেলেটি যে অর্নগল কথা বলছিল তার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল, ‘এই তো কাছেই’। লোকটি ছেলে দু’টোর আচরণে একটু অবাক হয়। মনে মনে ভাবে ছেলে দু’টো শুধু ইঁচড়ে পাঁকাই নয়, গোঁয়ারও বটে। সে আবার সিগারেটে টান দিল। কয়েকগজ দূরে নদীর পাড়ের যে জায়গাটায় শেয়াল কাঁটার ঝোঁপ আছে তার পাশে অল্প একটু জায়গা জুঁড়ে পাড়টি ভাঙা ছিল। সেই ভাঙা পাড় দিয়ে ঢালু পথ ধরে ছেলে দু’টি নেমে যেতে থাকে। সামনে চলা ছেলেটির হাঁটুর কাছে শেয়াল কাঁটার আঁচড় লাগলেও সে পাত্তা দিল না। লোকটা তখন সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দু’টি পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে নদীর অন্য পাড়ের দিকে তাঁকায়। সিগারেটে আরেকটি টান দিয়ে আবারো গোল গোল বৃত্ত তৈরী করতে করতে পাইন গাছের ডালে বসা মাছরাঙাটির দিকে চোখ যেতেই দেখে মাছরাঙাটি টুপ করে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ঠোঁটে করে একটি মাছ তুলে নিয়ে আবার সেই পাইন গাছের ডালেই এসে বসলো। সিগারেট তখনও শেষ হয়নি, সে চেয়ে চেয়ে মাছরাঙাটির মাছ খাওয়ার ভঙ্গিটি খেয়াল করছিল। ঠিক সে সময় বাচ্চা কন্ঠে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনে তার বুকটা ধক্ করে উঠলো। পড়ি মরি করে ছেলে দু’টি যে দিক দিয়ে নদীর পাড়ে নেমেছিল  সেদিকটায় ছুঁটলো।

নেফেদেভ ভলোদিয়ার পেছন পেছন যাচ্ছিল কথা বলতে বলতে। ভলোদিয়া যেতে যেতে একটু থামতেই সে কথা বন্ধ করে ভলোদিয়ার কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করলো। কিন্তু ভলোদিয়ার কাছে পৌঁছানোর আগেই ভলোদিয়া পা ফঁসকে চোখের নিমেষে নদীতে গিয়ে পড়লো। সে হাতে ধরা পাত্রটি ছু্ঁড়ে ফেলে কোনরকমে নদীর কিনারে পৌঁছে দেখে ভলোদিয়ার হাতের কিছু অংশ তখনও পানির উপরে ভাসছে আর  প্রচন্ড দাপাদাপি করে উপরে উঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু নেফেদেভ যখন দেখলো ভলোদিয়া উপরে উঠতে তো পারছেই না বরং তার হাতের যে অংশটুকু পানির উপরে ছিল সেটাও ক্রমশ: ডুবে যাচ্ছে তখন সে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার শুরু করে। নেফেদেভের চিৎকার শুনে সেই শ্রমিকটি দৌঁড়ে নদীর তীরে এসে দেখে তলিয়ে যাওয়া জায়গাটায় তখনও বুদবুদ দেখা যাচ্ছে। সে একটুও সময় ব্যয় না করে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ডুব দিয়ে ভলোদিয়ার কাছে পৌঁছালে দেখে ছেলেটি দ্রুত জ্ঞান হারাচ্ছে। তার পা’দুটো কচুরীপানার লতায় আটকে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি পা দুটো ছাড়িয়ে তাকে নিয়ে সে যখন তীরে এসে পৌঁছায় ততক্ষণে ভলোদিয়া জ্ঞান হারিয়েছে। নেফেদেভ তখনও চিৎকার করে কাঁদছিল। সে ভাবছে ভলোদিয়া বোধ হয় মারা গেছে। লোকটি তখন রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। ঐ অবস্থাতেও সে ভলোদিয়াকে চিৎ করে শুইয়ে তার পেটে জোরে জোরে চাপ দিতে থাকে। ভলোদিয়ার মুখ দিয়ে পানি বের হতে থাকে। সে বারবার ভলোদিয়ার পেটে চাপ দিচ্ছে আর তার মুখ দিয়ে একটু একটু করে পানি বের হচ্ছে। পানি বের হওয়া বন্ধ হলে লোকটি থামে। ততক্ষণে ভলোদিয়ারও জ্ঞান ফিরতে শুরু করেছে।

