জীবনে সাহিত্যের স্থান II মুন্সী প্রেমচন্দ II মূল হিন্দী থেকে তর্জমা: সফিকুন্নবী সামাদী

সাহিত্যের আধার জীবন। এই ভিতের ওপর সাহিত্যের দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকে, তার চিলেকোঠা, তার মিনার, তার গম্বুজ তৈরি হয়; কিন্তু বুনিয়াদ মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। তাকে দেখতে মন চাইবে না হয়তো। জীবন পরমাত্মার সৃষ্টি, সেই জন্যে তা অনন্ত, অবোধ্য, অগম্য। সাহিত্য মানুষের সৃষ্টি; সেইজন্যে সুবোধ্য, সুগম এবং মর্যাদায় পরিমিত। পরমাত্মার নিকট জীবনের জবাবদিহিতা আছে কি নেই সে কথা আমাদের জানা নেই, কিন্তু মানুষের কাছে সাহিত্যের জবাবদিহিতা আছে। তার জন্যে নিয়ম-কানুন আছে যে কারণে সে এদিক-সেদিক যেতে পারে না। জীবনের উদ্দেশ্যই আনন্দ। মানুষ আজীবন আনন্দেরই খোঁজ করতে থাকে। কেউ তা পায় রত্নাদির মধ্যে, কেউ তা পায় ভর-ভরন্ত পরিবারে, কেউ লম্বা-চওড়া দালান কোঠায়, কেউবা ঐশ্বর্যে। কিন্তু সাহিত্যের আনন্দ, এইসব আনন্দ থেকে উচ্চতর, এদের চেয়ে পবিত্র; তার আধার সুন্দর এবং সত্য। বাস্তবে সত্যিকারের আনন্দ সুন্দর এবং সত্যের কাছ থেকেই পাওয়া যায়। সেই আনন্দ প্রদর্শন করা, সেই আনন্দ সৃজন করা সাহিত্যের উদ্দেশ্য। ঐশ্বর্য বা ভোগের আনন্দে গ্লানি লুকিয়ে থাকে। সে বিষয়ে অরুচিও হতে পারে, অনুশোচনাও হতে পারে; কিন্তু সুন্দরের কাছ থেকে যে আনন্দ পাওয়া যায় তা অখণ্ড, অমর।

সাহিত্যের নয় রসের কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হতে পারে, বীভৎসের মধ্যেও কি কোনো আনন্দ আছে? যদি তা না হয় তাহলে একে রসের মধ্যে ধরা হয় কেন? হ্যাঁ, আছে।বীভৎসের মধ্যে সুন্দর এবং সত্য আছে। ভারতেন্দু* শ্মশানের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কত বীভৎস! অর্ধদগ্ধ মাংসপিণ্ড নিয়ে প্রেত এবং পিশাচের কাড়াকাড়ি, চটড়-চটড় করে হাড় চিবানো বীভৎসতার পরাকাষ্ঠা; কিন্তু তা বীভৎস হয়েও সুন্দর, কেননা তা সৃষ্টি করা হয়েছে পরবর্তী পর্যায়ে আসা স্বর্গীয় আনন্দকে তীব্র করবার জন্যে। সাহিত্য তো প্রত্যেক রসেই সৌন্দর্য খোঁজে—রাজমহলে, দরিদ্রের কুঁড়েঘরে, পর্বতশিখরে, নোংরা নালার ভেতর, প্রভাতের লালিমায়, শ্রাবণ-ভাদ্রের আঁধার রাতে। আর আশ্চর্যের বিষয় এই যে দরিদ্রের কুঁড়েঘরে যত সহজে সুন্দরকে মূর্তিমান দেখা যায় ততটা রাজমহলে পাওয়া যায় না। রাজমহলে তো তাকে অনেক কষ্টে খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে মানুষ নিজের মৌলিক, যথার্থ অকৃত্রিম রূপে থাকে সেখানেই আনন্দ। আনন্দ কৃত্রিমতা এবং আড়ম্বর থেকে ক্রোশ ক্রোশ দূরে পালায়। কৃত্রিমের সাথে সত্যের সম্পর্ক কী? সুতরাং