লেনিন।। পর্ব চার।। আশানুর রহমান খোকন

লেনিনপর্ব ৪।। সেন্ট পিটার্সবার্গ।।

সিমবিরস্কের পাবলিক লাইব্রেরিটির নাম কারামজিন। অষ্টাদশ শতকের রাশিয়ান ঐতিহাসিক নিকোলাস কারামজিনের নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়। ক্লাসিক্যাল জিমনেঝিয়া স্কুল থেকে লাইব্রেরিটির দূরত্ব খুবই কম। অথচ স্কুলের ছাত্রদের জন্য তা নিষিদ্ধ। হেডমাস্টার থিডোর কেরেনেস্কির কড়া হুকুম তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোন ছাত্র পাবলিক লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারবে না। ১৮৮১ সালে জার আলেকজান্ডার নিকোলাস-২ খুন হন। সেই হত্যাকান্ডের পর সরকার যে সব কড়াকড়ি আরোপ করেছে এটাও তারই অংশ। কিন্তু এর ফল হলো উল্টো। অনেকের লাইব্রেরির প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেলো। বুদ্ধিমান ও সাহসী যারা, তারা গোপনে লাইব্রেরিতে যাতায়াত করতে থাকলো। এদিকে জিমনেঝিয়া স্কুলের ছাত্রদের ক্রুশ পরা বাধ্যতামূলক না হলেও গির্জায় যাওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। গির্জাগুলো জারের কড়া সমর্থক। ফলে ধর্মভক্তি ও জারভক্তি সমার্থক ভাবা হতে লাগলো। সাশা তখন ক্রুশ না পরলেও ভলোদিয়া ক্রুশ পরে। প্রত্যেক রবিবার সাশা ও ভলোদিয়া বাবার সাথে গির্জায় যায়।

তেমনি এক রবিবারে সন্ধ্যার একটু আগে ভলোদিয়া গির্জায় যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। সাশা তখনও তার ল্যাবরেটরিতে। অন্য রবিবারগুলোতে গির্জায় যাবার জন্য তৈরি হতে সাশা সন্ধ্যার আগেই ল্যাবরেটরি থেকে বের হতো। কিন্তু কেন জানি আজ সে আসছে না। ইলিয়া তাই ভলোদিয়াকে পাঠায় তাকে ডাকতে। ইলিয়া বসার ঘরে কালো সোফাটায় বসে ছেলেদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ভলোদিয়া সাশাকে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই তিনি জানতে চান,
-তুমি এখনও তৈরি হওনি? গির্জায় যাবে না?
-না, বাবা। আমার স্কুলের জন্য কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে শেষ করতে হবে। তাছাড়া সামনে আমার ফাইনাল পরীক্ষা, আমার পড়াশুনারও একটু চাপ আছে।

সাশা কথাগুলো বললো মাথা নীচু করে। বাবার সাথে ছেলেমেয়েরা ঠিক সহজ হতে পারে না। সাশার দিকে তাকিয়ে ইলিয়া বলেন,
-ঠিক আছে। তোমার পড়াশুনার ক্ষতি করে গীর্জায় যাবার দরকার নেই।
বাবার কথায় শুধু ভলোদিয়াই নয়, সাশাও একটু অবাক হলো। সাশা ভেবেছিল বাবা কোনভাবেই রাজী হবেন না। হয়তো গীর্জায় যেতে হুকুম করবেন। বাবার সাথে সেদিন ভলোদিয়া একাই গীর্জায় গেল। সাশা আবার তার ল্যাবরেটরিতে ঢোকে। ল্যাবরেটরিতে ঢুকেই সাশার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সাশা জানে সে বাবাকে পুরোপুরি সত্যি বলেনি। তার পড়াশুনার চাপ আছে সেটা ঠিক, প্রবন্ধগুলোও শেষ করতে হবে এবং সেটা নিয়ে সে কাজও শুরু করেছে। কিন্তু সেটাই কি সব? স্টুয়ার্ট মিল আর হার্বাট স্পেনসার তাকে কোনভাবেই ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে দিচ্ছে না। গত কয়েকমাস ধরে নিজের সাথে বোঝাপড়া শেষে সাশা এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে ঈশ্বর বলে কিছু নেই। সাশা যখন এই বিবেচনায় গীর্জায় না যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে পড়াশুনার দোহাইটুকু দিতে হলো। সে কারণে সাশার মনটা একটু খচ্ খচ্ করতে লাগলো। বাবার সাথে এই মিথ্যাটুকু না বললে কি হতো?

রাতের খাবার শেষে ঘুমোতে যাবার আগে ভলোদিয়া সাধারণত: সাশার ঘরে একবার ঢু’ মারে। সেদিনও যথারীতি সাশার ঘরে ঢুকেই সে বলে, ‘সাশা, আগামী রোববারে আমিও গীর্জায় যাবো না ভাবছি’।
‘তুমি কেন যাবে না?’ সাশা বিছানা থেকে উঠে বসতে বসতে প্রশ্ন করে। ভলোদিয়ার চোখ তখন সাশার টেবিলে। এক পাশে দস্তভয়েস্কির কয়েকটি বই। অন্য পাশে হার্বাট স্পেনসার, স্টুয়ার্ট মিল ও ডারউইনের কিছু বই। সাশার বিছানার এক পাশে তার পোষা বিড়ালটা গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। সে দিকে এক নজর তাকিয়েই ভলোদিয়া বলে,
-আমারও পড়াশুনার অনেক চাপ।

সাশা ভলোদিয়ার বাম হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় ধরে তাকে পাশে বসায়। তারপর বলে,
-ভলোদিয়া, আমি ঠিক পড়াশুনার চাপের জন্য গীর্জায় যাইনি তা কিন্তু নয়। অন্যকারণও আছে।

ভলদিয়া একটু অবাক হলো। জানতে চায়,
-অন্য কারণ? কি সেটা? তুমি তো বাবাকে সেটা বলো নি?

ভলোদিয়ার একথায় দেয়ালে টাঙানো ডারউইনের ছবিটার দিকে তাকিয়ে যেন অনেক দূরের কিছু দেখছে এমনভাবে নীচু স্বরে কিছুটা স্বগতোক্ততির মতো সাশা বলে ওঠে,
-বাবাকে হয়তো বুঝাতে চেষ্টা করতে পারতাম তবে তিনি হয়তো সেটা মানতে পারতেন না।

সাশার এমন কন্ঠস্বর ও বলার ধরনে ভলোদিয়া একটু অবাক হলো। তবু তার কৌতুহল মেটে না। সে জিজ্ঞাসা করে,
-মানে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি বাবাকে যেটা বললে না, সেটা আমাকেই বা বলছো কেন?

ভলোদিয়ার কথা শুনে সাশা দেয়ালের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একটু ঘুরে ভলোদিয়ার মুখোমুখি বসে। তারপর ভলোদিয়া হাত দু’টি সে নিজের দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলে,
-তুমিও হয়তো বুঝবে না সেটা আমি জানি। কিন্তু আমি এটাও জানি আমার কথাগুলোকে তুমি অন্ততঃ উড়িয়ে দেবে না।

সাশার এমন কথায় ভলোদিয়া অবাক হওয়াটা বাড়ে বৈ কমে না। সে তার হাত দু’টো দিয়ে সাশার হাত দু’টো একটু চাপ দেয়। তারপর তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-সাশা, আমি তো তোমার কথা ভাল বুঝতে পারছি না।

ভলোদিয়ার কথায় সাশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ভলোদিয়াকে কথাটা সে কিভাবে বলবে সেটা যেন মনে মনে ঠিক করে নিচ্ছে। কথাটা বললে ভলোদিয়া কতটা বুঝবে সেটাও তাকে বিবেচনা করতে হচ্ছে। ভলোদিয়া সাশার থেকে চার বছরের ছোট। সাশার বয়স ষোল পার হয়েছে কিছুদিন আগে। তারপরও ভলোদিয়ার দিকে আরেকটু সরে এসে তার চোখের দিকে নিজের চোখ দুটিকে স্থির রেখে বলে,
-আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছি, ভলোদিয়া! কথাটা সাশা এমনভাবে এবং এত দ্রুত বলে গেল যে ভলোদিয়ার কথাটা বুঝতেই একটু সময় লাগে।

ভলোদিয়া নিজের কানকে যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। এই মাত্র সাশা যা বললো সেটা শোনার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। তাই সে তার ছোট ছোট চোখ দু’টো কুঁচকে সাশার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
-এটার মানে কী, সাশা?

সাশাও ভলোদিয়ার চোখে চোখ রেখে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়,
-ঈশ্বর বলে কেউ নেই।

ভলোদিয়ার চোখে-মুখে তখন অবিশ্বাস ও একরাশ বিস্ময়। সে বলে ওঠে,
-তুমি কি বলছো? ঈশ্বর নেই?

সাশা তার হাত দু’টো আস্তে করে ছেড়ে দিয়ে আবার দেয়ালের দিকে তাকায়। সেখান থেকে তার চোখ গেলো তার নিজের পড়ার টেবিলে। সারি সারি সাজানো বইগুলোর দিক তাকিয়ে সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলে ওঠে,
-না নেই।

সাশার ঘর থেকে নিজের শোবার ঘরে এসে ভলোদিয়া সটান বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে এপাশ ওপাশ করতে থাকে কিন্তু কোনভাবেই তার ঘুম আসে না। পাশের ঘরে সাশা আলো নিভিয়ে দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। এত রাতে ভাই-বোনরা কেউ জেগে নেই। কিন্তু ভলোদিয়া তার মাথা থেকে কোনভাবেই ‘ঈশ্বর বলে কেউ নেই’ সাশার এই কথাটি সরাতে পারছে না। তার বারবার মনে হচ্ছে কার কথা ঠিক? গির্জার ফাদারের না সাশার? আজকেও তো ফাদার কত কথা বললেন! বুকের কাছাকাছি ঝুলে থাকা ক্রুশটির উপর হাত বুলাতে বুলাতে সেই রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে ভলোদিয়ার এটাই মনে হলো সাশার কথাই হয়তো ঠিক, কারণ সাশা তো কখনো মিথ্যা বলে না!

