আজকের দিনে শঙ্করদেবের প্রাসঙ্গিকতা ।। বাসুদেব দাস

শঙ্করদেবের বিশাল রচনারাশির মূল সুরটি হল সত্যের অবিরত সন্ধান এবং সেই সত্য নিহিত রয়েছে তাঁর রচনার মধ্যে। শঙ্করদেবের সময়কার রাজনৈতিক,সামাজিক,অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের আজ হয়তো খুব একটা প্রভাবিত করতে পারে না,কিন্তু পাঁচশ বছর আগে রচিত তাঁর রচনারাজি আজও আমাদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে,আমাদের জীবনে পূর্ণতা বহন করে আনে। শঙ্করদেবের মতো একজন বিশাল প্রতিভার ব্যক্তির হঠাৎ আবির্ভাব ঘটেনি। শেক্সপিয়ারের আবির্ভাবের আগে চসার,স্পেনসার আদি কবি সাহিত্যিকরা ইংলন্ডের ভূমিকে সাহিত্যের উপযোগী করে তুলেছিলেন,টলস্টয়ের আবির্ভাবের আগে রাশিয়ার সাহিত্যের ভূমি গোগল,চেকভের দ্বারা কর্ষিত হয়েছিল,বাংলায়ও তেমনই রবীন্দ্রনাথের আগমণের আগে বঙ্কিমচন্দ্র,মাইকেল মধুসূদন দত্ত,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রভৃতি প্রতিভাবান মনীষীদের দ্বারা ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। শঙ্করদেবের আবির্ভাবের আগে তাঁর পূর্বসূরী মাধব কন্দলী আদি কবিদের দ্বারা অসমের সাহিত্যজগত সারবান হয়ে উঠেছিল।

শঙ্করদেব ইচ্ছা করলে সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করে অতি সহজেই সর্ব্বভারতীয় খ্যাতি অর্জন করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা না করে অসমের মানুষকে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং শাস্ত্রীয় পণ্ডিতদের গ্রাস থেকে উদ্ধার করে সর্বভারতীয় পটভূমিতে প্রতিষ্ঠা করে ভারতীয় দর্শন,ভারতীয় চিন্তার সঙ্গে অসমিয়া মানুষের যোগসূত্র স্থাপন করেন।

আমার গবেষণাপত্রে শঙ্করদেবের সাহিত্যে কীভাবে মানবতাবাদ প্রকাশ পেয়েছে তার পরিচয় দেবার একটা চেষ্টা থাকবে। শঙ্করদেবের আধ্যাত্মিকতার উৎস ছিল আধ্যাত্মবাদ। এক কথায় বলা যেতে পারে,তাঁর চিন্তায় আধ্যাত্মিকতা এবং মানবীয়তার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। মানুষের প্রতি প্রেম অথবা ভালোবাসাই মহাপুরুষ শঙ্করদেবকে সমস্ত ধরনের কর্মের প্রতি উৎসাহী করে তুলেছিল,সমস্ত প্রকারের ত্যাগ স্বীকার করার জন্য মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রেম মানুষের সর্বোত্তম অনুভূতি। প্রেমের সঙ্গে ভক্তি জড়িত। ভক্তি অবিহনে ব্যক্তি একান্ত স্বার্থপর,সংকীর্ণ এবং অন্যের সুখদুঃখের প্রতি নির্বিকার হয়ে পড়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন,মানুষের মধ্যে পারস্পরিক  সম্পর্ক স্থাপন করার,সমগ্র মানবসমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলার,মানুষকে জয় করার একমাত্র উপায় হল প্রেম। এ জন্যই শঙ্করদেবের প্রচারিত ধর্মমতকে প্রেমধর্ম বলা হয়।

শঙ্করদেবের সমস্ত চিন্তা এবং কর্মের উদ্দেশ্য ছিল সর্বসাধারণ লোকের মঙ্গল কামনা,সমাজ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তিসাধনা,এই উদ্দেশ্যেই তিনি সাহিত্যের সৃষ্টি করেছিলেন,সাধারণ মানুষ যাতে সব কথা সহজে বুঝতে পারে সেইজন্য তিনি নাটক লিখেছিলেন। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করার একটি উপায়। শঙ্করদেবের নাটকের চিরন্তন আবেদনের দিকটিও আমার গবেষণা পত্রে তুলে ধরা হবে। ধর্মীয় দৃষ্টিভংগী এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনার মতোই সাংস্কৃতিক সংহতির ক্ষেত্রেও শঙ্করদেবের অবদান প্রচুর।

শঙ্করদেবের আবির্ভাবের সময় ধর্মের নামে কুসংস্কার এবং দুর্নীতি সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। বাহ্যিক আড়ম্বর আচার অনুষ্ঠানের জাঁকজমক মানুষকে প্রকৃত ধর্ম থেকে সরিয়ে এনে তাদের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করে দিয়েছিল। শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করে সর্বসাধারণকে শোষণ এবং নিষ্পেষণের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছিল। শঙ্করদেবের লক্ষ্য ছিল এ পরিস্থিতির অবসান ঘটান এবং প্রেমের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে জাতীয় সংহতির সেতু নির্মাণ করা। এ লক্ষ্য সাধনের জন্যই তিনি নববৈষ্ণব আন্দোলনের জন্ম দান করে একশরণ ভাগবতী ধর্ম প্রচার করেছিলেন। তাই আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, তাঁর চিন্তার গোড়ায় ছিল মানবতাবাদ। জনসাধারণের বোধগম্যতা অথবা গ্রহণযোগ্যতার কথা মাথায় রেখে তিনি তার সংগে ধর্মকে জুড়ে দিয়েছিলেন। ভারতবর্ষ ধর্মভীরু দেশ। এখানে জনগণ সবকিছু ধর্মের নামে গ্রহণ করে। শঙ্করদেবের মতো প্রতিভাশালী ব্যক্তি এই কথা সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন। জনগণের কথা ভেবেই তাঁর প্রচারিত ধর্মে তিনি যুক্তি,বিশ্বাস বা বুদ্ধিতে নয়,গুরুত্বারোপ করেছিলেন প্রেমে। শঙ্করদেবের মতে এই প্রেমের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য মানুষের সংসার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। গার্হস্থ্য জীবনযাপন করেও,গৃহাশ্রম পালন করেও মানুষ প্রেমের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বমানবকে আপন করে নিতে পারে।