ভলোদিয়ার জ্ঞান ফিরলে দেখে সে মাটিতে শুয়ে আছে। তার মুখের উপর ঝুঁকে আছে দুই জোড়া চোখ। একজোড়া চোখ তার চেনা। অন্যজনকে তো চেনা যাচ্ছে না। কি হয়েছিল বুঝে উঠতে ভলোদিয়া একটু সময় নেয়। অল্প অল্প করে তার সব মনে পড়তেই সে উঠে বসতে যায়। তখন সেই অপরিচিত মানুষটি বলে ওঠে,

-‘তাড়াহুড়া করার দরকার নেই, আরেকটু শুয়ে থাকো’। ভলোদিয়া কিছুক্ষণের জন্য চোখ দুটো আবার বন্ধ করে ফেলে।

ভলোদিয়ার চুল থেকে তখনও পানি ঝরছে। মাথার চুলে কচুরীপানার পাতা লেগে আছে। সারা শরীর কাঁদায় মাখামাখি। ভলোদিয়া ভাবছে আরেকটু হলে সে তো মারাই যাচ্ছিল। এই লোকটি কাছে পিঠে না থাকলে বা সময়মত এসে না পৌঁছালে সে হয়তো মারা যেত! চোখ খুলে ভলোদিয়া গভীর কৃতজ্ঞতায় মানুষটির মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ভলোদিয়ার চাহনি দেখে মানুষটি ভাবে ছেলেটি বোধহয় ভয়টা বেশীই পেয়েছে। তাকে সহজ করতে এবং একটু সাহস দিতে সে জানতে চায়,

-তোমার নাম কী?

-ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল পড়ে আসে। ভলোদিয়া এখনও বাড়ী ফিরছে না। মারিয়া একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে।

এমনতো সাধারণত: হয় না। আন্না ও ওলগা গেছে গানের ক্লাসে। সাশা তার ল্যাবরেটরিতে। মারিয়া ছোট মেয়েটি ও ছোট ছেলে দিমিত্রিকে নিয়ে চিন্তিত মুখে বাইরের ঘরে বসে আছে। বেলা তিনটে নাগাদ ভলোদিয়া যখন বাড়ী ফেরে তার চুল তখনও ভেজা, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাঁদার দাগ। মারিয়া উদ্বিগ্ন মুখে দিমিত্রিকে কোলে নিয়েই দ্রুত কাছে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করে,

-একি চেহারা করে বাড়ী ফিরেছো? কী হয়েছে তোমার?

মাকে দেখে আর মায়ের মুখে ব্যাকুল প্রশ্ন শুনে ভলোদিয়া অনেকটা দৌঁড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ভলোদিয়ার কান্না দেখে ছোট্ট মারিয়া এবং দিমিত্রিও কাঁদতে শুরু করে। ন্যানী ছিল আশেপাশেই। সে দ্রুত এসে দিমিত্রিকে কোলে নিলো। ছোট্ট মারিয়াকে এক হাতে আর অন্য হাতে ভলোদিয়াকে জড়িয়ে ধরে মারিয়া আবার বসার ঘরে কালো সোফাটার কাছে ফিরে আসে।

ভলোদিয়া প্রথমে ভেবেছিল বিষয়টি সে বাড়ীতে বলবে না। সে এটাও ভেবেছিল পিছন দিক থেকে বাড়ীতে ঢুকবে কিনা। তাদের মস্কো স্ট্রিটের এই বাড়ী থেকে স্ভিয়াগা নদী দেখা যায়। তাই বাড়ীতে ফিরেই মায়ের মুখোমুখি হয়ে সে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। এছাড়া মায়ের  উদ্বেগ মুখ দেখে এবং সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার কারণে ভলোদিয়া নিজের ভিতরের যে চাপা কান্নাটুকু নদীর তীর থেকে বয়ে বাড়ী পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল সেটুকু আর ধরে রাখতে পারে না। তাই তাকে নিয়ে বসার ঘরে আসার পরও সে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেই থাকে। মায়ের উদ্বেগ তাতে আরো বাড়ে। মারিয়া আবার জিজ্ঞাসা করে,

-ভলোদিয়া, কি হয়েছে? তুমি এমনভাবে কাঁদছো কেন?

