সন্দেহ II রওশন রুবী

কোথাও একটা ক্লু না রেখে কানিজ হাওয়া হয়ে যাবার পর থেকেই মনসুর সাহেবের একটা ধারণা হয়েছে মেয়ে আর কোথাও নয় আছে তার প্রতিবেশির বাসায়ই। তার শান্ত অমায়িক মেয়েটাকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে ভাগিয়ে নিয়েছে সিয়াম। সেই থেকে ওর হাবভাব চালচলন কথাবার্তার উপর নজর রেখে বিস্তর একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন মনসুর সাহেব। যা এক বাক্যে সিয়ামকে অপরাধী হিসেবে পরিচয় করায় । যেমন- খুব নমনীয় হয়ে কথা বললেও ডোন্টকেয়ার স্বভাবটা ফুটে উঠে। মনসুর সাহেবকে দেখেও অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে এ বাড়ির দিকে চোরের মতো উঁকিঝুঁকি দিতেও দেখা যায়। সেদিন যখন মনুসুর সাহেব বাড়ি ফিরছিলেন মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে তখন তার বাসার সামনে সিয়ামকে পায়চারি করতে দেখেছেন তিনি। আরো দেখেছেন তার সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যাবার সময় সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে আড়চোখে চেয়ে মাথা সামান্য ঝাঁকিয়ে সালাম দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। দু’বাড়িকে একটা দেয়াল দিয়ে পৃথক করা হয়েছে। বাড়ির প্রবেশ মুখের দু’টো গেইট পাশাপাশি। এ বাড়ি ও বাড়ির ছাদ একটিই। যখন বাড়ি করছিলেন তখন ইঞ্জিনিয়ার হক সাহেবই প্রস্তাব দিয়ে এভাবে ছাদটি করিয়েছেন। এতে ছাদ নাকি প্রশস্ত দেখাবে, আর দু’বাড়ির বিভিন্ন প্রোগ্রামগুলো করার জন্য বিস্তর জায়গাও পাওয়া যাবে। সহজ সরল মনসুর সাহেব কিছু চিন্তা না করেই রাজি হয়েছিলেন এবং জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন, যা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। তিনি গভীর রাত অবধি একা একা ভাবলেন কি করা যায়, কীভাবে কানিজ যে সিয়ামদের বাড়ি তা প্রমাণ করে তার মুখে চুনকালি মেখে দেয়ার সাহসের প্রতিশোধ নেয়া যায়। সব বিষয় জাহানারা বেগমকে শেয়ার করলেও তার সন্দেহের তালিকা প্রকাশের সময় ইচ্ছে করেই প্রতিবেশি ছেলেটার নাম বাদ দিলেন। ইদানীং তিনি দেখেছেন তার স্ত্রী কারণে অকারণে ছাদে উঠে যান এবং ছাদ থেকে ফিরলে তার মুখে লালছে ভাব ও চোখ থাকে ফুলা। বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন গভীরভাবে। এও লক্ষ্য করেছেন ফেরার আধঘন্টা পর্যন্ত তিনি কারোর সাথেই কথা বলেন না। ঘর অন্ধকার করে পড়ে থাকেন। তারপর উঠে নতুন একটি শাড়ি সাথে তার গচ্ছিত অলঙ্কারগুলোর যেকয়টি কানিজ নিয়ে যায়নি সেগুলো পরে পান চিবাবেন এবং খুব উৎফুল্ল¬ মনে ঘুরেন। মনসুর সাহেবের কাছেও ঘুরঘুর করবেন, খিলখিল করে হাসবেন, বাড়তি যত্ন নেন, যা জাহানারার স্বভাবের সাথে বেখাপ্পা লাগে। সন্দেহ থেকে তাই জাহানারা বেগমকেও বাদ দেননি তিনি।

