কাহিনী-শিল্প: এক মুন্সী প্রেমচন্দ II মূল হিন্দী থেকে তর্জমা: সফিকুন্নবী সামাদী

গল্প, আখ্যায়িকা এবং ছোট কাহিনী লেখার প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই চালু রয়েছে। ধর্মগ্রন্থে যে উদাহরণ রয়েছে, সেগুলো ছোট কাহিনীই; কিন্তু কতটা উচ্চকোটির! মহাভারত, উপনিষদ, বৌদ্ধ জাতককাহিনী, বাইবেল ইত্যাদি সৎ-গ্রন্থে এদেরকেই জনশিক্ষার উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। জ্ঞান আর তত্ত্বের কথা এতোটা সরল ভঙ্গিতে আর কেমন করে বলা যেতে পারে? কিন্তু প্রাচীন ঋষিগণ এসকল দৃষ্টান্তের দ্বারা আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক তত্ত্ব নিরূপণ করতেন। কেবল মনোরঞ্জন তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো না। সৎ-গ্রন্থের রূপকসমূহ এবং বাইবেলের Parable দেখে তো একথাই বলতে হয় যে তাঁরা যা করে গেছেন তা আমাদের সাধ্যের বাইরে। এতোটা বিশুদ্ধ কল্পনা, এতোটা মৌলিক চিন্তা, এতোটা ওজস্বী রচনা-শৈলী যে তাকে দেখে বর্তমান সাহিত্যিকদের মাথা ঘুরে যায়। আজকাল ‘আখ্যায়িকা’র অর্থ অনেক ব্যাপক হয়ে গেছে। তার মধ্যে প্রেম-কাহিনী, গোয়েন্দা-গল্প, ভ্রমণ-বৃত্তান্ত অদ্ভুত ঘটনা, বিজ্ঞানের কথা, এমনকি বন্ধুদের গালগল্প পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এক ইংরেজ সমালোচকের মতে তো যে কাহিনীকে পনেরো মিনিটের মধ্যে পড়ে শেষ করা না যায় তাকে গল্প (ছোটগল্প) বলা যায় না। অন্য কথা দূরে থাক, এর যথার্থ উদ্দেশ্য এতোটাই অনিশ্চিত হয়ে গেছে যে, তার মধ্যে কোন উপদেশ থাকাকে ত্রুটি বলে বিবেচনা করা হয়। সেই কাহিনীকে সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট ভাবা হয়, যার মধ্যে উপদেশের ছায়ামাত্র পড়ে।
আখ্যায়িকার দ্বারা নৈতিক উপদেশ প্রদানের উদাহরণ কেবল ধর্মগ্রন্থে নয় সাহিত্য-গ্রন্থেও প্রচলিত ছিল। কথাসরিৎসাগর এর উদাহরণ। তারপর অনেক আখ্যায়িকাকে এক শৃঙ্খলায় বাঁধবার প্রয়াস চলে। ‘বৈতাল-পচীসী'(পঁচিশটি কাহিনীতে যুক্ত সংস্কৃত কাহিনী-গ্রন্থ, রচয়িতা বেতালভট্ট) এবং ‘সিংহাসন-বত্তীসী'(সংস্কৃত ‘সিংহসন দ্বাত্রিংশিকা’ লোক-কথার সংগ্রহ যাতে বত্রিশ টি পুতুল গল্পাকারে রাজা বিক্রমাদিত্যের গুণ বর্ণনা করে) এই শ্রেণীর গ্রন্থ। এগুলোর মধ্যে কত নৈতিক এবং ধার্মিক সমস্যার সমাধান করা হয়েছে, তা তাঁদের কাছে লুকানো নেই যাঁরা এগুলো অধ্যয়ন করেছেন। আরবিতে ‘সহস্ত্র এক রজনী’ এই ধরনের অদ্ভুত সংগ্রহ; কিন্তু তাতে কোনো রকমের উপদেশ দেবার চেষ্টা করা হয়নি। তাতে সকল রসের সমাবেশ ঘটেছে, কিন্তু অদ্ভুত রসেরই প্রাধান্য, আর অদ্ভুত রসে উপদেশের কোনো সুযোগ থাকে না। কখনো কখনো সেই আদর্শ নিয়ে এই দেশে ‘শুক বাহাত্তরী’র ঢঙের কাহিনী রচিত হয়েছে যেখানে নারীজাতির বিশ্বাসঘাতকতার গান গাওয়া হয়েছে। গ্রিসের হেকিম ঈশপ এক নতুন ঢঙ শুরু করেন। তিনি পশুপক্ষীর কাহিনী দ্বারা উপদেশ দেয়া প্রবর্তন করেন।