ভলোদিয়া একটু শান্ত হয়ে মায়ের কাঁধে মাথাটা রেখেই আস্তে আস্তে মাকে সব খুলে বললো। সব শুনে মারিয়া ভলোদিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মা ভাবে আমার এই ছেলেটা এমন দস্যি হয়েছে কেন? ভলোদিয়াকে গোসলে পাঠিয়ে মারিয়া গেলো তার খাবারের বন্দোবস্ত করতে। এই ঘটনার দিন সাতেক পর ইলিয়া বাড়ী ফেরেন। মারিয়ার কাছে সব শুনে ভলোদিয়াকে ডেকে বললেন,

-ভলোদিয়া, এখন থেকে সাঁতার কাটা তোমার জন্য বন্ধ। আর নেফেদেভের সাথেও তুমি মিশবে না।

ভলোদিয়া কিছুটা ভয়ে ভয়ে মাথা নীচু করেই বলে,

-নেফেদেভের কোন দোষ নেই বাবা।

ইলিয়াও জানে নেফেদেভের কোন দোষ নেই। তার নিজের ছেলেটাই দূরন্ত। তবু ভলোদিয়ার এই বেপরোয়া ঘুরে বেড়ানোটা বন্ধ করা দরকার। আর সেই সাথে তার পড়াশুনায় আরো মনোযোগী হওয়াটা জরুরী। সেই সব ভেবে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তবু মুখে বললেন,

-সেটা নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে না বেড়িয়ে বাড়ীতে বসে সাশার মতো পড়াশুনা করলেও তো পারো!

বাবা কথা শেষ হলে ভলোদিয়া মন খরাপ করে নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে। তার বেশী মন খারাপ হলো বাবার শেষ কথায়।

এই ঘটনার পর ভলোদিয়ার বাইরে ঘুরাঘুরি কমে গেলো। সময় কাটে বই পড়ে, দাবা খেলে। কখনো কখনো সাশার সাথে সাইকেল চালিয়ে। এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে আন্না, সাশা, ভলোদিয়া ও ওলগা গেলো তাদের নানা বাড়ী ককুশকিনোতে। সেখানে  এক বিকালে বাড়ীর সামনের লেবু বাগানে বসে সাশা, আন্না ও তাদের সবার প্রিয় খালাতো বোন মারিয়া  ইভানোভনা ভেরেটেন্নিকোভা গল্প করছিল। গল্পের এক পর্যায়ে কথা ওঠে তাদের পড়া প্রিয় বইগুলো নিয়ে। তারা যখন কথা বলছিল ভলোদিয়া ও ওলগা তাদের কাছাকাছি বসে দাবা খেলছিল। লেবু গাছ ভলোদিয়ার খুব পছন্দের। দাবার চালের ফাঁকে ফাঁকে সে গাছ ভর্তি লেবুগুলোকে দেখছিল। ভলোদিয়া দেখে মারিয়া সাশাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিসের’ কোন চরিত্রটি তোমার সব থেকে ভাল লেগেছে?’। আন্না ও মারিয়ার মুখোমুখি বসা সাশা উত্তর দেয়, ‘ডলোখভ’।

ভলোদিয়া তখন খেলা বাদ দিয়ে কান খাড়া করে তাদের আলোচনা শুনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সাশার উত্তর শুনে সে আন্না ও মারিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখতে তাদের মুখের দিকে তাকালে দেখে আন্না বিস্মিত মুখে সাশার দিকে চেয়ে আছে আর মারিয়া যেন কিছুটা অবাক হয়ে তাকে প্রশ্ন করে,

‘সাশা, তুমি সত্যিই সিরিয়াস?। ডলোখভকে তোমার ভাল লাগে? সে একটা খুনী ও বজ্জাত। যে নিজ হাতে যুদ্ধবন্দী এক ফরাসীকে কাপুরুষের মতো হত্যা করেছে। আর তাকে তোমার ভাল লাগলো? প্রিন্স আন্দ্রেই নয়, পিয়ের নয়, ডলোখভকে তোমার ভাল লেগেছে? আশ্চর্য্য তো! আচ্ছা বলো, তাকে তোমার কেন ভাল লেগেছে?