দেৱরো দুর্লভ   ইহেন জন্মক

বৃথা করা কোন কামে।

গৃহতে থাকিয়া   হরিক স্মরিয়া

মোক্ষ সাধা হরিনামে।। (কীর্তন,প্রহ্লাদ চরিত্র)

প্রেম মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সমস্ত প্রাণীকে সমান দৃষ্টিতে বিচার করতে হবে,উচ্চ -নিচের ভেদ পরিহার করতে হবে।

কুকুর শৃগাল গর্দভরো আত্মারাম।

জানিয়া সবাকো পরি করিবা প্রণাম।।

সকলো প্রাণীক দেখিবেক আত্মাসম।

উপায় মধ্যত ইটো আতি মুখ্যতম।।  (কীর্তন,’শ্রীকৃষ্ণের বৈকুণ্ঠ প্রয়াণ)

প্রতিটি মানুষের অন্তরে প্রেম এবং ভক্তিভাব জাগ্রত করার লক্ষ্য সামনে রেখে শঙ্করদেব সব রকম সৃষ্টিকর্মে হাত দিয়েছিলেন। মানবতাবাদীরা মানুষের ধনাত্মক শক্তি ,সামর্থ্য এবং সম্ভাবনার উপর গভীর আস্থা স্থাপন করে। তাঁদের বিশ্বাস,মানুষ অসীম শক্তির অধিকারী। এই শক্তির সঠিক প্রয়োগের দ্বারা ব্যক্তি নিজের চরম উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে সমাজেরও সর্বাংগীন উন্নতি সাধন করতে পারে। মানুষের দেবত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই শঙ্করদেব তাঁর চারপাশের বিরুদ্ধ শক্তিসমূহের প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ব্যক্তির নৈতিক উন্নতি এবং সমাজের ভবিষ্যৎ কল্যাণের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলীন করে দিয়েছিলেন। তাঁর মতো প্রতিভাশালী মানুষ খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে মানুষ যতদিন লোভ আর ক্ষুদ্র স্বার্থে অন্ধ হয়ে থাকবে ততদিন সে সামাজিক উন্নতির কথা চিন্তা করতে পারবে না। তাই তিনি প্রথমেই ব্যক্তির মানসিক সংস্কার সাধনের ওপরে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সমাজ। কিন্তু তার জন্য প্রথম প্রয়োজনীয় জিনিস হল ব্যক্তির সামাজিক সজাগতা অথবা ক্ষুদ্র স্বার্থ অতিক্রম করে যেতে পারার ক্ষমতা। মানুষকে এই ক্ষমতার অধিকারী করে তোলার জন্যই শঙ্করদেব তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার দ্বারা বিভিন্ন মাধ্যম উদ্ভাবন করেছিলেন। গীত,পদ,কাব্য,নাটক ইত্যাদি রচনা করেছিলেন,নাট্যাভিনয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন, নৃত্যকলা, চিত্রকলার দ্বারা মানুষের সাংস্কৃতিক মন সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন,নামঘর এবং সত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন জাতি উপজাতির মধ্যে সংহতি স্থাপন করা,মানুষের মনকে ক্রমশ প্রসারিত করে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করা। এক কথায় বলতে গেলে শঙ্করদেবের চিন্তা এবং সৃষ্টির মূল প্রেরণা ছিল গভীর মানবীয় অনুভূতি,মানুষের প্রতি অকৃত্রিম প্রেম এবং সহানুভূতি।

মানবতাবাদ শঙ্করদেবের ভক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল যদিও,তাঁর ধর্মমত কেবল আবেগকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেনি। তাঁর সঙ্গে দার্শনিক মতবাদ যুক্ত হয়ে ছিল। শঙ্করদেবের ধর্মমত এবং সাহিত্যের আধার ছিল ভাগবত পুরাণ। ভাগবতকে বেদান্তের সার বলা হয়ে থাকে। ভাগবত পুরাণের অনুপ্রেরণাতেই শঙ্করদেবের দার্শনিক মত গড়ে উঠেছিল। অদ্বৈতবাদের সমস্ত তত্ত্ব শঙ্করদেব গ্রহণ করেননি । অদ্বৈত দর্শনের জ্ঞানতত্ত্বের বিপরীতে পরম সত্য উপলদ্ধি করার জন্য তিনি ভক্তিমার্গের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করেছেন। জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তকে অস্বীকার না করলেও ভক্তিকেই তিনি মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় বলে মনে করেছেন। ভক্তি থেকেই জ্ঞান লাভ হয় বলেছেন।–

ভকতির বলে জ্ঞান লভিলা নির্গুণ।

জীবন্তে মুকুত হুই বহিলা অর্জুন ।।

সনাতন হিন্দু ধর্মে ঈশ্বর লাভের জন্য যাগ-যজ্ঞ, কর্ম, জ্ঞান প্রভৃতি বিভিন্ন পথের কথা বলা হয়েছে। মধ্যযুগের অন্যান্য বৈষ্ণব গুরুদের মতো শঙ্করদেবও এই বিভিন্ন পথের মধ্যে ভক্তিকেই শ্রেষ্ঠ পথ বলে নির্বাচিত করেছেন। এর কারণ স্বরূপ তিনি বলেছেন –

