উপন্যাস লেনিন।। পর্ব-৯ ।। আশানুর রহমান খোকন

লেনিন-পর্ব ৯। রায়।।

গোপন সিনেট ট্রাইবুনালে শুরু হলো আসামীদের জেরা পর্ব। জেরার জন্য আদালতে প্রথমেই ডাকা হলো কানসারকে। ডায়ার তার সামনে থাকা পুলিশকে ইতোপূর্বে তার দেয়া জবানবন্দীর দিকে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে জানতে চাইলেন,

-তোমাকে এই গ্রুপে কে যুক্ত করেছিল?

-শেভেরেভ।

-তোমার কী দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল?

-পহেলা মার্চ মহামান্য জারের চলাচলের খবরের সংকেত প্রদান করা।

-তুমি উলিয়ানভকে চেনো?

-জি, জনাব।

-কিভাবে চেনো?

-একটা খবর দিতে উলিয়ানভের বাসায় গেলে আমি তাকে ও লুকাশেভিচকে বোমা বানাতে দেখেছিলাম।

-কী ধরণের বোমা?

-সিলিন্ডার বোমা।

-তুমি নিজেকে এর মধ্যে জড়াতে গেলে কেনো?

-হুজুর, আমি না জেনে না বুঝে এদের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সংকেত প্রদান ছাড়া আমি আর কোন কিছুর সাথে যুক্ত ছিলাম না। একথা আমি যেদিন ধরা পড়ি প্রথম জিজ্ঞাসাবাদেই পুলিশকে বলেছি হুজুর। আমি নির্দোষ হুজুর। আমাকে মাফ করে দিন।

ডায়ার আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে তাকে নিয়ে যেতে পুলিশকে নির্দেশ দিলেন।

এরপর ডাকা হলো গরুখিনকে। সে তার রুমমেট কানসার থেকে একটু আলাদা কথা বললেও নিজেকে নির্দোষ দাবী করে। গরুখিনের ইতোপূর্বে পুলিশকে দেয়া বক্তব্যেই ডায়ার গ্রহণ করে আদালত কক্ষে রাখা বোমার দিকে আঙ্গুলি তুলে জানতে চাইলেন,

-তুমি এই বোমাগুলো চিনতে পারছো?

-আমি কানসারের সাথে উলিয়ানভের বাসায় গেলে তাদের দু’জনকে এই বোমাগুলো তৈরী করতে দেখেছিলাম।

গরুখিনের মতো ভলোকভও একই কথা বলে এবং নিজেকে নির্দোষ দাবী করে। ডায়ার এদের পিছনে সময় বেশী ব্যয় না করে বোমা নিক্ষেপকারীদের একে একে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। প্রথমেই ডাক পড়ে জেনারেলভের। শক্ত-সামর্থ চেহারা ও মুখে কালো দাঁড়ি থাকায় বয়সে তুলনায় তাকে যেন একটু বয়স্কই লাগছিল। ডায়ার প্রশ্ন করে,

-তুমি কিভাবে যুক্ত হয়েছো?

-আমাদের ছাত্রদের সমিতি ‘ডন এন্ড কুবান জেমলিচেষ্টাভোতে’ গভরুখিন একদিন উলিয়ানভকে নিয়ে আসে। তারপর উলিয়ানভই আমাকে শেভেরেভের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। উলিয়ানভ ও গভরুখিন আমার থাকার জন্য একটি ঘর এবং ল্যাবরেটরী ও রসদ রাখার জন্য অন্য একটিসহ মোট দুটো ঘর ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেয়।

-তুমি লুকাশেভিচকে চিনতে?

-দু/একবার দেখেছি?

-সে যে বোমা বিশেষজ্ঞ সেটা জানতে?

-আমি তার সম্পর্কে কিছু জানি না।

-তুমি তাকে বোমা বানাতে দেখোনি?

-জি, না। আমি আমার পাশের ঘরে বসে উলিয়ানভকে বোমা বানাতে দেখেছি। নাইট্রিক এসিড নিয়ে আসা থেকে অন্য সব কাজ উলিয়ানভই সমন্বয় করে।

তার বক্তব্য শেষ হতে হতে বেলা পড়ে গেলো। ডায়ার সন্ধা পর্যন্ত আদালত মুলতুবি রাখার ঘোষণা দিয়ে বললেন রাতের খাবার শেষে আদালত আবার বসবে। আদালতের কাজ যখন আবার শুরু হলো তখনও বাইরে কিছুটা আলো আছে। এবার ডাকা হলো আন্দ্রেয়ুশকিনে। ডায়ারের প্রশ্নের উত্তরে সে শেভেরেভকে আড়াল করে সব দায় সাশার কাঁধে চাপালো। একই সাথে তার বক্তব্যে সে তার বান্ধবী সারডিয়ুকোভাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলো।

তারপর ডাকা হলো অসিপানভকে। বেশ ঠান্ডা ও ভাবলেশহীন অসিপানভ নিজেকে এই ষড়যন্ত্রের একজন হিসাবেই দাবী করলো। ডায়ার জানতে চাইলো,

-এই ষড়যন্ত্রের সাথে আর কে কে যুক্ত ছিল?

-আমি কারো নাম বলবো না।

-তুমি জানো এর শাস্তি কী হতে পারে?

-নিজেকে যেদিন এই মহান কাজটির সাথে যুক্ত করেছিলাম তার পরিণাম জেনেই করেছিলাম। আপনি বৃথাই আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন।

ডায়ার দেখলো এর পিছনে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। ডায়ার তখন সংগঠক ও বোমা হামলার নেতাদের হাজির করার নির্দেশ দিলেন। ডাকা হলো আলেকজান্ডার উলিয়ানভ ওরফে সাশাকে। অভিযুক্তদের মধ্যে সাশাকেই সবচেয়ে কম বয়স্ক লাগছিল। অন্যদের কারো মুখে দাঁড়ি-গোঁফ, কারো মুখে শুধুই গোঁফ। কিন্তু ক্লিন শেভের এবং মাথা ভর্তি চুলের সাশাকে সেদিন আদালত কক্ষেও দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় লাগছিল। ডায়ার সাশার কাছে জানতে চাইলো,

-পহেলা মার্চের এই ন্যাক্কারজনক ষড়যন্ত্রের মুল নায়ক কি তুমি?

-না।

-তাহলে কে? নাম বলো।

-আমি দুঃখিত কারো নাম জানাতে পারছি না।

-তুমি কী অন্যদের এই কাজে যুক্ত করেছো?

-না।

-তোমাকে কে এমন জঘন্যকাজে যুক্ত করেছে?

