ইনতিযার হুসেইন কে? II জাভেদ হুসেন


ইনতিযার হুসেইন কে? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া একটু ঝামেলার ব্যাপার। কারণ ইনতিযার হুসেইন নিজে সারা জীবন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে গেছেন। সেই উত্তর তৈরি করার চেষ্টাই হচ্ছে তাঁর ছোট গল্প, উপন্যাস আর পত্রিকার জন্য লেখা প্রবন্ধ। অমিমাংসিত এই প্রশ্নের জবাব ভারতবর্ষ আর প্রতিটা উপনিবেশ পরবর্তি জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য সমান রকম প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম তথা গাইডেড সংস্কৃতি দিয়ে তাকে এরকম সবগুলো রাষ্ট্রই সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। যা আমাদের ইতিহাসে নেই, তাকেই যখন আমাদের বর্তমানের পরিচয় বানাই, তখন নিজের ইতিহাস নিজের কাছে গোলকধাঁধা মনে হয়। ইনতিযার হুসেইন এই ধাঁধাঁ চিনতে পেরেছিলেন। এর ফলে ১৯৪০এর দশকের ভারতবর্ষে বড় হয়ে ওঠা এই সাহিত্যিক প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের প্রবল বলয়ে ঘনিষ্ঠ থেকেও তাদের ধারায় সরাসরি দীক্ষা নেননি। কিন্তু যে খোঁজ তিনি করলেন, সেটা লেখক সঙ্ঘের বর্তমানকে এর অতীতের সঙ্গে জুড়ে দেয়ার কাজটি করেছে।
ভারতবর্ষের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার ইতিহাস। এই ইতিহাস ঘটে যাওয়া ঘটনার সামনে নিজেকে খুঁজে না পেয়ে কখনো ঘটনা আর কখনো নিজেকে অস্বীকারের বয়ান।
ইনতিযার হুসেইনকে নিয়ে কথা বলতে গেলে উপমহাদেশের ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। স্বাধীনতা, ১৯৪৭র দেশভাগ, রাজনীতি আর ধর্মের বিভীষিকা কাউকে বাদ দেয়া যাবে না। ঘটমান রাজনীতির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বয়ান স্বৈরশাসকের ভূমিকা নেয়। তার দাবি থাকে কাউকে মহিমান্বিত করার, অজস্র জটিল ঘটমানতাকে সরলীকরণ করার। লেখক এবং পাঠক সাবধান না হলে সেই দাবির কাছে জিম্মি হয়ে যেতে হয়। ইনতিযার হুসেইন এই দাবির কাছে সমর্পিত হননি। দেশভাগের পর বর্তমানের মাঝে অচেতন হয়ে থাকা অতীতকে নিয়ে প্রশ্ন আর উত্তরের অন্বেষণ, যা বদলে গেছে আর যা বদলে যায়নি তা চিনে নেয়ার তীক্ষ্ণ চোখ আর যদি অতীত একটু ভিন্ন রকম হতো তাহলে বর্তমান কেমন হতো – এই অন্বেষণ একই সঙ্গে আজকের বর্তমান সম্ভাব্য কেমন ভবিষ্যতের রূপ নিতে পারে সেই প্রশ্নের আকার দেয়ার জন্য জরুরী তালাশ বলে মনে করতেন ইনতিযার হুসেইন। তাঁর গল্প আর উপন্যাসের চরিত্ররা সবাই ইতিহাস আর রাজনীতির মাঝে বেঁচে থাকে, কিন্তু তারা সেই ইতিহাসের বহাল বয়ানের দাস হতে অস্বীকার করে।