না লাগে ভক্তিত দেব দ্বিজ ঋষি হুইবে।

নালাগে সম্ভূত শাস্ত্র বিস্তর জানিবে ।।

জপ তপ-যজ্ঞ-দান সবে বিড়ম্বন।

কেবল ভক্তিত তুষ্ট হোৱা নারায়ণ।।

ধর্মীয় দৃষ্টিভংগী এবং আধ্যাত্মিক চিন্তা -ভাবনার মতোই সাংস্কৃতিক সংহতির ক্ষেত্রেও শঙ্করদেবের অবদান অসামান্য। মহাভারতীয় সংস্কৃতির মতোই অসমের সংস্কৃতিও মূলতঃ সংমিশ্রণের সংস্কৃতি। বিভিন্ন জাতি উপজাতির পারস্পরিক মিলন এবং দেয়া-নেয়ার মনোভাবের মাধ্যমে অসমিয়া সংস্কৃতি নিজস্ব রূপ লাভ করেছে। প্রাচীন ধ্রুপদী সঙ্গীত এবং লোকসঙ্গীতের মিশ্রিত ধারায় শঙ্করদেব এবং তাঁর অন্যতম শিষ্য মাধবদেব রচিত বরগীতগুলি এবং দক্ষিণ ভারতীয় দেশি উপাদানের সঙ্গে অসমের ওজাপালি, পুতুলনাচ ইত্যাদি স্থানীয় উপাদান মিশিয়ে সংস্কৃত নাটকের অনুসরণে রচিত অঙ্কীয়া ভাওনা অসমের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংহতির ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান। বিংশ শতকের নাট্যকার ব্রেখট যে অভিনব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নাটক রচনা করেছিলেন, শঙ্করদেব পাঁচশত বছরেরও আগে অঙ্কীয়া ভাওনার মাধ্যমে প্রায় একই উদ্দেশ্য সাধন করেছিলেন। তাছাড়া শঙ্করদেবের রচিত নাটক,গীত ইত্যাদি কৃষ্ণ মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্য শ্রীকৃষ্ণের লীলাক্ষেত্র ব্রজধামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ব্রজবুলি ভাষার প্রয়োগ এবং লোককৃষ্টিকে ধর্মীয় পরম্পরার ভেতরে এনে তার মাধ্যমে লোকশিক্ষা প্রচারের প্রচেষ্টা সর্ব্বভারতীয় সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্রে এক অভিনব আদর্শ।

শঙ্করদেব এবং মাধবদেব দুজনেই তাদের লেখায় নানাভাবে জগতের সর্বোত্তম পুণ্যভূমি হিসেবে ভারতবর্ষের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে মহাভাগ্যের উদয় হলে তবেই ‘ভারতবরিষ,কলিযুগ,হরিনাম এবং নরকায়’এই চারের সমন্বয় ঘটে। ভাগবতের একাদশ স্কন্দের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে শঙ্করদেব লিখেছেন-‘দেবসবে নিশ্চয় গাৱয় এহি গীত।সেহি ধন্য যার জন্ম ভারত ভূমিত।ভারতত নরজন্ম লোৱার কারণ। সাধিব পারিব যার যিটো প্রয়োজন। পায় স্বর্গ মোক্ষ পদ বৈকুণ্ঠকো যায়। ভারত সমান কর্ম ভুমি আন নাই।।‘ভাগবতের বেশ কিছু জায়গায় শঙ্করদেব পুণ্যভূমি ভারতবর্ষকে প্রশংসা করেছেন।

‘কৃষ্ণর কিংকরে ভণে        শুনিয়োক সর্বজনে

ভাগবত শাস্ত্রর সম্মত ।

কত কোটি পুণ্যরাশি        ইটো জীবে সঞ্চি আসি

নর দেহ লভৈ ভারতত।।

শঙ্করদেব নিজের লেখার কোথাও ধর্ম প্রচার করা জায়গা বোঝাতে গিয়ে ‘অসম’শব্দটি প্রয়োগ করেননি,বরং কাব্যের বিভিন্ন স্থানে ভারত শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। রাজনৈতিকভাবে কখনও কখনও ভিন্নতা থাকলেও সাংস্কৃতিকভাবে যে সমগ্র ভারতবর্ষ এক ছিল এবং সেই সম্পর্কে শঙ্করদেব যে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন তার অজস্র ইঙ্গিত তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই। একজন ভালো অসমিয়া হয়েও যে ভালো ভারতীয় হওয়া যেতে পারে – শঙ্করদেবের জীবনাদর্শই তার অন্যতম প্রমাণ।

মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের একটি লক্ষণীয় বিষয় হল ধর্মীয় চেতনা। এই সময়ে সর্ব্বভারতীয় পটভূমিতে ভক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। দক্ষিণ ভারত থেকে পূর্ব ভারত পর্যন্ত এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভরতবর্ষে এক বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করে। অসমের নববৈষ্ণব আন্দোলনকে সর্ব্বভারতীয় পটভূমিতে গড়ে উঠা ভক্তি আন্দোলন থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। শঙ্করদেব প্রচারিত নব-বৈষ্ণব ধর্ম ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংগ মাত্র। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ভক্তিধর্ম প্রচার করার জন্য বেশকিছু ধর্মগুরু,ধর্ম-প্রচারক, সন্ত কবির আবির্ভাব ঘটেছিল। এই সমস্ত মনীষী তাঁদের সৃজনশীল প্রতিভার দ্বারা ভারতীয় সাহিত্য,সংস্কৃতি,সমাজ জীবনে অভূতপূর্ব অবদান রেখে গেছেন। এই প্রসঙ্গে আলোয়ার,নায়নমাররা ছাড়া শংকরাচার্য ,রামানুজাচার্য, রামানন্দ, কবীর, তুলসীদাস, চৈতন্যদেব, নানকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এবার আমরা ভারতের অন্যান্য ধর্মগুরুদের সংগে শঙ্করদেবের একটি তুলনামূলক আলোচনার দ্বারা শঙ্করদেবের প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করব।

