মলিয়েরের নাটক ছলনাময়ী। দ্বিতীয় অঙ্ক । রূপান্তর অনীক রহমান

দ্বিতীয় অঙ্ক II প্রথম দৃশ্য

(চরিত্র- কুলসুম, লতিফ; স্থান- আবাসিক এলাকার পার্ক)
কুলসুম- আমি ঠিকই ধরেছি। খবরটা তুমিই কাউকে বলেছো আর সেই ব্যাটা আমার সাহেবের কানে খবরটা পৌঁছে দিয়েছে।
লতিফ- একজন লোক আমাকে তোমাদের বাসা থেকে বেরুতে দেখেছিল। সেই লোকটি কাউকে বলবে না এই শর্তে শুধু হালকার উপর ঝাপসা একটা ধারণা দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাটা যে তোমার স্যারের স্পাই তা আমি বুঝবো কিভাবে?
কুলসুম- খাজা সাহেব গোপন প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার জন্য ভালো লোক পেয়েছেন।
লতিফ- আহা। আমি তো ড্রাইভার। এখন টাকার লোভে স্যারের খবর চালাচালি করছি। এবার প্রথম তো। আশা করি, পরের বার থেকে আর কোন ভুল হবে না।
কুলসুম- দেখা যাবে।
লতিফ- এই প্রসঙ্গ বাদ দাও। তোমার মুখটা একটু ফেরাও না।
কুলসুম- কেন? মুখে আবার কী হলো?
লতিফ- কুলসুম!
কুলসুম- উফ, আবার কী হলো?
লতিফ- ন্যাকা, যেন কিছু বোঝ না।
কুলসুম- না।
লতিফ- এই শোন। আমি না তোমাকে ভালোবাসি।
কুলসুম- (উপহাস করে) তাই নাকি?
লতিফ- বিশ্বাস করো, খোদার কসম। এই তোমার মাথায় হাত রেখে বলছি। তোমাকে দেখলেই আমার বুকটা আনচান করে। কী করে এতো সুন্দরী হলে তুমি?
কুলসুম- (ঢং করে) সবাই বলে, আমি তো জন্ম থেকেই সুন্দরী। জানো, আমি মাসে একবারের বেশি বিউটি পার্লারেও যাই না। ঘষে মেজে আবার রূপ হয় নাকি?
লতিফ- আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। এরপর পরিবার পরিকল্পনা।
কুলসুম- বিয়ের আগে সব ছেলেই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। আর বিয়ের পর আসিফ স্যারের মতো খালি বৌয়ের দোষ ধরে বেড়ায়।
লতিফ- আমি সেরকম লোক নই।
কুলসুম- সন্দেহবাতিকগ্রস্ত স্বামীদের আমি দুই চোখে দেখতে পারি না। আমার এমন স্বামী চাই, যে তিরিশজন লোকের মধ্যে আমাকে দেখলেও কোন অশান্তি করবে না। আমার চরিত্রের উপরে যার পূর্ণ আস্থা আছে। বৌকে সন্দেহ করে ঘরে অশান্তি করা দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ কাজ।
লতিফ- তুমি যা বলবে আমি তা-ই করবো।
কুলসুম- যে স্বামীরা বৌদের সঙ্গে সব বিষয়ে খিটিমিটি করে তারা পরে গিয়ে পস্তায়। আর যারা স্বাধীনতা দেয়, তাদের সঙ্গে মেয়েরা বুদ্ধিমতী ও বিবেচকের মতো আচরণ করে।
লতিফ- ঠিক আছে। আমি খুবই উদার স্বামী হবো, আমাকে বিয়েটা করেই দেখো।
কুলসুম- সময়ে দেখা যাবে।
লতিফ- কাছে এসো, কুলসুম।
কুলসুম- কেন?
লতিফ- আহা! এসোই না।
কুলসুম- আনাড়ি লোক আমি একদমই পছন্দ করি না।
লতিফ- একটু আদর করবো।
কুলসুম- আমাকে টাচ করবে না। এ জাতীয় ইয়ার্কি আমার সহ্য হয় না।
লতিফ- এজন্যেই তো এতো সুন্দরী হয়েও কোন স্মার্ট ছেলে বা দামী শেভ্রোলে গাড়ীর ড্রাইভারকে (নিজেকে ইঙ্গিত করে) বয়ফ্রেন্ড হিসেবে যোগাড় করতে পারলে না।
কুলসুম- একটা চড় দেবো তোমাকে।
লতিফ- ছিঃ! কী হিংস্র, আদিম মেয়ে তুমি কুলসুম।
কুলসুম- তুমি খুব দ্রুত সবকিছু চাও।
লতিফ- একটু সোহাগ করলে কী এমন ক্ষতি?
কুলসুম- সেজন্যে সবুর করতে হবে।
লতিফ- আমাদের প্রেমের শুরু হিসেবে ছোট্ট একটা চুমু।
কুলসুম- খবরদার। বিয়ের আগে এসব নয়। যাই এবার, খাজা সাহেবের চিঠিটা আমার ম্যাডামকে পৌঁছে দিতে হবে।
লতিফ- আসি, পাষাণ হৃদয়ের নিষ্ঠুর সুন্দরী। (প্রস্থান)