আমাদের বিবেচনা হলো, সাহিত্যে কেবল এক রস আছে আর তা হলো শৃঙ্গার। কোনো রস সাহিত্যিক দৃষ্টিতে রস থাকে না আর সেই রচনাকে সাহিত্য হিসেবে গণনা করা হতে পারে না যা শৃঙ্গারবিহীন এবং অসুন্দর। যে রচনা কেবল বাসনা-প্রধান, যার উদ্দেশ্য কুৎসিত ভাবকে জাগানো, যা কেবল বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে তা সাহিত্য নয়। গোয়েন্দা উপন্যাস অদ্ভুত হয়ে থাকে; কিন্তু আমরা তাকে সাহিত্য তখন বলবো যখন তার মধ্যে সুন্দরের সমাবেশ ঘটে, খুনিকে খোঁজার জন্য শত উদ্যোগ, নানা প্রকারের কষ্টভোগ, ন্যায়-মর্যাদা রক্ষা করা—এইসব ভাব থাকে যা এই অদ্ভুত রসের রচনাকে সুন্দর করে তোলে।

সত্যের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক তিন প্রকারের। প্রথমত জিজ্ঞাসার সম্পর্ক, দ্বিতীয়ত প্রয়োজনের সম্পর্ক, তৃতীয়ত আনন্দের। জিজ্ঞাসার সম্পর্ক দর্শনের বিষয়, প্রয়োজনের সম্পর্ক বিজ্ঞানের বিষয় আর সাহিত্যের বিষয় কেবল আনন্দের সম্পর্ক। সত্য যেখানে আনন্দের স্রোত হয়ে যায় সেখানেই সাহিত্য হয়ে ওঠে। জিজ্ঞাসার সম্পর্ক বিবেচনার সাথে, প্রয়োজনের সম্পর্ক স্বার্থ-বুদ্ধির সাথে। আনন্দের সম্পর্ক মনোভাবের সাথে। সাহিত্যের বিকাশ মনোভাবের দ্বারাই হয়ে থাকে। এক দৃশ্য, ঘটনা বা কাণ্ডকে আমরা তিন ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে পারি। বরফে ঢাকা পর্বতে প্রভাতের দৃশ্য দার্শনিকের গভীর চিন্তার বিষয়, বৈজ্ঞানিকের জন্যে অনুসন্ধানের আর সাহিত্যিকের জন্যে বিহ্বলতার। বিহ্বলতা এক ধরনের আত্মসমর্পণ যেখানে আমরা পৃথকতা অনুভব করি না। যেখানে উঁচু-নিচু, ভালো-মন্দের ভেদ থাকে না। শ্রী রামচন্দ্র শবরদের এঁটো কুল কেন আনন্দের সঙ্গে খান, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিদুরের শাককে কেন নানা ব্যঞ্জনের চেয়ে রুচিকর মনে করেন? এই জন্যে যে তাঁরা এই পার্থক্য মিটিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের আত্মা বিশাল। এতে সমস্ত জগতের জন্যে স্থান রয়েছে। আত্মার সঙ্গে আত্মা মিশে গেছে। যাঁর আত্মা যতো বিশাল, তিনি ততোটাই মহান পুরুষ। এমনকি মানুষ এমন মহান পুরুষও হয়েছেন, যিনি জড়-জগতের সঙ্গেও নিজের আত্মাকে মেলাতে পারেন।

আসুন দেখা যাক, জীবন কী? জীবন কেবল বেঁচে থাকা, খাওয়া, ঘুমানো আর মরে যাওয়া নয়। এতো পশুর জীবন। মানব জীবনেও এসকল প্রবৃত্তি থাকে; কারণ, মানুষও তো এক ধরনের পশু। কিন্তু মানুষ এসব ছাড়া আরো বেশি কিছু। তার মধ্যে কিছু এমন মনোবৃত্তি থাকে যা প্রকৃতির সাথে আমাদের মিলনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এমন কিছু মনোবৃত্তি আছে যা এই মিলনে সহায়ক হয়ে যায়। যে সকল