লেনিন।। পর্ব-৫।। আশানুর রহমান খোকন

লেনিন। পর্ব-৫।। প্রেম ও মৃত্যু।।

১৮৮৫ সালের ডিসেম্বর মাস। সিমবিরস্কি থেকে প্রায় একশো মাইল দূরে সিজরান রেল স্টেশনে সকাল থেকেই বসে আছেন এক ভদ্রলোক। নাম ইলিয়া উলিয়ানভ। গায়ে  কালো ওভারকোট, মাথায় পশমী টুপি। টুপি থাকায় তাঁর মাথার সামনের টাকটা ঢাকা পড়েছে। বেশ ঠান্ডা বিধায় তাঁর দু’হাতেই  হাতমোজা এবং সেই হাতমোজা পরা বাম হাতে তিনি চামড়ার একটি ফোলিও ব্যাগ ধরে আছেন। অপেক্ষা করছেন তাঁর মেয়ের জন্য। বড় মেয়ে আন্না আসবে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে। ছেলে সাশা আসতে পারবে না জানিয়ে ডিসেম্বরের চার তারিখে একটি চিঠি লিখেছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তার প্রাণিবিজ্ঞানের উপর একটি পরীক্ষা ছিল । আবার জানুয়ারির ১৩ তারিখে অর্গানিক ক্যামিস্ট্রির উপর তার আরেকটি পরীক্ষা আছে। সাশার ইচ্ছে সে ডাক্তার হবে। তার নানা আলেকজান্ডার ব্ল্যাঙ্কও একজন নামকরা ডাক্তার ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি অত্যন্ত সম্মানিত একজন মানুষ ছিলেন। যদিও ইলিয়া সাশাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। ইলিয়া তবুও ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে চান না। গত গ্রীষ্মে সাশার সাথে এ বিষয়ে তার কিছু কথা হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তিক্ততার দিকে যাচ্ছিল দেখে তিনি চুপ করে গিয়েছিলেন। ডিসেম্বর মাসে প্রচন্ড শীতে ভলগা নদীর উপর বরফের স্তর জমায় এখন স্টিমার চলাচল বন্ধ।  সিমবিরস্কি পর্যন্ত এখনও রেলপথ চালু হয়নি। সেখান থেকে সবচেয়ে কাছের রেল স্টেশন এই সিজরান। এখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে সিমবিরস্কি যেতে কয়েকদিন লাগে। পথের ক্লান্তি ও পড়া নষ্ট হবার ভয়ে তাই এবারও সাশা বাড়ি আসতে চায়নি। সেই কারণে আন্নাকে একাই আসতে হচ্ছে। অফিসের কাজে তিনি কাছাকাছি এসেছিলেন। এতটা পথ মেয়েটা একা ফিরবে চিন্তা করে দু’টো দিন হোটেলে কাটিয়ে আজ সকাল থেকে তিনি স্টেশনে বসে আছেন আন্নার জন্য।

ইলিয়া বসে আছেন স্টেশনটির দক্ষিণ পাশে। এখান থেকে ভলগা নদী দেখা যায়। কয়েক বছর আগে ভলগার উপর দিয়ে একটি রেলসেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সিজরানের এই রেল স্টেশনটি চালু হয়েছিল ১৮৭৪ সালে। ১৮৬১ সালে ভুমিদাস প্রথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রাশিয়ার পরিবর্তনগুলো যেন দ্রুত হচ্ছে। উৎপাদন বেড়েছে, কল-কারখানা হচ্ছে, হচ্ছে জমি কেনা-বেচাও। কাঁচামাল, পণ্য ও যাত্রী পরিবহণের জন্য শুধু ভলগা নদীতে চলাচলকারী স্টিমারের উপর নির্ভর করলে এখন আর চলছে না। তাছাড়া শীতকালে প্রায় স্টিমার চলে না। তাই রাশিয়া জুড়ে চলছে রেল লাইন স্থাপনের কাজ। রেল যোগাযোগকে সহজ করতে ভলগার উপর বিশাল রেল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ১৮৮০ সেতু নিমার্ণের কাজ শেষ হলে নামকরণ করা হয়েছিল জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের নামানুসারে আলেকজান্ড্রাভস্কি। স্টেশনের এ দিকটায় বসে সেই সেতুটি দেখা যাচ্ছে। তেরটি পিলারের উপর নির্মিত ১.৪১ কিলোমিটারের এই সেতুটিই এখন ইউরোপের সব চেয়ে বড় রেলসেতু। সেতুটি হবার পর সিজরান শহরটিও যেন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও স্টেশনটির এই পাশটায় ভাঁটুইগাছ ও শেয়ালকাঁটার জঙ্গল ছিল। এখন বসতি গড়ে উঠেছে। এখান থেকে আগে আলেকজান্ড্রাভস্কি রেলসেতুটি পরিস্কার দেখা যেতো। নতুন বসতি ও কল-কারখানার কারণে এখান থেকে আর পুরোটা দেখা যায় না।

ইলিয়া স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে অনেক কথাই ভাবছিলেন। এই যে রেলসেতু, রেল স্টেশন কত দ্রুতই না সব কিছু পাল্টে দিচ্ছে। মানুষও পাল্টাচ্ছে দ্রুত। এত সব সংস্কার ও পরিবর্তন শুরু করেছিলেন যে জার তাঁকেই কিনা একদল লোক খুন করলো? ১৮৮১ সালের পহেলা মার্চ জার দ্বিতীয় আলেজান্ডার খুন হয়ে গেলেন প্রকাশ্যে। সে কারণেই বোধ করি ক্ষমতায় এসে জার তৃতীয় আলেকজান্ডার বড্ড কড়াকড়ি শুরু করেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থায়, বিশেষ করে পাঠ্যসূচীতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। ধর্মীয় শিক্ষার উপর শুধু অধিক গুরুত্বারোপই নয়, এখন স্কুলগুলোকে তদারক করতে চার্চকে ক্ষমতা দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ইলিয়া অবশ্য এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের একজন পরিচালক ও কাউন্সিলর হিসাবে ধর্মীয় শিক্ষায় ইলিয়ার আপত্তি নেই কিন্তু চার্চের তদারকিতে তার আপত্তি আছে। তার এই আপত্তির কথা অনেকে জানে বলেই গত বছর পাদ্রী এ. আই. বারতিনস্কি স্থানীয় পত্রিকায় তাঁকে আক্রমণ করে নিবন্ধ পর্যন্ত লিখেছেন। ১৮৮০ সালে ইলিয়ার বয়স যখন ৪৯ বছর তখন তিনি তার চাকুরীর ২৫ বছর পূর্ণ করেছিলেন। নিয়ামানুযায়ী অবসরে যাবার কথা থাকলেও বাচ্চাদের লেখাপড়া শেষ না হওয়ায় চাকুরীর মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। সরকার প্রথমে এক বছর পরে আরো পাঁচ বছর সেটা বাড়িয়েছে। যেভাবে পাদ্রী ও কিছু লোক তাঁর পিছনে লেগেছে তাতে মনে হয় না তিনি আবার অবসরের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলে সেটা মঞ্জুর হবে। শুধু তাই নয়, চার্চ এবং কিছু লোক এতটাই বিরুদ্ধাচারণ শুরু করেছে যে তিনি মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কিনা সেটাই এখন তাঁর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া তাঁর শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না। আন্নার আর এক বছর পড়াশুনা আছে, শেষ করলে সে স্কুল শিক্ষক হিসাবে যোগ দিতে পারবে। সাশাটা শেষ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারতো কিন্তু সে যদি ডাক্তারিই পড়ে তাহলে আরো কিছুটা সময় লাগবে। তার অন্য ছেলমেয়েরাও পড়াশুনায় ভাল। ওলগাও মেডিকেল পড়তে চায়। রাশিয়ার মেয়েদের মেডিকেল পড়ার কোন ব্যবস্থা না থাকায় সে ইউরোপে যেতে চায়। ইলিয়ার তাতে কোন আপত্তি নেই বরং তিনি উৎসাহই দিচ্ছেন। একারণেও আরো কিছুদিন তার চাকরীটা করা দরকার। কিছুদিন আগে তিনি চভিস্টিদের জন্য একটি স্কুল চালু করেছেন। প্রতি রোববার ভলোদিয়া চভিস্ট ছাত্রদের পড়ায়। তার এই ছেলেটাও খুবই মেধাবী। কিন্তু তাকে নিয়ে মাঝে মাঝে তার চিন্তা হয়। ছেলেটা পড়াশুনায় ভাল হলেও বড্ড একগুঁয়ে।

