উপন্যাস লেনিন-পর্ব দশ।। আশানুর রহমান খোকন

লেনিন-পর্ব দশ। ঝরা পালক

সন্ধ্যা নামছে। শীতকাল হওয়ায় সূর্য ঢলে পড়ার সাথে সাথে রোদের তেজ কমতে থাকে। বিকাল বেলার দৈর্ঘ্যটা এখন বড্ড ছোট। হুট করে এক সময় সূর্য মিলিয়ে যায় তারপর সন্ধ্যা নামে ঝপ করে। গোল বৃত্তাকার সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে। নিজের পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে চকিতে একবার মস্কো স্ট্রিট ছাড়িয়ে ভলগার দিকে চোখ পড়তেই ভলোদিয়ার মনে হলো ভলগা যেন সূর্যটাকে গ্রাস করছে। ভলোদিয়া দেখছিল বিশাল একটি অমলেট যেন ভলগার পেটে ঢুকে গেলো। পায়ের খসখস শব্দে জানালা থেকে চোখ ফেরাতেই ভলোদিয়া দেখে অখোটনিকভ তখনও পড়ার টেবিলের উল্টোদিকে বসে আছে। পড়ানো শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। পড়া শেষ হলেই অখোটনিকভ সাধারণত উঠে পড়ে। কিন্তু আজ বসে আছে। তার মধ্যে একটু ইতঃস্তত ভাব। মনে হচ্ছে সে কিছু বলতে চায়। ভলোদিয়া চেয়ারের একটু সামনে ঝুঁকে তার দিকে তাকাতেই সে মাথা নীচু করে পায়ের দিকে চেয়ে খুব আস্তে করে সে বলে ওঠে,

-আগামীকাল থেকে আমি আর পড়তে আসবো না।

তার এ কথায় ভলোদিয়া একটু অবাক হলো। আরো সামনের দিকে ঝু্ঁকে সে জানতে চাইলো,

-কেন? বাড়িতে কোন সমস্যা?

অখোটনিকভ পড়ে চুভাষ স্কুলে। ভলোদিয়ার বাবা সিমবিরস্কিতে চুভাষ ভাষাভাষী মানুষদের জন্য এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কয়েক বছর আগে। মূলধারার শিক্ষা থেকে এরা অনেক পিছিয়ে আছে বলে বাবার নির্দেশে গত দু’বছর ধরে সে অখোটনিকভকে পড়ায়। সাশা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর মায়ের অনুপস্থিতিতে খালা আন্না সংসারের অন্য সব কাজ সামলালেও ছোট্ট মারিয়া আর দিমিত্রিকে সময় দেয়ার কাজটি ভলোদিয়াকেই করতে হয়। নিজের স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি অখোটনিকভকে পড়ানোর জন্য বাড়তি সময় ব্যয় করাটা তাই খালা আন্নার একদম পছন্দ না। তিনি চান না ভলোদিয়া এই কাজে পরীক্ষার আগে কোন সময় ব্যয় করুক। আজ অখোটনিকভ যখন পড়তে আসে তখন আন্না নিজেই অখোটনিকভকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছিল। আর সে কারণেই অখোটনিকভ পড়া শেষে কিছুটা দ্বিধা নিয়েই প্রসঙ্গটি তোলে। ভলোদিয়ার প্রশ্নের উত্তরে সে বললো,

-সামনে আপনার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হলে না হয় আবার আসবো।

ভলোদিয়া নিজের চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে অখোটনিকভকে বলে,

-তুমি যেমন পড়তে আসো, তেমনই এসো। আমি ঠিকই সময় বের করে নেবো।

-কিন্তু আপনাদের পরিবারের এই অবস্থা আর সামনে আপনার পরীক্ষা?

-সে সব নিয়ে তুমি ভেবো না। এসবের মধ্যেও আমাদের যার যা কাজ সেগুলো করে যেতে হবে।

ভলোদিয়ার কথায় খুশী হয়ে অখোটনিকভ চলে গেলো। আর তখুনি ঘরে ঢুকলো ওলগা। ওলগাকে বেশ অস্থির ও উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে। ভলোদিয়া নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

-কি হয়েছে ওলগা?

-মায়ের টেলিগ্রাম এসেছে!

ওলগার কন্ঠে উদ্বেগ। ভলোদিয়া হাত বাড়িয়ে টেলিগ্রামটা নিয়ে দ্রুত একবার চোখ বুলায়। মা জানিয়েছেন পনেরই এপ্রিল সাশার বিচার শুরু হবে। ভলোদিয়া ওলগার দিকে চেয়ে দেখে তার চোখে পানি টলমল করছে। ভলোদিয়া এগিয়ে এসে ওলগাকে জড়িয়ে ধরলে ওলগা অঝোরে কাঁদতে শুরু করে। ভলোদিয়া বাঁধা না দিয়ে ওলগাকে কাঁদতে দিলো। ওলগা একটু শান্ত হলে তাকে অখোটনিকভ যে চেয়ারটিতে বসে ছিল সেখানে বসিয়ে ভলোদিয়া নিজের চেয়ারটায় গিয়ে বসে।

ওলগা দুই হাত টেবিলের উপর রেখে বসে। ভলোদিয়া তার একটি হাতের উপর নিজের হাতটি রেখে বলে,

-ওলগা, মা সেখানে আছেন। সাশার জন্য যা কিছু করা সম্ভব তিনি করবেন। তুমি এত চিন্তা করছো কেন?

-আমার ভয় করছে। ওরা যদি সাশাকে—।

কথাটা বলেই ওলগা চুপ করে যায়। ভলোদিয়া নিজেও যেন কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে পড়ে। তারপর নিজেই দ্রুত আনমনাভাবটা কাটিয়ে ওলগাকে বলে,

-বিচার সাশার অনুকূলে নাও যেতে পারে। কিন্তু আমরা ভেবে ভেবে সেটা কী পাল্টাতে পারবো? তুমি কান্নাকাটি করলে বিচার সাশার পক্ষে যাবে?

-তাহলে আমরা কী করবো?

ওলগা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে।

-তুমি না সাশার মতো হতে চাও?

ভলোদিয়া ওলগার চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্নটি করে। ভলোদিয়ার এমন প্রশ্নে ওলগা চট করে উত্তর দিতে পারে না। সে ডাক্তার হতে চায়। সাশার মতো সেও জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চেয়েছে। ভলোদিয়া কী সেটাই বুঝাতে চাইলো? নাকি সাশা যে পথ বেছে নিয়েছে সেই পথের অনুসারী হওয়ার কথা বললো? ভলোদিয়াও তো সাশার মতো হতে চাইতো! তাহলে? তাই সে পাল্টা প্রশ্ন করে,

-মানে? তুমিও তো সাশার মতোই হতে চাইতে!

-হুম। সেটাই তো কথা। তাহলে বলো আমাদের স্কুল ফাইনাল কত দিন পর?

-কয়েক সপ্তাহ।

-সাশা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় কী পেয়েছিল?