রেডিও, টেলিভিশনের খবর আর আলাপচারিতা, মিছিলের শ্লোগানের পাশে থাকে নদীতে মাছ ধরে থাকা জেলে, থাকে বাজারের কোনে মাথা নুইয়ে থাকা ভিখেরি, কারখানায় পুড়ে মরা একমাত্র অবলম্বন সন্তানের ফুটপাথের পাশে বিড়বিড় করে কাঁদতে থাকা বৃদ্ধা, থাকে চায়ের দোকানের গুজব আর গল্প, প্রতিবেশি গৃহিনীদের বিকেলের অন্তহীন আলাপচারিতা। রাজনীতির সঙ্গে গুজব, ঘটনার সঙ্গে গল্প আর ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির সঙ্গে লোকগাথা – এতো ইতিহাস সৃষ্টির এক অনস্বীকার্য প্রক্রিয়া। কোন একাডেমি তাকে ধারণ করতে পারে না, কোন বহাল বয়ান তাকে আটকে ফেলে প্রকাশ করতে পারে না। সেই বয়ানকে প্রকাশ করার কাজ সারা জীবন চালু রেখে গেছেন ইনতিযার হুসেইন।


আধুনিক উর্দু কথা সাহিত্য বিকাশে ছোট গল্প যে ভূমিকা পালন করেছে, সেই দায়িত্ব পালন করার কথা উপন্যাসের। সেই দায়িত্ব হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠির বয়ান হাজির করা। উর্দুর প্রথম আধুনিক উপন্যাস হচ্ছে ১৮৯৯ সালে ছাপা ‘উমরাও জান আদা’। এর পর প্রায় অর্ধ শতাব্দী আর কোন উল্লেখযোগ্য উপন্যাস লেখা হয়নি। এই শুন্যতার জায়গায় কেন্দ্রে উঠে আসে উরদু ছোট গল্প। সমাজকে নতুন সময়ের ছাঁচে ফেলা, সংস্কার, ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, সদ্য জেগে উঠা জাতিবোধের ধারণা – এই সব কিছুকে সফলভাবে ধারণ করলো উর্দু ছোট গল্প। মুনশি প্রেমচন্দ (১৮৮০ – ১৯৩৬) উর্দু বাস্তবভিত্তিক ছোট গল্পের যে ভিত তৈরি করলেন সেই ধারায় কৃশন চন্দর, ইসমত চুগতাই, সাদাত হাসান মান্টো, রাজেন্দর সিং বেদি। তারা এই ধারার সম্ভাবনা পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাঁরাই এক হয়ে ১৯৩০র দশকে প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁরা জোর দিলেন সাহিত্যের সামাজিক ভূমিকার ওপর। একা একা লিখে যাওয়া লেখকদের প্রথমবারের মত কোন ভাবনা এক্ত্রিত করতে পেরেছিল এই প্রক্রিয়ায়। হাওয়াই রোমান্স আর ফ্যান্টাসি হতে উর্দু সাহিত্যকে তাঁরা নতুন এক সম্ভাবনার দিউকে নিয়ে গেলেন। ইনতিযার হুসেইন সেই কালেই বেড়ে উঠেছেন।
প্রাথমিক উর্দু ফিকশন গড়ে উঠেছে গদ্য রোমান্সের আদলে যাকে বলা হতো ‘দাসতান’। এর বাস্তবের সঙ্গে যোগ ঘটার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে পশ্চিম হতে, মোপাসা, চেখভ, মম, ছিল আদি বাস্তবনির্ভর উর্দু ছোট গল্পের অনুপ্রেরণা। এই ধারার পরবর্তি সংযোগ হচ্ছেন ইনতিযার হুসেইন।
অবিভক্ত ভারতের উত্তর প্রদেশের আলীগড়ের দিবাই গ্রামে জন্ম ইনতিযার হুসেইনের ১৯২৩ সালে। ধুসর, নিদ্রালু সেই গ্রামে তাঁর ছেলেবেলা কাটে। পশ্চিমা শিক্ষার কুপ্রভাব থেকে বাঁচাতে বাবা বেশ কিছুদিন তাকে ঘরেই পড়ালেখা করালেন। শিখলেন আরবি, ফার্সি আর মাঝে মধ্যে উর্দু বই পড়ার সুযোগ হতো। এক সাক্ষাতকারে তিনি ছেলেবেলার কথা বলছেন:
“ছেলেবেলায় আমি গ্রামের পাশে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম একা। কখনো আম, জাম কখনো তেতুল পেড়ে সময় কাটতো। গ্রামের প্রতিটা গাছ নিয়ে একটা করে গল্প থাকতো। তখন থেকেই সেই একাকি গাছদের সঙ্গে, খোলা মাঠের সঙ্গে আমার আলাপে গল্প আমার অস্তিত্তের অংশ হয়ে রয়ে গেছে।…আমাদের বাড়িতে একটা বই ছিলো। হলুদ মলাট, ওপরে জিন আর জাদুকরের ছবি। আমি সেই বই পড়তে শুরু করলাম। আমার বাবার একটা ছোট লাইব্রেরি ছিল। সেগুলোও পড়া শুরু হলো”।
তাঁর প্রথম স্মৃতির মাঝে ছিল খেলাফত নেতা মুহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মিছিল, আল্লামা ইকবালের মৃত্যুর খবর। দশ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হলেন। পরে মিরাট কলেজ থেকে উর্দু সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি নিলেন। তখন ১৯৪৭ সাল। ভারতভাগের উত্তাল সময়। সে বছরের শেষের দিকে ইনতিযার হুসেইনকেও জন্মভূমি ছেড়ে লাহোর যেতে হলো। তিনি নিজে বলছেন:
“ দেশভাগের প্রক্রিয়া যখন শুরু হলো, রায়ট লাগলো, আমার মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনূভব করলাম, যেন কিছু একটা আমার হাত ফস্কে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি আমার সেই অস্থিরতা সব লিখে রাখার চেষ্টা করলাম। তারই ফল হলো দুটো ছোট গল্প। দুটোই লেখা হয়েছিল মিরাটে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়। আমার মনে হয় সেই কারণ না হলে আমি ছোট গল্প লেখার কথা ভাবতাম না”।
কিন্তু ছোট গল্পই কেন? কারণ খুব পরিষ্কার, সেই সময় পত্রিকাতে ছাপার জন্য ছোট গল্পই ছিল সবচেয়ে সুবিধাজনক, নতুন লেখকের বর লেখা কে ছাপবে!
নতুন দেশে পা দেয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। কিন্তু তার কালের প্রভাবশালী প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা থাকলেও, সেই ধারা তিনি অনূসরণ করেননি। তাঁর কাছে মনে হয়েছি অতীতকে সেই অতীতের দৃষ্টি দিয়ে না দেখলে তাকে আরোপিতভাবে বোঝা হবে। যে অতীতের মাঝে তিনি আজকের বহমান বর্তমানের বীজ খুঁজে পেতে চান, তাকে তিনি সমগ্র হিসেবেই অনুসন্ধান করতে আগ্রহী।
দিন গেলে পর, দেখলেন যে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন “ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতি, আমি যার হাতে সৃষ্টি, যা আমি যে ইতিহাসের অংশ তাকে আকার দিয়েছে”। তিনি দেখতে পেয়েছেন তাঁর সংস্কৃতি রূপ লাভ করেছে ভারতবর্ষে, এই মাটির বর্তমানের সঙ্গে এক সৃষ্টিশীল মেলামেশার মধ্য দিয়ে। সেই অগ্রযাত্রা বার বার থমকে গেছে কৃত্রিম বাধায়। ছক বাঁধা গোড়া মুসলমান আর হিন্দু মানস একে আটকে দিতে চেয়েছে। একদিকে আছে সেই মুসলিমেরা যারা ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমনের আগের সমস্ত ইতিহাস চোখ বুজে অস্বীকার করতে চায়, আরেকদিকে আছে সেই সব হিন্দু মানস যারা মুসলিম ভাবনার সঙ্গে এখানের মানুষের সমস্ত মিথঃষ্ক্রিয়া অস্বীকার করে তা শুরু হবার কোণ এক কালে ফিরে যেতে চায়। এই দুই দিকের প্রতিক্রিয়াশীল উপাদানগুলোই আমাদের ওপর দিয়ে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজিক ঘটনাবলীর বীজ বুনে দিয়েছিল। (বস্তি উপন্যাসের ইংরেজি অনূবাদে উমর মেননের ভূমিকা)। এই বেদনাদীর্ণ চৈতন্য নিয়েই ইনতিযার হুসেইন দেশভাগের বাস্তবকে খতিয়ে দেখেছেন।