প্রবৃত্তির দ্বারা প্রকৃতির সাথে আমাদের সামঞ্জস্য বৃদ্ধি পায় সেগুলো বাঞ্ছনীয়, যেগুলো সামঞ্জস্যে বাঁধা উৎপাদন করে সেগুলো দূষিত। অহংকার, ক্রোধ অথবা হিংসা মনের বাধা দেয়া প্রবৃত্তি। যদি আমরা এদের বিনা বাধায় চলতে দিই, তবে নিঃসন্দেহে তারা আমাদেরকে বিনাশ এবং পতনের দিকে নিয়ে যাবে। এজন্যে তাদের লাগাম টেনে ধরতে হয়, এদের বিষয়ে সংযম রাখতে হয় যাতে তারা নিজের সীমার বাইরে যেতে না পারে। আমরা তাদের ব্যাপারে যতোটা কঠোর সংযম রাখতে পারি, ততোটাই মঙ্গলময় হয়ে ওঠে আমাদের জীবন।

কিন্তু দুষ্ট বালককে ধমক দিয়ে বলা—তুমি বড় বদমাশ, আমি তোমার কান ছিঁড়ে ফেলবো—সাধারণত ব্যর্থই হয়; বরং সেই প্রবৃত্তিকে আরো জেদের দিকে নিয়ে গিয়ে পুষ্ট করে তোলে। প্রয়োজন হলো, সেই বালকের মধ্যে যেসকল সৎ-বৃত্তি রয়েছে তাদেরকে উৎসাহিত করা যাতে দূষিত বৃত্তি স্বাভাবিকভাবেই শান্ত হয়ে যায়। এধরনের মানুষেরও আত্মবিকাশের জন্যে আবশ্যকতা হয়। সাহিত্যই মনোবিকারের রহস্য খুলে দিয়ে সৎ-বৃত্তিগুলো জাগিয়ে তোলে। সত্যকে রস দ্বারা যত সহজে আমরা পেতে পারি, জ্ঞান এবং বিবেক দ্বারা তা করতে পারি না। ঠিক সেরকম, যেমন আদর-চুমো দিয়ে বাচ্চাদের যতটা সফলতার সাথে বশ করা যায়, মেরে-কেটে তা করা সম্ভব নয়। কে জানে না যে ভালোবাসা দিয়ে কঠিন থেকে কঠিন প্রবৃত্তিকে প্রসন্ন করা যায়। সাহিত্য মস্তিষ্কের বিষয় নয়, হৃদয়ের বিষয়। যেখানে জ্ঞান এবং উপদেশ অসফল হয়, সেখানে সাহিত্য বাজিমাৎ করে দেয়। এ কারণেই আমরা উপনিষদ এবং অন্য ধর্ম-গ্রন্থকে সাহিত্যের সহায়তা নিতে দেখি। আমাদের ধর্মাচার্যগণ লক্ষ্য করেন যে মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব মানব জীবনের সুখ-দুঃখের বর্ণনা দ্বারা হতে পারে আর তাঁরা মানবজীবনের এসব কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যা আজও আমাদের জন্যে আনন্দের জিনিস। বৌদ্ধদের জাতক-কাহিনী, তৌরাত, কুরআন, বাইবেল এর সবই মানবিক কাহিনীতে পূর্ণ। এ সকল কাহিনীর ওপর আমাদের বড়-বড় ধর্ম স্থির। এসব কাহিনী ধর্মের আত্মা। এসব কাহিনী বের করে দিলে ধর্মের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। ওই ধর্মপ্রবর্তকগণ কি অকারণেই মানবজীবনের কাহিনীর আশ্রয় নিয়েছিলেন? না, তারা দেখেছেন যে হৃদয় দ্বারাই মানুষের আত্মা অব্দি নিজের বার্তা পৌঁছে দেয়া যেতে পারে। তাঁরা স্বয়ং বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তাঁরা মানব জীবনের সাথে আপন আত্মার মিলন ঘটিয়েছিলেন। সমস্ত মানবজাতির সঙ্গে তাদের জীবন সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো, তারপর তারা মানব-চরিত্রকে কীভাবে উপেক্ষা করবেন?