আন্নার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে গত বছর। সে এখন বাড়িতেই থাকে। ছোট বোন মারিয়া, ভাই দিমিত্রির সাথে সে বড় একটা সময় কাটায়। মা’কে সংসারের টুকিটাকি কাজেও সাহায্য করে। আর তার সময় কাটে বই পড়ে। এসবের পাশাপাশি প্রত্যেক শনিবার তারা ভাই-বোনরা মিলে ‘শনিবার’ নামে সাপ্তাহিক যে দেয়াল পত্রিকাটি বের করে তার সম্পাদনার দায়িত্বটিও সেই পালন করে। সেদিন শনিবার। ইলিয়া বাড়িতে নেই। ছোট্ট মারিয়ার দু’দিন ধরে শরীর খারাপ। পারিবারিক চিকিৎসক ডা: আলেকজান্ডার কাদিয়ান এসেছেন তাকে দেখতে। মারিয়াকে দেখা শেষ করে তিনি বসার ঘরে এসে বসতেই দেয়াল পত্রিকাটি তাঁর চোখে পড়ে। সুন্দর গোটা গোটা হাতের লেখা। তিনি লারমেন্টভ, ডব্রোলিউভ ও পুশকিনের ছোট কবিতা তিনটি পড়লেন। তিনি কবিতাগুলোর বিষয় নির্বাচনে একটু অবাক হলেন বৈকি! ইলিয়া ও মারিয়া উলিয়ানভ কোন দিন রাজনীতি নিয়ে তার সাথে আলাপ করে না অথচ ছেলে-মেয়েদের দেয়াল পত্রিকাটিতে স্পষ্টত:ই তাদের উদার ও প্রগতিশীল চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। আন্নার লেখা কবিতাটিও তিনি পড়লেন। কিন্তু তিনি সব থেকে বেশি অবাক হলেন আলেকজান্ডার উলিয়ানভ ওরফে সাশার লেখা একটি প্রবন্ধের খন্ডাংশ পড়ে। ছেলেটি ফরাসী বিপ্লব সম্পর্কে দু’জন রাশিয়ান বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখেছে। লেখাটি পড়ে বসার ঘরে অপেক্ষমান আন্নার কাছে তিনি জানতে চাইলেন,

-সাশার সাথে একটু কথা বলা যাবে? সে আছে বাড়িতে?

-সে তার ল্যাবরেটরিতে। আমি ডেকে নিয়ে আসছি। আন্না চলে গেলে ডাঃ আলেকজান্ডার একটি ষোল/সতের বছরের ছেলের পড়াশুনার পরিধী ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা দেখে বিস্মিত হলেন। একটু পরে সাশাকে নিয়ে আন্না বসার ঘরে ঢুকতেই ডাঃ আলেকজান্ডার বলে উঠলেন,

-সাশা, তোমার এই লেখাটি নিশ্চয় তোমার পুরো লেখা নয়?

সাশা ডাক্তারের চোখের দিকে তাকিয়েই উত্তর করে,

-না, আপনি ঠিকই ধরেছেন। এটা স্কুল গ্রাজুয়েশনের জন্য তৈরি আমার একটি প্রবন্ধের অংশ মাত্র।

ডাক্তার হাসি মুখে সাশার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-অামিও সেরকমই ভাবছিলাম। তোমার লেখার বিষয়বস্তু, লেখার ভঙ্গি এবং বিশ্লেষণ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তুমি খুব ভাল লেখো। আচ্ছা, তুমি এসব বিষয় নিয়ে পড়াশুনার জন্য বই-পত্র কোথায় পাও?

-বাবার সংগ্রহে অনেক বই-পত্র আছে। এছাড়া স্কুলের লাইব্রেরি থেকেও সংগ্রহ করি। তবে সত্যি কথা বলতে কি, এই সব বিষয়ে যে ধরনের বইয়ের প্রয়োজন পড়ে তার অনেককিছুই পাই না।

-তুৃমি পাবলিক লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারো।

সাশা আন্নার দিকে একবার তাকায়। দেখে আন্নাও তার দিকেই চেয়ে আছে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে সাশা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলে,

-আমাদের জিমনেঝিয়ার ছাত্রদের পাবলিক লাইব্রেরি ব্যবহারে বারণ আছে।

ডাক্তার আলেকজান্ডার বসা থেকে তখন উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,

-হুম। বুঝেছি। সাশা, আমার সংগ্রহে কিছু বই আছে। এই ধরো ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, অর্থনীতি, সাহিত্য, বিভিন্ন রকম জার্নাল বিশেষত: মেডিকেল জার্নাল, এই সব আর কি। তোমার যদি প্রয়োজন হয় তুমি নির্দ্বিধায় ব্যবহার করতে পারো। আন্না, তুমিও আসতে পারো।

আন্না ও সাশা দু’জনেই কাঁধ নেড়ে সম্মতি জানায়।

ডা: আলেকজান্ডার কাদিয়ান মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন বিপ্লবী চিন্তা-ভাবনার কারণে ১৮৭৪ সালে কারাবরণ করেন। চার বছরের জেল খেটে তিনি বের হতে পেরেছিলেন নির্বাসনে যাবার শর্তে। সেই ১৮৭৮ সাল থেকে তিনি সিমবিরস্কিতে নির্বাসনে আছেন। তাঁকে প্রতিদিন স্থানীয় থানায় একবার করে রিপোর্ট করতে হয়। অন্যদিকে সিমবিরস্কি শহর থেকে তার বের হবার অনুমতি নেই। সরকার অবশ্য তাকে দয়া (!) করে সিমবিরস্কির অাঞ্চলিক প্রাদেশিক হাসপাতালে ইন্টার্নি হিসাবে কাজ করার অনুমতি দিয়েছিল। ডাক্তার হিসাবে ভদ্রলোক অল্পদিনেই অত্যন্ত সফল হন। সফল অস্ত্রোপাচারে টিউমার অপসারণ ও কিডনী ফেলে দিতে সক্ষম হওয়ায় তার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভলোদিয়ার বাবা ইলিয়া উলিয়ানভ শহরের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হওয়ায় তাদের দু’জনের জানাশোনা হতে সময় লাগে না। ইলিয়া ও মারিয়া দু’জনেই সাহিত্যানুরাগী মানুষ হলেও রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতেন না। তবুও এই ডাক্তারটিকে কেন জানি ইলিয়া ও মারিয়া দু’জনেই পছন্দ করে ফেলে। ফলে ইলিয়া ডাঃ আলেকজান্ডারকে তাঁর পারিবারিক চিকিৎসক হবার অনুরোধ করলে তিনিও রাজী হন। সেই সুবাদে তিনি সাশাদের ৬৪নং মস্কো স্ট্রিটের বাড়িতে মাঝে মাঝেই আসেন। পেশাগত বিষয়ের বাইরে তিনি নিজে থেকে সাধারণত: কোন কথা বলেন না। ইলিয়া বা মারিয়া কেউই অবশ্য অন্য বিষয়ে কোন কৌতুহলও দেখান না।

সাশার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে ১৮৮৩ সালের মে মাসে। আর মাত্র দুই মাস বাকী। ক্লাসিক্যাল জিমনেঝিয়ার শেষ বর্ষের ছাত্রদের গ্রাজুয়েট হতে গেলে বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখা প্রবন্ধ জমা দিতে হয়। সাশাও তার প্রবন্ধগুলো চূড়ান্ত করার কাজে এখন ব্যস্ত। কোন কোন দিন সে তার ল্যাবরেটরিতে রাতটাও কাটিয়ে দেয়। সেই প্রবন্ধগুলোর একটির ক্ষুদ্রাংশ সে পারিবারিক দেয়াল পত্রিকায় দিয়েছিল। সাশা তার প্রবন্ধগলোর বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছে ‘ফরাসী বিপ্লব’, ‘যুদ্ধের কারণ’, ‘ক্রুসেডের ভিত্তি ও ফলাফল’, এবং ‘সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তির দায়িত্ব’। ফরাসী বিপ্লব নিয়ে লিখতে গিয়ে সাশা অষ্টাদশ শতকের দুই প্রভাবশালী রাশিয়ান ঐতিহাসিক ডেনিস ফনবিজিন ও নিকোলাস কারামজিনের ইউরোপ ভ্রমণ এবং ফরাসী বিপ্লব নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক পার্থক্যগুলোকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে। ডেনিস ফরাসী বিপ্লবের কিছুদিন আগে সেখানে গিয়েছিলেন আর কারামজিন গিয়েছিলেন বিপ্লবের কিছুদিন পরে।