এটা যে বিরাট একটা চক্রান্ত এবং এ চক্রান্তের সাথে হাত আছে মনুর মায়ের; সে বিষয়েও খুব শীঘ্রই নিশ্চিত হবেন মনে হচ্ছে মনসুর সাহেব। তখন দুষ্ট কাজের মহিলা মনুর মা তো শাস্তি পাবেই, বাদ যাবে না বাকি জড়িতরাও। ঠাণ্ডা মাথার মানুষ হিসেবে পরিচিত মনসুর সাহেব। তিনি ঘুরছেন, ফিরছেন ঠিকই; রহস্যের গন্ধে তার মাথা সারাক্ষণ বিভোর থাকছে। এই মনুর মা সেদিন সিঁড়ির দরজাতে মুখ লাগিয়ে প্রায় বিশ মিনিট ফিসফাস করলো কার সাথে? ফিসফাস শেষে শাড়ির তলা থেকে কী বের করে এদিক ওদিক তাকিয়ে সিঁড়িদরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। তারপর ছাদের জামা-কাপড়গুলো নিয়ে যখন কবুতরের খড়ের দরজা লাগাচ্ছিলো লুকিয়ে তাকে লক্ষ্য করা মনসুর সাহেব তখন নেমে এলেন ছাদ থেকে। অথচ নামার পর তাকে জিজ্ঞেস করলে কোথায় ছিলো এতক্ষণ? সিগারেট শেষ, দোকান থেকে সিগারেট আনতে হবে। সে কথা শুনে এমন ভাব করলো যে বাংলা ভাষায় এমন জটিল শব্দ তার জন্মে শুনেনি। কথাগুলো শুনে খেকিয়ে উঠলেন মনসুর সাহেবকে ‘আমি কি বইসা বইসা চর্বি বানাইতাছি, কামই তো করতাছি। কামের মানুষ দেখলে আফনারা নড়নচড়ন করবার পারেন না? দোকান কি আসমানোত যে যাইতে যাইতে তেষ্টা মইরা যাইবো; হের লাইগ্গা তেষ্টা লইয়া বইসা আছেন?’ এক ঝটকায় কথা শেষ করেই গজগজ করতে করতে কাপড়গুলো ডাইনিং টেবিলের উপর এমনভাবে ফেললো যে দু’তিনটে কাপড় ডাইনিং টেবিল টপকে মেঝেতে পড়লো। ঠাস্ ঠাস্ করে দু’গালে চার থাপ্পড় দিতে পারলে মনসুর সাহেবের রাগ মিটতো। বড় বেশি বেড়েছে  মনুর মা। সেই মেয়ের জন্মের পর থেকে আছে এ বাড়িতে। অনেক বছরের পুরোন বলে কথার পরিবর্তন হয়েছে চোখে লাগার মতো। এর কিছুদিন পর অফিস ফেরত মনসুর সাহেব ছাদে গেলেন অভ্যাসবসত। ছাদের শেষ সিঁড়িতে পা দিতেই সিঁড়িঘরে ফিসফাস শব্দ কানে এলো। সতর্ক হয়ে ভেতরে উঁকি দিলেন। তার শব্দ পেয়ে দুটো ছায়ামূর্তি পৃথক হয়ে গিয়ে, একটি ছুটলো হক সাহেবের সিঁড়ির দিকে, অন্যটি তার সিঁড়ির দিকে। তিনি খপ্ করে তার সিঁড়ির দিকে ছোটা ছায়ামূর্তির হাত ধরে টানতে টানতে সিঁড়ির আলোর নিচে এনে দেখলেন মনুর মা। তিনি মনুর মায়ের কাছে জানতে চাইলেন কে ও বাড়ির দিকে পালিয়েছে? মনুর মা হয়ত বাঁকাভাবে কথা বলার কলাকৌশল রপ্ত করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইদানীং। তাই বোধ হয় ঝটকা মেরে মনুসুর সাহেবের হাত থেকে নিজের হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে মনসুর সাহেবের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে বললো “ব্যবাগ সময় পাহারা দিয়া রাখন লাগছেন লাইগে, কামের মাইনসের লেজে লেজে ঘুরঘুর করার বদমতলব পকেটে রাইখেন সাব। নিজের মাইয়ার লগে দুইডা কতা কইবার পারুম না? আফনার গায়ে অমনি ফোসকা পড়ে ক্যা? নিজের মাইয়ার পিছে লাইগা মাইয়ারে ভাগাইছেন—-” মনুর মা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো। মনসুর সাহেব ধমকে উঠলেন “বেয়াদপি কম করো মনুর মা! কাল থেকে এ বাড়ির ত্রিসীমানায় তোমাকে যেন না দেখি।” তবু মনুর মা থেকে গেছে জাহানারার আসকারায়। ও বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে বহুবার সংগোপনে উঁকি দেবার কথা ভেবেছিলেন মনসুর সাহেব কিন্তু কোনদিনই সিঁড়ি দরজা খোলা তিনি পাননি। আর এরা দরজায় গেলেই দরজা কি