ষষ্ঠ শতকে দাক্ষিণাত্যে বৈষ্ণব ভক্ত কবি আলোয়ার এবং শৈব ভক্ত কবি নায়নমাররা ভক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। এই আলোয়ার এবং নায়নমারদের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্যাদি জানা যায় না। আলওয়ারদের পরবর্তী ধর্মপ্রচারক হলেন শংকরাচার্য। শংকরাচার্যের আবির্ভাবকে একটি যুগ পরিবর্তনকারী ঘটনা বলে অভিহিত করা হয়। শংকরাচার্যের প্রকৃত নাম শংকর বিজয় বিলাস। ভক্তিধর্ম প্রচারকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাশালী ছিলেন শংকরাচার্য। শংকরাচার্যের জীবন কথা, প্রতিভা এবং ব্যক্তিত্বের বেশ কিছু দিকের সঙ্গে শঙ্করদেবের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। কুসুম্বর ভূঞার বহুদিন ধরে কোনো সন্তানাদি না হওয়ায় শিবের আরাধনা করে শঙ্করদেবকে লাভ করেন। ঠিক একইভাবে শিবগুরু এবং আর্চাম্বার বহুদিন ধরে কোনো সন্তানাদি না হওয়ায় শিবের কাছে প্রার্থনা করে শংকরাচার্যকে লাভ করেন। তাই সন্তানের নাম রাখেন শংকরাচার্য। পাঁচ বছর বয়সে শংকরাচার্যের পিতার মৃত্যু হয়। শঙ্করদেবেরও শৈশবে পিতা মাতার মৃত্যু হয়। দাদি খেরসুতি তাঁর লালন পালন করেন। বেদ আদি অধ্যয়ন করার জন্য শংকরাচার্যকে পাঁচ বছর বয়সেই গুরুগৃহে পাঠান হয়। শংকরদেবও ১২ বছর বয়সে গুরু মহেন্দ্র কন্দলীর টোলে পড়তে যান। শংকরাচার্য খুবই কম দিনের মধ্যে বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করে অভূতপূর্ব মেধার পরিচয় দান করেন। ঠিক তেমনই শঙ্করদেবও অল্প বয়সেই শাস্ত্রজ্ঞান ও সৃষ্টিশীল প্রতিভার পরিচয় দান করেন। উভয়ের সম্পর্কেই নানা অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। কম বয়সে বর্ষা ভরা ব্রহ্মপুত্র সাঁতরে পার হওয়া,নদীতে ডুব মেরে কাছিম ধরা,বলদ গরুর শিঙ ধরে কাবু করা, ভেকুরি নামে একজন ভিক্ষুকের ভাংগা হাড় জোড়া লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি অনেক কাহিনিতে শঙ্করদেবের বাল্যজীবন পরিপূর্ণ। একইভাবে শংকরাচার্যের জীবনেও নানান রকম অলৌকিক ঘটনার সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। দিবাকর নামে একটি বোবা শিশুকে বাকশক্তি প্রদান, মহাদেবের সাক্ষাৎ লাভ, শিবের আজ্ঞা অনুসরণে ব্যাসকৃত ‘ব্রহ্মসূত্র’এর ভাষ্য রচনা, ব্যাসের সশরীরে শংকরাচার্যকে দর্শন দান, ব্রহ্মসূত্রের নিঁখুত ব্যাখ্যা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে শংকরাচার্যের ষোল বছরের মৃত্যুযোগ বিনাশ করে আরো ষোল বছরের আয়ু প্রদান, যোগবলে শংকরাচার্যের আকাশপথে পরিভ্রমণ ইত্যাদি অনেক অলৌলিক কাহিনি শংকরাচার্যের জীবনেও আমরা দেখতে পাই। শঙ্করদেব তাঁর জীবনকালে দুবার করে তীর্থ ভ্রমণ করেছিলেন। প্রথমবার সুদীর্ঘ বারো বছর এবং দ্বিতীয়বার ছয়মাস কাল। এই ভ্রমণে তিনি গয়া,মথুরা,বৃন্দাবন,দ্বারকা,বদরিকাশ্রম,কাশী,প্রয়াগ,বারাণসী,পুষ্কর,পুরী,অযোধ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শঙ্করদেবের জীবনকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। শংকরাচার্যও ধর্মমত প্রতিষ্ঠার জন্য তিব্বত,কাশ্মীর,ভূটান,নেপাল আদি ভ্রমণ করার কথা জানা যায়। তবে শঙ্করদেবের মতো সুদীর্ঘ বারো বছর ছয়মাসের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আর কোনো ধর্মগুরুর ছিল না। ধর্মমত প্রচার করার জন্য শংকরাচার্য নিজে ভারতে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই মঠগুলি হল –দক্ষিণে শৃংগেরী পর্বতে শৃঙ্গেরী মঠ,পশ্চিমে দ্বারকায় শারদা মঠ,উত্তরে বদরিকাশ্রমে জ্যোর্তিমঠ ((জোশী মঠ হিসেবে পরিচিত),পূবে জগন্নাথ পুরীতে গোবর্ধন মঠ। এই মঠগুলির মাধ্যমে শংকরাচার্যের শিষ্য তথা অনুগামীরা ধর্ম প্রচার করে থাকেন। শংকরদেব এবং তার অনুগামীরা নামঘর,সত্র প্রতিষ্ঠা করে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার করেন। ভক্তি আন্দোলনের প্রায় প্রতিজন ধর্ম প্রচারকই সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এর ফলে প্রতিটি প্রদেশেই সাহিত্যের ভাণ্ডার ঋদ্ধ হয়েছিল। শংকরাচার্য ‘প্রস্থানত্রয়’ নামে ব্রহ্মসূত্র,উপনিষদ এবং গীতার ভাষ্য রচনা করেন। ‘বিবেকচূড়ামণি’,’অপরোক্ষনুভূতি’,’আত্মবোধ’,’সর্ব বেদান্তসার সংগ্রহ’,’শতশ্লোকী’,মোহমুদ্গর শংকরাচার্যের উল্লেখযোগ্য রচনা। শংকরাচার্যের মতোই রামানুজাচার্যের ‘শ্রীভাষ্য’,তুলসীদাসের ‘রামচরিত মানস’,’বিনয় পত্রিকা’,সুরদাসের ‘সুরসাগর’,নানকের’গুরুগ্রন্থ সাহেব’মীরাবাঈ এবং কবীরের ভজন ভক্তি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। কিন্তু অন্যান্য ভক্ত কবিদের সংগে শঙ্করদেবের সৃষ্টিপ্রতিভার তুলনা করলে দেখা যায় যে শঙ্করদেবের রচনার পরিমাণ অনেক বেশি।তাই সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে ও ভারতীয় ভক্ত কবিদের মধ্যে শঙ্করদেব অন্যতম।শঙ্করদেবের মতো একই ব্যক্তি গীত,নাটক,কাব্য,পরিবেশ কলা সৃষ্টি করে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার মতো উদাহরণ একান্তই বিরল।