-কেউ না। আমি নিজের গরজে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছি। আর এই কাজটিকে আমার নৈতিক কর্তব্য মনে করি।

তার বক্তব্যের দৃঢ়তায় উপস্থিত সকলে অবাক হয়। সাশাকে ডায়ার আরো যে সব প্রশ্ন করে তাতে সাশা শেভেরেভের ভুমিকাটুকু স্বীকার করে। অন্যদের জেরার মুখে যতটুকু সত্যতা ইতোমধ্যে আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাকে সাশা অস্বীকার না করলেও সতর্ক থাকলো যাতে নতুন কোন তথ্য সে যোগ না করে। সে নিজেও লুকাশেভিচকে আড়াল করতে গিয়ে বলে যে শুধুমাত্র সিলিন্ডার বোমা তৈরীতে সাহায্যের জন্য সে লুকাশেভিচের সাহায্য নিয়েছিল।

এরপর আনা হলো শেভেরেভকে। আদালতে শেভেরেভ ক্রমাগত মিথ্যা বলতে থাকলো। সব দোষ সে দিল গভরুখিনকে যে ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়েছে। সেদিনের মতো আদালতের কাজ শেষ হলো।

ষোল তারিখ দুপুরবেলা আদালতের কাজ পুনরায় শুরু হলে পুলিশ প্রহরায় লুকাশেভিচকে আদালতে আনা হলো। সে যে ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমেই সেটা অস্বীকার করলো। পোলিশ উচ্চারণে নিচু স্বরে সে যখন উত্তর করছিল ডায়ার দু’বার তাকে জোরে কথা বলতে নির্দেশ দিল। লুকাশেভিচ তার বক্তব্যে সামাজিক ন্যয়বিচার ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলতে শুরু করলে ডায়ার তাকে চুপ করতে বলে এবং জানতে চায়,

-তুমি এই জঘন্য কাজে কিভাবে যুক্ত হলে?

-গভরুখিন আমাকে যুক্ত হতে বলে।

শেভেরেভের মতো সেও গভরুখিনের নাম বলায় ডায়ার খুশী হতে পারে না। বিশেষতঃ গভরুখিন যেখানে পলাতক। তাই ডায়ার তাকে আবারও প্রশ্ন করে,

-আর কেউ তোমাকে এই চক্রান্তে যুক্ত করেছিল?

-হ্যাঁ। গভরুখিনের সহযোগী হিসাবে এ কাজে আলেকজান্ডার উলিয়ানভও যুক্ত ছিল।

-তুমিই তো বোমা তৈরীর মুল কারিগর?

-না, জনাব। সিলিন্ডার বোমা তৈরীর কাজে শারিরীকভাবে সক্ষম একজনের দরকার হওয়ায় উলিয়ানভ আমার সাহায্য চেয়েছিল।

ডায়ার যেন এমন একটা উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিল। লুকাশেভিচের সাক্ষ্যেও প্রমাণিত হলো যে উলিয়ানভ বোমা তৈরী এবং জার হত্যা চক্রান্তের প্রধান হোতা।

এরপর নভোরস্কিকে আনা হলো। নভোরস্কিও লুকাশেভিচের মতো তার সম্পৃক্ততার কথা প্রথমেই অস্বীকার করে। ডায়ার তখন প্রশ্ন করে,

-তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে কি পড়ছো?

-আমার শেষ বর্ষের থিসিস নিয়ে কাজ করছি।

-থিসিস? কী নিয়ে থিসিস করছো?

-কান্দিদাত নিয়ে।

-আলেকজান্ডার উলিয়ানভকে কিভাবে চেনো?

-আমরা একই বর্ষের ছাত্র।

-তুমি তাকে তোমার শ্বাশুড়ির বাড়ীতে পাঠিয়েছিলে কেন?

-তার বাবা মারা যাওয়ার পর সে আর্থিক সংকটে পড়ে। আমাকে সেটা বললে আমি টিউটর হিসাবে থাকার জন্য সেখানে পাঠাই।

-হুম। তুমি ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখে পারগোলভোতে কী কী জিনিষ পাঠিয়েছিলে?

-সাশার রসায়ন ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য কাজে লাগবে এমন কিছু জিনিষপত্র পাঠিয়েছিলাম।

-তোমার বাসায় সিলিন্ডার বোমা এলো কিভাবে?

-আন্দ্রেয়ুশকিন ও জেনারেলভ রেখে আসে।

-তোমাকে পিটার পল দূর্গের সেল থেকে স্পালোরনায়া স্ট্রিটের প্রাথমিক ডিটেনশন জেলে বদলি করা হয়েছিল কেন?

-আমার নার্ভাস এ্যাটাক হয়েছিল।

-নাকি তুমি ভয় পেয়েছিলে?

-ভয় পাবো কেন? আমি কোন অন্যায় করিনি।

-তুমি ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলছো।

-কথাটা ঠিক না।

-আচ্ছা প্রাথমিক ডিটেনশন জেলে তোমাকে কোথায় রাখা হয়েছিল?

-আমাকে ১৮৭ নম্বর সেলে রাখা হয়েছিল।

-তোমার পাশের সেলে কে ছিল?

-অ্যান্টন অষ্ট্রুমভ নামের একজন বন্দী ছিল।

– তার পাশের সেলে কে ছিল?

-আরসেনি খেননিখভ।

-অ্যান্টনকে তুমি আগে থেকে চিনতে?

-না। ওখানেই পরিচয়। ওখানে আমাকে নেবার পর আমার ও আরসেনির মাঝের সেলটি খালি ছিল। একদিন পুলিশ তাকে সেখানে নিয়ে আসে।

-কত নম্বর সেল সেটা?

-১৮৮।

-তুমি তার কাছ থেকে কিছু শিখেছিলে?

-হ্যাঁ, সে আমাকে শিখিয়েছিল কিভাবে বই ব্যবহার করে কোডের মাধ্যমে জেলের অন্যদের কাছে খবরাখবর পাঠাতে হয়। একাজে সে জেলের লাইব্রেরির বই কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটাও শিখিয়েছিল।

-তাকে তুমি উলিয়ানভ সম্পর্কে কী বলেছিলে?