-গোল্ড মেডেল।

-সাশার মতো হতে গেলে আমাদেরও তো গোল্ড মেডেল পাওয়া উচিত তাই না?

-কিন্তু আমার কিছু ভাল লাগে না। একা একা পড়তেও ইচ্ছে করে না।

-তুমি এক কাজ করো।

-কী?

-আজ থেকে পড়ার সময় তুমি আমার ঘরে চলে এসো। আমরা এক সাথে পড়বো।

খুশীতে ওলগার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভলোদিয়া ওলগাকে বললো,

-চলো নীচে যাই, মারিয়া ও দিমিত্রি কি করছে দেখি।

সেদিন ১৮ই এপ্রিল। ভলোদিয়াদের অংক ক্লাস সবে শেষ হয়েছে। ল্যাটিন ক্লাস শুরু হবে। এমন সময় দপ্তরী এসে জানায় ভলোদিয়াকে হেডস্যার ডাকছেন। ভলোদিয়াকে একটু চিন্তিত দেখালো। সে বুঝতে পারছে না তাকে ডাকার কি কারণ থাকতে পারে? কিন্তু সে যখন ফিডোর কেরেনেস্কির ঘরে ঢুকলো তিনি বেশ আন্তরিকভাবে তাকে কাছে ডেকে নিলেন। ভলোদিয়া কাছে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন,

-ভ্লাদিমির, আমি জানি তোমরা খুব খারাপ একটা সময় পার করছো। তোমার বাবা বেঁচে নেই। তোমার মা এখন রাজধানীতে। তাই বিষয়টি তোমাকেই বলতে হচ্ছে।

কথাটা বলে তিনি একটু থামলেন। হেডস্যারের এমন ভূমিকা করে কথা বলায় ভলোদিয়ার বিস্ময় আরো বেড়ে গেলো। নতুন কিছু কি ঘটেছে যে স্যারকে এমন ভূমিকা করে কথা বলতে হচ্ছে? সাশার কি কিছু হলো? একটা অজানা শংকায় ভলোদিয়া ভেতরে ভেতরে অস্থিরবোধ করলেও বাইরে সেটা প্রকাশ করতে দিলো না। সে চুপচাপ হেডস্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি গলার স্বরটা অস্বাভাবিক রকম নরম করে বললেন,

-সাশা যেহেতু জেলে এবং কারণটি গুরুতর তাই তোমাকে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে অনুমতি লাগবে। আদালত থেকে চিঠি দিয়ে আজই কথাটা আমাকে জানানো হয়েছে।

ভলোদিয়া চুপ করে কথাটা শুনলো। তার যেন নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না। তার ক্লাসের আর কারো অনুমতি নিতে হবে না, শুধু তাকে নিতে হবে সাশার ভাই হওয়ার কারণে? সাশা যদি অন্যায় করেও থাকে তার শাস্তি তাকে কেন দেয়া হবে? তাকে কেন পরীক্ষার জন্য অনুমতি চাইতে হবে? এটা কি তবে অন্যায় নয়? কিন্তু মুখে সেটা না বলে সে মন খারাপ করে হেডস্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভলোদিয়ার মুখখানি দেখে ফিদোর কেরেনেস্কি তার মনের অবস্থাটি বোধ হয় অনুমান করার চেষ্টা করলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,

-কিন্তু ভাল খবর হলো আদালত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা আমাকেই দিয়েছেন।

হেডস্যারের একথায় ভলোদিয়া যেন আশার আলো দেখতে পায়। তিনি বললেন,

-এই নাও কাগজ-কলম। এখনই আমার বরাবর একটা আবেদন লিখে ফেলো।

ভলোদিয়া পরম কৃতজ্ঞতায় কলম ও কাগজটি নিয়ে হেডস্যারের সামনেই তার টেবিলের উপর কাগজটি রেখে লিখতে শুরু করলো,

Date: April 18, 1887

To,

The Director of the Gymnasium

Subject: Request for permission to sit for the School Leaving Certificate.

Dear Sir,

Most humbly requesting Your Excellency to permit me to sit for the school-leaving certificate which will enable me to enter in the University.

Thank you.

Your faithfully,

Vladimir Ilyich Ulyanov

আবেদনপত্রটি হেডস্যারের হাতে দিতেই তিনি দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে পত্রটির মার্জিনে খস্ খস্ করে লিখলেন, ‘Permission guaranteed.’

গভীর রাত। অন্যদিন সাশা ঘুমিয়ে পড়ে কিন্তু আজ তার ঘুম আসছে না। পিটার এন্ড পল দূর্গের এই নির্জন সেলটা যেন দুনিয়ার সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন। দিনের বেলা বা সন্ধ্যার দিকে সৈন্য চলাচলের শব্দ, কখনো কখনো লোকজনের হাঁটাচলার শব্দ পাওয়া গেলেও রাত যত বাড়ে সেই সব শব্দের জায়গায় শোনা যায় বাঁদুড়ের উড়াউড়ি, ইঁদুরের আনাগোনা আর দূর্গের ভিতরে সৈন্যদের যে ব্যারাক আছে সেখান থেকে ভেসে আসা ঘোড়ার হ্রস্বধ্বনি। কোন কোন রাতে হয়তো কোন কোন সেলের তালা খোলার শব্দ শোনা যায়। কাউকে কাউকে সরিয়ে নেয়া হয় অন্য কোন জেলে বা দূর্গে। কারো কারো জন্য সেই রাতটিই হয়তো শেষ রাত। সেই সব রাতে একটা ফিসফাস শব্দ এবং চাপা উত্তেজনার হাওয়া যেন বাতাসে টের পাওয়া যায়।

রাত ১২টার ঘন্টা বাজলো। মে মাসের পাঁচ তারিখ পড়ে গেল। কয়েকঘন্টা আগে মায়ের সাথে সাশার দেখা হয়েছিল। মায়ের শেষ বাক্যটা ছিল ‘সাহস রেখো সাশা’। কথাটা মা উচ্চারণ করেছিলেন দু’বার। মা কি ভেবেছিলেন আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে সে ভীত? মায়ের সাথে কথোপকথনে সাশা কি তেমন কিছু প্রকাশ করেছিল? সাশার মনে পড়লো না। নাকি সাশার আসন্ন মৃত্যদণ্ডের কথা ভেবে মা নিজেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সাশাকে কথাটা বলেছিল? কে জানে। এসব ভাবনায় সাশার ঘুম আসছে না। মায়ের কথা, মৃত বাবার কথা, আন্নার কথা বারবার মনে পড়ছে। ছোট ভাই-বোনগুলোর মুখগুলোও ভীষণ মনে পড়ছে। মনে পড়ছে তার কালো রঙের বিড়ালটার কথাও। মাঝে কখনো কখনো রাইসার কথা, কমরেডদের কথাও চকিতে মনে হচ্ছে বটে তবে সব কিছু ছাপিয়ে আজ মায়ের সাথে তার সাক্ষাৎকারের কথোপকথনটাই বেশি করে মনে পড়ছে। মায়ের মুখটা আজ এত বিষন্ন লাগছিল!