স্টেশনে বসে এই সব ভাবতে ভাবতে ইলিয়া স্টেশনের ঘড়িতে দেখেন দুপুর ১টা বাজে। ট্রেন আসার কথা তিনটায়। তিনি দূরে ভলগার দিকে যেদিকটায় আলেকজান্ড্রাভস্কি সেতু, সেদিকটায় তাকিয়ে আছেন। দূরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন মেঘের রঙ পাল্টে গেছে। সকালে দেখা সাদা সাদা মেঘগুলো এখন দেখতে মনে হচ্ছে হালকা গোলাপী।  তিনি বুঝলেন তুুুুষার পড়বে। তুুুুষার যখন পড়ে দেখতে খুব ভাল লাগে এমনকি তুষার পড়ার সময় রাস্তায় হাঁটতেও খারাপ লাগে না। কিন্তু তুষার পড়া বন্ধ হবার পর সেটা যখন গলতে শুরু করে তখন রাস্তাঘাটে চলাচল করাই কঠিন। ইলিয়া স্টেশনের দক্ষিণ দিকটায় বসে শুধু মেয়ে আন্নার জন্যই অপেক্ষা করতে থাকলেন তাই নয়, তিনি যেন তুষার দেখার জন্যও অপেক্ষা করতে লাগলেন।

আন্না বসে আছে ট্রেনের জানালার কাছে। ট্রেনটি ছুটছে হু হু করে। সারি সারি পাইন গাছ যেন উল্টো দিকে ছুটে পালাচ্ছে। গাছের পাতাগুলো অল্প স্বল্প তুষারে ঢাকা। রেলগাড়ীর ঝমঝম শব্দ শুনতে শুনতে, মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে আর বই পড়ে আন্না সাধারণত তার এই দীর্ঘ যাত্রাটাকে আনন্দময় করে তোলে। কিন্তু আজ তার মনটা বিষন্ন। হাতে ইভান তুর্গেনেভের ‘প্রথম প্রেম’ বইটা ধরা থাকলেও সেটা পড়ার জন্য যতটুকু মনোযোগ দেবার দরকার সেটার অভাবে বইটা হাতে নিয়েই সে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্রিসমাসের ছুটিতে সে বাড়ি যাচ্ছে। কতদিন পর মা, বাবা, ভাই-বোনদের সাথে দেখা হবে! আন্নার খুশী লাগার কথা। অন্যবার সে যখন বাড়ি যেতে ট্রেনে চেপে বসতো তখন মনে হতো কখন বাড়ি গিয়ে পৌঁছাবে। কিন্তু আজ কেন জানি তার সেই আনন্দটুকু লাগছে না। দু’দিন আগেও সে যখন তার হাত খরচের টাকা দিয়ে নেভেস্কি প্রসপেক্টের ঝলমলে দোকানগুলো থেকে ছোট বোন ওলগা, মারিয়া আর ভাই দিমিত্রির জন্য ক্রিসমাসের উপহার কিনছিল তখনও তার মনটা কেমন একটা অদ্ভুত আনন্দে ভরে ছিল। ছুটিতে বাড়ি যাবার আনন্দ। প্রিয় মুখগুলো দেখার আনন্দ। সে ভলোদিয়ার জন্যও কিছু কিনতে চেয়েছিল কিন্তু সাশা তাকে বারণ করে। কয়েকদিন আগে মা সাশাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল যে ভলোদিয়ার জন্য একটি জিওমেট্টি বক্স পাঠাতে, ভলোদিয়াই চেয়েছে। সাশা সেটা কিনে রেখেছিল। আন্না তাই সব মিলিয়ে খুশীই ছিল। কোথায় তার মন ভাল হবার কথা, তা না তার কিনা মন খারাপ! বাবা তার জন্য অপেক্ষা করবে সিজরানে। দেখা হবে কয়েক ঘন্টা বাদেই। অথচ তার মন খারাপ ভাবটা কোনভাবেই যাচ্ছে না। বাবা যদি বুঝতে পারেন তার মন খারাপ, তিনি নিশ্চয় খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বেন!

প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেনটি যখন সিজরানের পথে ছুটতে শুরু করে, তখনই আন্নার মন খারাপের শুরু। ট্রেন ছুটছে হু হু করে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে যেন সব মন খারাপ তাকে পেয়ে বসেছে। সাশা গত দু’বছর ক্রিসমাসের ছুটিতে বাড়ি যায় না। অথচ আন্নার সেমিস্টার শেষে হলেই বাড়ি যেত ইচ্ছে করে। সাশা রাগ করে। কিন্তু তার সিমবিরস্কিই ভাল লাগে। সাশা পড়াশুনা নিয়ে যেমন ব্যস্ত, তেমনি ব্যস্ত তার নিজের তৈরি ‘জীববিজ্ঞান ক্লাব’ নিয়ে, অনেকেই যাকে বলে কিনা ‘উলিয়ানভ গ্রুপ’। অান্নার মনে আছে শেবোটারেভ একদিন সাশা ও তাকে নিয়ে গিয়েছিল ভলগা জেমলিয়াশেস্টভোর (আঞ্চলিক সমিতির) সভায়। সামারা, সিজরান, সিমবিরস্কির সব ছাত্র-ছাত্রীরাই ‘ভলগা জেমলিয়াশেস্টভো’র অন্তর্ভূক্ত। জার আলেকজান্ডার-২ খুন হবার পর থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। ছাত্রদের যে কোন ধরনের জমায়েতে তাই পুলিশী নজরদারী থাকে। এ ধরনের আঞ্চলিক সমিতিগুলোর কার্যক্রমকে সীমিত পরিসরে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে সমিতিগুলোতে সাধারণ ছাত্রদের যেমন ব্যাপক আগ্রহ আছে অন্যদিকে এসব সমিতির আড়ালে গোপনে রাজনীতির কার্যক্রমও চলে। সাশার এধরনের সমিতির প্রতি খুব একটা আগ্রহ ছিল না বললেই চলে। সেই সেখানেই প্রথম দিনই আন্নার পরিচয় হয় মার্কের সাথে। আন্না সাধারণত নতুন মানুষদের সাথে সহজ হতে পারে না। এধরনের জমায়েতে তো আরো না। সাশা ও শেবোটারেভ সেখানে অন্যদের সাথে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সে এক পাশে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ আগে শেবোটারেভই মার্কের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আন্নাকে ওভাবে দেখে মার্ক এগিয়ে এসে তার সাথে কথা বলে। প্রথম প্রথম একটু আড়ষ্টভাব থাকলেও আস্তে আস্তে আন্না তার সাথে সহজ হয়ে পড়ে। অবশ্য সে কৃতিত্বটুকু মার্কের। সামারার একটি কৃষক পরিবারে ছেলে মার্ক। আন্না মার্কের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখে তাদের পছন্দের মধ্য অনেক মিল। আন্না লারমন্টভ, হাইন এদের কবিতা পছন্দ করে, মার্কও তাই। আন্নার কবিতার প্রতি দূর্বলতার কথা জানতে পেরে মার্কই তাকে সাহিত্য সভায় যোগ দিতে বলে। মার্ক নিজেও যার সদস্য। বেস্টুজহেভ কোর্সে আন্না ইতিহাস ও দর্শন নিয়ে পড়ছে জানতে পেরে মার্ক আন্নাকে ইতিহাস সমিতিতেও যোগ দিতে বলে। মার্ক নিজেও ইতিহাস সমিতির সদস্য। সাহিত্য ও ইতিহাস দু’টোই আন্নার ভাল লাগার জায়গা। সে মনে মনে খুব খুশী হয়। তবু সাশাকে একবার জিজ্ঞাসা করা দরকার বিধায় সে হেসে বিষয়টি সেই মূহুর্তে এড়িয়ে যায়। তবে মার্ককে তার ভাল লাগে। পরে সাশাকে বিষয়টি বলতেই সেও তাকে উৎসাহ দেয়। এভাবেই আন্না ইতিহাস ও সাহিত্য সমিতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে এবং ক্রমশ: মার্কের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। সাশা সে সময় তার জুনিয়র ক্লাসের থিসিসের কাজে এবং তার নিজের জীববিজ্ঞান গ্রুপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আন্নাকে আগের মত সময় দিতে পারছিল না। আন্নাকে এখন তাই প্রায় মার্কের সাথে দেখা যায়। মাঝে মাঝে মার্কই আন্নাকে হোস্টেল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

