লেনিন।। পর্ব-৮ ।। আশানুর রহমান খোকন

লেনিন-পর্ব ।। বিচার।।

৬৪ নম্বর মস্কো স্ট্রিট। মার্চ মাস এসে যাচ্ছে, তবু শীত কমছে না। গত কয়েকদিন কোন বরফ না পড়লেও দমকা বাতাসে ঠান্ডাটা আরো জাঁকিয়ে তুলেছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে হিমটাও যেন বাড়ছে। দোতলায় নিজের ঘরে পড়ার টেবিলে বসে আছে ভলোদিয়া। টেবিলে উপর একটি বাতি জ্বলছে। ভলোদিয়ার চোখের সামনে কবিতার বইটি খোলা। খোলা পাতায় লেখা কবিতাটি আলেকজান্ডার পুশকিনের। কবিতাটির নাম ‘একজন নবী’। বইটির ঠিক ডানেপাশেই একটি খাতা। খাতাটার উপরের দিকে রাখা স্কুল লাইব্রেরি থেকে ধার করে আনা পুশকিনের একটি জীবনী। ভলোদিয়ার ডান হাতে একটি পেন্সিল। সে তাকিয়ে আছে কবিতাটির প্রথম লাইনটির দিকে। গত দু’দিন ধরে কবিতাটির প্রথম লাইনটি নিয়ে সে গভীরভাবে চিন্তা করছে। আরো পরিস্কারভাবে বললে প্রথম লাইনটির তিনটি শব্দই বরং তাকে বেশী ভাবাচ্ছে। ভলোদিয়া পুরো কবিতাটি আবার শুরু থেকে পড়তে থাকে।

“আত্মিক তৃষ্ণায় ক্লিষ্ট হতে হতে
নিজেকে টেনে নিয়েছিলাম তপ্ত মরুতে।
এবং পথে ছয় ডানার ফেরেস্তা এলেন।
তিনি আঙুলের স্পর্শে আমার চোখের পাপড়ি ছুঁলেন
এবং আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে গেলো ভয়ার্ত ঈগলের মতো।
তিনি আমার কান ছুঁলেন
এবং আমার কান ভরে গেলো শব্দে ও বাজনায়;
এবং আমি শুনলাম বেহেস্তের কম্পন;
এবং দেখলাম ফেরেস্তাদের উঁচুতে উড়ে যেতে;
এবং দেখলাম সাগরের নীচে প্রাণীদের চলাচল;
এবং শুনলাম উপত্যকায় বেড়ে ওঠা দ্রাক্ষালতার শব্দ।
তিনি আমার মুখ বাঁকা করে,
আমার মুখ থেকে কেঁড়ে নিলেন
যত পঙ্কিল, কপট ও অসার ভাষা;
এবং ডান হাত দিয়ে শরীরের রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দিলেন,
তিনি আমার কাঁটা জিহ্বা দিয়ে
অসাড় মুখের ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন জ্ঞানী ভূজঙ্গ;
তিনি তরবারী দিয়ে আমার বুক চিরে
একটি জ্বলন্ত চুল্লি থেকে গরম কয়লা নিয়ে
আমার কলুষিত হৃদয়ে দিলেন ঢুকিয়ে।
মৃতের মত আমি পড়ে থাকলাম মরুভূমিতে।
এমন সময় আল্লাহর কন্ঠ এলো কানে;
‘ওঠো, হে নবী! দেখো এবং শোনো!
আমার ইচ্ছা পূরণ করো

ভূমি ও সমুদ্রের কাছে যাও
এবং তোমার বাণীতে মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালাও’।।”

অন্য অনেক রাশান কবির মতোই পুশকিনও ভলোদিয়ার খুব প্রিয়। অবশ্য পুশকিনকে ভাললাগার পিছনে হেডমাষ্টার কেরেনেস্কির বিশাল ভূমিকা আছে। পুশকিন তাঁরও খুবই প্রিয়। তিনি চান তাঁর ছাত্ররাও পুশকিন পড়ুক, পুশকিনকে ভালবাসুক। তাই তিনি যখন ভলোদিয়াকে ডেকে বললেন গ্রাজুয়েশনের জন্য একটি প্রবন্ধের বিষয় হিসাবে পুশকিনের কবিতাকে বেছে নিতে, ভলোদিয়া তার মিডল স্কুলের সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত ‘একজন নবী’ কবিতাটিকে বেছে নিল। কিন্তু কবিতাটি নিয়ে লিখতে গিয়ে পুশকিনের জীবন সম্পর্কেও তাকে জানতে হচ্ছিল। বই-পত্র পাওয়া যায় না, হয়তোবা বেশী কিছু লেখাও হয়নি। তবু নানা সূত্র থেকে যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে তাতে সে জানতে পারে পুশকিন কবিতাটি লিখেছিলেন ১৮২৬ সালে যখন তিনি মিখাইলোভস্কিতে নির্বাসনে ছিলেন। তিনি কেন নির্বাসনে ছিলেন সে বিষয়ে পরিস্কার করে কোথাও কিছু বলা না থাকলেও হেডমাষ্টার ক্লাসে পুশকিন পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন যে তিনি জারতন্ত্রের বিরোধী এবং ডিসেম্বারিষ্টদের সমর্থক ছিলেন। ভলোদিয়া ডিসেম্বারিষ্টদের সম্পর্কে তখন জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলেও বেশী কিছু জানতে পারে না। তবে হেডস্যার ক্লাসে কবিতাটির পেক্ষাপট বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে পুশকিন তার বন্ধু পি এ ভিয়াজেমস্কিকে ১৮২৪ সালে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, ‘মুহাম্মদকে যেমন মক্কা থেকে মদীনা যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, তেমনিভাবে আমাকেও রাজধানী থেকে মিখাইলোভস্কিতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে’।

ভলোদিয়া কবিতাটি বারবার পড়তে গিয়ে প্রথম লাইনে এসে চিন্তায় ডুবে যেতে থাকে। তার মনে হয় নবী হতে গেলে যে আত্মিক ক্ষুধা থাকা দরকার, তৃষ্ণা থাকা দরকার সেটা কোন ধরণের ক্ষুধা বা তৃষ্ণা? মানুষের যদি পানির তৃষ্ণা পায়, আর সেই তৃষ্ণায় যদি সে ক্লিষ্ট হতে থাকে, ছটফট করতে থাকে তবে সেই তৃষ্ণা নিবারণ না হলে তার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু সেটা তো শারিরীক ক্ষুধা। মানুষের আত্মিক ক্ষুধাও কী সেরকম হতে পারে? আর যদি তেমনটা নাই হয় তাহলে কী নবী হওয়া সম্ভব নয়? আর নবী না হলে মানুষের হৃদয়ে কী আগুন জ্বালানো সম্ভব না?

ভলোদিয়া সে রাতে ভাবতে ভাবতে বিছানায় যায়। ঘুমিয়ে পড়ার আগে তার মনে হলো কোন কিছু হতে গেলে, বড় কিছু পেতে গেলে নিজের চাওয়াটাও বোধ হয় এমনই হতে হয়। নিজের চাওয়াটা যদি নিজেকে ক্লিষ্ট না করে, নিজের মধ্যে কোন যন্ত্রণা বা অস্থিরতা তৈরী না করে তবে সেই চাওয়া দিয়ে মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালানো যায় না। কেবল নবীরাই মানুষের মনে আগুন জ্বালাতে পারে!

