লেনিন ।। পর্ব-সাত।।আশানুর রহমান খোকন

পর্বসাত অপারেশন পহেলা মার্চ

দোসরা ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৭। দিনটি বুধবার। আগের রাতে বেশ বরফ পড়লেও সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার। সূর্যের তাপে রাতের বেলায় পড়া বরফ গলতে শুরু করেছে। রাস্তাটা তাই বড্ড স্যাঁতস্যাঁতে। সকালে আন্নার একটি ক্লাস ছিল। হোস্টেল থেকে ক্লাসে যেতে এমনিতে কয়েক মিনিট লাগে কিন্তু স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তায় সময়টা আজ একটু বেশীই লেগেছিল। ক্লাস শেষে ঘন্টাখানেক হলো সে ফিরেছে। এখনও দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হয়নি কিন্তু আন্নার বেশ ক্ষুধা লেগেছে।  টেবিলের উপর রাখা এ্যালমন্ডের কৌটা থেকে একটা একটা করে এ্যালমন্ড নিয়ে সে মুখে দিচ্ছে আর ভাবছে বেশ কিছুদিন হয়ে গেল সিমবিরস্কির কোন খবর নেই। শেষ চিঠিতে মা লিখেছিল ভলোদিয়া পড়াশুনা নিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত। এ বছর ভলোদিয়া ও ওলগার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা । ভলোদিয়াকে নিয়ে যে দুঃশ্চিন্তা আন্নার ছিল সেটা এখন অনেকটা দূর হয়েছে। এবার বড় দিনে আন্না বাড়ী না যাওয়ায় ছোট ভাই-বোনগুলো মন খারাপ করেছে। তাদের মন খারাপের কথাটা মা জানালেও তিনি নিজেও যে কষ্ট পেয়েছেন তার ছাঁপ ছিল চিঠিতে। একারণে আন্না মাকে বুঝিয়ে একটি চিঠি লিখেছিল। মা সে চিঠির জবাব এখনও দেননি। ঐ চিঠিতে আন্না মার্কের কথাও জানিয়েছে। মায়ের কোন চিঠি না পেয়ে আন্না তাই একটু দুঃশ্চিন্তায় আছে। গতবার বাড়ী গিয়েও মার্কের কথাটা সে বলতে পারেনি। এদিকে মার্কের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়টি এখানকার পরিচিত সবাই মোটামুটি জানে। আন্নার এক খালাতো বোন ইলেনা তার সাথেই বেষ্টুজহেভ কোর্সে পড়ে। ইলেনা বিবাহিতা। মার্ক সম্পর্কে সেও একদিন আন্নাকে প্রশ্ন করেছিল। এদিকে মার্কের কিছু আত্মীয়ও থাকে সেন্ট পিটার্সবার্গে। মার্ক আন্নাকে নিয়ে কয়েকবার সে সব বাসায় গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যেও কিছু কৌতুহল ও প্রশ্ন ছিল। মার্ক একদিন হঠাৎ করেই তার এক আত্মীয়ের বাসায় আন্নাকে পরিচয় করিয়ে দেয় নিজের বাগদত্তা হিসাবে। আন্না কথাটা প্রথমে শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিল। বিষয়টি এতটাই আকস্মিক ছিল যে আন্না মার্কের মুখের দিকে তাকিয়েছিল বিস্ময় ও গভীর আবেগে। মার্ক কথাটা বলে ফেলে নিজেও একটু বিব্রত ছিল এই ভেবে যে বিষয়টি আন্না কিভাবে নেবে। কিন্তু আন্নার চোখ-মুখ দেখে সে বুঝতে পেরেছিল আন্নার তাতে আপত্তি তো নেই বরং খুশী হয়েছে। তাই ইলেনার প্রশ্নের উত্তরে সে মার্কের কথা তাকে বলেছিল এবং সাথে এটাও বলেছিল যে সে মার্কের বাগদত্তা। কিন্তু ইলেনাকে কথাটা বলার পরেই আন্নার মনে হয়েছিল কথাটা তো প্রথম মাকেই জানানো উচিত। শেষ চিঠিতে আন্না তাই সব জানিয়ে মাকে লিখেছিল। মার্কের বাগদত্তা এই নতুন পরিচয়ে সুবিধা হয়েছে যে তাদের মধ্যকার সম্পর্কটুকু নিয়ে এখন কারো মধ্যে বাড়তি কোন কৌতুহল নেই। তাদের পরস্পরের যোগাযোগ ও মেলামেশা করাটা এর ফলে অনেক সহজ হয়েছে।

কিন্তু আন্নাকে বিষয়টি বেশ ভাবাচ্ছে। এটি শুধু তাদের সম্পর্কের একটি নতুন সম্বোধনই নয়, তার থেকেও অনেক গভীর কিছু। একটি মেয়ে কারো বাগদত্তা হলে মেয়েটি যেন আপেক্ষিক স্বাধীনতা লাভ করে। ছেলেটি বা মেয়েটির  পারস্পারিক যোগাযোগ বা মেলামেশাটা পরিবার ও সমাজের কাছে তখন এক ধরণের গ্রহণযোগ্যতা পায়। যেদিন মার্ক তাকে বাগদত্তা হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সেদিন ফেরার পথে বাগদত্তা বিষয়ে সে মজার একটি তথ্য দিয়েছিল। আন্নার মনটা সেদিন এমনিতেই ছিল ফুরফুরে। মার্ক ও আন্না ঘনিষ্ঠভাবে পাশাপাশি হাঁটছিল। রাস্তার স্বল্প আলোয় হাঁটতে হাঁটতে মার্ক আন্নার হাতটি ধরে বলে ওঠে,

জানোবাগদত্তাব্যপারটি এখানকার বিপ্লবী রাজনৈতিক মহলে ব্যপক জনপ্রিয়

কী রকম?

পুরুষ বিপ্লবীরা যখন জেলে যায় তারা জেল কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রুপের নারী কর্মীদের বাগদত্তা হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়

মানে? বাগদত্তা বলে পরিচয় করিয়ে দেয় কেন?

কারণটা বেশ মজার। তারা যখন জেলে যায় তাদের পরিবারের মানুষদের সাথে সাধারণত তাদের দেখা করার অনুমতি দেয়া হয়। কমরেডরা তো পরিবারের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু বাগদত্তাকে পরিবারের মানুষই মনে করা হয়। ফলে গ্রুপের নারী কমরেডদের বাগদত্তা হিসাবে পরিচিত করালে তাদের মাধ্যমে জেল থেকে বিভিন্ন খবরাখবর আদান প্রদান করা সহজ হয়

তুমিও কী সে কারণে আমাকে বাগদত্তা হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিলে নাকি?

কথাটা আন্না দুষ্টামি করেই বলেছিল।

কি যে বলো? আমি কি তোমাকে বাগদত্তা হিসাবে জেলারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি নাকি আমার আত্মীয়দের সাথে?

একথায় আন্না ও মার্ক দুজনেই হেসে উঠে। দু’জনে আরো নিবিড় হয়ে আসে। মার্ককে যেন সেদিন কথায় পেয়েছে, সে গড়গড় করে বলতে থাকে,

জানো, বাগদত্তা হিসাবে নিজের পরিবারে একবার প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে নারী কর্মীদেরও সুবিধা হয়। তাদের উপর পরিবারের চাপটা তখন কমে আসে। বাড়ীর বাইরে যাওয়া, থাকা বা পুরুষ কর্মীদের সাথে মেলামেশায় তখন বাড়তি কিছু সুবিধা পাওয়া যায়

আন্না একটু অবাক হয়ে মার্কের মুখের দিকে তাকায়। মাঝে মাঝে তার মনে হয় সে বোধ হয় মার্ককে ভাল বুঝতে পারেনা। ‘বাগদত্তা’ পরিচয়টি কি শুধুই সামাজিক স্বীকৃতি মাত্র? আন্না বুঝতে পারে তার চোখে পানি চলে এসেছে। সে নিজেই অবাক হয় তার আচরেণ। ইদানীং কি যে হয়েছে। চোখের জল লুকাতে সে মুখটি অন্যদিকে ঘুরায়।

আন্নার এই আকস্মিক পরিবর্তনে মার্ক হঠাৎ করেই থেমে যায়। দু’জনের মাঝে নেমে আসে এক ধরণের নিস্তব্ধতা। মেঘ সরে গিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে আন্নার মুখে। মার্ক যে কথা অনেকবার চেষ্টা করেও মুখ ফুটে সরাসরি বলেনি বা হয়ত বলার প্রয়োজন হয়নি, তার মন যেন তাই বলতে চাইছে কোন দ্বিধা ছাড়াই। মার্ক হঠাৎ দু’হাত বাড়িয়ে আন্নাকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখটি নামিয়ে বলে, ‘আন্না আমি তোমায় ভালবাসি আন্না কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। মার্কের কন্ঠে এমন কিছু ছিল যা আন্নাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। প্রবল আনন্দে তার দু’চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। সময় সমাজ সব কিছুই যেন দু’জনের কাছে সেই মুহূর্তে থেমে যায়। মার্ক তার ঠোঁট দুটো আলতো করে আন্নার ঠোঁটে রাখে। প্রকৃতি যেন তার অসীম উদারতায় আহ্বান জানায় এই তরুন যুগলকে আর চাঁদের আলো ঢাকা পড়ে মেঘের আলিঙ্গনে।

মার্কের কথার সত্যতা আন্না টের পেয়েছিল কিছুদিন বাদেই। নিজেকে বাগদত্তা হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় সেন্ট পিটার্সবাগে আন্নার নানার দিকের আত্বীয়-স্বজন যারা আছেন তারা বিষয়টিকে সহজ ভাবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্ক তার মা কিভাবে নিয়েছেন সেটা জানা আন্নার জন্য খুব জরুরী। তাই সে প্রতিদিনই মায়ের চিঠির জন্য অপেক্ষা করে। আন্নার আরেকটি উদ্বেগের কারণ হয়েছে সাশা। সাশা এখন দিনরাত অর্থনীতি গ্রুপের কাজ নিয়ে ব্যস্ত একই সাথে সে গোপন রাজনীতির সাথেও জড়িয়ে পড়েছে। আন্নার ভয়টা সেখানেই। সাশার কারণে একভাবে তাদের কাজে-কর্মে আন্নাও যুক্ত হয়ে পড়েছে। কথাটা মাকে সরাসরি না জানালেও সাশার পড়াশুনার বাইরেও ব্যস্ত থাকার বিষয়টি সে মাকে চিঠিতে জানিয়েছে। মায়ের প্রতিক্রিয়াটা জানাটা একারণেও খুব জরুরী। আন্না বসে বসে যখন এসব কথা ভাবছিল ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। এ সময় তো কারো আসার কথা নয়। আন্না উঠে দরজা খুলতেই দেখে ডাকপিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। আন্নার দিকে হাত বাড়িয়ে একটি কাগজ দিয়ে বলে, ‘টেলিগ্রাম’।

কয়েকদিন আগে হন্তদন্ত হয়ে সাশা এসেছিল। সাশার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। সে রোগা হয়ে গেছে। চোখের কোনায় কালি পড়েছে। চোখ গুলো গর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তাকে দেখে আন্নার প্রথমেই মনে হয়েছিল সাশা বোধ হয় ভাল করে খায়ও না, ঘুমায়ও না। সাশাকে প্রশ্ন করে কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। আন্না সেটা জানে বলেই এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন করে না। আন্না শুধু ভয় পেয়েছিল। সাশা আন্নার সোফায় বসতে বসতে বলেছিল,