ডেনিস যেভাবে ফরাসী শাসন ব্যবস্থার গলদগুলো, সাধারণ মানুষের চরম দারিদ্র্যতা, শাসকদের বিলাসী জীবন ও দুর্নীতি এবং সর্বপরি ভয়াবহ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ফরাসী বিপ্লব সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছিলেন সাশা তার লেখায় সেই দিকগুলো তুলে ধরে। অন্যদিকে কীভাবে কারামজিন ফরাসী জনগণের মূর্খতা, শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা ও নেতিবাচক মনোভাব,এবং তাদের নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকাকে প্রধান করে দেখে বিপ্লবের বিরোধীতা করেছেন সেটাও তুলে ধরে। একই সাথে সে ফরাসী বিপ্লব সম্পর্কে ডেনিসের মনোভাবকে প্রগতিশীল এবং কারামজিনের মনোভাবকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে উল্লেখ করে। তার লেখার এই দিকটিই ডাক্তার আলেকজান্ডারকে মুগ্ধ করেছিল। সেদিনের পর থেকে মাঝে মাঝেই সাশা তার বাড়িতে যায়। ডাক্তারের বইয়ের সংগ্রহ দেখে সাশা রীতিমতো মুগ্ধ। তার অন্য প্রবন্ধগুলো তৈরি করতে ডাক্তারের সংগৃহীত বইগুলো তাকে সাহায্য করে। এভাবেই সাশা দ্রুতই তার প্রবন্ধগুলো শেষ করে ফেলে। সাশা ‘যুদ্ধের কারণ’ প্রবন্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকগুলোকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করে। তেমনিভাবে ‘ক্রুসেডের ভিত্তি ও প্রভাব’ শীর্ষক প্রবন্ধে সে ধর্মীয় আন্দোলনগুলোর পিছনে অর্থনৈতিক সংকটগুলো, বাইরের উন্নত মুসলিম সংস্কৃতির সংস্পর্শে ইউরোপ কীভাবে লাভবান হয়েছিল, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে সামন্তবাদের নেতিবাচক প্রভাব এবং ইউরোপের বাণিজ্য ও শিল্পায়নে ক্রুসেডের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। একইভাবে ‘সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তির দায়িত্ব’ নামে তার শেষ প্রবন্ধে সে ব্যক্তির ‘সততা, কাজের প্রতি ভালবাসা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান’ এই পাঁচটি ব্যক্তিগত মুল্যবোধের উপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে।

সাশার পরীক্ষা শেষ হতে হতে পুরো মে মাস লেগে গেল। ফল বের হলে দেখা গেল সাশা সকল বিষয়েই সর্বোচ্চ নন্বর পেয়েছে। সেই সুবাদে হেড মাস্টার থিডোর কেরেনেস্কি নিজ হাতে সাশাকে গোল্ড মেডেল পরিয়ে দিলেন। আন্না তো আগে থেকেই বাড়িতে এক প্রকার বসেই আছে। সেদিন সোমবার। সাশা ও আন্না ভলগার তীর ধরে হাঁটছিল আর কথা বলছিল তাদের আসন্ন সেন্ট পিটার্সবার্গ যাওয়া নিয়ে। সাশা সেন্ট পিটার্সবার্গে ভর্তি হয়েছে। অথচ ইলিয়া ও মারিয়া চেয়েছিল সাশা কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। ইলিয়া উলিয়ানভ নিজে সেখানে পড়েছেন সেটা যেমন একটা কারণ অন্যদিকে দুই বছর আগে সেন্ট পিটার্সবার্গে ‘পিপলস্ উইল’ এর ছেলেরা জার আলেকজান্ডার নিকোলাস-২ কে হত্যা করেছিল। সাশা সেখানে ভর্তি হয়ে শেষে না রাজনীতিতে জড়ায় সেই ভয়ও তাঁর মধ্যে আছে। তাছাড়া ইলিয়া ও মারিয়া ভেবেছিলেন কাজান বিশ্ববিদ্যালয় সিমবিরস্কি থেকে কাছে। অধিকন্তু কাজানে সাশাদের এক খালা থাকে। সে স্থানীয় অভিভাবক হিসাবে সাশাকে তদারকি করতে পারতো। কথাবার্তার এক পর্যায়ে আন্না সাশার কাছে জানতে চাইলো,

-তুমি কেন সেন্ট পিটার্সবার্গে যেতে চাইলে?

অান্নাকে ভাই-বোনরা আদর করে ডাকে অ্যানিউটা বলে। উত্তরে সাশা বলে,

-অ্যানিউটা, তুমি অন্তত: ভাল করেই জানো আমার স্বপ্ন কী? সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ডাক্তার হতে চেয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে আমি জীববিজ্ঞান শুধু পড়ছিই না, এটা আমার পরম ভাললাগার একটি বিষয়। আমি জীববিদ্যা পড়তে ভালবাসি। আর সেন্ট পিটার্সবার্গ ছাড়া আমার এই স্বপ্ন কিভাবে সফল হবে? তাছাড়া গত কিছুদিন ধরে পিসারেভ পড়ে আমি নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, ‘শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস এসব অর্থহীন, একমাত্র বিজ্ঞানই আমাদের ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে।’

প্রত্যুত্তরে আন্না জানতে চাইলো, ‘তুমি পিসারেভের বই কোথায় পেলে?’

-ডাক্তার আলেকজান্ডারের কাছে। আর তাছাড়া তুমি এক বছর বাড়িতে বসে আছো। সেটা কি জন্য? তোমাকে ভর্তি হতে হয়েছে মেয়েদের একমাত্র উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেস্টুজহেভ কোর্সে। সেটাও তো সেই সেন্ট পিটার্সবার্গে। এতটা দূরে তুমি একা একা যাতায়াত করবে এটাও বাবা-মা’র চিন্তার একটা কারণ ছিল। তাঁরাও শেষ পর্যন্ত চেয়েছেন তুমি আর আমি একসাথে থেকেই লেখা-পড়া করি।

সাশা একটানে কথাগুলো বলে গেল। একটু দম নিয়ে হাতের বামে বাড়ির ফেরার রাস্তাটায় মোড় নিয়ে সাশা আবার বলতে শুরু করে,

-আমি জানি, বাবা-মা কেন চাননি আমি সেন্ট পিটার্সবার্গে যাই।

আন্না একটু অবাক হয়ে সাশার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘কেন?’

-বাবা-মা ভয় পান। তাঁরা ভয় পান যে আমিও না রাজধানীতে গিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু বাবা-মায়ের আশঙ্কা অমূলক। আমি ডাক্তার হতে চাই এটা পরিষ্কার।

আন্না সাশার থেকে বয়সে দুই বছরের বড় হলেও সাশার ব্যক্তিত্ব, ব্যবহার, পড়াশুনা ও বিবেচনা বোধে তাকেই যেন বড় মনে হয়। পরিবারের অন্য সবাই তাকেই যেন পরিবারের আদর্শ ও পথ প্রদর্শক মনে করে। ইলিয়া ও মারিয়ার আশঙ্কার কারণও এটাই। শুধু ছোট ছেলেমেয়েদের উপরই নয়, সাশার প্রভাব এমন কি বড় সন্তান আন্নার উপরেও সাংঘাতিক রকমের। বাবা-মায়ের আশঙ্কা তাদের অন্য সন্তানগুলোও সাশার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। চতুর্থ সন্তান ওলগা, যে কিনা ভলোদিয়ার চেয়ে দেড় বছরের ছোট সে এখনই ঘোষণা দিয়েছে সেও সাশার মতো ডাক্তার হতে চায়। ফলে মারিয়া ও ইলিয়ার চারটি চোখ সবসময় সাশার উপর থাকে। তারা চায়, সাশা আদর্শ সন্তানই শুধু নয়, ভাই-বোনদের জন্যও আদর্শ হয়ে উঠুক। আন্না তাই বয়সে বড় হলেও সে যেন সাশার ছোট বোন। সে মুগ্ধ হয়ে সাশার কথা গিলতে থাকে। সে সাশার কথার প্রত্যুত্তরে সাশার কাছাকাছি সরে এসে তার হাতটি ধরে। সন্ধ্যা হতে তখনও বেশ কিছুটা দেরী। একটি দোতলা কাঠের বাড়ির সামনে পাশাপাশি দুটি পিচ্ গাছ। গাছ দু’টি ফলে ভরে গেছে। সেই বাড়িটার সামনে এসে সাশা আন্নাকে জিজ্ঞাসা করে,

-এই যে দোতলা কাঠের বাড়িটি দেখছো। এখানে ডা: আলেকজান্ডার থাকেন। যাবে?

আন্না মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ডাক্তার বাড়িতেই ছিলেন। ডাক্তার তাদের দুই ভাইবোনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালো। বসার ঘরে গিয়ে বসতেই সাশা টেবিলের উপর দিমিত্রি পিসারেভের The Destruction of Aesthetics বইটি দেখতে পায়। ডাক্তার সাশার চোখ অনুসরণ করে বইটির দিকে একবার তাকায়। অত:পর তিনিই কথা বলতে শুরু করেন,

-বইটি আজই শেষ করলাম। তুমি চাইলে নিয়ে যেতে পারো। আমার কাছে পিসারেভের আরো কিছু বই আছে। তাঁর  Notes on the history of Labor, Realists, Pushkin and Belensky এবং Our University Education বইগুলো আমার পড়ার ঘরের বাম পাশের সেল্ফে পাবে। সাশা টেবিল থেকে বইটি তুলে নিয়ে এলোমেলোভাবে পাতা উল্টাতে থাকে। আন্না চারপাশটা ভাল করে দেখছিল। সে এই প্রথমবার এসেছে। ডাক্তার বললেন, ‘তোমরা বসো, আমি সামোভারটা চাপিয়ে দিয়ে আসি। একটু চা খাওয়া যাবে’। আন্না মৃদু আপত্তি করতে চাইলেও সেটা শব্দাকারে মুখ থেকে বের করতে পারলো না। বাইরের মানুষের সামনে এখনও সে অাড়ষ্ঠ হয়ে থাকে। এটা নিয়ে সাশা তাকে অনেকবার কথা বলেছে। তবু আন্না এখনও নিজেকে ঠিক পাল্টাতে পারেনি। সাশা বইটির মধ্যে যেন ডুবে গেছে। ডাক্তার ফিরে এসে আগের জায়গায় বসলেন। সাশার চোখ আটকে যায় একটি পৃষ্ঠায়। যেখানে পিসারেভ লিখেছেন, ‘I would rather be a Russian Shoemaker than a Russian Raphael’.

