সাহিত্যের আধার II মুন্সী প্রেমচন্দ II মূল হিন্দী থেকে তর্জমা: সফিকুন্নবী সামাদী

সাহিত্যের সম্পর্ক বুদ্ধির সঙ্গে ততোটা নয় যতোটা ভাবের সঙ্গে। বুদ্ধির জন্যে দর্শন আছে, বিজ্ঞান আছে, নীতি আছে। ভাবের জন্যে কবিতা, উপন্যাস, গদ্যকাব্য ইত্যাদি।

সমালোচনাকেও সাহিত্যের একটি অঙ্গ হিসেবে মানা হয়, এজন্যে যে সমালোচনা সাহিত্যকে নিজের সীমার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করে। সাহিত্যে যখন এমন জিনিস পাওয়া যায় যে এর রসপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে তখন সাহিত্য ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি, যেমন সঙ্গীতে কোনো বেসুরো ধ্বনি তাকে ত্রুটিপূর্ণ করে তোলে। বুদ্ধি আর মনোভাবের পার্থক্য কাল্পনিক বলেই ধরে নেয়া উচিত।আত্মার মধ্যে বিবেচনা, তুলনা, সিদ্ধান্তের অংশ থাকে, বুদ্ধি ও ভালোবাসা, ভক্তি, আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ইত্যাদির অংশই ভাব। ঈর্ষা, দম্ভ, দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি মনোবিকার। সাহিত্যের সঙ্গে এদের সম্পর্ক এটুকুই যে  উক্ত সুভাবগুলোকে(প্রেম, ভক্তি, আনন্দ ইত্যাদি) তীব্র ও আনন্দবর্ধক করবার জন্যে সাহিত্যিক এদের সহায়তা নেন। ঠিক তেমনি, যেমন কোনো কারিগর সাদাকে আরো সাদা দেখানোর জন্যে কালোর সহায়তা নিয়ে থাকেন। আমাদের সত্য ভাবের প্রকাশই আনন্দ। অসত্য ভাবে তো দুঃখেরই অনুভব হয়। হতে পারে যে কোনো ব্যক্তি অভাবের মধ্যেই আনন্দ অনুভব করেন। হিংসাত্মক কর্ম করে, বা কারো সম্পদ অপহরণ করে, কিংবা নিজের স্বার্থের জন্যে কারও অনিষ্ট করেও কোনো কোনো মানুষের আনন্দ হয়, কিন্তু তা মনের স্বাভাবিক বৃত্তি নয়। এতে আলোর শ্রেষ্ঠত্বের ওপর কোন বাধা আসে না। আমাদের মানসিক গঠন যেরকম, তাতে অসত্য ভাবের প্রতি ঘৃণাপূর্ণ করুণাই উৎপন্ন হয়। যে সকল ভাবের দ্বারা আমরা নিজেকে অন্যের সঙ্গে মেলাতে পারি তাই সত্য ভাব, ভালোবাসা আমাদেরকে অন্যের সঙ্গে মেলায়, অহঙ্কার পৃথক করে দেয়। যার মধ্যে অহঙ্কারের মাত্রা অধিক সে অন্যদের সঙ্গে মিলবে কী করে? সুতরাং ভালোবাসাই সত্য ভাব, অহংকার অসত্য ভাব। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার মধ্যেই জীবন। যার প্রেমের পরিধি যতোটা বিস্তৃত তার জীবন ততোটাই মহান।

