উড়ে যাচ্ছে প্রেম, হৃদয় থেকে ক্রমাগত উড়ে যাচ্ছে প্রেমের মৌসুম II মাসুম মুনাওয়ার

আকাশী বনে ১

আকাশী বনে একটা মরা আকাশীতে হেলান দিয়ে যে পিঁপড়াটা বসে থাকে তার চোখ থেকে মধুর নহর বয়ে গেলে ঘাসের কার্পেট শুকিয়ে বন্যা আসে। বৃষ্টিহীন বন্যার স্রোত ভাসিয়ে নেয় দৈনন্দিন বিকেল সন্ধ্যা আর রাতের আরাম-আয়েশ। যে পাখিটা তখন কোকিলের মতো ডাকে তার পালক থেকে ঝরে রংধনুর চিঠি। সোনালি যে মাছিটা মিষ্টি থেকে ময়লা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গাঙে সাঁতার কাটে তার লক্ষাধিক চোখে ভেসে ওঠে পূর্ণিমা রাতের দৃশ্য। একটা চিনাজোঁক পিঁপড়ার পা বেয়ে পৌঁছে যায় যোনি পথের ভিতর। নীলতিমিগুলো যোনির রক্তে দূষিত হয়ে ভেসে ওঠে পাহাড়ের জাদুঘরে। যেখানে একটা বাতাসের মিউজিয়াম ছিলো বলে গুজব ওঠে। কার্তিক মাসে পূর্ণ যৌবন নিয়ে যে কুকুরটা গর্ভবতী হয় তার থেকে জন্ম নেয় একটা মানুষ।

আকাশী বনে ২

আকাশী বনে মরা আকাশীতে একটা বুলবুলি ডেকে যায়। যেখানে বুলবুলি ডেকে যায় সেখানে একটা ফুলের জন্ম হয়। যেখানে ফুলের জন্ম হয় সেখানে একটা পৃথিবী গড়ে ওঠে। পৃথিবীর পথ ধরে নেমে আসে বিবিধ অন্ধকার-আলো। অন্ধকারের পথে হাটে সমগ্র ইতিহাস। ইতিহাস নিয়ে চলে আলোর অবশিষ্ট অংশ। পাখিটি পতিত হয় দৃশ্যহীন গন্তব্যে অথবা আকাশী বনে।

ঘামঝরা সকাল

আমার বাগানে শেষ ফুলটা ঝরে পড়ার পর যে বুলবুলিটা উড়ে যায়, সে ফেরে কিছুকাল পর একটা খড় নিয়ে। যে উড়ে আসে বন থেকে সে উড়ে আসে একা এক প্রান্তর পথ। যে চলে যায় দিগন্তে সে চলে যায় দুর্গম সময়। অনন্ত নিয়তি ভেসে ওঠে আসমান পালক। হাসনাহেনা রজনীগন্ধার সুগন্ধে যে রাত, সে রাত প্রাপ্তিহীন সকালে মিলায়। বসন্ত সূর্যে জেগে ওঠে যে বন শীত আসতে না আসতে পাতা ঝরায় সে। আগুনের ফুলকির মত বেড়ে ওঠে যে জীবন বেলা গড়াতে গড়াতেই তার কপালে ভাঁজ। নিতান্ত চাষাভূষা যে রাখাল সন্ধ্যার আগেই সে ঘরে ফেরে শূন্যহাতে। বগলে ঘাম ঝরা কাব্যগুলো দুর্গন্ধ ছড়ায় আঙিনায়।

ধ্যান

যমুনার ঘাটে পাঠে বসে যে নারী তার কোলে মাথা রেখে যে প্রভুর বন্দনা আমি করি সে আমার প্রেমিকা। প্রভুর কোলে মাথা রেখে প্রভুর ইবাদত করছি শুনে আমায় নিয়ে হাসে সাইবেরিয়ান উল্লুক। আর আমি আদম হাওয়ার চরণে সেজদায় নত।