সাশা যেন লাইনটার উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। ডাক্তার সেটা লক্ষ্য করে একটু সরে এসে সাশার কাছে জানতে চাইলো,

-কোথায় তোমার চোখ আটকালো?

সাশা লাইনটা দেখায়। লাইন দু’টোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ডাক্তার একটু সরে গিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে একবার আন্নাকে দেখে নিল। তারপর সাশার দিকে ফিরে বলে,

-আমি তখন মেডিকেলের প্রথম বর্ষের ছাত্র। পিসারেভের একটি লেখার কয়েকটি লাইনে তোমার মতই সেদিন আমারও চোখ আটকে গিয়েছিল। আজো সেই কয়েকটি লাইন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।

ডাক্তার যেন একটু আনমনা হয়ে গেলেন। তিনি সাশার দিকে তাকিয়েই কথা বলছিলেন কিন্ত মনে হচ্ছিল তিনি যেন তার বসার ঘর, সাশা, আন্না সব কিছুর বাইরে অন্য কোথাও, অন্য কিছু দেখছেন। সাশা ও আন্না তখন ডাক্তারের মুখে সেই কয়েকটা লাইন শুনতে ব্যাকুল। আন্নাই ডাক্তারকে প্রশ্ন করে,

-কি লেখা ছিল সেই লাইনগুলোতে?

ডাক্তার তখনও যেন অন্য কোন জগতেই আছেন। সাশা বা আন্নাকে নয়, নিজেকেই যেন শোনাচ্ছেন এমনভাবে বেশ গম্ভীর কন্ঠে অনেকটা যেন কাউকে আহ্বান জানাচ্ছেন তেমনি করে বললেন,

“Break, beat up everything, beat and destroy! Everything that’s being broken is rubbish and has no right to life! What survives is good”.

লাইনগুলো বলেই ডাক্তার চুপ করে গেলেন। কিন্তু ডাক্তারের বলার ধরনের কারণেই হোক অথবা লাইনগুলোর নিজস্ব শক্তি ও জোরের কারণেই হোক সেদিন ডাক্তারের বাড়ি থেকে নিজেদের ৬৪ নম্বর মস্কো স্ট্রিটের বাড়িতে ফেরার পথে ঐ লাইনগুলো সাশা ও আন্নার মাথার মধ্যে গেঁথে গেলো।

নেভেস্কি প্রসপেক্টের প্রশস্ত সড়কটির উপর আনিচকভ প্যালেসের খুব কাছেই অষ্টাদশ শতকে গড়ে ওঠা তিন তলা পাবলিক লাইব্রেরিটির নাম ইমপেরিয়াল লাইব্রেরি। সেই বিশাল লাইব্রেরির সামনে থেকে নেভেস্কি প্রসপেক্ট ধরে হাতের বাম দিক দিয়ে হেঁটে কিছুদূর গেলেই নেভা নদী। নেভা নদীর উপর প্যালেস ব্রিজ। ব্রিজে ওঠার আগে হাতের ডান দিকে বিশাল শীত প্রাসাদ। নেভা নদীর উপর দিয়ে সেই প্যালেস ব্রিজটা পার হলে হাতের বামে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় আর ডান দিকে সেন্ট পল দূর্গ। ১৮৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। ঝলমলে একটি দিন। সেই লাইব্রেরি ভবনটি থেকে সতের বা আঠার বছরের একটি তরুণ বের হয়ে যখন নেভেস্কি প্রসপেক্টের ফুটপাথটিতে এসে দাঁড়ালো বেলা তখন প্রায় একটা। তরুণটি বাম দিকে একবার তাকালো। অনতিদূরে প্যালেস ব্রিজটি দেখা যাচ্ছে। শীত প্রাসাদের কারণে পিটার পল দূর্গটি এখান থেকে চোখে পড়লো না। সে হাত ঘড়িটা একবার দেখে নিল। একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত। তার মনে হলো এখনও অনেক সময় বাকী। তবু ইতস্ততা কাটিয়ে তরুণটি ফুটপাথটি ধরে হাতের ডান দিকে হাঁটতে শুরু করে। তার গন্তব্য রেল স্টেশন। প্রশস্ত সড়কের দুই পাশে সারি সারি চোখ ধাঁধানো দোকানপাট। নেভেস্কি প্রসপেক্ট দিয়ে হাঁটলে সেন্ট পিটার্সবার্গের জৌলুসটা চোখে পড়ে। পিটার দ্য গ্রেটের সময় ডমিনিকো ট্রেজ্জিনি নামের একজন নগর পরিকল্পনাবিদ সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরটির ডিজাইন করেছিলেন। তারই পরিকল্পনায় অবশ্য বিশাল সেন্ট পল দূর্গটিও গড়ে তোলা হয়েছিল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট টানা হেঁটে সে নিকোলায়েভস্কি রেল স্টেশনের উল্টোদিকে ল্যাম্পপোস্টির কাছে এসে থামে। হাতের ঘড়িটায় একবার চোখ বুলিয়ে দেখে দুটো বাজতে তখনও দশ মিনিট বাকী। নিজনি- নভোগরোড থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি এসে পৌঁছাবে চারটার দিকে। উল্টো দিকের স্টেশনে কুলি, ঘোড়ার গাড়ী আর মানুষের আনাগোনায় সরগরম। তরুণটির নাম আলেকজান্ডার উলিয়ানভ। কাছের মানুষরা তাকে ডাকে সাশা নামে। মাথা ভর্তি লম্বা চুলগুলো পিছন দিক করে আঁচড়ানো। কানের অর্ধেকটা চুলে ঢাকা। মুখে কয়েকটা ব্রণের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পরনে প্যান্ট, পায়ে বুট জুতো, সাদা একটি গেঞ্জির উপর একটি পাতলা ব্লেজার পরা সাশাকে দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় লাগছে। এখনও গোঁফ না গজালেও গোঁফের রেখাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছিল আন্নার জন্য। সিমবিরস্কি থেকে সরাসরি সেন্ট পিটার্সবার্গে আসার কোন ট্রেন নেই। তাই ট্রেন ধরতে সিমবিরস্কি থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রায় একশ’ মাইল যেতে হয় সিজরান রেল স্টেশনে । তারপর সেখান থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ। এছাড়া স্টীমারে করে সিমবিরস্কি থেকে ভলগা ধরে প্রথমে নিজনি- নভোগরোড, তারপর সেখান থেকে ট্রেনে করে রাজধানীতে যাওয়া যায়। কিন্তু শীতের কয়েকটা মাস ভলগার পানি জমাট বেঁধে বরফ হওয়ায় সে সময়টা নদী পথে চলাচল করা যায় না। নিজনি- নভোগরোড হয়ে আন্না আজই আসছে রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গে।

সাশা রাজধানীতে এসেছে সপ্তাহ দুয়েক আগে একই রুটে। রাশিয়ার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তার প্রথম পছন্দ ছিল সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়। তাই সতের বছর বয়সেই গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে সে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হয়েছে। আন্না ভর্তি হয়েছে ইতিহাস ও দর্শন নিয়ে বেস্টুজহেভ কোর্সে। কিছুদিন আগেও রাশিয়ায় মেয়েদের উচ্চশিক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না। ১৮৭৮ সালে বেস্টুজহেভ কোর্স নামে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি চালু হয়। সাশা ও আন্নার ক্লাস যদিও শুরু হবে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে তবুও বাসাভাড়া করাসহ আরো কিছু জিনিষ গুছিয়ে নিতে সাশাকে দু’সপ্তাহ আগে আসতে হয়েছিল। সে এসে উঠেছিল তার খালাতো ভাই আলেকজান্ডারের কাছে। সেই তাকে বুদ্ধি দেয় সস্তায় বাড়ি ভাড়া চাইলে পেসকি জেলায় যেতে। কিন্তু বাসাটা ভাড়া নেবার পর সাশার মনে হচ্ছে তার বিশ্ববিদ্যালয় এবং অান্নার কলেজ থেকে বাসাটা বেশ কিছুটা দূরে।

ল্যাম্পপোস্টটির কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাশা প্রশস্ত নেভেস্কি প্রসপেক্ট দিয়ে লোকজনের চলাচল দেখছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল একটু দুরেই পল ক্যাথেড্রাল নামের বিশাল চার্চটির চূড়াটার দিকে। সেই সাথে চোখে পড়লো চার্চের বিশাল ঘড়িটাও। আর তখনই গীর্জার ঘড়িতে দু’টো বাজার সংকেত দিল। সকাল ও সন্ধায় রাস্তাটি সরগরম থাকলেও এই পড়ন্ত দুপুরে রাস্তাটি ফাঁকা বললেই চলে। দু’একজন মানুষ বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। দাঁড়িমুখের একজন মানুষ হেঁটে গেলো বিড় বিড় করতে করতে। দু/একটি ঘোড়ার গাড়ী যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটছে। এটাই যে রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গের ব্যস্ততম রাস্তা এই সময় দেখে এটা মনেই হয় না। আয়েশি ভঙ্গিতে মানুষের রাস্তা পার হওয়া, ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ দেখতে দেখতে সাশার নিকোলাই গোগলের লেখা ‘নেভেস্কি প্রসপেক্ট’গল্পটির বর্ণনার কথা মনে পড়লো। সেই গল্পে গোগল নেভেস্কি প্রসপেক্টের কি দূর্দান্ত বর্ণনায় না দিয়েছেন! আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে লেখা গল্প তবুও সময় ধরে ধরে তিনি যেমনটা বর্ণনা দিয়েছিলেন এই পড়ন্ত দুপুরের নেভেস্কি প্রসপেক্ট যেন সেই একই রকম আছে। যদিও রাশিয়া পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। ১৮৬১ সালে ভূমিদাস প্রথা বিলোপ রাশিয়ার অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতিতে ব্যাপক প্রভাব ফলে। ক্রমবর্ধমান রেলপথ, কাঁচামাল সরবরাহের সহজলভ্যতা, বিকশিত শিল্প-কারখানা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা কাজে ও কাজের খোঁজে আসা মানুষের পদভারে দেশের রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গ তাই দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