হঠাৎ সাশা অন্ধকারের মধ্যেই কি যেন খুঁজলো। অন্ধকারে থাকতে থাকতে চোখ এক সময় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই অন্ধকারে সাশা চকিতে একবার দরজার উপরে বাঁকানো লোহার পাতটির দিকে তাকায়। চড়ুই পাখিটি কি ঘুমাচ্ছে? মায়ের সাথে দেখা শেষে তাকে যখন আবার সেলে ঢুকানো হচ্ছিল, সঙ্গের সৈন্যটি সেলের তালাটা তখন সবে মাত্র খুলেছে আর ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন একটি চড়ুই পাখি এসে সেলের ভিতর ঢুকে পড়ে। সৈন্যটির সেদিকে মনোযোগ ছিল না। সাশার মুখে এক চিলতে হাসি দেখা দিয়েছিল। সৈন্যটি সে হাসির অর্থ বুঝতে ব্যর্থ হয়ে ভেবেছিল মৃত্যুদণ্ডের আগে অনেক বন্দী পাগল হয়ে যায়। ছেলেটির মধ্যে কি সেই সব লক্ষণ দেখা দিলো?

সেলের দরজা বন্ধ হলে চড়ুইটি ভয়ে কিছুক্ষণ এদিক সেদিক উড়াউড়ির চেষ্টা করে। ছোট ছোট ডানাগুলো ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে কয়েকটি পালকও ঝরায়। একসময় ক্লান্ত হয়ে দরজার উপরে বাঁকানো চিকন লোহার পাতের উপর বসে সাশাকে লক্ষ্য করতে থাকে। চড়ুইটি হয়তো বুঝতে চেষ্টা করছিল এই ছোট্ট ঘরটিতে যে মানুষটি আছে তার কাছ থেকে সে নিরাপদ কিনা। সাশা কিন্তু মুগ্ধ হয়ে চড়ুইটি দেখছিল। এই দূর্গের ভিতর চড়ুইটি কীভাবে এলো সেটা সাশার মাথায় এলো না। আগে তো কোনদিন চড়ুই চোখে পড়েনি। নাকি শীত শেষ হয়ে আসছে বলেই চড়ুইয়ের দেখা মিললো? ঘুলঘুলি দিয়ে আসা অস্তগামী সূর্যের রাঙা আলোয় সাশা খেয়াল করে দেখে সিমবিরস্কিতে তাদের বাড়িতে বা বাগানের গাছগুলোতে যে সব চড়ুই পাখির বাসা ছিল তাদের সাথে এই চড়ুইটি কোন পার্থক্য নেই। সব দেশের চড়ুই পাখিগুলি কি দেখতে একই রকম?

এই গভীর রাতেও সাশার যখন ঘুম আসছিল না, তখন হঠাৎ করে আবার তার চড়ুই পাখিটির কথা মনে হলো। পাখিটি কি ঘুমিয়ে গেলো? কোন সাড়া-শব্দ নেই। সাশার মনে হলো সেলটি নির্জন হলেও সে তো একা নয়। একটা চড়ুই পাখি তার সাথে আছে। সাশা দরজার উপরের দিকে তাকালো, যদি চড়ুইটিকে দেখা যায়। সেই নিঃশব্দ অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ সাশার কানে এলো স্টিমচালিত নৌকার শব্দ। শব্দটি আসছে দূর্গের দক্ষিণ দিকে নেভা নদী ও দূর্গের মধ্যে সংযোগকারী লনভস্কায়া ব্রিজটি সংলগ্ন ডেকটার দিক থেকে। ঘুমবিহীন সাশা নৌকাগুলোর ইঞ্জিন বন্ধ হবার শব্দ শুনতে পেলো। সাশা মনে মনে ভাবতে থাকে নৌকাগুলো থামলে যে ঢেউ তৈরি হলো সেই ঢেউগুলো যেন দূর্গের দেয়ালে এসে আছড়ে পড়ছে। সাশা দূর্গের দেয়ালে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ শোনার জন্য কান খাড়া করে রাখলো।

রাত তখন তিনটা। চারপাশ অন্ধকার। সেই অন্ধকার ভেদ করে পিটার এন্ড পল দূর্গের দক্ষিণ দিকের লনভস্কায়া ব্রিজ সংলগ্ন ডেকের কোল ঘেষে পরপর দু’টি স্টিম চালিত নৌকা এসে থামে। নৌকা দু’টোর একটির নাম ‘ঝরকা’ এবং অন্যটি ‘ময়কা’। দু’টি নৌকায় দূর্গের সৈন্যরা ব্যবহার করে থাকে তাদের চলাচলের জন্য। ময়কা’র মাঝি নভরভ দেখে ‘পুলন্দ্র’ নামের অন্য একটি নৌকা আগে থেকেই ঘাটে বাঁধা। নভরভ বুঝতে পারে দূর্গ থেকে বড় সংখ্যার কোন দূধূর্ষ আসামীদের আজ সরানো হবে। কোথায় যেতে হবে আগে থেকে নভরভদের কখনো বলা হয় না। আজ কয়েক বছর হয়ে গেল সে এই দূর্গের সৈন্যদের নৌকার মাঝি হিসাবে কাজ করে। নৌকার ভিতর অপেক্ষা করতে করতে নভরভ ভাবে জীবন আজ তাকে কোথায় নিয়ে এলো! কাজান এলাকায় ভলগার খুব কাছেই তাদের বাড়ি ছিল। বাবা ছিল ভূমিদাস। সারাদিন হাড়ভাঙা খাঁটুনির পরও তাদের তিনবেলা ঠিকমত খাবার জুটতো না। তাদের মতো আরো অসংখ্য ভূমিদাসের অবস্থাও একই ছিল। তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল, রাগ ছিল। কখনো কখনো সেই সব রাগ-ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো খুনোখুনিতে। অনেক জায়গায় ভূ-স্বামীরা ভূমিদাসদের হাতে খুন হতে লাগলো। ভূমি মালিকদের পাল্টা আঘাতে, বিচারের নামে ফায়ার স্কোয়াডে বা ফাঁসিতে অনেক ভূমিদাসও মরতে লাগলো। একসময় নভরভরা শুনলো ভূমিদাসপ্রথা উঠে গেছে। নভরভের বাবা বলেছিল, ‘দেখিস, এবার আমাদের সুদিন আসবে’। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তার বাবা নিজেকে আবিস্কার করলো একজন ক্ষেতমজুর হিসাবে। হাঁড়ভাঙা খাটুনি কমে না, সুদিনও ফেরে না। মা খোঁটা দিয়ে বলতো, ‘এই তোমার সুদিন’? সে কথায় বাবার মেজাজ আরো খিঁটখিঁটে হয়ে যেতো। নভরভ তখন ছোট। কেন এমন হয় সে কিছুই বুঝতে পারতো না। সে দেখতো শুধু অভাব। খাবার কষ্ট, শীতের কষ্ট, আর বাবার তিরিক্ষি মেজাজ। ছোট-খাটো কারণে বাবা-মায়ের ঝগড়া লাগতো। সে সময় কারণে-অকারণে বাবা তাদের গায়ে হাত তুলতো। নিজেরা সে সময় ভয়ে কুঁকড়ে থাকতো। মাঝে মাঝে বাবা বাড়ি ফিরতো রাত করে। সেসব রাতে বাবা আর মানুষ থাকতো না। চিৎকার করতো, গালাগালি করতো। মায়ের গায়ে হাত তুলতো। তারপর এক সময় ঘর ভরে বমি করতো। ক্লান্ত বাবা সেই বমির একপাশে নিজেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়তো। তার গায়ের কাপড়ে, মুখের চারপাশে বমি লেগে থাকতো। কোত্থেকে মাছি এসে বমি লেগে থাকা বাবার মুখে বসতো। দুর্গন্ধে তখন সেই ঘরে থাকা অসহনীয় হয়ে উঠলেও নভরভদের অন্য কোন ঘর না থাকায় তারা দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতো। এক সময় তা মা নিজেই চোখ মুছতে মুছতে সেই সব বমি পরিস্কার করতো, বাবাকে পরিস্কার করে দিত। এই সব দেখতে দেখতে ঘৃণা ধরে যাওয়া জীবন থেকে পালিয়ে চৌদ্দ বছরের কিশোর নভরভ এসেছিল রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গে। থাকার জায়গা ছিল না, খাওয়ার কোন বন্দোবস্ত ছিল না। কতদিন ফুটপথে, নেভেস্কি প্রসপেক্টের দোকানগুলোর বারান্দায়, রেলস্টেশনে সে রাত কাটিয়েছে। দুর্বিসহ সেই দিনগুলোতে কাজ জুটেছিল চামড়ার কারখানায়। নানা চড়ায়-উৎরায় শেষে সৈন্যদের নৌকা চালানোর কাজটি যোগাড় করতে পেরেছিল। ভলগার তীরের মানুষ হওয়ায় নৌকা চালানো ও সাঁতার কাটায় তার যে সহজাত দক্ষতা ছিল, এই কাজটি পেতে তাকে সেই দক্ষতাটুকু তাকে সাহায্য করেছিল। নৌকায় বসে থাকতে থাকতে নভরভ ভাবছিল বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম কিন্তু যে জীবন থেকে পালাতে চেয়েছিলাম তা থেকে মুক্তি পেলাম কোথায়? নভরভের ভাবনার মাঝখানেই ঝরকা’র মাঝি উঁচু স্বরে জানতে চাইলো,