অ্যানিউটা, কয়েকদিনের মধ্যে আমার একটা টেলিগ্রাম আসবে ভিলনিয়াস থেকে। বিশেষ কারণে তোমার ঠিকানাটা ব্যবহার করতে হয়েছে। বিষয়টি একটু গোপনীয়। টেলিগ্রামটি যেন অন্য কারো হাতে না পড়ে।

সাশার এ কথায় সে রীতিমতো আতংকিত হয়ে পড়েছিল। আন্নার চোখ-মুখ দেখে সাশা বিষয়টি টের পেয়ে বলেছিল,

অ্যানিউটা, তুমি অযথায় চিন্তা করছো। টেলিগ্রামটি পেলে সোজা আমার কাছে পৌঁছে দেবে। দেরী করবে না। তারপর তোমার দায়িত্ব শেষ।

সাশার কথায় আন্নার আশংকা সেদিন কমেনি বরং বেড়েছিল। তার আশংকা সাশাকে নিয়েই। তার মনে হয়েছিল সাশা বোধ হয় ভয়ানক কোন কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে। তাই সে বলেছিল,
সাশা, তোমার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা আছে। আজ রাতের ডিনারটা আমরা বাইরে কোথাও করতে পারি?
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সাশা উত্তর করেছিল,
আমি এখন খুবই ব্যস্ত। ডিনারে যাবার সময় আমার হবে না। কথাটা খুব জরুরী হলে এখনই বলে ফেলো

সাশার উত্তর শুনে সেদিন আন্নার শুধু মন খারাপই হয়নি, রীতিমতো কান্না পেয়েছিল। সাশাকে তখন বড্ড অচেনা, অনেক দূরের কেউ মনে হয়েছিল। কষ্টে, অভিমানে আন্নার তখন বাকরুদ্ধ হবার উপক্রম।  আন্নার তখন কেন জানি মনে পড়ে প্রথম প্রথম সেন্ট পিটার্সবার্গ এসে তার মন খারাপ থাকতো বুঝতে পেরে এই সাশাই প্রত্যেক রবিবার ও বুধবার তাকে নিয়ে ডিনারে যেতো। তারা নতুন নতুন রেষ্টুরেন্টে খেতো। কত রাত তারা নেভেস্কি প্রসপেক্ট ধরে হাঁটতে হাঁটতে নেভা নদী পর্যন্ত চলে গিয়েছে! অথচ এখন সাশার দেখাই পাওয়া যায় না। সাশার উত্তরে আন্না মাথাটা নীচু করে নিজের কান্নাটুকু লুকিয়ে বলে,
না, তেমন জরুরী কিছু না।
সাশার সেদিকে খেয়াল করার সময় কোথায়? সে ঝড়ের বেগে বের হয়ে যায়। সাশা চলে গেলে আন্নার যেন বুক ফেটে কান্না আসে। দরজাটা কোন রকম বন্ধ করে আন্না সেখানেই বসে পড়ে। তার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি ঝরছিল।

আজ তাই ডাকপিয়ন চলে যাবার পরও আন্না টেলিগ্রামটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরে টেলিগ্রামটি উল্টে-পাল্টে দেখে। শুধু লেখা ‘Sister is dangerously ill’. আন্না কিছুই বুঝতে পারে না। এমন একটি টেলিগ্রামের জন্য সাশা কেন ব্যস্ত সেটাও তার বোধগম্য হলো না। তবু আন্না দ্রুত প্রস্তুত হয়ে সাশার খোঁজে তার বাসার দিকে রওনা দেয়। তার যে আজ দুপুরে খাওয়া হয়নি সেটা যেন সে ভুলেই গেলো।

সাশার ঘরের দরজা-জানালা সবই বন্ধ। শীতকাল ছাড়াও বাসার একটি কক্ষে বোমা তৈরীর নানা উপকরণ জড়ো করে রাখায় সে বাড়তি সাবধানতার জন্য সবসময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সাশা এসময় বাড়ী বাইরেও কম যায়। নাইট্রিক এসিড পাওয়া গেলেই সে বোমা তৈরীর কাজ শুরু করবে। টেবিলে বসে গভীর মনোযোগে সে রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনের সংক্ষিপ্তসার ও জার হত্যার ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি খসড়া বক্তব্য লিখছিল। লিখতে লিখতে তার মনে হলো কানসার ভিলনিয়াসে গিয়েছে কয়েকদিন হয়ে গেলো। এখনও কোন টেলিগ্রাম এলো না। কোন বিপদ হলো না তো? কোন কারণে কানসার ব্যর্থ হলে নাইট্রিক এসিড সংগ্রহের বিকল্প উপায় নিয়ে লুকাশেভিচের সাথে সাশার অবশ্য ইতোমধ্যে কথা হয়েছে। দুপুর হয়ে গেছে কিছুক্ষন হলো। সাশা বেশ ক্ষুধা অনুভব করে। এমন সময় দরজায় ঠক্ ঠক্ আওয়াজ। আওয়াজের ধরণটা পরিচিত এবং আওয়াজ যে করছে তার মধ্যে যেন এক ধরণের অস্থিরতা আছে। বিরতি ছাড়াই আবার ঠক্ ঠক্ আওয়াজ হওয়ায় সাশা বুঝতে পারে আন্না এসেছে। সে গিয়ে দরজা খুলতেই আন্না দ্রুত ঘরে ঢুকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। সাশা আন্নাকে ওভারকোট খুলতে সাহায্য করে। আন্না ওভারকোটটি খুলে রেখে সাশার খাটে গিয়ে বসে। সাশা কাছে এসে বসতেই কোন কথা না বলে হাত ব্যাগ খুলে সে টেলিগ্রামটি সাশার হাতে দিলো। টেলিগ্রামটি হাতে নিয়ে সাশা দ্রুত একবার চোখ বুলিয়েই ঘরের কোনায় রাখা টেবিলটায় গিয়ে বসে। সাশা যেন ভুলে গেলো আন্নাও ঘরে আছে। সাশা কয়েক মিনিট সময় নিল সাংকেতিক টেলিগ্রামের পাঠোদ্ধার করতে। উত্তেজনায় সাশার চোখমুখ জ্বলজ্বল করতে থাকে। সাশার এমন খুশীতে আন্না একটু অবাক হলো। তবু অনেকদিন পর সাশাকে এমন হাসিখুশি দেখে আন্নার ভাল লাগে। যদিও আন্না জানে না সাশার এত খুশীর কারণ কী? টেলিগ্রামটি তখনও সাশার হাতে ধরা। এমন সময় আন্না বলে,
সাশা, আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। তুমি কি দুপুরে খেয়েছো?
আন্নার কথায় সাশা যেন সম্বিৎ ফিরে পায়। সেই সাথে সে যেন একটু লজ্জাও পেলো। অন্ততঃ আন্নার এমনটাই মনে হলো। সাশা খুশীর গলায় বলে,
আমিও খুব ক্ষুধার্ত। চলো আজ বাইরে খাই।
কথাটা বলেই সাশা হাতের টেলিগ্রামটি টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলো। দ্রুত গরম কাপড় পরে নিয়ে সাশা বললো, ‘চলো বেরিয়ে পড়ি’।

বৃহস্পতিবার সন্ধা। সাশা দাঁড়িয়ে আছে ওয়ারশ রেল ষ্টশনের প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ মাথায়। টেলিগ্রামের কোড অনুযায়ী কানসারের আজকের ট্রেনেই আসার কথা। ট্রেনটি সাধারণতঃ এসে পৌঁছায় সাতটায়। শীতকাল হওয়ায় এখন রীতিমতো অনেক রাত মনে হচ্ছে। সাশা আগে থেকে একটি ঘোড়ার গাড়ী ঠিক করে রেখেছে। তাকে অপেক্ষা করিয়ে রেখেছে সাশা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে ৫০ গজের মধ্যে। সাতটা বাজতে তখনও মিনিট দশেক বাকী। কিন্তু হঠাৎ করেই আবহাওয়া যেন বদলে যেতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাদা পাউডারের মতো বরফ পড়তে শুরু করেছে। সাশা আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে খুশীই হলো। এমন আবহাওয়ায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কানসারের নিয়ে আসা জিনিষগুলো গাড়ীতে তুলতে সহজ হবে। এর মধ্যে সাশা একবার দেখে আসে ঘোড়ার গাড়ীটা জায়গামত দাঁড়িয়ে আছে কিনা। প্ল্যাটফর্মে ফিরে টিকিট কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশটিকে সে আর দেখতে পেলো না। এমন সময় দূর থেকেই ট্রেনের হুইসেল কানে আসে। সাশা ষ্টেশনের ঘড়িটার দিকে একবার তাকালো। দেখে সাতটা বেজে দশ। ওভারকোট ও হ্যাট পড়া সাশা একটু এগিয়ে গেল। ট্রেনটি থামার আগেই সাশা জানালা দিয়ে কানসারকে দেখতে পায়। সাশা কানসারের বগি বরাবার জানালার কাছে এসে দাঁড়াতেই কানসার দ্রুত নাইট্রিক এসিড ভর্তি দুটো মাঝারি সাইজের কাঁচের জার জানালা দিয়ে নামিয়ে দিলো। তারপর সে নিজেও ঘাড়ের ব্যাগটা নিয়ে জানালা থেকে লাফ দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামে। যাত্রীরা তখনও ট্রেন থেকে নামতে ব্যস্ত। সাশা চকিতে চারপাশটা একবার দেখে নেয়। চোখের ইশারা করতেই কানসার একটি জার তুলে নিল। অন্য জারটি নিজে তুলে নিয়ে সাশা আগে ভাগে হাঁটতে শুরু করে। বরফের ঝাঁপটা এসে চোখে মুখে লাগছে। কোন ধরণের ঝামেলা ছাড়াই জার দুটো নিয়ে তারা ঘোড়ার গাড়ীতে উঠতেই কোচোয়ান গাড়ীটা ছেড়ে দিলো। সাশা গাড়ীর পিছন দিকের ছোট্ট ছিঁদ্রটুকু দিয়ে একবার দেখে নিল কেউ অনুসরণ করছে কিনা। নিশ্চিত হয়ে সাশা সামনে ফিরে কানসারের হাতটি ধরে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আস্তে করে বলে,
অনেক ধন্যবাদ, কমরেড!
উত্তরে সাশার হাতে একটু চাপ দিয়ে কানসার বলে,
আরো ভাল খবর আছে। তোমার বাসায় পৌঁছে বলছি। বাসায় আর কেউ আছে নাকি?
কানসারে কথা শুনে সাশা মনে মনে খুশী হলো।
লুকাশেভিচ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে

গাড়ীটি বাসার সামনে এলে ভাড়া মিটিয়ে জিনিষপত্র নিয়ে তারা নেমে পড়ে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে সাশার কাছে জারটাকে বেশ ভারী লাগে। সাশা জানতে চায়,
জারে কতটুকু জিনিষ আছে?
পিছন পিছন উঠতে উঠতে কানসার বলে,
প্রতিটা জারে বিশ পাউন্ড।
সাশা গুনে গুনে তিনবার কড়া নাড়ে। নিঃশব্দে দরজা খুলে দেয় লুকাশেভিচ। ভিতরে ঢুকতেই লুকাশেভিচ কানসারকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানায়। কানসার গিয়ে চেয়ারে বসে। ঘাড় থেকে ব্যাগটি নামিয়ে সে একটি পিস্তল, পটাশিয়াম সায়ানাইড ও বেশ কিছু রুবল বের করে।
ভিলনিয়াস গ্রুপের পক্ষ থেকে এই জিনিষগুলো শুভেচ্ছা স্বরুপ পাঠানো হয়েছে।
সেগুলো পেয়ে সাশা ও লুকাশেভিচ দু’জনেই ভীষণ খুশী হয়। সাশা পিস্তলটি নাড়াচাড়া করতে থাকে। লুকাশেভিচ জারের মুখ খুলে এসিড পরীক্ষা করতে শুরু করে। সাশা খেয়াল করে দেখে লুকাশেভিচের মুখের হাসিটুকু আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। সাশা এগিয়ে এসে জানতে চায়,
-কি হলো? কোন সমস্যা?
উত্তরে লুকাশেভিচ মাথা নাড়তে থাকে আর জার দু’টোর মুখ লাগাতে লাগাতে বলে,
কমরেড কানসার, তুমি অনেক কষ্ট করেছো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যপার হলো এই এসিড দিয়ে বোমা বানানো যাবে না। এটা বোমা বানানোর উপযুক্ত নাইট্রিক এসিড নয়।
লুকাশেভিচের কথা শুনে কানসার অনেকটা লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়ে। তার চোখ মুখে প্রবল হতাশা এবং কিছুটা যেন অবিশ্বাস। লুকাশেভিচের কথা শুনে সাশাও যেন হতাশ হয়। কানসার আবার চেয়ারে বসে পড়ে ধপ করে। সাশা তখন প্রশ্ন করে,
তাহলে কী হবে, লুকাশেভিচ?
লুকাশেভিচ উঠে দাঁড়ায়। কানসারকে ভাল করে একবার দেখে নিল। তারপর সাশার দিকে তাকিয়ে বলে,
এখান থেকে বোমার তৈরীর উপযোগী নাইট্রিক এসিড যোগাড় করতে হবে। যদিও কাজটার মধ্যে ঝুঁকি বেশী।
সাশা কাঁচের জার দু’টোর দিকে তাকিয়ে বলে,
এই এসিড তো এখানে রাখা নিরাপদ নয়। এগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এখান থেকে এসিড যোগাড় করার দায়িত্বই বা কাকে দেয়া যায়?

সাশার কথাগুলো কানসারের অহংকারে ভীষণ লাগে। সে চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে বলে,
আমি যেভাবেই পারি এখান থেকেই এসিড সংগ্রহ করে দেবো। তোমরা চিন্তা করো না। আমি এখনই ঘোড়ার গাড়ী ডেকে আনছি। আজ রাতেই এগুলো নেভা নদীতে ফেলে দেবো।
কানসারের কথায় সাশা লুকাশেভিচের মুখের দিকে তাকায়। লুকাশেভিচ তখন বলে ওঠে,
আমি জানি কানসার, তুমি সেটা পারবে। তা না হলে শেভেরেভ তোমাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দেবে কেনো? ঠিক আছে, তুমি গাড়ী নিয়ে এসো! তবে সাবধানের সাথে যেও!

সে রাতেই তারা তিনজনে মিলে নেভা নদীতে এসিডগুলো ফেলে আসে। কানসার কয়েকদিনের মধ্যে স্টেফিন ভলোকভ নামে একজনকে রিক্রুট করে এবং দু’জনে মিলে সেন্ট পিটার্সবার্গের কয়েকটি দোকান থেকে নাইট্রিক এসিড ছাড়াও বোমা তৈরীর অন্য উপকরণ যোগাড় করতে শুরু করে। সংগৃহীত উপকরণের কিছুটা জড়ো করা হলো গভরুখিনের ইতালিয়ান স্ট্রিটের ভাড়া বাসায়। সেই সাথে সাশার বর্তমান বাসাটি বোমা তৈরীর জন্য যথেষ্ঠ নিরাপদ মনে না হওয়ায় সাশা নতুন জায়গা খুঁজতে থাকে।

সাশার তখন নভোরস্কি নামে এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে। সে বিয়ে করেছিল লিডিয়া আনানিনা নামের একটি ‘নিহিলিষ্ট’ মেয়েকে। লিডিয়ার মায়ের নাম মারিয়া আনানিনা, যিনি পেশায় নার্স। ১৪ বছরের ছেলে নিকোলাসকে নিয়ে শহর থেকে ১০ কিমি উত্তরে পারগোনাভার একটি ‘ডাসা’য়  (বিশেষ ঋতুতে থাকার উপযোগী জায়গা বা দ্বিতীয় আবাস স্থল বিশেষ) তিনি থাকেন। সাশা নিরিবিলি জায়গা খুঁজছে জেনে নভোরস্কি বলে,
শহরের বাইরে হলে তোমার চলবে?
কত দূর?
এখান থেকে দশ কিলোমিটার।
কার বাসা?
আমার শ্বাশুড়ি সেখানে থাকেন।
তুমি আমার কী পরিচয় দেবে?
সাশার এমন প্রশ্নে নভোরস্কি একটু ভাবে।
তোমাকে নিকোলাসের টিউটোর হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিলে কেমন হয়?
সেটা মন্দ নয়। কিন্তু তোমার শ্বাশুড়ির সহযোগিতা ছাড়া আমি কাজটি করবো কিভাবে?
সেটা কোন সমস্যা না। আমি তাঁকে বলবো। তিনি সবরকম সহযোগিতা করবেন। সেটা নিয়ে তুমি ভেবো না।
আমি কিন্তু তাড়াতাড়ি যেতে চাই। আর যাবার আগে জিনিষপত্রগুলো সেখানে পাঠানো দরকার।
তুমি কত তারিখে যেতে চাও?
ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে।
তুমি জিনিষপত্রগুলো আমাকে বুঝিয়ে দিলে আমি সব কিছু ১০ তারিখের মধ্য পৌঁছে দিতে পারবো।
তাহলে তো বিশাল একটা কাজ হয়। সেখানে যাবো কিভাবে?
তুমি এখান থেকে যদি ফিনল্যান্ড রেল ষ্টেশনে যাও তবে ট্রেন ধরে তুমি শুভালভ ষ্টেশনে নামবে। মিনিট দশেক হাঁটলে পারগোনাভা পাবে। সেখানে আমার শ্বাশুড়িকে সবাই মোটামুটি চেনে। তাছাড়া আমি তোমাকে ঠিকানাটা দিয়ে দিচ্ছি।
নভোরস্কি মারিয়া আনানিনার ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে সাশার হাতে দিলো। সাশা ঠিকানাটা একবার ভাল করে চোখ বুলিয়ে কাগজটা ছিঁড়ে ফেললো। ছোট্ট এই বিষয়টি নভোরস্কির ভাল লাগলো।
আমি ১১ই ফেব্রুয়ারি পৌঁছে যাবো। তোমার শ্বাশুড়িকে সব কিছু বলে রেখো।
তুমি কোন চিন্তা করো না।
ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে নভোরস্কি সাশার ল্যাবরেটরির জিনিষপত্র ও কেমিক্যাল তার শ্বাশুড়ীর বাসায় পাঠিয়ে দিল। সাশা ১১ তারিখে মারিয়া আনানিনার বাড়ীতে যখন পৌঁছালো তখন প্রায় সন্ধা। হালকা বরফ পড়ছে। পথে একজনকে মারিয়া আনানিনার কথা বলতেই হাত দিয়ে দেখিয়ে বললো, ‘এই তো কাছেই। বামে মোড় নিয়ে ডান দিকেই একটি ডাসা দেখতে পাবেন তিনি সেখানেই থাকেন। বাড়ীর দরজায় ঠক্ ঠক্ করে দু’বার আওয়াজ করতেই ১৩/১৪ বছরের একটি ছেলে দরজা খুলে দিলো। দেখতে অসম্ভব সুশ্রী ছেলেটিকে সাশা জিজ্ঞেস করলো,
তুমি নিকোলাস?
ছেলেটি মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ে।

ওভারকোটটি খুলতে খুলতে সাশা বলে,
আমার নাম আলেকজান্ডার উলিয়ানভ।
ছেলেটি সাশাকে একবার ভাল করে দেখে নিয়ে হেসে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো,
বুঝেছি। আপনিই আমার নতুন টিচার। আসুন! আমি মাকে ডেকে দিচ্ছি।
ছেলেটি ভিতরে চলে গেলে সাশা ওভারকোটটি দেয়ালে ঝু্ঁলিয়ে রেখে বাইরের ঘরে এসে বসলো। অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। সেই অন্ধকারেও সাশা চারপাশটা একটু দেখে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারিয়া ঘরে ঢুকলেন,
তুমি যে সময় আসবে সেটা নভোরস্কি আমাকে আগেই জানিয়েছিল। আমি সামোভার চড়িয়ে এলাম। একটু চা খাওয়া যাক। চা খেতে খেতেই গল্প করি।

মারিয়ার আন্তরিকতায় সাশা যেন কিছুটা হাল্কা অনুভব করলো।

পরেরদিন বোমা তৈরীর বাকী জিনিষপত্র নভোরস্কি পাঠিয়ে দিলো। তিন দিনেই সাশা সাড়ে তিন পাউন্ড সাদা ডিনামাইট পাউডার ও নাইট্রোগ্লিসারিন তৈরী করে ফেললো। সাশা নাইট্রোগ্লিসারিনের বিপদ সম্পর্কে মারিয়া আনানিনাকে জানালে তিনি নাইট্রোগ্লিসারিনের বোতলগুলো একটি বড় পাত্রের মধ্যে পানিতে ভিজিয়ে রাখলেন।
সাশা ১৪ ফেব্রুয়ারি পারগোনাভা ছাড়ার কথা জানালে মারিয়া তাকে পরামর্শ দিলো তার সাথে ঘোড়ার গাড়ীতে করে সেন্ট পিটার্সবার্গের ট্রেন ধরতে। সেটা তার জন্য একদিকে যেমন সহজ ও সস্তা হবে, অন্যদিকে নিরাপদও। সাশা মারিয়ার সাথে ঘোড়ার গাড়ীতে রওনা দেবার আগে নাইট্রোগ্লিসারিনের অন্য বোতলগুলো তাকে বুঝিয়ে দিল। মারিয়া কিছু বরফ এনে বোতলগুলোর উপর থেকে ঢেকে দিলেন। ঘোড়ার গাড়ীতে উঠার পরই সাশার মনে হলো সে ভুল করে ফেলেছে। ঘোড়ার গাড়ীর ঝাঁকুনি তার সাথে থাকা নাইট্রোগ্লিসারিনের বোতলগুলোর জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। বিষয়টি মারিয়া নিজেও উপলব্ধি করলেন। তাই গাড়ীটা যখন ঘোড়ায় চালিত ট্রাম স্ট্যান্ডে এলো সাশা নেমে পড়ে ট্রাম ধরার জন্য। মারিয়া সাশার ট্রামে উঠা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করলেন। ট্রামটি ছাড়লে তিনি কোচোয়ানকে বললেন, ‘যাও!’

ষোলই ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৭। ইতালিয়ান স্ট্রিট।  বাড়ীর নম্বর ১৮। বাইরে ভীষণ ঠান্ডা। বাড়ীর যে দারোয়ান তার বয়স মনে হয় পঞ্চাশের কাছাকাছি। ময়লা ছেঁড়া-ফাঁটা কয়েকপ্রস্থ কাপড় গায়ে দিয়েও শীতে লোকটি কাঁপছিল। বাড়ীর মুল দরজার কোনায় গুটিশুটি হয়ে বসে শীত নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যেও তার ঘুম পাচ্ছিল। দরজায় ঠক্ ঠক্ আওয়াজে বিরক্তমুখে লোকটি উঠে দাঁড়ায়। ‘এত রাতে আবার কে এলো?’ বিড় বিড় করতে করতে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। দরজা খুলতেই দেখে একটি অপরিচিত ছেলে।

এত রাতে কাকে দরকার?