দ্বিতীয় অঙ্ক II দ্বিতীয় দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ, অন্তরা; স্থান- আসিফের বাসার লিভিং রুম)
আসিফ- দেখো অন্তরা, এতো সহজে আমাকে বোকা বানাতে পারবে না। তোমাদের গোপন অভিসার বোঝার মতো বুদ্ধি-শুদ্ধি আমার মাথায় আছে। ওই ব্যাটাকে প্রশ্রয় দিয়ে বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্ক নিয়ে তামাশা করছো তুমি।
অন্তরা- কোন ভদ্রলোক আমাকে পছন্দ করলে সেটা কি আমার দোষ?
আসিফ- কোন মেয়ে প্রশ্রয় না দিলে মেয়ে পটানো পুরুষেরা সুবিধা করতে পারে না। তোমার মতো মেয়েরা আকারে-ইঙ্গিতে পুরুষদের আহ্বান করে। আর ভদ্রমহিলারা বরং এ জাতীয় লম্পট পুরুষদের পুরোপুরি এড়িয়ে চলে।
অন্তরা- কেন এড়িয়ে চলবো? কেউ আমার রূপের প্রশংসা করলে আমি খুশী হই।
আসিফ- তাহলে তোমাদের প্রশংসা বিনিময়ের সময় আমার কী করা উচিৎ?
অন্তরা- একজন সুবিবেচক ব্যক্তির যা করা উচিৎ, নিজের বৌয়ের প্রশংসায় আনন্দিত হওয়া।
আসিফ- জেনে ধন্য হলাম। আমি এটা পারবো না। কারণ “জামান পরিবার” তোমাদের মতো অতোটা “সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত” নয়।
অন্তরা- এখন তোমার “সৈয়দ ও চৌধুরী” পরিবারের মতো “সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত” আচরণে অভ্যস্ত হতে হবে। কারণ, উনবিংশ শতকের বৌদের মতো স্বামীর চিতায় দাহ হয়ে নিজের সতীত্বের প্রমাণ দিতে পারবো না। বিয়ের পর সারা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে নিজের সব সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে স্বামীর সব আদেশ মেনে চলতে হবে- এটা খুবই ব্যাক-ডেটেড ধারণা। আমার মতো সুন্দরী তরুণীকে এভাবে জীবন্ত মমি বানাতে চায় এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। উফ! ভাবতে পারছি না।
আসিফ- বিয়ে নামক যে ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধনে আমরা দুজন আবদ্ধ হয়েছিলাম সেটার কী মূল্য থাকলো?
অন্তরা- বিয়ে তো আমি নিজের ইচ্ছায় করিনি। বিয়ের আগে এ বিয়েতে আমার মত আছে কিনা সেটাও তুমি জানতে চাওনি। এসব ব্যাপারে তুমি কথা বলেছো আমার বাবা-মার সাথে। এখন তোমার কোন অভিযোগ থাকলে সেটাও তাদেরই জানানো উচিৎ।
আমাকে বিয়ে করতে আমি তোমাকে অনুরোধ করিনি। আমার পছন্দ-অপছন্দ না জেনেই তুমি আমাকে বিয়ে করেছো, কাজেই তোমার ইচ্ছের দাসত্ব আমি করতে পারবো না। তারুণ্যের এই রঙিন দিনগুলোতে পৃথিবীর সব আনন্দদায়ক জিনিস এবং আমার উদ্দেশ্যে করা সকল প্রশংসা আমি উপভোগ করতে চাই।
এখন নিজের কর্মফল ভোগ করার প্রস্তুতি নাও, আসিফ। আর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো যে, অন্য কিছু করার মতো খারাপ মেয়ে নই আমি।