মারিয়ার  প্রতিক্রিয়ায় মনে হলো আন্নারও সায় আছে। ভলোদিয়া বইটি পড়েনি ফলে সে আলাপের বিষয়টি ভাল বুঝতে পারছিল না। তার ভাল লাগে গোগল, পুশকিন, তুর্গেনেভ, আর চেখভ। এর মধ্য সব থেকে ভাল লাগে তুর্গেনেভকে। তাঁর  ‘এ নেস্ট অব জেন্টলফক’ আর ‘আন্দ্রেই কলোসভ’ বই দু’টি সে কয়েকবার করে পড়েছে। বাবার লাইব্রেরীতে তলস্তয়ের ঐ বইটি সে দেখেছে বটে তবে বইটি অনেক মোটা বলে সে এখনও সাহস করে ওঠেনি। তবুও সাশার উত্তর শোনার জন্য সে সাশার দিকে ঘুরে বসে। ওলগাও খেলা বন্ধ রেখে ভলোদিয়ার পাশে সরে আসে। ঘাসের উপর পড়ে থাকা একটি শুকনো লেবু পাতা হাতে তুলে নিয়ে সাশা উত্তর দিল,

-তলস্তয়ের এত বড় উপন্যাসে ঐ একটি মাত্র চরিত্র যে তার মাকে খুব ভালবাসতো। আর ঠিক এই কারণে চরিত্রটি আমার ভাল লাগে।

সাশার উত্তর শুনে আন্না ও মারিয়া পরস্পরের দিকে চেয়ে দৃষ্টি বিনিময় করলো। আন্না সাশার থেকে দুই বছরের বড় আর মারিয়া সাড়ে তিন বছরের। আন্না ও মারিয়ার কাছে সাশার মন্তব্য সম্ভবত এতটাই অদ্ভুত লেগেছে যে তারা কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। আন্না নিজে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। নিজে কয়েকটি কবিতাও লিখেছে। আন্না ও মারিয়ার দু’জনেরই মনে হলো সাশার কথায় কোন সাহিত্যিক বিবেচনা নেই, যেটা আছে সেটা ব্যক্তিগত আবেগ। তাই হঠাৎ করেই যেন একদম নিরবতা নেমে এলো। কেউ কিছুক্ষণ কোন কথা বলে না। পরিবেশটা অনেকটা ভারী হয়ে ওঠে। ভলোদিয়ার মনে হলো সন্ধ্যাটা যেন ঝপ করে নেমে এলো। সেই গুমোট ও ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশ আর সন্ধ্যার আগমনটা যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। সাশা প্রথমে পরিবেশটা গম্ভীর হয়ে ওঠার কারণটি ধরতে পারেনি। সাশা একবার আন্না আর একবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে সম্ভবত: কিছুটা আঁচ করতে পারে। তার মনে হয় সে তো কিছু মিথ্যা বলেনি। চরিত্রটির ঐ গুনটির কারণে তাকে তার ভাল লেগেছে। যদিও তলস্তয়ের অনেকগুলো লেখাই সে পড়েছে কিন্তু তার ভাল লাগে দস্তয়েভস্কি। গোগলও ভাল লাগে, এমন কি পুশকিনও । পুশকিন ভাল লেগেছে হেডমাস্টার থিডোর কেরেনেস্কির কারণে। তিনি ক্লাসে সাহিত্য পড়ান। তিনি নিজে পুশকিনের ভক্ত। তবে সাহিত্যের থেকে সাশার ভাল লাগে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শন। স্টুয়ার্ট মিল, স্পিনসার আর ডারউইন তার খুব প্রিয়। গুমোট ভাবটা কাটাতে সাশা তার খালাতো বোন মারিয়াকে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবে প্রশ্ন করে, ‘তুমি আঙ্কেল টমস্ কেবিন পড়েছো?’