মহাপুরুষ শঙ্করদেব এবং গুরু নানক সমসাময়িক মহাপুরুষ। দুজনেরই জীবন দর্শন প্রায় এক। দুজনেই হিলেন সমাজ সংস্কারক, সাম্যবাদী, উদার, দয়ালু, মেধাবী, সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক, সংসারে বসবাস করেও উদাসীন বৈরাগী, ঈশ্বরভক্তিতে আত্মমগ্ন সিদ্ধ যোগীপুরুষ।গুরু নানকের জীবনও অলৌকিকতায় পরিপূর্ণ। মহাপুরুষ শঙ্করদেব যেমন বর্ণমালা শিখে আকার-ইকার ছাড়া কবিতা লিখে শিক্ষককে বিস্মিত করেছিলেন, গুরু নানকও তেমনই বর্ণমালা শিখেই একটি সুন্দর প্রার্থনা সংগীত রচনা করে সুন্দর কণ্ঠে গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। তবে শঙ্করদেবের মতো নানককে শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন হতে হয়নি। পিতা কালু একজন ধনী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। শৈশব থেকেই নানক ছিলেন প্রকৃতিমুখী।নির্জন স্থানে বসে ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকতে ভালবাসতেন।শৈশব থেকেই নানক ছিলেন যুক্তিবাদী। তখনকার দিনে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা উপবীত ধারণ করতেন। নানকেরও উপবীত ধারণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। কিন্তু তিনি উক্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেন না। তিনি অংশগ্রহণ না করার কারণ হিসেবে বললেন-‘যে উপবীত তোমরা আমাকে ধারণ করতে বলছ, তা কয়েকটি সুতোর সমাহার মাত্র। একদিন এই উপবীত জীর্ণ হবে, অপরিষ্কার হবে, ছিঁড়ে যাবে। এটা তো পরলোকে আমার সংগী হব না।‘ শঙ্করদেবের মতোই নানক অস্পৃশ্যতা এবং বর্ণবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন। তাঁর উদার সাম্যবাদী কার্যকলাপেরর দ্বারা পশ্চিম উত্তর ভারতে অস্পৃশ্যতা দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। মহাপুরুষ শঙ্করদেব যেভাবে ঈশ্বর উপাসনার জন্য নাম-কীর্তন, বরগীত আদি রচনা করেছিলেন গুরু নানকও তেমনই প্রার্থনা গীত, ভজন আদি রচনা করেছিলেন। অবশ্য নাট-ভাওনা, চিত্র-ভাস্কর্য ইত্যাদি চর্চার কথা গুরু নানকের জীবনীতে দেখা যায় না।

শ্রীচৈতন্যদেব বঙ্গদেশের একজন ধর্মপ্রচারক। পিতা জগন্নাথ মিশ্র এবং মাতা শচীদেবী। আদিতে তাঁদের বাড়ি ছিল শ্রীহট্টে। পরবর্তীকালে নবদ্বীপে চলে আসেন। ১৪৮৫ সনে নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের জন্ম হয়। এগারো বছর বয়সে চৈতন্যদেবের পিতার মৃত্যু হয়। ১৬ বছর বয়সে নিমাই ওরফে চৈতন্যদেব টোলের পণ্ডিত হন। একই বছরে লক্ষ্মীপ্রিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু সর্প দংশনে লক্ষ্মীপ্রিয়ার মৃত্যু হওয়ায় বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে পুনরায় বিয়ে হয়। তেইশ বছর বয়সে চৈতন্যদেব তীর্থযাত্রা করেন। গয়ায় মাধবেন্দ্রপুরীর শিষ্য ঈশ্বরপুরীর কাছ থেকে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। নানা তীর্থ পরিভ্রমণ করে এসে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পুরীতে মৃত্যু বরণ করেন। চৈতন্য নিজে কোনো গ্রন্থ লিখেননি। তাঁর মৃত্যুর পরে কৃষ্ণদাস বৈষ্ণব ‘চৈতন্য চরিতামৃত’নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন । এটিকেই চৈতন্য জীবন দর্শনের আকরগ্রন্থ বলা হয়ে থাকে। শঙ্করদেব সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে নাম-ধর্ম প্রচারের জন্য শঙ্করদেব জন্ম নিয়েছিলেন। কিন্তু চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের কারণ আলাদা। বৈষ্ণবদের মতে রাধার প্রেমের গভীরতা আস্বাদনের জন্য চৈতন্যদেবের আবির্ভাব। শ্রীচৈতন্য রাধা-কৃষ্ণের অভেদ বা অদ্বৈত রূপ।শ্রীচৈতন্যের মতো শঙ্করদেবকে কখনও বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করা হয় না। চৈতন্যপন্থীরা শঙ্করদেবকে নির্বিশেষবাদী আখ্যা দিয়ে তাঁর ওপরে নাস্তিকতার দোষ আরোপ করেন। একটা সময়ে শ্রী শঙ্করদেব এবং মহাপুরুষীয়া ধর্মের বিরুদ্ধে নিন্দাবাদের ধ্বনি তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল । এর সদুত্তর সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া তাঁর ‘চৈতন্যদেব’প্রবন্ধে দিয়েছেন। চৈতন্যপন্থীদের সঙ্গে শ্রীশঙ্করদেব প্রচারিত ধর্মের আরো একটি বিষয়ে পার্থক্য চোখে পড়ে। ‘চৈতন্য চরিতামৃত’এ বলা হয়েছে যে শ্রীচৈতন্যের কাজ যুগধর্ম  প্রবর্তন নয়। কিন্তু নাম-ধর্ম প্রবর্তনের দ্বারা শঙ্করদেব অসমে যুগান্তরের সৃষ্টি করেছিলেন। শ্রীচৈতন্যের মতো শঙ্করদেব শেষ বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেননি। শঙ্করদেব বুঝতে পেরেছিলেন যে ভগবানের নাম গান করার জন্য সংসার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। গৃহে বসবাস করেও ঈশ্বরের নাম গান করা যেতে পারে। চৈতন্য পন্থায় শৃঙ্গার রসের প্রাচুর্য অধিক। শৃঙ্গার রসের প্রবর্তক ঈশ্বরপুরীর কাছ থেকেই চৈতন্যদেব এই রসের বীজ গ্রহণ করেছিলেন। তাই তিনি বলেছিলেন—‘সব রস হৈতে শৃংগারে অধিক মাধুরী।‘এই জন্যই তিনি রাধাকৃষ্ণের প্রেম সম্পর্কর উপর অধিক জোর দিয়েছিলেন। এই রসের বশবর্তী হয়ে তিনি পরকীয়া প্রেমের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছিলেন—পরকীয়া ভাবে রতি রসেরে উল্লাস।’ ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রাধার ভাব নিয়ে চৈতন্য অবতাররূপে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং এভাবে নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেছেন।–