ডায়ারের এই প্রশ্নে নভোরস্কি আমতা আমতা করতে থাকে। কারণ যে কথাটা সে অ্যান্টনকে বলেছিল সেটা স্বয়ং অ্যান্টন যদি না বলে থাকে তবে ডায়ারের সেটা জানার কথা নয়। কিন্তু অ্যান্টন তো তার মতই একজন আসামী ছিল? তবে কী সে পুলিশের লোক? একথাটা মনে হতেই নভোরস্কির মাথার মধ্য যেন বিদ্যুৎ খেলে খায়। হায়! কী বোকামীই না সে করেছে! ডায়ারের অন্য কোন প্রশ্নের জবাব দেয়া থেকে চুপ থাকাকে সে তখন শ্রেয় মনে করে। কারণ সে এ্যান্টনকে বোমা হামলার পরিকল্পনা, সরঞ্জামাদি সরবরাহ, তার শ্বাশুড়ীর ভূমিকা এবং এই গোটা ব্যপারে সাশার যে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা ছিল তার কোন কিছুই বলতে বাদ রাখেনি।

পুলিশের তথ্যদাতা এই এন্টন অষ্ট্রুমভই পরে পুলিশকে শেভেরেভ ও নভোরস্কি সম্পর্কে গোপন সব তথ্য প্রদান করে। পুলিশ সে সব তথ্য মন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয়কে দিয়েছিল। আর বিচারের আগেই মন্ত্রী সে তথ্য পৌঁছে দেন জার আলেজান্ডার-৩ কে। মন্ত্রী জারকে এটাও বলেন যে, ‘উলিয়ানভের মতো সাহস, নিবেদিত প্রাণের অন্য কেউ ছিল না’।

ফলে এরকম পেট পাতলা একজন মানুষকে গ্রুপে নেবার খেসারত আবারও দিতে হলো সাশাকে।

পরের শুনানি চললো তিনজন নারী বন্দীকে নিয়ে। মারিয়া আনানিনা নিজে পেশায় মিডওয়াফ ও সার্জন এ্যাসিসটেন্ট। তিনি অনেকদিন ধরেই নারোদনিকদের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাকে আদালতে আনা হলে তাকে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। ডায়ারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। অনেক চেষ্টায় তিনি আদালতে বলেন যে সাশাকে তিনি তার ছেলের টিউটর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সাশা একদিন পড়িয়েছিল বাকী কয়েকটাদিন তার ঘরে রসায়ন পরীক্ষার প্রস্তুতির নিয়ে ব্যস্ত ছিল। মারিয়া সত্য বলছে না দেখে ডায়ার প্রশ্ন করে,

-আপনি নাইট্রোগ্লিসারিন চেনেন?

-আমি নার্স। চিনি বৈকি।

-নাইট্রোগ্লিসারিনের স্ট্যাবিলিটি পরীক্ষার জন্য কী লাগে জানেন?

-সেটা জানি না।

-উলিয়ানভ আপনাকে এই পরীক্ষাটা করে দেখায়নি?

-না, সে কেন আমাকে এটা পরীক্ষা করে দেখাবে?

-আমাকে আপনি কোন প্রশ্ন করবেন না। আপনাকে যে প্রশ্ন করা হচ্ছে সেগুলোর উত্তর দিন। নাইট্রোগ্লিসারিনের স্ট্যাবিলিটি পরীক্ষা কেন করা লাগে জানেন না?

-আমি সত্যিই জানি না।

-আপনি আদালতে ক্রমাগত মিথ্যা কথা বলছেন। এটাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ সেটা জানেন তো?

ডায়ারের এমন কথায় মারিয়া চুপ করে থাকলে ডায়ার আবার প্রশ্ন করে,

-ঐ পরীক্ষাটা করার জন্য লিটমাস পেপার লাগে। উলিয়ানভ লিটমাস কাগজই ব্যবহার করে আপনাকে সেটা দেখিয়েছিল।

-মিথ্যা কথা।

ডায়ার তখন একটা পাত্র থেকে একটি ব্যবহার করা লিটমাস পেপার তুলে ধরে বলেন,

-এই কাগজটা চিনতে পারছেন?

মারিয়া চমকে ওঠে। সাশা তো এটা দিয়েই পরীক্ষা করে দেখিয়েছিল। পুলিশ এটা কিভাবে পেলো? মনে মনে ভাবে-হায়, হায় সে কেন আরো সাবধানতা অবলম্বন করেনি। তাই মারিয়া চুপ করে থাকে। ডায়ার তখন বলে,

-আপনার বাড়ী থেকে পুলিশ আপনাকে যেদিন গ্রেফতার করে তখন নাইট্রোগ্লিসারিনের বোতলগুলোর সাথে এটাও উদ্ধার করে। আপনার আর কিছু বলার আছে?

মারিয়া মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে। ডায়ার আর কোন প্রশ্ন না করে তাকে যেতে বলে।

রাইসা ছিল ধর্মসূত্রে ইহুদি। রাইসাকে দেখেই ডায়ারের মনে হলো মেয়েটি ভীষণ উগ্র। বিশেষতঃ তার ছোট চুল ও পোষাকের কারণে। ইহুদি বিদ্বেষী ডায়ার তাই প্রশ্ন করে,

-তোমার ফ্যামিলি ইনকাম কত?

নার্ভাস রাইসা ‘ফ্যামিলি ইনকাম’ জানতে চাওয়ায় সে তার বাবার চাকুরীর কথা বলতে শুরু করে। ডায়ার তখন প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে তার বাবা একজন ইহুদি চোরাকারবারী। ভিলনিয়াসের চোরাকারবারিদের একটা বড় অংশই ছিল ইহুদি। একই সাতে আদালত রাইসার জীবনযাত্রার বিষয়ে বেশী আগ্রহ প্রকাশ করে। বিশেষতঃ ইতালিয়ান স্ট্রিটে সে আর গভরুখিন পাশাপাশি রুমে থাকতো এবং রুম দু’টো শুধুমাত্র কাঠের আসবাবপত্রের উপর পর্দা দিয়ে পৃথক করা ছিল। রাইসা ও গভরুখিনের বাড়ীওয়ালী বুড়ি প্রকোফায়েভা যেমন রাইসাকে চরিত্রহীন মনে করতো বিচারক ডায়ার রাইসাকে তেমনিভাবে চরিত্রহীন নারী হিসাবে প্রমাণের চেষ্টা করতে থাকে। আর তাই তিনি প্রশ্ন করেন,

-গভরুখিনের সাথে তোমার কী সম্পর্ক?

-আমরা পাশাপাশি ঘরে ভাড়া থাকি। এছাড়া আমার বন্ধু ইউজেনিয়া খেলিভনিকোভা গভরুখিনের বাগদত্তা। ইউজেনিয়ার ভাই ‘ডন ও কুবান জেমলিয়াচেষ্টাভোর’ সাথে যুক্ত। গভরুখিনের সাথে আমার এক সময় একটা রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল কিন্তু সে যখন তার সুইসাইডাল নোটটি পড়ে শোনায় আমার মনে হয়েছিল সে মানসিকভাবে অসুস্থ এবং তার সাথে আমি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ত্যাগ করি।

-তুমি ভ্লাদিমির পপোভ নামের একজনের সাথে ওয়ারশ ষ্টেশনে কেন দেখা করেছিলে?