-নভরভ, আগুন আছে? সিগারেট ধরাতাম।

অপেক্ষা না করে লোকটি নিজেই চলে আসে। নভরভের মনে পড়লো তাইতো অনেকক্ষণ সিগারেট ধরানো হয়নি।

জেনারেল ইভান স্টেপানোভিচ বসে আছেন তার অফিসে। রাত তখন ৩.১৫ । দূর্গের সাতজন সৈন্য তার সামনে সাতটি লন্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাদেরকে সেগুলো জ্বালাতে বললেন। তারপর তাদেরকে তিনি নির্দেশ দিলেন কোন সাতটি সেলে তাদের যেতে হবে এবং বন্দীদের কি বলতে হবে। লন্ঠনগুলো নিয়ে তারা রওনা দিলো। নির্দেশ মতো সেই সব সেলের সামনে গিয়ে তারা ঠক্ ঠক্ করে আওয়াজ করতে থাকে। রাত তখন ৩.৩০ মিনিট। সাশা তখনও ঘুমায়নি। ঠক্ ঠক্ আওয়াজে সে উঠে দরজার কাছে গেলো। শব্দে চড়ুই পাখিটির ঘুম ভাঙে এবং ভয় পেয়ে পাখিটি আবার তার ছোট ছোট ডানাগুলো ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে এদিক-ওদিক উড়তে থাকে। সাশার পায়ের শব্দ পেয়ে বাইরে থেকে সৈন্যটি বলে,

-তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন, এখনই বের হতে হবে!

সাশা অবাক হলো না। রায় ঘোষণার পর থেকেই তো সে তৈরি। আজ কি তাদের শেষ দিন? নাকি আজ রাতে তাদের অন্য কোথাও নেয়া হবে? সাশা সেলের অল্প খোলা জায়গাটা দিয়ে হাত বাড়িয়ে লন্ঠনটি নিলো। সেই স্বল্প আলোতেও অন্ধকার সেলটির অনেক কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লন্ঠনটি এক পাশে রেখে সাশা বাইরে যাবার পোষাকটি পরে নিলো। পরনের কাপড়টি আরো কয়েকটি কাপড়ের সাথে ভাঁজ করে রাখলো। ঘরটির এক কোণায় কিছু কাগজ-পত্র আছে। চিঠি-পত্র লেখার জন্য তাকে দেয়া হয়েছিল। কয়েকটি বই দিয়ে সেগুলো চাপা দেয়া আছে। সাশা ঘরটি একবার ভাল করে দেখে নিলো। এক পাশে মাটির তৈরি কয়েকটি পাত্র, পানি খাবার একটি গ্লাস, আর একটি ধাতব পাত্রও আছে। শীত প্রায় চলে গেছে বলে সাশা তার মাথার হ্যাট, ওভারকোট, আর আলখেল্লাটাও রেখে দিলো। সাশা একবার তার ব্যবহারের রুমাল, তোয়ালে, চায়ের কাপ ও চামচগুলোর দিকে তাকায়। সাশা যেন কি মনে করে বইগুলোর উপর নিজের হাতটি একটু রাখলো। এমন সময় সেলের দরজায় আরেকজনের পায়ের শব্দ পেতেই সাশা বলে,

-আমি প্রস্তুত।

কিন্তু গম্ভীর গলায় আগন্তুকটি বলে ওঠে,

-আমি এডজুডেন্ট জেনারেল আই এস জানেটস্কি। আপনার জিনিষগুলো বুঝে নিতে এসেছি। এগুলো জেলের কোষাগারে জমা থাকবে।

সেলের তালা খুলে গেলো। সাশা ভাবছে চড়ুই পাখিটি তো বড্ড বোকা! এই সুযোগে সে পালাতে পারতো! নাকি চড়ুইটি বুঝতে পারছে না তার কি করা উচিত। ভয়ে চড়ুইটি যেন আরো গুটিশুটি মেরে চুপ করে বসেই থাকলো। সাশা জিনিষগুলো বুঝিয়ে দিলে জানেটস্কি সৈন্যটিকে সেগুলো নিয়ে যাবার জন্য নির্দেশ দিলেন। সাশা সেল থেকে বের হবার আগে তাকে বললেন,