সাদাত হাসান মান্টো দেশভাগের হিংস্রতায় যে মানবিক বিপর্যয় দেখেছিলেন, ইনতিযার হুসেইনের কাছে প্রথম দিকে ছিল নতুন দেশে নতুন সম্ভাবনার আশা।
লাহোরে তিনি সাহিত্য জগতের সঙ্গে প্রথম থেকেই জড়িয়ে গেলেন। দেখা গেল তিনি তাঁর গল্প পড়ছেন প্রগতিশিলদের আসরে, আবার কলাকৈবল্যবাদিদের দল হলকায়ে আরবাবে যওক-এও আনাগোনা ছিল। নতুন দেশে নতুন সাহিত্য ধারার প্রয়াসেও তাঁর উদ্যম দেখা গেল।
রাজনীতি দিয়ে দেশ হলেও রাতারাতি সাহিত্য ধারা তৈরি হয় না। নতুন পাকিস্তানে জাতীয় সাহিত্য আর সংস্কৃতির রূপ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। পাকিস্তানের নাগরিকেরা কি তাদের ভূখন্ডে পড়ে যাওয়া হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর কাল থেকে তাদের ইতিহাস শুরু করবে। নাকি ইসলামের শুরু থেকে,নাকি তারো পরে উপমহাদেশে ইসলামের আগমনের পর থেকে?
ইনতিযার হুসেইন কিছু দিন পর এই তর্ক থেকে সরে এলেন। তাঁর মনে হলো এই তর্ক সমাধানের যোগ্য নয়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘পাকিস্তানি কাহানিয়াঁ’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখলেন:
‘আমরা যদি ভারত থেকে আলাদা জাতি হই তাহলে আমাদের জাতীয় আর সাংস্কৃতিক পরিচয় কী? আমাদের ইতিহাসের শুরু কোথায়? যদি ভারতবর্ষে মুসলিমদের আগমন থেকে শুরু করি তাহলে তার আগের সময়ের কী হবে? সেই যুগও কি আমাদের ইতিহাস নয়? তা যদি হবে, তাহলে মুসলিম ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী”?
ইনতিযার হুসেইনের সমগ্র সাহিত্য এই সংযোগের অনুসন্ধান বলা যায়। কিন্তু পাকিস্তানে দেশভাগপূর্ব বহু সংস্কৃতির সভ্যতা তিনি খুঁজে পেলেন না। দেশভাগের প্রথমে আশাবাদ সত্বেও তার গল্প আর উপন্যাসের চরিত্রেরা হিজরত করে আশা দেশে কোন অর্জন খুঁজে পেতে দেখা যায় না। ফলে তাঁরা অতীতের স্বপ্নের মাঝে আশ্রয় পায়, তার হাতেই তাড়িত হয়। তাদের ভুতপূর্ব জীবনে যে সমগ্রতার অস্তিত্ত্ব ছিল তা তিরোহিত হয়েছে। তাঁরা এখন বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার বেদনায় আক্রান্ত। সে বেদনা আরো ভালো আর সমৃদ্ধ অতীতের অনুভূতি হতে কেটে বাদ পড়ে যাওয়ার বেদনা। বাস্তবের বর্তমানের চাইতে অতীত বড় বাস্তব হয়ে যাওয়ার কথা তিনি এমন করে বলছেন:
“ আমি বুঝি না কেন জীবন্ত জিনিষের কথা লিখে রাখতে হবে! আমি জিনিষের মৃত শরীর নিয়ে লিখি। জীবন্ত, বাস্তব জিনিস তো স্পর্শগ্রাহ্য, তাদের নিয়ে লিখবো কী করে! তাদের মাঝে কোন না জানার ছায়া নেই যা নিয়ে আমি আমার কল্পনাকে ঠাই দিতে পারি। এগুলো নিয়ে পত্রিকার রিপোর্ট হতে পারে কিন্তু কবিতা বা গল্প হয় না”।
যদি সাদাত হাসান মান্টো যদি ১৯৪৭এর কদর্যতা, এর ক্ষতকে এক সার্জনের দৃষ্টি নিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরেন, তাহলে ইনতিযার হুসেইন সেই ক্ষতের উপরিস্তর হতে, শরীর হতে মন আর স্মৃতির গভীরে প্রবেশ করে এমন আঘাত উন্মোচন করেন যা প্রশমিত হয়নি, হয়তো কখনো হবে না, যাকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে তাকে মেনে নিয়েই, যে ক্ষত থেকে নতুন করে বারবার রক্ত-পুঁজ ঝরবে কিন্তু আমরা তার কারন মনে করতে পারবো না যে কখন কোথায় এই আঘাত লেগেছিল।
ইনতিযার হুসেইনের সাহিত্য ছিল অতীতকে দেখা। সে দেখা ফিরে দেখা নয়। এই অতীত তাঁর বর্তমানের চাইতে অনেক বেশি সমন্বয়ের কথা বলে, সে বর্তমানের খন্ডায়নের মুখোমুখি বৈচিত্রকে ধারণ করার সামর্থের অস্বস্তিকর বাস্তবতার ছবি তুলে ধরে। গল্পের পরে গল্পে তিনি একটা ভয়াবহতার সুতোর দীর্ঘ জড়ানো মাকু খুলে ছবি একেছেন। সেই ঘটনা দেশভাগ নামে আমরা জানি। এই ভাগ তাঁর কাছে কেবল ১৯৪৭ সালে শুরু বা শেষ নয়। এই ভাগ কেবল কয়েক কোটি মানুষের স্মরণাতীত কাল হতে নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়া নয়। এ হচ্ছে নিজের মনোজগতের কাছ হতে বিরহ। একে তিনি দেখেছেন মহানবীর মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের পাশে রেখে। একই সঙ্গে দেশভাগ তাঁর গল্পে এক তাড়া করে ফেরা এক হারানো জীবন, যে জীবন আর কখনো ফিরে আসবে না। আরো ভয়াবহ হচ্ছে এই যে, দেশ ছাড়ার বেদনার মাঝে ভাল ভবিষ্যতের যে নিরুপায় আশা ছিল তাও যেন হাতছাড়া হয়ে গেছে।
দেশভাগ নিয়ে তাঁর ট্রিলোজিতে (বস্তি, আগে সমন্দর হ্যায় আর নয়া ঘর) তিনি পাকিস্তানকে এক ভাঙ্গনের গাথা হিসেবে দেখছেন। তিনি সরাসরি দ্বিজাতি তত্ত্বের যে বাস্তবায়িত রূপ তাকে নিয়ে প্রশ্ন করছেন। অস্বস্তিকরভাবে তাঁর দেশের শাসককুলের সামনে তিনি বলে দিচ্ছেন যে, ১৯৭১এর ঘটনার জন্য যত আক্ষেপ, দোষারোপ হচ্ছে হোক, এর জন্য পূবের বাসিন্দাদের দায়ী করার কোন উপায় নেই। নির্মন রকম সৎ হয়ে তিনি বলে দিচ্ছেন যে পাকিস্তান তৈরির প্রথম যুগে নতুন দেশের পুরাতন এই মানুষদের মাঝে যে নিষ্পাপতা আর উদার-হৃদয় ছিল তার পেছনে ধর্ম ছিলো না। ছিল সবার মাঝে সমান রকম সত্য হারানোর বেদনা, দেশ হারানোর দূঃখ।
এ হতাশার গল্প স্পষ্টভাবে আসছে ‘আগে সমন্দর হ্যায়’ উপন্যাসে। অতীত আর বর্তমানের মাঝে অবিশ্রান্ত সাতার কেটে, নিজ ভাবনার ভারত আর দেখে আসা ভারতের মাঝে ক্লান্তিহীন চলাচলে তিনি সমান উত্তরাধিকারে নিজেকে আবিষ্কার করছেন পঞ্চতন্ত্র, জাতক, কথাসরিৎসাগর, মহাভারতে, নিজেকে অসম্পূর্ণ জানছেন যদি সেই নিজেকেই না দেখেন আলিফ লায়লা আর দাস্তানের গল্পে। কিন্তু সর্বত্র, কখনো কৈলাশ-মানস সরোবরের দিকে ডানা মেলে উড়ে চলা হংস-হংসী অথবা কর্ডবার ক্রন্দনরত বিড়ালের স্বরে একটা ভাবনা থাকেই। সে হোল নিজ ঘরের গল্প।
