জাত্যাভিমান II রোমেল রহমান

ঋষি পাড়ার একদিন পুলিশ আসে। তিনজন পুলিশ আসে দুইটা মোটর সাইকেলে।  শঙ্কররে তারা খোঁজে। শঙ্কর মুচিরে। ফলে ঋষি পাড়ার বুড়ারা বেকায়দায় পড়ে যায়। কেনোনা পুলিশেরা যখন আসে তখন পাড়ার সবাই কাজে গেসে বাইরে। কেবল মাত্র মহিলা আর খুনখুইন্যা বুইড়ারা ছাড়া আর কেউ নাই পাড়ায়। ফলে পুলিশরা তাদের নিকট গিয়া বলে, শঙ্কর কই? ফলে বুইড়া কয়জন আগায় আসে। পুলিশরা কেউ একজন বলে, শঙ্কর কই? বুইড়াদের একজন বলে, কোন শঙ্কর? পুলিশ বলে, শঙ্কর মানে শঙ্কর! তোমাগের শঙ্কর মুচি! বুইড়াদের একজন বলে, কোন শঙ্কর ঠিক কইরে কোতি না পাল্লি তো বাপু ঝামেলা হয়ে যাবে নে! পুলিশদের একজন বলে, কাকা বেশি প্যাঁচানোর টাইম নেই। শঙ্করের ঘর কোনডা সেইটে দেখায় দেও আমরা যায়ে খোঁজ নিচ্চি! বুড়োদের একজন বলে, কিন্তু কোন শঙ্কররে চাচ্চো বাপু? এবার পুলিশেরা একে অপরের দিকে তাকায় এবং তারা বুঝতে পারে কোন একটা প্যাঁচ আছে ফলে তারা বলে, তোমরা কও। তখন একজন বলে, তার চেহারা কি আপনারা বর্ণনা কোরতি পারেন কিরাম? একজন পুলিশ বলে, না। ফলে পুলিশদের সকলেই মনে মনে চাপ ফিল করে কেননা তাদের খারাপ লাগে এই কারণে যে, তারা সত্যিই শঙ্করের চেহারা মনে করতে পারে না। তারা মনে মনে এই ভেবে সান্ত্বনা নেয় যে, আসলে মুচির মুখ দেখার কিছু নাই। মুচিরা মানুষের পায়ের জুতার দিকে তাকায় থাকে ফলে তাদের মুখ দেখার সুযোগও নাই। তখন একজন বুইড়া বলে, তালি কিরাম কইরে হবে? তখন পুলিশদের একজন বলে, আপনারা কয়ে যান আমরা মিলেয়ে নিবানি। তখন বুড়োদের একজন তার সুতা দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখা ঘোলাটে চশমার লেন্সের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে বলে, এক শঙ্কর আছে ময়লাপোতা মোড়ে বসে তুমরা কি তার কথা কচ্চ? পুলিশরা চুপ করে থাকে। তখন বুইড়া আবার বলে, আরেক শঙ্কর আছে সাতরাস্তা মোড়ে বসে! পুলিশরা এইবার বোঝে শঙ্কর বেশ কয়েকজন। তখন একজন পুলিশ বলে, আর? বুইরা বলে, পি টি আই মোড়ে এক শঙ্কর বসে! ফেরিঘাট মোড়ে বসে দুইজন শঙ্কর। পিকচার প্যালেস মোড়েও আছে একজন শঙ্কর…! পুলিশদের একজন বলে, বাবা ইরা দেহি মোড়ে মোড়ে শঙ্কর পোস্টিং দিয়ে রাখিছে! এতো আমাগের সিস্টেম! বুড়ো বলে যায়, পশ্চিম বাইনেখামারে বাক্স নিয়ে ঘুইরে বেড়ায় এক শঙ্কর আর পূর্ব বাইনেখামার যায় নাটা শঙ্কর! তখন পুলিশদের একজন বলে, থাক! তুমি চুপ থাকো দিনি বাড়া। পাড়ার সবাই ফিরলি কয়ে রাখপা শঙ্কর যেন থানায় যাইয়ে দেহা করে। তখন অন্য বুড়ো বলে, কোন শঙ্কররে কবো? ফলে তিনজন পুলিশ পরস্পরের দিকে তাকায় এবং তারা বিভ্রান্ত হয়। এবং বাইকে উঠে বেরিয়ে যায়।