-আপনি এগোন। আমার এক মিনিট সময় লাগবে।

জানেটস্কি কোন কথা না বলে সেলের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। সাশা হাত বাড়িয়ে গুটিশুটি হয়ে বসে থাকা চড়ুইটিকে ধরে ফেলে। চড়ুইটি যে এত সহজে ধরা দেবে সাশা নিজেও ভাবেনি। পাখিটিকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে সাশা সেল থেকে বের হলো।

দূর্গের মূল গেটের সামনে আগে থেকে অপেক্ষা করছিলেন জেনারেল ভি এন ভেরেভকিন। তিনি দূর্গের সামরিক শাখার প্রধান। তার কাছে আসামীদের হস্তান্তর করা হবে। তিনি পূর্বেই শ্লিলেচবার্গ দূর্গ প্রধানের কাছে পাঁচটি শিকল পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন। কাকতালীয় হলেও ভেরেভকিন নামটি এসেছে ভেরেভকা থেকে। যার অর্থ দড়ি। শিকল হাতে পাঁচজন সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। সাশা, শেভেরেভ, অসিপানভ, জেনারেলভ ও আন্দ্রেয়ুশকিন গেটে এসে পৌঁছালে ভেরেভকিন তাদেরকে শিকল পরাতে সৈন্যদের নির্দেশ দিলো। উনিশে এপ্রিল রায় ঘোষণার পরে এই পাঁচজনের আজই একসাথে দেখা হলো। সৈন্যদের বাঁধা ও আপত্তির মুখেও তারা কোলাকুলি করলো এবং একে অপরের কুশল জানতে চাইলো। ভেরেভকিনের ভ্রুকুটিকে তারা পাত্তায় দিল না। ভেরেভকিনের নির্দেশ মতো সৈন্যরা দ্রুত তাদের শিকল পরাতে গেলো। তারা কেউ বাঁধা দিল না। কেবল সাশাকে শিকল পরানোর আগে তার হাতের মুঠোয় থাকা চড়ুই পাখিটিকে সে শুন্যে উড়িয়ে দিলো। ভোর বেলার ঠাণ্ডা হাওয়ায় মুক্ত পাখিটি শূন্যে উড়তে থাকে। আর উড়তে থাকা মুক্ত চড়ুই পাখিটির দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক জোড়া চোখ।

তাদেরকে মূল গেট থেকে সৈন্যদের পাহারায় নিয়ে আসা হলো ডেকে। সেখানে পনেরজন সৈন্যসহ আগে থেকে অপেক্ষা করছিল ক্যাপ্টেন কুঝনেসভ। তার কাছে এই পাঁচজনকে বুঝিয়ে দিতে না দিতেই সেখানে আনা হলো নভোরস্কি এবং লুকাশেভিচকেও। তারা অবশ্য শিকল ছাড়া। কুঝনেসভের নেতৃত্বে পনের জনের সৈন্যদলটি আসামীদের নিয়ে গেল ডেকের যেখানটায় নৌকাগুলো বাঁধা আছে সেখানে। বন্ধুদের শিকল পরা দেখে নভোরস্কি ও লুকাশেভিচ দু’জনেরই নিজের কাছে ছোট মনে হতে লাগলো। এ যেন এক যাত্রার পৃথক ফল। নিজেদের জীবন বাঁচাতে আদালতে ও পরবর্তীতে নিজেদের ভূমিকার জন্য তারা লজ্জাবোধ করতে থাকে। সবাইকে নৌকায় তুলতে ডেকে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হলে তারা লজ্জায় যেন অন্যদের মুখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারছিল না। নভোরস্কিকে এই লজ্জা থেকে উদ্ধার করলো সাশা নিজেই। কিছুটা কাছাকাছি আসার সুযোগ হলে সে নভোরস্কিকে আস্তে করে বললো,

‘আমাকে সাহায্য করতে গিয়েই তোমার ও তোমার শ্বাশুড়ির এমন দূর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যেতে হলো। পারলে আমাকে ক্ষমা করো’।

সাশার এমন কথায় নভোরস্কির বুকের ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে। সাশার দিকে চেয়ে সে কেঁদে ফেলে। এমন সময় দু’জন সৈন্য নভোরস্কি ও লুকাশেভিচকে নিয়ে পুলন্দ্র নামের নৌকাটিতে তোলে। নৌকায় উঠতে উঠতে নভোরস্কি বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিল। নৌকায় ওঠার পর সে যেন কিছু বলতে গেলো কিন্তু দমকা বাতাসে কথাগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। তাদের পিছু পিছু সেই নৌকায় একজন জল্লাদও উঠলো।

ময়কা নামের নৌকাটিতে তোলা হলো শেভেরেভ ও সাশাকে। পাঁচজন সৈন্যসহ ক্যাপ্টেনটি উঠলো এখানেই। অসিপানভ, জেনারেলভ ও আন্দ্রেয়ুশকিনকে তোলা হলো ‘ঝরকা’তে। ক্যাপ্টেন নভরভকে নির্দেশ দিলো নৌকা ছাড়তে। নভরভ জানতে চাইলো,

-স্যার, কোথায় যাবো?

-শ্লিলেচবার্গ দূর্গ।

কথাটা সাশা ও শেভেরেভের কানে গেলো। নেভা নদী ধরে ৪০ কিলোমিটার পুর্বে লাডোগা লেকের তীরে চৌদ্দ শতকের দূর্গটিই তাহলে তাদের গন্তব্য? কিন্তু সেখানে কেন? তাদেরকে এখানে ফাঁসি না দিয়ে সেখানে কেন নেয়া হচ্ছে? সাশা ও শেভেরেভে দু’জনেরই কথাটা শুনে দু’রকম প্রতিক্রিয়া হলো। সাশা মনে মনে হাসে। ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের কত না ভয়! ফাঁসিটা দিতেও তাদেরকে নিতে হচ্ছে রাজধানী থেকে দূরে-নির্জন দূর্গে। এদের সৈন্য আছে, প্রশাসন আছে, বিচার ব্যবস্থা আছে, অর্থ আছে তবুও তাদের ভয় যায় না। কারণ তারাও জানে তারা জনগণের কাঁধের উপর চড়ে আছে। তাদের সবসময় ভয় জনগণ যদি জাগে এবং তাদেরকে ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলে!