হাওয়ার বলে খুলে যায়? ও বাড়ির সাথে যোগাযোগ বন্ধের একমাত্র হোতা তো জাহানারাই। জাহানারার হাতে সিয়ামের পোষা কুকুর যখন কামড়ে দিলো তখন কুকুরটা সিয়ামের কোলে ছিলো। সিয়াম কুকুরটাকে কোনরূপ আটকানোর চেষ্টা তো করেইনি বরং কামড়ের ফলে তার কুকুর দাঁতের ব্যথায় তিনদিন জ্বরে ভুগেছে ও খেতে পারেনি তাই নিয়ে হৈচৈ করেছে। যার মাত্রা ছড়াতে ছড়াতে দু’বাড়ির মধ্যে হাতাহাতির পর্যায়ে চলে গেছে ব্যাপারটি। সেই সেবার নাভিতে চৌদ্দটি ইনজেকশন দিয়ে জাহানারা বেগম তাদের থেকে মুখ ফিরিয়েছে এই তিন বছর। হঠাৎ কি এমন হলো যে তাদের সম্পর্ক রমরমা হয়ে উঠেছে? স্বয়ং মনসুর সাহেবকে শত্রু বানিয়ে তারা গোপনে খাতিরের দস্তরখানা বিছিয়ে খেতে বসে গেছে? একবার মওকা পেলে হাঁড়ের দাগ ঘঁষে ঘঁষে তুলবেন জাহানারা বেগমের পিঠে চাবুক মেরে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন মনসুর সাহেব।

জাহানারা বেগমের ঘুম কাকের ঘুমের চেয়েও হালকা, তাই তাকে ফাঁকি দিয়ে একটা তেলাপোকাও এ ঘর ও ঘর যেতে পরে না। সেই জাহানারা বেগমের জন্য, মনসুর সাহেব আজ তিনরাত সিয়ামদের বাড়ি লুকিয়ে তল্লাশি করতে যাবো যাই করে করেও যেতে পারছেন না। সারারাত একমতো নির্ঘুমই কাটাচ্ছেন। এভাবে আর কয়দিন কাটাবেন? ঘরে বাইরে তার শত্রু । একটা মানুষকে বিশ্বাস করার ফুসরত নেই। নিজের স্ত্রী যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে তখন সবই শূন্য। কথায় আছে ঘরের শত্রু বিভীষণ। মনসুর সাহেব সবদিক ভেবেচিন্তে একটা ঘুমের ঔষধ জাহানারা বেগমের দুধের সাথে মিশিয়ে দিলেন। জাহানারা বেগমের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলে খুব সাবধানে দরজাটা চাপিয়ে বাইরে গেলেন। ছাদে সেরকম কোন সুবিধে না থাকায়, তিনি সদর গেইটের পাশে দেয়ালের কাছে এসে হাঁটার গতি পায়চারিতে নামিয়ে আনলেন। তিন চার মিনিট পায়চারি করে নিশ্চিত হলেন তাকে কেউ লক্ষ্য করছে না। অনেক কষ্টে দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করলেন। দেয়ালের পাশে থাকা ঘনঝোঁপ। সেগুলো দূরের ব্যালকনি থেকে ছিটকে আসা আলো মিশে মায়াময় ছায়ার মতো হয়ে উঠেছে। সেই ছায়ায় বসে আরো খানিক্ষণ অপেক্ষা করলেন কেউ শব্দ পেয়েছে কিনা। কোন দিকে কোন সাড়া শব্দ নেই। সব শুনশান। ঘরগুলো থেকে ভেন্টিলেটরের ভেতর দিয়ে ম্রিয়মান আলোর সরুরেখা শুধু দেখা যায় যা বিস্তৃত নয়। সাবধানের মার নেই তাই পা টিপে টিপে সামনের দিকে রওয়ানা দিতে গিয়ে টের পেলেন তার পেছনের পাঞ্জাবির কোনাটা কেউ টেনে ধরে আছে। মনসুর সাহেব পেছনে তাকালেন। কাউকে দেখতে পেলেন না। দেখলেন পাঞ্জাবি ঝোঁপের কাটাডালে আঁটকে আছে। টানাটানি করে গাছ থেকে পাঞ্জাবিকে পৃথক করতে না পেরে হ্যাঁচকাটান দিলেন। দারুণ ফল হলো, পাঞ্জাবির কোনাটি ছিঁড়ে রইলো গাছে। সময় নষ্ট না করে তিনি পা বাড়ালেন। প্রথম ঘরটি ড্রইংরুম তিনি জানেন তবু উঁকি দিলেন কাঠের জানালার ছিদ্র দিয়ে, এরা দরজা জানালায় কেন পর্দা দেয় না তা জানেন মনসুর সাহেব। এও জানেন এ বাড়ির কর্তা ও গিন্নির ঘুমের ব্যামো আছে। এবং এ ব্যামোকে কেন্দ্র করেই পর্দা উঠেছে বাড়ির দরজা জানালার গা থেকে।

