রমিলা থাপারের সাক্ষাৎকার II ভাষান্তরঃ অজিত দাশ

রমিলা থাপারের সাক্ষাৎকার II ভাষান্তরঃ অজিত দাশ

“একটা ভাবনা সবসময়ই আমাকে বিচলিত করে যে, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বেড়ে ওঠা কীরকম হবে। ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকার কার্যত একটি প্রতিষ্ঠানকে ভঙ্গুর করে ফেলতে পারে কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানটিকে আবার তার নিজের মত করে দাঁড় করানোর জন্য একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।  কম করে হলেও এক প্রজন্ম তো লেগেই যায়।  কেননা ততদিনে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা এবং কোনোকিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভ্যাস অদৃশ্য হয়ে যায়।  আমি যখন আমাদের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন উত্থাপন করেছি দেখা গেল একের পর এক বাজে ইমেইল আসতে শুরু করল। আমার আলোচনা এবং মতবিরোধের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো।  লেখকদের হুমকি দেওয়া হলো। আমরা এখন এমন এক সমাজ ব্যবস্থায় আছি যেখানে অসংকোচের সঙ্গে কুসংস্কারগুলোকে প্রদর্শন করা শিখানো হচ্ছে।  সম্প্রতি এই কুসংস্কারগুলোর পূর্বাভাস আমাদের কাছে অপেক্ষাকৃত অদৃশ্য থাকলেও এখন তা সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। আমরা যদি একটি নিরাপদ সমাজ ব্যবস্থা এবং বাক-স্বাধীনতার অধিকার চাই তাহলে এই কুসংস্কারগুলোকে অপসারণ করতে হবে।”

গণবুদ্ধিজীবীদের সময় ভাল যাচ্ছে না…

এইতো গতবছর একটি বই বের করার পরিকল্পনা ছিল। যদিও বইটি বর্তমান সময়ের কথা চিন্তা করে লেখা নয়। তবুও বইটিতে  সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া নিপীড়নমূলক অনেক ঘটনার বিশেষ প্রতিচ্ছবি পাওয়া যাবে।

অনেক স্বনামধন্য লেখকরা তাদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছে। আর এই প্রতিবাদটি এমন সময়ে হয়েছে যখন কিছু বুদ্ধিজীবী মোদির অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে বেশ উচ্ছসিত বোধ করছে।

কে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলো আর কে প্রধানমন্ত্রী হলো এইসব বিবেচনা বাদ দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের এই প্রতিবাদ কর্মসূচীটি চলমান থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার প্রভাব থেকে বের হয়ে বুদ্ধিজীবীদের একটি জোরালো ভূমিকা থাকা জরুরি। পূর্বে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছিলো। বর্তমানে আমরাও সেটি করছি। এই প্রতিবাদ জনসাধারণের বিতর্কগুলোর একটি কার্যকর সংস্থা হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত কিছু স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না তবুও সম্প্রতি সপ্তাহগুলোতে এর প্রভাব বেশ পরিলক্ষিত হবে বলে ধারনা করছি।

গণমাধ্যমগুলো আরএসএসের মতো নিছক কিছু দলের পরিচিত সদস্যদের তাদের অনুষ্ঠানগুলোতে ডাকছে…   

তাদেরকে নিছক একটি দল বলার সুযোগ নেই। তাদের কার্যক্রমগুলো পত্রিকার প্রথম পাতায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয় যা রাজনৈতিক মতাদর্শকে চাঙ্গা করে এবং তারা সন্ত্রাসী দলগুলোর সহিংসতাকে ব্যবহার করে। কাউকে হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে শারীরিক লাঞ্চনা এবং শেষমেষ হত্যা করার সবটুকু প্রক্রিয়ায়ই সন্ত্রাসবাদের অন্তভূর্ক্ত। এই কার্যক্রমের অন্য কোনো নাম নেই। আমরা এমন একটি দেশ যেখানে সন্ত্রাসীরা ইসলামের অনুগত বলে দাবি করে, হিন্দু ধর্মানুভূতি ও মূল্যবোধ রক্ষার দাবি করে, বর্ণপ্রথার নামে দলিতদের পুড়িয়ে মারে এবং আদিবাসীদের উন্নত জীবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করে। শিবসেনাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি-সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে কখনো জনগণের প্রতিনিধি হওয়া যায় না।

আপনার কি মনে হয় বিজেপির নিজেদের কর্মকান্ডগুলো নিয়ে পর্যবেক্ষণ করার সময় কি এখনো হয়ে উঠেনি?

অবশ্যই। তাদের দলের অনেক সদস্যদের আচরণ এবং কর্মকান্ডগুলো নজরে রাখা উচিত। এই সময়ে কেন বরং সেটি অনেক আগে থেকেই করা দরকার ছিল। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধ অমার্জনীয়। যদি মানুষের বাকস্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয় এমনকি খাদ্যতালিকাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে বুঝতে হবে এই আক্রমণ আমাদের ইতিহাসের উপরেও। ভারতীয় পুরাণগুলোকেও ইতিহাস বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়েছে।  তাহলে কি আমাদের ইতিহাস হুমকির মুখে নেই?