মারিয়া ইভানোভনা মাথা নেড়ে ‘না’ বলতেই সাশা বলে,’ বইটি পড়তে পারো। আমার ভাল লেগেছে।’ কথাটা যেন একটু খাপছাড়া হয়ে অন্যদের কানে লাগলো। বিশেষতঃ আন্নার। কেন যেন আলোচনাটা আর জমছে না। সুরটা যেন কেটে গেছে আগেই। অন্ধকার হয়ে আসছিল দ্রুত। মারিয়া ও আন্না ভিতরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ায়। সেই সন্ধায় ভলোদিয়ার মাথায় ‘আঙ্কেল টমস্ কেবিন’ নামটাই কেবল ঘুরপাক খেতে থাকে।

গতকালই ছেলেমেয়েরা ককুশকিনো থেকে সিমবিরস্কে ফিরেছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। সেই পড়ন্ত বিকেলে বাড়ীর সামনের লনে উলিয়ানভ পরিবারের কয়েকজন বৈকালিক চা পানের জন্য বসে আছে। লনের ঝাউগাছটির ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করেছে। পরিবারে কর্তা ইলিয়া উলিয়ানভ অফিসের কাজে শহরের বাইরে থাকায় চায়ের টেবিলে আজ অনুপস্থিত। বড় ছেলে আলেকজান্ডার উলিয়ানভ, যাকে পরিবারের সবাই আদর করে সাশা নামে ডাকে সেও বরাবরের মতোই অনুপস্থিত। সামনে তার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। সেটা একটা কারণ বটে তবে সে কারণটি গৌণ। বাড়ীর এক পাশে ছোট্ট একটি ঘর আছে। সেই ঘরটিকে সে তার গবেষণাগার বানিয়েছে অনেকদিন ধরেই। বিজ্ঞানের প্রতি তার ঝোঁক সাংঘাতিক, বিশেষতঃ জীববিজ্ঞানে। মাইক্রোস্কোপ, স্লাইড, জার, স্প্রীট, নানা ধরণের রাসায়নিক জিনিস, কেঁচো, ব্যাঙ, পোঁকা-মাকড়, পত্র-পত্রিকা, বিজ্ঞানের নানারকম বইয়ে ঘরটি ঠাসা। বাড়ীতে যেমন বাবা, স্কুলে তেমনি হেডমাস্টার থিডোর কেরেনেস্কি সাশার গবেষণা কাজের আরেকজন উৎসাহদাতা। ছেলের বিজ্ঞানে উৎসাহ আছে জেনে বাবা  ইলিয়া ‘হিস্টোরিক্যাল জার্নালের’ গ্রাহক করে দিয়েছেন অনেকদিন আগেই। স্কুলের সময় ও রাতের ঘুমটুকু বাদ দিলে সাশা বাকী সময়টুকু ঐ ঘরটিতেই কাটায়। এমনও হয়, কোন কোন দিন আন্না গিয়ে তাকে ঐ ঘর থেকে বের করে আনে। অসম্ভব মেধাবী ও ভাল ছাত্র হওয়ায় পরিবারের এই বৈকালিক চা-পানের আসরে সাশার অনুপস্থিতিটা তাই সবাই মেনে নিয়েছে। বেশ কিছুদিন নানাবাড়ী কাটিয়ে গতকাল বাড়ী ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত সে ল্যাবেই কাটিয়েছে। আজকেও খাবার সময়টুকু বাদে সে ওখানেই আছে। ভ্লাদিমির মানে ভলোদিয়া প্রায়ই উপস্থিত থাকে। বড়রা যখন কথা বলে তখন দেখা যায় সে হয় ওলগার সাথে দাবা খেলছে অথবা ছোট বোন মারিয়া বা ছোট ভাই দিমিত্রির সাথে খেলছে বা গল্প করছে। কখনো কখনো সে এক পাশে বসে বই পড়ে। মারিয়া ও ইলিয়ার এই ছয় সন্তানের মধ্যে একটি চমৎকার ‘জোড়া’ আছে। বড় মেয়ে আন্নার সাথে সাশার ঘনিষ্ঠতা বেশী। ভ্লাদিমিরের সাথে ওলগার। তেমনি মারিয়ার সাথে দিমিত্রির। অথচ আজকের এমন চমৎকার বৈকালিক চায়ের আসরে ভলোদিয়াও অনুপস্থিত। দুপুরের খাবার সময় ভলোদিয়াকে একবার দেখা গিয়েছিল বটে কিন্তু তারপর আর দেখা নেই। মারিয়া তাই আন্নাকে প্রশ্ন করতেই সে জানায়, ‘ভলোদিয়া তার ঘরে কি যেন একটা বই পড়ছে। সে বলেছে শেষ না করে নামবে না।’