সেই রাধার ভাব লৈঞা চৈতন্যাবতার

যুগধর্ম নাম প্রেম কৈল পরচার।।

সেইভাবে নিজ বাঞ্ছা করিল পূরণ।

অবতারের এই হেতু মূল যে কারণ।।

এই পরকীয়াবাদ শঙ্করদেবের ধর্ম মতে নেই। শৃঙ্গার নয়,দাস্য ভাবই শঙ্করদেবের ধর্ম সাধনার মূল আধার। দর্শনের দিক থেকে শ্রীচৈতন্যদেব ‘অচিন্ত্য ভেদাভেদবাদ’ প্রচার করেছিলেন, শঙ্করদেব করেননি। এই মতবাদ মতে জগত ও জীব ভগবানের সঙ্গে এক হয়েও আলাদা।শঙ্করদেব এই ধরনের কোনো মতবাদ প্রচার করেননি। তাঁর কাছে ভাগবত পুরাণই বেদান্তের ভাষ্য। শঙ্করদেব যে চৈতন্যের শিষ্য ছিল না, বা চৈতন্য পন্থার কোনো প্রভাব যে মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণব ধর্মে পড়েনি তার জ্বলন্ত উদাহরণ হল শঙ্করদেব এবং মাধবদেবের পুঁথিতে চৈতন্যের কোনো নাম উল্লেখ নেই। চৈতন্য প্রচারিত ধর্মের আগেই অসমে মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারিত হয়েছিল।

মহাপুরুষ শঙ্করদেবের বিভিন্ন সৃষ্টির মধ্যে নাটকের রচনা অসমের নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসের সূচনাপর্ব বলা যেতে পারে। কারণ শঙ্করদেবের পূর্বে অসমে কোনো পূর্ণাংগ নাটকের পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে সংস্কৃত নাটক চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মা চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েনসাঙকে নৃত্য গীত দেখিয়ে সন্তুষ্ট করেছিলেন। নাট্যকার শঙ্করদেবের অভিনব মৌলিকতার পরিচয় পাওয়া যায় নাটকের সূত্রধারের পরিকল্পনায়। প্রাচ্য-প্রতীচ্য, প্রাচীন-মধ্যযুগীয়, এমনকি আধুনিক যুগেরও অনেক নাট্যানুষ্ঠানে সূত্রধার সদৃশ্য চরিত্র দেখা যায়। সূত্রধার মূল কাহিনির অন্তর্ভুক্ত চরিত্র নয়,কিন্তু প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত উপস্থিত থেকে সমগ্র নাটকটি সূত্রধারই পরিচালনা করে। শঙ্করদেব রচিত নাটকগুলি হল যথাক্রমে পত্নীপ্রসাদ,পারিজাত হরণ’ কালিদমন যাত্রা,রুক্মিণী হরণ নাট,কেলিগোপাল এবং রামবিজয় নাট। এগুলি ছাড়া চিহ্নযাত্রা এবং জন্ম নামে দুটি নাটকও তিনি রচনা করেন বলে জানা যায় তবে আজ আর সে দুটির কোনো লিখিত রূপ পাওয়া যায় না। পারিজাত হরণ নাটকের উৎস হরিবংশ। পরবর্তী নাটক কালিদমনের কাহিনিভাগ শ্রীমদ্ভাগবত, হরিবংশ এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকে গৃহীত। রুক্মিণী হরণ নাটকের কাহিনিও হরিবংশ, শ্রীমদভাগবত এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকে গৃহীত হয়েছে। বাল্মীকি রামায়ণের বালকাণ্ডের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে শঙ্করদেব ‘রামবিজয়’নাটক রচনা করেন। শঙ্করদেব যে নাটককে জনমুখী করতে চেয়েছিলেন তার অন্যতম প্রমাণ হল নাটকগুলিতে ব্যবহৃত ভাষা। অঙ্কীয়া নাটকের বিষয়বস্তু এবং উদ্দেশ্য এরকম যে এর রচনা কলাসম্মত হতে পারে না। ভগবান কৃষ্ণের মাহাত্ম্য প্রকাশ করার জন্য এবং শ্রোতা দর্শকের মনে ভক্তিভাব জাগিয়ে তোলার জন্য সাধারণ কথিত ভাষা উপযুক্ত মাধ্যম হতে পারে না। এর জন্য উপযুক্ত হল সংস্কৃত ভাষা। কিন্তু যেহেতু সংস্কৃত সাধারণের উপযোগী ভাষা নয় তাই শঙ্করদেব এরকম একটি কৃত্রিম ভাষার সৃষ্টি করলেন যার মধ্যে এক বিশেষ ধরনের গাম্ভীর্য রয়েছে,অথচ জনগণ তা সহজে বুঝতে পারে। মৈথিলি এবং অসমিয়া ভাষার সংমিশ্রণে সৃষ্ট এই ভাষা রাধা এবং কৃষ্ণের পবিত্র ধামের সঙ্গে জড়িত ব্রজধামের কথা মনে করিয়ে দেয় বলে একে ব্রজবুলি ভাষা বলা হয়ে থাকে।