ওভাটকোট গায়ে, হাতে একটি প্যানকেক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসিপানভ জানতে চায়,

গভরুখিন আছে?

দারোয়ানের এতক্ষণে মনে পড়ে যে গভরুখিন তাকে বলেছিল আজ রাতে তার বাসায় একটা পার্টি আছে। এই সব অল্প বয়সী ছেলে-ছোকরারা এই শীতের রাতেও কেন  যে পার্টি দেয় কে জানে? মনে মনে বিরক্ত দারোয়ান দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে অসিপানভকে ভিতরে যাওয়ার জায়গা করে দিলো। লোকটা চোখ-মুখে ভীষণ বিরক্তি। মনে হয় গোটা দুনিয়ার উপরই সে বিরক্ত। তবে লোকটি বোধ হয় সব থেকে বেশী বিরক্ত বুড়ি বাড়ীওয়ালীর উপর। আর বুড়িটাও হয়েছে এমন! সারাক্ষণ বকাবকি করে। দারোয়ানকে বসতে দেখলেই একটার পর একটা কাজের হুকুম দিতে থাকে। সেই সব হুকুম তামিল করতে করতে দারোয়ান বিড়বিড় করে বলে,‘বুড়িটা মরে না কেন?’।

ঐদিন রাতে দারোয়ানকে আরো কয়েকবার দরজাটা খুলতে হয়েছিল শেভেরেভ, সাশা, ও লুকাশেভিচের জন্য। প্যানকেক পার্টির আড়ালে পহেলা মার্চের অপারেশনের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে তারা জড়ো হয়েছে গভরুখিনের বাসায়। পাশের ঘরেই রাইসা থাকে। তবু আজকের বৈঠকের কথা তাকে জানানো হয়নি।

সবাই এসে পৌঁছালে আনুমানিক রাত ন’টায় খাবার টেবিলটি ঘিরে গভীর মনোযোগে আলাপ করতে থাকে কয়েকজন যুবক। শেভেরেভের এক প্রশ্নের জবাবে অসিপানভ জানালো জারকে হত্যার দিন তিনজন বোমা নিক্ষেপকারীকে সংকেত প্রদানের জন্য তার তিনজন সিগন্যালম্যান লাগবে। বোমা তৈরীর উপকরণ সংগ্রহের কাজ শেষ হওয়ায় কানসার ও গরকুনের সাথে ভলোকভ নামের উনিশ বছরের এক তরুণও সিগন্যালম্যানের দায়িত্ব পালন করবে বলে শেভেরেভ জানালো। পরের দিন শেভেরেভ ইয়াল্টা চলে যাবে। ফলে বৈঠকে গোটা অপারেশনের জন্য লুকাশেভিচকে ভারপ্রাপ্ত নেতা এবং সাশাকে কো-লিডার হিসাবে দায়িত্ব দেবার সিদ্ধান্ত হয়। তারা এটাও সিদ্ধান্ত নিল যে গভরুখিনকে মুল পরিকল্পনার বাইরে রাখা হবে যাতে তাকে কেউ সন্দেহ না করে। গভরুখিন বাইরে থেকে সবরকম সহযোগিতা করবে। অপারেশনের পর অংশগ্রহণকারীদের লুকিয়ে রাখা, বাসা ভাড়া ও প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহের দায়িত্ব দেয়া হলো গভরুখিনকে। একাজের জন্য তার অর্থের দরকার। গভরুখিন টাকার কথা বলতেই শেভেরেভ জানালো এই মুহূর্তে কোন টাকা নেই। তখন একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। শেভেরেভ সাশার দিকে তাকিয়ে বলে,
উলিয়ানভ, তুমি কোন ব্যবস্থা করতে পারো?
সাশা এক মুহূর্ত চিন্তা করে। তারপর বলে,
কত টাকা লাগবে?
গভরুখিন বলে,
প্রাথমিকভাবে ১০০ রুবল হলেই চলবে।
সাশা গভরুখিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
তুমি আগামী ২০ তারিখ সন্ধায় ওয়ারশ ষ্টেশনে আমার সাথে দেখা করো। আমি টাকা যোগাড় করে রাখবো।

সেদিন মিটিং থেকে ফিরে সাশা টাকা যোগাড়ের উপায় খুঁজতে গিয়ে দেখে এত রুবল যোগাড় করার কোন সঙ্গতিই তার নেই। তার কাছে আছে মাত্র দশ রুবল। আন্নার কাছেও টাকা থাকার কোন কারণ নেই। পরেরদিন সন্ধায় নেভেস্কি প্রসপেক্ট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাশা যখন গভীর ভাবনায় মশগুল ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে একটি দোকানের দিকে। বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘সোনা বন্দক রেখে টাকা দেয়া হয়’। চট করে সাশার মাথায় আসে, ‘তাইতো, আমার কাছে তো সোনার মেডেলটা আছে’। সাশা দ্রুত হাঁটতে থাকে। দোকান বন্ধ হবার আগে মেডেলটি নিয়ে আসতে হবে। মেডেল দিয়ে সাশা যখন দোকাটায় ফিরে এলো ততক্ষণে দোকান বন্ধ হবার সময় হয়ে গেছে। তবু মধ্যবয়সী দোকানী দিনের শেষ খরিদ্দারের কাছ থেকে ভাল লাভের আশায় সাশাকে সাদরেই গ্রহণ করে। তবে মেডেলটি বন্দক রেখে দোকানী কোনভাবেই ১০০ রুবলের বেশী দিতে সম্মত হলো না। অগত্যা সাশা ১০০ রুবল ও রসিদটি নিয়ে দোকান থেকে বের হলো। টাকাটা বুক পকেটে রাখলেও রসিদটি সে যত্ন করে ভাঁজ করে তার কোটের পকেটে রাখে। রাত হয়ে গেছে। রাস্তার স্বল্প আলোয় বরফ ছড়ানো রাস্তা ধরে সাশা যতটা দ্রুত সম্ভব বাসায় ফিরতে থাকে। তার লেখাটা এখনো শেষ হয়নি।

১৮ নম্বর ইতালিয়ান স্ট্রিট। সেদিন সকাল প্রায় ১০ টার দিকে বাড়ীওয়ালী বসে আছেন নীচতলায়

জানালার পাশে। এখান থেকে বাড়ীর ভিতরে কে আসছে বা কে বাইরে যাচ্ছে পরিষ্কার দেখা যায়। আকাশ পরিস্কার থাকায় জানালা দিয়ে আসা রোদে বুড়ো শরীরে তিনি কিছুটা উত্তাপ নিচ্ছিলেন। দারোয়ানকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বুড়ির ধারণা দারোয়ানটা মহা ফাঁকিবাজ। বুড়ি এদিক সেদিক তাকাচ্ছিল দারোয়ানের দেখা পাবার আশায়। এমন সময় একটি ঘোড়ার গাড়ী এসে থামে বাড়ীর সামনে। গাড়ী থেকে ২০/২১ বছরের একটি ছেলে নামে কাঁধে একটা কাঠের বাক্স নিয়ে। ছেলেটিকে আগে কখনো দেখেছে বলে বুড়ির মনে পড়ে না। উপরের পাশাপাশি ঘর দু’টিতে দু’জন ভাড়াটিয়া থাকে। ছেলেটি ছাত্র। বেশ মিশুক এই ছেলেটিকে প্রথম প্রথম বুড়ির ভালই লাগতো। কিন্তু অন্য ঘরটি যখন পেশায় নার্স একটি মেয়েকে ভাড়া দিল, বুড়ি দেখলো মেয়েটি ছেলেটিকে আগে থেকেই চেনে। তাদের মেলামেশার ধরণে বুড়ির ক্রমশঃ সন্দেহ হতে থাকে যে তাদের মধ্যে বিশেষ কোন সম্পর্ক আছে। মেয়েটিকে দেখলে বুড়ির বেশ উগ্র লাগে। চুলগুলো ছাঁটা পুরুষের মতো। কেন বাপু? মেয়ে মানুষ তুমি, তোমার চুল বড় রাখতে অসুবিধা কোথায়? তার কিছুদিন পর বুড়ি দেখে মেয়েটির সাথে আরো কিছু ছেলে মেলামেশা করছে। তাদের কারো কারো সাথে মেয়েটি বেশ ঘনিষ্ঠ। বুড়ির মনে ক্রমশঃ এমন সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে যে মেয়েটির চরিত্র বোধ হয় ভাল নয়।

বুড়ি যখন এসব ভাবছিল ঠিক তখুনি দারোয়ান এসে দরজা খুলে দিলো। আজকাল গভরুখিনের কাছে অনেক লোকজন আসে। এর মধ্যে কেউ কেউ আছে যাদেরকে বুড়ি আগে কোনদিন দেখেনি। বুড়ির সন্দেহ হলো বাক্সে কী থাকতে পারে? বুড়ি ঠাঁই জানালার কাছে বসে থাকে। প্রায় অাধা ঘন্টা বাদে ছেলেটির সাথে গভরুখিনকে বের হয়ে যেতে দেখলো। রাইসা নামের মেয়েটি এখনও বাসায়। বুড়ি অস্থির বোধ করতে থাকে। কিন্তু মেয়েটি বাসা থেকে বের না হলে গভরুখিনের ঘরটায় ঢুকা যাচ্ছে না। বাসার টুকটাক কাজের ফাঁকে ফাঁকে কানটা খাড়া করে রাখে। রাইসা কখন বাসা থেকে বের হবে তার জন্য বুড়ি অপেক্ষা করতে থাকে।

রাইসা দুপুরের খাবারের পর বাসা থেকে বের হলো। বাড়ীওয়ালী তক্কে তক্কে ছিল। মুল দরজা দিয়ে রাইসা বের হওয়া মাত্রই বাড়ীওয়ালী সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠে। তার কাছে থাকা চাবিটা দিয়ে সাবধানে গভরুখিনের বাসার তালাটা খোলে। ঘরে ঢুকতেই সিগারেটের গন্ধে তার বমি আসার যোগাড় হয়। হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে বুড়ি গোটা ঘরটি তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কাঠের বাক্সটি দেখতে পেলো না। বুড়ি বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘কোথায় রাখলো? কোথায়?’ কি মনে করে বুড়ি খাটের নীচে উঁকি দিতেই কাঠের বাক্সটি চোখে পড়ে। বুড়ির মুখে হাসি ফোঁটে তবে সাথে সাথে তার মধ্যে প্রচন্ড ভয় কাজ করে। বাক্সে কী থাকতে পারে? একবার ভাবলো দারোয়ানকে ডাকে। কিন্তু নিশ্চিত হবার আগে ডাকাটা ঠিক হবেনা ভেবে বুড়ি মেঝেতে বসে আস্তে আস্তে বাক্সটি টেনে খাঁটের নীচ থেকে বের করে আনতে থাকে। বাক্সটি যথেষ্ট ভারী হওয়ায় এই শীতেও বুড়ি টের পায় তার বুড়ো শরীরে যেন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। বুড়ি আশংকা করছিল বাক্সটিতে তালা মারা থাকতে পারে। কিন্তু বাক্সটি বের করে আনার পর যখন দেখতে পেল কোন তালা নেই বুড়ির মুখে আরেক দফা হাসি ফোঁটে। কিন্তু বাক্সের পাল্লা খুলতেই চোখ ছানাবড়া। সারি সারি কাঁচের বোতল ভর্তি এক ধরণের তরল পদার্থ। বুড়ি ধপ করে পাল্লাটা বন্ধ করে। তাড়াতাড়ি করে বাক্সটি আবার ভিতরে ঢুকিয়ে রাখে। তারপর দরজা বন্ধ করে অনেকটা হাঁপাতে হাঁপাতে রাইসার ঘরের তালা খোলে। রাইসার ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু না পেয়ে বুড়ি সিঁড়ি দিয়ে জোরে জোরে নামতে থাকে। নামতে নামতেই দারোয়ান! দারোয়ান! বলে ডাকতে থাকে। বুড়ির ডাকে বরাবরের মতোই দারোয়ান কোন সাড়া দেয় না। বুড়ির ডাকটা যখন হাঁপানীর মতো করে দারোয়ানের কানে এসে লাগে দারোয়ান তখন সিঁড়ির কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। বুড়ি তখনও বুঝতে পারছিল না কাঁচের বোতল ভর্তি তরল পদার্থগুলো কী হতে পারে? দারোয়ানকে দেখতে পেয়েই বুড়ি ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে,