একবার ঘুমালে পৃথিবী উল্টে গেলেও তারা টের পায় না। এইতো প্রায় বছর পাঁচেক আগে হবে হক সাহেব কি কারণে ঢাকায় গিয়েছিলেন। ফিরতে রাত এগারোটা পার হলো। পারভীন বেগম স্বামী আসবার অপেক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ছেলে নানার বাড়ি গিয়েছিলো। হক সাহেব রাতে ফিরে মোবাইল, কলিংবেল ইত্যাদি দিয়েও যখন পারভীন বেগমের ঘুম ভাঙাতে পারছিলেন না, তখন দরজায় আঘাত শুরু করলেন। রাগে আঘাতের বেমক্কা শব্দে প্রতিবেশীদের ঘুম টুটে গেলো। তারা বুঝতে পারলো তাদের প্রতিবেশী জনদরদী হক সাহেব বিপদে পড়েছেন। কেউ অতি উৎসাহে; কেউ বিপদে সাহায্যের হাত বাড়াতে ছুটে এলেন। এসে অনেক ডাকাডাকি করেও ফলাফল শূন্য দেখে অনেকেই ভয় পেয়ে গেলেন। এবং বলাবলি করতে লাগলো ‘কে জানে ঘরের ভেতর পারভীন বেগম লাশ হয়ে আছে কি না।’ জানালা দরজার ভারি পর্দার জন্য ভেতরের কিছু দেখতে পারছে না কেউ। বিষয়টি আর হক সাহেবের নিয়ন্ত্রণে রইলো না। পুরোপুরি জনগণের হাতে চলে গেলো। ভোটাভোটি হলো এবং দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত জয়যুক্ত হলো। পাড়ার যুবক ছেলেরা উৎসাহ পেলে কি না করতে পারে! তারা নয় মিনিট আটান্ন সেকেন্ডের মাথায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ছিটকে বেরিয়ে এসে হক সাহেবকে ভেতরে পাঠালেন। হক সাহেব ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারলেন কেন উপকারী যুবকেরা দু’সেকেন্ডও ঘরে টিকেনি। ফুলস্প্রিডে ফ্যান চালিয়ে সোফার উপর সেমিজ গায়ে চিৎ হয়ে এমনভাবে শুয়ে আছে পারভীন বেগম যে তার শরীরের অনেক বাঁকই সুস্পষ্ট – যা হক সাহেবের ভীষণ পছন্দের হলেও প্রতিবেশী যুবকের কাছে শোভন নয়। পারভীন বেগম বেঁচে আছে এবং সুস্থ্য আছে উদগ্রীব সবাইকে নিশ্চিত করলে একে একে সবাই চলে গেলো। কিন্তু পারভীন বেগম তখনও ঘুম থেকে উঠেনি দেখে হক সাহেব রাগে, অপমানে টানতে টানতে পারভীন বেগমকে ঘরের সিঁড়ি দিয়ে টেনে বাইরে রেখে এলেন। তবু পারভীন বেগম ঘুমাচ্ছে দেখে নিজে ফ্রেস হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকাল বেলা পারভীন বেগম তার পরিণতি ও দরজার পরিণতির কথা জানতে চাইলেন। হক সাহেব এমন বিকৃত  মুখ করে খেঁকিয়ে উঠলেন যে নিজের ভারি শরীরটা দু’পা পেছনে সরিয়ে নিতেই ভাঙা দরজায় ধাক্কা লেগে দরজাটি দ্রিম করে পলকেই পড়লো পারভীন বেগমের উপর। সেবার পারভীন বেগম সেরে উঠতে বেশ ক’মাস সময় লাগলেও ঘুমের কোন রদবদল হয়নি।

ড্রইংরুমের পাশেই হক সাহেবের রুম ভাবনার মধ্যে ঐ রুমটা পেরুতে যেতেই মনসুর সাহেবের পায়ের বুড়ো আঙুলটা জানালার নিচে রাখা পরিত্যক্ত ইটে খোঁচা লেগে উল্টে গেলো। হঠাৎ আঘাতে টনটন করে উঠলো বুক অবধি। শীতল কিছু গড়িয়ে পড়ছে পা থেকে বুঝতে পেরে হাত বাড়িয়ে হাতে নিলেন। রক্তের চ্যাটচ্যাটে ছোঁয়ায় আঙুল ভিজে উঠলো। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। এতো দূর এসে এখন প্রমাণ না নিয়ে ফিরে যাবেন? না! তা হয় না! কোন কিছুর শেষ না দেখে শান্তি পান না মনসুর সাহেব। তিনি পাঞ্জাবির ছেঁড়া অংশ থেকে কিছু অংশ ছিঁড়ে আঙুলটা বেঁধে নিলেন। আর দু’টো রুম পরেই সিয়ামের রুম। সেদিক থেকে খুব চিকন সুরে গান ভেসে আসছে। দু’একবার মনে হলো চাপা কন্ঠের কথা ও হাসাহাসি শুনা যাচ্ছে। নিশ্চয় কানিজ! নিশ্চয় কানিজ! খুশিতে ডগমগ করে উঠলো মনসুর সাহেবের মন। আর কয় মিনিট পর সব দিনের আলোর মতো পরিস্কার হয়ে যাবে। তখন বাচাধনেরা টের পাবে কতো ধানে কতো চাল। তিনি পঁচা  ইটের উপর বসেই অপেক্ষা করতে লাগলেন ও ঘরের লাইট বন্ধ হবার জন্য। কারণ তীরে এসে তরী ডুবাতে তিনি নারাজ। সিয়াম টের পেয়ে যদি তাকে হাতে নাতে ধরে তবে তাদের বাসায় যে প্রায় চুরি হচ্ছে; সে দোষ পড়বে তার ঘাড়ে। তখন তো আর বাঁচবার পথ থাকবে না কোন। তার থেকে সামান্য অপেক্ষা করা ভালো। এখান থেকে তার ঘরটি দেখা যায়। জানালায় পর্দা থাকার কারণে ডিমলাইটের আলোটা খুব নরম দেখাচ্ছে। ঘরের ভেতর যেন কাউকে নড়ে উঠতে দেখলেন মনসুর সাহেব। তিনি পলকহীন তাকিয়ে রইলেন সত্য জানবার জন্য। জাহানারা বেগমের ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাসটার কথা টেনশনে বেমালুম ভুলে গেছেন এতক্ষণ। মনে পড়তেই তার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেলো। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো হায় খোদা! মনসুর সাহেব প্রমাণপত্র সব পেছনে ফেলে ঘর অভিমুখে ছুটলেন পাগলের মতো। জাহানারা বেগম ঘুমের মধ্যে হাঁটতে শুরু করার চার বা পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে মনসুর সাহেবকে না দেখতে পেয়ে পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজবেন। খুঁজতে খুঁজতে তার সব আত্মীয় স্বজনদেরকে ফোন দিতে থাকবেন। যতোক্ষণ না তিনি ব্যালেন্স শূন্য হয়ে পড়েন। একজনকে বারংবার ফোন করেও বিরক্ত করবার রের্কড রয়েছে। গতকালই তিনশো মিনিট নেয়া হয়েছে ফোনে। তিক্ততায় মনটা বিষিয়ে উঠলো, মুখে একাটা খিস্তি করে বাড়ির দিকে ছুটলেন। ঘরে ঢুকে জাহানারা বেগমকে শুয়ে থাকতে দেখে আশ্চর্য হলেন। ঘরের লাইট জ্বালতেই একটা বিড়াল মিউ মিউ শব্দ করে, খাট থেকে লাফ দিয়ে ওয়ারড্রোপের উপর হয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। মনসুর সাহেবের বিরক্তে গা জ্বলে উঠলো। তিনি গা থেকে পাঞ্জাবিটা খুলে ছাদে উঠে গেলেন এবং পাঞ্জাবিটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে দলা পাকিয়ে দূরের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেললেন।

ঐরাতের পর ফের অনেকদিন পেরিয়ে গেলো তক্কেতক্কে থেকেও মেয়ের একটা খোঁজ তিনি বের করতে পারলেন না। ছুটির দিন দুপুরে অফিস থেকে ফিরে খেয়ে ভাত ঘুম দিচ্ছিলেন। হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। সাধারণত তিনি ফোনে হালকা শব্দ দিয়ে রাখেন। কিন্তু এখন দূরে চার্জে রাখার কারণে শব্দ দিতে হলো। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে তার কান্না পায় তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। মনুর মা এই ব্যাপারটি জানে এবং এও জানে এর ঔষধ কি! তিনি দৌড়ে একটি পুরনো জুতা এনে মৃগ রুগির মতো মনসুর সাহেবের নাকে ধরলেন। মনসুর সাহেব জুতার গন্ধে সম্বিত ফিরে পেলো। জাহানারা বেগম ফোনটি বাড়িয়ে ধরে বললো, বয়স হচ্ছে ন্যাকামো গেলো না। এবার জুতোর বড়ি বানিয়ে রাখবো বলে দিলাম। নাও কে ফোন করে পৃথিবী কাঁপিয়ে ফেলছে দেখো। মনসুর সাহেব ফোন নিতে নিতে ফোন কেটে গেলো। তিনি জাহানারা বেগমকে জব্দ করার পাল্টা অস্ত্রটা নিক্ষেপ করলেন, তোমার বয়স হয়নি বুঝি! তুমিও তো ভুতের মতো ঘুমের মধ্যে হাঁটো! জাহানারা বেগম তাচ্ছিল্ল্যভরে ঠোঁট উল্টে বললো, ভুত আবার ঘুমায় নাকি ? তার কথা শেষ হতে না হতেই আবার ফোনটা বেজে উঠলো। মনসুর সাহেব ফোনটি রিসিভ করলেন ‘হ্যালো!’ ফোন রেখে গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর জাহানারা বেগমকে বললেন, তুমি কি কানিজের সত্যি কোন খরব জান না? জাহানারা বেগমের চোখ ছলছল করে উঠলো। কতোগুলো দিন পর আজ তার সাথে মেয়ের কথা বলছেন। জাহানারা বেগমের আবেগে গলা বন্ধ হয়ে এলো। তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, না! সত্যি না! মনসুর সাহেব বললেন, আমাদের একবার হাসপাতালে যেতে হবে। দু্র্বৃত্তদের আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি গাড়ির অনেক আহত যাত্রী সেখানে ভর্তি। একজনের পক্ষ থেকে আমাকে ফোন করা হয়েছে। তাকে চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না সে চিৎকার চেঁচামেচি করছে যে সে চিকিৎসা নিবে না যতক্ষণ সে আমাকে দেখবে। আমি যাচ্ছি তুমি গেলে চলো। মনসুর সাহেব হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন। হাসপাতালের ব্যালকনিতে উদ্ভ্রান্তের মত সিয়ামকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তার হাত নিশপিষ করতে লাগলো। তিনি ফোনটি তুলে টাটকা প্রমাণের জন্য ফোন দিলেন। কিন্তু সিয়ামের নয় একটু দূরে দাঁড়ানো কালো লিকলিকে এক যুবকের হাতে ফোনটি বেজে উঠলো। সে কথা বলতে বলতে মনসুর সাহেবের দিকে এগিয়ে এসে তাঁকে নিয়ে দ্রুত জরুরি বিভাগের সামনে চললেন। মনসুর সাহেব সিয়ামের পাশ দিয়ে যেতে যেতে জানতে চাইলেন এখানে কেন? সিয়াম বললো, “সকালে গ্যাসের চুলা ধরাতে গিয়ে মামীমার গায়ে আগুন ধরে গেছে। তার চিকিৎসা চলছে। কাকু আপনি?” সিয়ামের কথার উত্তর দেবার সময় না দিয়ে যুবক তাকে টেনে নিয়ে গেলো। পেছনে পেছনে আসছে সিয়ামও টের পান মনসুর সাহেব। যুবক এনে যেখানে দাঁড় করালো মনসুর সাহেবকে; সেখানের বাতাস মরা কান্না আর মাংসপোড়া গন্ধে ভারি হয়ে আছে। কোণার একটি ট্রেচারে শুয়ে থাকা অর্ধপোড়া এক মেয়ের কাছে গিয়ে যুবক খুব কাতর গলায় বলল,  কানিজ দেখো তোমার বাবা এসেছে। প্লিজ তাকাও! আধবোজা চোখ পিটপিট করে মেয়েটি তাকিয়ে একটি পোড়া হাত তুলে দিয়ে অস্পষ্ট গলায় ডাকলেন বাবা! মনসুর সাহেবের বুকের ভেতর হু হু করে ফাঁকা হয়ে গেলো। পায়ের নিচ থেকে সরে গেলো মাটি। তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে দূর্বল পোড়া হাতটি ছুঁলেন।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top