সেদিন ৫ই মার্চ ১৮৮৭। দিনটি বৃহস্পতিবার। জিমনেঝিয়া স্কুলের হেডস্যার ভলোদিয়াকে সকালেই ডেকে পাঠালেন। দু’দিন আগে ভলোদিয়া পুশকিনের ‘একজন নবী’র উপর তার লেখা প্রবন্ধটি জমা দিয়েছিল। আজ সকালে হেডস্যার ডেকে পাঠানোয় ভলোদিয়ার একটু ভয় ভয় করলো এই ভেবে যে হেডস্যার তার লেখাটা পছন্দ করেছেন তো? তাঁর ঘরে যাবার আগে বারান্দায় দেখা হলো তাদের পরিবারের খুবই ঘনিষ্ঠ এবং শিক্ষিকা ভেরা কাশকাদামোভার সাথে। স্কুলের সকলে তাকে ভ্লাদিমির বলে ডাকলেও একান্তে তিনি ভ্লাদিমিরকে ‘ভলোদিয়া’ বলেই ডাকেন। চোখে চোখ পড়তেই হেসে জানতে চাইলেন, ‘ভলোদিয়া, তোমার মা কেমন আছেন?’ উত্তরে ভলোদিয়াও হেসে বললো, ‘ভাল আছেন। আপনি তো কয়েকদিন হলো আমাদের বাড়ীতে যান নি?’ যেতে যেতে ভেরা বললেন, ‘দু/এক দিনের মধ্যেই যাব’।

ভলোদিয়া হেডস্যারের ঘরে ঢুকতেই তিনি বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে বললেন,

‘তুমি কবিতাটি নিয়ে যা লিখেছো তাতে আমি অবাক হয়েছি। তোমার লেখাটি অসাধারণ হয়েছে। তোমার জন্য সত্যিই আমি গর্বিত। আমি জানতাম তুমি সাশার পদাংকই অনুসরণ করবে’।

আবেগ ও লজ্জায় ভলোদিয়া কিছু বলতে পারেনা। বিদায় নিয়ে নিরবে ক্লাসে ফিরে আসে। ক্লাসের মধ্যেও হেডস্যারের কথাগুলো তার মাথার মধ্যে ঘুরপাঁক খাচ্ছে। দুপুর হয়ে আসছে। একটি ক্লাস সবে শেষ হয়েছে অন্যটি তখনও শুরু হয়নি এমন সময় স্কুলের দপ্তরী এসে জানায়, শিক্ষিকা ভেরা কাশকাদামোভা ভলোদিয়াকে ডাকছে। খুবই জরুরী। ভলোদিয়া একটু অবাক হলো। সকালেই তো তাঁর সাথে দেখা হয়েছিল। কিছুটা দুরু দূরু বুকে সে শিক্ষকদের কমনরুমের সামনে গেলো। তাকে দেখেই ভেরা কাশকাদামোভা দ্রুত বের হয়ে এলেন। তাঁর হাতে একটি চিঠি। তিনি ভলোদিয়াকে কিছুটা দূরে একপাশে নিয়ে গিয়ে বললেন,

-ভলোদিয়া, একটা খারাপ খবর আছে। এই মাত্র পিয়ন এসে এই চিঠিটি দিয়ে গেলো। তুমি চিঠিটা আগে পড়ো।

ভলোদিয়া বিস্ময়ের সাথে চিঠিটি নিলো। দু’হাত দিয়ে চিঠি খুলে সে পড়তে শুরু করে। ভেরা কাশকাদামোভা তাকে গভীরভাবে লক্ষ্য করতে থাকেন। ভলোদিয়া এমনভাবে চিঠিটি পড়ছে যেন চিঠিটা পড়া শেষে তার কাছে জানতে চাইলে সে চিঠির প্রতিটি শব্দ নির্ভুলভাবে বলতে পারবে। ভলোদিয়া চিঠিটি পড়া শেষ করেও পলকহীনভাবে চিঠিটির দিকে চেয়ে আছে। ভেরা কাশকাদামোভা ভলোদিয়ার প্রতিক্রিয়া বুঝার চেষ্টা করলেন কিন্তু তাঁর মনে হলো ছেলেটির নিজের উপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ আছে। কোন আবেগ বা উচ্ছ্বাসই সে প্রকাশ করছে না। সে নিরবে চিঠিটির দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়েই আছে। ভেরা কাশকাদামোভার

মনে হলো কিছু একটা বলা দরকার। তিনি কিছু বলার আগেই নিরবতা ভেঙে ভলোদিয়া বলে ওঠে,

‘এটা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার এবং সাশার জন্য বিষয়টি খুব বিপদজনক হতে পারে’।

-তুমি বাড়ী যাও। তোমার মাকে জানাও। আমি কিছুক্ষণ বাদে আসছি।

সাশা দ্রুত তার ক্লাসরুমে ফিরলো। নিজের ব্যাগটি গুছিয়ে নিয়ে বারান্দা থেকে নেমে স্কুল মাঠের শর্টকাট পথটি ধরে সে হাঁটতে শুরু করে। ভেরা কাশকাদামোভা তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তাঁর মনে হলো ভলোদিয়া হেঁটে নয় যেন দৌঁড়ে যাচ্ছে।

ভলোদিয়া সত্যিকার অর্থেই ছুটছিল। সে হাঁটছিল অনেকটা দৌঁড়ের ভঙ্গিতে। যেতে যেতে সে ভাবছিল তার খালাতো বোন ইলেনা চিঠিটি মা’কে সরাসরি না লিখে ভেরা কাশকাদামোভাকে কেন লিখলেন? চিঠিতে এটাও লিখেছেন যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অ্যানিউটাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ভলোদিয়া ভাবছে এই সাংঘাতিক খবরটি সে মাকে কিভাবে দেবে? আর তখনই তার মনে হলো ঠিক একই কারণে হয়তো তার খালাতো বোন খবরটি মাকে সারাসরি দিতে চাননি। অল্প সময়ের মধ্যেই ভলোদিয়া বাড়ী পৌঁছালো। মারিয়া তখন রান্নাঘরে। এমন অসময়ে ভলোদিয়াকে বাড়ীতে ফিরতে দেখে চিন্তিত মুখে তিনি প্রশ্ন করেন,

-কী হয়েছে, ভলোদিয়া? তুমি এখন বাড়ীতে? শরীর খারাপ?

ভলোদিয়া চুপ করে থাকে। সে তখনও ভাবছিল কথাটা মাকে কিভাবে বলা যায়। তাকে চুপ থাকতে দেখে মারিয়া এগিয়ে এসে ভলোদিয়ার কপালে হাত দেয়। দেখেন তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা। ভলোদিয়া গায়ে তো জ্বর নেই। তাহলে? মারিয়া ভলোদিয়ার কাঁধে হাত দিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বলেন,

-ভলোদিয়া, কী হয়েছে?

ভলোদিয়া তবুও চুপ করে আছে দেখে মারিয়া তার দু’কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে জানতে চাইলেন,

-ভলোদিয়া কী হয়েছে? আমাকে বলো!

-সাশা ও আন্নাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

কথাটা ভলোদিয়া এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে। মারিয়া তাই ভলোদিয়ার কথাটা ভাল বুঝতে পারে না। তিনি আবার জানতে চান,

-কী করেছে?

-পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করেছে।

মারিয়ার ভলোদিয়ার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে একটু পিছিয়ে গিয়ে যেন নিজের সাথেই কথা বলছে এমনভাবে বললেন,

-এটা অসম্ভব। আমি বিশ্বাস করি না। এটা হতেই পারে না। কে বললো তোমাকে?

প্রচন্ড উদ্বেগ নিয়ে মারিয়া জানতে চাইলেন।

-ইলেনা পেসকোভস্কায়া ভেরা কাশকাদামোভাকে চিঠি লিখে জানিয়েছে। তিনি চিঠটি লিখেছেন দুই তারিখে। আমি সেই চিঠি দেখেছি।

-কোথায় সে চিঠি? দেখি চিঠিটা?

-আমার কাছে নেই।

-এটা হতেই পারে না। কেন তাদেরকে পুলিশ গ্রেফতার করবে? কী করেছে তারা?

-সাশা জারকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

-কী বলছো এসব? অসম্ভব! সাশা কেন এটা করতে যাবে? আমি কিছুই বিশ্বাস করি না।

মারিয়া ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়েন। ভলোদিয়া কী করবে বুঝতে পারে না। মা তো কথাটা বিশ্বাসই করছেন না! একারণেই কী ইলেনা পেসকোভস্কায়া বিষয়টি ভেরা কাশকাদামোভাকে জানিয়েছে? মারিয়া হঠাৎ করে জানতে চাইলেন,

-ভেরা কোথায়?