গতকাল তাদের সাহিত্যসভার মিটিং ছিল। সাহিত্যসভায় নামী-দামী সাহিত্যিকদের লেখা পাঠ বা তাদের লেখা নিয়ে আলোচনা যেমন হয় তেমনি অংশগ্রহণকারী সদস্যরাও তাদের স্বরচিত লেখা পাঠ করে থাকে। মার্কের পীড়াপীড়িতে আন্না কবিতা পড়তে উঠে দাঁড়ায়। ব্যাগ থেকে কম্পিত হাতে চারভাঁজ করা একটি কাগজ বের করে। কোন দিকে না তাকিয়ে দুরূ দুরূ বুকে সে পড়তে থাকে,

“রাত নামছে, ঘুমিয়ে পড়ছে বসুধা।

নিঝুম চারপাশ।

গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে মাঠগুলো

ঘুমাচ্ছে গ্রামটাও।

ঘন মেঘের আড়ালে ঢেকে গেছে চাঁদ,

আকাশে একটি তারাও নেই দ্যুতিমান।

বারান্দায় ছোট্ট একটি প্রদ্বীপ জ্বলছে

তাকে ঘিরে জড়ো পুরো পরিবার।

প্রত্যকে নিমগ্ন বইয়ে, বড্ড গম্ভীর

এমন গভীর নীরবতায়, চোখের পাতা

বন্ধ করে প্রিয় মারিয়া ঘুমায় বেশুমার।

অন্ধকারের গভীর থেকে

জোনাকী পোকারা এসে

ঘুরপাক খায় অবিরাম।

আলোর উত্তাপ নিতে নিতে

নিজেরা যেন বিশ্বাস করে

তারা ফিরে পেয়েছে গ্রীষ্মকাল।”

কবিতাটি পড়া শেষ হলে আন্না চোখ বন্ধ করে ফেলে। সভায় তখন যেন পিন পতন নীরবতা। আন্নার বুকের ধুক্ ধুকানিটুকু ততক্ষণে যেন ড্রাম হয়ে বাজতে শুরু করেছে। তার নিজের কাছে সেই সময়টুকুকে মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। তারপর হঠাৎ নীরবতা ভেঙে তুমুল করতালি। আন্না ভয়ে ভয়ে চোখ খোলে। সে প্রথম তাকায় মার্কের দিকে। মার্কের দু’হাত তখনও তালির ভঙ্গিতে ধরা। মুখে হাসি, চোখে প্রশংসা।  আন্নার মুখ রাঙা হলো কিছুটা লজ্জা আর বাকীটা আনন্দে। সে অন্যদিকে ফিরলে দেখতে পায় অনেকের চোখে মুখেও প্রশংসার হাসি। আন্না আশ্বস্ত বোধ করে। তারপর শুরু হয় তার কবিতা নিয়ে আলোচনা। একজনের কথা আন্নার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। তিনি বললেন, ‘আন্নার কবিতায় জার্মান কবি হাইনের প্রভাব আছে’। তিনি প্রশংসা না সমালোচনা করলেন সেটা আন্নার কাছে মোটেই বিবেচ্য মনে হল না। আন্না খুশী হয়েছিল এই ভেবে যে তার একজন প্রিয় কবি ‘হাইনে’র নাম জড়িয়ে তার কবিতা নিয়ে কেউ কথা বললো।

সাহিত্যসভা থেকে তারা যখন বের হয়ে আসে তখন একটা অদ্ভূত আনন্দ, মার্কের প্রতি পরম কৃতজ্ঞতা এবং একটা অসাধারণ ভাললাগায় আন্নার শরীর ও মন ছিল আপ্লুত। সে আর মার্ক পাশাপাশি হাঁটছিল। দু’দিন আগে পড়া তুষারে গাছের ডাল ও পাতাগুলি তখনও কিছুটা ঢাকা। আজকে ঠান্ডাটা তুলনামূলক কম। সন্ধ্যা হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ। কখনও কখনও মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢাকা পড়লেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ধবল আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি দেখতে দেখতে আর গল্প করতে করতে সাডোভায়া স্ট্রিট ধরে তারা হাঁটছিল। আন্না কথা বলছিল পরের দিন তার সিমবিরস্কি যাওয়া নিয়ে। আন্নার চোখে মুখে ঘরে ফেরার আনন্দ। আন্নাকে হয়তো সে কারণেও খুব উচ্ছ্বল ও প্রাণবন্ত লাগছিল। আন্না কথা বলছিল তাদের সিমবিরস্কির দোতলা কাঠের বাড়ি, বাগান, বাগানের ডানপাশে সাশার ল্যাবরেটরি, বামপাশে বাবার লাইব্রেরি, এমনকি নিজের শোবার ঘরটি নিয়েও। সেই সাথে কথা বলছিল মা, বাবা, ভলোদিয়া, ওলগা, মারিয়া, দিমিত্রি সবাইকে নিয়ে। পরিবারের গল্প করতে গিয়ে আন্নার যেন কথায় পেয়ে বসে। সাশার পোষা বেড়ালটার কথাও বলতে বাদ রাখে না। যে আন্না বাইরের মানুষের সামনে সহসা সহজ হতে পারে না, কথা বলে মেপে মেপে, সে যেন আজ এক প্রগলভা নারী। আন্না কথা বলে চলে আর মার্ক মাঝে মাঝে তাকে দু/একটা প্রশ্ন করে। আজকের এই প্রগলভা আন্নাকে দেখলে অভিজ্ঞ কেউ ধারণা করতে পারে মেয়েটি সম্ভবত প্রেমে পড়েছে। কিন্তু সম্ভাব্য যার প্রেমে পড়তে পারে সেই মার্ক নিজে এখনও নিশ্চিত নয়। সে নিজে আন্নাকে পছন্দ করে, এমনকি ভালবাসে কিন্তু কথাটা সে আন্নাকে বলতে পারে না। কিভাবে কথাটা বলবে সেটা নিয়ে অনেকদিন ভেবেছে কিন্তু আন্নাকে কথাটা সে কোনভাবেই বলতে পারছে না। সে এটাও ভাবে যদি আন্নাকে সে বুঝতে ভুল করে আর সেই একই কারণে আন্না যদি তাকে ভুল বোঝে। আন্না চলে যাবে বেশ কিছুদিনের জন্য। নিজের মনের এই চাপটা আজ যেন মার্ককে ভিতরে ভিতরে অস্থির করে তোলে। সাডোভায়া স্ট্রিট ছেড়ে আন্নার হোস্টেলে যাবার জন্য তারা বামে মোড় নিয়ে সার্জিয়েভস্কায়া স্ট্রিটে ওঠে। মোড় নিতেই দূর থেকে হোস্টেলটি দেখা যায়। আন্না তখনও কথা বলছে। তারা যখন পাইন গাছটির নীচে এসে দাঁড়ায়, মার্ক অনতিদূরে হোস্টেলটির দিকে একবার তাকিয়ে হঠাৎ করেই বলে ওঠে, ’আন্না, তুমি বেশ কিছুদিন থাকবে না। আমার কিন্তু খুব খারাপ লাগবে।’