এক্ষুনি পুলিশকে খবর দাও

দারোয়ান বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে না বুড়ি কী বলছে? দারোয়ানের মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় বুড়ির মাথায় হয়তো ছিট আছে। তাই বুড়ির এমন কথায় সে গা করে না। বুড়ি তখন দারোয়ানের কাছে এসে বলে,

কি কুক্ষণেই আমি এদের কাছে বাড়ীভাড়া দিয়েছিলাম। এরা সাংঘাতিক লোক। তুমি এক্ষুনি পুলিশকে খবর দিয়ে আসো। আমি আর নিতে পারছি না। আমার শরীর খারাপ লাগছে

বুড়ি যেন অনেকটা টলতে টলতে নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে। দারোয়ান বুড়ির ঘরে না ঢোকা পর্যন্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বুড়ি দরজা বন্ধ করতেই দারোয়ান বিড়বিড় করে বলে, ‘বুড়িটা মরে না কেন?’ তারপর আস্তে আস্তে গিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে। বুড়ি যে তাকে পুলিশকে খবর দিতে বলেছে সে কথায় দারোয়ান পাত্তাই দেয় না।

গভরুখিনের বাসা ছেড়ে অন্যত্র যাবার কথা ২০ শে ফেব্রুয়ারি এবং একই দিন সন্ধায় ওয়ারশ ষ্টেশনে

সাশার সাথেও তার দেখা করার কথা। সাশার সাথে তার দেখা হলো ষ্টেশনের শেষ মাথায়, অনেকটা নিরিবিলি একটা কোনায়। সাশা গভরুখিনকে ১০০ রুবল দিয়ে জানতে চাইলো,
তোমার বাসায় এখন কে আছে?
বাসা ফাঁকা। সকালে আদ্রেয়ুশকিন এসেছিল। সে একটা কাঠের বাক্সে বোমা তৈরীর কিছু জিনিষপত্র কয়েকটা বোমা রেখে গেছে।
তুমি সেগুলো কোথায় রেখেছো?
আমার খাটের নীচে।
মনে হয় কাজটি ঠিক হয়নি। তুমি বাসায় নেই, এমতাবস্থায় তোমার বাসায় সেগুলো রাখাটা আমার কাছে নিরাপদ মনে হচ্ছে না। ঠিক আছে আমি তোমার বাসায় যাচ্ছি। ওগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
সাশা দ্রুত ষ্টেশন থেকে বের হয়ে একটি ঘোড়ার গাড়ী ভাড়া করে। গাড়ীতে উঠতে উঠতে গাড়োয়ানকে বলে,

একটু দ্রুত চালাও, ভাই!’

সাশা যখন ১৮ নম্বর ইতালিয়ান স্ট্রিটে পৌঁছালো তখন বেশ কিছুটা রাত হয়েছে। রাইসা ঘরে ফিরেছে ঘন্টাখানেক আগে। সেই যে বুড়ি দরজা বন্ধ করেছে বুড়ির আর কোন খবর নেই। দারোয়ান শুয়ে পড়বে কিনা ভাবছিল। এমন সময় সাশা এসে দরজায় ঠকঠক শব্দ করতেই বরাবরের মতোই বিরক্ত মুখে যায় দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই সাশাকে দেখে দারোয়ান খুশী হলো। সাশা ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে এক হাত দারোয়ানের কাঁধে রেখে জিজ্ঞেস করে ,

কি খবর, সব ভালোতো?

রাইসা এবং গভরুখিনের বন্ধুদের মধ্যে এই ছেলেটিকে দারোয়ানের খুব ভাল লাগে। যখনই আসে হাসি মুখে কুশল জানতে চায়। কোন অহংকার নেই। দারোয়ান কোন উত্তর না দিয়ে হাসে। সাশা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে। দারোয়ান গিয়ে শুয়ে পড়ে। সাশা রাইসার দরজায় গুনে গুনে তিন বার শব্দ করে। একটু পরেই রাইসা এসে দরজা খুলে সাশাকে দেখেই আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরে। সাশা রাইসার আলিঙ্গনাবস্থায় ভিতরে ঢোকে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে নিজেই দরজা বন্ধ করে।

রাইসা, তোমার কাছে গভরুখিনের ঘরের চাবি আছে?

রাইসা একটু থমকে দাঁড়ায়। সাশাকে কেমন যেন  গম্ভীর ও অস্থির লাগছে। কোন বিপদ? নিজেকে তাই সামলে নিয়ে সে উত্তর দেয়,

হ্যাঁ, আজ সকালেই সে রেখে গেছে।

চাবিটা নাও আর আমার সাথে এসো। সাবধানে তালা খুলতে হবে যাতে কোন শব্দ না হয়।

কী ব্যপার বলো তো? কী হয়েছে?

পরে বলছি। আগে এসো আমার সাথে

সাশার কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে রাইসা কথা না বাড়িয়ে চাবি নিয়ে খুব সাবধানে গভরুখিনের ঘরের তালা খোলে। ভিতরে ঢুকে সাশা নিজেই দরজাটা বন্ধ করে। তারপর দ্রুত খাটের কাছে গিয়ে বসে পড়ে একটা বাক্স টেনে আনে। রাইসা কিছু বুঝতে না পারলেও নিঃশব্দে সাশাকে অনুসরণ করছিল। সাশা পাল্লাটা উঠিয়ে ভাল করে দেখে নিল। রাইসা শুধু কিছু বোতল দেখতে পেলো। সাশা বললো,

তুমি অন্য পাশটা উঁচু করে ধরো। যেন কোনরকম শব্দ না হয়।

রাইসা ততক্ষণে কিছুটা অনুমান করে ফেলে। ফলে কোন কথা না বলে সে হাত লাগায়। আস্তে করে দরজাটা খুলে বাক্স নিয়ে তারা রাইসার ঘরে ঢোকে। ধরাধরি করে বাক্সটি নিয়ে রাইসার খাটের নীচেই রাখে। সাশা রাইসাকে বলে,

যাও, গভরুখিনের ঘরটা বন্ধ করে এসো

রাইসা মাথা নেড়ে চলে যায় আদেশ পালন করতে। ফিরে এসে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। সাশা ততক্ষণে রাইসার ঘরের এক পাশে রাখা ছোট্ট সোফাটায় গিয়ে বসেছে। রাইসা এসে তার পাশে বসতেই সাশা বলে,

তুমি নিশ্চয় অনুমান করতে পারছো যে বাক্সের ভিতর কী আছে?

বোমা?

হ্যাঁ

বোমাগুলো বাসায় নিরাপদ নয়। এই রাতে আমি এগুলোকে নিরাপদ কোথাও সরাতেও পারবো না। আজ রাতে বোমাসহ আমি এখানে থাকতে চাই। তোমার কোন আপত্তি নেই তো?

সাশার একথায় রাইসার মনে মনে খুব খুশী হয়। তার আপত্তি করার তো প্রশ্নই ওঠে না। সে যখন প্রথম এই গোপন গ্রুপটির সাথে জড়িয়ে পড়েছিল তখনই শপথ নিয়েছিল সে কোন দিন বিয়ে করবে না। কোন পুরুষের সাথে কোন সম্পর্কে জড়াবে না। গ্রুপের অন্যদের মধ্যে গভরুখিনকে তার ভাল লেগেছিল। সেই ভাললাগাটা ক্রমশঃ ভালবাসা আকারে তার মধ্যে জেঁকে বসতে চেয়েছিল। নিজের শপথের কথা নিজেও ভুলে যেতে বসেছিল। ঠিক সে সময় সাশার সাথে তার পরিচয়। পরিচয়ের পর থেকে সে সাশার প্রতি প্রবল আগ্রহবোধ করতে থাকে। সাশার অজান্তেই সে যেন রাইসাকে গভরুখিনের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে রক্ষা করে। কিন্তু একই সাথে রাইসা সাশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাইসা যে সাশাকে প্রচন্ড পছন্দ করে সেটা তাকে দেখে অনেকেই বুঝতে পারে। সাশাকে দেখলে রাইসার বুক ধকধক করে। সাশার হাসি, সাশার কথা বলার ভঙ্গি সবকিছু তাকে চুম্বকের মতো টানতে থাকে। ‘সাশা কি তার মনের অবস্থাটা বোঝে?’ কথাটা রাইসা প্রায় ভাবে। কিছুদিন ধরে সাশা ভীষণ ব্যস্ত। দেখা হয় না অনেকদিন। রাইসা ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়েছিল। আজ তাই সাশাকে দেখে নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে প্রবল আবেগে সাশাকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু তার মনের এমন অবস্থা নিয়ে সাশার সাথে তার কথা বলার কোন সুযোগ হয়নি। আজ রাতে সাশা এখানে থাকবে শুনে ভিতরে ভিতরে রাইসা অস্থির হয়ে পড়ে। সে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু তার কথাগুলো সাশাকে বলা দরকার। মনের এমন ভার তার পক্ষে আর বয়ে বেড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। চাপা আনন্দে, খুশীতে রাইসা তাই সাশার দু’হাত চেপে ধরে বলে,

আপত্তি করবো আমি? তুমি আমার এখানে থাকবে তো আমার পরম সৌভাগ্য। তোমাকে বলার যে কত কথা আছে! আজ তোমাকে সব কথা বলতে চাই

সাশা রাইসার কথা বলার ধরণে একটু অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকায়। রাইসার মুখের দিকে তাকিয়ে সাশার নিজের বুকের মধ্যেও যেন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। যেটা সে কখনো ভাবেনি, চিন্তা করেনি তেমন একটা সম্ভাবনা দেখে নিজেও যেন অবাক হয়। সে জানে তার জীবনের লক্ষ্য এখন একটাই। সেই লক্ষ্যপূরণ ব্যতীত তার অন্য কোন আকাঙ্ক্ষা নেই। যেদিন থেকে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে জারকে হঠাতে হবে সেদিন থেকেই সে চেরনিশেভস্কির অসাধারণ সৃষ্টি ‘রাখমেটভ’কে তার জীবনের আদর্শ হিসাবে মেনে নিয়েছে। প্রেম, বিয়ে, সংসার, ক্যারিয়ার সব তাই নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু আজ তার এমন হলো কেন? বুকের ভিতরে একটা চিনচিন ব্যথা, মনের মধ্যে একটা গভীর আনন্দ কেন বয়ে যাচ্ছে? সাশার মনে হলো এই ফেব্রুয়ারির শেষেও যেন ঘরের ভিতর বসন্ত ঢুকে পড়েছে। রাইসার জন্য নিজের মনে এমন একটা জায়গা তৈরী হয়ে আছে সাশা আগে কখনো খেয়াল করেনি তো? রাইসার কথাটা তাই সাশাকে ভীষণ রকম স্পর্শ করে। রাইসা সাশার হাত ধরেই বলে,