অন্যদিকে শেভেরেভ ভাবে এমনও তো হতে পারে তাদের ফাঁসির আদেশ মওকুফ করে শ্লিলেচবার্গ দূর্গে অন্তরীণ করে রাখা হলো। উদ্দেশ্যসাধনের জন্য যে জীবনকে সে তুচ্ছ মনে করেছিল আজকে সেই জীবনের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য একটা আকুতি যেন শেভেরেভে নিজের মধ্যে টের পেতে থাকে।

শ্লিলেচবার্গ দূর্গে স্থায়ী কোন ফাঁসিকাষ্ঠ ছিল না। নতুন ফাঁসিকাষ্ঠ নির্মাণের কাজ চলছিল জোরেসোরে । কাজ শেষ না হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের ফাঁসির সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হলো না। এক দূর্গ থেকে আরেক দূর্গে নেয়া এবং ফাঁসি কার্যকর করতে দেরী হওয়ায় শেভেরেভের মতো জেনারেলভ এবং আন্দ্রেয়ুশকিনও আশাবাদী হয়ে উঠলো এটা ভেবে যে শেষ মুহূর্তে জার হয়তো তাদের প্রাণদণ্ড মওকুফ করতে পারেন।

৮ই মে ১৮৮৭। ভোর ৩.৩০ মিনিট। সাশার সেলের দরজায় ঠক্ ঠক্ আওয়াজ। ক্রমশঃ আওয়াজ বাড়তে থাকলে সাশা জেগে ওঠে। একজন সৈন্য দাঁড়িয়ে। সাশাকে জানালো আধাঘন্টা পর তাদের ফাঁসি কার্যকর হবে। সাশা যেন তৈরি হয়ে নেয়। সৈন্যটির পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে না যেতেই দূর্গ প্রধান এলেন একজন পাদ্রী নিয়ে। ক্ষমা প্রার্থনার জন্য। সাশা ক্ষমা প্রার্থনা চাইতে অস্বীকার করলো। দূর্গ প্রধান অন্যদের কাছেও পাদ্রীকে নিয়ে গেলে সাশার মতো তারাও ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকার করলো। সেল থেকে একে একে তাদের সবাইকে নিয়ে আসা হলো ফাঁসি দেবার নির্ধারিত জায়গায়। তাদের পাঁচজনকে পাশাপাশি দাঁড় করানো হলো। প্রথমে সাশা, এরপর শেভেরেভ, অসিপানভ, আন্দ্রেয়ুশকিন এবং সব শেষে জেনারেলভ। তখনও ভোর হয়নি তবে ভোর হবার আগে এক ধরণের আলো ফুটে ওঠে। সেই আলোয় সাশা দেখে ফাঁসি মঞ্চের কাজটি যেন তড়িঘড়ি করে শেষ করা হয়েছে। কাঁচা রঙের দাগগুলো সেই স্বল্প আলোতেও বোঝা যাচ্ছে। মন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয় নিজে ফাঁসি কার্যকর দেখতে সেই ভোরেই উপস্থিত হয়েছেন। দূর্গ প্রধান ও তিনি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। উপস্থিত আছেন অন্য পদস্থ কর্মকর্তারাও। এমন সময় দূর্গ প্রধান মন্ত্রী তলস্তয়ের কাছে জানতে চাইলেন,

-স্যার, এক সাথে তিনজনের বেশি ফাঁসি দেবার ব্যবস্থা নেই। ফাঁসিকাষ্ঠ মাত্র তিনটি। কোন তিনজনকে আগে ফাঁসি দেবো?

মন্ত্রী এক মুহূর্ত না ভেবেই বললেন,

-উলিয়ানভ ও শেভেরেভ ছাড়া বাকী তিনজনকে আগে ফাঁসি দিন।

-বাকী দু’জনকে কি ফাঁসি চলাকালীন এখানেই রাখবো না সেলে পাঠিয়ে দেবো?

-ওরা দু’জন এই ষড়যন্ত্রের হোতা। ফাঁসিতে বন্ধুদের মৃত্যুর দৃশ্যটি ওদেরকে স্বচক্ষে দেখতে দিন। এটা হবে ওদের চরম শাস্তি!

দূর্গ প্রধান কোন কথা না বলে অধঃস্তন এক অফিসারকে নির্দেশ দিলেন অসিপানভ, আন্দ্রেয়ুশকিন ও জেনারেলভকে ফাঁসির মঞ্চের কাছে নিয়ে আসতে। অফিসারটি আদেশমতো তাদেরকে আনতে গেলে ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলো, চুমু খেলো। তাদের তিনজনকে ফাঁসির মঞ্চের কাছে এনে দাঁড় করানোর পর জল্লাদ উঠলো মঞ্চে। সে দড়িগুলো পরীক্ষা করতে লাগলো।

সাশা ও পিটার শেভেরেভ তাকিয়ে ছিল সতীর্থ তিনজনের দিকে। জল্লাদের দড়ি পরীক্ষা করতে দেখে শেভেরেভ বলে ওঠে,

-উলিয়ানভ, এদের নিষ্ঠুরতার কোন তুলনা হয় না। যাদের ফাঁসি দেয়া হবে আবার তাদেরকেই জল্লাদের ফাঁসির দঁড়ি পরীক্ষা করাটাও দেখতে হচ্ছে?

সাশা মৃদু স্বরে বলে,

-তুমি কি অন্য কিছু আশা করেছিলে?

-ঠিক তা নয়। কিন্তু এদের নিষ্ঠুরতার কোন সীমা নেই।

সাশার তখন মনে পড়লো ডিসেম্বারিস্টদের কথা। ১৮২৬ সালে ডিসেম্বারিস্টদের পাঁচ জনকে ফাঁসি দেবার সময় তিন জনের ফাঁসি কার্যকর করার পর ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় দড়ি না আসা পর্যন্ত বাকী দু’জনকে অন্যদের ফাঁসির দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন অপেক্ষারত এক বিপ্লবী অন্যজনকে বলেছিল, “রাশিয়ার জন্য সত্যিই করুণা হয়। হে রাশিয়া, তুমি এখনও জানো না কীভাবে ঠিকঠাক মতো ফাঁসি দিতে হয়”।

তাই শেভেরেভের কথায় সাশা কোন উত্তর করে না। কেবল তার মুখে একটু বেদনামাখা হাসি দেখা দিল। তখন শেভেরেভ আবার বলে ওঠলো,

-সাশা, এমনও তো হতে পারে একদম শেষ মুহূর্তে আমাদের ফাঁসির আদেশ রহিত হয়ে গেলো। আমাদেরকেও লুকাশেভিচ এবং নভোরস্কির মতো যাবজ্জীবন কারদণ্ড বা নির্বাসন দেয়া হলো।

শেভেরেভের এ কথায় সাশার এবার সত্যি সত্যি হাসি পেলো। মানুষের বেঁচে থাকার আশা কখনো ফুরায় না। কিছুক্ষণের মধ্যে ফাঁসির দড়ি যার গলায় ঝুলবে সেও কিনা ভাবছে শেষ মুহূর্তে সেটা স্থগিত হতে পারে! মানুষ কি তবে শেষ পর্যন্ত আশা রাখে? আর এ কারণেই কি ঈশ্বর অবিশ্বাসী মানুষগুলোও দূর্বল মুহূর্তে ভাগ্যে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে? শেভেরেভের কথা শুনে সাশার ফিডোর দস্তভয়েস্কির কথা মনে পড়ে।