মার্কের গলার স্বর এবং বলার ধরনে আন্না মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে সে মার্কের দিকে তাকায়। আন্না যেন মার্কের চোখে কিছু একটা খুঁজছিল। চাঁদের স্বল্প আলোতেও সেটা খুঁজে পেতে আন্নার বোধ করি কোন অসুবিধা হলো না। অথবা এমনও হতে পারে চোখ নয়, হয়তো আন্নার মনের আলোয় সেটা ধরা পড়ে। তাই মার্কের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার নিজের মধ্যে যেন কিছু একটা ঘটে যায়। সে ভিতরে ভিতরে একটা প্রচন্ড আবেগে কেঁপে ওঠে। সে সরে এসে নিজের ডান হাতটি দিয়ে মার্কের বাম হাতটি ধরে। মার্ক একটু অবাক হয়। সে নিজেও যেন এতটা আশা করেনি। মার্ক তখন প্রবল আবেগে এবং সজোরে আন্নার পাঁচটি আঙুল সজোরে চেপে ধরে। তাতে আন্না নিজের শরীরের শক্তি যেন কিছুটা হারিয়ে ফেলে। সে মার্কের কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দেয়। তারা কতক্ষণ এভাবে পাইন গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা নিজেরাও যেন ভুলে যায়। সময় যেন সেখানে থেমে থাকে। দু’দিন আগে পড়া তুষারে কিছুটা তখনও গাছের পাতাগুলো ধরে আছে। শুক্লপক্ষের চাঁদটির ডুবে যাবার সময় হচ্ছে। এক টুকরো মেঘ এসে ক্ষণিকের জন্য চাঁদকে আড়াল করে। পাইন গাছটির নীচে তখন একটি আলো-আঁধারির পরিবেশ তৈরি হয়। মার্ক হঠাৎ লক্ষ্য করে তার বাম হাতের তালুটা যেন ভেজা ভেজা লাগছে। ডিসেম্বরের এই ঠান্ডায়ও তাদের দু’জনের হাতের তালু ঘেমে গেছে। প্রবল আবেগ এবং ভালবাসা নিয়ে, কোন ধরনের দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব ছাড়া আন্না ও মার্ক এই প্রথমবার একজন আরেকজনের এভাবে হাত ধরেছে। নিজেদের হাতের তালু এভাবে ঘেমে উঠায় তারা একটু অবাকও হয়, সেই সাথে আন্না যেন একটু লজ্জ্বা পায়। আন্নার এই লজ্জ্বামাখা মুখটির দিকে তাকিয়ে মার্ক তার বাম হাতটি আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে দু’হাত দিয়ে প্রবল আবেগে আন্নাকে জড়িয়ে ধরে। সেই আলো-আঁধারীতে দু’জন যুবক-যুবতী এভাবেই তাদের প্রাণের আবেগ বিনিময় করে গভীর আলিঙ্গনে। শুক্লপক্ষের চাঁদটি এই দুই তরুণ-তরুণীর হৃদয়াবেগ দেখতেই যেন এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। মেঘ সরে গেলে চাঁদটিও যেন মুচকি হেসে তাদের ভালবাসার স্বাক্ষী হয়ে হঠাৎ করেই ডুবে যায়।

গতকাল রাতে হোস্টেলে ফিরে আন্না অনেক রাত পর্যন্ত জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। মার্ককে সে পছন্দ করতো, ভালবাসতো। মার্কও হয়তো তাই। কিন্তু আজ রাতে দু’জনের আবেগ দু’জনের কাছে এমনভাবে উন্মোচিত হবার পর একদিকে যেমন প্রবল আনন্দ আর ভাললাগায় তার মনটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে, আবার একই সাথে অন্য একটি দু:খ, যেন ছোট্ট একটি কষ্ট চোরাকাঁটার মতো তার মনকে খুঁচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। যেটা তার কখনও মনে হয়নি কিন্তু আজ সেটাই তার মনে হচ্ছে। আন্না ভাবছিল মার্ককে ছাড়া এতটা দিন সে সিমবিরস্কিতে কীভাবে থাকবে? আবার এমনটা মনে হওয়ায় নিজের উপর তার রাগও হচ্ছে এই ভেবে যে সন্ধ্যা বেলাতেও তো এমনটা মনে হয়নি। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সব কিছু এমন পাল্টে গেল? দু’জন নারী পুরুষের ভালবাসার কী এমনই শক্তি? মা, বাবা, ভাই-বোন সব কিছু কিভাবে এমন তুচ্ছ হয়ে উঠতে পারে? আবার সে এটাও ভাবছে মার্কের কথাটা সে তার মাকে কিভাবে বলবে? মা বিষয়টি কিভাবে নেবে? বাবা মেনে নিবেন তো? আচ্ছা সাশা যখন জানবে সেই বা কী বলবে? এত সব ভাবতে ভাবতে সে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। এমন তৃপ্তির, এমন আনন্দের ঘুম সিমবিরস্কি ছেড়ে আসার পর সে আর কখনও বোধহয় ঘুমায়নি।

সকালে স্টেশনে বিদায় দিতে সাশার আসার কথা। মার্কও আসবে বলেছিল। আন্না স্টেশনে পৌঁছে দেখে প্ল্যাটফর্মে মার্ক একা দাঁড়িয়ে আছে। সাশাকে আশে-পাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সাশাকে না দেখে শুরুতে একটু বিরক্তির ভাব তৈরি হলেও আন্না পরক্ষণেই খুশী হয়ে ওঠে মার্ককে একা পেয়ে। মার্ক কাছে এসে সুন্দর করে হেসে তার স্যুটকেসটি তুলে নিল। আন্না মার্ককেই দেখতে থাকে। স্টেশনে নানান মানুষের ভিড়, চিৎকার, ফেরিওয়ালাদের চেঁচামেঁচি কোন কিছুই যেন আন্নাকে স্পর্শ করে না। মার্ক স্যুটকেস নিয়ে সামনে এগোতে থাকলে আন্না তার হেঁটে যাওয়া দেখতে থাকে। কিছুটা সময় সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। সম্বিৎ ফিরলে দেখে মার্ক অনেকটা এগিয়ে গিয়ে তার দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে আছে। আন্না লজ্জ্বা পায়। সে দ্রুত মার্কের কাছে যেতে থাকে।

ট্রেনটি পরের স্টেশনে কখন এসে থেমেছে আন্না খেয়াল করেনি। গতকাল থেকে আজ সকালে স্টেশনে যা যা হয়েছে সেগুলোকে নিজের মধ্যে বারবার উল্টে-পাল্টে দেখছিল। একজন মধ্যবয়স্কা নারী তার পাশে এসে বসতেই সে যেন চমকে ওঠে। একবার সেই মহিলার দিকে তাকিয়ে একটু সরে জানালার আরো কাছে গিয়ে আন্না বাইরে তাকিয়ে থাকে। আন্নার কাছে আজ স্টেশনে মার্ককে যেন অন্যরকম লাগছিল। একদিন আগের মার্ক আর আজকের মার্ক যেন সম্পূর্ণ আলাদা। আন্না যখন মার্কের দিকে তাকাচ্ছিল তখন তার বুকের মধ্যে দিয়ে একটা দমকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। মার্ক ও আন্নার পরস্পরের চাহনী ও আস্তে আস্তে কথা বলার ভঙ্গি দেখে অভিজ্ঞদের বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে এরা সদ্য প্রেমে পড়েছে। ট্রেন ছাড়তে বেশি দেরী নেই। সাশার আসার কথা আগেই কিন্তু কেন জানি সে আসতে দেরী করছে। আন্না তখন একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সাশা যেন দিন দিন বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সাশা এখন থাকে অন্য একটি ভাড়া বাড়িতে। সেই বাড়িটির উপরের তিনটি ঘরের একটিতে থাকে সাশা, অন্য দু’টির একটিতে শেবোটারেভ এবং অন্যটিতে স্মিদোভা রাইসা নামের একটি মেয়ে থাকে, যে পেশায় নার্স। আন্নার সাথে রাইসাকে পরিচয় করে দিয়েছিল সাশায়। কিন্তু কেন জানি প্রথম দিন থেকেই আন্না তাকে পছন্দ করতে পারেনি। মেয়েটি দেখতে সুশ্রী, মাথার চুল ছেলেদের মত করে ছাঁটা। আবার সেও নারীবাদী মেয়েদের মতো লাল জামা পরে। সেটা হয়তো আন্নার অপছন্দ হবার একটি কারণ হতে পারে। তবে সে কারণটি গৌণ। মুখ্য কারণটি আন্না হয়তো মার্ক ছাড়া অন্য কাউকে বলতেও পারবে না। আন্নার অপছন্দের মুল কারণ মেয়েটি সাশাকে পছন্দ করে আর তার এই পছন্দের বিষয়টা সে গোপনও করে না। সাশা মেয়েটিকে পছন্দ করে কিনা আন্না ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। মেয়েটি গভরুখিন নামের সাশার জীববিজ্ঞান গ্রুপের একটি ছেলের খুবই ঘনিষ্ঠ। কেউ কেউ বলে মেয়েটি গভরুখিনের বাগদত্তাও হতে পারে। মাথা ভর্তি চুলের সব সময় কালো টুপি পরে থাকা এই কসাক ছেলেটিকে আন্না একদম পছন্দ করে না। তার চেহারার মধ্যে যেমন কাঠিন্য আছে, কন্ঠটাও কর্কশ। আন্না মার্কের কাছে শুনেছে সে নাকি অর্থনীতি গ্রুপেরও একজন সক্রিয় সদস্য। অনেকেই জানে এই অর্থনীতি গ্রুপের অনেক ছেলে-মেয়েই ‘পিপলস্ উইল’ নামক একটি বিপ্লবী দলের সদস্য। আন্না মনে প্রাণে চাই সাশা এদের থেকে দূরে থাকুক। আন্না তাই একদিন সাশার সাথে ইতিহাস গ্রুপের পাঠচক্র থেকে ফেরার পথে জানতে চেয়েছিল,

-সাশা, তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো?