সাশা তখনও ল্যাম্পপোস্টের কাছেই আন্নার ট্রেনটি আসার অপেক্ষা করছে। হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো সিমবিরস্কির আরেক ছাত্র আই এন শেবোটারেভের সাথে। ক্লাসিক্যাল জিমনেঝিয়ায় সে সাশার থেকে এক ক্লাস উপরে পড়লেও সাশা তাকে তুমি বলেই সম্বোধন করতো। সাশাকে দেখে শেবোটারেভ কাছে এসে আবেগে জড়িয়ে ধরে। সাশাও তাকে উষ্ণভাবে আলিঙ্গন করে। সাশার দু’কাধে দু’হাত রেখে শেবোটারেভ বলে,

‘ভালই হলো সাশা এখানেও তোমাকে পেলাম। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় তোমার মত একজন ছাত্রকে পেয়ে ধন্য হলো’।

শেবোটারেভের কথায় সাশা যেন একটু লজ্জায় পেলো। সাশা জানতে চাইলো,

-তুমি থাকো কোথায়?

-সিঝনস্কয়া স্ট্রিটে। তুমি?

-আমি বাসা ভাড়া নিয়েছি পেসকি জেলায়।

-সেটা তো বেশ দূরে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তো দূর হয়ে যাবে।

-বাসাটা যে এতটা দূরে সেটা আগে বুঝতে পারিনি। বাসাটা বোধহয় পাল্টাতে হবে। আপাত: আমি আর আমার বোন আন্না একসাথে থাকবো। তুমি তো আন্নাকে চেনোই?

শেবোটারেভ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

সাশা জিজ্ঞাসা করে,

-তুমি এখানে কি করছো?

-রেল স্টেশনের পিছন দিকে সামারা থেকে আসা আমার এক আত্বীয় থাকে। তার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। তা, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?

সাশা শেবোটারেভকে কারণটি জানালে সেও সাশার সাথেই আন্নার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। তারা দু’জন ক্লাসিক্যাল জিমনেঝিয়ামের দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে থাকে। গল্পের ফাঁকে সাশা তাকে জানায় আন্নার সাথে ভারী সুটকেস আছে। সে ঘোড়ার গাড়ী ভাড়া করবে এবং শেবোটারেভকে তার ঠিকানায় নামিয়ে দেবে আর সেই সাথে তার বাসাটাও চিনে যাবে। গল্পে গল্পে সময় কেটে যাচ্ছিল। চারটার দিকে তারা রাস্তা পার হয়ে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়। প্ল্যাটফর্মে ঢোকার আগে অবশ্য তারা একটি ঘোড়ার গাড়ী ঠিক করে রাখে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে বলে কোচোয়ান দুই রুবল ভাড়া হাঁকালো। চারটা পনের মিনিটে আন্নার ট্রেনটি এসে পৌঁছায়। আন্না ট্রেনের জানালা দিয়ে তাদের দেখতে পেয়ে হাত নাড়ে। আন্না শেবোটারেভকে চিনতো আগে থেকেই। তারা দু’জনেই আন্নাকে দেখে হাসি মুখে হাত নাড়াতে থাকে। ট্রেনটি থামলে তারা নির্দিষ্ট বগিতে গিয়ে ওঠলো। সাশা জানতে চাইলো,

-অ্যানিউটা, কোন অসুবিধা হয়নি তো?

আন্না হাসি মুখে বলে, ‘দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ছাড়া আর কোন অসুবিধাই হয়নি’। তারপর শেবোটারেভের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমরা দু’জন এখানে একসাথে হলে কিভাবে?’

শেবোটারেভ উত্তর দেবার আগেই সাশা আন্নাকে বলে, ‘আকস্মিক যোগাযোগ। পরে তোমাকে বলছি। তুমি নেমে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়াও। আমরা দু’জন জিনিষপত্র নামিয়ে ফেলি।’

আন্না বলে, ‘কি দরকার? একজন কুলি ডাকো।’ সাশা বলে, ‘কি দরকার অনর্থক পয়সা খরচের’।

দু’জনে ধরাধরি করে মালপত্র নামিয়ে একেবারে ঘোড়ার গাড়িতে এনে তোলে। । সবাই গাড়িতে বসার পর কোচোয়ানকে গন্তব্যের কথা বলতেই সে গাড়ি ছেড়ে দিল। দেখতে দেখতে গাড়িটা আনিচকভ ব্রিজটি পার হয়ে গেলো। এরপর এটি? নেভেস্কি এ্যাভিনিউ ছেড়ে হাতের বামে সাডোভায়া স্ট্রিটে ঢুকে পড়ে। এসময় কোচোয়ান বলে ওঠে, ‘নেভেস্কি এ্যাভিনিউ দিয়ে একটু সামনে গেলেই কিন্তু ‘সেন্ট পল দূর্গ’।

সাশা এসময় আন্নাকে বলে ‘আমি তোমাকে পরে ওখানে নিয়ে যাব’।

কোচোয়ান বলে, ‘বলেন তো আপনাদের ঐ দিকটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারি। আমাকে পঞ্চাশ কোপেক না হয় বাড়িয়ে দেবেন’।

আন্না বলে, ‘আজ থাক। অনেক দূর থেকে আসছি। বড্ড ক্লান্ত লাগছে’।

কোচোয়ান আর কিছু বললো না। কিছুদূর গিয়ে ডানে মোড় নিয়ে গরোখোভায়া স্ট্রিটে গাড়িটি ঢুকে পড়লো। বেস্টুজহেভ কোর্সের বড় বিল্ডিংটি পেরিয়ে একটু ঘুরে কয়েক মিনিট যেতেই গাড়িটি সিঝনস্কায়া স্ট্রিটে এসে ঢোকে। শেবোটারেভকে তার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটি আবার নেভেস্কি প্রসপেক্টে এসে পড়ে। শীত-প্রাসাদ পার হয়ে গাড়িটি প্যালেস ব্রিজে ওঠার আগ দিয়ে ডানে মোড় নিল। নেভা নদীর তীর ঘেঁষে বেশ কিছুটা পথ গিয়ে পেসকি জেলার ভাড়া করা দোতলা বাড়িটির সামনে এসে গাড়িটি যখন থামলো সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। গাড়ি থেকে নেমে বৃত্তাকার লাল সূর্যের দিকে তাকিয়ে সাশার মনে হলো সিমবিরস্কে সূর্যটা কখনো এত বড় মনে হয় নি তো! পরক্ষণেই সাশা ভাবলো আসলেই কি তাই? নাকি সে অস্তগামী সূর্য দেখেনি বহুদিন। আন্না গাড়ি থেকে নেমে তাকালো নেভা নদীর দিকে। মনে হলো নেভা নদীর মাঝখানে বিশাল একটি অট্টালিকা। সেই অট্টালিকাটিই যে পিটার পল দূর্গ আন্না সেটা জেনেছিল আরো কিছুদিন পরে।

১৮৮৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর। সেদিন বৃহস্পতিবার। সাশা ও আন্না গরোখোভায়া স্ট্রিট থেকে হাঁটতে হাঁটতে হাতের বামে সাডোভায়া স্ট্রিটে এসে ওঠে। আন্না সেন্ট পিটার্সবার্গ আসার পর থেকে তারা নতুন বাসা খুঁজছে। প্রথমে তারা একত্রে থাকার উপযোগী বাসা খুঁজছিল। তাদের বাজেটের মধ্যে যখন বাসা পাওয়া যায় তখন দেখা যায় সেটা সাশার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হলেও আন্নার বেস্টুহেভ কোর্স থেকে অনেক । দু’জনের সুবিধা মত বাসা পাওয়া গেলে দেখা যায় বাসাটা অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে। আলো-বাতাস একদম নেই। বেস্টুজহেভ কোর্সের কাছাকাছি মেয়েদের কয়েকটা হোস্টেল আছে। আন্না ও সাশা সার্জিয়েভস্কায়া স্ট্রিটের একটি হোস্টেল পছন্দও করেছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে বাবা-মায়ের সাথে কথা বলা দরকার। সেক্ষেত্রে দু’জনকে যদিও আলাদা থাকতে হবে। সাশা অবশ্য আন্নার হোস্টেলে থাকার পক্ষে। সাশা মনে করে তাতে আন্না নির্ভরশীল মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে। সে আন্নাকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। বাবা-মা অনুমতি দিলে তারা সিদ্ধান্ত নেবে। আজ সাশা তার নিজের জন্য একটি বাসা দেখে দু’জন হেঁটে হেঁটে পাবলিক লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিল। সাডোভায়া ছেড়ে নেভেস্কি প্রসপেক্টে উঠতেই দেখে বিশাল এক শব মিছিল এগিয়ে আসছে। মিছিলটি আসছে ওয়ারশ রেলস্টেশন থেকে। যে মানুষটির কফিন বহন করে এই দীর্ঘ ও বিরাট শব মিছিল, তাঁর নাম ইভান তুর্গেনেভ। তিনি মারা গিয়েছিলেন ১৮৮৩ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর প্যারিসে। আজ তাঁর কফিন সেন্ট পিটার্সবার্গের ওয়ারশ রেলস্টেশনে এসে পৌঁছায়। তাঁর শব বহনকারী ওয়াগনটি ছিল সোনালী চাদরে ঢাকা আর সেই ওয়াগনটি চারপাশ ঢাকা ছিল অসংখ্য ফুলে। ওয়ারশ স্টেশন থেকে শুরু হওয়া শবমিছিলটি যত এগিয়েছে শব মিছিলে শোকাহত মানুষের সংখ্যা ততই বেড়েছে। সাশা এবং আন্নাও শবমিছিলে যোগ দিল। তারা পিছন পিছন হাঁটতে থাকে। দুপুরের কিছুটা পরে শবমিছিল এসে পৌঁছালো ভলকভো সিমেট্রিতে। কিন্তু দেখা গেল শবমিছিলকারী কাউকে সিমিট্রির ভিতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে সাশা বা আন্না কেউই ভিতরে ঢুকতে পারল না। পুলিশ ও কসাক সৈন্যরা সিমেট্রি ঘিরে রেখেছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারা ফিরে গেলো পেসকি জেলার বাসায়।