আদিকাল থেকে মানুষের সবচেয়ে নিকটে মানুষই। আমরা যার সুখ-দুঃখ হাসি-কান্নার মর্ম বুঝতে পারি তার সাথেই আমাদের আত্মার অধিক মিল হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীর জীবনের বিষয়ে শিক্ষার্থীর, কৃষকের জীবনের বিষয়ে কৃষকের যতোটা আগ্রহ, ততোটা অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে নেই; কিন্তু সাহিত্য-জগতের মধ্যে প্রবেশমাত্রই এই ভেদ, এই পার্থক্য মিটে যায়। আমাদের মানবতা যেন বিশাল এবং বিরাট হয়ে সমস্ত মানবজাতির ওপর অধিকার পেয়ে যায়। কেবল মানব জাতিই নয়, স্থির-জঙ্গম, জড়-চেতন সকলই তার অধিকারের মধ্যে চলে আসে। সে যেন বিশ্বের আত্মার ওপর সম্রাজ্য পেয়ে যায়। শ্রী রামচন্দ্র রাজা ছিলেন; কিন্তু আজ দরিদ্রও তাঁর দুঃখে ততোটাই প্রভাবিত হয় যতোটা কোনো রাজা হতে পারেন। সাহিত্য সেই যাদুর কাঠি, যা পশুর মধ্যে, ইট-পাথরের মধ্যে, গাছ-গাছালির মধ্যে বিশ্বের আত্মার দর্শন করিয়ে দেয়। মানবহৃদয়ের জগৎ এই প্রত্যক্ষ জগতের মতো নয়। মানুষ হবার কারণে আমরা মানব জগতের প্রাণীদের মধ্যে নিজেদের অধিক পাই, তাদের সুখ-দুঃখ, হর্ষ-বিষাদে বেশি বিচলিত হই। আমরা আমাদের নিকটতম বন্ধু-বান্ধবের সাথেও নিজেদের এতটা নিকটবর্তী হিসেবে পাই না; তাদের মন আমাদের দৃষ্টির সামনে আয়নার মতো খোলা থাকে। জীবনে এমন প্রাণী আমরা কোথায় পাই যাদের মনের ভেতরে আমরা এতোটা স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারি? সত্যিকারের সাহিত্যিকের লক্ষণ এই যে তাঁর ভাবের মধ্যে ব্যাপকতা থাকে, তিনি বিশ্বের আত্মা থেকে এমন Harmony পেয়ে যান যে তার ভাব প্রত্যেক প্রাণীর নিকট নিজের ভাব বলে মনে হয়।

সাহিত্যকার বহুভাবেই নিজের দেশ-কাল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন। যখন দেশে কোনো ঢেউ ওঠে, তখন সাহিত্যিকের পক্ষে অবিচল থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তার বিশাল আত্মা নিজের দেশের বন্ধুদের কষ্টে বিকল হয়ে ওঠে আর এই তীব্র বিকলতায় তিনি কেঁদে ওঠেন; কিন্তু তাঁর কান্নাতেও থাকে ব্যাপকতা। তিনি স্বদেশের হয়েও সার্বভৌমিক থাকেন।’টম কাকার কুড়ে’ (Uncle Tom’s Cabin by Harriet Beecher Stowe) গোলামীপ্রথার দ্বারা আহত হৃদয়ের রচনা; কিন্তু আজ সেই প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবার পরও তার মধ্যে সেই ব্যাপকতা রয়েছে যে আমরাও তা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই। সত্যিকারের সাহিত্য কখনো পুরানো হয় না। তা চির-নতুন হয়ে থাকে। দর্শন এবং বিজ্ঞান সময়ের গতির সাথে সাথে বদলাতে থাকে; কিন্তু সাহিত্য তো হৃদয়ের বস্তু আর মানবহৃদয়ের মধ্যে বদল ঘটে না। হর্ষ এবং বিস্ময়, ক্রোধ এবং হিংসা, আশা এবং ভয় আজও আমাদের মন সেরকমই অধিকার করে আছে, যা আদি কবি বাল্মীকির সময় ছিল এবং অনন্ত কাল অব্দি থাকবে। রামায়ণের