আন্না, ভলোদিয়া ও ওলগা পিয়ানো শিখতো। আন্না নিজে খুব ভাল পিয়ানো বাজায়। সে খুব ভাল বেটোফেন তুলতে পারে। ভলোদিয়াও পিয়ানো শিখছিল। তার গানের কন্ঠটিও ভাল। সে পিয়ানো বাজাতে ভালও বাসতো। কিন্তু হুট করে সে পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিয়েছে। মা মনে মনে অখুশী। আজ তাই মারিয়া ওলগার কাছে জানতে চাইলো,

-তোমার পিয়ানো শিখতে কেমন লাগছে?

ওলগা তখন কেবল একটি বিস্কুটে কামড়বসিয়েছে। মায়ের কথার উত্তর দিতে গিয়ে মুখের ভিতর থেকে বিস্কুটের একটি টুকরো পড়ে গেল টেবিলে রাখা চায়ের কাপে। কাপ থেকে গরম চায়ের ছিটা গিয়ে পড়লো ছোট বোন মারিয়ার হাতে। মারিয়া উঃ বলে উঠতেই মা যেখানটায় গরম চা এসে পড়েছিল সেখানে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুছে দেয়। ওলাগা কিছুটা বিব্রত হয়ে উত্তর দেয়,

-আমার ভাল লাগছে, মা।

মারিয়া তখন আন্নাকে প্রশ্ন করে,
-তুমি জানো ভলোদিয়া কেন পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিলো?

আন্না চায়ের কাপ থেকে মুখ তুলে উত্তর দিলো,
-আমাকে কিছু বলেনি তো। মনে হয় ওর স্কুলের পড়ার চাপ বেশী।
ছোট্ট মারিয়া এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। সে হঠাৎ বলে ওঠে,
-আমি জানি, ভলোদিয়া কেন পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিয়েছে।
ছোট্ট মারিয়ার কথায় শুধু আন্নাই নয়, বিস্কুট খাওয়া থামিয়ে ওলগাও তার দিকে তাকায়। মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-তুমি জানো? কি জানো? তোমাকে কিছু বলেছে?
ছোট্ট মারিয়া বিজ্ঞের মতো বলে ওঠে,
-ভলোদিয়া বলেছে, ‘পিয়ানো বাজানো একটি মেয়েলি ব্যাপার’।
‘সত্যি সে এটা বলেছে?’- আন্না জানতে চাইলো।
ছোট্ট মারিয়া উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, বলেছে তো’।
মা বা আন্না কেউ আর কোন কথা বলে না। শুধু তারা দু’জন দু’জনের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। পরিবেশটা অস্বস্তিকর মনে হওয়ায় ওলগা চায়ে মনোযোগ দিল। ওলগার সাথে ভলোদিয়ার ঘনিষ্ঠতা বেশী, কিন্তু ভলোদিয়া তাকে কিছু বলেনি তো। অবশ্য সেও কিছু জানতে চায়নি। মায়ের মুখে আন্না ও ওলগা দু’জনেই প্রবল অসন্তোষের ছাপ দেখতে পেল।

পরিবারের অন্যরা যখন লনে বসে কথা বলছিল ভলোদিয়া তখনও তার ঘরে বসে হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়েরআঙ্কল টমস্ কেবিন পড়ছে। গতকালই তারা নানা বাড়ী থেকে ফিরেছে। ককুশকিনোতে থাকার সময়ই বইটি পড়ার প্রবল আগ্রহ তৈরী হয়েছিল। আজ সকালে তাই বাবার লাইব্রেরী থেকে সে বইটি নিয়ে আসে। সেই সকাল থেকেই ভলোদিয়া টানা বইটি পড়ছে। দুপুরে খাবার জন্য কিছু সময়ের জন্য সে নীচে নেমেছিল বটে তবে বইটি শেষ না করে সে কোনভাবেই উঠতে পারছিল না। ওদিকে বেলা পড়ে আসছে। মা কয়েকবার ডেকেছে, সে সাড়া দেয়নি। বইটি যখন শেষ হলো সূর্য ততক্ষণে ডুবতে শুরু করেছে। বইটি শেষ করে ভলোদিয়ার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। ভলোদিয়া কোনভাবেই টমের করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। সে অস্থির বোধ করতে থাকে।