তোমার রাতে নিশ্চয় খাওয়া হয়নি? আমিও খাইনি। তুমি হাতমুখ ধুয়ে ফেলো, আমি খাবারের ব্যবস্থা করি। খাওয়া শেষে আমরা গল্প করবো

সাশা রাইসার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে। রাইসা সাশার হাসিতে যেন সম্মতি দেখতে পায়। সে সোফা থেকে উঠে গেলে সাশা নিজের মনের এমন অনুভূতিটা নিয়ে ভাবতে থাকে। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে তার বাসায় সে ফেয়ারওয়েল পার্টি দিচ্ছে। সে কথাটা রাইসা এখনও জানে না। পহেলা মার্চ কী হবে সাশা এখনও নিশ্চিত নয়। তারা ধরা পড়তে পারে, তাদের মৃত্যুদন্ড হতে পারে। হতে পারে নির্বাসন। একজনের সাথে আরেকজনের আর কখনো দেখা নাও হতে পারে। ঝড়ের পাখির মতো যে জীবন সে বেছে নিয়েছে এমন জীবনে ভালবাসা, প্রেম নিশ্চিতভাবেই বিলাসিতা। এসব ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ আগে নিজের মনের নরম জায়গাটিকে সে যেন শক্ত করে তোলে। রাইসা এসে তাড়া দিলে সে হাতমুখ ধুঁয়ে খেতে বসে। খাওয়া শেষ হলে রাইসা বলে,

তুমি বিশ্রাম করো, আমি হাতের কাজগুলো শেষ করে আসছি

সাশা কথা না বাড়িয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়। তার ঘুম পায়। ভীষণ ঘুম। সে ঘুমিয়ে পড়ে। রাইসা সব কিছু গুছিয়ে নিজেও একটু তৈরী হয়ে বিছানার কাছে এসে দেখে সাশা ঘুমাচ্ছে। সাশার মুখের দিকে তাকিয়ে রাইসার মনে হলো সাশা বোধ হয় বহুদিন এমনভাবে ঘুমায় না। একবার ভাবলো সাশাকে জাগায়। তার কথাগুলো বলা খুব জরুরী। কিন্তু সাশার মুখের দিকে তাকিয়ে তার খুব মায়া হলো। আবার একই সাথে তার মনে হলো খাটের নীচে বোমা রেখে যে মানুষটি এমন গভীরভাবে ঘুমাতে পারে, নিজের মানুষিক অস্থিরতা দূর করতে সেই মানুষটিকে কী চাইলেও জাগানো যায়? সাশা ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রাইসার মনে সাশাকে প্রথম যেদিন দেখেছিল তাকে দেখতে যেন দস্তয়েভস্কির উপন্যাস থেকে উঠে আসা কোন চরিত্র মনে হয়েছিল। আর এই মুহূর্তে রাইসার মনে হলো সাশা যেন চেরনিশেভস্কির ‘কী করিতে হইবে?’ উপন্যাসের ‘রাখমেটভ’। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলোটা নিভিয়ে রাইসা শুয়ে পড়ে।

সূর্য ওঠার অনেক আগেই সাশার ঘুম ভাঙে। ঘরে কোন আলো নেই। জানালা দিয়ে কৃষ্ণ পক্ষের চাঁদের আলো আসছে। আলোটা ঠিক যেন রাইসার মুখের উপর এসে পড়েছে। চাঁদের আলোয় রাইসার মুখটি সাশার কাছে যেন অপার্থিব লাগে। সাশা রাইসার মুখের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে। রাইসা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সাশার খুব ইচ্ছে করে রাইসাকে ছুঁয়ে দেখে। নিজের মুখটা অনেকটা নামিয়ে এনে রাইসার কপালে আলতো করে একটা চুমু দেয়। সেই আলতো স্পর্শে রাইসা পাশ ফিরে শোয়। তার পাশ ফিরে শোয়াটা সাশা মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। তারপর সাশা খাট থেকে আস্তে করে নামে। কোন শব্দ না করে জুতোটা পায়ে লাগায়। খাটের নীচ থেকে আস্তে আস্তে বাক্সটা টেনে দরজার কাছে নিয়ে আসে। ছিটকিনি খুলতে গিয়ে অল্প একটু শব্দ হলো। সাশা ভেবেছিল রাইসা বোধহয় উঠে যাবে। কিন্তু না, রাইসা আবার অন্যপাশ ফেরে। সাশা দরজার বাইরে বাক্সটি বের করে আস্তে করে দরজাটি টেনে দেয়। বাইরে তখনও সূর্য ওঠেনি। কৃষ্ণ পক্ষের চাঁদ তখনও আকাশে। ভোরের আলোয় শিশির ভেজা পথ ধরে ভারী কাঠের বাক্সটি কাঁধে নিয়ে সাশা নিজোর বাসার দিকে যেতে থাকে।

সাশা বাসায় পৌঁছানোর পরপরই সূর্য ওঠে। সাশার ঘরে লুকাশেভিচ তখনও ঘুমাচ্ছে। সাশা হাতমুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে। রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনের সারসংক্ষেপ ও জার হত্যার কেন জরুরী এই বিষয়ে তার খসড়া লেখাটা চূড়ান্ত করতে শুরু করে। আটটার দিকে সাশা লেখাটা শেষ করে। লুকাশেভিচ ইতোমধ্যে উঠে পড়ে। সকাল দশটা নাগাদ সাশার বাসা থেকে বোমা নিতে আসে কানসার ও ভলোকভ। তাদের দায়িত্ব হলো বোমাগুলো যারা ছুঁড়বে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তারা এসে দেখে সাশা ও লুকাশেভিচ তখনও বোমা তৈরী করছে। তারা অপেক্ষা করতে থাকে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সাশা ও লুকাশেভিচ কাজ শেষ করে বোমাগুলো তাদের বুঝিয়ে দিয়ে সাশা বলে,

এই যে বড় বোমাটা এটা পৌঁছে দেবে আন্দ্রেয়ুশকিনকে। আর এই যে বই বোমা (বইয়ের ভিতরে বোমা) এটা অসিপানভকে পৌঁছে দেবে। আর এই মাঝারী আকারের বোমাটা জেনারেলভকে দেবে

একই সাথে তাদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য পিস্তল ও পটাশিয়াম সায়ানাইড দিলো। জিনিষগুলো বুঝে নিয়ে তারা চলে গেলে ক্লান্ত সাশা বিছানায় শুয়ে পড়ে।

বাইশে ফেব্রুয়ারি। রবিবার। মিখাইলোভস্কি ষ্ট্রীটের বাতিগুলো জ্বলছে টিম টিম করে। এই রাস্তায় বেশ কয়েকটা রেস্তোরাঁ আছে। এর মধ্যে ক্যাঁফে পলোনাইস কিছুটা অভিজাত এবং পরিবেশটাও নিরিবিলি।  নিরালায় কথা বলার জন্য রেঁস্তোরাটা আদর্শ। এই ক্যাঁফের একেবারে কোনায় একটি টেবিলে বসে আছে তিনজন যুবক। টেবিলের মাঝখানে গরম স্যুপের পাত্র। প্রত্যেকের সামনে চীনা মাটির তৈরী স্যুপের বাটি। তবে কেউ যদি ভাল করে খেয়াল করে দেখে তবে দেখতে পাবে তাদের মুখ যতটা সরব স্যুপের পাত্রের চামচ ততটা সচল নয়। তিনজনের মধ্যে যে বেশী কথা বলছে তার নাম অসিপানভ। অন্য দু’জনের একজনের নাম আন্দ্রেয়ুশকিন, অন্যজন জেনারেলভ। প্রথমবারের মতো আজ তারা একত্রিত হয়েছে আসন্ন অপারেশনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে। জারের উপর কোথায় হামলা করা হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে তারা সম্ভাব্য দু’টো জায়গা মনোনীত করে। প্রথম পছন্দ নেভেস্কি প্রসপেক্ট ও ক্যাথেরিন ক্যানেলের সংযোগ স্থল। দ্বিতীয় পছন্দ বলশয়া শেভেভায়েত। আলোচনা শেষে অসিপানভ বলে,

পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হতে পারে। এমন কি দিন এবং সময়ও। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো আগামী ২৫ তারিখ। আমরা কানসার গরকুনের ওখানে সন্ধায় মিলিত হবো

অসিপানভের কথা শেষ হলে অন্য দু’জন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তারা ক্যাঁফে থেকে বের হয়।

তেইশে ফেব্রুয়ারি। সোমবার। আন্না ক্লাস শেষে বাসায় ফেরে দুপুরবেলা। খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে ভাবছিল সেই ফেব্রুয়ারির ২ তারিখের পর সাশার সাথে আর দেখা হয়নি। মার্কের কাছে আন্না শুনেছে সাশা ইদার্নিং বিশ্ববিদ্যালয়েও যায় না। সাশা কী নিয়ে ব্যস্ত? সাশা কী রাজনীতিতে বেশী জড়িয়ে পড়েছে? আন্না গত সপ্তাহে মায়ের চিঠি পেয়েছে। মা সাশার পড়াশুনা এবং অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়ায় উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন। সাশা ইদার্নিং বাড়ীতে চিঠি লেখে না সে কথা জানিয়ে মা লিখেছেন, ‘সাশাকে নিয়ে আমাকে এমন উদ্বিগ্ন হতে হবে  কোনদিন ভাবিনি মা আন্নাকে আরো লিখেছেন সাশা যত দ্রুত পাশ করে সংসারের হাল ধরে ততই মঙ্গল। বাবার অবর্তমানে মা কিভাবে সব সামলাচ্ছে তার বিস্তারিত বিবরণ পড়তে পড়তে আন্নার চোখে পানি চলে এসেছিল। আন্না সাশার সাথে কথা বলতে চায়। সে এর মধ্য দু’দিন সাশার খোঁজে তার বাসায় গিয়েও পায়নি। শেষবার অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও তাকে না পেয়ে একটি চিরকুট লিখে আসে। সাশা কী চিরকুটটি পায়নি? নাকি ব্যস্ততার কারণে আসতে পারছে না? এসব ভাবতে ভাবতে আন্নার একটু তন্দ্রাভাব আসে। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ। আন্না উঠে দরজা খুলতেই দেখে সাশা দাঁড়িয়ে আছে। আন্না চমকে ওঠে। একি চেহারা হয়েছে সাশার! আন্না সাশার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে আসে। সোফার উপর পাশাপাশি বসেও আন্না সাশার হাত ছাড়ে না। সাশার হাতের উপরে হাত বুলাতে বুলাতে আন্না জিজ্ঞাসা করে,

একি চেহারা হয়েছে তোমার? কী হয়েছে সাশা?

সাশা মুখে মলিন একটা হাসি। জানতে চাইলো,

অ্যানিউটা, তুমি কেমন আছো?

আন্না সাশা দিকে চেয়ে মাথা নাড়ে। আন্নার যেন কান্না পায়। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে প্রশ্ন করে,

সাশা, চা খাবে?

সাশা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে আন্না রান্না ঘরে ঢোকে। চুলায় সামোভার চড়িয়ে আন্না ভাবে কি সাশা কি হয়ে গেলো? আন্না বোঝে না তার কী করা উচিত? মায়ের চিঠিটা সাশাকে পড়তে দেবে? তাতে কী কোন কাজ হবে? সাশা কী তার পথ থেকে ফিরে আসবে? তবু আন্নার মনে হলো মায়ের চিঠিটা সাশাকে একবার পড়তে দেওয়া যেতে পারে। পানি গরম হচ্ছে। আন্না তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে চিঠিটা বের করে সোফার দিকে তাকিয়ে দেখে সাশা সোফার উপর ঘুমিয়ে পড়েছে। আন্নার দেখে এত মায়া লাগে! সাশাকে না ডেকে সে আবার রান্না ঘরে ঢোকে।

সাশা তখনও ঘুমাচ্ছে দেখে ঘন্টা দুয়েক পরে আন্না সাশাকে ডেকে তোলে। সাশার হাতে চায়ের কাপটা এগিয়ে দেয়। সাশা হাতটা বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিলে আন্না আরেক হাত দিয়ে মায়ের চিঠিটা সাশার দিকে এগিয়ে দিলে সাশা প্রশ্ন করে,

এটা কী?