দ্বিতীয় অঙ্ক II তৃতীয় দৃশ্য

(চরিত্র- কুলসুম, অন্তরা; স্থান- আসিফের বাসার লিভিং রুম)
কুলসুম- ম্যাডাম, খাজা সাহেবের কাছ থেকে খবর এনেছি। স্যার বেরুচ্ছিলেন না বলে আমি ঢুকতে পারছিলাম না।
অন্তরা- কী খবর এনেছো?
কুলসুম- উনি খুব বেশী রাগ করেছেন বলে মনে হলো না। আপনার প্রতি উনার ভালোবাসা একটুও কমেনি।
অন্তরা- বুঝলে কুলসুম, অভিজাত পরিবারের ব্যাপারটাই আলাদা। খাজা সাহেবের পাশে আসিফকে রীতিমত “গেঁয়ো ভূত” মনে হয়।
কুলসুম- ম্যাডাম, আমার ধারণা, খাজা সাহেবের পরিবারকে দেখলে আসিফ স্যারের পুরো পরিবারকেই আপনার “গেঁয়ো ভূত” মনে হবে।
অন্তরা- এক কাজ করো। আজ সন্ধ্যায় তোমার স্যার একটা পার্টিতে যাবে। তুমি সেসময় খাজা সাহেবকে নিয়ে আসবে। আমরা একটু গল্প করবো আর তুমি পাহারা দেবে। কারণ ফোনে কল বা টেক্সট করা নিরাপদ নয়। ধরা পড়ে যেতে পারি।
কুলসুম- ঠিক আছে ম্যাডাম। কোন চিন্তা করবেন না। আমি তাহলে চলি।

দ্বিতীয় অঙ্ক II চতুর্থ দৃশ্য

(চরিত্র- কুলসুম, কাইয়ুম, লতিফ; স্থান- কাইয়ুমের বাসার লিভিং রুম)
কুলসুম- স্যার, আপনার কাজ করে ফেলেছি।
কাইয়ুম- তুমি খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে। একারণেই এই রিলেশনের ব্যাপারে লতিফের চেয়ে তোমার উপরে আমি বেশী ভরসা করি। তোমাকে আমি মোটা অঙ্কের বকশিশ দেবো।
কুলসুম- ধন্যবাদ স্যার। বকশিশের লোভে নয়, আপনার ম্যাডাম আপনাকে ভালোবাসেন বলেই আমি একাজ করছি। আপনার উদারতার জন্য আমিও আপনাকে শ্রদ্ধা করি।
কাইয়ুম- (কিছু টাকা দেয় কুলসুমকে) তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
লতিফ- আমরা যেহেতু বিয়ে করবোই, তোমার সবই তো আমার হবে। টাকাটাও আমাকে দিয়ে দাও।
কুলসুম- আমার আদরের মতো টাকাটাও তোমার জন্যই তোলা থাকলো।
কাইয়ুম- কুলসুম, তোমার ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না।
কুলসুম- আমি তো আছি স্যার। একটু পরে আমার সঙ্গে বাসায় চলুন। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কাইয়ুম- ধরা পড়ে যাবো না তো?
কুলসুম- ধরা পড়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। আসিফ স্যার একটা পার্টিতে যাবেন। আমি নিজে আপনাদের পাহারা দেবো, স্যার। নো টেনশন।
কাইয়ুম- তোমার কথায় আমি ভরসা পেলাম। চল তাহলে বের হই।
কুলসুম- চলুন স্যার। (কুলসুম ও কাইয়ুমের প্রস্থান)
লতিফ- (একান্তে) কুলসুমের মাথায় তো মেলা বুদ্ধি। এক ডজন পুরুষকে ও একাই ঘোল খাওয়াতে পারবে।