টম দাস ছিল। টমের মালিক শেলবির দেনা ছিল অনেক। দাস ব্যবসায়ী মি. হ্যাডলী  দাস বিক্রি করে দেনা শোধের পরামর্শ দিলে মি. শেলবি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সৎ দাসটমএবং শেলবির স্ত্রীর দাসী এলিজার ছেলে হ্যারীকে বিক্রি করে দেবে বলে ঠিক করে। এলিজা বিষয়টি শুনে ফেলে সিদ্ধান্ত নেয় পালিয়ে যাবে। আগের দিন তার স্বামী জর্জ হ্যারিসও তাকে পালাবার কথা বলেছিল। সিদ্ধান্ত মতো এলিজা পালায়। দাস ব্যবসায়ী হ্যাডলী তার পিছু নেয় এবং প্রায় ধরে ফেলে। একটি ভাসমান বরফে ভেসে নদী পার হয়ে কোন রকমে সেঅহিওতেপালাতে সক্ষম হয়। হ্যাডলী এলিজার পিছনে অন্য এক লোককে লাগিয়ে নিজে ফিরে আসে টমকে নিতে। তাকে নিয়ে সে তখন দক্ষিণ দিকে যেতে থাকে। পথে টম ইভা নামের একটি বাচ্চা মেয়ের জীবন বাঁচালে, ইভার বাবা টমকে কিনে নেন দাস হিসাবে, যেন টম তার মেয়েকে দেখাশুনা করতে পারে।

টমের নতুন মালিক অগাস্টিন অনেক ভাল লোক। কিন্তু তার বউটি তত ভাল না। ইভা টমকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু ভয়ানক অসুখে ইভার মৃত্যু হলে অগাস্টিন  ভেঙে পড়েন। তিনি টমকে কথা দেন তাকে মুক্তি দিবেন। কিন্তু কাগজপত্র পুরো তৈরী হবার আগেই তিনি খুন হয়ে যান। টম অন্য দাসদের সাথে নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। তার নতুন প্রভু সিমন ভয়ানক নিষ্ঠুর। মৃত্যু অবধি দাসদের  সে খাটায়। অমানুষিক নির্যাতন আর অতিরিক্ত পরিশ্রমে দাসদের মৃত্যু হলে সে আবার নতুন দাস কিনে আনে। শুধু তাই নয় নারী দাসীদের সে বাধ্য করে যৌনকাজে। এমনই দুই নারী দাসী ক্যাসি এমেলিনকে টম পালাতে সাহায্য করে। ফলে টমের উপর নেমে আসে সিমনের ভয়াবহ অত্যাচার। সেই অত্যাচারে টম যখন মৃত্যুমুখে তখনই তার পুরাতন মনিবের ছেলে তার মুক্তির কাগজপত্র নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। টম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে

ভলোদিয়ার প্রথম মনে হলো টম কেন পালিয়ে গেল না। সে নিজে তো পালাতে পারতো? ভলোদিয়া তার মন খারাপ ও অস্থিরতা কাটাতে ভাবলো কারো সাথে কথা বলা দরকার। কিছুটা হন্তদন্ত হয়ে সে গেলো সাশার ঘরে। সাশা তার ঘরে নেই। সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো সাশার ল্যাবরেটরীতে। সাশা তখন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে একটি কেঁচোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। ভলোদিয়ার চিৎকার করে তাকে ডাকতে ডাকতে আসছিল। ভলোদিয়ার চিৎকার ও জোরে জোরে পা ফেলার শব্দে সাশার মনোযোগ নষ্ট হল। সে চোখ তুলতেই দেখে ভলোদিয়া দরজায়। সাশার চোখে জিজ্ঞাসা। ভলোদিয়া অন্য কোন কথা না বলেই প্রশ্ন করে,

-সাশা, টম কেন পালালো না? কেন সে মারা গেল?

সাশা কিছুটা বিস্ময় নিয়ে ভলোদিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

-তুমি কোন টমের কথা বলছো?