-আমি নার্স। তার বোন অসুস্থ। আমি তাকে দেখভাল করি। পপোভ আমার সাথে তার বোনের শারিরীক বিষয় নিয়ে আলাপ করতে সেখানে যেতে অনুরোধ করেছিল।

ডায়ার এসময় দু’টো বিষয়ে কোন প্রশ্ন না করায় রাইসা মনে মনে স্বস্তি বোধ করে। সাশার সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে যেমন কোন প্রশ্ন ডায়ার করে না ঠিক তেমনি তার সাথে বিপ্লবী ভাসিলি ব্রাঝনিকভের সাথে যে যোগাযোগ হয়েছিল এবং সাশার নির্দেশে তাকে সে একটা কাগজ পৌঁছে দিয়েছিল সে বিষয়েও ডায়ার কোন প্রশ্ন করে না। ডায়ার আবার জানতে চায়,

-আন্দ্রেয়ুশকিনের সাথে তোমার কী সম্পর্ক?

-আন্দ্রেয়ুশকিন খুব ভাল কবিতা পড়ে। আমার প্রিয় ইউক্রেনীয় কবি ‘তারাস শেভচেনকোর’ কবিতা পড়তে আমি অনুরোধ করলে মাঝে মাঝে সে আসতো।

-আর জেনারেলভের সাথে তোমার যোগাযোগের কী কারণ?

-জেনারেলভ নিজেও কবিতা পছন্দ করে বলে সেও মাঝে মাঝে যোগ দিত।

ডায়ার রাইসার উত্তর শুনে সামনে থাকা কাগজে খসখস করে লিখলেন, ‘একজন নারোদনিক ইহুদী নারী কসাক যুবকদের ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদের রুপকার এক কবির কবিতা শোনার জন্য রাতে তার ঘরে আমন্ত্রণ জানাতো’।

এরপর ডাকা হলো সারডিয়ুকোভাকে। রাইসার মতই সে অনেক প্রশ্নের চৌকস জবাব দিল। বোমা হামলার বিষয়ে তার সংযুক্তির বিষয়ে ডায়ারের প্রশ্নের জবাবে সে বলে,

-হুজুর চিন্তা করুণ। আন্দ্রেয়ুশকিন যে চিঠি লিখে আমাকে বিবাহের প্রস্তাব করলো সেই একই চিঠিতে সে জার হত্যা চেষ্টায় তার সম্পৃক্ততার কথা জানালো! আমার মানসিক অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন। আমার ভুল, আমি তাকে ভালবেসেছিলাম। এছাড়া আমার কোন দোষ নেই, আমি নির্দোষ।

ঠিক সেই মুহূর্তে আদালতের কাছে সন্ত্রাসী ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অন্য কোন প্রমাণ না থাকায় ডায়ারের মনে হলো মেয়েটি প্রেমের কারণে নিজের অজান্তে নিজেকে কিছুটা হয়তো জড়িয়ে ফেলেছে। তাকে অন্য কোন প্রশ্ন না করে ডায়ার সন্ধা পর্যন্ত আদালত মুলতবি রাখলো।

সতেরই এপ্রিল বিকাল পর্যন্ত সকলের বক্তব্য থেকে সাংঘাতিকভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল যে সব জায়গায় উলিয়ানভের পায়ের ছাঁপ আছে এবং সে এই বোমা হামলা পরিকল্পনার মুল নায়ক। এমনকি বিষয়টি এভাবেই আদলতের সামনে এলো যে শেভেরেভের থেকে সাশা ও গভরুখিনের ভূমিকা অত্যাধিক। একই সাথে আদালতের কাছে এটাও প্রতীয়মান হলো যে শেভেরেভ ও গভরুখিন ঘটনার বেশ কিছুদিন আগেই সেন্ট পিটার্সবার্গ ছেড়ে যাওয়ায় নেতৃত্বের ভার সাশার উপরেই পড়ে। একই সাথে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি লুকাশেভিচের ভূমিকা তার নিজের বক্তব্য ও অন্যরা তাকে আড়াল করতে চাওয়ায় বোমা তৈরীতে তার মুখ্য ভূমিকা গৌণভাবে আদালতের সামনে উঠে আসে। আদালতে সাশা নিজেই নিজের ভু্মিকাকে মুখ্য করে তোলে এবং অন্য অভিযুক্তরা তাদের বক্তব্যে সাশার বক্তব্য সমর্থন করে গেলো।

সেদিন সন্ধার সময় মেজর জেনারেল ফাইদরোভকে আদালত তলব করে বোমা বিষয়ে তার বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদানের জন্য। ডায়ারের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন,

-বোমাগুলো ডিজাইন করা হয়েছে দূর্বলভাবে।

ফাইদরোভের বক্তব্য শুনে লুকাশেভিচ একটু আশাবাদী হয়ে ওঠে এই ভেবে যে এই পয়েন্টটি কেসটাকে দূর্বল করে দিতে পারে। কিন্তু সাশা ফাইদরোভের বক্তব্য প্রত্যাখান করে। আদালতে উপস্থিত সরকার পক্ষের আইনজীবি নেখলিউদভের তখন মনে হলো বিষয়টি একদিকে যেমন সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙুরতা তুলে ধরলো আবার একই সাথে গোপন দলগুলির সমন্বয়হীনতা, কর্মীদের রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও টেকনিক্যাল অদক্ষতাকে স্পষ্ট করে তুললো।

এপ্রিলের ১৮ তারিখে মারিয়াকে ট্রাইবুনালে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হলো। সেদিন অভিযুক্তদের নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া হলে প্রথমে জেনারেলভ ও আন্দ্রেয়ুশকিন তাদের বক্তব্য রাখে। তারা বিশ বছর আগে নারোদনিক নেতা লভরভের লেখা আচরণবিধি ‘আদালতে কি রকম ব্যবহার করতে হবে?’ অনুযায়ী ক্ষমাভিক্ষা বা নিজেদের জন্য কোন আইনজীবি নিয়োগের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে তাদের কাজের স্বপক্ষে বক্তব্য রাখলেও কোন বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত থাকে। ডায়ারের প্রশ্নের উত্তরে তাই সাশা বলে,

-নিজের কাজের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি কোন কথা বলতে চাই না। তবে আমি রাশিয়ার পরিবর্তনকামী মানুষের সংগ্রামের ঐতিহাসিক কারণ ও আজকের পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে আমার বক্তব্য রাখতে চাই।

ডায়ার অনুমতি দিতে মৃদু আপত্তি জানালেও অন্য সিনেটর ও সরকার পক্ষের আইনজীবির পরামর্শে তিনি রাজী হলে সাশা পিসারেভ, ডব্রোলিউবভ, চেরনিশেভস্কি থেকে শুরু করে বাকুনিন,নেখায়েভ, লভরভসহ পরিবর্তনকামী বুদ্ধিজীবিদের ভূমিকার কথা এবং রাশিয়ার জনগণের সংগঠিত হবার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলে,

-বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কোন পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব না। এমনকি সাধারণ অধিকারগুলো যেমন- কথা বলা বা চিন্তা করার স্বাধীনতাও অর্জন করা সম্ভব নয়। সেটা করতে হলে সংগঠিত কোন গ্রুপের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সেটা সম্ভব।

মারিয়া সাশার বাগ্মিতায় অবাক হচ্ছিল এবং শুরু থেকেই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। কিন্তু আদালত সাশার বক্তব্য শুনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল না। বিশেষতঃ বিচারক ডায়ার স্বয়ং। তাই তিনি বাঁধা দিয়ে জানতে চাইলেন,

-তুমি এদের সন্ত্রাসী বক্তব্য ও কাজগুলোকে সমর্থন করো?