যখন সাহিত্যিক সৃষ্টিই ভাবোৎকর্ষ তখন তার কোনো আধার থাকা অনিবার্য। আমাদের অন্তঃকরণের সামঞ্জস্য যতোক্ষণ পর্যন্ত বাইরের পদার্থ বা বস্তু বা প্রাণীর সঙ্গে না হয় ততোক্ষণ জাগরণ সম্ভব হতে পারে না। ভক্তি করবার জন্যে কোনো প্রত্যক্ষ বস্তু চাই। দয়া করবার জন্যেও কোনো পাত্রের আবশ্যকতা রয়েছে। ধৈর্য আর সাহসের জন্যেও কোনো সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। এর তাৎপর্য এই যে, আমাদের ভাবসমূহকে জাগাবার জন্যে বাইরের বস্তুর সঙ্গে তাদের সামঞ্জস্য জরুরী। যদি আমাদের ওপর বাহ্য-প্রকৃতির কোনো প্রভাব না পড়ে, যদি কাউকে পুত্রশোকে বিলাপ করতে দেখে আমরা চার ফোঁটা চোখের জল ফেলতে না পারি, যদি আমরা কোনো আনন্দোৎসবে মিলিত হয়ে আনন্দিত হতে না পারি তবে একথা মনে করতে হবে যে আমরা নির্বাণ লাভ করে ফেলেছি। এই অবস্থার জন্যে সাহিত্যের কোন মূল্য নেই। সাহিত্যিক তো তিনিই হতে পারেন যিনি দুনিয়ার সুখ-দুঃখ থেকে সুখী অথবা দুঃখী হতে পারেন আর অন্যের মধ্যে সুখ-দুঃখ সৃষ্টি করতে পারেন। নিজে দুঃখ অনুভব করাই যথেষ্ট নয়। শিল্পীর মধ্যে তাকে প্রকট করবার মত সামর্থ্য থাকা চাই। কিন্তু পরিস্থিতি মানুষকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। মানুষমাত্রই ভাবের সমতা থাকলেও পরিস্থিতিতে পার্থক্য হয়েই থাকে। আমাদের তো প্রয়োজন মিষ্টতা, এখন তা ইক্ষু থেকে আসুক, খেজুর থেকে আসুক বা চুকন্দর(গাজরের আকৃতির এক প্রকার সব্জী) থেকে আসুক। যদি আমরা কৃষকদের মধ্যে থাকি বা তাদের মধ্যে থাকার মতো সুযোগ আমাদের মেলে, তবে স্বাভাবিকভাবেই তাদের সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ-দুঃখ বলে মানতে শুরু করি এবং তার দ্বারা আমরা ততোটাই প্রভাবিত হই আমাদের চিন্তার মধ্যে যতোটা গভীরতা থাকে। সেরকম অন্য পরিস্থিতিকেও বুঝতে হবে। যদি এর অর্থ এ কথা বোঝানো হয় যে অমুক প্রাণী কৃষকদের বা মজুরের বা অন্য কোনো আন্দোলনের প্রোপাগান্ডা করে, তাহলে সেটা অন্যায়। সাহিত্য এবং প্রোপাগান্ডার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, এ কথা এখানে পরিষ্কার করে দেয়া জরুরী মনে হচ্ছে। প্রোপাগান্ডায় যদি আত্মবিজ্ঞাপন নাও থাকে তবু এক বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিল করবার জন্যে সেই ঔৎসুক্য থাকে যা সাধনার পরোয়া করে না। সাহিত্য শীতল, মৃদুমন্দ বায়ু যা সকলকেই শীতল এবং আনন্দিত করে। প্রোপাগান্ডা এক ঝড়, যা চোখে ধুলো ছিটায়, সবুজ বৃক্ষ উপড়ে ফেলে দেয় আর কুঁড়েঘর এবং মহল দুটোকেই কাত করে দেয়। তা যেহেতু রসবিহীন তাই আনন্দের বস্তু হতে পারে না। কিন্তু যদি কোনো দক্ষ শিল্পী তাতে সৌন্দর্য এবং রস সৃষ্টি করতে পারেন, তবে তা আর প্রোপাগান্ডার জিনিস না হয়ে সৎ সাহিত্যের বিষয় হয়ে যায়। ‘আঙ্কল টম’স ক্যাবিন’ দাসপ্রথার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা, কিন্তু কী রকম প্রোপাগান্ডা? যার প্রতিটি শব্দ রসে ভরপুর। সেইজন্যে তা আর প্রোপাগান্ডার জিনিস থাকে নি। বার্নার্ড শয়ের নাটক, ওয়েলসের উপন্যাস, গল্সওয়ার্দীর নাটক এবং উপন্যাস, ডিকেন্স, মেরী কারেলী, রোমাঁ রোলাঁ, টলস্টয়, দস্তয়োভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কি, সিনক্লেয়ার, আর কত বলবো? এদের সকলের রচনাতেই প্রোপাগান্ডা এবং সাহিত্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে। যতোটা শুষ্ক বিষয়ের প্রতিপাদন ততোটা প্রোপাগান্ডা, যতোটুকুন সৌন্দর্যের অনুভূতি আছে, ততোটুকু সত্যিকারের সাহিত্য হয়ে উঠেছে। আমরা এজন্যে কোনো শিল্পীর কাছ থেকে জবাব তলব করতে পারি না যে তিনি অমুক প্রসঙ্গকে কেন পছন্দ করেন। বিষয়টি তাঁর রুচি এবং পরিস্থিতির অধীন। আমাদের কাছে তো তাঁকে পরীক্ষা করবার জন্যে একটিই কষ্টিপাথর আছে: তিনি আমাদেরকে সত্য এবং সৌন্দর্যের নিকটবর্তী করতে পারেন কিনা। যদি পারেন তবে তা সাহিত্য, না পারলে তা প্রোপাগান্ডা অথবা তার চেয়েও নিকৃষ্ট কিছু।