দ্বিতীয় অঙ্ক II পঞ্চম দৃশ্য

(চরিত্র- আসিফ, লতিফ; স্থান- আসিফের বাসার লন)
লতিফ- ভাই, আপনি তো একটা আস্ত বাচাল। আপনাকে এতো করে বললাম বিষয়টা গোপন রাখতে আর আপনি কিনা সারা শহরে মাইকিং করে বেড়ালেন।
আসিফ- কে? আমি?
লতিফ- হ্যাঁ। আপনি তো আসিফ সাহেবকে পুরো ঘটনা বলে দিয়েছেন। আর তিনি এক লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়েছেন। আপনার মতো পেট-পাতলা মানুষকে আর কিছুই বলা যাবে না। শিক্ষা হয়ে গেছে আমার।
আসিফ- আহা। ভাই, আমার কথাটা তো আগে শুনবেন।
লতিফ- আপনি যদি আল-জাজিরার মতো ঘটনার পূর্ণ বিবরণ না দিতেন, তাহলে আরও কিছু নতুন ঘটনার কথা বলতাম।
আসিফ- নতুন কী ঘটনা?
লতিফ- সেটা বললে আপনি তো আবার আল-জাজিরা চ্যানেল চালু করে দেবেন। চলি এবার।
আসিফ- চলুন, একটু কফি খাই।
লতিফ- কফি খাইয়ে গোপন কথা বের করতে পারবেন না আপনি।
আসিফ- ঠিক আছে, কফি খেতে হবে না। একটা কথা শুনে যান।
লতিফ- আমাকে দেখে যতটা বোকা মনে হয়, ততটা বোকা কিন্তু আমি নই।
আসিফ- আহা! আপনি বোকা এটা কে বললো? শুধু আমার কথাটা শুনুন।
লতিফ- (উত্তেজিত হয়ে) আপনার কোন কথাই আমি শুনবো না। আপনি আমার কাছ থেকে কখনোই এ খবর বের করতে পারবেন না যে, খাজা স্যারকে কুলসুম অন্তরা ম্যাডামের বাসায় নিয়ে গেছে আর স্যার খুশী হয়ে কুলসুমকে মোটা অঙ্কের বকশিশ দিয়েছেন। এতো বোকা নই আমি।
আসিফ- প্লিজ, বলুন না।
লতিফ- কখনোই নয়।
আসিফ- আপনাকে আমি মোটা অঙ্কের বকশিশ দেবো।
লতিফ- আরে, রাখেন আপনার বকশিশ। আমার বকশিশ আছে কুলসুমের কাছে আর কুলসুমই তো আমার সবচেয়ে বড় বকশিশ। খোদা হাফেজ। (লতিফের প্রস্থান)
আসিফ- আহ! জব্বর একটা খবর পেলাম। এখুনি আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে ডেকে অন্তরার প্রেমলীলা দেখাতে হবে।