এই ঘর হারানোর সত্যকে নিরাময়ের আশা তিনি দুরাশার মাঝে পাননি, বুদ্ধের বচনে এর নিরাময়ে খুঁজেছেন – “কোন জন্মেই কোন শান্তি নেই, আর কোন বসতি চিরকাল থাকে না। প্রতিটি ঘর তৈরি হয় ছেড়ে যাওয়ার জন্য”।
১৯৪৭ সাল উর্দু সাহিত্যে অনেক ফসল ফলালেও, ১৯৭১ যেন পাকিস্তানের উর্দু সাহিত্যিকদের নাড়া দিতে পারেনি। তাঁর সমকালীনদের তূলনায় ইনতিযার হুসেইন অনেক খোলামেলা ছিলেন এই বিষয়ে। এর ফলে তিনি দেশভাগের পরিণতি, এর অনিবার্যতা আর ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের বাস্তবতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। ইনতিযার হুসেইন ১৯৭১ সালের বাস্তবতাকে ১৯৪৭এর টানাপোড়েন হিসেবে দেখেন। এই প্রসঙ্গে ২০০৫ সালের সাক্ষাতকারে তিনি জানাচ্ছেন:
“তৎক্ষণাৎ আমার এই অনূভুতি হোল যে ১৯৪৭ যেন আমার মাঝে আবার জীবন্ত হয়ে এসেছে। সেই সব কথা এত জীবন্ত আর এত প্রবলভাবে মনে এলো যে আমি কী লিখব, কিভাবে লিখব কিছু না ভেবেই লিখতে বসে গেলাম”।
এই ভাবে লেখা উপন্যাসটি হচ্ছে তাঁর শ্রেষ্ঠতম কাজ ‘বস্তি’। এই উপন্যাসটি ২০১৩ সালে ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছিল।
বস্তি উপন্যাসে ১৯৭১ মিশে যায় ১৮৫৭র সাথে। ১৯৫৭ মিশে যায় শিবের বাহন নন্দীর সাথে, যে আবার হেটে চলে যায় আরব্য রজনীর গল্পের সাথে। উপন্যাসে নায়ক যে ডায়েরি লিখে যায়, তার বয়ান অবতীর্ণ হয় ফ্যান্টাসির মাঝে। উপন্যাসের পরম্পরার ধরণ ভেঙ্গে দিয়ে সে সকল চলমান, বহমান আর মানুষের বয়ে নিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালকে ইনতিযার হুসেইন দেখেছেন এক দীর্ঘ ঘটনা প্রবাহের সুত্র হিসেবে, এমন এক পরিণতি হিসেবে যা আগে কখনো ঘটেনি। অশ্রুতপূর্ব বাস্তবতাকে বয়ান দিতে হলে তো এমন ফর্ম লাগবে যা আগে ছিল না। আর তাকে খুঁজে নিতে তিনি গেছেন পুরাতন মুখে বলা গল্পের ফর্মের কাছে।
দেশ ভাগ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম – এই বাস্তবতাগুলোকে হুসেইন হিজরতের প্রেক্ষা দিয়ে দেখছেন। অবিচার থেকে মুক্তি নিয়ে নতুন ন্যায্য বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা যা আবার পুরাতনের হাতে কয়েদ হয়ে যায়। তবে নিজে নিরীশ্বর দর্শনে আগ্রহী লেখক মনে করতেন না যে কোন অবিমিশ্র ধর্মীয় বয়ান এই ঘটনাসমূহকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু সেই উৎপ্রেক্ষা দিয়ে হিজরতের ট্রাজেডি হিসেবে একে উপ্সথাপন করলন তিনি। কিন্তু এতে তাতে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর বেদনা যা মান্টোতে পাওয়া যায়, তা