সময় এখন আর নেই, মহাভারতের সময়ও অতীত হয়ে গেছে; কিন্তু এসব গ্রন্থ এখনো নতুন। সাহিত্যই সত্যিকারের ইতিহাস। কেননা, তার মধ্যে নিজের দেশ ও কালের যেমন চিত্র থাকে, এরকম কোনো ইতিহাসে হতে পারে না। ঘটনার তালিকা ইতিহাস নয় আর রাজাদের লড়াইও নয় ইতিহাস। ইতিহাস জীবনের বিভিন্ন অঙ্গের প্রগতির নাম, জীবনের ওপর সাহিত্যের চেয়ে অধিক আলো কে ফেলতে পারে? সাহিত্য তো নিজের দেশ-কালের প্রতিবিম্ব।

জীবনে সাহিত্যের উপযোগিতা বিষয়ে কখনো কখনো সন্দেহ করা হয়ে থাকে। বলা হয়, যে স্বভাবত ভালো সে ভালোই থাকবে, যা কিছুই পড়ুক না কেন। যে স্বভাবত মন্দ সে মন্দই থাকবে, যা কিছুই পড়ুক। এই কথায় সত্যের মাত্রা অনেক কম। একে সত্য মেনে নেয়ার অর্থ হবে মানব-চরিত্রকে বদলে দেয়া। যা সুন্দর তার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে। আমরা যতোই পতিত হয়ে যাই না কেন অসুন্দরের প্রতি আমাদের আকর্ষণ হতে পারে না। আমরা যতই খারাপ কর্ম করি না কেন এটা অসম্ভব যে করুণা, দয়া, ভালোবাসা আর ভক্তির প্রভাব আমাদের হৃদয়ের না পড়ে। নাদির শাহের চেয়ে অধিক নির্দয় মানুষ আর কে হতে পারে? আমরা বলছি দিল্লিতে গণহত্যার নায়ক নাদির শাহের কথা। যদি দিল্লির গণহত্যা সত্য ঘটনা হয় তবে নাদির শাহের নির্দয়তার বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। আপনাদের জানা আছে, সেই সময় কোন কথায় প্রভাবিত হয়ে তিনি গণহত্যা বন্ধ করবার হুকুম দিয়েছিলেন। দিল্লির বাদশার উজির ছিলেন এক রসিক ব্যক্তি। যখন তিনি দেখলেন নাদির শাহের ক্রোধ কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছে না আর দিল্লিবাসীর রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে, এমনকি নাদির শাহের পার্শ্বচর কর্মকর্তাগণও তাঁর সামনে যাওয়ার সাহস করছে না, তিনি জীবন হাতে নিয়ে নাদির শাহের কাছে পৌঁছুলেন এবং এই শে’রটি পড়লেন:
কসে ন মাঁদ কি দীগরব তেগ়ে নায কুশী।
মগর কি যিন্দা কুনী খ়ল্ক রা ওয়হ বায কুশী।
এর অর্থ হলো, তোমার প্রেমের তালোয়ার আর কাউকে জীবিত ছাড়েনি। মৃতকে জীবিত করে পুনরায় মারা ছাড়া তোমার তো আর কোনো উপায় নেই। এটা প্রসিদ্ধ এক ফার্সি কবির শৃঙ্গারবিষয়ক শে’র; কিন্তু এই শে’র শুনে হন্তারকের মনে মানুষ জেগে ওঠে। এই শে’র তাঁর হৃদয়ের কোমল অংশ স্পর্শ করে আর গণহত্যা অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়া হয়। নেপোলিয়নের জীবনের একটি ঘটনাও প্রসিদ্ধ, যখন তিনি এক ইংরেজ নাবিককে ঝাউয়ের নৌকায় কৃষ্ণ সাগর পাড়ি দিতে দেখেন। যখন ফরাসিরা অপরাধী নাবিককে ধরে নেপোলিয়নের সম্মুখে হাজির করে আর তাকে জিজ্ঞাসা করে—তুমি এই ভঙ্গুর নৌকায় কেন সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিলে, অপরাধী বলে—আমার বৃদ্ধা মা বাড়িতে একা, আমি তাকে একবার দেখতে চেয়েছিলাম। নেপোলিয়নের