সেদিন বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঋষিরা সারা শহর থেকে কাজ শেষ করে বাক্স কাঁধে একে একে ফেরে। কেউ কেউ সদাইপাতি নিয়ে ফেরে। তারা পাড়ায় ফিরে উদ্বেগের বিষয়টা জানতে পারে এবং তারা টের পার সমস্যাটা গুরুতর। ফলে তারা একেএকে আবার হাওয়া হয়ে যায়। সেদিন রাত্রে আবার ঋষি পাড়ায় দুইটা বাইক আসে। বাইকে চড়ে সিভিল ড্রেসে পুলিশ আসে। তারা এসে ঘরে ঘরে খোঁজ নিতে যায়। সব ঘরে মেয়েছেলে আর বুইড়া কিংবা বাচ্চা ছাড়া যুবক বা মাঝবয়সী কেউ নাই। তারা জিজ্ঞাস করে, শঙ্কর মুচি কই? এক বুইড়া বারান্দার চাটাইয়ের থেকে বলে, নাই।  ফেরে নাই। আর ফেরে নাই। পুলিশ বলে, কই গেছে যে ফেরে নাই? বুইড়া বলে, স্বাধীনের যুদ্ধে গিয়া গুলি খায়ে মইরে গেছে। আর ফেরে নাই। পুলিশ তখন বিব্রত হয়ে বেরিয়ে আসে। পুলিশ অন্য ঘরে গিয়ে খোঁজ নেয়, শঙ্কর কই? কই শঙ্কর মুচি? তখন এক বুড়ি বেরি এসে বলে, ঘরে! ফলে পুলিশের মুখে হাসি ফোটে। তারা বলে, চলো। তারা আগায়।  বুড়ি বলে, আস্তে যান। বাড়িতে মনিষ্যি কেউ নেই। পুলিশ সেদিকে না তাকিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে বিব্রত হয়। এক তরুণীর কোলে একটা বাচ্চা দুধ খাচ্ছে। তরুণী তার বাচ্চাকে দ্রুত আড়াল করে। পুলিশ ফিরে তাকাতেই বুড়ি বলে, নাতি দেখতি হইসে চান্দির মতন এরা নাম রাখিছে শঙ্কর। ক্যা বাপু আমি কতো কলাম শশী রাহি তা শোনবে না। পুলিশদের একজন বল, স্যর এরা কি পাগল না ডাইল খায়? অন্য পুলিশ ফোঁস করে ওঠে, কোন উত্তর দেয় না। ফলে তারা অন্য ঝুপড়িতে যায়, সেখানে গিয়ে দেখে বাড়িতে বুড়ো লোক ছাড়া কেউ নাই।  ফলে তারা বুড়োকে জিজ্ঞাস করে, শঙ্কর আসে নাই? তখন বুড়ো বলে, সারা পাড়ায় বুইড়া আর মেয়ে মানুষ ছাড়া কেউ নাই। তখন একজন পুলিশ বলে, সবাই কই গেছে? তখন বুইরা বলে, কাজে। অন্য একজন বলে, শঙ্করও কাজে গেছে? তখন বুইরা বলে, সে তো চিতায় ছাই হইয়ে গেইছে দুইমাস আগে। পুলিশরা এইবার নিজেদের মধ্যে বলে, স্যর এইখানে বড় কোন ঘেন্টি আছে মনে হয়। একজন বলে, হু। অন্যজন বলে, চলেন বের হই। এরা ভয়ে পালায় গেছে। শঙ্কর এইখানেই আছে পাওয়া যাবে।

পরদিন সকালে তিনজন মহিলা পুলিশ আসে শঙ্করের খোঁজে। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে সন্ধান করে। প্রথমে তারা যেই ঘরে যায় সেইখানে গিয়ে বলে, শঙ্কর দা আছে? এক মহিলা বলে, ঘরে! ফলে মহিলা পুলিশ তিনজনের মুখে আলো  ঝিল্কি মারে। তারা ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতেই দেখে বিছানায় মুমূর্ষু এক শতবর্ষী বৃদ্ধ। তারা মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, কে? মহিলা বলে, আমার শ্বশুর মশাই। তখন মহিলা পুলিশ বলে, শঙ্কর উনি? মহিলা বলে, জি! তখন বিরক্ত হয়ে পুলিশ বলে, গাধা মহিলা। অন্য মহিলা পুলিশ বলে, তোমার বর কই? মহিলা বলে, বাড়ি নেই। তখন মহিলা পুলিশ বলে, কই গেছে? মহিলা বলে, কাইল কাজে গেইলো যে আর ফিরি নি! মহিলা পুলিশ বলে, তার নাম কি? মহিলা বলে, শঙ্কর! তখন মহিলা পুলিশ বলে, বাপের নাম শঙ্কর ছেলের নামও শঙ্কর? মহিলা বলে, জি।  