হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় -এর কবিতা

সিদ্ধান্ত

নাক বরাবর
যে রাস্তা শুয়ে আছে
ওটা তোমার সিদ্ধান্ত ।

 

সিঁড়িতে

সিঁড়ির যে ধাপে তুমি
আগের ধাপ আয়না

তোমাকে মেপে দেয়
তোমাকে বেঁধে রাখে

আয়নায় মুখ দেখতে ভুলে গেল
তোমার ঠিক পিছনেই গভীর খাদ ।

 

গাছ

যা আসছে
তাকে নাও

যা আসছে না
তাকেও নাও

যা আছে
তার মধ্যে ডুবে থাকো

সবাই তোমার বয়সে আঙুল তুলবে
অথচ তোমার গায়ে নতুন নতুন পাতা

 

গাছের গায়ে

গাছ আর
গাছের পাশে
গাছের মতো কিছু একটা
তুমি ওই জায়গায়
বসতে চাও
গাছের মতো করে

গাছের গায়ে
রোদ এসে পড়লে
ঝড় ডানা ঝাপটালে
বিদ্যুতের না বলা কথায়
তোমার জায়গা থেকে
তুমি অনেক দূরে ।

 

চলো

কেউ যেন আমার
কানের কাছে এসে বললো —– ” চলো ”
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম

—– “তোমার কোনো জিজ্ঞাসা নেই ? ”
—– ” হাঁটতে পারাটাই অনেক বড় পাওয়া । ”

কোনো এক পথের বাঁকে সে হারিয়ে গেল

 

অন্য হাওয়া

তোমার চিরুনিতে উকুন উঠে আসত

বুড়ি ঠাকুমা তোমার মাথায় চিরুনি দিত
তুমি প্রায় নিভে যাওয়া উনুনের মুখে

মুঠো করে পাতা ছুঁড়ে দিতে

মা বিকেল বস্তা মাথায় ঘাস নিয়ে ফিরত
ধোঁয়ার রাত থেকে বাবার রিক্সাটা

আর ফিরল না

 

এখন তোমার গন্ধ মাথা ।

নিরুদ্দেশ

“তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে দিতি”

চারপাশ চুপচাপ, কোনো কথা নেই
বুঝতে পারি এসব কথা এখন আর

কেউ কাউকে বলে না

এখন আর কেউ কাউকে দেখে না

দেখা হলে কোনো কষ্ট কথা নেই
কুড়ির দুপুরে চিলেকোঠায় গোপন চুমুর
হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া নেই

দেখা হলে শুধু কে কোথায় কত নম্বরে আছে
আরও এগিয়ে যেতে কত দিন দেরি

আমি অনকেক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম
আমার চোখে কারও চোখ পড়ে নি
চারপাশে তখন রাত নামছে ।

রাস্তা

হাঁটতে হাঁটতে দেখি
আমার সামনে একটা নতুন সর্ম্পক
নিজেকে ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে

পিছনে আমার মা
রান্নাঘরে ভীষণ ব্যস্ত
খুন্তি নাড়তে নাড়তে
আমাকে রাস্তা এগিয়ে দিচ্ছে

দুয়ারে পুঁথি লিখতে লিখতে বাবা
চোখের ঈশারায় রাস্তা বলে দিচ্ছে

আমার পা টলতে দেখে
দিদি ঠোঙায় কাই দিতে দিতে
চোখ বড় বড় করে

আমার মনে হয়
মা, বাবা, দিদিতে কছিুটা মন রাখলেই
নতুন সর্ম্পকটাকে টিকিয়ে রাখতে পারব ।

খোঁজ

আমি অনেকক্ষণ থেকে তাঁকে খুঁজছি
তাঁকে খুঁজে পাওয়াটা আমার দরকার
এই অঞ্চলের অনেকগুলো রাস্তা তাঁর তৈরি
অনেক জায়গাতেই তিনি টাইমে কল খুলে দয়িছেনে

তাঁকে খুঁজে পেলেই
শুরু হবে তাঁর স্মরণানুষ্ঠান
আর মাত্র মিনিট দশেক দেরি

আমি এখনও তাঁকে খুঁজে চলেছি ।

মঞ্চে

সভার মঞ্চে উঠলেই মনে হয়
সবাইকে সবকিছু বলে দিই
তারপর ভাবি কী আর বলবো
সেই তো এক অভাব, কোথাও কিচ্ছু হচ্ছে না,
যে যা পাচ্ছে যা খুশি নিয়ে নিচ্ছে

আমি না বললেও কেউ কেউ তো বলেছে
কী বদলটা হয়েছে তাদের ?
সেই তো অভাবের এক ডাল থেকে আর এক ডালে

আজকেও অনেক কিছু বলবো ভেবেছিলাম
শেষমেষ একটা কবিতা বলে নেমে এলাম ।

 

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় : পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় ১৯৬৭ সালে জন্ম। প্রকাশিত গ্রন্থ : তুমি অনন্ত জলধি (কবিতা),  দু এক পশলা মান্না (ছড়া), চার ছক্কায় সচিন (ছড়া), From the Spring of Light (প্রবন্ধ)। সম্পাদিত পত্রিকা —- ছায়াবৃত্ত এবং কাটুম কুটুম ।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top