-স্কুলে।

-চলো, আমি স্কুলে যাবো।

কথাটা বলেই তিনি কাপড় পাল্টাতে নিজের ঘরে গেলেন। ভলোদিয়া তখনও সেখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় ভেরা কাশকাদামোভা এসে ঢুকলেন। তিনি ভলোদিয়াকে কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মারিয়া কাপড় পাল্টে ফিরে এলেন। ভেরাকে দেখেই অনেকটা ছুটে এসে বললেন,

-ভেরা, আমি তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম। চিঠিটা কোথায়? আমি পড়তে চাই।

ভেরা কাশকাদামোভা কোন কথা না বলে চিঠিটা মারিয়ার হাতে দিলে তিনি অনেকটা তাড়াহুড়ো করে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করেন। চিঠি পড়া শেষে তিনি ধপাশ করে চেয়ারটায় বসে পড়েন। ভেরা আরেকটা চেয়ার টেনে তাঁর পাশে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলে না। মারিয়া কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন,

-আমি আজই সেন্ট পিটার্সবার্গ যাবো। ভলোদিয়া দেখো তো কাউকে পাও কিনা যে আমার সাথে সিজরান রেল ষ্টেশন পর্যন্ত যেতে পারে।

ভলোদিয়া ঝড়ের বেগে বের হয়ে গেলো। ভলোদিয়া চলে গেলে মারিয়া আবার চিঠিটি পড়লেন। চিঠিটি ভেরার হাতে ফেরৎ দিয়ে বললেন,

-আমি ভলোদিয়াকে বলে যাবো আমার বোন আন্নাকে একটা টেলিগ্রাম করে দিতে। সে যেন দ্রুত এখানে চলে আসে। ভলোদিয়া এবং ওলগার ফাইনাল পরীক্ষা তাছাড়া দিমিত্রি ও মারিয়াকে দেখভাল করার জন্য কাউকে দরকার। আন্না এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত ভেরা, তুমি আমার ছেলেমেয়েদের দিকে একটু খেয়াল রেখো! তুমি একটু বসো, আমি যাবার জন্য এই ফাঁকে একটু গুছিয়ে নিই।

বাড়ী থেকে বের হয়ে ভলোদিয়া ভাবলো কাকে অনুরোধ করা যায়। তার দুই ভাই-বোন জার হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে এটা জানার পর কেউ কী তার মায়ের সাথে সিজরান পর্যন্ত যেতে চাইবে? তাই প্রথমেই যে মানুষটির কথা তার মনে হলো তিনি ভলোদিয়াদের প্রতিবেশী। ভদ্রলোক ইলিয়া বেঁচে থাকতে প্রায় তাদের বাড়ীতে আসতেন দাবা খেলতে। দাবা খেলার ফাঁকে ফাঁকে বাবার সাথে নানা বিষয়ে গল্প করতেন। বাবা সরকারী চাকুরী করতেন তাই স্বভাবতই তিনি প্রকাশ্যে সরকার বা জারের কোন সমালোচনা করতেন না। কিন্তু ভদ্রলোক সমালোচনা করতেন এবং নিজেকে উদারপন্থী হিসাবে দাবী করতেন। পরিবারের এমন সংকটে ভলোদিয়ার তাই প্রথমেই ঐ ভদ্রলোকের কথা মনে হলো। ভলোদিয়া ভদ্রলোককে বাড়ীতেই পেলো। অনুরোধটি জানালে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন,

-‘এই অবেলায় শীতের দিনে কী এমন জরুরী দরকার পড়লো যে তোমার মাকে সেন্ট পিটার্সবার্গে যেতে হবে?

ভলোদিয়া যা জানে সেটুকু বলতেই ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে গেলো। দরজাটা ভলোদিয়ার মুখের সামনেই বন্ধ করতে করতে বললেন,

-আমি দুঃখিত ভ্লাদিমির, আমি নিজেকে এসবের মধ্যে জড়াতে চাই না।

দরজাটা ঠাস করে মুখের উপর বন্ধ হয়ে গেলো। ভলোদিয়া স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। ভদ্রলোককে ভলোদিয়া একটু অন্যরকম মনে করতো। মনে মনে মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করতো। কিন্তু এই মুহূর্তে ভদ্রলোককে চরম স্বার্থপর ও কাপুরুষ মনে হলো। ভলোদিয়ার মনে হলো এই যদি উদারপন্থী মানুষটির অবস্থা হয় তবে আর কেই বা মায়ের সাথে যেতে চাইবে? তবু ভলোদিয়া বেছে বেছে সেই সব প্রতিবেশীর বাড়ীতেই গেলো যাদের সাথে তাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু প্রত্যেকেই ভলোদিয়াকে হতাশ করে। বাড়ীর ফেরার পথে তাই সে ঠিক করে মায়ের সাথে সে নিজেই যাবে। বাড়ীতে ঢুকতেই দেখে মা ব্যাগ গুছিয়ে বসে আছেন। ছোট্ট মারিয়া মায়ের কোলে। দিমিত্রি মায়ের চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভেরা কাশকাদোমাভা মাকে বলছেন,

-আমি কোচোয়ানকে বলে এসেছি। সে দশ মিনিটের মধ্যেই আসছে।

ভলোদিয়ার দিকে চোখ পড়তেই মারিয়া প্রশ্ন করে,

-কাউকে পেলে?

-না, কেউ যেতে রাজী হলো না।

-ঠিক আছে। আমি একাই যাবো।

-মা, আমি আপনার সাথে যেতে চাই।

-না, কোন দরকার নেই। তোমার ফাইনাল পরীক্ষা। তাছাড়া ছোট ভাইবোনদেরকেও দেখাশুনার ব্যপার আছে। এই কাগজে লিখে রেখেছি। আমি রওনা দেবার পর তোমার খালাকে টেলিগ্রাম করে দেবে।

-মা, আমার পড়াশুনার ক্ষতি আমি পুষিয়ে নিতে পারবো। ওলগা থাকছে, খালা এসে যাবে কোন সমস্যা হবে না। আমি আপনার সাথে যেতে চাই।

-আমি না করেছি ভলোদিয়া। তোমার এখানে থাকাটা দরকার। আমি ভেরাকে অনুরোধ করেছি তোমাদের নিয়মিত খবরাখবর নিতে। আমি ওখানে গিয়ে পরিস্থিতি বুঝে খবর দেবো।

এমন সময় হ্রস্বধ্বনি শোনা গেলো। কোচোয়ান বাড়ীর সামনে ঘোড়ার গাড়ী এনে দাঁড় করিয়েছে। ভলোদিয়া মায়ের ব্যাগটি নিজেই কাঁধে নিল। অন্য হাতে দিমিত্রির হাতটি ধরে গাড়ীর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মারিয়া ন্যানীকে ডেকে মারিয়াকে তার কোলে দিতে গেলো। সে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। মারিয়া তাকে কিছুক্ষণ কাঁদতে দিলো, তারপর কিছুটা জোর করেই ন্যানীর কোলে দিলো। গাড়ীতে ওঠার আগে ভলোদিয়াকে বললো,

-যাবার আগে ওলগার সাথে দেখা হলো না। ওকে বুঝিয়ে বলো। কান্নাকাটি করতে নিষেধ করো!

গাড়ী ছেড়ে দিলো। ছোট্ট মারিয়া গলা ছেড়ে কাঁদছে। এতক্ষণে দিমিত্রিও কাঁদতে শুরু করলে ভলোদিয়া দিমিত্রির হাতটি ধরেই ন্যানীর দিকে এগিয়ে যায় মারিয়াকে কোলে নিতে। ভেরা

কাশকাদামোভা খেয়াল করে দেখলেন এমন একটি সংকটময় মুহুর্তে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা কেমন শক্তভাবে নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি আরো অবাক হলেন ভলোদিয়ার আচরণে। পরিবারের এই দুঃসময়ে নিজের আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে কেমন করে ছোট ভাই-বোন দু’টোকে সে সামলাতে লাগলো!