মধ্যযুগ নাটক এবং কাব্য রচনার কাল; তখন আখ্যায়িকার দিকে খুব কম মনোযোগ দেয়া হয়েছে। সেই সময় কোথাও ভক্তি-কাব্যের প্রাধান্য ছিল, কোথাও রাজরাজড়ার কীর্তিগানের। হ্যাঁ, শেখ সাদী ফারসিতে গুলিস্তাঁ-বোস্তাঁ রচনা করে আধ্যাত্মিকতার মর্যাদা বাড়িয়েছেন। এই উপদেশ-কুসুম এতটাই মনোহর এবং সুন্দর যে চিরকাল প্রেমিকদের হৃদয় এর সুগন্ধে রঞ্জিত হয়ে থাকবে। উনিশ শতকে পুনরায় আখ্যায়িকা রচনায় সাহিত্যিকদের প্রবৃত্তি হয়; আর তখন থেকে শিক্ষিত সমাজের সাহিত্যের বিশেষ মহত্ব পরিলক্ষিত হয়। ইউরোপের সকল ভাষাতেই গল্পের বিশেষ প্রচলন রয়েছে; কিন্তু আমার বিবেচনায় ফ্রান্স এবং রাশিয়ার সাহিত্যে যতো উচ্চকোটির গল্প পাওয়া যায় ততোটা অন্য ইউরোপীয় ভাষায় নেই। ইংরেজিতেও ডিকেন্স, ওয়েলস, হার্ডি, কিপলিং,শার্টল ব্রন্টি প্রমুখ গল্প রচনা করেছেন, কিন্তু তাদের লেখাও মোপাসাঁ, বালজাক বা পিয়ের লোতোর সঙ্গে মোকাবেলা করার মতো নয়। ফরাসি গল্পে সরসতার মাত্রা অনেক বেশি। তারপরও মোপাসাঁ এবং বালজাক আখ্যায়িকার আদর্শকে হাতছাড়া করেননি। তার মধ্যে আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক সমস্যার সমাধান অবশ্য করা হয়েছে। রূপগত দিক দিয়ে সবচেয়ে উত্তম গল্প কাউন্ট টলস্টয়ের। এরমধ্যে বেশ কিছু আছে যা প্রাচীনকালের দৃষ্টান্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। চেখভ অনেক কাহিনী লিখেছেন এবং ইউরোপে তাঁর রচনায় প্রচারও বেশি; কিন্তু তাদের মধ্যে রাশিয়ার বিলাসপ্রিয় সমাজের জীবনচিত্র ছাড়া আর কিছু বিশেষত্ব নেই। দস্তয়োভস্কি উপন্যাস ছাড়া গল্পও লিখেছেন; কিন্তু তার মধ্যে মনোভাবের দুর্বলতা দেখানোর চেষ্টাই করা হয়েছে। ভারতে বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ গল্প লিখেছেন এবং তাদের মধ্যে অনেকগুলো উচ্চকোটির রচনা।

প্রশ্ন আসতে পারে আখ্যায়িকা (আর গল্প, বিশেষভাবে ছোটগল্প) এবং উপন্যাসের মধ্যে আকার ছাড়া আর কোনো পার্থক্য আছে কি না। হ্যাঁ, আছে, অনেক বড় পার্থক্য। উপন্যাস ঘটনা এবং চরিত্র-পাত্রের সম্ভার, আখ্যায়িকা (এবং গল্প) কেবল একটি ঘটনা—অন্য বিষয় সব ওই ঘটনার অন্তর্গত থাকে। এই বিবেচনায় তার তুলনা নাটকের সঙ্গে করা যেতে পারে। উপন্যাসে আপনি চাইলে যতো খুশি স্থান আনতে পারেন, চাইলে অনেক দৃশ্য দেখাতে পারেন, চাইলে অনেক চরিত্র আঁকতে পারেন; কিন্তু এটা আবশ্যক নয় যে সকল ঘটনা বা চরিত্র একটি কেন্দ্রে এসে মিলিত হবে। তার মধ্যে কত চরিত্র তো কেবল মনোভাব (দর্শন) প্রকাশ করার জন্যে আঁকা হয়ে থাকে; কিন্তু আখ্যায়িকায় (এবং গল্পে) এই বাহুল্যের সুযোগ নেই, বরং বিজ্ঞজনের মত তো এই যে তাতে কেবলমাত্র একটি ঘটনা বা চরিত্রের কথা থাকা উচিত। আপনার কলমে যত শক্তি আছে উপন্যাসে তা আপনি দেখাতে পারেন, রাজনীতি নিয়ে তর্ক করতে পারেন, কোনো মাহফিলের বর্ণনায় দশ-বিশ পৃষ্ঠা লিখে যেতে পারেন;(ভাষা সরস হওয়া প্রয়োজন) সেটা কোনো দোষের বিষয় নয়। আখ্যায়িকায় (গল্পেও) আপনি মাহফিলের সামনে দিয়ে চলে যাবেন, আর অনেক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আপনি তার দিকে দৃষ্টি দিতে পারবেন না। সেখানেতো একটি শব্দ বা একটি বাক্যও এমন হওয়া উচিত নয় যা গল্পের উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে না। তাছাড়া কাহিনীর (গল্পের) ভাষা অনেক সরল এবং সুবোধ্য হওয়া চাই। উপন্যাস তারাই পড়েন যাদের হাতে অর্থ রয়েছে; তার কাছেই সময় থাকে যার কাছে অর্থ থাকে। আখ্যায়িকা (গল্প) সাধারণ জনতার জন্য লেখা হয়ে থাকে, যার না আছে অর্থ না আছে সময়। এখানে যতোই সরলতা তৈরি করতে পারবেন ততোই আশ্চর্য গুণের বিষয় হয়ে উঠবে। কাহিনী (গল্প, বিশেষত ছোটগল্প) সেই দ্রুপদের তান মাহফিল শুরু হতেই যার মধ্যে গায়ক সম্পূর্ণ প্রতিভা দেখিয়ে দেন, এক মুহূর্তে চিত্তকে এতোটা মাধুর্যপূর্ণ করে তোলেন যতোটা সমস্ত রাত গান শুনেও হতে পারে না।

