পাঁচটি অণুগল্প II চন্দন চৌধুরী

আত্মঘৃণা

একদিন সাধারণের বেশে বের হয়েছিল একজন ভিক্ষুক। তখন অন্য একজন ভিক্ষুক তার কাছেই ভিক্ষে চেয়ে বসল। শুরুতে সাধারণ-বেশী ভিক্ষুকটি সামান্য হকচকাল। তারপর নিজেকে গর্বিত ভাবল। এবং পকেট থেকে একটা দুই টাকার নোট বের করে রাখল বাড়িয়ে দেওয়া ভিক্ষুকের থালাতে। এরপর ভিক্ষুকের কানে নিজের মুখটি নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল। এ শুনে প্রথমে ভিক্ষুকের গাল মুখ লাল হয়ে চোখ গোল গোল হয়ে গেল। তারপর আবার স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর চলে গেল সাধারণ-বেশী সেই ভিক্ষুক।
চোখের আড়ালে যেতেই ভিক্ষুকের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। সাধারণের বেশে আসা ভিক্ষুকের দেয়া দুই টাকার নোটটাকে থালা থেকে খুঁজে বের করে দুই হাতে দুমড়ে মুচড়ে ছুড়ে ফেলল দূরে।
ভিক্ষুকের ঠিক মাথার ওপরেই গাছের শাখায় বসে ছিল দুইটি ফিঙে। একটি অন্যটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলি কিছু? বল তো, ওই লোকটি ভিক্ষুককে কী বলেছে?’
অন্য ফিঙেটা বলল, ‘বলেছে সেও একই পেশার মানুষ। আর তাতেই ভিক্ষুকের গাল মুখ লাল হয়ে চোখ গোল গোল হয়ে গিয়েছিল। আর সেটা সাধারণ-বেশী ভিক্ষুকের কাছ থেকে লুকাতে চেষ্টা করেছে।’
‘হুম, সত্যিই তুই জ্ঞানী। এবার বল তো, ভিক্ষুক দুই টাকার নোটে আসলে কী ফেলেছে?’
অন্য ফিঙেটা এবার একটু হাসল, ‘এবারও পরীক্ষা! ঠিক আছে, আসলে নিজের থালা থেকে সে নিজেকেই ছুড়ে ফেলেছে।’

নিজের কাছে

জাহাজের সাথে এক নাবিকের প্রেম হয়ে গেল। নাবিকের যখন চাকুরি ছাড়ার সময় হলো, সে জাহাজটিকে ছেড়ে আসতে পারছিল না। বেদনায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। অনেক কেঁদে কেটে বুক ভাসিয়ে সে বাড়ির পথে রওনা হলো। পথেও একবারের জন্য সে জাহাজটিকে ভুলতে পারছিল না। বাড়ি এসে যখন স্ত্রীকে পেল, তখনও তার মনে পড়ছিল জাহাজের কথা। স্ত্রী জানতে চাইল, ‘এতদিন পর বাড়ি ফিরেছ, কত আনন্দ থাকার কথা আর তুমি কিনা দুঃখী দুঃখী ভাব করে আছো! কী হয়েছে তোমার?’
স্ত্রীর কাছে সত্য কথাটি বলতে পারল না নাবিক। হয়তো পাগল ভাববে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছিল, ততই বিষাদ আরও চরমে উঠছিল। একদিন সে স্ত্রীকে কিছু না বলেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে জাহাজঘাটে চলে গেল। কিন্তু গিয়ে দেখল তার জায়গায় অন্য নাবিক এসে গেছে। সে প্রিয় ড্যাকে অনেকক্ষণ হেঁটে বেড়াল। তারপর আবার বাড়ি ফিরল। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি?’
লোকটি বলল, ‘আমার কাছে গিয়েছিলাম।’
স্ত্রী কিছুই বুঝল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো স্বামীর দিকে।

অবস্থান

ডোবায় নতুন জল এসেছে। শামুক আর ঝিনুকের কি যে আনন্দ। মনের খুশিতে এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করছি। এক সময় তারা তাকাল আকাশের দিকে। দেখল অনেক অনেক দূর দিয়ে একটা ছোট্ট কী যেন যাচ্ছে। ওটার পেছন দিয়ে আবার ধোঁয়ার মতো সাদা রেখা তৈরি হচ্ছে। শামুক বলল, ‘দেখছিস, ওই ওপর দিয়ে কী যেন একটা যাচ্ছে।’
ঝিনুক বলল, ‘আমাদের মতো কোনো প্রাণীই হয়তো। তবে সে নিশ্চয়ই উড়াল জানে। কিন্তু ওটার পেছন দিয়ে ক্যামন একটা সাদা রেখা, দেখছিস তুই?’
শামুক বলল, ‘হুম, আমরা কাদায় হাঁটলে যেমন দাগ পড়ে, সে হাঁটলেও নিশ্চয়ই আকাশে দাগ পড়ে।’
শামুকের সঙ্গে ঝিনুকও একমত। তখন শামুক বলল, ‘দেখছিস, ওটা কিন্তু আমাদের চেয়ে আরও বেশি ধীরে হাঁটে। সবার ধারণা আমরাই শুধু ধীরে চলি। দূরে দেখে কেউ হয়তো ওটার খবরই রাখে না!’
এবারও ঝিনুক শামুকের কথায় একমত হলো। ঝিনুক বলল, ‘এখন থেকে কেউ আমাদের ধীর প্রাণী বলতে পারবে না।’
ওরা দুটিই খুশি। আনন্দে কোলাকুলি করল।
তখন আকাশের অনেক অনেক ওপর দিয়ে যাচ্ছিল একটি রকেট। ওটার পেছনে তৈরি হচ্ছিল ধোয়ার সাদা রেখা। শামুক ঝিনুকের মনে হচ্ছিল একটা পিঁপড়ের মতো ছোট প্রাণী উড়ে যাচ্ছে।

