টমাস ট্রান্সট্রোমারের কবিতা II অনুবাদ : মনোজিৎকুমার দাস

সকালের প্রার্থনা

 

কালো পিঠের সমুদ্রচিল, সূর্য- সারথী তার

পরিক্রমা করছে।

তার নিচে জলরাশি।

পৃথিবী এখনো নিদ্রিত জলের নিচে

বহুবর্ণ পাথরের মতো।

অনাবিষ্কৃত দিন। দিনগুলো

অ্যাজটেক চিত্রের মতো। সঙ্গীত আর আমি বন্দী

ভুতুড়ে ঢেউয়ে

বাহু দুটো উঁচিয়ে থাকি-  একটা অবয়বের মতো

লোকশিল্পের ভেতর থেকে।

 

বিক্ষুব্ধ ধ্যান

 

ঝড় অসভ্যভাবে বয়ে যায় কলের পালগুলোর চারপাশ দিয়ে

রাতের আঁধারে, কোন কিছুকে গুড়িয়ে না দিয়ে- তোমাকে

জাগিয়ে রাখা হয়েছে একই বিধানে।

ধুসর রঙের শার্কের পেটে তোমার ম্লান আলো।

আকারবিহীন স্মৃতিগুলো সমুদ্রের গভীরে ,

আর তা অদ্ভুতভাবে শক্ত- সবুজ

শৈবাল যেন তোমার ক্রাচ। যে লোক

সমুদ্রে যায় , ফিরে আসে আড়ষ্ট হয়ে।

 

চাপের মুখে

 

নীচ আকাশের ড্রোন ইঞ্জিনের শব্দে কান বধির-

কর্মক্ষেত্রে আমরা ভয়ে কম্পমান ।

সমুদ্রের গভীরতা মুহূর্তে মধ্যে জেনে ফেলেছি,

শেল আর টেলিফোনের ফ্যাস ফ্যাস শব্দ কানে আসছে।

 

তুমি শুধুমাত্র আলোর পাশে সৌন্দর্য – অবলোকন করতে পার,

মাঠ ফসলে ভরা, ঝরণার জলে অনেক রঙের মেলা-

এক রাশ ছায়া আমার মাথার ভেতরে করছে খেলা

তারা হামাগুড়ি দিয়ে এসে শষ্যদানার মাঝে মিশে গিয়ে সোনা হতে চায়।

 

চারদিকে আঁধার নেমে এসেছে

মাঝরাতে আমি ঘুমাতে যাই-

বড় নৌকাটার ভেতর থেকে ছোট নৌকাটা বের হয়ে আসে,

তুমি জলে একা ভাসতে থাক-

দূরে আরো দূরে আঁধার থিক থিক করে।

 

আঁধার সাঁতরানো অবয়ব

 

একটা প্রাগৌতিহাসিক পেন্টিং

সাহারার এক পাথরের উপরে:

আঁধার সাঁতরানো অবয়ব,

একটা প্রাচীন নদী, তখন সে যৌবনবতী।

অস্ত্র কিংবা কৌশল ছাড়া,

বিশ্রাম নয়, দ্রুত নয় –

তার নিজের ছায়া থেকে

বিচ্ছিন্ন ঝরণার তলদেশ।

নিজেকে মুক্ত করতে সে লড়াই করে-

ঘুমিয়ে থাকা একটা সবুজ ছবি সে যেন,

অবশেষে তীরে এসে পৌঁছে

সে নিজের ছায়ার সাথে।

 

আবহাওয়া চিত্র

 

অক্টোবরের সমুদ্র ঠান্ডা থিক থিক করে,

তার সাথে মরিচিকাগুলোর পিঠের পাখনা।

কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না-

বিলাসতরীর গতি সফেদ তন্দ্রায় আচ্ছন্ন।

একটা স্বচ্ছফটিক গ্রামের ‘পর দীপ্তি ছড়ায়।

সব শব্দ ধীরে বয়।

একটা সারমেয় ঘেউ ঘেউ করে, একটা চিত্রকল্প

উদ্যানের উপরের বাতাসে চিত্রায়িত ,

যেখানে হলুদ ফল নিজের ইচ্ছেয়

গাছ থেকে পড়ে চত্বরটাতে ছড়িয়ে পড়ে।

 

মুখোমুখি

 

ফেব্রুয়ারিতে বসবাস এখনো চলছে

পাখিরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও উড়েছিল, আর মন

উদ্বীপ্ত হয়েছিল ভূদৃশ্যের বিপরীতে-

যেহেতু তা একটা নৌকা উত্তাল স্রোতে ভাসমান-

ব্রিজটির বিপরীত দিকে শুয়ে আছে আর্দ্রভূমি,

গাছগুলো আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে,

পুরু বরফ শুকনো খড়ের সাথে মিশে আছে।

পদচিহ্নগুলো কঠিন বহিরাবরণের নিচে মিশে গেছে।

একটা ত্রিপলের নিচে ভাষা পিনবদ্ধ।

একদিন কিছু একটা জানালার দিকে এগিয়ে আসে,

কাজ রেখে আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখি।

রঙের ছটা ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছু বদলে গেছে।

পৃথিবী ও আমি একে অপরের দিকে তাকাই।

 

শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় জুলাই

 