আমরা যখন কোনো অপরিচিত প্রাণীকে দেখি, তখন স্বভাবত আমরা জানতে চাই সে কে। প্রথমে তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজনীয় মনে করি। কিন্তু আজকাল গল্প ভিন্ন ভিন্ন রূপে শুরু করা হয়ে থাকে। কোথাও দুই বন্ধুর কথাবার্তার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায়, কোথাও পুলিশ কোর্টের এক দৃশ্যের মাধ্যমে। পরিচয় পরে আসে। এটা ইংরেজি আখ্যায়িকার নকল। এতে কাহিনী অনায়াসেই জটিল এবং দুর্বোধ্য হয়ে যায়। ইউরোপীয়দের দেখাদেখি যন্ত্র দ্বারা, ডায়েরি বা টিপ্পনী দ্বারাও কাহিনী লেখা হয়ে থাকে। আমি স্বয়ং এসব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লিখেছি; কিন্তু বাস্তবে এসবের কারণে কাহিনীর (গল্পের) সরলতায় বাধা পড়ে। ইউরোপের বিজ্ঞ সমালোচক কাহিনীর (গল্পের) জন্যে কোনো শেষ-এর প্রয়োজন মনে করেন না। এর কারণ এই যে তারা কাহিনী কেবল মনোরঞ্জনের জন্যে পড়ে। কোনো এক লেডির সাথে পাঠকের লন্ডনের কোনো হোটেলে দেখা হয়। তার সাথে তার বৃদ্ধা মাতাও রয়েছে। মাতা কোনো বিশেষ পুরুষকে বিয়ে করবার জন্যে কন্যাকে চাপাচাপি করে। মেয়েটি নিজের জন্যে অন্য ছেলে ঠিক করে রেখেছে। মা বিগড়ে গিয়ে বলে, আমি তোমাকে আমার অর্থ-সম্পত্তি দেবো না। মেয়ে বলে, আমি তার পরোয়া করি না। শেষে মা নিজের মেয়ের ওপর রাগ করে চলে যায়। মেয়েটি নিরাশ হয়ে বসে থাকে, এমন সময় তার পছন্দ করা যুবক আসে। দুজনের মধ্যে কথাবার্তা হয়। যুবকের প্রেম খাঁটি। সে অর্থ ছাড়াই বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। বিয়ে হয়ে যায়। কিছুদিন স্বামী-স্ত্রী সুখেই থাকে। তারপর স্বামী অর্থাভাবে অন্য এক নারীর সঙ্গে গোপনে দেখাসাক্ষাৎ করতে থাকে। তার স্ত্রী একথা জেনে ফেলে এবং একদিন সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ব্যাস, কাহিনী (গল্প) শেষ করে দেয়া হয়। কেননা Realist অর্থাৎ বাস্তববাদীদের মত হলো, পৃথিবীতে পাপ-পুণ্যের ফল পেতে কোথাও দেখা যায় না; বরং অনেক সময় খারাপের পরিণাম ভালো এবং ভালোর পরিণাম খারাপ হয়ে থাকে। আদর্শবাদীরা বলেন, বাস্তবের যথার্থ রূপ দেখানোর মধ্যে লাভ কী, সে তো আমরা আমাদের নিজের চোখে দেখেই থাকি। কিছুক্ষণের জন্য আমাদের এই কুৎসিত ব্যবহার থেকে দূরে থাকা উচিত, নইলে সাহিত্যের মুখ্য উদ্দেশ্যই গায়েব হয়ে যাবে। তারা সাহিত্যকে সমাজের দর্পণ-মাত্র মনে করেন না বরং দীপক মনে করেন, যার কাজ আলোক ছড়ানো। ভারতের প্রাচীন সাহিত্য আদর্শবাদেরই সমর্থক। আমাদেরও আদর্শেরই মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। হ্যাঁ, বাস্তবের এমন সংমিশ্রণ হওয়া উচিত যাতে সত্য থেকে দূরে চলে যেতে না হয়।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top