পহেলা মার্চ পুলিশ যখন কানসার ও গরুখিনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে তখন তাদেরকে রাজসাক্ষী হবার প্রস্তাব করলে তারা রাজী হয়ে যায় এবং জিজ্ঞাসাবাদের এক ঘন্টার মধ্যে তারা গড়গড় করে সব বলতে শুরু করে। তারা এটাও বলে যে সাশার বাসায় সাশা ও লুকাশেভিচকে তারা বোমা বানাতে দেখেছিল। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গ্রেফতার অভিযান শুরু করে। সাশার বাসা থেকে আন্নাকে, কানসারের বাসা থেকে সাশাকে, রাত বারোটায় লুকাশেভিচকে তার বাসা থেকে এবং একই রাতে রাইসাকেও পুলিশ গ্রেফতার করে। মার্চের তিন তারিখে গ্রেফতার করে নভোরস্কি ও তার শ্বাশুড়ি মারিয়া আনানিনাকে। মার্চের ৭ তারিখে পুলিশ শেভেরভকে গ্রেফতার করে ইয়াল্টা থেকে।

আন্নাকে গ্রেফতারের পর তাকে নিয়ে পুলিশ প্রথমে সার্জিয়েভস্কায়া স্ট্রিটে তার হোস্টেলে যায়। তার রুমটি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সন্দেহভাজন আর কিছু না পেয়ে পুলিশ একটু হতাশ হলো। এরপর তারা আন্নাকে নিয়ে গেলো ২নং ভরোখোভায়া স্ট্রিটের পুলিশের কার্যালয়ে। আন্না দেয়াল ঘড়িতে সময়টা একবার দেখে নেয়। পাঁচটা বেজে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। তাকে একটি প্রায়োন্ধকার ঘরে বসিয়ে রেখে বাইরে থেকে আটকে দেয়া হলো। রাইসার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আন্না শুধু একটার পর আরেকটা ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। কোন কিছু সুস্থির ভাবে চিন্তা করার সময় পায়নি। পুলিশ কার্যালয়ের এই প্রায়োন্ধকার ঘরটিতে বসে আন্না ভাবতে থাকে কী থেকে কী হয়ে গেলো? সাশা এখন কোথায়? সে কী পলাতক নাকি পুলিশ তাকেও গ্রেফতার করেছে? খবরটি যখন সিমবিরস্কিতে পৌঁছাবে মা কী এই সংবাদ সহ্য করতে পারবেন ? মায়ের যদি কিছু হয় ছোট ভাই-বোনগুলোর কী হবে? আন্না যখন এমন ভাবনায় মশগুল তখন দরজার খোলার শব্দে মুখ তুলে তাকাতেই দেখে মোটা-সোটা, রাগী চেহারার একটি লোক ঢুকছে। লোকটির দিকে তাকিয়ে আন্নার প্রথম যেটা চোখে পড়লো সেটা তার পুরু, দীর্ঘ গোঁফ। আন্না রীতিমত ভয় পেলো। আন্নার মনে হলো এমন গোঁফের মানুষটিকে থানার বাইরে দেখলেও সে ভয় পেতো। লোকটি এসেই আন্নার সামনে রাখা চেয়ারটা একটু টেনে ধপাস করে বসে পড়ে। বসার শব্দ এবং ভঙ্গীটিও ভয় জাগানোর মতো। লোকটি খুব গম্ভীর এবং রুঢ় গলায় আন্নার কাছে জানতে চাইলো,

-কী নাম তোমার?

-আন্না উলিয়ানাভা।

-বাবার নাম?

-ইলিয়া উলিয়ানভ।

-মায়ের নাম?

-মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা।

-কী করো?

-বেষ্টুজহেভ কোর্সে পড়ি।

-পড়াশুনায় যদি করো তবে এসবে জড়িয়েছো কেন?

আন্না ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে না লোকটি আসলে কী বলতে চাচ্ছে। সে চুপ করে থাকে। লোকটি তখন গোঁফে একটু তা দিয়ে বলতে শুরু করে,

-আমার নাম কোটলায়ারোভস্কি। পেট থেকে কথা বের করে নিয়ে আসার বিষয়ে পুলিশ বিভাগে আমার একটু সুনাম আছে। আর সেই সাথে তোমার মতো যারা অপরাধী তাদের মাঝে কিছু দূর্নামও আছে বৈকি। শোন মেয়ে, তোমার বয়স কম, লেখাপড়া করতে এসেছো কিন্তু ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছো। আমি যা জানতে চাইবো তার ঠিক ঠিক মতো উত্তর দিলে আখেরে তোমারই লাভ।

আন্না অনুভব করে তার ঠোঁট শুকিয়ে আসছে। সে জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভেজাতে গিয়ে একবার ঢোকও গিলে ফেলে। তার হাত-পায়ে প্রচন্ড ঠান্ডা লাগতে থাকে। সেটা মার্চের এই সন্ধার শীতে না ভয়ে সেটা সে আলাদা করতে পারে না। চোখ তুলে তাকাতেই দেখে লোকটি বড় বড় চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

-তোমাকে কোথা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে?

-আমার ছোট ভাই সাশার বাসা থেকে।

-কী নাম? সাশা? পুরো নাম কী?

-আলেকজান্ডার উলিয়ানভ।

-তুমি সেখানে কী করছিলে?

আন্না আবার ঢোক গেলে। সে বুঝতে পারছে না কী বলা উচিত হবে? লোকটি পলকহীনভাবে আন্নার দিকে চেয়ে আছে।

-আমি এমনিতেই দেখা করতে গিয়েছিলাম।

-তুমি মিথ্যা বলছো। দেখো আন্না, তুমি মিথ্যা বলে নিজেকে বা তোমার ভাই আলেকজান্ডার কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। বরং তুমি যদি সত্যি কথা বলো তাতে শুধু নিজের নয়, আলেকজান্ডারেরও উপকার হবে। তাই সত্যি করে বলো তুমি সেখানে ঐ সময় কেন গিয়েছিলে?

আন্না কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কোন কথা বলে না। সে বুঝতে পারছে না পুলিশের কাছে কী খবর আছে বা কতটুকু আছে। আবার সে নিজেও বেশী কিছু জানে না। তাই সে চুপ করেই থাকে।

-তুমি তিতাস পাশকোভস্কি বা ব্রনিস্কো পিলসুডস্কি নামের কাউকে চেনো?

আন্না এই নাম জীবনেও শোনেনি। সে একদিকে যেমন অবাক হয় অন্যদিকে বুঝতে পারে না সে কী বলবে। সে না সূচক মাথা নাড়তে থাকলে লোকটি আন্নাকে প্রচন্ড একটা ধমক দেয়। ধমক খেয়ে আন্না রীতিমত কেঁপে ওঠে। আবার পরক্ষণেই লোকটি বেশ শান্ত গলায় বলে,

-তোমার ঠিকানায় একটা টেলিগ্রাম এসেছিল ভিলনিয়াস থেকে। ঠিক?

-হ্যাঁ।

-তুমি ভিলনিয়াসের কাকে কাকে চেনো?

-কাউকে চিনি না?

-তাহলে যে লোকটি টেলিগ্রাম করেছিল তাকে চেনো?

-না, চিনি না।

-তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? একটা টেলিগ্রাম এলো তোমার ঠিকানায় একটা জায়গা থেকে। সেই জায়গা বা প্রেরক কাউকে তুমি চেনো না। আর টেলিগ্রামটি পাওয়া গেল তোমার ভাই আলেকজান্ডারের পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে। এর কী ব্যাখা তুমি দেবে আন্না?

আন্নার বুকটা ধক করে ওঠে। কী সর্বনাশ। সাশা এমন ভুল কিভাবে করলো? সে টেলিগ্রামটি ড্রয়ারেই রেখে দিয়েছিল? আন্না কোন জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে। লোকটি আন্নার চোখের দিকে চেয়ে বলতে থাকে,

-আমি বলছি। তোমার ভাই কাউকে তোমার ঠিকানায় টেলিগ্রামটি করতে বলেছিল কিন্তু টেলিগ্রামটি ছিল তার নিজের জন্য। কথাটা ঠিক?

আন্না চুপ করেই থাকে। মাথা নীচু করে সে ভাবছিল সাশা কী এক ভয়ানক বিপদ ডেকে এনেছে!

-আচ্ছা আন্না, আমি জানি তোমার জবাব দেবার কিছু নেই। এখন বলো তো খারকিভের কোন সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে তোমার যোগাযোগ আছে?

-না। আমি কাউকে চিনি না।

-ভাল কথা। কিন্তু ফেব্রুয়ারী মাসের পাঁচ তারিখে তোমার সাথে তোমার বাসায় একটি মেয়ে রাত কাটায়। কথাটা ঠিক?

-হ্যাঁ। কিন্তু মেয়েটিকে আমি আগে থেকে চিনতাম না।

-আমি জানি। মেয়েটিকে ঐ রাতে তোমার কাছে রাখতে কে বলেছিল?