দ্বিতীয় অঙ্ক II ষষ্ঠ দৃশ্য

(চরিত্র- সৈয়দ, সৈয়দা, আসিফ; স্থান- সৈয়দ সাহেবের বাসার লিভিং রুম)
আসিফ- আপনারা তো আমার কথা বিশ্বাস করেননি সেদিন। আজ অন্তরার বিশ্বস্ততার প্রমাণ আপনারা স্বচক্ষে দেখতে পাবেন।
সৈয়দ- আসিফ, সেই একই ভাঙা রেকর্ড তুমি এখনো বাজাচ্ছো দেখছি।
আসিফ- উপায় নেই। ঘটনা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
সৈয়দা- বলিউডি ট্রায়াঙ্গল লাভের সিনেমা দেখে তোমার মাথাটা পুরো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন এসব ছাইপাঁশ আষাঢ়ে গল্প বলে আমাদেরও তুমি পাগল করে দেবে।
আসিফ- ম্যাডাম, ঘটনা দেখে-শুনে আসলেই আমার উন্মাদ হওয়ার দশা।
সৈয়দ- দেখো বাবা, তোমার এই একঘেয়ে গল্প শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
আসিফ- অন্তরার দ্বারা প্রতারিত হতে হতে আমিও খুব ক্লান্ত।
সৈয়দা- তোমার এই আজগুবি গল্পের মেগাসিরিয়াল কবে শেষ হবে, বলো তো?
আসিফ- যেদিন আপনাদের মেয়ের প্রেমলীলা শেষ হবে।
সৈয়দা- মুখ সামলে কথা বলবে, আসিফ।
সৈয়দ- ভদ্রতা কী বস্তু সেটা তুমি কখনোই শিখবে না।
আসিফ- আর ভদ্রতা। যার যায়, সেই বোঝে।
“কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।”
সৈয়দা- মনে রেখো, সম্ভ্রান্ত বংশের একটি মেয়েকে তুমি বিয়ে করেছো।
আসিফ- আপনাদের গুণধর মেয়ে অন্তরা সেটা ভুলতে দিলে তো!
সৈয়দা- দেখো আসিফ। অন্তরাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে কথা বলবে।
আসিফ- অন্তরা আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে প্রেম করে বেড়াবে। আর আমি সেটা মুখে বললেই তার অসম্মান হবে?
সৈয়দ- তুমি খাজা কাইয়ুমের সাথে অন্তরার পরকীয়ার যে অভিযোগ এনেছো তা তো সে সেদিনই অস্বীকার করেছে। আমরাও ওকে এসব থেকে দূরে থাকতে বলেছি।
আসিফ- কিন্তু যদি দেখেন তারা দুজন এখনো আমার বাসায় বসে ভরপুর প্রেম চালিয়ে যাচ্ছে, তাহলে কী হবে?
সৈয়দা- তাহলে অন্তরা আমাদের মেয়ে বলে প্রাপ্য শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।
সৈয়দ- সৈয়দ পরিবারের বংশমর্যাদা আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। ঘটনা সত্যি হলে ওকে আমরা ত্যাজ্য করবো। তখন তোমার অপমানের জ্বালা জুড়াতে তুমি ওকে নিয়ে যা খুশী কোরো।
আসিফ- ঠিক আছে। চলুন।
সৈয়দা- কোন ভুল যেন না হয়।
আসিফ- ভুল না ঠিক গেলেই দেখতে পাবেন।