ফরাসী সমাজতন্ত্রী চার্লস ফুয়েরবাখের এক রাশান অনুসারীর নাম ছিল মিখাইল পেত্রাশেভস্কি। তিনি রাশান শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি গ্রুপ গঠন করেছিলেন। সবাই সেই গ্রুপকে বলতো ‘পেত্রাশেভস্কি গ্রুপ’। এই গ্রুপের প্রধান দু’টো উদ্দেশ্য ছিল জার শাসনের অবসান ও ভূমিদাস প্রথা বাতিল। সেই গ্রুপের একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন ভিসারিয়ন বেলেনস্কি। তিনি অনেক বড় সাহিত্য সমালোচক ছিলেন। লেখক নিকোলাই গোগল বরাবরই জার ও অর্থোডক্স চার্চের সমর্থক ছিলেন। গোগলকে সমালোচনা করে বেরেনস্কি ‘গোগলের প্রতি চিঠি’ নামের একটি প্রবন্ধ লেখেন এবং সেই প্রবন্ধে তিনি চার্চ ও জারের প্রচণ্ড সমালোচনা করেন। সেই প্রবন্ধটি প্রচুর মানুষ পড়ে এবং প্রভাবিত হয়। ফিডোর দস্তয়েভস্কিও তাদেরই একজন। তিনি সেই প্রবন্ধটি কপি করে আরো অনেকের কাছে বিলি করেন এবং নিজেও ঐ গ্রুপে যোগ দেন। সেই প্রবন্ধটি রাশিয়ার সিক্রেট বিভাগের কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইভান পেত্রভিচের হাতে পড়ে। তিনি এই গ্রুপের সদস্যদের ধড়পাকড় শুরু করলে দস্তয়েভস্কিও ধরা পড়েন। ধরা পড়ার পর চার মাস ধরে তদন্ত চলে। চার সদস্যের সেই তদন্ত কমিশনের প্রধান স্বয়ং জার আলেকজান্ডার নিকোলাস-২। বিচারে আরো অন্যদের সাথে দস্তয়েভস্কিরও ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারার আদেশ দেয়া হয়। সেই কারণে ১৮৪৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর সেন্ট পিটার্সবার্গের সিমিয়োনভ প্যালেসের সামনে খোলা চত্বরে অভিযুক্তদের নেয়া হলো। সেদিন বরফ না পড়লেও আকাশ ছিল মেঘলা এবং খোলা চত্বরটি ঢাকা ছিল বরফে। অভিযুক্তদের তিনটি সারিতে দাঁড় করানো হয়। দস্তয়েভস্কি ছিলেন দ্বিতীয় সারির তৃতীয়জন। অন্য দুজনের একজনের নাম প্লেশিয়েভ অন্যজন ডুরভ। প্রথম সারির সবাইকে হত্যা করা হলো। দ্বিতীয় সারির প্রথমজনকে গুলি করা হলো। দ্বিতীয়জনের পালা। তাকেও গুলি করা হলো। এবার দস্তয়েভস্কির পালা। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। হঠাৎ একটা আওয়াজ কানে ভেসে এলো। কেউ যেন বলছে, ‘থামো, থামো!’ যে গুলি করবে সেও থেমে গেলো। একজন অফিসার হাঁপাতে হাঁপাতে এসে কমান্ডিং অফিসারকে একটি কাগজ দেখালেন। যেখানে লেখা আছে জার নিকোলাস-২ দস্তয়েভস্কির প্রাণদণ্ডের আদেশ মওকুফ করে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাটি স্মরণ করে সাশার মনে হলো শেভেরেভ কী তেমন কিছু মনে মনে আশা করছে? আর তখনই সাশা দেখলো অপেক্ষমান তিনজনকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হচ্ছে। তাই শেভেরেভের কথার উত্তরে সে বলে,

-সামনে তাকাও!

সাশার কথায় সামনে তাকাতেই শেভেরেভ দেখলো একে একে জেনারেলভ, আন্দ্রেয়ুশকিন ও অসিপানভকে ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হলো। তারা পরস্পরকে আবারো জড়িয়ে ধরলো এবং চুমু খেলো। জল্লাদ প্রথমে জেনারেলভের মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেবার পূর্বে সে চিৎকার করে বললো, ‘Long Live People’s Will!’। আন্দ্রেয়ুশকিনের মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেবার আগে সেও একই শ্লোগান দিলো। তাদের এমন শ্লোগানে মন্ত্রী, দূর্গ প্রধানসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বিব্রত বোধ করতে শুরু করলে সেটা জল্লাদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়। তাই জল্লাদ যখন দেখলো পরের জনও একই রকম শ্লোগান দিতে পারে তখন সে অসিপানভের মুখ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কালো কাপড়ে মুড়ে কাপড়ের ঝুলন্ত অংশটুকু তার মুখের ভিতর গুঁজে দিল যাতে সে কোন শ্লোগান দিতে না পারে। জল্লাদের এমন ক্ষিপ্রতা ও তড়িৎ সিদ্ধান্তে মন্ত্রী ও দূর্গপ্রধান যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

তিনজনকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। শেভেরেভের মুখ দিয়ে আহ্ বলে একটা অস্পষ্ট শব্দ বের হলো। সে সতীর্থদের ঝুলন্ত শরীরের দিকে তাকাতে না পেরে অন্যদিকে চেয়ে থাকে। সাশা পলকহীনভাবে সতীর্থদের দিকে চেয়ে ছিল। একে একে তাদের অসাড় দেহগুলো সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। শেভেরেভ তখন ঘুরে সাশাকে দেখলো। তার মনে এতক্ষণ ক্ষীণ যে আশা জেগেছিল সেসব কিছুকে যেন ঝেড়ে ফেলে মৃত্যুর এই পূর্বক্ষণে শাসকের প্রতি সকল ক্রোধ, ঘৃণা ও ক্ষোভ নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। সাশা শেভেরেভের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলো। দু’জন সৈনিক এগিয়ে এলো সাশা ও শেভেরেভকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যেতে। সাশা ও শেভেরেভ তাদেরকে ধরতে না দিয়েই ঋজুভাবে নিজেরাই হেঁটে ফাঁসির মঞ্চে উঠে গেলো। ভোরের আলো তখন ফুটতে শুরু করেছে। কোত্থেকে যেন একটি চড়ুই পাখি এসে ফাঁসি মঞ্চের উল্টো দিকের দেয়ালে এসে বসলো। দেয়ালের কাঁচা রঙটি ভোরের আলোয় আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাশার চকিতে একবার মনে হলো এটা কি সেই চড়ুই পাখি, যাকে সে ছেড়ে দিয়েছিল পিটার এন্ড পল দূর্গের গেটে? কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব? মঞ্চে পাশাপাশি দু’জন দাঁড়ালে জল্লাদ কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে আসার পূর্বেই দু’জনেই এক সাথে বলে ওঠে, ‘Long live people’s will’। তাদের জোড়া কণ্ঠে, শ্লোগানের গমগম শব্দে চারদিক যেন কেঁপে উঠলো। সেই শব্দে চড়ুই পাখিটি যেন ভয় পেয়েই উড়তে গিয়ে একটি পালক ঝরালো। পাখিটি উড়ে গেলো, পালকটি তখনও বাতাসে ভাসছে। জল্লাদ কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকতে গেলে তারা দু’জনেই কালো কাপড়ে মুখ ঢাকতে অস্বীকার করলো। অসহায় জল্লাদ করণীয় কি বুঝতে না পেরে দূর্গ প্রধানের দিকে তাকালে তিনি চোখের ইশারায় মুখ কাপড়ে না ঢেকেই ফাঁসিতে ঝুলাতে ইঙ্গিত করলে সে আর দেরী না করে দু’জনের গলায় ফাঁসির দঁড়ি পরিয়ে দিল। সাশা তাকিয়ে আছে ঝরা পালকটির দিকে। তখনও পালকটি বাতাসে উড়ছে। হঠাৎ সাশার পায়ের নীচ থেকে পাটাতনটি সরে গেলো। সাশার দেহটি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে লাগলো। সাশার নিজের শরীরটাকে পাখির পালকের মতোই হালকা মনে হতে লাগলো!