চোখ জলে ছলছল করে ওঠে। মানুষের কোমল অংশ স্পন্দিত হয়ে ওঠে। তিনি সেই সৈনিককে ফরাসি নৌকায় ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন। মানুষ স্বভাবে দেবতুল্য। দুনিয়ার ছলনা-প্রপঞ্চ এবং পরিস্থিতির বশ হয়ে সে নিজের দেবত্ব খুইয়ে ফেলে। সাহিত্য এই দেবত্বকে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করে—উপদেশের মাধ্যমে নয়, তিরস্কার করে নয়, ভাব দ্বারা স্পন্দিত করে, মনের কোমল তারে আঘাত করে, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য উৎপন্ন করে। আমাদের সভ্যতা সাহিত্যের ওপর আধারিত। আমরা যা কিছু হই, সাহিত্যই করে তোলে। বিশ্বের আত্মার অন্তর্গত রাষ্ট্র বা দেশেরও আত্মা আছে। এই আত্মারই প্রতিধ্বনি— সাহিত্য। ইউরোপের সাহিত্যের কথাই ধরুন। আপনি সেখানে সংঘর্ষ পাবেন। কোথাও খুন-খারাবির প্রদর্শন, কোথাও আশ্চর্য গোয়েন্দাগিরি। যেন সংস্কৃতি উন্মত্ত হয়ে মরুভূমিতে জল খুঁজে ফিরছে। সেই সাহিত্যের পরিণাম এই যে ব্যক্তিগত স্বার্থপরায়ণতা দিন দিন বেড়েই চলে, অর্থলোলুপতার কোনো সীমা নেই, নিত্য দাঙ্গা, নিত্য লড়াই। সকল জিনিস স্বার্থের তুলাদণ্ডে মাপা হচ্ছে। এমনকি কোনো ইউরোপিয়ান মহাত্মার উপদেশ শুনেও সন্দেহ হয় তার পর্দার পেছনে স্বার্থ রয়েছে কিনা। সাহিত্য সামাজিক আদর্শের স্রষ্টা। যখন সেই আদর্শ ভ্রষ্ট হয়ে যায়, সমাজের পতনে বেশি দিন লাগে না। নতুন সভ্যতার জীবন দেড়শ বছরের বেশি নয়, কিন্তু এখনই বিশ্বসংসার তিতিবিরক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তার বদলে সে এমন কোনো জিনিস পাচ্ছে না, যাকে সেখানে স্থাপিত করতে পারে। তার দশা সেই মানুষের মতো, যে একথা বুঝতে পারছে যে সে যে রাস্তায় যাচ্ছে সে রাস্তা ঠিক নয়; কিন্তু সে এতদূর চলে এসেছে যে এখন আর ফেরার সামর্থ্য তার মধ্যে নেই। সে সামনেই যাবে। যদি সেখানে সমুদ্রও ঢেউয়ে ফুলে উঠতে থাকে। তার মধ্যে রয়েছে নিরাশার হিংসাত্মক শক্তি, আশার উদার শক্তি নেই। ভারতীয় সাহিত্যের আদর্শ তার ত্যাগ এবং উৎসর্গ। ইউরোপের কোন ব্যক্তি লাখপতি হয়ে, জায়গা-জমি কিনে, কোম্পানির শেয়ার নিয়ে, আর উচ্চসমাজে মেলামেশা করে নিজেকে কৃতকার্য মনে করে। ভারত সেই সময় নিজেকে কৃতকার্য মনে করে, যখন সে মায়া-বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায়, যখন তার মধ্যে ভোগ এবং অধিকারের মোহ থাকে না। কোনো জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি তার সাহিত্যিক আদর্শ। ব্যাস এবং বাল্মীকি যে আদর্শ সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজও ভারতের শির উঁচু করে রেখেছে। রামকে যদি বাল্মীকির ছাঁচে ঢালা না হতো, তবে সে রাম থাকতো না। সীতাকেও সেই ছাঁচে ঢেলে সীতা করা হয়েছে। একথা সত্য যে আমরা সকলেই এমন চরিত্র সৃজন করতে পারিনা; কিন্তু ধন্বন্তরি থাকা সত্বেও পৃথিবীতে বৈদ্যের প্রয়োজন ছিল এবং থাকবে।