উত্তর দেবার আগে সাশা একটু থামে। সবার কৌতুহলী চোখগুলোর দিকে একবার চোখ বুলাতে গিয়ে দেখে মারিয়া সাশার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সাশার বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি পিটানোর শব্দ হয়। মায়ের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ডায়ারের দিকে তাকিয়ে বলিষ্ঠ কন্ঠে সে বলতে থাকে,

-সন্ত্রাস, একধরণের আত্মরক্ষা। প্রবল শক্তিমানদের বিরুদ্ধে আদর্শে উজ্জীবিত মানুষের এটা এক ধরণের শক্তি প্রয়োগ। —রাশিয়ার জনগণের মধ্যে সব সময় কিছু মানুষ ছিলেন যাঁরা তাদের মাতৃভুমির দূর্দশা লাঘবে হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তাঁরা কখনও মনে করেননি যে তারা দেশের জন্য কিছু ত্যাগ করছেন। বরং সেটাকে তারা মাতৃভূমির প্রতি তাদের দায় মনে করেই করেছে। এটা তাদের ‘রোদিনা’।

সাশার বক্তব্যের এ পর্যায়ে মারিয়ার মনে হলো সাশা জেলখানায় এই ‘রোদিনা’র কথায় তাহলে বলেছিল? সাশাও কি তার নিজের জীবন এতটাই তুচ্ছ মনে করে? মা, পরিবার, নিজের জীবন, সব কিছু থেকে মাতৃভূমি বড়? এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাশা তো নিজে থেকেই ফাঁসির দঁড়ি গলায় পরতে চাচ্ছে। মারিয়া ভাবে সাশা নিজেই তো বাঁচতে চায় না, তাকে আমি কিভাবে রক্ষা করবো? সাশার ফাঁসি হবে এমন ভাবনায় তাই হঠাৎ করে মারিয়ার মাথাটা ঘুরে ওঠে। তিনি সাশার বক্তব্য শুনার জন্য আর বসে থাকতে পারলেন না। তিনি আদালত কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন অনেকটা টলতে টলতে। সাশার অবশ্য সেদিকে কোন খেয়াল নেই। তার বক্তব্যের মাঝখানেই ডায়ার তাকে থামিয়ে দিয়ে আবার প্রশ্ন করে,

-তুমি কেন এমন জঘণ্য কাজে জড়ালে?

-আমরা কোন জঘণ্য কাজ করিনি বরং যে কাজটি করতে চেয়েছিলাম সেটাকে মহৎ জেনে ও মেনেই করেছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্যে রাশিয়ার অসুখী মানুষকে মুক্তি দেয়া। যখন জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা নেই, ন্যূনতম কোন অধিকার নেই, যখন জনগণের অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক লড়াইকে কঠোর হাতে দমন করা হয় সে রকম একটি অবস্থায় প্রতিরোধের একটিই পথ-আর সেটা ’সন্ত্রাস’। এই রাষ্ট্র এতটাই শক্তিশালী ও নির্মম যে আমরা প্রকাশ্যে লড়াই করতে পারছি না। ফলে যে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাকে সন্ত্রাসের পথই বেছে নিতে হবে। সন্ত্রাস হচ্ছে রাষ্ট্রের এই চরম নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমাদের ‘জবাব’। এটাই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে জনগণের নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার দিতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যায়।

সাশার এমন বক্তব্যে ডায়ার বিব্রতবোধ করতে থাকে তাই তাকে আবার থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে,

-তুমি মৃত্যুকে ভয় পাও না?

-আমি মৃত্যুকে ভয় তো পায়ই না বরং দেশের জন্য মৃত্যু হলে সেটাকে পরম সৌভাগ্যের মনে করবো।

ডায়ার সাশাকে আবার থামিয়ে দিল। অন্য সিনেটরাও তার বক্তব্য শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেললো। ডায়ার তখন পুলিশকে আদেশ দিল সাশাকে নিয়ে যেতে।

আদালত একে একে অন্যদেরকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলেও নতুন করে কেউ কিছু না বলায় পরের দিন ১৯শে এপ্রিল বেলা ২টা পর্যন্ত আদালত মুলতবি রাখা হলো। উনিশে এপ্রিল যখন আদালত বসলো সরকার পক্ষের আইনজীবী নেখলিউদভ আসামীদেরকে উনত্রিশটি প্রশ্নের ‘হ্যাঁ ও না’ আকারে উত্তর দিতে বললে সকলেই উত্তরে হ্যাঁ বলার পর তিনি পনেরজন আসামীরই ফাঁসি চাইলেন।

আদালতে তখন পিন পতন নিরবতা। বিচারপতি ডায়ার বয়স ও অপরাধের ধরণ বিবেচনায় কানসার, গরুখিন ও ভলোকভকে সাইবেরিয়ায় ২০ বছরের জন্য নির্বাসনের আদেশ দিলেন। মারিয়া আনানিনাকেও ২০ বছরের জন্য নির্বাসন দেয়া হলো এই কারণে যে সে তার জামাতা নভোরস্কি ও মেয়ে লিডিয়ার প্রভাবে এই কাজে সম্পৃক্ত হয়েছে। পিলসুডস্কির বয়স বিবেচনায় ১৫ বছরের নির্বাসন আর পাসকোভস্কির ১০ বছরের নির্বাসন দেয়া হল। রাইসাকে যাবজ্জীবন নির্বাসন দেয়া হলো সাইবেরিয়াতে। সারডিয়ুকোভাকে দুই বছরের জেল দেয়া হলো এই বিবেচনায় যে তার নিজের অপরাধ একান্তই লঘু । শেভেরেভ, লুকাশেভিচ, উলিয়ানভ, অসিপানভ, জেনারেলভ, আন্দ্রেয়ুশকিন ও নভোরস্কিকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হলো। একই সাথে প্রাণভিক্ষার জন্য ২৫ শে এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হলো।