অনুপস্থিত। এই রকম করে তিনি সেই বহাল রাজনীতি, নৈতিকতা আর ভাবনার ধরনকে অস্বীকার করার কথা বলেন। কারণ এই বহাল নৈতিকিতা মানুষের হিংস্র অমানবিকতাকে যুক্তি দিয়ে জায়েয করতে চায়, কারন এই বহাল রাজনীতি এক গোষ্ঠির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কেবল ওপর গোষ্ঠির আকাঙ্ক্ষা দাবিয়ে রেখেই অর্জন করতে পারে, কারন এই ভাবনার ছক তাঁর পাঠককে এক খন্ডিত বর্তমানে আটক করে যার অতীত তাঁর হাতে অসহায় হয়ে থাকে।
উপন্যাসের প্রধান নায়ক জাকির নিজে দেশভাগের নিয়তি বরণ করা একজন শিয়া সংস্কৃতির মানুষ। যখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরু হল,সে ডায়েরি লেখা শুরু করে। তাঁর ডায়েরির লেখাগুলোতে শিয়া মিথ, অতীত আর বর্তমান এক স্রোতে ভেসে যাতে থাকে, এমন মনে হয় এই ক্ষণকে বোঝা বা প্রকাশ করার একমাত্র পথ হচ্ছে শতাব্দীর ওজনের ভার বয়ে বেড়ানো অসমাধিত শেষ না হওয়া গল্পগুলোর কাছে ফিরে যাওয়া। হুসেইন ইতিহাসবিদ নন, তিনি একাডেমির বাইরের মানুষের প্রতিনিধি যারা দেশ-কালকে আলাদা অস্তিত্ব হিসেবে দেখে না।


এতো হিংস্র সব ঘটনার পৃথিবীতে বেঁচে থাকা ইনতিযারের বয়ানে কোন ঘটনা নেই কেন?যুদ্ধের বিভৎসতাকে তিনি ব্যক্তির সংবেদনশীলতার অবনমন দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান। এখানে মানুষ তাঁর দীর্ঘ অতীত অস্তিত্তের কাছে হতে হারিয়ে যায়। ‘শ্যাহরে আফসোস” গল্পের তিনজনের কোন নাম নেই। তাঁরা তিনজন নিছক মৃতদেহ, ঘুরে বেড়াচ্ছে বেদনার শহরে তাদের পাপ আর বিমানবিকতার বোঝা নিয়ে, অপেক্ষা করছে কখন তাদের সৎকার হবে। তাদের চেহারা চেনার উপায় নেই, তাঁরা তাদের নিজকে ভুলে যাওয়ার পাপের চলমান ফলাফল।
আসির (বন্দী) নামের আরেক গল্পে তিনি ১৯৭১এ পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করছেন। এ যেন একটা রাষ্ট্রের রক্তক্ষয়ের কালে নির্বিকার চিন্তাহীনতার বয়ান। বাংলাদেশ হতে পালিয়ে আসা জাভেদ দেখা করে তাঁর পুরোনো বন্ধু আনওয়ারের সঙ্গে। আনওয়ার জানতে চায় পূর্ব পাকিস্তানে আসলে ঘটছে কী? আশ্চর্য ব্যাপার হোল, নরহত্যার চোখে দেখা ঘটনা বলতে চেয়েও জাভেদ বলতে পারে না। কেমন এক নির্বিকারত্ব তাঁর অভিজ্ঞতাকে ঘিরে ধরে। সে তখন বরং জানতে চায় আনওয়ারের কথা, আরেক বন্ধু মির্জার কথা। আনওয়ার জানায় যে বেচারা এক মিছিলে গিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছে। জাভেদ এবার ভীত হয়। কারণ এই হত্যার কোন আপাত কারন জাআ যাচ্ছে না। সেই হত্যার কোন প্রতিবাদও হয়নি। আনওয়ার বলে – তুমি নিশ্চই ওখানে আরো ভয়াবহ ঘটনা দেখেছ? জাভেদ একটু দ্বিধান্বিত হয়ে বলে – হ্যা, তা ঠিক, কিন্তু ওখানে তো অন্তত এটা তো জানতাম যে কী হচ্ছে আর কেন হচ্ছে।