কষ্টের সংজ্ঞা

এক বোঝা কষ্ট কাঁধে নিয়ে কলাবতির জন্ম হয়। কষ্টগুলো রাত হয়ে বিঁধে যায় কলাবতির সোনালী চোখে। চোখ থেকে কষ্টগুলো ছড়িয়ে পড়ে সারা গাঁয়ে। কিছু কষ্ট কুয়াশার মতো অরন্যে তুবরে পড়ে। কলাবতির স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়। কারো ঘর ভাঙে, কারো ভাঙে আকাশ। সংসারগুলো আঁচরে পড়ে দখিনা হাওয়ায়। মানুষগুলো ঢলের মতো উপচে পড়ে গ্রাম থেকে শহরে-বস্তিতে। গ্রামগুলো ফাঁকা হতে থাকে বনগুলোর মতো। বন থেকে উড়ে আসে দল বাঁধা পাখি। মানুষেরা শহরে সুখ খোঁজে আধখানা পয়সা। তখন সুখগুলো বাসা বাঁধে বস্তির বিছানায়। কলাবতি স্বপ্ন কুঁড়ায়।

ছুটি

সময়কে দিলাম ছুটি। তুই চলে যা একা পথে আমি হাঁটছি আগ্নেয়গিরি। পথ আলাদা নয় জলমাটির মতো। তীব্র অনুভূতিগুলো তুই নিয়ে যা আমি চলছি খাপছাড়া আলাপগুলো সঙ্গে নিয়ে গভীর জঙ্গলে। রাতগুলো না হয় থাক দিনগুলো তুই বেছে বেছে নে। সকালগুলো দুপুরে মিলাক বিকেলগুলো যেন রঙধনু পায়। আমি হাঁটছি তুই বসে থাক। এতেও যদি তোর শান্তি আসে আমি না হয় ঘুমাতেই গেলাম সাঁইজির দরগায়!

ভোরের গল্প ১

প্রতিদিন আমি ভোরের প্রেমে পড়ি। ভোর আমার প্রেমে পড়ে। ভোর আর আমি খেলার দুজন সঙ্গী মাত্র। প্রেমের অতিরিক্ত কিছু কি আছে হে ভোরের শালিখ? হে কর্কশ কাক, তুমি কি জানো প্রতিদিন দক্ষিণের জানালাটা কেন ভোরের প্রেমে পড়ে? অথবা ঘাসগুলো কি জানে, সজীবতার সাথে ভোরের সম্পর্কটা কি? প্রেমের রংটা কেমন করে জন্মায় সকালের সূর্যটা কি সত্যিই বলতে পারে! একটা ঘুঘু কেমন করে জানতে পারে একটা ভোরের গল্প! অথচ আমি জানি আমার নিকটে বাস করে শত দূর আকাশ অথবা মেঘ অথবা দুঃখ।

ভোরের গল্প ২

চাতক তো অনেকগুলো ভোর চেয়েছিলো। বৃষ্টিস্নাত ভোরের কথা ছিলো কিন্তু নেমে এলো  খরতাপদাহ। পুড়িয়ে গেলো রাস্তার জমানো দুঃখগুলো। পাহাড়ি ঢলে ভাসিয়ে নিলো টুকিয়ে আনা স্বপ্ন। কলাবতীর গেলো মেহগনি বন। পেয়ারা বাগান থেকে পালিয়ে আসা কাঠবিড়ালী খেয়ে নিলো মেহগনি বীজ। স্বপ্নগুলো জোনাকি হয়ে উড়ে গেলো আলোর মিছিলে। রাতের তারা হয়ে স্বপঝুড়ি ঝুলে আছে আকাশের নীলিমায়।