এবার পেসকোভস্কি শেষবারের মতো সাশাকে বাঁচাতে চেষ্টা শুরু করলেন। তিনি উপর মহল থেকে এমন আভাস পেলেন যে প্রাণভিক্ষা চাইলে সেটা জার মঞ্জুর করতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে তাকে নির্বাসন দেয়া হতে পারে। প্রাণভিক্ষা চাওয়ার শেষ তারিখ ২৫শে এপ্রিল। পেসকোভস্কির এমন কথায় মারিয়া আবার আশার আলো দেখতে পেলেন। আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে পেসকোভস্কি আবেদনপত্রের একটি খসড়া তৈরী করে নিয়ে গেলেন সাশার সাথে দেখা করতে। দিনটি এপ্রিলের ২৪ তারিখ। সাশা পেসকোভস্কির প্রস্তাব প্রথমেই না করে দিল। পেসকোভস্কি তখন তাঁর শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন।

-সাশা, তুমি জানো আন্নাও জেলে। তোমার ফাঁসির রায়ে তোমার মা ভেঙে পড়েছেন। তিনি ভীষণ অসুস্থ। ডাক্তার বলেছেন যে কোন মুহূর্তে যে কোন দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তোমার মায়ের যদি কিছু হয়……!

এ পর্যন্ত বলে তিনি থামলেন। বুঝার চেষ্টা করলেন সাশার কী প্রতিক্রিয়া হয়। সাশা তাঁর একথায় একটু আনমনা হয়ে পড়ে। পেসকোভস্কি ভাবলেন, যে অস্ত্র তিনি ব্যবহার করেছেন সেটা কাজ করতে শুরু করেছে। তাই তিনি গলাটা আরেকটু উঁচু করে বললেন,

-আমি স্পষ্ট করেই বলছি এমতাবস্থায় তোমার মা যদি হঠাৎ করে মারা যান তাহলে তোমার ছোট চারটি ভাই-বোনের কী হবে একবারও ভেবে দেখেছো? তোমার বাবা বেঁচে নেই, আন্নাও জেলে। ভেবে দেখো ভ্লাদিমিরের বয়স মাত্র সতের।

পেসকোভস্কির গলার স্বর, বলার ভঙ্গি ও পরিবারের এমন সংকটময় চিত্র তুলে ধরায় সাশার মন নরম হয়ে পড়ে। সে তখন বলে,

-ঠিক আছে। শুধুমাত্র মা ও পরিবারের কথা ভেবে আমি আবেদন করতে রাজী আছি।

পেসকোভস্কি সাশার কথায় খুশী হয়ে পকেট থেকে কাগজটি বের করে বললেন,

-তাহলে এই আবেদনপত্রে একটা স্বাক্ষর করে দাও।

সাশা আস্তে আস্তে কাগজটি তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করে। একবার চোখ বুলিয়েই বলে,

-এই কাগজে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে প্রাণভিক্ষা চাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি আমার মত করে লিখে দিচ্ছি।

পেসকোভস্কি সাশার কথায় অসন্তোষ্ট হলেন। কিন্তু উপায় নেই দেখে তিনি রাজী হলেন। পুলিশকে একটি কাগজ ও কলম আনতে অনুরোধ করলেন। কাগজ-কলম এলে সাশা লিখলো,

“আমি জানি যে আমি যে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলাম এবং সেই কাজে আমার যে সম্পৃক্ততা তাতে আপনার কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়াটা অনেক বড় কিছু। কিন্তু আমার মা আছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর শরীর ভীষণ খারাপ এবং আমার মৃত্যুদন্ড হলে তিনি যে কোন সময় দূর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। আমার মায়ের জন্য এবং আমার ছোট ভাই-বোনেরা যারা সম্প্রতি তাদের পিতাকে হারিয়েছেন তারা সম্পূর্ণভাবে আমার মায়ের উপর নির্ভরশীল বিধায় আমি আপনার কাছে প্রাণভিক্ষা চাচ্ছি এবং বিনিময়ে অন্য কোন শাস্তি কামনা করছি।

আমি প্রাণে বাঁচলে আমার মা শারীরিকভাবে সুস্থ্য হয়ে উঠবেন এবং তিনি পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবেন যাদের কাছে তাঁর জীবনের মুল্য অপরিসীম। পরিবারের সকলের জন্য যে চরম দূর্ভাগ্য আমি বয়ে এনেছি সেটা বর্ণনাতীত এবং আমার জন্য আমার মায়ের যেন মৃত্যু না হয়; তাহলে অন্ততঃ একটা অপরাধবোধ থেকে আমি মুক্তি পাবো।”

এপ্রিলের ২৬ তারিখ। সকাল প্রায় দশটা। সাশা তার সেলে বসে আছে। হাতে দু’টো চিঠি। দু’টো চিঠিই লিখেছে আন্না। নানা ঝামেলায় প্রথম চিঠিটির উত্তর দেয়া সাশার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফাঁসির আদেশ হয়েছে। প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে হয়েছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। সাশা এখন অনেকটা ভারমুক্ত। আন্নার দ্বিতীয় চিঠিতে সে লিখেছে, “পৃথিবীতে তোমার থেকে ভাল ও মহৎ কোন মানুষ নেই। শুধু আমিই এটা মনে করি না বা তুমি আমার ভাই বলেই বলছি না, যারাই তোমাকে জানে-সকলে এমনটাই মনে করে। সাশা, তুমি আমার জীবনের আলো”।

চিঠিটি আরেকবার পড়ে সাশা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। তারপর সাশা কাগজ ও কলম নিয়ে লিখতে শুরু করে।

এপ্রিল ২৬, ১৮৮৭

পিটার পল দূর্গ, সেন্ট পিটার্সবার্গ।

প্রিয় আন্না,

তোমার চিঠির জন্য অনেক ধন্যবাদ। চিঠিটি কয়েকদিন আগে পেয়ে কী যে খুশী হয়েছিলাম! আমি উত্তর দিতে কয়েকদিন দেরী করলাম কারণ আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে মুখোমুখি দেখা হবে, কিন্তু আমি জানি না সেটা আদৌও সম্ভব হবে কিনা।

প্রিয় আন্না, তোমার আজকের এই পরিণতির জন্য আমিই দায়ী। প্রথমেই আমি এই কথাটা বলে নিতে চাই এবং তার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি। তোমার এবং মায়ের যে কত ক্ষতি করেছি সেটা বলে শেষ করা যাবে না, সেটা আমরা দু’জনেই জানি। আমাকে ক্ষমা ক’রো যদি সম্ভব হয়।

এখানে থাকার জায়গাটা মন্দ নয় এবং খবারগুলোও ভাল, সর্বপরি আমার কোন কিছুরই অভাব নেই। হাতে পর্যাপ্ত টাকা আছে, বই-পত্র আছে। মানসিক ও শারিরীকভাবে আমি ভালই আছি।

তুমি যতটা সম্ভব ভাল ও শান্ত থেকো! আমি সর্বান্তঃকরণে তোমার সুখী জীবন কামনা করছি। প্রিয় বোন আমার, বিদায়! আমার আদর ও চুমু নিও!