সাশা, আন্নার পাশে পাশেই হাঁটছিল। আন্নার প্রশ্ন করার ধরনে সাশা একটু অবাক হয়। কিন্তু মুখে বলে,

-স্বাচ্ছন্দ্যে।

-এই যে আমাদের বেস্টুভহেজ কোর্সের মেয়েরা বা আরো অনেকে যারা নিজেদেরকে নারীবাদী বা প্রগতিশীল বলে দাবি করে, তাদের পোষাক তোমার কেমন লাগে? মানে তুমি কি এদের পোষাক পছন্দ করো?

সাশার মনেই হলো না যে আন্নার এই জানতে চাওয়ার পিছনে অন্য কোন কারণ থাকতে পারে। সে সরল মনে উত্তর দেয়,

– না। এরকম পোষাক আমার ভাল লাগে না।

আন্না তবুও নিশ্চিত হতে পারে না। সে বুঝতে চায়, সাশা রাইসাকে পছন্দ করে কিনা। আন্না তাই আবারও প্রশ্ন করে,

-তাহলে তোমার কেমন ধরনের পোষাক পছন্দ?

সাশা হাঁটতে হাঁটতে জবাব দেয়,

-মায়ের মত।

সাশার এ কথায় সেদিন আন্নার বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে যায়। আন্না কয়েকদিন সাশার ওখানে গিয়ে দেখেছে রাইসা কারণে-অকারণে সাশার ঘরে আসে। সাশার ঘর আর রাইসার ঘরের মাঝখানে শুধুমাত্র বাড়িওয়ালীর ডাইনিং রুমটি। রাইসা যতবারই আসে না কেন আন্না সাশার মধ্যে কখনো কোন বিরক্তি দেখেনি। তাই সেদিন সাশার সাথে কথা বলে সে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। কিন্তু সেদিনের সেই নিশ্চয়তাটুকু আজ নিমেষে উবে গেল যখন আন্না দেখলো তাকে বিদায় দিতে স্টেশনে সাশার সাথে রাইসা ও শেবোটারেভ এসেছে। শেবোটারেভ আসতেই পারে কিন্তু রাইসা কেন? শুরুতে তার রাগ হয়েছিল আর এখন এই ট্রেনের জানালার বসে থাকতে থাকতে তার মনটা ক্রমাগত খারাপ হতে লাগলো। সাশার মতো একটা ভাল ছেলে এ রকম একটি মেয়ের পাল্লায় পড়ে যাবে ভাবতেই আন্নার মনটা ব্যথায় ভরে যাচ্ছে। সাশার সাথে ইদানী গভরুখিন নামের সেই ছেলেটিকে প্রায় দেখা যায়। যেটা আন্নার একেবারেই পছন্দ নয়। এবার বাড়ি থেকে ফিরে আন্না সাশার সাথে কথা বলার কথা চিন্তা করে। অনেকে বলে রাইসার সাথে গভরুখিনের সম্পর্ক আছে। মার্ক একদিন বলেছিল গভরুখিন গোপনে রাজনীতি করে। আন্না চায় না সাশা এই গ্রুপের সাথে মিশুক। আবার সে এটাও বোঝে না এই রাইসা মেয়েটির সাথে যদি গভরুখিনের সম্পর্কই থাকে তাহলে আবার সাশার পিছু নেয়া কেন? আন্না মনে মনে উদ্বিগ্ন বোধ করে। কিন্তু এ সব কথা সাশাকে বলা যাচ্ছে না। তার এই ভাইটি পড়াশুনা আর নিজস্ব ভাবনার বাইরে দুনিয়ার আর কিছুই বোঝে না। ট্রেন ছুটতে থাকে আর মার্ক ও সাশা দু’জন মানুষের জন্য প্রচন্ড আবেগ ও ভালবাসার পাশাপাশি ভিন্ন রকম চিন্তা করতে করতে বিষন্ন মন নিয়েই আন্না অপেক্ষা করতে থাকে সিজরান স্টেশনের জন্য, যেখানে বাবা তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

আন্নাকে নিয়ে ইলিয়া যখন ৬৪ নম্বর মস্কো স্ট্রিটের বাড়িতে ঢুকেই দেখেন বাড়ির সবাই ক্রিসমাস উৎযাপনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। ওলগা, মারিয়া ও দিমিত্রিকে নিয়ে ক্রিসমাস ট্রি সাজাচ্ছে। ভলোদিয়া অদূরে বসে একটি বই পড়ছে। মারিয়া ছুটে গেল আন্নার দিকে আর ছোট দিমিত্রি দু’হাত বাড়িয়ে দিল বাবার দিকে। মারিয়া তখন দুপুরের খাবার পরিবেশনের জন্য ব্যস্ত ছিল। আন্নাকে দেখে ভলোদিয়াও বই পড়া বন্ধ করে আন্নার কাছে আসে। সবাইকে সম্ভাষণ করে ইলিয়া ঢুকলেন তার পড়ার ঘরে। যাবার আগে মারিয়াকে বললেন,

‘অামার খাবারটা পড়ার ঘরে পাঠিয়ে দিও। আমাকে বাৎসরিক রিপোর্ট তৈরি করতে হবে।’

একজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্ববান মানুষ হিসাবে ইলিয়া বাৎসরিক রিপোর্ট যত্নের সাথে তৈরি করেন। তিনি বরাবরই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর রিপোর্ট জমা দেন। দীর্ঘ সংসার জীবনে মারিয়া সেটা জানে বলে কোন কিছু না বলেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

১৮৮৬ সালের ১০ জানুয়ারি। দিনটি রবিবার। খুব ভোরে মারিয়ার ঘুম ভাঙে ইলিয়ার কাঁশিতে। মারিয়া দেখে কাঁশতে কাঁশতে ইলিয়া ধনুকের মত শরীর বাঁকা করে ফেলছে। মারিয়া দৌঁড়ে রান্না ঘরে গেল গরম পানির ব্যবস্থা করতে। সামোভার চুলায় চাপিয়ে ফিরে এসে দেখে ইলিয়া পেটে হাত চেপে তখনও অনবরত কাঁশছে। মাঝে মাঝে কাঁশতে কাঁশতে তার দম বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে বোধহয় আর দম ফিরে পাবে না। এ সময় ইলিয়ার চোখ মুখও বেশ শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মারিয়া ভয় পেল। ভীষণ ভয়। এমনতো আগে কখনও হয়নি। এত ভোরে কি করা যায় মারিয়া ভেবে পাচ্ছে না। কিছুই করার নেই জেনেও যদি ইলিয়ার ভাল লাগে এই ভেবে তিনি ইলিয়ার বুকে হাত বুলাতে লাগলেন। কিন্তু কোনভাবেই কাঁশি কমে না। এক সময় সকাল হয়। কাঁশির বেগটা কমে আসে। মারিয়া ডাক্তার ডাকতে চাইলে ইলিয়া নিষেধ করে। দুপুর নাগাদ তিনি বেশ আরামবোধ করেন। মারিয়ার দু:শ্চিন্তা কমে। বিকালে ছেলে-মেয়েদের সাথে একসাথে গল্প করলেন, চা খেলেন। ভলোদিয়ার পড়াশুনার খবর নিলেন। ইলিয়ার শরীরটা ভাল বোধ করায় মারিয়া পরেরদিন সোমবার বিকালে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষকে চায়ের আমন্ত্রণ জানালো।