মায়ের চিঠি

সাশা চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে দু’হাত দিয়ে চিঠিটি খুলে পড়তে শুরু করে।

চিঠিটা পড়ে সাশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার চেহারাট করুণ হয়ে ওঠে। তারপর হঠাৎ হাঁটুর উপরে হাত দুটো রেখে মাথাটা দু’হাতের মুঠিতে চেপে ধরে। আন্না যেন সাশার মধ্যে সাময়িক একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে। কিন্তু সেটা সাময়িকই। পরক্ষণেই সাশা চোখ-মুখ শক্ত করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সাশাকে উঠতে দেখে আন্নাও উঠে দাঁড়ায়। সাশা কিছুক্ষণ আন্নার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাশার দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যা দেখে আন্নার বুকটা ধক করে ওঠে। আন্নার মনে হলো সাশার সাথে বোধ হয় অনেকদিন দেখা হবে না। আন্না নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো। সে দু’হাতে সাশাকে জাপটে ধরে হু হু করে কেঁদে ফলে। সাশাও তাকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখে।

পঁচিশে ফেব্রুয়ারি। কানসার ও গরকুনের বাসায় একে একে জড়ো হয় সাশা, লুকাশেভিচ, অসিপানভ, আন্দ্রেয়ুশকিন, জেনারেলভ ও ভলোকভ। ডাইনিং টেবিল ঘিরে সবাই বসে। অসিপানভ বোমা হামলার স্থান, সময়, এবং কার কী দায়িত্ব সে বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখে। তার বক্তব্য শেষ হলে সাশা বোমা হামলার রাজনৈতিক কারণটি কী এবং জার হত্যা কেন জরুরী সে বিষয়ে তার লেখা বৈজ্ঞানিক ব্যাখাটি পড়ে শোনালে সবাই সমস্বরে তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করে। তারপর ধরা পড়লে পুলিশ বা আদালতে কী বলতে হবে সে বিষয়ে সাশা একটা গাইডলাইন দেয়। একই সাথে সাশা সবাইকে ২৮ শে ফেব্রুয়ারি রাতে তার বাসায় ‘ফেয়ারওয়েল’ পার্টিতে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানায়।

কিন্তু ছাব্বিশ তারিখ সকালে অসিপানভ  খবর পেলো যে জার আজ বের হচ্ছে। বোমা হামলার নেতা হিসাবে অসিপানভ সবাইকে দ্রুত নেভেস্কি প্রসপেক্টের সেন্ট আইজাক ক্যাথার্ডালের কাছে জড় হবার নির্দেশ দেয়। দিনটি ছিল জার দিবস। বোমা হামলাকারী তিনজন নির্দিষ্ট স্থানে জড় হবার পর দেখে পুলিশ পুরো এলাকাটা ঘিরে রেখেছে। তাতে অসিপানভের ধারণা দৃঢ় হয় যে তাদের সোর্সের তথ্য সঠিক এবং জার এখানে এসেছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও জারের কোন দেখা না পেয়ে অসিপানভ এগিয়ে গিয়ে এক পুলিশের কাছে জানতে চাইলো,

মহামান্য জার কি এসেছেন?

পুলিশটি মাথা নাড়ে। যা দেখে অসিপানভ নিশ্চিত হয় যে জার সত্যিই এসেছে। তারা সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করার পরও যখন জারের কোন দেখা মেলে না তখন অসিপানভ বুঝতে পারে যে তার সোর্সের খবর সঠিক ছিল না। সেদিন তারা ফিরে যায়। তাদের দরকার নিশ্চিত খবরের। সাশা ও লুকাশেভিচের সোর্স  নিশ্চিত করে যে পহেলা মার্চ জার সেন্ট পল দূর্গে যাবেন জার দিবস উপলক্ষ্যে বক্তব্য রাখতে। একই সাথে সোর্স জারের গাড়ীর রুটও নিশ্চিত করে। ফলে অসিপানভ তার টিমকে নির্দেশ দেয় ২৮ শে ফেব্রুয়ারি রেকি করার জন্য।

সাতাশে ফেব্রুয়ারি। গরোখোভায়া স্ট্রিট। সেন্ট পিটার্সবার্গ পুলিশ প্রধানের কার্য্যালয়। পাঁচটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকী। পুলিশ প্রধান গ্রেসার বসে আছেন তার অফিসে। তার চেয়ারের পিছনে জার আলেকজান্ডার নিকোলাসের বিশাল একটি ছবি ঝুঁলানো। তিনি সামনের দেয়ালে ঝুঁলানো ঘড়ির দিকে একবার তাকালেন। তিনি বের হবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন সময় তার পিএস ঢুকলো কিছুটা হন্তদন্ত হয়ে। গ্রেসার ভ্রু কু্ঁচকে পিএসের দিকে তাকাতেই সে হাত বাড়িয়ে একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো,

-এই মাত্র ‘ব্ল্যাক অফিস’ থেকে টেলিগ্রামটি এসেছে।

গ্রেসার বাম হাতে টেলিগ্রামটি নিয়ে একবার দ্রুত চোখ বুলালেন। তার চোখ-মুখ বেশ শক্ত হয়ে গেলো। তিনি চেয়ারে বসে পড়ে আবার টেলিগ্রামটি গোড়া থেকে পড়তে শুরু করেন।

জানুয়ারির ২০ তারিখে আন্দ্রেয়ুশকিন খারকিভ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার এক বন্ধু ইভান প্লাটোনভিচ নিকিটিনকে একটি চিঠি লিখেছিল। জার আলেকজান্ডার-২ হত্যাকান্ডের পর স্বরাষ্ট্র  মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয় নাগরিকদের চিঠিপত্র পরীক্ষা করে দেখার জন্য ‘ব্ল্যাক অফিস’ নামের যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তাদের হাতে আন্দ্রেয়ুশকিনের সেই চিঠিটি পড়ে। চিঠিতে রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ধাঁচের লড়াইয়ের সম্ভাবনা নাকচ করে সে চিঠির এক জায়গায় লিখেছিল,

“…… রাশিয়ায় জার্মানী ধাঁচের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট আন্দোলন সম্ভব নয়। যেটা সম্ভব সেটা ক্ষমাহীন সন্ত্রাস, এবং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি নিকট ভবিষ্যতে সেটাই ঘটতে যাচ্ছে; আমি বিশ্বাস করি যে বর্তমানে এই আপাত শান্তভাব ঝড়ের পূর্বাভাস মাত্র….”

চিঠিটি ব্ল্যাক অফিসের হাতে পড়লেও চিঠির নীচে কোন স্বাক্ষর না থাকায় তারা নিশ্চিত হবার জন্য খারকিভের ব্ল্যাক অফিসের সাহায্য চায়। খারকিভ অফিস সময় নেয়। আজই তারা নিশ্চিত করে সেন্ট পিটার্সবার্গ অফিসে জানায় যে চিঠিটি আন্দ্রেয়ুশকিনের লেখা। ব্ল্যাক অফিস তাই টেলিগ্রামে পুলিশ প্রধানকে অনুরোধ করেছে আন্দ্রেয়ুশকিনকে ফলো করার জন্য। গ্রেসার সংগে সংগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ফোন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করলেন।

আটাশে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় জেনারেলভ তার বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে যায় আন্দ্রেয়ুশকিনের বাসায়। সেখান থেকে সাড়ে ১০ টায় তারা দু’জন বেরিয়ে পড়ে। আন্দ্রেয়ুশকিন ও জেনারেলভ দু’জনেই ‘সিলিন্ডার বোমা’ তাদের কোটের পকেটে নিয়ে বের হলো। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে তারা হাঁটতে থাকে। কথা মত তারা এসে উপস্থিত হয় নেভেস্কি প্রসপেক্ট ও মালায়া মরস্কয়ারের কোনায়। সেটা পুলিশ ব্রীজের খুব কাছে। তারা যখন সেখানে জড়ো হয়, প্রায় ২০০ গজ দূর থেকে সাদা পোষাকে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের ফলো করতে শুরু করে। সেখানে ‘বই বোমা’ নিয়ে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল অসিপানভ। যে পুলিশ অফিসারটি তাদেরকে ফলো করছিল সে এখন তিনজনকেই চিহ্নিত করে । সেখানে উপস্থিত সাদা পোষাকের অন্য পুলিশের লোকগুলো তখন আলাদা আালাদা করে তিনজনের উপর নজরদারি শুরু করে। রেকি শেষে তিনজন আলাদা আলাদাভাবে স্থান ত্যাগ করলেও সাদা পোষাকের পুলিশ তিনজনকেই ফলো করতে শুরু করে।

আটাশে ফেব্রুয়ারি রাতে সাশার বাসায় ‘ফেয়ারওয়েল পার্টি’ শেষ হতে অনেক রাত হয়ে গেলো। সেই পার্টিতে একটি মাত্র নারী উপস্থিত ছিল। যার নাম রাইসা। রাত বেশী হওয়ায় সাশা তাকে রাতটা তার বাসায় কাটাতে বলায় রাইসা খুব খুশী হয়। সবাই একে একে চলে গেলে সব কিছু গুছিয়ে তারা যখন সোফায় এসে বসে রাত তখন ১২ টা। বাইরে অন্ধকার। জানালা ও দরজার ফোকর গলিয়ে ঠান্ডা বাতাসের কিছুটা এসে ঘরে ঢুকছে। রাইসার ঠান্ডা লেগেছে বুঝতে পেরে সাশা বলে,

পা গুটিয়ে সোফায় আরাম করে বসো!

পা দু’টো ভাজ করে সোফায় গুটিশুটি হয়ে বসে রাইসা তার হাতটি দিয়ে সাশার বাম হাতের আঙুল গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে নিজের মাথাটা সাশার কাঁধে এলিয়ে দিয়ে আস্তে করে বলে,

সাশা, তোমরা যদি ধরা পড়ো তাহলে কী হবে?

সাশা নিজেও রাইসার আঙুলগুলোয় আস্তে আস্তে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

তুমি যাকে হত্যা করতে চাও, ব্যর্থ হলে তুমি তোমার শত্রুর কাছ থেকে কী আশা করো?

মৃত্যুদন্ড?