তোমারই

এ. উলিয়ানভ।

বি. দ্র. আমাকে আবার লিখো। তোমার কাছ থেকে সামান্য কোন খবর পেলেও আমি খুশী হবো। আমিও তোমাকে লিখবো, যদি লিখবার অনুমতি আমাকে দেয়া হয়। আবারও বিদায়!

তোমারই

এ. উলিয়ানভ।

চিঠিটি লিখে সাশা চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অজস্র কথা আর স্মৃতি তার মাথার মধ্যে তখন দাপাদাপি করতে থাকে।

অসিপানভ, আন্দ্রেয়ুশকিন ও জেনারেলভ প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখান করলো। অন্যদের প্রাণভিক্ষা চেয়ে পাঠানো আবেদনপত্রগুলি বিবেচনার জন্য সেগুলো বিচার বিভাগ থেকে ট্রাইবুনালে পাঠানো হলো। এপ্রিলের ৩০ তারিখ ট্রাইবুন্যাল সেগুলো বিবেচনার জন্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখে আবেদনপত্রে জার বা আদালতকে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। লুকাশেভিচ এবং নভোরস্কি ছাড়া অন্যরা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ বা ক্ষমা প্রার্থনাও করেনি। সবদিক বিবেচনায় ট্রাইবুনাল লুকাশেভিচ ও নভোরস্কির আবেদনপত্র দু’টি বিবেচনার জন্য সুপারিশ করে বাকী আবেদনপত্রগুলোও জারের কাছে পাঠিয়ে দিল। জার ট্রাইবুনালের সুপারিশকে বিবেচনায় নিয়ে লুকাশেভিচ ও নভোরস্কিকে যাবৎজীবন কারাদন্ড দিয়ে বাকী পাঁচজনের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে সেগুলো ফেরৎ পাঠালেন।

এদিকে আদালত আন্নাকে পাঁচ বছরের জন্য পূর্ব সাইবেরিয়াতে নির্বাসনের রায় দিলে সে জারের কাছে আবেদন করে। আবেদন পত্রে সে লেখে, ‘আমাকে আমার মায়ের কাছ থেকে আলাদা করবেন না।’ একই সাথে মারিয়াও আন্নার জন্য জারের কাছে পৃথক আবেদন করেন। আবেদনপত্র দু’টিই মন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয়ের কাছে গেলে তিনি বিবেচনার জন্য জারের কাছে পাঠালেন। জার মন্ত্রীর সুপারিশ বিবেচনায় নেন এবং আন্নাকে তাদের পারিবারিক ষ্টেট ককুশকিনোতে মারিয়ার ছোট বোন লুভভ পনোমারিয়োভার তত্ত্বাবধানে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দিলেন।

মে মাসের চার তারিখ। সকাল হয়েছে কিছুক্ষণ আগে । সাশা তখনও ঘুমাচ্ছে। বহুদিন বাদে সে এমন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে দেখে সে আর ভলোদিয়া ৬৪ নং মস্কো স্ট্রীট ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে ভলগার পাড়ে যাচ্ছে। সাশা সামনে পিছনে ভলোদিয়া। সাশা হঠাৎ করে খেয়াল করে তার সাইকেলের চাকা দুটো বালুতে আটকে গেছে। সে যতই প্যাডেল করছে চাকা দু’টো বালুতে ডুবে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে ভলোদিয়াকে ডাকছে। ভলোদিয়া তার চিৎকার শুনে জোরে জোরে প্যাডেল করছে কিন্তু সে নিজেও সাশার কাছে পৌঁছাতে পারছে না। সাশা ক্রমশঃ বালুর ভিতরে ডুবে যেতে থাকে। হঠাৎ ঠক্ ঠক্ শব্দ। সাশা চোখ খুলতেই মাথার উপরে কড়িকাঠ দেখতে পেলো। শব্দ হচ্ছে তার সেলের দরজায়। সাশা উঠে দরজার কাছে যেতেই ছোট্ট ফাকা জায়গাটা দিয়ে দেখে পিটাল পল দূর্গের তত্বাবধায়ক জেনারেল ইভান স্টেপানোভিচ জেনেটস্কি দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন,

-উলিয়ানভ, আমি দু:খের সাথে জানাচ্ছি যে আপনার প্রাণভিক্ষার আবেদন মহামান্য জার প্রত্যাখান করেছেন।

তার বলার ভঙ্গি ও গলার স্বরে সাশার মনে হলো জেনারেল মোটেই দুঃখ পাননি বরং খুশী হয়েছেন। নিজের এমন দুঃসংবাদে কোথায় সাশা কষ্ট পাবে তা না বরং তার মুখে এক চিলতে হাসি দেখা দিল। সাশার এমন হাসিতে জেনারেল ইভান ভীষণ অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করেন এবং তাড়াহুড়ো করে চলে যাবার আগে বলে গেলেন,

-উলিয়ানভ, ঘন্টা দুয়েকবাদে তোমার মা দেখা করতে আসবেন। তুমি প্রস্তুত থেকো!

জেনারেল চলে গেলেন। সাশার কপালে এতক্ষণে ভাঁজ পড়ে। চিন্তাটা নিজের ফাঁসির জন্য নয়, মায়ের জন্য। মা কী জানেন এই খবরটা? যদি না জেনে থাকেন খবরটি পেয়ে মা কি ভেঙে পড়বেন? মা’কে কি খবরটা সে নিজেই দেবে? মা কি খবরটা সহ্য করতে পারবেন? সাশা পুরো সকালটা সেই ভাবনায় মশগুল হয়ে থাকলো।

এদিকে জেনারেল ইভান সাশার সেল থেকে শেভেরেভকে তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হবার একই খবর দিল। তিনি লুকাশেভিচ এবং নভোরস্কিকেও ফাঁসির পরিবর্তে যাবৎজীবন সশ্রম কারাদন্ডের কথাটা অবহিত করলেন।

মারিয়া সাশার জন্য একটি বিশেষ ঘরে অপেক্ষা করছেন। একজন পুলিশের লোক এসে জানালো কিছুক্ষণের মধ্যেই উলিয়ানভকে আনা হবে। সাশার প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে খবরটি মারিয়া জেনেছেন আজই সকালে। সারা সকাল মারিয়ার সময় কোটেছে অস্থিরতায়। মারিয়া কেঁদেছেন। তাঁর বুকের ভিতর প্রবল হাহাকার তাঁকে তোলপাড় করে তুলতে চাইছে। বারবার মনে হয়েছে সাশার ফাঁসি হলে তিনি নিজেও বাঁচবেন না। অথচ আজই ঘটনাক্রমে সাশার সাথে তার দেখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। সাশা কি এটা জানে? সাশাকে তিনি একথাটা কিভাবে বলবেন? কাছেই পায়ের শব্দ শুনে নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করলেন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন সাশার সামনে তিনি যেভাবেই হোক নিজেকে শান্ত রাখবেন।