তখন তাদের একজন বলে, তোমার নাম কি? মহিলা বলে, পার্বতী।  তখন তারা বেরিয়ে যায় বিভ্রান্তি নিয়ে। ফলে তারা অন্য ঘরে যায় সেইখানের মহিলাকে বলে, শঙ্কর কই? মহিলা বলে, খাচ্ছে। ফলে তারা হুড়মুড় করে এগিয়ে যেতেই দেখে এক বালক টিনের থালায় ভাত খাচ্ছে, পুলিশ দেখে বালকের চোখ বড় হয়ে যায়। মহিলা পুলিশ বলে, এই শঙ্কর? মহিলা বলে, জি। তখন অন্যজন বলে, অর বাপের নাম কি? তখন মহিলা বলে, ওর যা নাম তাই।  তখন অন্য মহিলা পুলিশ বলে, তোমার নাম কি? মহিলা বলে, পার্বতী! ফলে তারা তিনজন অসহায় বোধ করতে থাকে।  তারা অন্য বাড়িতে গিয়ে এক মহিলাকে দেখেই বলে, তোমার নাম কি পার্বতী? মহিলা মাথা নেড়ে বলে, জি।  তখন পুলিশদের একজন বলে, তোমার বরের নাম শঙ্কর তাই না? মহিলা মাথা নেড়ে বলে, জি।  অন্য পুলিশ বলে, সে তো ফেরে নাই তাই না? মহিলা মাথা নেড়ে বলে, না।

সেদিন হয়তো তিন মহিলা পুলিশ ফিরে গিয়ে রিপোর্ট করে ঋষি পাড়ার সকল পুরুষের নাম শঙ্কর এবং সকল স্ত্রী লোকের নাম পার্বতী। ফলে সেদিন সন্ধ্যায় দেখা যায় ঋষি পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে পুলিশের এক গোয়েন্দা চা খেতে থাকে। একজন লোক পত্রিকা পড়তে থাকে শব্দ করে। সে পড়ে, ‘শহর থেকে আচমকা সকল পাদুকা শিল্পী নিখোঁজ!’ ফলে পুলিশ গোয়েন্দা লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, কি শিল্পী? যিনি পড়ছিলেন তিনি বলেন, মুচি। ফলে গোয়েন্দা লোকটা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, শুনলাম এগের সবার নাম নাকি একই! ফলে চা দোকানী মহিলা ফোঁস করে বলে, তাতি সমস্যা কুয়ানে! তখন গোয়েন্দা পুলিশ বলে, তা তুমি বুঝবা না। সবার নাম এক হলি সমস্যা হয়। চা দোকানী বলে, কিরাম সমস্যা হয়? পুলিশ গোয়েন্দা লোকটা ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলে, তোমার নাম কি? মহিলা বলে, পার্বতী! ফলে গোয়েন্দা পুলিশ লোকটা আচমকা একটা ধাক্কা খায়। চা দোকানী মহিলা বলে, ঋষি পাড়ার মাইয়ে তো আমি।

সেদিন রাত্রে পুলিশের একটা দল আসে। তারা একটা পুলিশ পিকাপে করে কয়েক শ জোড়া বুট জুতা নিয়াসে। জুতাগুলান তারা ঋষিপাড়ার রাস্তায় ঢেলে দিয়ে বুড়ো আর মেয়েদের বলে, কাইল সকালে আইসে নিয়ে যাবো। সব গুলো পালিশ কইরে রাখবা। কেম্নে কি করবা তা জানি না। কিন্তু সকালে কমপ্লিট চাই, আর আরও কয়েকশো জোড়া কাইল দিয়ে যাবো। তোমাগের  এই তামাশা এইবার শেষ। কিন্তু পরেরদিন সকালে এসে দেখে জুতা যেখানে রেখে গিয়েছিলো সেইখানেই পড়ে আছে। ফলে গাড়িতে করে আনা আরও