কিন্তু রাতের বেলা ইলিয়ার শরীরটা আবার খারাপ করে কাঁশির সাথে সাথে তার পেটের গন্ডগোল দেখা দিল। কিছুক্ষণ পর পর তাঁকে বাথরুমে যেতে হচ্ছে। সারারাত তিনি নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরবেলায় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। মারিয়া সকালে তাকে ডাকলেন না। তিনিও অনেক দেরী করে ঘুম থেকে উঠে সেদিন আর কাজে গেলেন না। সারাটা বিকাল কাটালেন তার পড়ার ঘরে। বিকালে চায়ের নিমন্ত্রণে আসা লোকজনের সাথেও তিনি দেখা করলেন না। মারিয়া একবার অনুরোধ করলেও তার পেটটা ভাল নয় বলে মারিয়া আর জোরাজুরি করলো না।

পরেরদিন মঙ্গলবার। জানুয়ারির ১২ তারিখ। ঠান্ডা হলেও বেশ ঝলমলে একটি দিন। শরীর খারাপ নিয়েই ইলিয়া তার সহকারী ভি এস স্টরঝলোকভস্কিকে সাথে করে কাজে বের হলেন। মারিয়া বারণ করলেও তিনি শুনলেন না। যাবার আগে বলে গেলেন তাড়াতাড়িই ফিরে আসবেন। সেদিন বেলা দুইটায় পরিবারের সবাই যখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিল তিনি তখন বাড়ি ফেরেন। ডাইনিং রুমে উঁকি দিয়ে সবাইকে এক ঝলক দেখে তিনি তাঁর পড়ার ঘরে ঢুকলেন। মারিয়া সবার খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত থাকায় ইলিয়াকে লক্ষ্য করে না। আন্না চকিতে বাবাকে দেখে ফেলে। আন্নার কাছে হঠাৎ করেই তার বাবাকে যেন বয়স্ক মনে হলো। তার কাছে বাবাকে খুব ক্লান্ত এবং বাবার অসম্ভব সুন্দর চোখ দুটোকে ভীষণ ম্লান মনে হলো। আন্নার বুকটা ধক্ করে উঠলো। সে মাকে কিছু বলতে যাবে এমন সময় ছোট বোন মারিয়া পানির গ্লাস উল্টে পানি ফেলে দিলে মারিয়া ও আন্না সেটা পরিস্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আন্না যে কথাটা মাকে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিল সেটা ভুলে গেল।

প্রায় চারটার দিকে মারিয়া যখন ইলিয়ার খোঁজে তাঁর পড়ার ঘরে ঢোকে, দেখে ইলিয়া দেয়াল বরাবর রাখা কালো সোফাটার উপর শুয়ে ভয়ানক কাঁশছে এবং সেই সাথে তাঁর শরীরে ভীষণ কাঁপুনি। মারিয়া ভলোদিয়াকে চিৎকার করে ডেকে বললেন তাড়াতাড়ি ডা: লেডজারকে ডেকে আনতে। ডাক্তার লেডজার কাছেই থাকতেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভলোদিয়া ডাক্তারকে সাথে করে ফিরলেও তাকে বসার ঘরে ঢুকতে মারিয়া নিষেধ করলেন। ইলিয়ার শরীর ক্রমশ: খারাপ থেকে খারাপ হতে লাগলো। সেই প্রচন্ড ঠান্ডার দিনেও ইলিয়া ভীষণ ঘামতে লাগলো। তাঁর শরীরের উপরের অংশ ক্রমশ: অবশ হয়ে যেতে থাকে। বিকাল ৫টা নাগাদ আন্না ও ভলোদিয়াকে তাদের বাবাকে দেখার অনুমতি দেয়া হলো। ততক্ষণে ইলিয়ার অবস্থা আরো খারাপের দিকে। আন্না ও ভলোদিয়া ঘরে ঢুকার পর দেখে তাদের বাবার শরীর প্রবলভাবে দু’বার ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। ভলোদিয়া দেখলো এমন পরিশ্রমী, ব্যস্ত ও গম্ভীর মানুষটির শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল সাথে সাথে। আন্না হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে। মারিয়া স্তব্ধ হয়ে ইলিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থাকলো। মারিয়া তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যে, মানুষটা এই মাত্র তাদের ছেড়ে চলে গেল। মারিয়া অপলক চোখে ইলিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তার একটা হাত ইলিয়ার ঘাড়ের নীচে। আরেকটা হাত ইলিয়ার বুকের উপর। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, মারা যাবার পর সেই মুখটিই কেমন যেন শান্ত ও স্থির। এই মুখটিই তো সে প্রথম দেখেছিল আজ থেকে তেইশ বছর আগে পেনজাতে। গরমের ছুটিতে সে বেড়াতে গিয়েছিল পেনজায় তার বোন আন্না ব্ল্যাঙ্ক ও ভগ্নিপতি আই ডি ভেরেটেননিকভের কাছে। ইলিয়া তখন পেনজার জেনট্রি ইনস্টিটিউটের গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞানের নতুন শিক্ষক। ভগ্নিপতি আই ডি ভেরেটেননিকভের আমন্ত্রণে এক বিকালে ইলিয়া চা খেতে এসেছিল। বড় বোন আন্নাই তাকে চা পরিবেশনের জন্য লনে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ইলিয়া এমনই শান্ত চোখে তার দিকে চেয়েছিল। মারিয়া যে সুন্দরী একথা সে ছোটবেলা থেকে শুনতে অভ্যস্ত ছিল। পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি দেখলে সে বুঝতে পারতো। ইলিয়ার চাহনীতে মুগ্ধতা নয়, আরো গভীর কিছু ছিল। মারিয়া প্রথমবার দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু কেন যেন সেইক্ষণে তার মনে হয়েছিল ঐ চোখ দু’টো আবার দেখা দরকার। মারিয়া আবার তাকিয়েছিল। তারপর আবার। ইলিয়া দেখতে সুপুরুষ বলা চলে না। মাথার সামনের দিকে তখনই তাঁর চুল দ্রুত কমে আসছিল। কিন্তু ইলিয়াকে মারিয়ার ভাল লাগে। বোন আন্না রাতে যখন জানতে চেয়েছিল মারিয়ার এখনও মনে আছে সে কি বলেছিল। আন্নার প্রশ্নের জবাবে সে বলেছিল, ‘আমার পঁচিশ বছর বয়সে অনেক পুরুষকেই আমার দিকে তাকাতে দেখেছি নানা ভাবে। কিন্তু কোন পুরুষের চোখে আমার জন্য এতটা শ্রদ্ধামিশ্রিত গভীরতা দেখিনি। তোমাদের পছন্দ হলে আমার কোন আপত্তি নেই’। তাই মাত্র তিন মাসের মাথায় পেনজাতে ১৮৬৩ সালের আগস্ট মাসে তাদের বিয়ে হয়ে যায়। আজ যেন তেইশ বছর আগের সেই চোখ দুটো তাকে আবার দেখছে। কান্না নয়, হাহাকার নয়, শোক নয়, মারিয়া গভীর আবেগ ও ভালবাসায় ইলিয়ার চোখের দিকে চেয়ে থাকে।

ডাক্তার লেডজার এগিয়ে এসে ইলিয়ার শরীরে হাত দিয়ে বললেন, ‘তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন’। সে কথায় আন্না ডুকরে কেঁদে ওঠে। ভলোদিয়া তখনও বাবার পায়ের দিকটায় দাঁড়ানো। বাড়িতে কান্নার শব্দে ওলগা এবং মারিয়াও ছুটে আসে। দিমিত্রি তখন বাড়ি ছিল না। সে গিয়েছিল তার এক বন্ধুর বাড়ি। ওলগা ও মারিয়া এসে ইলিয়ার মাথার কাছে বসে মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলে মারিয়া যেন সম্বিৎ ফিরে পায়। মারিয়া নিজেকে একটু সামলে নেয়। তারপর ভলোদিয়াকে বলে,
-ভলোদিয়া, তুমি ঘোড়ার গাড়ীটা নিয়ে যাও, দিমিত্রিকে নিয়ে আসো।
অতঃপর মারিয়া ওলগাকে বললো, ‘ওলগা, তুমি মারিয়াকে সাথে নিয়ে যাও। প্রতিবেশীদের খবর দাও। বলো যে তোমাদের বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন’। ওলগা ও মারিয়া কাঁদতে কাঁদতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে মারিয়া ডাক্তার লেডজারকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-আপনার কি মনে হয়? উনার কি হয়েছিল?
-পোস্টমর্টেম ছাড়া সঠিকভাবে বলাটা কঠিন। তবে আমার অনুমান উনার ব্রেইন হেমারেজ হয়েছিল। তবে আপনি চাইলে আমরা পোস্টমর্টেম করাতে পারি।
-সেটার দরকার নেই।
মারিয়া ডাক্তারের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল। ডাক্তার ঘর ছেড়ে চলে গেলে আন্না কাঁদতে কাঁদতে বললো,
-বাবার সাথে সাশার শেষ দেখাটাও হলো না।
আন্নার একথায় মারিয়ার এতক্ষণের শোকটুকু যেন আর বাঁধ মানে না। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে থাকে। কিছুক্ষণ পর উভয়েই একটু শান্ত হলে আন্না মারিয়াকে বলে,

-মা, সাশাকে একটা টেলিগ্রাম করে দেবো?