সাশা সেই কক্ষে ঢুকলো শাম্ত পায়ে। মারিয়া সাশার দিকে চেয়ে দেখে সাশা যেন তার চেয়েও শান্ত। মারিয়া বুঝতে পারে না মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিভাবে নিজেকে এত শান্ত রাখা যায়? সাশা বলেছিল ‘রোদিনা’ তাকে এমনকাজে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাশাকে দেখে মনে হলো সে ঠিকই বলেছিল যে ‘রোদিনার কাছে মৃত্যু তুচ্ছ’। তবু সাশার এমন শান্ত মুখোচ্ছবি দেখে মারিয়ার বুকটা ধক্ করে ওঠে এবং সাথে সাথে তাঁর এটাও মনে হলো সাশা জেনে গেছে যে তার প্রাণভিক্ষার আবেদন মঞ্জুর হয়নি। অন্যদিকে সাশাও মায়ের এমন স্থির ও শান্ত মুখোচ্ছবি দেখে প্রথমে ভেবেছিল মা বোধহয় খবরটি জানে না। কিন্তু মায়ের চাহনির করুণ রুপটি মা আড়াল করতে পারেননি। তাই সাশাও বুঝতে পারে মা সব জানেন। সাশা ছুটে গিয়ে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে। সেই আগের মতোই মায়ের জানুতে মাথা রেখে চুপটি করে থাকে। কেউ কোন কথা বলে না। মারিয়া সাশার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে এক পর্যায়ে প্রশ্ন করে,

-সাশা, ভলোদিয়া, ওলগা, মারিয়া, দিমিত্রি এদের কথা তোমার মনে হয়?

সাশা মুখ না তুলেই বলে,

-আগে ওদের কথা বেশী ভাবিনি। কিন্তু গত কয়েকটা দিন ওদের কথাই বারবার মনে পড়ছে। ভলোদিয়া ও ওলগার তো ফাইনাল পরীক্ষা। ওরা পড়াশুনা কেমন করছে?

-ওরা পড়াশুনায় ভাল। ওদেরকেও আমি তোমার মতো করে যত্ন নিতে চেষ্টা করেছি।

-আমি জানি মা। দেখবেন ওরা দু’জনেই গোল্ড মেডেল পাবে।

-কী লাভ গোল্ড মেডেলে? তুমিও তো গোল্ড মেডেলই পেয়েছিলে।

-মা, আমার জন্য মন খারাপ করবেন না। পাছে আমার পড়াশুনার ক্ষতি হয়, তাই আপনি বাবার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আমাকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। আপনি চেয়েছিলেন আমার ভাল একটা ক্যারিয়ার হোক। অথচ আমি আপনার সেই ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারলাম না। ভলোদিয়া হয়তো পূরণ করবে! আমি জানি আপনি তেমনি ভাবেই ভলোদিয়াকে গড়ে তুলছেন।

-তোমাকে বাবার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যেতে মানা করায় তুমি কী কষ্ট পেয়েছিলে সাশা?

-কষ্ট নয়, মা। বড্ড অভিমান হয়েছিল। আজ আর সেসব কথা তুলে কী লাভ? পড়াশুনা, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা, পরিবার সবকিছু একটা সময় আমার কাছে তুচ্ছ হয়ে উঠেছিল। আর তাইতো নিজেকে এমন একটি কাজে যুক্ত করতে পেরেছিলাম। আমার জন্য কষ্ট পাবেন না। আমার না পারাগুলো ভলোদিয়া নিশ্চয় পূরণ করবে!

সাশার এ কথায় মারিয়া যেন আঁতকে ওঠে। মাথা নেড়ে বলেন,

-না! আমি তা চাই না।

-কি হলো মা? কী চান না?

-আমি চাই না, ভলোদিয়া তোমাকে অনুসরণ করুক। আমি চাই না আমার অন্য কোন সন্তান নিজের জীবনকে এত তুচ্ছ করে তুলুক।

-মা, আমি তো আমার স্বপ্ন পূরণের কথা বলিনি। আমাকে নিয়ে আপনার যে স্বপ্ন ছিল সেটা পূরণের কথা বলেছি। আমার স্বপ্ন যদি তাদেরও স্বপ্ন হয়ে ওঠে তাহলে কোন বাঁধাই তাদেরকে আটকে রাখতে পারবে না, মা। সেটা আমি জানি। আমি এটাও জানি, কেউ না কেউ আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে আসবেই। আমরা সেটা দেখে যেতে পারলাম না। তাতে আমার কোন আফসোস নেই মা।

-সাশা, কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমরা কিভাবে বাঁচবো বলতে পারো?

-মা, আপনাকে বাঁচতে হবে আপনার অন্য সন্তানদের জন্য, আপনার নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য।

সাশা এবার চুপ করে থাকে। মারিয়া সাশাকে জড়িয়ে ধরেন শক্ত করে। অনেকক্ষণ এভাবে থাকার পর সাশা মাকে বলে,

-মা, আমার একটা শেষ অনুরোধ আছে?

-কী, বাবা?

এমন সময় পুলিশের লোক এসে জানায়, ‘আপনাদের সময় শেষ।’

সাশা তার বুক পকেট থেকে ভাঁজ করা একটি রসিদ বের করে মায়ের হাতে দিয়ে বলে,

-মা, আমাদের আর দেখা হবে কিনা জানি না। আমার সোনার মেডেলটি আমি বন্দক রেখে ১০০ রুবল ধার করেছিলাম। দোকানি বলেছিল মেডেলটি বিক্রি করলে ১৩০ রুবল দেবে। আপনি রসিদটি নিয়ে যান। মেডেলটি বিক্রি করে দেবেন। যে ৩০ রুবল পাবেন সেটা আমার এক বন্ধুকে দিতে হবে। এই নিন, এই কাগজে তার ঠিকানা লেখা আছে। তার কাছ থেকে ৩০ রুবল ধার করেছিলাম।

মারিয়া সাশার হাত থেকে কাগজটা নিতে গিয়ে দেখে তার শরীর কাঁপছে। তিনি সাশাকে জড়িয়ে ধরে তাকে চুমো দিতে থাকলেন। পুলিশের লোকটি এসে মা ও ছেলের এমন আবেগঘন অবস্থায় দেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মারিয়া সাশাকে আলিঙ্গন মুক্ত করতে করতে বলেন,

-সাহস রেখো সাশা! সাহস রেখো!!

লেনিন-পর্ব ৮: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4533

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top