লোকটি গাছের নিচে উপরে দিকে মুখ করে শুয়ে

পত্রপল্লবের দিকে তাকিয়ে আছে ,

তাকিয়ে থাকতে থাকতে লোকটার চোখে জল আসে।

লোকজনের থেকেও তাড়াতাড়ি থামগুলো পুরনো হয়ে গেছে,

সিলভার – গ্রে কাঠের গুড়ি ও পাথরগুলো ওদের পাকস্থলীতে।

নিষ্প্রভ আলো পড়েছে ডান দিকে-

লোকটি সারাদিন একটা খোলা নৌকায় ভ্রমণ করেছে

উদ্বেল উপসাগরের বুকে,

অবশেষে একটা নীল ল্যাম্পে ভেতরে সে ঘুমাবে

দ্বীপপুঞ্জ যেন হামাগুড়ি দেয়

কাঁচের উপর দিয়ে চলা বড় মথটার মতো।

 

দম্পতি

 

তারা আলো নিভিয়ে দিলে বাতির সাদা সেড

কয়েক মুহূর্তের জন্যে জ্বল জ্বল করে

অন্ধকারে রাখা একটা গ্লাসের মতো।

হোটেলটির দেওয়ালগুলো কালো আকাশের দিকে উঠে গেছে।

ভালবাসার আলোড়নগুলো স্থিতু হয়েছে, তারা ঘুমাচ্ছে

কিন্তু তাদের সবচেয়ে গোপন ভাবনাগুলোর মিলন ঘটেছে

যেহেতু দুটো রঙ মিলে গিয়ে পরস্পরের দিকে বয়ে যায়

ওয়েট পেপারের ওপরে একটা স্কুল বালকের পেন্টিংয়ে।

অন্ধকার ও নীরবতা। শহরটি টানাটানি করে ঘনিষ্ঠ হয়েছে

আজ রাতে। জানালাগুলো বন্ধ। বাড়িগুলো কাছাকাছি এসেছে।

তারা শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন অপেক্ষা রত,

একটা কাক,  যার মুখে একটুও অভিব্যক্তির চিহ্ন নেই।

 

মধ্যরাতের সন্ধিকাল

 

কাঠপিঁপড়ে নীরবে পাহারা দেয়, তাকায় না

কোন কিছুর দিকেই। কোন কিছুই শোনে না,

কিন্তু গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে পত্রপুঞ্জের থেকে-

রাতের মর্মর ধ্বনি গভীর হয় গ্রীষ্মের প্রহরে।

 

পাইন গাছ দাঁড়িয়ে থাকে ঘড়ির কাটার মতো,

পিঁপড়েটা দ্বীপ্ত হয়ে উঠে পাহাড়ের ছায়ায়।

পাখি চিৎকার করে! অবশেষে মেঘপুঞ্জ

ধীরে ধীরে মোড়াতে শুরু করে।

 

শহরতলি

 

মোটের উপর মানুষেরা একই রঙের যেহেতু

পৃথিবীটা একটা গর্তের বহি:প্রকাশ ।

এটা একটা মধ্যস্থল, নগরী নয়, নয় দেশ,

দিগন্তের উপরের কনসট্রাকশন ক্রেন

যেন একটা লাফ দিতে যাচ্ছে , কিন্তু ঘড়িগুলো তা চায় না।

সিমেন্টের পাইপ চারদিকে ছড়ানো ছিটানো

শুকনো জিহ্বা দিয়ে যেন আলো চাটছে।

মেরামত চলছে সাবেক গোলাঘরগুলোতে ,

পাথরগুলো তাদের ছায়া ছড়িয়েছে এলোমেলো

চাঁদের জমিনের বস্তুর মতো,

আর এ দিকটা প্রায় গড়ে উঠছে।

 

 

টমাস ট্রান্সট্রোমার (জন্ম: ১৫ এপ্রিল ১৯৩১– মৃত্যু: ২৬ মার্চ ২০১৫) সুইডিশ কবি ও মনস্তত্ত্ববিদ। ১৯৩১ সালের ১৫ এপ্রিল স্টকহোমে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে তাঁর প্রথম  কবিতা সংকলন ১৭ পোয়েমস প্রকাশিত হয়। তিনি স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন, অতিরিক্ত বিষয় হিসাবে ইতিহাস , ধর্ম ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন।  তাঁর কাব্যসংকলনগুলোর মধ্যে 17 Poems (17 dikter), 1954, Secrets on the Way (Hemligheter på vägen), 1958, The Half-Finished Heaven (Den halvfärdiga himlen), 1962, Bells and Tracks (Klanger och spår), 1966, Seeing in the Dark (Mörkerseende), 1970, Paths (Stigar), 1973, Baltics (Östersjöar), 1974, The Truthbarrier (Sanningsbarriären), 1978, The Wild Market Square (Det vilda torget), 1983, For the Living and the Dead (För levande och döda), 1989, The Sorrow Gondola (Sorgegondolen), 1996, Prison (Fängelse), 2001 (from 1959), The Great Enigma (Den stora gåtan), 2004 ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । তিনি ২০১১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। সুইডিশ থেকে রবিন ফুলটন কর্তৃক ইংরেজি অনুবাদ থেকে বঙ্গানুবাদ।

Facebook Comments

comments

১ Reply to “টমাস ট্রান্সট্রোমারের কবিতা II অনুবাদ : মনোজিৎকুমার দাস”

  1. Thalia বলেছেন:

    Your site has superb web content. I bookmarked the website

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top