মারিয়া কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর ইলিয়ার চোখের দিকে আবার তাকালো। ইলিয়ার চোখ দুটো তখনও খোলা। মারিয়া তাঁর ঘাড়ের নীচ থেকে বাম হাতটি সরিয়ে নিজের ডান হাতটি দিয়ে তাঁর চোখের পাতাগুলো বন্ধ করে দিলেন। তারপর আন্নাকে বললেন,

-এখন থাক। আগামীকাল সাশার একটা পরীক্ষা আছে। পরীক্ষাটা শেষ হোক।

মায়ের একথায় আন্না চুপ করে গেল। ভলোদিয়া মায়ের এ কথায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। এমন অবস্থায়ও এমন ঠান্ডা মাথায় সবদিক খেয়াল করার শক্তি দেখে সে আশ্চর্য্যবোধ করে। সদ্য মৃত বাবার মুখ নয়, ভলোদিয়া গভীরভাবে মায়ের মুখখানি দেখতে লাগলো।

বাবার মৃতদেহটা তখনও কালো সোফাটার উপর। তাঁকে ধরে কাঁদছে দু’জন মানুষ। কিন্তু ভলোদিয়ার কোন কান্না পাচ্ছে না কেন? ভলোদিয়া এই প্রথম চোখের সামনে কারো মৃত্যু দেখলো। মা ও আন্না কাঁদছে কিন্তু ভলোদিয়া যেন তখনও বিষয়টি ভাল বুঝে উঠতে পারছে না। সে যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। বাবার মৃত্যু বা এভাবে চলে যাওয়াটা সে যেন তখনও মেনে নিতে পারছে না। যে কারণে মায়ের বা আন্নার কান্না কিংবা কিছুক্ষণ আগে কান্নারত ওলগা ও ছোট্ট মারিয়া ঘর থেকে বের হয়ে গেলেও সে বিচলিত বোধ করে না। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন, দু’জন করে প্রতিবেশী আসা শুরু করে। ভলোদিয়া নীরবে সেখান থেকে চলে গেল দিমিত্রিকে আনতে।

পরেরদিন ইলিয়ার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হলো পোকরোভস্কি সিমেট্রিতে। সিমেট্রির দক্ষিণপাশের দেয়াল বরাবার একটি কবরে তাঁকে সমাহিত করা হলো। ইলিয়া তার জীবদ্দশায় প্রায় ৫০০টি স্কুল তৈরি করেছিলেন। তিনি এক সময় শিক্ষকতাও করেছেন। তাঁর শবযাত্রায় তাই স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষা বিভাগের লোকজন ও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও যোগ দিল। স্কুলের ছেলে-মেয়েরা ফুলের মালায় কফিনটি ঢেকে দিল। পরিবারের পক্ষ থেকে কফিনটি বহন করলো ভলোদিয়া। সাথে ছিল ইলিয়ার কিছু সহকর্মী ও প্রতিবেশী। নারীদের কফিন বহনের কোন রীতি নেই। তাই বড় সন্তান হয়েও আন্না বা স্ত্রী মারিয়া কফিন বহন করতে পারলো না। বড় ছেলে সাশা রাজধানীতে থাকায় ভলোদিয়াকেই সে দায়িত্ব পালন করতে হলো। সেদিন ১৩ই জানুয়ারি স্থানীয় পত্রিকায় ইলিয়ার মৃত্যুর খবর এবং সেই সাথে অনেক শোক-বার্তা প্রকাশিত হলো। ওলগা সে সব পত্রিকা যত্ন করে রেখে দিল। ইলিয়ার কফিনটি কবরে শোয়ানোর পর ভলোদিয়ার খুব ইচ্ছে করছিল বাবার মুখটি আরেকবার দেখে। মৃত্যুর পর বাবার মুখটি সে খুব ভাল করে দেখেনি। ভলোদিয়া জানে সেটা হবার নয়। পাদ্রী সাহেব কবরে প্রথম মাটিটুকু তাকেই দিতে বলে। ভলোদিয়া তখন কল্পনায় বাবার মুখটা দেখার চেষ্টা করছে। বাবার মুখখানি কল্পনায় সে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে না কেন? কেমন যেন ঝাঁপসা, অস্পষ্ট একটা ছবি মনের পর্দায় ভেসে আসছে। পাদ্রী সাহেব আবার তাড়া দিলেন। ভলোদিয়া কথাটা শুনলো বটে তবে তখনও সে মাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। একজন বলে উঠলো, ‘ছেলেটা বোধ হয় শোকে পাথর হয়ে গেছে। ওর শরীর ধরে একটু ঝাঁকুনি দাও না?’। লোকটার কথা শুনেই হোক বা ভলোদিয়ার মাটি হাতে কালক্ষেপণ করতে দেখেই হোক ইলিয়ার সহকর্মী স্টরঝলোকভস্কি কাছে এসে ভলোদিয়ার হাত দুটি নিজ হাতে ধরে কবরে প্রথম মাটিটুকু দিতে সাহায্য করে।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাড়ি ফিরতে ভলোদিয়ার সন্ধ্যা হয়ে যায়। ফেরার পথে ভলোদিয়ার মনে হলো যে মানুষটি গতকালও জীবিত ছিল, বিকালে চায়ের টেবিলে একসাথে বসে গল্প করলো আজ কবরখানায় তাঁর কফিনটি রেখে আসার পর সেই মানুষটির সাথে জাগতিক সমস্ত কিছুর সম্পর্ক রহিত হয়ে গেলো। বাড়িতে ঢুকতেই মনে হলো সব কিছু যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা। বসার ঘরে মা কথা বলছিলেন কয়েকজন প্রতিবেশীর সাথে। আন্না বা অন্যরা হয়তো অন্য কোথাও। ভলোদিয়া গেল বাবার পড়ার ঘরে। আলমারিগুলো বইয়ে ভরা। বাবার চেয়ারটা খালি। এই চেয়াটাকে তারা ভাই-বোনরা বলতো ‘ব্ল্যাক চেয়ার’। এই চেয়ারে তিনি আর কোনদিন বসবেন না। এটা মনে হতেই ভলোদিয়ার বুকটা যেন হু হু করে উঠলো। মনে হলো বুকের ভিতর থেকে শো শো করে একটা বাতাস দমকা হাওয়ার মত বেরিয়ে গেল। ভলোদিয়ার যেন হঠাৎ করেই ভীষণ শীত করতে লাগল। সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার সময় আন্নার সাথে দেখা হলো। আন্নার চোখ-মুখ ফুলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। আন্না ভলোদিয়াকে জড়িয়ে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। ভলোদিয়া শক্ত করে আন্নাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। আন্নার কান্না শুনে ছোট্ট মারিয়া ও দিমিত্রি ছুটে আসে। ভলোদিয়া ও আন্না তাদেরকেও জড়িয়ে ধরে। ওলগাকে আশেপাশে দেখা গেল না। হয়তো সেও তার ঘরে বসে কাঁদছে। সমবেত এই কান্না ভলোদিয়ার চোখকে যেন ভিজিয়ে দিতে চাচ্ছে। দিমিত্রি ঘুরে ভলোদিয়ার মুখ দেখতে চাইলো। দেখতে চাইলো ভলোদিয়াও কাঁদছে কিনা। সবাই একটু শান্ত হলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ভলোদিয়া আন্নাকে বলে‘ ‘মাকে বলো আমি নিজের ঘরে আছি’। ভলোদিয়ার এ কথায় আন্না ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে বসার ঘরের দিকে চলে যায়। ভলোদিয়া নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ভলোদিয়ার মনে হলো বাবা নেই, এটাই এখন একমাত্র সত্য। হাজার কান্নায়ও বাবা ফিরে আসবেন না। এত যে কান্না, এত যে শোক তাও বাবাকে স্পর্শ করবে না। ভলোদিয়ার নিজের বুকটা ক্রমশ: যেন ভারী হয়ে উঠতে থাকে। চোখটাও কেমন যেন ঝাপসা লাগছে! চোখের কোনায় হাত যেতেই দেখে অনেক অশ্রুকণা জমা হয়ে আছে। হাতের স্পর্শে অশ্রুগুলো গড়িয়ে পড়ে। গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে বালিশ ভিজতে থাকে। এত চোখের পানি সে কীভাবে পুরো একটা দিন আটকে রেখেছিল? বুকের জমানো ব্যথাটুকু অশ্রু হয়ে অবিরাম ঝরতে থাকে। সেই রাতে ঘুমুতে যাবার আগে ভলোদিয়া নিজের গলার ক্রুশটি খুলে রাখে।