দ্বিতীয় অঙ্ক II সপ্তম দৃশ্য

(চরিত্র- অন্তরা, কাইয়ুম, কুলসুম, সৈয়দ, সৈয়দা, আসিফ; স্থান- আসিফের বাসার লিভিং রুম)
অন্তরা- বিদায়, খাজা সাহেব। ধরা পড়ার ভয় হচ্ছে।
কাইয়ুম- যাচ্ছি। শুধু কথা দিন, নিয়মিত দেখা করবেন।
অন্তরা- সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
কুলসুম- (ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রবেশ) ম্যাডাম, আসিফ স্যার আপনার বাবা-মাকে নিয়ে এদিকেই আসছেন।
কাইয়ুম- আল্লাহ্‌ মালিক।
অন্তরা- (নিচু স্বরে কাইয়ুমকে) নির্বিকার থাকুন। যা করার আমিই করছি। (সৈয়দ, সৈয়দা ও আসিফ পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে সব শুনবে।)
(উঁচু স্বরে) এই ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস আপনি কোত্থেকে পেলেন? বলছেন, আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন। আমাকে না পেলে আপনি বাঁচবেন না। আপনাকে আগেও বলেছি, আমাকে বিরক্ত করবেন না। কিন্তু আপনি তো ভারী নাছোড়বান্দা।
আপনি আমাকে নিয়ে হানিমুনে যেতে চান হাওয়াই দ্বীপে। কতো বড়ো স্পর্ধা আপনার। আমাকে কি রাস্তার মেয়ে পেয়েছেন? আপনি বললেই আমি আপনার সাথে হাওয়াই-হনুলুলু-হংকং চলে যাবো, এটা ভাবলেন কিভাবে?
সৈয়দ বংশের মেয়ে আমি, বংশের বদনাম হয় এমন কোন কাজ আমি করবো না। আসিফের সঙ্গে আমি পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। এ বন্ধন নিয়ে প্রতারণা করার শিক্ষা বাবা-মা আমাকে দেন নি।
বাবা জানলে আপনাকে উচিৎ শিক্ষা দিতেন। আমি তাঁর মেয়ে, সৈয়দা অন্তরা জামান। আজ আমিই আপনাকে ধোলাই করবো। (সৈয়দ, সৈয়দা ও আসিফের প্রবেশ)
(পাশে রাখা লাঠি নিয়ে কাইয়ুমকে তাড়া করলে সে দৌড়ে বেড়াবে।)
কাইয়ুম- আমাকে মারবেন না, প্লিজ। আমি খাজা বংশের ছেলে।
কুলসুম- ম্যাডাম, আজ খাজা-গজা সব মেরে ভাজা ভাজা করে ফেলুন।
অন্তরা- পিটিয়ে আজ আপনার প্রেমের ভূত নামাবো।
কুলসুম- ভূত-পেত্নী সব নামিয়ে দিন ম্যাডাম।
(আসিফ, সৈয়দ ও সৈয়দা অন্তরাকে থামাতে গেলে কাইয়ুম আসিফের পিছনে লুকাবে। অন্তরা কাইয়ুমকে লাঠির বাড়ি দিতে উদ্যত হলে মাঝে থাকা আসিফের গায়ে লাগবে।)
অন্তরা- (বিস্মিত হওয়ার ভান করে) বাবা! মা! তোমরা কখন এলে?
সৈয়দ- তোমার বিচক্ষণতা ও সাহস দেখে আজ বুঝেছি, সৈয়দ বংশের যোগ্য মেয়ে তুমি। এসো মামণি, আমার কাছে এসো।
সৈয়দা- বুকে এসো মামণি, তোমাকে আদর করি। আনন্দে আমার চোখে পানি এনে দিয়েছো তুমি। চৌধুরী বংশের রক্ত আজ কথা বলছে।
সৈয়দ- অন্তরার বিশ্বস্ততা দেখে আমার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী স্বামী হলে তুমি। তোমার মনে যে আশঙ্কা ছিলো, আশা করি, তা আর নেই।
সৈয়দা- সত্যিই তুমি ভাগ্যবান, আসিফ।
কুলসুম- হ্যাঁ, স্যার। এতো ভালো বৌ পেলে যে কোন পুরুষ মাথায় করে রাখবে।
আসিফ- (একান্তে) নষ্টা মেয়েছেলে কোথাকার।
সৈয়দ- আসিফ, তোমার জন্য ওর যে ভালোবাসা আমরা দেখলাম তাতে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অন্তরার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ।
অন্তরা- সৈয়দ বংশের একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মেয়ের যা করা উচিৎ, আমি কেবল তা-ই করেছি। এজন্য আসিফ গর্বিত হতে পারে, কিন্তু কৃতজ্ঞতার কিছু নেই। আমি ভিতরে গেলাম, বাবা।
সৈয়দ- কেন, মামণি?
অন্তরা- মরবিড জেলাসিতে ভোগা একজন স্বামীর সঙ্গে ঘর করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কুলসুম- ম্যাডাম তো রাগ করবেনই। উনি মাসুম বাচ্চার মতো নিষ্পাপ আর সাহেব উনাকে খালি সন্দেহ করেন।
আসিফ- (একান্তে) একটা ডাইনী, আরেকটা শাঁকচুন্নি।
সৈয়দ- তুই ঠিক বলেছিস কুলসুম। বাবা আসিফ, তোমার এই সন্দেহ বাতিক দেখে অন্তরার বিরক্ত হওয়াটা অযৌক্তিক নয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এসব ছোট-খাট ঝামেলা হয়েই থাকে। এটা তোমরা আলাপ করলেই মিটিয়ে নিতে পারবে।
সৈয়দা- চৌধুরী এবং সৈয়দ- এই দুই বংশের কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড়ো হয়েছে অন্তরা। কোন ধরনের ব্লেম গেমে মামণি অভ্যস্ত নয়। আশা করি, তোমার ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে। চল সৈয়দ, এবার আমরা যাই।

প্রথম অঙ্ক: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3569

তৃতীয় অঙ্ক: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4285

 

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top