-সাশা।

-এই তো, দারুণ। আমার আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দাও। মেয়েটিকে সেই রাতে কে তোমার ওখানে পৌঁছে দিয়েছিল?

-রাইসা স্মিদোভা নামের একটি মেয়ে।

-ভাল। খুবই ভাল। আর এই মেয়েটিই বোধ করি আজ সকালে তোমার বাসায় গিয়ে জানিয়েছিল তোমার ভাই কী ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তাই না?

আন্না একদম চুপ করে যায়। সে বুঝতে পারে সাশা ও রাইসার বিষয়ে সে যা বলে ফেলেছে সেটা পুলিশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। লোকটি এবার চেয়ারটিকে আরেকটু সামনে টেনে এনে আন্নাকে প্রশ্ন করে,

-রাইসা কোথায় থাকে?

-১৮ নম্বর ইতালিয়ান স্ট্রীট।

-অনেক ধন্যবাদ আন্না। সহযোগিতার জন্য। আমার আপাততঃ আর কিছু জানার নেই।

লোকটি এরপর হঠাৎ করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা খুলে বের হয়ে যায়। যাবার আগে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। আন্না বসে থাকে অন্ধকারে।

পহেলা মার্চ রবিবার। জারের আঠার বছরের ছেলে জারাভিচ নিকোলাস অন্যান্য দিনের মত আজও ঘুম থেকে উঠেছে সকাল সাতটায়। সকালের কফি খাওয়া শেষ করে সে পড়তে বসলো। আজ বাবার সাথে তার সেন্ট পল দূর্গে যাবার কথা। সকাল ১১টায় তাদের রওনা দেবার কথা। সাড়ে দশটার দিকে সে সামরিক পোষাকে সজ্জিত হতে গিয়ে জানতে পারে গাড়ীতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। যাত্রার বিলম্ব আছে ভেবে সে আবার তার পড়ার ঘরে ফিরে গেলো।

এদিকে জার আলেকজান্ডার-৩ বসে আছেন আনিচকভ প্রাসাদে নিজের অফিস কক্ষে। সকাল তখন দশটা। তিনি বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিয়েই বসে আছেন। তিনি ও তাঁর পুত্র জারভিস নিকোলাস যাবেন ‘জার দিবস’ উপলক্ষে সেন্ট পল দূর্গে। আজ থেকে ছয় বছর আগে এই দিনেই তাঁর পিতা আলেকজান্ডার -২ কে একদল সন্ত্রাসী নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সেই দিনটিকে স্মরণ করে আজ তাঁর বক্তব্য রাখার কথা। তিনি অপেক্ষা করছিলেন পুত্র জারভিস নিকোলাসের জন্য। পুত্রের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জার ভাবছিলেন ১৮৮১ সালের পহেলা মার্চ তাঁর বাবা আলেকজান্ডার-২ এর গাড়ীটি যখন ক্যাথারিন ক্যানলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখনই প্রথম বোমাটি ফাঁটে একেবারে গাড়ীটির নীচে। বাবা আঘাত পেলেও মারাত্বক জখম না হওয়ায় গাড়ী থেকে নেমেছিলেন কী ঘটেছে দেখার জন্য। তিনি নিজেও খুব সাহসী ছিলেন। ড্রাইভার বা দেহরক্ষীর নিষেধ শোনেন নি। আর তখনই দ্বিতীয় বোমাটি ফেঁটেছিল এবং বাবার দু’টো পা উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ঘটনাটি স্মরণ করেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে আর তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে পড়তে থাকে।

তিনি একবার দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন। এগারটা বাজতে যাচ্ছে অথচ জারভিস এখনও দেরী করছে? এমন সময় তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত এক অফিসার এসে ঢোকে। সালাম ঠুকেই জানায়,

-গাড়ীর সামান্য কিছু ক্রুটি ধরা পড়েছে। কোচোয়ান বলছে গাড়ীটি প্রস্তুত করতে আধা ঘন্টা লাগবে।

জার ভ্রুকুটি করলেন। বিরক্ত মুখে বললেন,

-তাড়াতাড়ি ঠিক করতে বলো।

অফিসারটি আবার সালাম দিয়ে বিদায় নিলে তিনি পূর্ব ভাবনায় ফিরে যেতে না যেতেই লোকটি আবার ফিরে এসে জানায়, ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তামন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয় এসেছেন। তিনি জরুরী ভিত্তিতে দেখা করতে চান।’

জার অবাক হলেন। তলস্তয়ের তো এসময় আসার কথা নয়। কোন গন্ডগোল? তিনি ইশারায় আসতে ইঙ্গিত করার কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্ত্রী এসে ঢুকলেন। সাথে সাথে জারভিসও প্রবেশ করে। মন্ত্রী তলস্তয়কে বেশ উদ্বিগ্ন মনে হওয়ায় জারভিচ চুপ করে বাবার পাশে এসে দাঁড়ায়। জার চোখ তুলে তাকাতেই মন্ত্রী সালাম দিয়ে বলে ওঠে,

-কিছুক্ষণ আগে একটা গভীর চক্রান্ত আমরা বানচাল করতে সক্ষম হয়েছি এবং ইতোমধ্যে চক্রান্তকারীদের কয়েকজন ধরা পড়েছে। বাকীদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে।

জার একটু সোজা হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন,

-কী ব্যপার খুলে বলুন তো?

মন্ত্রী তলস্তয় ব্ল্যাক অফিসে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে আজকের বোমা হামলা পরিকল্পনার ঘটনা ও ধড়পাকড়ে পুলিশের সাফল্য বিস্তারিত বলতে থাকলেন। শুনতে শুনতে জারের চোখ-মুখ বারবার শক্ত হয়ে ওঠে। নিজের অজান্তেই তিনি নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেন। জারের মনে হলো ছয় বছর আগে তাঁর বাবাকে যারা হত্যা করেছিল তারা তার বাবাকে কোন করুণা দেখায়নি, দ্বিতীয়বার বোমা মেরে তারা বাবাকে হত্যা করেছিল। আজকের যারা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এরা তাকেও করুণা দেখাতো না। তাই জার মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ষড়ষন্ত্রকারী যারাই হোক তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

জারভিচ মন্ত্রীর সব কথা শুনলো। সব শুনে সে উপরের দিকে মুখ তুলে আস্তে করে বলে, ‘হে ঈশ্বর! তুমি আজ আমাদের রক্ষা করেছো’। জারভিচ আস্তে বললেও মন্ত্রী কথাটা শুনতে পায়। জার-৩ মন্ত্রীকে বললেন, ‘যে সব পুলিশ সদস্যরা এই সব সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করেছে তাদেরকে আগামী ৯ই মার্চ আমি পুরস্কৃত করতে চাই। আপনি ব্যবস্থা করুন! আর সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিবেন?

দিমিত্রি তলস্তয় বললেন, ‘আপনি জানেন যে এর আগে সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য আদালতে বিচারের সময় ভেরা জাসুলিচ নামের এক নারী সন্ত্রাসী পুলিশ প্রধান ট্রেপভকে সবার সামনে গুলি করেছিল। আবার প্রথম পহেলা মার্চের খুনীদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়ায় আমাদের ইউরোপীয় শত্রুদেশগুলো সেগুলো নিয়ে ব্যপক মিথ্যা প্রচারণা চালনার সুযোগ পেয়েছিল। আমার প্রস্তাবনা হলো এবারের সন্ত্রাসীদের কোনরকম সহানুভূতি বা সুযোগ না দেয়া। আপনি অনুমতি দিলে আমরা সিনেট ট্রাইব্যুনাল গঠন করে গোপন বিচার সভায় এদের বিচার করতে পারি।

-উত্তম প্রস্তাব। ট্রাইব্যুনালে কে কে থাকবে?

-চারজন সিনেটর থাকবেন। একজন ব্যবসায়িক ও একজন কৃষক প্রতিনিধি থাকবেন।

-বিচারক কে হবেন?

-পিটার অ্যান্টোনভিচ ডায়ার।

-ওহ, সিনেটর ডায়ার।

-সের্গেই নেখায়েভের মতো চরমপন্থীকে তিনিই পিটার পল দূর্গে আজীবন আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

-সে কাজের জন্য আমরা তাকে পুরস্কৃত করেছিলাম। এবারেও স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার ও অবকাশ যাপনের জন্য সিনেটর ডায়ার যেন পর্যাপ্ত টাকা পায় সেটা নিশ্চিত করবেন!