ভারতীয় ইতিহাস অবশ্য বিগত কয়েক শতক ধরে অ-ইতিহাসের সঙ্গে মোকাবেলা করে চলছে। উদ্ভট কল্পনাগুলোকেও ইতিহাস বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখানে একটা গভীর সমস্যা রয়েছে। আমি এরিক হবসমের বাক্য ধরে বলবো, জাতীয়তাবাদীর নিকট ইতিহাস আফিমখোরের পপির মতোই। ইতিহাসের বিশ্লেষণ থেকেই এই জাগীয়তাবাদী পরিচয় গড়ে তোলা হয়েছে। আচ্ছা যদি পাকিস্তানের ইতিহাস রচনা করতে হয় তাহলে সে দেশের ইতিহাসবিদরা কোথা থেকে শুরু করবেন। তাদেরকে ৪৭’র পূর্বে ফিরে যেতে হবে। তাহলে কি সেটি শুরু হবে মোহাম্মদ বিন কাসিম থেকে নাকি হরপ্পা সভ্যতা থেকে? সেখানে আবার হিন্দু এবং বৌদ্ধ ইতিহাসের শিকড় রয়েছে। উনিশ শতকে এসে বৃটিশরা আমাদের বলেছে ভারতের ইতিহাস নির্ধারিত হবে শাসকদের ধর্মের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাদেরতো এক সময় হিন্দু শাসক ছিলো আবার মুসলিম শাসকও ছিলো আর এই দুই শাসন ব্যবস্থায় বৈপরিত্য ছিলো। এগুলো হলো উনিশ শতকের উপনিবেশিক ইতিহাস পর্যালোচনা।

ইতিহাসের এই বিষয়গুলোকে এভাবে চিহ্নিত করেছে মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা। পাকিস্তান তৈরির জন্য যে ইতিহাস তৈরি করা হয়েছিল একই ইতিহাস এখন হিন্দু রাষ্ট্রের সমর্থনে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো উপনিবেশিক ধারনার ফলাফল। এটাকে দেশভাগের অসম্পূর্ণ ব্যবসার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তাই দ্বিজাতি তত্ত্বের ইতিহাসকে যে অস্বীকার করে তাদেরকে ইতিহাসের ধ্বংসকারী বলা যেতে পারে।

ষাটের দশক ছিলো মূলত ভারতী ইতিহাসকে শৃঙ্খলিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যেটি বর্তমান ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি চর্চার মধ্য থেকে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে…

ঐতিহাসিকদের জন্য ইতিহাসের বিশ্লেষণগুলো এখন আর উপনিবেশিক কাঠামোয় আবদ্ধ নেই। কিন্তু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জন্য ইতিহাস এখনো উনিশ শতকের উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই আটকে আছে।

কিন্তু লেখকরা তাদের পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে সেটির সমালোচনা করেছেন। অনেকেই আবার লেখকদের সিদ্ধান্ত এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ যুক্তি তুলে ধরেছেন-পুরস্কার রাষ্ট্র দিয়েছে সরকার নয়। আমি রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ দেখি না। কারণ রাষ্ট্রের এই পুরস্কারগুলো সরকারের সিদ্ধান্ত নির্ভর। বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সমালোচনা করার আমি কোনো কারণ দেখি না। এমনকি ২০০২, ১৯৯২ অথবা ১৯৮৪’র ঘটনায়ও না। দৃশ্যমান প্রতিবাদই একমাত্র উপায় আমি তাও মনে করি না। প্রতিবাদের ভিন্ন ভিন্ন উপায় থাকে। যে কেউ যে কোনো সময় তার মতো করে প্রতিবাদ করবে। হ্যাঁ আগেও স্বাধীন মতপ্রকাশে বাঁধা ছিলো তবে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বাধাগ্রস্থ করা সাম্প্রদায়িকতা সমর্থনে একটি বড় আন্দোলনের ডাক দেয় যা কিনা সহিংসতার জন্ম দেয় এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।  যারা আইন অমান্য করে মানুষ হত্যা করে তাদের বিষয়ে ক্ষমতায় থাকা লোকজনের প্রতিক্রিয়া এবং কার্যক্রমে দায়িত্বের প্রকাশ ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে দায়িত্বহীন হলেতো প্রতিবাদ গড়ে উঠবেই। এই প্রতিবাদ স্বাধীন গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভারতীয় নাগরিকদের অধিকারের প্রতিবাদ।

বর্তমানে সংখ্যালঘুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনায় যতটা প্রতিবাদ দেখা যায়, দলিতরা নির্যাতিত হলে সে পরিমাণ প্রতিবাদ কোথাও দেখা যায় না…

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনকে মিডিয়া যতটা প্রকাশ করে ঠিক সেরকমভাবে দলিতদের উপর নির্যাতনকে জনসম্মুখে প্রকাশ করে না। সমাজের মধ্যে সামাজিক পদমর্যাদার একটা গ্রহনযোগ্যতাতো আছেই ফলে দলিতদের প্রতি নির্যাতন সেখানে কোনো বড় ঘটনা হিসেবে দেখা দেয় না।

বুদ্ধিজীবীরা কি আগেও এভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো?

যখন ইউপিএ ২০০৪ সালে ক্ষমতায় এলো আমরা বেশকজন বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত করার কথা জানিয়েছি। কিন্তু সেখানে তাদের কারো তেমন আগ্রহ দেখিনি। আজকে যারা সেই সরকারের সময়ে পুরস্কার পেয়েছিলেন সেটি ছিলো তাদের মন্ত্রী আমলাদের নির্বাচন। এখন পর্যন্ত যারা যারা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছিলো তাদের তালিকা এবং সময় দেখলেই বোঝা যাবে কোন দল ক্ষমতায় ছিলো।

সূত্রঃ দ্যা হিন্দু ডট কম (২০১৫)II সাক্ষাৎকার নিয়েছেনঃ জিয়া উস সালাম

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top