ধ্যানী

ঈশ্বরের সন্ধানে ঘর ছাড়ল এক তরুণ। প্রথমে উপসনালয় আর আশ্রমগুলোতে খোঁজল। অনেককে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু কেউ তাকে সঠিকভাবে ঈশ্বরের খোঁজ দিতে পারল না। একজন বলল, ‘তিনি নিশ্চয়ই আছেন। কিন্তু সেটা যে কোথায়, তা আমি বলতে পারব না।’
একজন বলল, ‘খুঁজে দেখো, পেয়েও যেতে পারো।’
একজন বলল, ‘তুমি যেভাবে খুঁজছ, সেটা সঠিক পন্থা কিনা জানি না।’
এরপর তরুণটি বনে বনে ঘুরতে লাগল। সেখানে দেখা হলো এক ধ্যানীর সঙ্গে। যিনি দীর্ঘদিন ঈশ্বরের ধ্যান করছেন। তরুণ বলল, ‘আমি ঈশ্বরের সন্ধানে বাড়ি থেকে বের বের হয়েছি। বলতে পারেন কোথায় দেখা পাব তার?’
ধ্যানী বলল, ‘এখানে বনে বনে ঘুরে তো তাকে পাওয়া যাবে না। তুমি বাড়ি ফিরে যাও।’
এরপর তরুণ একটা প্রশ্ন করে বসল, ‘তাহলে আপনি এখানে কী করছেন?’
ধ্যানী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘দীর্ঘদিন কঠিন ধ্যান করছি।’
তরুণ বলল, ‘তাহলে আমাকে বাড়ি যেতে বলছেন কেন!’
ধ্যানী বলল, ‘কারণ আমিও একদিন তোমার মতো ঘর ছেড়ে বের হয়েছিলাম। আর ফেরা হয়নি।’
তরুণ জানতে চাইল, ‘তাহলে আমি তাঁকে বাড়ি গিয়ে পাব কী করে?’
ধ্যানী বলল, ‘তোমার বাড়িতেই তুমি তাকে পাবে। তোমার প্রতি আমার উপদেশ, কাউকে ফেরাবে না, বিমুখ করবে না। এটাই তোমার কর্ম। এই কর্মের মাঝেই তুমি ঈশ্বরকে পেতে পারো। আর আমি এখানে আছি, কারণ এটাই এখন আমার কর্ম হয়ে গেছে।’
কিন্তু তরুণ ধ্যানীর কথা বিশ্বাস করল না। সে আরও অনেক অনেক পথ, অনেক জনপদ পরিভ্রমণ করল। শেষে ক্লান্ত হয়ে এক আশ্রমকাননে ধ্যানে মগ্ন হলো।
এভাবে অনেক দিন কেটে গেল। চুল দাঁড়ি শ্বেতবর্ণ হলো, ভাঁজ পড়ল চামড়ায়। একদিন তার কাছে এক তরুণ এলো। যে বয়সে সে ঘর থেকে বের হয়েছিল, তরুণটি ঠিক সেই বয়সের। তরুণ জানতে চাইল, ‘কোথায় গেলে আমি ঈশ্বরকে পাব?’
সেও ঠিক আগের ধ্যানীর মতো বলল, ‘তোমার বাড়িতেই তুমি তাকে পাবে। তোমার প্রতি আমার উপদেশ, কাউকে ফেরাবে না, বিমুখ করবে না। এটাই তোমার কর্ম। এই কর্মের মাঝেই তুমি ঈশ্বরকে পেতে পারো।’
কিন্তু তার কথা তরুণ বিশ্বাস করল না। সেও বনে জনপদে ভ্রমণ শুরু করল। একদিন সেও বসে পড়ল ধ্যানে।

ভোটার

ভোটারের বাড়িতে একজন নির্বাচনী প্রার্থী এলেন এবং ভোট চাইলেন। ভোটার প্রতিশ্র“তি দিলেন যে তিনি তাকে ভোট দেবেন।
পরদিন আর একজন প্রার্থী এলেন। তাকেও তিনি ভোট দেবার পূর্ণ প্রতিশ্র“তি দিলেন।
এবং এর পরদিন আরও একজন। এবং তিনি শতভাগ নিশ্চিত করলেন তাকেই তিনি ভোট দেবেন।
ভোটারের ছোট মেয়েটি বলল, ‘তুমি যে সবাইকে একই কথা বললে, ঠিক বোঝলাম না!’
ভোটার বলল, ‘আমি আসলে এদের কাউকেই ভোট দেব না।’
মেয়েটি বলল, ‘তাহলে প্রতিশ্র“তি দিলে যে!’
ভোটার বলল, ‘সান্ত্বনা দিলাম। ওরা যদি যোগ্য হতো আমার কাছে ভোট চাইতে আসতো না।’

Facebook Comments

comments

১ Reply to “পাঁচটি অণুগল্প II চন্দন চৌধুরী”

  1. Avatar আনোয়ার রশীদ সাগর বলেছেন:

    চন্দন চৌধুরীর অণুগল্প গুলোর মধ্যে যে গুলো ফেবুতে পোস্ট করে সেগুলো পড়ি।চন্দন চৌধুরী প্রচুর লিখছে।নতুন ধারার অনেক লেখা লিখছে।লেখাগুলো মন্দ লাগে না।তবে লিখতে থাক,আমরাও পড়তে থাকি বিচার বিশ্লেষণ পরে হবে।ধন্যবাদ চন্দন চৌধুরী ও সম্পাদককে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top