-আমি নিজে বিষয়টি দেখবো।

-আপনি তাহলে সব কিছু চূড়ান্ত করে প্রস্তাব আকারে পাঠিয়ে দিন, আমি অনুমোদন দিয়ে দেবো।

মার্চের নয় তারিখে ধড়পাকড়ে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যদের জার নিজ হাতে পুরস্কৃত করলেন। আর সেই সাথে মন্ত্রী তলস্তয়ের পাঠানো প্রস্তাবপত্রটি অনুমোদন দিয়ে অনুমোদন পত্রে লিখলেন,

“গ্রেফতারকৃতদের খুব বেশী গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। আমার মনে হয় তাদের নিকট থেকে সমস্ত তথ্য আদায় করার পূর্বে তাদের কোর্টের কাছেও সৌপর্দ্য করার দরকার নেই। তাদের প্রতি কোন ধরণের দয়া প্রদর্শন ছাড়াই হত্যার জন্য তাদেরকে শুলেচবার্গ দূর্গে স্থানান্তর করা হোক এবং সেটাই হবে তাদের চরম ও কষ্টদায়ক শাস্তি।”

ভলোদিয়ার খালাতো বোন ইলেনা পেসকোভস্কায়া সরাসরি মারিয়াকে চিঠি না লিখে সাশা ও আন্নার গ্রেফতারের খবরটি শিক্ষিকা ভেরা কাশকাদামোভাকে লিখে জানিয়েছিল। তারই স্বামী ম্যাথিউ পেসকোভস্কি একজন বিশিষ্ট লেখক এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের উচুঁ মহলের কাছে খুবই পরিচিত একটি মুখ। তিনি ঘটনার সাথে সাশা ও আন্নার সংশ্লিষ্টতার কথা না জেনেই ৩রা মার্চ ১৬ নম্বর ফনটান্কা স্ট্রিটে ছুটে গেলেন আন্না ও সাশাকে ছাড়িয়ে নিতে। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হলেন। পুলিশের কাছে শুনে ও বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি শরণাপন্ন হলেন সেন্ট পিটার্সবার্গের নামকরা আইনজীবী আলেকজান্ডার ইয়াকভলেভিচ পাসওভার এর কাছে।

এদিকে মারিয়া উলিয়ানভা রাজধানীতে পৌঁছেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা জায়গায় ছুটাছুটি শুরু করলেন। তার প্রথম কাজ আন্না ও সাশার সাথে দেখা করা। মারিয়া তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের মারফত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেন। আন্নার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হলেও সাশার সাথে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেখা করার অনুমতি পেতে ব্যর্থ হলেন। পুলিশ আন্নার সাথে দেখা করার অনুমতি দিলে নির্দিষ্ট দিনে মারিয়া গেলেন আন্নাকে দেখতে। আন্নাকে তখনও স্পালোরনায়া স্ট্রিটের প্রাথমিক ডিটেনশন জেলে।

আন্না মারিয়াকে দেখেই কেঁদে ফেলে। মারিয়া নিজেকে শক্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন। আন্না এই কয়েকদিনেই শুকিয়ে গেছে। মারিয়া খেয়াল করে দেখেন আন্নার চোখের কোনায় কালি জমেছে। সে হয়তো ঠিক মত ঘুমায় না। মারিয়া শক্ত করে আন্নার হাত দুটো ধরে রাখেন। আন্না চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে,

-মা, কোথা থেকে কী হয়ে গেলো?

মারিয়া নিজেকে যতই শক্ত রাখতে চেষ্টা করুক না কেন আন্নার একথায় নিজেকে সামলে রাখা তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। তিনি নিজেও চোখ মুছতে মুছতে বলেন,

-চিন্তা করো না, সব ঠিক হযে যাবে। মার্ক কি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।

মার্কের কথায় আন্না একটু লজ্জা পায়। এই প্রথম মা মার্কের কথা জানতে চাইলো।

-সে কয়েকবার দেখা করে গেছে।

তবু মার্কের প্রসঙ্গ থেকে সরে যাবার জন্যই সে দ্রুত প্রশ্ন করে,

-মা, সাশার সাথে দেখা করতে পেরেছো?

-না, এখনও পারিনি। চেষ্টা করছি। শীগ্রই ব্যবস্থা হবে।

মায়ের কথায় আন্না সাহস পায়।

অনেক ঘুরাঘুরি শেষে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হলো জারের অনুমতি ছাড়া পুত্রের সাথে মারিয়ার দেখা করা সম্ভব না। কয়েকদিন নানা জায়গায়, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সাথে দেখা করেও কাজ না হওয়ায় ২৮ শে মার্চ আইনজীবির পরামর্শে তিনি জারের কাজে আবেদন করলেন। ছেলেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে মারিয়া আবেদনপত্রে লিখলেন,

“আলেকজান্ডার উলিয়ানভ বিজ্ঞান গবেষণায় নিজেকে এতটাই ব্যস্ত রাখে যে সে অন্য সব বিনোদন থেকেও নিজেকে দূরে রেখেছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক গোল্ড মেডেল পেয়েছে যা তাকে ভাল একটি পেশায় যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছে। বর্তমান শিক্ষা বছরে এম এস সি পরীক্ষার থিসিসের জন্য প্রাণিবিজ্ঞান গবেষণাগারে সে কঠিন পরিশ্রমও করেছে এই কারণে যে দ্রুত পাশ করে সে যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারে।”

আবেদনপত্রটি জারের কাছে পৌঁছালে পত্রটির মার্জিনের মধ্যে জার লিখলেন,

“আমি মনে করি পুত্রের সাথে তাকে দেখা করতে দেয়া যেতে পারে। ফলে সে যেন নিজের চোখেই দেখতে পারে তার প্রিয় পুত্রটি আসলে কি জিনিষ এবং ঠিক কোন অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে”।

অবশেষে অনুমতি মিললো। পহেলা এপ্রিল সকাল ১০ থেকে দুই ঘন্টার জন্য মায়ের সাথে সাশার দেখার ব্যবস্থা করা হলো রুবেটস্কয় বেসানে। নির্দিষ্ট দিন সকালে সাশাকে পিটার পল দূর্গের সেল থেকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো । সকাল থেকেই মারিয়া একটু অস্থির হয়ে আছেন। সাশার সাথে দেখা হবে কতদিন বাদে, এক ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন প্রেক্ষিতে। সাশা কি রোগা হয়ে গেছে? জেলে ঠিকমত খাবার দেয়? সে সব খাবার সাশা খায় তো? সকাল থেকেই মারিয়া শুধু এসবই ভাবছিলেন। অন্যদিকে সাশাকে যখন বলা হলো তার মায়ের সাথে দেখা করার জন্য তাকে অন্যত্র নেয়া হচ্ছে সাশার বুকটা ধক্ করে ওঠে। মায়ের সাথে দেখা হবে? মা কী করে এসব সহ্য করতে পারছেন? আন্নাও গ্রেফতার হয়েছে তারই ভুলে। আন্নাকে টেলিগ্রামের বিষয়ে যুক্ত করাটা মারাত্বক ভুল ছিল! মাকে সে কী বলবে? পথের পুরো সময়টুকু সাশার কেবলই মা, আন্না, বাবার কথা, ছোট ভাই-বোনগুলোর কথা বার বার মনে পড়তে থাকে। সাশা একবার জোর করে মাথা থেকে পরিবারের মানুষদের ভাবনা তাড়াতে গিয়ে দেখে সেই একই ভাবনা ঘুরে ফিরে আসছে।

সকাল ঠিক দশটায় মারিয়াকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা সাশার সাথে সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে গেলেন। পুলিশ কর্মকর্তাটি মারিয়াকে কক্ষটির ভিতর রক্ষিত একটি চেয়ারে বসতে ঈঙ্গিত করলেন। লোহার গ্রিলে মাথা রেখে সাশা কিছু একটা ভাবছিল। মানুষের পায়ের শব্দ শুনে ফিরে মারিয়াকে দেখেই সাশা অনেকটা ছুঁটে এসে হাঁটু গেড়ে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে। তারপর মায়ের জানুতে মাথা রেখে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে। মারিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কিন্তু সাশাকে সেটা বুঝতে দিতে চান না বলে এক হাতে চোখের পানি মুছতে লাগলেন আর এক হাত দিয়ে সাশার চুলের মধ্যে হাত বুলাতে লাগলেন। মা-ছেলের এই মিলন দৃশ্যটি বড্ড করুণঘন হয়ে উঠায় সেই পুলিশ অফিসারটি একটু দূরে সরে গেলেন যদিও তার কাছাকাছি থাকারই কথা। বেশ কিছুক্ষণ মা-ছেলে সেই অবস্থায় থাকে। এক সময় মারিয়া সাশার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতেই জানতে চাইলেন,

-সাশা, তোমাকে এরা মারধোর করেনি তো?