সেদিন রাতের খাবার শেষে বসার ঘরে বসে তারা কথা বলতে থাকে ইভান তুর্গেনেভকে নিয়েই। সাশা বসেছিল খাবার টেবিলের চেয়ারটায় আর অান্না ছোট সোফাটায়। সাশা নিজে যদিও বেশি পছন্দ করে দস্তভয়েস্কির লেখা তবে তুর্গেনেভও তার কম প্রিয় নয়। যদিও তার ছোট ভাই ভলোদিয়া তুর্গেনেভ বলতে পাগল। সাশা আন্নাকে বলে, ‘এসো মহান তুর্গেনেভকে স্মরণ করে তার এই শেষ যাত্রার দিনে কয়েকবছর আগে রাশিয়ান বিপ্লবী নারীদের নিয়ে লেখা তাঁর ‘দ্য থ্রেশোল্ড’ নামক গদ্য কবিতাটি পড়া যাক’। আন্না আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে বসলে সাশা পড়তে শুরু করে-

আমি বিশাল এক অট্টলিকার প্রবেশদ্বার দেখতে পাচ্ছি। সামনের দরজাটা পুরোটাই খোলা। দরজার পিছনে গভীর অন্ধকার। একটি মেয়ে উঁচু দেয়ালটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে——একটি রুশ মেয়ে। একটি অভেদ্য অন্ধকার যেন বাতাসকে শীতল করছে এবং সেই ঠান্ডা হাওয়ার সাথে একটি গম্ভীর, অদৃশ্য কন্ঠের আওয়াজ যেন সেই দালানের ভিতর থেকে বের হয়ে এলো—————।

-তুমি যে এই দেয়াল টপকাতে চাচ্ছো, জানো তোমার জন্য কি অপেক্ষা করছে?

-আমি জানি, মেয়েটি উত্তর করে।

-ঠান্ডা, ক্ষুধা, ঘৃণা, উপহাস, অবজ্ঞা, অপমান, জেল, রোগভোগ এবং মৃত্যু স্বয়ং।

-জানি।

-চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব।

-আমি জানি, আমি প্রস্তুত। আমি সমস্ত যন্ত্রণা ও আঘাত সহ্য করতে পারব।

-শুধু শত্রুরাই নয়, বন্ধু ও আত্বীয়-স্বজন থেকেও?

-হ্যাঁ, তাদের থেকেও।

-খুব ভাল। তুমি নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত?

-হ্যাঁ।

-একজন অজ্ঞাত বলি হতে? তুমি প্রাণ হারাবে এবং কেউ—-কেউ জানবে না, স্মরণও করবে না।

-কারো সহানুভূতি বা কৃতজ্ঞতা কোনটাই আমার দরকার নেই।

-তুমি অপরাধ করতেও প্রস্তুত?

মেয়েটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলে

-আমি অপরাধ করতেও প্রস্তুত আছি।

সেই অদৃশ্য কন্ঠটি তখন কিছুক্ষণ নীরব থাকে।

-তুমি জানো, এটা বলা হয়ে থাকে যে অবশেষে তুমি তোমার বর্তমান বিশ্বাসে আস্থা হারাবে, তুমি উপলব্ধি করবে যে তুমি প্রতারিত হয়েছো এবং তোমার যৌবনের সময়গুলো অপচয় করেছো?

-আমি এটাও জানি এবং তবুও যেতে চাই।

-তবে যাও!

মেয়েটি লম্বা পা ফেলে দেয়ালটি টপকিয়ে গেল এবং একটি ভারী পর্দা তাকে আড়াল করে ফেলল।

-বোকা! কেউ একজন ফিসফিস করে বলে উঠল।

-সাধু! প্রত্যুত্তরে কোথা থেকে যেন শব্দটি ভেসে এল।

সাশা পড়া শেষ করে চুপ করে থাকে। আন্না শুধু মুগ্ধ নয়, স্তব্ধও। কিছুটা সময় চুপচাপ বসে থাকার পর আন্না বলে ওঠে,

-সাশা, ঘুমাতে যাবে না?

সাশা জানালা দিয়ে গভীর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলে,

-তুমি ঘুমাতে যাও। আমি মাকে একটা চিঠি লিখবো। চিঠিটি শেষ করেই ঘুমাবো।

সেই রাতে আন্না ঘুমাতে যাবার পর সাশা মাকে লিখতে বসে। দীর্ঘ এক চিঠি। সেন্ট পিটার্সবার্গে আসার পর যা যা হয়েছে সব লিখে মাকে জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়, পেসকির এই বাসা, পথের দূরত্ব। নতুন বাসা খোঁজা। আন্নাকে মেয়েদের হোস্টেলে দিলে সুবিধার কথা এমন কি ইভান তুর্গেনেভের শবমিছিলটিও বাদ যায় না। তবে মাকে লেখা চিঠিটায় সাশা এটাও উল্লেখ করে যে ইভান তুর্গেনেভের সমাহিত করার সময় সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে প্রচুর পুলিশ ও কসাক সৈন্য উপস্থিত ছিল।

পেসকি জেলা থেকে সাশার বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্নার বেস্টুজহেভ কোর্স দূর হবার কারণে অবশেষে সাশা ওঠে ৪ নম্বর সিঝনস্কয়া স্ট্রিটের দোতলা একটি বাড়িতে। জায়গাটা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রিজের খুব কাছে। এই ব্রিজটি ভ্যাসেলিভস্কি আইল্যান্ডের পিটার্সবার্গের পাশটি এবং স্টক এক্সচেঞ্জ স্কোয়ারকে সংযোগ করেছে। নতুন বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে যেতে পনের থেকে বিশ মিনিট লাগে। সাশা হেঁটেই যায়। বাড়িটি কাঠের এবং সাশার ঘরে যাবার পৃথক সিঁড়ি আছে। ঘরে পর্যাপ্ত আলো আসে এবং ঘরটিও অনেক বড়। ছাদটি অনেক উঁচুতে এবং ঘরে দু’টো জানালাও আছে। ঘরটি বেশ গরম, এবং শীতের উপযোগী করেই বানানো। ঘরে একটি খাট, খাটের পায়াগুলো লোহার, যেমনটা সাশার সিমবিরস্কির ঘরেও ছিল। একটি চামড়ার ডিভান আছে, সাথে পড়ার জন্য একটি টেবিল, চেয়ার এবং একটি চেস্ট অব ড্রয়ার। বয়স্ক বাড়িওয়ালী মাসিক ১০ রুবলে ঘরের ভাড়া ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজটুকু করে দিতে সম্মত হলো। সাশা বাড়িওয়ালীর সাথে রাতের খাবারের বন্দোবস্ত করে ফেললো। বাড়িওয়ালী ডিনার পরিবেশন করবে দু’টো পদ দিয়ে। এই বন্দোবস্তে খাবার বাবদ ৩৫ কোপেক দিতে সাশা সম্মত হল। অন্যদিকে আন্না সার্জিয়েভস্কায়া স্ট্রিটে ছাত্রীদের একটি হোস্টেলে ওঠলো। সার্জিয়েভস্কয়া স্ট্রিট থেকে গরোখোভায়া স্ট্রিটে বেস্টুজহেভ কোর্সে যেতে আন্নারও খুব বেশি সময় লাগে না।