ঘুম (নিন্দ) গল্পের মধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ ফেরত এক সৈনিকের কথা আছে যে তাঁর বন্ধুর কাছে যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই অভিজ্ঞতার কাছে ফিরে যাওয়ার তাঁর চেতনায় কোন ইচ্ছে নেই। শেষে সে বলে, তাঁর এখন একটাই ইচ্ছে – ঘুমিয়ে পড়া।
অনেক ভিয়েতনাম ফেরত মার্কিন সৈনিকদের মতই এই চরিত্রগুলো তাদের অভিজ্ঞতার কাছে ফিরে যাওয়ার ভয়াবহতার কথা জানে। কোন এক আদীম অনুভূতি তাদের বলে দেয় যে তাদের যা বলার আছে, এখানে সেই কথা বোঝার কেউ নেই। কেউ বুঝতে চাইবে না। কারন এই সমাজ এমন এক অস্তিত্ত্ব তৈরি করেছে যেখানে তৈরি করা আরোপিত সত্য আর হয়ে ওঠা সত্য এক ঠাইয়ে থাকতে পারেনা, সংঘাত লাগে। আপাত কোন কারন ছাড়া মানুষ খুন হয়ে যাওয়া, তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া না হওয়া এক সংকট বটে। কারণহীন মৃত্যু কারণহীন জীবনের গোপ্ন কথা ফাঁস করে দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইনতিযার হুসেইন নিজ দেশের স্বরূপ দেখার চেষ্টা করেন। ওখানে অন্তত জানা যায় কে কিসের বিরুদ্ধে লড়ছে। তাঁর দেশে শ্ত্রুও অজানা, লড়াইয়ের কারনও অস্পষ্ট।


“ছোট গল্পের ভবিষ্যত অন্ধকার। কারণ মানুষ যত বাড়ছে পৃথিবীতে, গাছের সংখ্যা তত কমছে। যে পৃথিবীতে মানুষ ছাড়া আর কিছু নেই সেখানে সাংবাদিকতা জন্মাতে পারে কিন্তু গল্প আর কবিতা কিভাবে জন্মাবে? (ইনতিযার হুসেইন – বিক্রম, বেতাল অওর আফসানা, ১৯৭৪)।
তবে এই নৈরাশ্বে মগ্ন হয়ে থাকার সুযগ নেই। ইনতিযার সেই কথা বলছেন ২০১৩ সালে করাচি লিটারেচর ফেস্টিভালের উদ্বোধনি বক্তৃতায় – অনেকেই প্রশ্ন করেন, এই ভয়াবহ সহিংসতার কালে সাহিত্য সম্মেলন কেন? আমি তাদের আরব্য রজনীর গল্পের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। শেহেরজাদের হাজার গল্প এক নৃশঃস বাদশাহকে মানবিক করে তুলেছিল। কোন কিছু যদি এই সহিংসতার প্লাবন থামাতে পারে তবে তা হচ্ছে গল্প বলা”।
হুসেইনের স্মৃতিকথা ছেপে বের হয় ২০১২ সালে, নাম ‘কিসের খোঁজ (জুস্তজু কেয়া হ্যায়)। নামটি নেয়া হয়েছে মির্জা গালিবের একটি শের হতে:

জ্বলা হ্যায় জিস্ম জাঁহা দিল ভি জ্বল গেয়া হোগা
কুরেদতে হো জো আব রাখ জুস্তজু কেয়া হ্যায়

(শরীর জ্বলেছে যখন, হৃদয়ও জ্বলে গিয়ে থাকবে
এখন যে ঘাটছো এই ছাই, কিসের খোঁজে?)
২০১৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইনতিযার হুসেইন ছাই ঘেটে গেছেন। তবে এর মাঝে মানুষের ফিনিক্স হয়ে ফিরে আসার দায়িত্ব তিনি নিতে চাননি। কারন বোধ হয় এই যে, সে দায়িত্ব নিজেকে চিনতে চাওয়ার আকুতি সম্পন্ন মানুষের। অতীত উপনিবেশের যে মানুষ নিজেকে ভুলেছে, তাদের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি লিখে গেছেন। তাঁর গুরুত্ব নিজেদের চিনে নেয়ার চেষ্টার সঙ্গে জুড়ে আছে।
****

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top