আজ ৮ই মে। মারিয়ার ঘুম ভেঙেছে খুব ভোরে একটি দুঃস্বপ্ন দেখে। তিনি কোনভাবেই আর ঘুমাতে পারলেন না। তিনি বিছানা থেকে উঠে গ্লাসে রাখা পানিটুকু খেয়ে আবার এসে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলেন কিন্তু কোনভাবেই ঘুমুতে পারলেন না। বুকটা যেন বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। তবে কি সাশার………..! মারিয়া মন থেকে জোর করে সাশার চিন্তা সরাতে গেলেন। কিন্তু পারলেন না। আজ সকাল ১০টায় আন্নার সাথে দেখা হবে। ১১ই মে আন্নাকে ককুশকিনোতে পাঠানো হবে। সরকার চেয়েছিল পুলিশ প্রহরায় এবং সরকারি খরচে সেখানে পাঠাতে। কিন্তু মারিয়ার অনুরোধে আন্নাকে নিজ খরচে ও দায়িত্বে ককুশকিনোতে পাঠাতে সরকার রাজী হয়েছে। ককুশকিনোতে পাঠানোর আগে আজই আন্নার সাথে মারিয়ার শেষ সাক্ষাত। অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকেও কোনভাবেই যখন ঘুম এলো না, মারিয়া বিছানায় উঠে বসলেন।

মারিয়া উলিয়ানভা নেভেস্কি প্রসপেক্ট ধরে হাঁটছেন। তাঁর গন্তব্য স্পালোরনায়া স্ট্রিটের প্রাথমিক ডিটেনশন জেল। রাতে ভাল ঘুম হয়নি, মারিয়ার শরীরটাও দূর্বল। তবু তাঁকে বের হতে হয়েছে কারণ আজ আন্নার সাথে দেখা করে তার ককুশকিনোতে যাবার সব বন্দোবস্ত করতে হবে। পাবলিক লাইব্রেরির উল্টোদিকে একটা ছোট্ট পত্রিকার স্টল আছে। স্টলটির উল্টোদিকেই একটি ল্যাম্পপোস্ট। তিনি যখন ল্যাম্পপোস্টটির সামনে তখন হঠাৎ শুনতে পেলেন হকার ছেলেটি চেঁচিয়ে বলছে, ‘গরম খবর, গরম খবর! জার হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ, দুষ্কৃতিকারীদের ফাঁসি কার্যকর!’

কথাটা কানে যেতেই মারিয়ার মাথাটা ঘুরে ওঠে। তিনি সেই ফুটপথের উপরেই ধপ করে বসে পড়েন। তিনি মাথাটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে নির্বাক হয়ে বসে থাকলেন। পথচারীদের একজন এগিয়ে এসে জানতে চাইলো,

-আপনার শরীর খারাপ?

মারিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। লোকটার বোধ হয় তাড়া ছিল। চলে গেলো, যেদিকে যাচ্ছিল সেদিকে। মারিয়া হকার ছেলেটির দিকে একবার তাকালো। তাকে ঘিরে ধরে আছে কয়েকজন মানুষ। একজন মারিয়ার খুব কাছে দাঁড়িয়ে সদ্য কেনা বুলেটিনটি গ্রোগ্রাসে পড়তে শুরু করে। প্রথম পৃষ্ঠা শেষ করে পাতা উল্টালে মারিয়া অন্যদের সাথে সাশার ছবিটাও প্রথম পৃষ্ঠায় দেখতে পেলো। ছবিগুলোর পাশে ফাঁসির দড়ির ছবিও দেয়া হয়েছে। মারিয়া জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। মাথাটা ল্যাম্পপোস্ট থেকে হেলে মাটিতে পড়ে গেলো। পত্রিকার জন্য উৎসুক সেই পথচারীদের কেউ কেউ এগিয়ে এলো। মারিয়ার এমন অবস্থা দেখে কেউ একজন বললো, ‘জ্ঞান হারিয়েছে, বাতাস করো’। কেউ বললো, ‘এই, একটু পানি নিয়ে আসো। চোখে-মুখে একটু পানির ছিঁটা দিতে হবে’। ভীড়ের মধ্যে কাজের থেকে অকাজের মানুষ বেশি থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর কেউ একজন পানি এনে মারিয়ার চোখে-মুখে ছিঁটিয়ে দিলে আস্তে আস্তে তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে। তিনি দেখেন তাঁর মাথাটা ফুটপথে। তিনি তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসতে গেলেন। যে লোকটি পানি নিয়ে এসেছিল সে মারিয়াকে বসতে সাহায্য করে। মারিয়া মাথাটা আবার ল্যাম্পপোস্টে ঠেকিয়ে বসলেন। লোকটি জানতে চাইলো,

-মা, আপনার কি হয়েছে? শরীরটা বেশি খারাপ? এমন শরীর নিয়ে বের হয়েছেন কেন?

লোকটির এতগুলো প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে তার দিকে মারিয়া তাকিয়ে থাকেন। নিজের মাথাটা যেন ফাঁকা আর বুকটা বড্ড খালি খালি লাগছে। মারিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। উপস্থিত লোকগুলো বুঝতে পারছে না তাদের কি করা উচিত। মারিয়া মনে হলো সাশা নেই, তার নিজের বেঁচে থেকেই বা কী লাভ? একবার চকিতে মনে হলো তারও মরে যাওয়াই ভাল। সামনে নেভা নদী। পানিতে ডুবেই তিনি মরবেন! মারিয়া উঠে দাঁড়ান। তিনি টলতে টলতে হাঁটতে থাকলেন। তিনি হাঁটতে লাগলেন নেভা নদীর দিকে। স্পালোরনায়া স্ট্রিটটি যখন পার হয়ে যাচ্ছেন তখন তার চকিতে একবার মনে পড়লো তার তো আন্নার সাথে দেখা করতে হবে। তার ককুশকিনোতে যাবার বন্দোবস্ত করতে হবে। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি নেভা নদীর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে স্পালোরনায়া স্ট্রিট ধরে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top