সাশার অর্গানিক ক্যামিস্ট্রি পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে। আজ ১৪ই জানুয়ারি। তার মনটা বেশ ফুরফুরে। পরীক্ষার কারণে পাশের ঘরে থাকলেও গত কয়েকদিন শেবোটারেভ তার ঘরে ঢোকেনি। আজ তাই দুপুরের খাবারের পর শেবোটারেভ সাশার ঘরে বসে আছে। বিকালবেলা দু’জনেই ইতিহাস সমিতির সভায় যাবার পরিকল্পনা করে। শেবোটারেভ বসে আছে সোফায়। সাশা বিছানায় বালিশটাকে একটু মুচড়ে কাত হয়ে তার সাথে গল্প করছে। এমন সময় দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ। শেবোটারেভ দরজা খুলতেই দেখে সাশার খালাতো ভাই আলেকজান্ডার। এসময় তাকে দেখে সাশা একটু অবাক হলেও উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। একটি চেয়ার এগিয়ে দেয় তার বসার জন্য। নিজে গিয়ে দাঁড়ায় বিছানার কাছে। চেয়ারে বসতে বসতেই সে বলে,

-সাশা, একটা খারাপ খবর আছে।

সাশার বুকটা ধক্ করে ওঠে। তার প্রথমেই মনে হয় মায়ের কিছু হয়নি তো! সাশা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

-কী হয়েছে?

কোন ভনিতা না করেই সে বলে, ‘গত ১২ জানুয়ারি খালু মারা গেছেন!’

সাশা ধপাস্ করে বিছানায় বসে পড়ে। তারপর দু’হাতে মুখ ঢেকে সে ফু্ঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। অনেকক্ষণ পর সে একটু শান্ত হলে শেবোটারেভ তার পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখে। চেয়ারে বসে থাকা আলেজান্ডারের চোখেও পানি। সাশার কেবলি মনে হতে থাকে গতবার বাড়িতে গিয়ে সে বাবার সাথে কিছু বিষয় নিয়ে অযথা তর্ক করেছিল। বাবা এবং সে কথা বলছিল বাড়ির সামনের বাগানে হাঁটতে হাঁটতে। বাবার একটি কথার প্রেক্ষিতে সাশা বেশ উঁচু স্বরে তার প্রত্যুত্তর করে। তার এমন আচরণে বাবা কষ্ট পেয়ে চুপ করে যান। বাগানে তখন দিমিত্রি খেলছিল। ভয় পেয়ে সে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। বাবা হয়তো তাকে সেদিন আরো কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাশা গলার স্বর উঁচু করে কথা বলায় তিনি অন্য কোন আর বলেননি। সাশা তার আচরণে ভীষণ লজ্জ্বা বোধ করে সেদিন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবা আর কোন কথা না বলে তাঁর পড়ার ঘরের দিকে চলে যায়। সাশা নিজের এমন আচরণে এতটাই বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়ে যে বাবার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথাটাও সেদিন ভুলে যায়। তার সেই বাবা এভাবে চলে গেলো? বাবার কাছে ক্ষমাটুকু আর চাওয়া হলো না, দেখাও হলো না! বাবা সেদিন কি বলতে চেয়েছিলেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চার্চের খবরদারির বিরোধীতার কারণে তিনি কিছু মানুষের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। সেটা সাশা জানতো। এর বাইরে বাবা কী বলতে চেয়েছিলেন? কেন সে ঐ দিন বাবার সাথে ওভাবে কথা বলেছিল? এসব কথা মনে হতেই সাশা যেন একেবারে ভেঙে পড়ে। সে সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ বসে থেকে একসময় আলেকজান্ডার চলে যায়। যাবার আগে সাশাকে মুখে শান্তনা না দিয়ে সাশার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে যায়। শেবোটারেভ বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিত? সে কি আজ বাসায় থাকবে না ইতিহাস সভায় যাবে? সাশার যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সাশাকে এই অবস্থায় একা রেখে যাওয়াও যায় না। সেও চুপচাপ সাশার ঘরে অপেক্ষা করতে থাকে।

অনেকক্ষণ এভাবে কেটে যাবার পর সাশা দেখে শেবোটারেভ তখনও চুপচাপ বসে আছে। সে বলে,

-শেবোটারেভ, তুমি ইতিহাস সমিতির সভা থেকে ঘুরে আসো। আমি বাসায় আছি।’

শেবোটারেভ বলে, ‘কোন অসুবিধা নেই। আজ থাক। তোমাকে এভাবে একা রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না।’

সাশা শেবোটারেভকে একরকম জোর করেই পাঠিয়ে দেয়। তার এখন একা থাকাটা দরকার। সাশার বারবার মনে হতে লাগলো বাবার এই অকাল মৃত্যুতে তারও একটা ভূমিকা আছে। একথা যতই মনে হচ্ছে নিজেকে তার চরম অপরাধী মনে হচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। শেবোটারেভ তখনও ফেরেনি। রাইসা তখনও বাইরে। বাড়িওয়ালী থাকে নীচে। সাশা দাঁড়িয়ে আছে জানালার কাছে। ঠান্ডার কারণে জানালা বন্ধ। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকার ঘরেও। মাথায় অসহ্য ব্যথা। এদিকে বুক ফেটে যাচ্ছে কান্নায়। সাশা নিজেকে অপরাধী ভাবতে ভাবতে এমনই মানসিক অবস্থায় পৌঁছায় যে সে একবার ভাবলো আত্মহত্যা করবে। আর এই ভাবনাটা তার মাথার মধ্যে একটা নেশার মতো যেন ঘুরপাঁক খেতে থাকে। অবস্থা এমন হয় যে সাশা আত্মহত্যার চিন্তা থেকে কোনভাবেই বের হতে পারছে না। সে অস্থির বোধ করতে থাকে। এমন সময় তার দরজায় জোরে জোরে শব্দ হতে লাগলো। তখনও ঘরে আলো জ্বালানো হয়নি। সাশা নিজের চোখমুখ মুছে প্রথমে ঘরে আলো জ্বালাতে গেল। ততক্ষণে দরজার ওপাশে অপেক্ষারত রাইসা অস্থিরভাবে আবার দরজার কড়া নাড়তে লাগলো। রাইসা আজ দেরী করে ইতিহাস সমিতির সভায় গিয়েছিল। সেখানেই শেবোটারেভের কাছে খবরটি শুনে একটুও দেরী না করে সে সোজা বাসায় চলে এসেছে। সাশা দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে রাইসা ঘরে ঢোকে। সাশার চোখ-মুখ তখনও ফুলে আছে। সাশার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে সাশাকে দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে। সাশাও তখন রাইসাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

প্রথম পর্বের লিঙ্ক:
http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3491
দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক:
http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3868
তৃতীয় পর্বের লিঙ্ক:
http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4027
চতুর্থ পর্বের লিঙ্ক:
http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4155

 

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top