জুতার দিকে পুলিশরা তাকায় এবং তারা আবিষ্কার করে যে সারা পাড়া শুনশান। পাড়ায় একজন মানুষও নাই। এই ঘটনার পর আর বিষয়টা চেপে রাখা যায় না। চারদিকে ঘটনা বিভিন্ন রঙে ছড়াতে থাকে ফলে শেষমেশ আমরা সব কিছু কেটেছেটে জুড়ে জানতে পারি যে, শঙ্কর নামে এক মুচি যে কিনা পুলিশদের জুতা পালিশ করতো। এই শঙ্কর একদিন দেখে যে, পিটিআই মোড়ে কিংবা ছবেদাতলা মোড়ে কিংবা পূর্ব বানিয়াখামার বা আলকাতরা মিল মোড়ে  একদল পুলিশ যারা কিনা হেঁটে যাওয়া এক যুবককে থামিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে, তারপর তার শরীর সার্চ করতে থাকে, যখন কিছুই পায় না তখন হয়তো ছেলেটা শক্ত কোন উত্তর দেয়। পুলিশ তাকে পাল্টা কোন উত্তর দেয় যার বিপরীতে যুবকটি আরেকটি উত্তর দেয়, ফলে মুহূর্তের ভেতর যুবকটিকে ঝাঁপিয়ে মারতে শুরু করে পুলিশটি এবং একপর্যায়ে বুট দিয়ে লাথি দিতে থাকে। দলের অন্য পুলিশরা হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে দেখে। শঙ্কর বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে কেনোনা আজ সকালেই সে এই আক্রমণকারী পুলিশটির বুট জোড়া পালিশ করে দিয়েছে। শঙ্কর দেখে বুটের পাড়ায় ছেলেটার রক্ত বের হয়ে রাস্তায় মেখে কালচে হয়ে গেছে। ফলে শঙ্করের চিন্তার জগতে কি যেন কি হয়, একটা ঝাঁকা কিংবা ঝড়। ফলে সে জমে যায়। পরের দিন শঙ্করকে দেখা যায় নিরালা বাজার মোড়ে বসে ঝিমোতে। একজন পুলিশ এসে তার বাক্সের উপর পা তুলে দিয়ে বলে, পালিশ লাগা! শঙ্কর পুলিশের পা বাক্সের উপর থেকে সরিয়ে দেয়। পুলিশ পা নামিয়ে দেয়ায় প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না। কিছুক্ষণ পর শঙ্কর বলে, যেই বুট দিয়ে মানুষরে লাত্থি দেন সেই বুট আমি পালিশ করি না। পুলিশ বলে, কি কস? শঙ্কর বলে, আজকের থে পুলিশের জুতো রঙ করা বন্ধ! তখন কিংবা তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওই পুলিশ শঙ্করের বুকে একটা লাথি মেরে তাকে লুটিয়ে ফেলে। এবং শঙ্করের বুট পালিসের বাক্সটা পাড়া দিয়ে ভেঙে ফেলে।  অন্য এক মুচি এগিয়ে আসলে তাকেও পাড়ানো হয়।

ফলে এই ঘটনা ছড়িয়ে যায় গোপনে এবং ধীরে। কিছুদিনের মধ্যে পুলিশ এবং ক্রমশ শহরের লোকেরা টের পায় তাদের পাদুকার সৌন্দর্যের কারিগরেরা নিখোঁজ। ফলে আজ এই সকাল বেলা পুলিশের এক ভ্যান জুতা নিয়ে আসা আর গত রাতে এক ভ্যান জুতা রেখে যাওয়া দুটোকেই এক সঙ্গে নিয়ে ফিরে যেতে যেতে পুলিশ ভ্যানের মাহুত জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে, রাগে ঘৃণায় তার ইচ্ছা হতে থাকে একটা শঙ্করকে পেলে বুটের তলায় চেপে পিষে ফেলতে। পুলিশি রাষ্ট্রে মুচিদের কাছে পরাজয় মেনে নেয়া যায় না।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top