ইলিয়া প্রতি মাসে আন্না ও সাশার জন্য ৪০ রুবল করে পাঠায়। সাশা কোন বাড়তি খরচ করে না। খাবার বন্দোবস্তটাও সে বাড়িওয়ালীর সাথে করেছে সস্তা হবে হলে। কোথাও যেতে হলে সে যায় পায়ে হেঁটে। আন্না মেয়েদের হোস্টেলে উঠেছে। বেস্টুজহেভ কোর্সে সে সময় প্রায় ৭০০ জন ছাত্রী। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হওয়ায় টিউশন ফি অনেক বেশি। এখানে যে সব ছাত্রীরা পড়ে তাদের পরিবারের সবারই আর্থিক সঙ্গতি যেমন ভাল আবার তাদের সামাজিক অবস্থানও অপেক্ষাকৃত মজবুত। এখানকার ছাত্রীদের একটা বড় অংশই রেডিক্যাল চিন্তা করে। কেউ কেউ গুপ্ত সংগঠনের সাথেও যুক্ত। আবার কেউ কেউ নারীবাদী। তাদের অনেকেরই চুল ছোট করে ছাঁটা। তাদের বিরাট অংশই আবার লাল জামা পরে। তাদের কথাবার্তাও ঠিক অন্য সাধারণ নারীদের মত নয়, কিছুটা যেন রূঢ়। এভাবে লাল জামা আর ছোট করে ছাঁটা চুল যেন রেডিক্যাল নারীর প্রতীক হয়ে ওঠে। কিছুটা মফস্বল শহর থেকে আসা আন্না এই সব মেয়েদের সাথে তাল মেলাতে হিমসিম খেতে থাকে। ঐ সব মেয়েদের পোষাক, চুল ছাঁটার ভঙ্গি ও কথা বলার ধরন আন্না পছন্দ করতে পারে না। সে একাকীত্ব বোধ করে এবং বাড়ির জন্য মন খারাপ করে। আন্নার এমন মানসিক অবস্থায় তাকে সঙ্গ দিতে সাশা তাই প্রত্যেক রবিবার ও বুধবার বিকালটা তার সাথে কাটায় এবং রাতের খাবারটা একসাথে কোন একটি হোটেলে খায়। কেন কোন সপ্তাহে সেই ডিনারটাও সে বাড়িওয়ালীর সাথে বন্দোবস্ত করে ফেলে। বাড়িওয়ালী বয়স্কা হলেও বেশ আন্তরিক। যদিও বাড়িভাড়ার সাথে সাশার এঁটো বাসনপত্র ধুঁয়ে দেবার কথা তবুও সেই বিশেষ বিশেষ দিনে বয়স্ক বাড়িওয়ালীটি আন্নার এঁটো বাসনগুলোও কোন বাড়তি পয়সা ছাড়াই ধুঁয়ে দেয়। এসময় সাশা চিঠি লিখে বাবাকে জানায় খরচবাবদ তার মাসে ৩০ রুবল হলেই চলবে। ইলিয়া ভাবলেন, ছেলে হয়তো তার আর্থিক চাপ কমাতেই এমনটা বলছে। বাবা প্রত্যুত্তরে জানায় ‘টাকা নিয়ে চিন্তা না করে পড়াশুনাটা মন দিয়ে করতে’। সাশা ৩০ রুবলে মাস খরচ চালাতে লাগলো আর এভাবেই সে প্রতি মাসে ১০ রুবল করে সঞ্চয় করতে থাকে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সাশা পেটের অসুখে পড়ে। সেন্ট পিটার্সবার্গের খাবার পানির উৎস হলো নেভা নদী। নেভা নদীর পানি ভীষণ নোংরা। আন্নাও অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। বড় দিনের ছুটি তখনও শুরু হয়নি তবুও সাশা আন্নাকে সিমবিরস্কি পাঠিয়ে দিল কিন্তু সে নিজে থেকে গেলো গরমের ছুটির অপেক্ষায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই সাশা বুঝে গেলো বন্ধুদের অনেকই সক্রিয় রাজনীতি করে, আর তাদের অনেকেই গুপ্ত সংগঠনের সাথে যুক্ত। সেরকম কারো কারো সাথে তার বন্ধুত্ব গাঢ় হলেও সে রাজনীতির প্রতি বেশি আগ্রহ বোধ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় বিভিন্ন সমিতি, পাঠচক্রের আড়ালে অনেকে রাজনীতিতে সক্রিয়। তেমনই দু’জন ছাত্র হলো সের্গেই নিকোনভ ও গভোরুখিন। তার দু’জনই প্রাকৃতিক বিজ্ঞানেরই ছাত্র। তারা দু’জনই ‘অর্থনীতি গ্রুপ’ নামের একটি পাঠচক্রের সদস্য। এর মধ্যে গভোরুখিনের সাথে সাশার ঘনিষ্ঠতা হয়। আন্না তখন সিমবিরস্কিতে। একদিন সেই বন্ধুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে পাবলিক লাইব্রেরি পর্যন্ত যায়। আবার সেখান থেকে কথা বলতে বলতে সে সাশার বাসা পর্যন্ত আসে। সাশা তাকে আমন্ত্রণ জানালে সে রাতটা সাশার সাথে কাটানো সিদ্ধান্ত নেয়। রাতের খাবার শেষে তারা ছাত্রদের বিভিন্ন ক্লাব বা গ্রুপের বিষয়ে কথা বলে। সাশা জীববিদ্যা গ্রুপ তৈরি করতে আগ্রহ দেখায়। পাবলিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ইতোমধ্যেই সে ডারউইন নিয়ে ব্যাপক পড়াশুনা করেছে। অর্থনীতি গ্রুপের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে কথা উঠার এক পর্যায়ে রাজনীতি নিয়েও কথা ওঠে। এসময় সেই বন্ধুটি সাশাকে রাজনীতিতে যোগ দেবার প্রস্তাব করে। উত্তরে সাশা বলে,
-‘কোন মানুষ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসাটা কী সেটা না জানাটা শুধু অযোক্তিক নয়, অনৈতিকও। আর কেউ যখন সমাজের রোগ সারাতে চায়, সবার আগে তাদের রোগের কারণ নির্ণয় করাটা জরুরি। আর সেটা করতে না পারাটা আরো বেশি অনৈতিক। রোগের কারণ না জেনে আমি রোগীর চিকিৎসায় আগ্রহী নয়’।

বন্ধুটি সাশার কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তারপর ডিভান থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেয়ালে হেলান দিয়ে টেবিলে বসা সাশাকে বলে,

-সে কারণেই তো তোমার পাঠচক্রে আসা উচিত। তোমার পড়াশুনা আছে, নিজস্ব একটি চিন্তা-কাঠামো আছে সেটা পাঠচক্রের অন্য সদস্যদের সাথে তুমি শেয়ার করতে পারো। তুমিও তাদের মতামতগুলো জানতে পারবে। তুমি ওখানে গেলে তুমি দেখবে রাশিয়া জুড়ে কত ‘রাখমেটভের’ জন্ম হচ্ছে।

গভোরুখিনের শেষ বাক্যের ‘রাখমেটভ’ কথাটা শুনেই সাশা তাকে থামিয়ে দিল। জানতে চাইলো,

-দাঁড়াও, দাঁড়াও! তুমি কি নাম বললে? রাখমেটভ? তিনি কে?

গভোরুখিন কয়েক কদম হেঁটে টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে একটু পানি খায়। তারপর সেখানে দাঁড়িয়েই বলে,

-তুমি চেরনিশেভস্কির ‘কী করিতে হইবে?’ বইটি পড়োনি বোধ করি। রাখমেটভকে সেই বইটির নায়কও বলতে পারো। একজন অনুসরণীয় বিপ্লবী। বইটি নিষিদ্ধ। তুমি চাইলে আমি যোগাড় করে দিতে পারি।

সাশাও উঠে গিয়ে টেবিল থেকে তার পানির গ্লাসের পানিটা ঢকঢক করে খেয়ে শেষ করে। তারপর বলে,

-তার দরকার হবে না। বইটি আমি বাবার লাইব্রেরিতে দেখেছি। আমি বাড়ি গেলে পড়ে নিতে পারবো। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি রাজনীতি নয়, বিজ্ঞানের অনুরক্ত।

সাশা সিমবিরস্কে আসে গরমের ছুটিতে। বিকালবেলা সবাই যখন বৈকালিক চায়ের আসরে বসেছে সাশা এসে বাবার হাতে একটি খাম দিল। বাবা জানতে চাইলো,
-কী এটা?
-কিছু টাকা আছে।
-কিসের টাকা?
-আপনাকে চিঠিতে জানিয়েছিলাম না যে, আমার মাসের খরচ ৪০ রুবল লাগে না, ৩০ রুবল হলেই চলে। গত আট মাসে আমি ৮০ রুবল জমিয়েছি। আমার এত টাকা লাগবে না। আপনি এখন থেকে আমার জন্য ৩০ রুবল করেই পাঠাবেন।
সাশার কথা শুনে ইলিয়ার চোখে পানি চলে আসে। তার এই ছেলেটা এত ভাল কেন? নিজের মনের দূর্বলতা ঢাকতে তিনি চট করে উঠে পড়েন। ছেলেমেয়েরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি তার পড়ার ঘরে গিয়ে ঢোকেন। মারিয়া বুঝলো, ইলিয়া চোখের পানিটুকু আড়ালে ফেলতে গেলো। বাইরে থেকে দেখতে শক্ত এই মানুষটির ভিতরটা এত নরম কেন?