সাশা মুখ না তুলেই মাথা নাড়ে।

-ঠিক মতো খেতে দেয়?

সাশা আবার মাথা নাড়ে।

-রাতে ঘুম হয়?

সাশা এবার মায়ের জানু থেকে মাথা তোলে। তার চোখে পানি। মারিয়া অবশ্য আগেই নিজের চোখের পানি মুছে ফেলেছেন। মারিয়া সাশার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে সাশার চোখগুলো গর্তের ভিতর ঢুকে গেছে। চোখের কোনায় কালি। গালের চোয়ালের হাড় বুঝা যাচ্ছে। মারিয়া নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চোখের কোনা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। সাশা আবার মায়ের জানুতে মাথা রেখে বলে,

-মা, আমাকে মাফ করে দিন। আমি আপনাদের সবাইকে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি। আমার জন্য আজ আন্নাও জেলে।

মারিয়া সাশার পিঠে হাত বুলাতে থাকেন। সাশা একটু শান্ত হলে মারিয়া বলেন,

-জেলে তোমার অনেক কষ্ট হয়, না?

মায়ের এমন কথায় সাশা বুক ফেঁটে যেন কান্না আসে। সে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে কিন্তু চোখের পানি কোন বাঁধাই মানে না। মারিয়া একসময় খেয়াল করেন যে তার হাঁটুর কাছে কাপড়টা যেন ভেঁজা ভেঁজা লাগছে। মারিয়া নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন না। সাশার মুখটা দু’হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে বলেন,

-সাশা, তুমি ভেবো না। আমি যেভাবেই পারি তোমাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নেবো।

মায়ের এ কথায় সাশার কান্নাজড়িত মুখেও একটি হাসির আভা ফুটে ওঠে। বড্ড করুণ সে হাসি। মারিয়া বলেন,

-আমি বিশ্বাস করিনা তুমি জার হত্যা চেষ্টার সাথে যুক্ত। এ হতেই পারে না। তোমার নিশ্চয় মনে আছে জার-২ হত্যার পর শোক জানাতে তোমার বাবার সাথে আমি, তুমি, আন্না ও ভলোদিয়া গির্জায় গিয়েছিলাম। তোমার বাবা সারা জীবন এই সরকারের জন্য কাজ করেছেন। আমি সব জানিয়ে জারকে চিঠি দেবো। নিশ্চয় কোথাও কোন ভুল হচ্ছে। আর তুমি যদি না বুঝে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কোন ভুল করেও থাকো তুমি ক্ষমা চাইবে! জার নিশ্চয় মাফ করবেন।

সাশা এতক্ষণ কোন কথা বলেনি। মায়ের শেষের কথায় সাশা বলে ওঠে,

-সেটা হয় না, মা।

-কী হয় না?

-ঐ যে আপনি বললেন না ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়ার কথা।

-কেন হবে না?

-মা, আপনি কল্পনা করুণ দু’জন মানুষ ‘ডুয়েল’ লড়তে সম্মত হলো। প্রথমজন তার পিস্তল থেকে দ্বিতীয়জনকে গুলি করলো কিন্তু টার্গেট মিস্ হলো। এখন দ্বিতীয়জনের গুলি করার পালা। প্রথমজন কী বলতে পারে, ‘প্লিজ, আমাকে গুলি করবেন না?’ মা, আমি সেটা করতে পারি না।

মারিয়া যেন সাশার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। বিস্ময়ের সাথে তিনি বলে উঠলেন,

-সাশা, তুমি এসব কী বলছো? তোমার বয়স কম। সারাটা জীবন তোমার সামনে পড়ে আছে। আমি কোনভাবেই এটা হতে দিতে পারি না।

-মা, আমি যে কাজ করতে চেয়েছি জারের কাছে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড। আর কোন কারণে মৃত্যুদন্ড না হলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পিটার পল দূর্গের অন্ধকার নির্জন কক্ষে আমাকে কাটাতে হবে। মা, সেটা আমি সহ্য করতে পারবো না! আমি পাগল হয়ে যাবো। তার থেকে মৃত্যু অনেক শ্রেয়।

-কি বলছো, সাশা? তোমার মৃত্যুদন্ড হলে আমি সেটা সহ্য করতে পারবো না। আমি প্রয়োজনে জারের কাছে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে তোমার নির্বাসন চাইবো। তোমাকে যদি নির্বাসন দেয় তোমার সাথে সাইবেরিয়াতে ভলোদিয়াকেও পাঠিয়ে দেবো। তাহলে তোমার অন্ততঃ একা লাগবে না।

-মা, আপনি এসব কী বলছেন? ভলোদিয়ার বয়স অল্প। ওর পড়াশুনা আছে। সেখানে গেলে তার পড়াশুনা হবে?

-সাশা, আমার এক ছেলের পড়াশুনার চেয়ে আরেক ছেলের জীবন আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

মা ও ছেলের এমন আবেগপূর্ণ কথাবার্তা পুলিশ অফিসারটি এতক্ষণ বিভোর হয়ে শুনছিল। মারিয়ার কথায় অফিসারটি সায় দিয়ে বলেন,

-দেখো বাছা, তোমার মা ঠিক কথা বলছেন। তোমার বয়স কম। দুনিয়ার কিছুই দেখোনি। এখনই মরতে চাও কেন? জীবন অনেক দামী খোকা, অনেক দামী!

সাশা এতক্ষণে মায়ের জানু থেকে মাথা তুলে একটু সরে বসে। একবার পুলিশ অফিসারটির দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে মায়ের চোখের দিকে চেয়ে সাশা বলে,

-জীবন অবশ্যই দামী। তবে তার থেকে দামী ‘রোদিনা’।

-রোদিনা? মারিয়া বিস্ময়ের সাথে বলে ওঠেন।

-হ্যাঁ, মা রোদিনা। আমার কাছে মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব অন্য সব কিছু থেকে বড়।

সাক্ষাতের সময় শেষ। পুলিশ অফিসারটি এতক্ষণে উসখুশ করতে শুরু করে। মারিয়ার দিকে চেয়ে বলে

– সময় শেষ। আপনাকে আর থাকতে দেবে না। আপনি চাইলে আবার আসার অনুমতি চাইতে পারেন’।

মারিয়ার চোখে তখনও যেন অবিশ্বাস। সাশাকে যেন তিনি মোটেই বুঝতে পারছেন না। এ কোন সাশা? সাশা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মারিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেলে তাঁর মাথাটা যেন একটু চক্কর দিয়ে ওঠে। তিনি ধপ করে আবার চেয়ারে বসে পড়েন। সাশা মায়ের কাছে ছুটে আসে। মারিয়া সাশার দিকে চুপচাপ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন। তারপর সাশার মাথায় হাত রেখে বলেন,