এমন মহান দায়িত্ব যে জিনিসের ওপর, তার নির্মাতাদের পদ কোনোভাবেই কম দায়িত্বপূর্ণ নয়। কলম হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মাথায় অনেক বড় দায়িত্ব এসে পড়ে। সাধারণত যুবক বয়সে আমাদের দৃষ্টি প্রথমেই ধ্বংস করার দিকে পড়ে। সংশোধন করবার লক্ষ্যে আমরা বিবেচনা না করেই তীর চালাতে শুরু করি। ঈশ্বরের সৈনিক হয়ে যাই। দ্রুত চোখ চলে যায় কালো দাগের ওপর। যথার্থবাদের প্রবাহে আমরা বইতে শুরু করি। মন্দ বিষয়ের নগ্ন চিত্র অঙ্কনকে শিল্পের সাফল্য বলে ভাবি। এ কথা সত্য যে কোনো ইমারত ভেঙেই তার স্থানে নতুন ইমারত বানাতে হয়। পুরানো ভণ্ডামি আর বন্ধন ধ্বংস করা জরুরী; কিন্তু একে সাহিত্য বলতে পারি না। সাহিত্য তো তাই যা সাহিত্যের মর্যাদাসমূহ ধারণ করে। আমরা প্রায়ই সাহিত্যের মর্ম না বুঝেই লিখতে শুরু করে দিই। সম্ভবত আমরা ভেবে নিই মজাদার, চটপটে এবং ওজস্বী ভাষায় কোনোকিছু রচনা করাই সাহিত্য। ভাষাও সাহিত্যের এক অঙ্গ; কিন্তু সাহিত্য ধ্বংস করে না, নির্মাণ করে। সে মানবচরিত্রের কালিমা দেখায় না, তার উজ্জ্বলতাকে দেখায়। ইমারত ভেঙে ফেলার লোককে ইঞ্জিনিয়ার বলে না। ইঞ্জিনিয়ার তো নির্মাণই করে। আমাদের মধ্যে যেসকল যুবক সাহিত্যকে নিজের জীবনের ধ্যানের বস্তু বানাতে চায়, তাদের মধ্যে আত্মসংযম আবশ্যক, কেননা সে নিজেকে এক মহান পেশার জন্যে তৈরি করছে, যা আদালতে যুক্তি-তর্ক পেশ করা কিংবা চেয়ারে বসে মোকদ্দমার ফয়সালা করার চেয়ে অনেক উঁচু। তাদের জন্য কেবল ডিগ্রি আর উচ্চশিক্ষা যথেষ্ট নয়। চিত্তের সাধনা, সংযম, সৌন্দর্য ,তত্ত্বজ্ঞান তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরী। ভাবের পরিমার্জনও ততটা বাঞ্ছনীয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যসেবকগণ এই আদর্শ অব্দি না পৌঁছুবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যের কাছ থেকে মঙ্গল আশা করা যায় না। অমর সাহিত্যের নির্মাতাগণ বিলাসী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন না। বাল্মীকি এবং ব্যাস দুজনেই তপস্বী ছিলেন। সুরদাস এবং তুলসীদাসও বিলাসিতার উপাসক ছিলেন না। কবিরও তপস্বীই ছিলেন। আমাদের সাহিত্য যদি আজ উন্নতি করতে না পারে তবে তার কারণ এই যে আমরা সাহিত্যরচনার জন্যে কোনো প্রস্তুতি নিইনি। দুচারটে ব্যবস্থাপত্র মুখস্ত করে আমরা হেকিম হয়ে বসেছি। সাহিত্যের উত্থান জাতির উত্থান। ঈশ্বরের নিকট আমাদের এই প্রার্থনা যে আমাদের মধ্যে সত্যিকারের সাহিত্যসেবক জন্ম নিক, সত্যিকারের তপস্বী, সত্যিকারের আত্মজ্ঞানী।

* ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র(১৮৫০-১৮৮৫, জন্ম ও মৃত্যু বেনারসে)আধুনিক হিন্দি সাহিত্য ও হিন্দি থিয়েটারের জনক।তাঁর ছদ্ম নাম রাশা।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top