আমরা প্রায়শই কোনো লেখকের সমালোচনা করতে গিয়ে নিজের কাছে পরাভূত হই। ও, এই লেখকের রচনার কানাকড়িও দাম নেই, এ তো প্রোপাগান্ডিস্ট, ও যা কিছু লেখে, কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থেকে লেখে, তার বিবেচনার মধ্যেই রয়েছে দারিদ্র্য, তাঁর রচনার মধ্যে স্বকীয় কোনো দর্শন নেই ইত্যাদি। কোনো লেখকের বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করার অধিকার আমাদের আছে, তেমনি অন্যদেরও আছে, কিন্তু সৎ সাহিত্যের পরীক্ষা তাই যার উল্লেখ আমরা করে এসেছি। তাছাড়া অন্য কোনো কষ্টিপাথর হতেই পারে না। লেখকের প্রতিটি শব্দ দর্শনে ভরা থাকুক, প্রতিটি বাক্য বিবেচনায় ভরা থাকুক, কিন্তু তাকে আমরা ততোক্ষণ অব্দি সৎ সাহিত্য বলতে পারবো না, যতোক্ষণ অব্দি তার মধ্যে রসের ধারা না থাকবে, তার মধ্যে ভাবের উৎকর্ষ না থাকবে, সে আমাদের সত্যের দিকে নিয়ে না যাবে, অর্থাৎ… বাহ্য প্রকৃতির সাথে আমাদের মিলন না ঘটাবে। কেবল বিবেচনা এবং দর্শনের আধার নিয়ে সে দর্শনের গ্রন্থ হতে পারে, সরস সাহিত্য হতে পারে না। যেমন কোনো আন্দোলন কিংবা কোনো সামাজিক অত্যাচারের পক্ষে বা বিপক্ষে লেখা রসহীন সাহিত্য প্রোপাগান্ডা, তেমনি কোনো তাত্ত্বিক বিচার বা অনুভূত দর্শনে ভরপুর রচনাও প্রোপাগান্ডা। সাহিত্য যেখানে রসবঞ্চিত হয়েছে, সেখানেই সাহিত্যের স্থান থেকে পতিত হয়েছে এবং প্রোপাগান্ডার ক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছেছে। অস্কার ওয়াইল্ড, শ প্রমুখের রচনা যতোক্ষণ অব্দি বিচারমুখ্য ততোক্ষণই রসহীন। আমরা যে রামায়ণকে সৎ সাহিত্য বলে মানি , তার কারণ এই নয় যে, তার মধ্যে বিবেচনা এবং দর্শন ভরে আছে, বরং এজন্যে যে তার প্রতিটি অক্ষর সৌন্দর্যের মধ্যে ডুবে আছে, এজন্যে যে তার মধ্যে ত্যাগ আর প্রেম, বন্ধুত্ব, মৈত্রী, সাহস ইত্যাদি মনোভাবের পূর্ণরূপ দেখানোর মতো চরিত্র রয়েছে। আমাদের আত্মা নিজের ভেতরে যে অপূর্ণতাকে অনুভব করে, তার পূর্ণতাকে পেয়ে সে যেন নিজেকে খুঁজে পায় আর এই তো তার আনন্দের পরম সীমা।

তার সাথে এও মনে রাখা প্রয়োজন যে প্রায়শই এক লেখকের কলম থেকে যা প্রোপাগান্ডা হয়ে বের হয়, তাই অন্য লেখকের কলমে সৎ সাহিত্য হয়ে যায়। অনেক কিছুই লেখকের ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে। আমরা যা কিছু লিখি, যদি তার মধ্যে থাকেও, তবুও আমাদের শুকনো বিচারও নিজের ভেতরের আত্মপ্রকাশের বার্তা দেয় আর তাতে পাঠকের আনন্দপ্রাপ্তি ঘটে। আমাদের মধ্যে যে শ্রদ্ধা রয়েছে যেন সে তার কিছু অংশ আমাদের লেখার মধ্যেও রেখে যায়। এক এমন লেখক যিনি বিশ্বভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে থাকেন, কিন্তু তুচ্ছ স্বার্থের জন্যে কোমর বেঁধে লড়তে শুরু করেন, তিনি কখনো নিজের উচ্চাদর্শের সত্যতা দিয়ে আমাদেরকে প্রভাবিত করতে পারেন না। তাঁর রচনায় তো বিশ্বভ্রাতৃত্বের গন্ধ আসতেই আমরা একঘেয়েমির ক্লান্তিতে ভুগি, আমরা তার মধ্যে কৃত্রিমতার গন্ধ পাই আর পাঠক সবকিছু ক্ষমা করতে পারে কিন্তু লেখকের মধ্যে বানানো জিনিস বা দেখাবার জিনিস বা প্রশংসার লালসা ক্ষমা করতে পারে না। হ্যাঁ, যদি লেখকের প্রতি তার সামান্য শ্রদ্ধা থাকে, তবে সে তার দর্শন, বিচার, উপদেশ, শিক্ষা সকল অসাহিত্যিক প্রসঙ্গের মধ্যে সৌন্দর্যের আভাস পায়। সুতরাং অনেক কিছুই লেখকের ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আমরা লেখকের সঙ্গে পরিচিত হই বা না হই, যদি তিনি সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারেন, তবে আমরা তাঁর রচনা থেকে আনন্দপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিজেকে রুখতে পারবো না। সাহিত্যের আধার ভাবের সৌন্দর্য, তার বাইরে যা কিছু আছে তাকে সাহিত্য বলা যায় না।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top