-তুমি চিন্তা করো না। তোমাকে বাঁচাতে সব চেষ্টাই আমি করবো।

মারিয়া সাশার সাথে দেখা করে ফিরলেন বিপর্যস্ত হয়ে। তিনি যা আশা করেছিলেন বা যেমনটা ভেবেছিলেন বিষয়টি তার থেকে অনেক জটিল। তবুও সাশার জীবন বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে বিবেচনায় তিনি হাল ছাড়লেন না। আত্মীয় পেসোভস্কিকে সব খুলে বললে তিনি এপ্রিলের তিন তারিখে একটি সম্মতিপত্রসহ সাশাকে চিঠি লিখলেন যে সাশা সম্মতি দিলে রাজধানীর সবচেয়ে নামী ও বুদ্ধিমান ডিফেন্স ল’ইয়ার আলেকজান্ডার ইয়াকভলেভিচ পাসওভার তার মামলা লড়তে সম্মত আছেন। সাশা যেন সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করে। সাশা সে চিঠির কোন জবাব দিল না। সাশার সম্মতি না পেয়ে এপ্রিলের ১০ তারিখে তিনি আদালতে আপিল করলেন অনুমতি চেয়ে যে, মি. পাসওভার সাশার পক্ষে মামলা লড়বেন। বিচার শুরু হতে মাত্র পাঁচদিন বাকী তখন। গোপন সিনেট ট্রাইবুনালের বিচারক মি. ডায়ার সে আবেদন নাকচ করলেন এই বলে যে, ‘উলিয়ানভের বয়স একুশ। আইনসঙ্গতভাবেই সে এখন সাবালক। তার সম্মতিপত্র ছাড়া এই অনুরোধ অনুমোদনযোগ্য নয়’। দু’টো উপায়ে ব্যর্থ হয়ে পেসোভস্কি হতাশ হয়ে পড়েন তখন শেষ চেষ্টা হিসাবে মারিয়া পেসোভস্কিকে বলেন যে তাঁর ধারণা সাশা মানষিকভাবে এখন সুস্হ্য নয়। এই প্রেক্ষাপটে কিছু করা যায় কিনা। পরেরদিন ১১ ই এপ্রিল পেসোভস্কি বিচার মন্ত্রীর কাছে আবেদন করলেন এই বলে যে, ‘উলিয়ানভ মানষিকভাবে অসুস্থ্য। এমতাবস্থায় তার পক্ষে ভাল-মন্দ কোন সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। দয়া করে আদালত যেন তার পক্ষে একজন আইনজীবি নিয়োগ দেন’। বিচারমন্ত্রী আবেদনপত্রটি মি. ডায়ারকে পাঠালে তিনি একই আইনগত ভিত্তির কথা উল্লেখ করে জানালেন, ‘উলিয়ানভের সম্মতি ছাড়া কোন কিছুই করা সম্ভব নয়’।

পুলিশ বিভিন্ন জায়গা থেকে সর্বমোট ৭০ জনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। সেই ৭০ জন থেকে মোট ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে পুলিশ চার্জশীট দিলে ১৮৮৭ সালের ১৫ ই এপ্রিল গোপন সিনেট ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হলো। অভিযুক্তদেরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হলো। সংগঠক, নেতা ও টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ হিসাবে শেভেরেভ, লুকাশেভিচ ও আলেকজান্ডার উলিয়ানভ (সাশা) কে; অসিপানভ, জেনারেলভ ও আন্দ্রেয়ুশকিনকে বোমা নিক্ষেপকারী হিসাবে; সিগন্যালম্যান হিসাবে কানসার, ভলোকভ ও গরকুনকে; সহযোগী ও সরঞ্জামাদি সরবরাহকারী হিসাবে ভিলনিয়াস গ্রুপের তিতাস পাশকোভস্কি ও ব্রনিস্কো পিলসুডস্কিকে অভিযুক্ত করা হলো। এদিকে সাশার বন্ধু নভোরস্কি ও তার শ্বাশুড়ি মারিয়া আনানিনাকে বোমা তৈরীতে সহযোগিতা ও মজুদকারী হিসাবে; রাইসা স্মিদোভাকে যোগাযোগ রক্ষা এবং সাশার সহযোগী হিসাবে; এবং সারডিয়ুকোভাকে নামের অপর এক নারীকে যে ছিল আন্দ্রেয়ুশকিনের বাগদত্তা, অভিযুক্ত করা হলো যোগাযোগ রক্ষায় সহযোগিতা করার অপরাধে।

বিচারের জন্য পিটার পল দূর্গের বিভিন্ন সেল থেকে ১৪ ই এপ্রিল কয়েদীদের নিয়ে আসা হলো স্পালোরনায়া স্ট্রিটের প্রাথমিক ডিটেনশন জেলে। জায়গাটা সেন্ট পিটার্সবার্গ সার্কিট কোর্টের ত্রিটিনিয়া প্রসপেক্টের খুব কাছে। পনেরই এপ্রিল বিচার শুরু হবার কিছু পূর্বে তাদের সবাইকে যখন বিচারের জন্য নির্ধারিত কক্ষটির করিডোরে এনে জড়ো করা হলো তখন এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরী হলো। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছে, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। রাইসা আরো দু’জন নারী অভিযুক্তদের সাথে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে দেখছিল সাশাকে। অন্যদের মুখে দাঁড়ি-গোঁফ। কেবল সাশা ক্লিন শেভ করা। একটু রোগা হয়ে গেলেও সাশাকে এখনও দূর্দান্ত আর্কষণীয় লাগছে। অসিপানভকে ভাবলেশহীন মনে হলেও অন্যদের চোখে-মুখ বিষন্নতা। এমন কি শেভেরেভ নিজেও বিষন্ন। কিন্তু সাশাকে যেন নির্ভার এবং নিজের কাজের উপর যথেষ্ট আস্থাশীল মনে হচ্ছে। একমাত্র তাকেই হাসি-খুশী ও প্রাণবন্ত লাগছে। প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কেটে গেলে সাশার চোখ যায় রাইসার দিকে। রাইসা পলকহীনভাবে তার দিকে চেয়ে আছে। সাশা মিষ্টি করে হেসে তার দিকে এগিয়ে যায়। রাইসাও এগিয়ে আসে। সাশা তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে তার কপোলে চুমু খায়। রাইসা অনেকক্ষণ সাশাকে জাপটে ধরে রাখে। একটু পর রাইসার আলিঙ্গন থেকে নিজে মুক্ত করে সাশা এগিয়ে গেলো মারিয়া আনানিনার সাথে কুশল বিনিময় করতে।

ঠিক দুপুর বেলা বিচারকার্য শুরু হলো। চারজন সিনেটর, চারজন এষ্টেট প্রতিনিধি, দু’জন সম্ভ্রান্ত নাগরিক যার একজন মস্কোর মেয়র অন্যজন একজন কৃষক প্রতিনিধি যিনি আবার জেলা প্রধানও, নির্দিষ্ট আসনে এসে বসলেন। এছাড়া সরকারী কর্মকর্তা, মন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয়, অন্যান্য সিনেট সদস্যরা এলেন। অন্যান্যদের মধ্যে যোগ দিলেন সরকার পক্ষের আইনজীবি নিকোলাস আন্দ্রেয়ানোভিচ নেখলিদিউভ যিনি ১৮৫৭ সালে পেনজা ইনস্টিটিউটে সাশার বাবা ইলিয়া উলিয়ানভের ছাত্র ছিলেন। এছাড়া সাশার জন্য মারিয়া একজন আইনজীবি পাঠান যার নাম টাগান্টসেভ, তিনিও উপস্থিত হলেন । আইনজীবি নেখলিদিউভ দেখলেন একজন নতুন মুখের লোক আর্দালির পোষাকে দাঁড়িয়ে আছে। একে আগে তিনি কখনও তাকে দেখেননি। তিনি ভাবলেন গোপন সিনেট বিচার সভা বলেই হয়তো নতুন কাউকে আনা হয়েছে। কিন্তু সেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও গোপন বিচারসভার মধ্যে এই নতুন মুখের লোকটি আর কেউ নন, তিনি লন্ডনের ‘ Daily News’ এর একজন সাংবাদিক।

বিচারের শুরুতে পুলিশের কাছে পহেলা মার্চ কানসার ও গরুখিনের দেয়া বক্তব্যকে ভিত্তি হিসাবে ধরে বিচারের কাজ শুরু হলো। বিচার সভার চেয়ারে এসে বসলেন সিনেটর পিটার অ্যান্টোভিচ ডায়ার। সবাই বেশ গম্ভীর। বিচার সভার বড় কক্ষটির ঠিক মাঝখানে একটি টেবিল রাখা ছিল। বিচারসভার কাজ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সেই টেবিলের উপর প্রমাণ হিসাবে তিনটি বোমা এনে রাখা হলো।

লেনিন পর্ব ৭: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4441

লেনিন পর্ব ৬:http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4368

লেনিন পর্ব ৫:http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4281

লেনিন পর্ব ৪:http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4155

লেনিন পর্ব ৩:http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4027

লেনিন পর্ব ২:http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3868

লেনিন পর্ব ১:http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3491

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top