শঙ্করদেবের সাহিত্য উদ্দেশ্যধর্মী, কিন্তু তাঁর কবিতা কোথাও উদ্দেশ্যসর্বস্ব নয়। সূক্ষ্ম নিরীক্ষণ, যথার্থ উপমা, সৌন্দর্যবোধ এবং কথাবস্তু আঙ্গিকের সুসমন্বয়ে তাঁর কবিতা পাঠক শ্রোতাকে মুগ্ধ করে এবং প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষা দান করে। শঙ্করদেবের কবিতার এক বিশেষ বিশেষত্ব ছন্দের বৈচিত্র্য। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাহিনি বর্ণনার সঙ্গে সংগতি রেখে কবিতার ছন্দেও পরিবর্তন এনেছেন। শ্রীমদ্ভাগবত, কীর্তন ইত্যাদিতে দুলড়ী,লেছারি,ছবি আদি ছন্দের তুলনায় ঝুমরীর প্রয়োগ কম, কিন্তু যেখানে বর্ণিত কাহিনির গতিবেগ বৃদ্ধি করা আবশ্যক সেখানে ঝুমরী ছন্দের প্রয়োগ করেছেন। শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্দে ভীম জরাসন্ধের যুদ্ধ বর্ণনায় ঝুমরী ছন্দের ব্যবহার করা হয়েছে। —

নানা ছন্দে ধরে আটি            ছাল ছুড়ি যায় ফাটি

ধরি পকাৱন্ত যার                 মরমরি করে হাড়

চৱর চপট চোট                  ছাল ভৈলা সোটা সোট। ইত্যাদি।

যুদ্ধের কলাকৌশল বর্ণনার তড়িৎ গতিবেগের সঙ্গে এখানে অনুপ্রাসের প্রয়োগও চমৎকার। মহৎ কবিতার একটি লক্ষণ হল এই যে, কবিতার কোনো কোনো সারি পৃথকভাবে ব্যবহৃত হলেও তার মাধুর্য হারিয়ে যায় না। শঙ্করদেব রচিত অনেক পংক্তি পরবর্তীকালে আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে। আজও অসমিয়া সমাজ দৈনন্দিন জীবনে তা ব্যবহার করে চলেছে।যেমন –‘আপনি বয়স হৈলে বুদ্ধি হৈবে ভাল (প্রহ্লাদ চরিত্র),’দেখন্তে শুনন্তে সদা হেলা হোৱে মতি (রাসক্রীড়া),’হেন চিন্তামণি জন্ম হাততে হরায়’(দশম স্কন্দ ভাগবত),’তনু উপজ্যন্তে মৃত্যু ওপজে লগতে’(দশম স্কন্দ ভাগবত),’বর বর পণ্ডিতো মরয় স্থানে স্থানে (চতুর্থ স্কন্দ ভাগবত) ইত্যাদি। সাহিত্য পঠনীয় এবং আমোদজনক হলে তবেই লোকেরা পড়বে এবং পড়ে আনন্দ পেলে তাতে কোনো উপদেশ থাকলে পাঠক তা গ্রহণ করা বা না করার কথা চিন্তা করবে। পড়তে বিরক্ত বোধ হলে জ্ঞানগর্ভ কথা থাকলেও পাঠক তা পড়বে না ফলে লেখকের উদ্দেশ্যও সফল হবে না। মহাপুরুষ শঙ্করদেব এদিক থেকে সমস্ত লেখকেরই শিক্ষক ছিলেন। পদ্য বা কবিতায় মনোরম কাহিনি বর্ণনা, চিন্তা ভাব-অনুভূতির পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে ছন্দের যথাযোগ্য ব্যবহার, চমৎকার প্রকৃতি এবং পরিবেশের বর্ণনা, নাটকীয় পরিস্থিতির উদ্ভাবন,গভীর তত্ত্বমূলক কথার সরল প্রকাশ, শব্দের নির্বাচন এবং সংযোজন, অলংকারের প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ, উপমার চমৎকার প্রয়োগ শঙ্করদেবকে কাব্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে রেখেছে।

শঙ্করদেবের রচনার মধ্যে বরগীতের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে। অসমের বৈষ্ণব পরম্পরা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বরগীতগুলিকে একটি বিশেষ স্থান দেওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত বরগীত বললে, মহাপুরুষ শঙ্করদেব ও মাধবদেব রচিত কিছু গীতকে বোঝায়। এই গীতগুলি মূলত আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন এবং নির্দিষ্ট রাগযুক্ত। ডঃ বাণীকান্ত কাকতি বলেছেন -বরগীতগুলি উচ্চ নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক ভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। বরগীতের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ভাষা, বিষয়বস্তুর সংরক্ষণশীলতা, সুর, চৌদ্দ প্রসঙ্গর পরিক্রমায় এর স্থান এবং সীমাবদ্ধ পবিত্রতা। বরগীত সাংসারিক জগতের প্রেম কাহিনির থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত—আধ্যাত্মিক ভাবের উপাসনা প্রসঙ্গের গীত। বরগীতগুলির উপজীব্য বিষয় কৃষ্ণের দৈহিক রূপের বর্ণনা, কৃষ্ণের শক্তি মাহাত্ম্যের বর্ণনা, পারমার্থিক তত্ত্বপ্রধান বিষয়, সংসার -বিরক্তি প্রকাশক বিষয়, নাম-মাহাত্ম্য প্রকাশক বিষয়, খেদ প্রকাশক বিষয়, বিরহ বিষয়ক, ভক্তবৎসলতা প্রকাশক বিষয় এবং বিলাপ বিষয়ক বিষয়। চরিত পুঁথি অনুসারে শঙ্করদেব নিজে বারো কুড়ি বরগীত রচনা করেছিলেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রকাশিত পুঁথিগুলিতে মাত্র চৌত্রিশটি গীত পাওয়া যায়। চরিত পুঁথিতে উল্লেখ রয়েছে যে কমলা গায়ন নামে একজন ভক্ত গীতগুলি পড়ার জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশতঃ বাড়িতে আগুন লেগে যাওয়ায় সবগুলি গীত পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

‘গুণমালা’ মহাপুরুষ শঙ্করদেবের একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা।এটি কলেবরে ক্ষুদ্র, কিন্তু গুণবৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ। পুস্তিকাটি ছয়টি ঘোষা এবং তিনশত সাতাত্তরটি পদে সমাপ্ত। মূলত ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্দের আধারে নির্গুণের গুণ ও অরূপের রূপে এক অতি সুন্দর মালাধার গেঁথেছেন মহাপুরুষ শঙ্করদেব-যার নাম গুণমালা। গুরুচরিত থেকে জানা যায় –মহারাজ নরনারায়ণ এক বৈঠকে ভাগবত শ্রবণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর সভায় পণ্ডিতদের সামনে এই ইচ্ছা প্রকাশ করলে, সকলেই অসম্ভব বলে রাজাকে জানান। তখন মহাপুরুষ শঙ্করদেব এক রাতের মধ্যে ভাগবতের সারাংশের মাধ্যমে ‘গুণমালা’ রচনা করে রাজাকে নিবেদন করেন। এটি কুসুমমালা ছন্দে রচিত। এই ছন্দে ছয় অক্ষর যুক্ত চারটি পর্ব থাকে-প্রতি পর্বে শেষ অক্ষঅরে মিল থাকে।