গরমের এই ছুটিতে ভাইবোনরা খেলাধুলা, হৈচৈ করে সময় কাটাচ্ছে। সাশা বড় একটা সময় কাটায় পড়াশুনা করে। সাশা বাড়ি আসার পর থেকে তার পোষা কালো বেড়ালটা সারাক্ষণ তার সাথে সাথে থাকে। ভলোদিয়াও বিড়ালটাকে প্রচন্ড আদর করে। তবে সাশা থাকলে সে যেন কাউকে চেনেই না। সাশার দেখাদেখি ভলোদিয়াও এসময় প্রচুর বই পড়ে। মাঝে মাঝে দু’জন দাবা খেলে। দাবা খেলতে বসলে তাদের যেন হুশ-জ্ঞান থাকে না। একদিন তো পাশের বাড়ির একটি মেয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখে সাশা ও ভলোদিয়াকে দাবার গুটিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মুখে কোন কথা নেই। কেউ নড়াচড়াও করছে না। তাদের এই অবস্থা দেখে অল্প বয়সী মেয়েটা চিৎকার করে ওঠে ভয়ে। মেয়েটির চিৎকারে তারা সম্বিৎ ফিরে পেলেও বুঝতে পারে না মেয়েটির চিৎকার করার কারণ কি। এদিকে ভলোদিয়াটা সাশার কার্বন কপি হচ্ছে বলে আন্না তাকে খেপায়। রুশ লেখকদের মধ্যে ভলোদিয়ার সব চেয়ে বেশি ভাল লাগে তুর্গেনেভের বই। সে একই বই কয়েকবার করে পড়ে। একদিন ভলোদিয়া সাশার শোবার ঘরে গিয়ে দেখে সাশা টেবিলে বসে খুব মনোযোগ কি যেন একটি বই পড়ছে। ভলোদিয়া জানতে চাই,
-তুমি কি বই পড়ছো?

সাশা বই থেকে মুখটা তুলে বলে,
-‘কী করিতে হইবে?’

সাশার উত্তর শুনে ভলোদিয়া থতমত খেয়ে গেলো। সে প্রথমে বুঝতে পারেনি সাশা তার প্রশ্নের উত্তর দিল, না তাকে সাশা কোন প্রশ্ন করলো। সে সাশাকে বলে,

-বুঝলাম না। তুমি কী আমার কাছে কিছু জানতে চাইলে?

সাশা হেসে চেয়ারটি ঘুরিয়ে ভলোদিয়ার মুখোমুখি হয়ে বলে,

-না তোমাকে কোন প্রশ্ন করিনি। যে বইটি পড়ছি সেটার নাম তোমাকে বললাম। তুমি তো সেটাই চেয়েছিলে তাই না? আর বইটা একটা উপন্যাস।
-কার লেখা উপন্যাস? ভলোদিয়া বেশ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে।
-চেরনিশেভস্কির।
-চের-নি-শে-ভ-স্কি? আগে কখনো এই লেখকের নাম শুনিনি তো। তাঁর অন্য কোন বইও তো পড়িনি।

ভলোদিয়ার কথা শুনে সাশা মুচকি হেসে বলে,
-এই লেখক অন্য কোন উপন্যাস লেখেননি। সরকার বিরোধী কিছু প্রবন্ধ লেখায় তার জেল হয়েছিল। তখন বিচারের জন্য তাঁকে দু’বছর সেন্ট পল কারাগারে অপেক্ষা করতে হয়। আর তখন জেলে বসেই তিনি বইটি লিখেছিলেন। বইটি নিষিদ্ধ। আর তিনি জেল শেষে এখন নির্বাসনে আছেন।
-তুমি এত কিছু কিভাবে জানো?
-বড় হলে তুমিও জানতে পারবে।
-আমি কি বইটি পড়তে পারি?
-পারো, তবে বুঝতে পারবে বলে মনে হয় না। এটা বুঝার জন্য তোমাকে আরো বড় হতে হবে, ভলোদিয়া।
-আমার বয়স এখন চৌদ্দ- ভলোদিয়া উত্তর করে।
-বইটি বুঝার জন্য চৌদ্দ বছর যথেষ্ট বয়স নয়, ভলোদিয়া।
-তুমি বলছো বইটি নিষিদ্ধ, তাহলে তুমি বইটি কোথায় পেলে?
-বাবার লাইব্রেরিতে। তবে বাবা জানেন না যে আমি বইটি নিয়েছি।

সাশার বইটি পড়া হয়ে গেলে সে বইটি আবার বাবার লাইব্রেরিতে রেখে আসে। ভলোদিয়া বইটি খু্ঁজে পেয়ে নিজের ঘরে বসে বইটি পড়তে শুরু করে। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা সে দারুণ আগ্রহ নিয়ে পড়ে। দারুণ একটি রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু পরের পৃষ্ঠাগুলো পড়তে গিয়ে সে হোঁচট খায়। কিছু কিছু বুঝতে পারে আবার অনেক কিছু হেঁয়ালি লাগে। ঠিক গোগল, চেখভ, তুর্গেনেভ বা তলস্তয়ের লেখাগুলোর মত হয়। তাছাড়া চরিত্রগুলোও যেন অন্যরকম। অন্য গল্প বা উপন্যাসগুলো থেকে বেশ আলাদা। বইটি পড়তে তার যে খুব ভাল লাগছে তাও নয়। তবে যেহেতু সাশা পড়েছে এবং সে সাশাকে পড়ার কথা বলেছে তাই অনেক কিছু না বুঝলেও সে বইটি পড়তে থাকে। এভাবে কয়েকদিন ধরে পড়ার পর সে বইটি শেষ করে ফেলে। এদিকে সাশার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময় হয়ে আসে। আন্নাও সাথে যাবে। তারা দু’জনেই গোছ-গাছ নিয়ে ব্যস্ত। তাদের যাবার আগেরদিন ভলোদিয়া সাশাকে জিজ্ঞেস করে,
-তুমি তো বইটি পড়ে শেষ করেছো না?
-কোন বইটি?
-‘কী করিতে হইবে?’
-হ্যাঁ। কেন?

– অামিও পড়েছি তবে অনেক কিছু বুঝতে পারিনি। তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?

সাশা, ভলোদিয়ার মুখের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকায়।
-কাকে তোমার বেশি ভাল লেগেছে?
ভলোদিয়ার প্রশ্ন শুনে সাশা একটু অবাক হয়। জানতে চাই,
-ভলোদিয়া, তুমি বইটি পুরোটা পড়েছো?
-পড়েছি। কিন্তু বললাম না, আমি ভাল বুঝিনি। বলো না, তুমি কাকে বেশি পছন্দ করো? লপুখভ, কিরসানভ, ভেরা না রাখমেটভকে?
-রাখমেটভকে।
-লোকটা খুব অদ্ভুত না? সে পোড়া রুটি খেয়ে দিন কাটায় কিন্তু সেটা খাবারের অভাবে নয়, ইচ্ছে করে। আবার সে নখের তৈরি বিছানায় ঘুমায়, এই কারণে নয় যে তার ভাল বিছানা নেই। নিজের শরীর সে ছুরি দিয়ে কেঁটে সে রক্ত ঝরায়। লোকটা কেমন না?

সাশার প্রথমে ইচ্ছে ছিল না বইটি নিয়ে ভলোদিয়ার সাথে এখন কোন আলোচনায় যায়। সে বয়সে ছোট, অধিকন্তু সে অনেক কিছু ভাল বুঝবেও না। যেহেতু আলোচনা শুরু হয়েছে তাই সে উত্তর করে,

-এগুলো সবই সিম্বলিক। রাখমেটভের একটাই স্বপ্ন বিপ্লব। বিপ্লব চাইলেই তো এমনি এমনি হবে না বা কেউ দিয়েও দেবে না। জারের খড়গহস্ত আছে, নিপীড়ন আছে। সব অত্যাচার-নিপীড়ন সহ্য করার ক্ষমতা না থাকলে সে বিপ্লবী হবে কিভাবে? বিপ্লবী হতে গেলে তাকে তো তৈরি হতে হবে। সে তো নিজেকে ফাঁকি দিতে পারে না। বিপ্লব চাইলে সবটুকু দিয়েই চাইতে হবে। এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে লেখক চেরনিশেভস্কি সেটাই বলতে চেয়েছেন। আর তাছাড়া লেখক নিজেও তো জীবনে আপোষ করেননি। জেল, নির্বাসন সব মেনে নিয়েছেন সেই বিপ্লবের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে। রাখমেটভও তেমনি একজন মানুষ। গোটা রুশ সাহিত্যে এমন শক্তিশালী ও দৃঢ় চরিত্রের মানুষ খুঁজে পাওয়া দু:ষ্কর। ব্যক্তি জীবনে সমস্ত বাহুল্যতা তাই রাখমেটভ পরিহার করেছে। প্রেম, বিয়ে, সংসার সে সব তার জন্য সে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। আর তাই উপন্যাসটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ভেরা পাভলোভনা তার স্বামী কিরসানভকে এক জায়গায় বলছে, ‘রাখমেটভ সবার থেকে আলাদা। সে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করে এমনভাবে যেন মনে হয় সেটা তার নিজের জন্যই জরুরি। আর এই জিনিষটি তার ব্যক্তিগত ধারণাকেও পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু সেটা আমাদের সাধ্যাতীত সাশা (কিরসানভকে আদর করে ভেরা সাশা নামে ডাকে)! আমরা তার মতো ঈগল নই। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ”।

সাশা যেন কথাগুলো বলে গেল বক্তৃতা দেবার ভঙ্গিতে। ভলোদিয়া বিস্মিত হয়ে তার কথাগুলো শুধু শুনছিল বলা ভুল হবে, যেন গিলছিল। ভলোদিয়ার সেই মুগ্ধ ও বিস্মিত ভাব কাটলো সাশার পরের কথায়,

-কোন কিছু চাইলে এমন করেই চাইতে হয়, সবটুকু দিয়ে চাইতে হয়। এখানেই রাখমেটভ অনন্য ও অনুসরণীয়।

ভলোদিয়া সাশার কথাগুলো সব বুঝলো এমন নয়। তবে এই অদ্ভুত চরিত্রের মানুষটিকে তারও যেন সেই মুহূর্ত থেকে ভাল লাগতে শুরু করে। সাশার সাথে সেদিন রাতের কথোপকথনের পর ভলোদিয়ার মনে হলো সাশা কী সেন্ট পিটার্সবার্গে গিয়ে পাল্টে যাচ্ছে?

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top