-’আঙ্কেল টমস্ কেবিনের’ টমের কথা বলছি।’ ভলোদিয়ার গলায় তখনও যেন ক্ষোভ মিশ্রিত কষ্ট। একই সাথে তার গলায় প্রচন্ড অসহিষ্ণুতা। সেটা লক্ষ্য করে সাশা ভলোদিয়াকে বললো, ‘একটু দাঁড়াও। আমি এগুলো গুছিয়ে রাখি। তারপর তোমার সাথে কথা বলছি’।

সাশার কথায় ভলোদিয়া একটু যেন শান্ত হলো। সাশা আগেও লক্ষ্য করেছে কোন কিছু পড়ার পরে সেটা নিয়ে কারো না কারো সাথে কথা না বলা পর্যন্ত ভলোদিয়া যেন অস্থির থাকে। সাশা তার এই ছোট ভাইটিকে সবসময় একটু প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। সব কিছু গুছিয়ে ভলোদিয়াকে নিয়ে সে যখন বাড়ীর লনে ঝাউ গাছটির কাছে সাজানো চেয়ারগুলোর কাছে এলো ততক্ষণে মারিয়াসহ অন্যরা বাড়ীর ভিতরে চলে গেছে। বাতাসে একটা ঠান্ডা ভাব আছে। যদিও শীত আসতে তখনও কিছুটা দেরী। সাশা ভলোদিয়াকে পাশে বসিয়ে জানতে চায়,

-টমের মৃত্যু না হয়ে অন্য কি হলে তোমার ভাল লাগতো?

-সেও অন্যদের মতো পালাতে পারতো।

সাশা চেয়ারটা ঘুরিয়ে ভলোদিয়ার মুখোমুখি বসলো। তারপর জানতে চাইলো,

-এলিজা, হ্যারিস, ক্যাসি বা এমেলিনের মতো?

-হ্যাঁ।

ভলোদিয়ার উত্তর শুনে সাশা কোন শব্দ ছাড়াই একটু হাসলো। সেই অন্ধকারেও সাশার হাসিটা ভলোদিয়ার চোখ এড়ালো না। তাই ভলোদিয়া বলে ওঠে,

-তুমি হাসলে কেন?

সাশা একটুখানি চুপ করে থাকে। তারপর সাশার বাম হাতের উপর নিজের ডান হাতটি রেখে বলে,

-এই বইটিতে এতগুলো মানুষ, তোমার মন খারাপ কার জন্য? টমের জন্য, তাইতো? আর সেই টমের এমন করুণ মৃত্যু যদি না হতো তাহলে টম কি তোমাকে এমন করে ভাবাতো? টম যদি পালাতো, তাহলে পালিয়ে যাওয়া অন্য দাসদের থেকে আলাদা করে তুমি তার কথা ভাবতে?

ভলোদিয়া চুপ করে সাশার কথা শুনছিল। সে তো এভাবে চিন্তা করে দেখেনি। সাশা আবার বলতে শুরু করে,

-টম একটি সমাজ ব্যবস্থার শিকার। যে সমাজে মানুষ মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করে। এরকম সমাজে টমের মৃত্যুটাই তো স্বাভাবিক, ভলোদিয়া।

সাশার কথা শেষ হলে ভলোদিয়া সাশার মুখের দিকে তাকায়। সেই অন্ধকারে তারা কেউ কাউকে স্পষ্ট করে দেখতে না পেলেও ভলোদিয়া সাশার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে সাশা তো সারাক্ষণ তার ল্যাবরেটরীতে বসে পোকা-মাকড় নিয়ে গবেষণা করে। সে এত বই কখন পড়ে? এসব নিয়ে ভাবেই বা কখন? কিন্তু মুখে সে সব কিছু না বলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চোখটা কুঁচকে কিছুটা যেন দুষ্টুমীর ঢঙে সে বলে ওঠে,

-তুমি এত কিছু জানো কি করে? আমি তো জানি তুমি শুধু কেঁচো নিয়ে গবেষণা করো।

ভলোদিয়ার কথায় সাশা শব্দ করে হেসে তার মাথার চুলগুলোতে একটু বিলি কেটে বলে, ‘চল, ঘরে ঢুকি। ঠান্ডা বাতাস ছাড়তে শুরু করেছে। তা না হলে আবার ঠান্ডা লাগবে।’

পর্ব চার পড়তে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top