খতিয়ান

উৎসর্গ : তানজিলা হক তানি

উড়ে যাচ্ছে প্রেম, হৃদয় থেকে ক্রমাগত উড়ে যাচ্ছে প্রেমের মৌসুম। হাতের কাছে রাখা চাদরে হৃদয়কে চেপে ধরলাম কিছুটা রক্ষার আশায়। তবু চাদরের ফাঁক দিয়ে উড়ে যাচ্ছে প্রেম। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। পাশের রুমগুলো থেকে মুহুর্তে কিছু বন্ধু ছোট ভাই আরো কিছু অপরিচিত মানুষ দৌড়ে এলো। কোনো কথা না বলেই শুরু করলো কাড়াকাড়ি। একজন চিৎকার করে বলছে আমার লাল প্রেমটা চাই। অন্য একজন বলছে আমার নীলটাই লাগবে। কাউকে বলতে শুনলাম আমার সবুজটা কেউ আবার শাদা শাদা বলে চিল্লাচ্ছে। কয়েকজন গোলাপি প্রেমের জন্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিলো। চাতকের মতো উদাস মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। প্রচণ্ড বেগে উড়ে যাচ্ছে প্রেম। সুক্ষকোণের শূন্যতা ছুঁয়ে ঘুরে ঘুরে ঘূর্নি হয়ে উড়ে যাচ্ছে হাওয়ার ভিতর। বুদ্ধের ধ্যান ভেঙে প্রবাহমান স্রোতের খণ্ডিত গতিতে উড়ে যাচ্ছে প্রেমের অবশিষ্ট খতিয়ান। হাওয়ার হৃদয় ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে হিমালয়। পূর্বাপর মিলনের প্রত্যাশায় উড়ে যাচ্ছে আরাফা অভিমূখ। জমজমের পবিত্র সরাবে নেশা কেটে গেলে আদম খুঁজে তার গন্ধমী কাবা। তাওয়াফে বিলিয়ে দিয়ে সবটুকু সময় ফিরে আসে মালিকের দরবার। তবু উড়ে যাচ্ছে প্রেম, উড়ে যাচ্ছে আদম; উড়ে যাচ্ছে হাওয়া। হৃদয় থেকে ক্রমাগত উড়ে যাচ্ছে প্রেমের মালিক। হৃদয়ের অবশিষ্ট প্রেম চুরি গেলে নিজেকে বিলিয়ে দেবো!

কবি ও কলাবতি

কালো চাদর। কবিঝোলা। কবিতা। ছেঁড়া খাতা। চটি জুতা। খোলা পা। কফিকালার। পাঞ্জাবি। মধ্যবয়স্ক। চৌরঙ্গী। সোজাপথ। ঝরাপাতা। হিম হাওয়া। ঝিরঝির। অস্তগামী। সূর্যপাঠ। হলুদ রঙ। শাদা ছাতা। ভেজা ফুল। পাতা ঝড়। উঁচু বট।

নীল শাড়ি। লাল টিপ। মায়া রোদ। সুতাবুড়ি। ঘাসফড়িং। গতিময়। ধোয়া পা। খোলা পিঠ। রেশমী সুতো। রঙিন চুল। ইচ্ছেঘুড়ি। ভেজা টিপ। সাজানো ভুল। হলুদ দিল! কালো তিল। খেয়ালি মন। চলমান পথ। জন্মমাটি। সোঁদা গন্ধ। পাগল পায়রা। ভেতর বাহির। কোমল হাত। আলতো ছোঁয়া। চেনা পথ। পাল্টানো রোদ। দূরের আলো। মিটিমিটি তারা। কাজলচোখ। কলাবতী মন। চাতক চাতক।

চাতকীর চোখে এঁকে দিয়ে জলবন ঘুমিয়ে খুঁজি সন্তরণ আকাশী ডিমের খোসায় রঙ লেগেছে ধুতরা ফুলের গন্ধে পাপড়ি দিয়ে কোমলতা ঢেকে দিলেই পারো কলাবতী অনুভূতি লুকায় এ কোন পিঁপড়ের দল জবার পাঁপড়ির মতো মুখখানা কেন চশমার আড়ালে ঢেকে নাও চন্দনের ফোঁটা বিষাদের থেকেও সুন্দর কলাবতীর বন ভেংচি এগিয়ে এলে কোকিলের ঠোঁট বিষাদময় কলাবতীর চোখে তলিয়ে যাবে জলবন কলাবতির তিন চোখ গাছের দেয়ালে হেলান দিয়ে খোঁজে সহপাঠী চাতকের হৃদয়ে ধরে সহজিয়া মন।

Facebook Comments

comments

২ Replies to “উড়ে যাচ্ছে প্রেম, হৃদয় থেকে ক্রমাগত উড়ে যাচ্ছে প্রেমের মৌসুম II মাসুম মুনাওয়ার”

  1. Avatar দিদার মুহাম্মদ বলেছেন:

    চমৎকার লিখে চলেছো মাসুম মুনাওয়ার। আমি তো বলি, প্রেমের অতিরিক্ত কিছু পেলে আমি হবো পর…

    1. Avatar মাসুম মুনাওয়ার বলেছেন:

      ধন্যবাদ কবি। আপনার মতামতে আমি শক্তি পাই। আপনার জন্যে ভালোবাসা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top