সেটাই তো স্বাভাবিক, রাইসা

সাশার একথায় রাইসা সাশার কাঁধ থেকে মাথাটা সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে সাশার দিকে ঘুরে বসে।

তোমার মৃত্যুদন্ড হবে? আমি চিন্তাও করতে পারি না

সাশা রাইসার দিকে না তাকিয়েই বলতে থাকে,

-’এ আমার রোদিনারাইসা। কথার অর্থ তুমি জানো। দেশকে, মাতৃভূমিকে যখন তুমি সত্যিই ভালবাসবে তখন সেই দেশকে সেবা করা তোমার প্রথম কর্তব্য হয়ে পড়ে। মাতৃভূমির প্রতি তোমারআমার, আমাদের সকলের একটা দায়িত্ব আছে। পরিবার, মা, বাবা, ভাই, বোন সব কিছুর উপরে এইরোদিনা তুমি যখন নিজের মধ্যে এইরোদিনাঅনুভব করবে তোমার তখন মনে হবে এসবের থেকেও দেশ, সমাজ অনেক বড়। সমাজের চাওয়া পূরণ না হলে ব্যক্তির নিজের চাওয়াও পূরণ হতে পারে না। তুমি যখন বুঝবে সমাজের চাওয়াটা আর তোমার চাওয়াটা এক অভিন্ন, তখন তোমার সেই চাওয়াটা, আর তোমার রোদিনা  এক বিন্দুতে এসে মিলে যাবে। এইরোদিনাতখন তোমাকে নিজের মধ্যে দগ্ধ করতে থাকবে। আর তখনই কেবল সব কিছুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত মনে হবে। নিজের জীবন সেখানে তুচ্ছ বৈ অন্য কিছু নয়। আমি সব কিছুর জন্য প্রস্তুত, রাইসা

রাইসা এতক্ষণ সাশার মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছিল। সাশার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সে সাশার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সাশাকে পাগলের মতে চুমু দিতে থাকে। সাশা বাঁধা দেয় না। নিজেও রাইসার আবেগের সাথে একাত্ব হয়ে পড়ে। এক সময় তারা শান্ত হয়। সাশার বুকে মাথা রেখেই রাইসা প্রশ্ন করে,

তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি কী নিয়ে বাঁচবো, সাশা?

সাশা রাইসার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

তুমি বাঁচবে স্বপ্ন নিয়ে। আমার জন্য কোন কিছুই থেমে থাকবে না। এই যে বিপ্লব, আমরা ব্যর্থ হলেও অন্য কেউ সেটা ঠিকই এগিয়ে নেবে। তোমার জীবনও থেমে থাকবে না। আমাকে যদি ভালবেসেই থাকো তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবে?

সাশার বুকে মাথা রেখেই রাইসা প্রশ্ন করে,

কী?

আমার কিছু হয়ে গেলে সেটা মৃত্যুদন্ড হোক আর  নির্বাসনই হোক; যাই হোক না কেন তুমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করবে। নতুন কাউকে ভালবাসবে। নতুন করে স্বপ্ন দেখবে। জীবনকে থামতে দেবে না!

রাইসার চোখে তখন পানি। সে সাশাকে জোরে জাপটে ধরে বলে,

আমি পারবো না

সাশা রাইসার মুখটা ডান হাত দিয়ে তুলে ধরে তার চোখে চোখ রেখে বলে,

তোমাকে পারতেই হবে। তা না হলে আমাদের এত চাওয়া সব ব্যর্থ হবে। জীবনের আহ্বানকে অস্বীকার করে জীবন থেকে পালানোর জন্য আমরা বিপ্লব চাচ্ছি না

সেই রাতে গল্প করতে করতে সোফার উপরে সাশার বুকের উপরেই রাইসা একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। রাইসার যখন ঘুম ভাঙে দেয়াল ঘড়িতে সময় তখন দশটা। সোফা থেকে ধড়মড় করে উঠে বসে সে সাশাকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু সাশাকে কোথাও দেখতে পায় না। টেবিলের উপর ছোট্ট একটি চিরকুট খুঁজে পায়। লেখা ‘আমাকে বের হতে হচ্ছে। তালাটা খুলে রেখে গেলাম। যাবার আগে লাগিয়ে দিও কোন সম্বোধন নেই, নাম নেই। রাইসা তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসে। কিন্তু কী যেন মনে করে রাইসা নিজের বাসার পথ না ধরে আন্নার হোষ্টেলের পথ ধরে।

পহেলা মার্চ।  সকাল ১০টা। আন্দ্রেয়ুশকিন নিজের বাসা থেকে বের হলো। তার গন্তব্য জেনারেলভের বাসা। বোমা ছাড়াও তার পকেটে একটি পিস্তল এবং পিস্তলে ৬টি বুলেট আছে। গলি থেকে বের হবার মুখে একটা রুটির দোকান আছে। সেখানে একটা লোককে দোকানদারের সাথে কথা বলতে দেখলো। আদ্রেয়ুশকিন সেদিকে ভাল করে না তাকিয়েই হন হন করে হাঁটতে শুরু করে। জেনারেলভের বাসা থেকে দু’জন বের হলো সাড়ে দশটায়। তারা যখন নেভেস্কি প্রসপেক্টে এসে ওঠে তখন গলির মুখের সেই লোকটিকেই আন্দ্রয়ুশকিন আবার দেখতে পায়। কিন্তু আগের মতই সে বিষয়টি পাত্তা দিল না। তারা যখন নেভেস্কি প্রসপেক্ট এবং এ্যাডমাইরালিটি স্কোয়ারের কোনায় পৌঁছালো তখন পুলিশের একজন এজেন্ট তাদেরকে পথরোধ করে। আশে পাশে তাকাতেই আরো কয়েকজন তাদের ঘিরে ধরে। তারা বাঁধা দেবার বা পালাবার কোন সুযোগই পায় না। তাদেরকে পাশেই পুলিশ প্রধানের অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো। কাছাকাছি সময়ে গরকুনকে পুলিশ গ্রেফতার করে আনিচকভ প্যালেসের কাছ নেভেস্কি প্রসপেক্ট ও সাডোভায়া স্ট্রিটের কাছ থেকে। কানসার ধরা পড়লো নেভেস্কি প্রসপেক্টের নিকোলায়েভস্কি রেল ষ্টেশনের কাছে। কিছুটা দূর থেকে ভলোকভকেও আটক করা হয়। বারোটা নাগাদ তাদের সবাইকে এনে জড়ো করা হলো গরোখোভায়া স্ট্রিটের পুলিশ প্রধানের কার্যালয়ে। প্রথম জিজ্ঞাসাবাদেই কানসার ও গরকুন সব কথা পুলিশকে জানায়। তার কিছুক্ষণবাদে পুলিশ অসিপানভকে গ্রেফতার করে কাজান ব্রিজের কাছ থেকে। সে নেভেস্কি ধরে যাচ্ছিল এ্যাডমাইরালিটি স্কোয়ারের দিকে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে চাইলে সে প্রশ্ন করে,
কোন প্রমাণ আছে?
পুলিশ কর্মকর্তাটি বলে, ‘আছে’। এরপর দু’জন পুলিশ দু’পাশ থেকে তাকে বগলদাবা করে ধরে। সে পুলিশকে অনুরোধ করে তার হাতদুটো ছেড়ে দিতে। পুলিশ ষ্টেশনে এসে তারা তার হাত দুটো ছেড়ে দেয়। অভ্যর্থনা রুমে একটি ডেস্কে তখন একজন পুলিশ বসা ছিল। অসিপানভ দ্রুত তার কোটের পকেট থেকে বই বোমাটা বের করে সেই পুলিশটার দিকে ছুঁড়ে মারে। কিন্তু বোমাটি ফাঁটে না। তখন সেই পুলিশ দু’জন আবার তাকে জাপটে ধরে।

রাইসা যখন আন্নার হোষ্টেলে পৌঁছায় তখন বেলা প্রায় ১১ টা। রাইসা এর আগে একবার আন্নার হোষ্টেলে এসেছিল। রাইসা বেশ জোরে জোরে আন্নার দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। এমন সময় মার্কও সেখানে এসে পৌঁছায়। রাইসাকে দেখে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। মার্ক কোন প্রশ্ন করার আগেই আন্না দরজা খুলে দেয়। মার্কের আসার কথা কিন্তু রাইসাকে দেখে আন্না অবাক হয়ে জানতে চায়,
কি হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

এক গ্লাস পানি খাবো

আন্না রাইসাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যায়। সে একবার মার্কের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে। রাইসার পানি খাওয়া শেষ হলে আন্না আবার প্রশ্ন করে,

তুমি কোথা থেকে আসছো? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

রাইসা একটা ঢোক গিলে বলে,

তুমি কিছু জানো না?

আন্নার বুকটা ধক করে ওঠে। উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চায়,

কী হয়েছে?

রাইসা তখন সাশাদের আজকের পরিকল্পনার কথা সব খুলে বলে। সব শুনে আন্না সোফার উপর ধপ করে বসে পড়ে। মার্ক তার পাশে এসে বসে বলে,

চলো, আমরা বেরিয়ে পড়ি।

আন্না, মার্ক ও রাইসা যখন আনিচকভ প্যালেসের কাছে এসে পৌঁছায় তারা দেখতে পায় পুলিশ গরকুনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আন্না ও মার্ক গরকুনকে না চিনলেও রাইসা চিনতো। রাইসা যখন আন্নাকে বলে গরকুন সাশাদের গ্রুপেরই একজন তখন এক মুহূর্ত দেরী না করে আন্না বলে,

মার্ক, আমি সাশার খোঁজে ওর বাসায় যাচ্ছি। তুমি একটু বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাও।

রাইসাও দ্রুত তার বাসায় ফিরতে থাকে যদি সাশা সেখানে যায়।

আন্না সাশার বাসায় পৌঁছালো বেলা দেড়টায়। নিজের কাছে থাকা চাবিটা দিয়ে দরজা খুলে সে সাশার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। তিনটা নাগাদ ঠক ঠক শব্দ শুনে দরজা খুলতেই দেখে পুলিশ।

আলেকজান্ডার আছে?’ বেশ রাগী গলায় পুলিশের কর্মকর্তা গোছের প্রশ্ন করে।

না’, আন্না উত্তর করে।

আপনি কে?

আমি আন্না উলিয়ানভা, আলেকজান্ডার আমার ছোট ভাই

ঠিক আছে, ভিতরে চলুন। আমরা বাসা সার্চ করবো। আমাদের কাছে ওয়ারেন্ট আছে

পুলিশের একথা শুনে আন্না বেশ ঘাবড়ে গিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ানোর সাথে সাথে কয়েকজন পুলিশ বাসার ভিতরে ঢুকে তল্লাশি শুরু করে। প্রায় মিনিট পনের পর সাশার টেবিলের ড্রয়ার থেকে পুলিশ কর্মকর্তাটি আন্নার ঠিকানায় আসা টেলিগ্রামটি খুঁজে পায়। সংগে সংগে পুলিশ কর্মকর্তাটি আন্নার কাছে এসে বলে,

এই টেলিগ্রামটির ঠিকানায় তো আপনি থাকেন?

আন্না মাথা নাড়ে। তখন কর্মকর্তাটি বলে,

আপনি আসুন আমাদের সাথে। আপনার বাসাও আমরা তল্লাশি করবো

আন্না বুঝতে পারে সাশা ফেঁসে যাচ্ছে সেই সাথে সে নিজেও। কোন কথা না বলে আন্না পুলিশকে অনুসরণ করে।

সাশা অনেকক্ষণ ধরে কোন সংবাদ না পেয়ে অস্থির বোধ করতে থাকে। খবরের আাশায় লুকাশেভিচ যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সাশা যায় কানসারের বাসায়। ক্যাম্পাসে ঢুকতেই তার কানে গুজব আসে। ‘জারকে হত্যা করা হয়েছে এবং কানসার ধরা পড়েছে খবরের সত্যতা জানতে লুকাশেভিচ ক্যাম্পাস ছাড়ে।

সাশা কয়েক ঘন্টা যাবৎ বসে আছে কানসারের বাসায়। সন্ধা প্রায় সাতটা। সাশা একবার ভাবলো চলে যাবে। অন্য কোন উৎস থেকে বরং খবর যোগাড় করার চেষ্টা করা যাক। সে উঠে দাঁড়ায়। এমন দরজায় টোকা পড়ে। সাশা দ্রুত গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে দরজায় পুলিশ দাঁড়িয়ে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top