এবার আমরা শঙ্করদেবের রচনায় নারীর স্থান কোথায় তা দেখাতে চেষ্টা করব। ধর্মগুরুরা চিরকাল কামিনী কাঞ্চন থেকে সর্বসাধারণকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে উপদেশ দিয়েছেন। কারণ তাদের মতে এই দুটি ষড়রিপুকে উত্তেজিত করে জীবকে পথভ্রষ্ট করে, ফলে মুক্তির পথ খুঁজে না পেয়ে সংসার চক্রে আবর্তিত হয়। এই বিষয়ে অসমের বৈষ্ণব ধর্মগুরুরাও একই কথা বলেছেন। মহাপুরুষ শঙ্করদেবের কীর্তন পুঁথিতে দেখি –

ঘোর নারীমায়া সর্বমায়াতে কুৎসিত।

মহাসিদ্ধ মুনিরো কটাক্ষে মোহে চিত্ত।।

দরশনে করে তপ জপ যোগ ভংগ।

জানি জ্ঞানীগণে কামিনীর এনে সঙ্গ।।

‘ভক্তি রত্নাকর’ এ আমরা দেখি –

পরম অনর্থকারী নারী সমস্তয়।

নারী সঙ্গে বহু দুখ পুরুষে লভয়।।

নিষ্কাম ভক্ত মহাপুরুষ শঙ্করদেবের রচনায় এই ধরনের উক্তি সর্ব্বভরতীয় বৈষ্ণব মতাদর্শেরই প্রতিধ্বনি। সাহিত্যকর্ম যখন উদ্দেশ্যধর্মী হয় তখন লেখকের সমস্ত চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণা,ভাব-অনুভূতি সেই একই উদ্দেশ্যে ধাবিত হয়। ফলে সেই সমস্ত রচনায় লেখকের প্রতিভার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না। অসমে ভাগবতী বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে শঙ্করদেব নাট, গীত,ভটিমা ইত্যাদি সৃষ্টি করেন। ভাগবতই ছিল অসমের বৈষ্ণব গুরুদের সাহিত্য সৃষ্টির মূল আধার। উপরোক্ত নারী সম্পর্কীয় উক্তিসমূহ অথবা ‘স্ত্রী শূদ্র অন্ত্য জাতি অধম চণ্ডাল’ বলে করা মন্তব্য শঙ্করদেবের নিজস্ব নয়। এসব কথা ভাগবতের।বাস্তব ক্ষেত্রে নারী সম্পর্কে শঙ্করদেবের ধারণা এই ধরনের ছিল বলে মনে হয় না। কারণ তিনি নিজে আদর্শ গৃহী ছিলেন এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য মাধবদেবকেও ‘গড় বান্ধি যুঁজিলে সজ,প্রাণর সংশয় নাই’বলে বিয়ে করে সংসারী হতে উপদেশ দিয়েছিলেন। নারীমনের স্বাভাবিক ভাব অনুভূতি, প্রেম-প্রীতির প্রকাশ শঙ্করদেবের রচনায় খুব একটা দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ ‘পত্নীপ্রসাদ’ নাটকের ব্রাহ্মণ পত্নীরা,’কেলিগোপাল’এবং কালিদমন’নাটকের ব্রজনারীরা এবং ‘রামবিজয়’নাটকের সীতা চরিত্রের পরিচয় কেবল ভগবানের পায়ে নিবেদিত ভক্ত হিসেবে,তাদের নারী সত্তার কোনো পরিচয় সেখানে ফুটে উঠেনি। ‘কেলিগোপাল’নাটকে আমরা রাধা নামে একজন গোপীর দেখা পাই। কিন্তু এই রাধা কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’এর বা ‘মৈথিন কোকিল বিদ্যাপতির দুরন্ত প্রেমিকা রাধা নয়।‘কেলিগোপাল’নাটকে রাধা নামে গোপীর উল্লেখ করা হয়েছে কেবল এটা দেখানোর জন্য যে অহং ভাবের বিলোপ সাধন না হলে ভগবানকে লাভ করা যায় না। ‘ রুক্মিণী হরণ’নাটকের ভীষ্মকের পত্নী শশীপ্রভা,সুমালিনী ধাই এবং দৈবকীর চরিত্র চিত্রনে শঙ্করদেবের মৌলিকতা লক্ষ্য করা যায়। এসবই পার্শ্বচরিত্র। কিছুক্ষণের জন্য কাব্যে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই মাতৃ এবং ধাতৃ রূপের সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। বিবাহযোগ্যা রূপবতী কন্যা ঘরে থাকলে সব মায়েরই দুশ্চিন্তা হয়। উপযুক্ত ছেলে দেখে কন্যার বিয়ে দিতে পারলে মাতা পিতা দায়মুক্ত হন। তাই আর দশজন মায়ের মতোই শশীপ্রভা ও রাজা ভীষ্মককে  বলেন—

রুক্মিণী জীয়াইর আমি ভৈল বোধমান।

যুড়িয়োক বর রাজা করা কন্যাদান।।

সাত পোঞ্চ নাহিকে জীয়াই এক গুটি।

কোনমতে আসে প্রভু নিশ্চিন্ত ঘুমটি।।

কন্যাকে সুপাত্রে অর্পণ করার জন্য মায়ের উদ্বিগ্নতা যেমন চিরন্তন,বিয়ের কন্যাকে বিদায় দেবার বেদনাও গর্ভধারিণীর কাছে তেমনই শাশ্বত। আদরে প্রতিপালিত কন্যাকে যেন শাশুড়ি সমস্ত দোষ ক্ষমা করে নিজের মেয়ের মতো পালন করেন এটাই সমস্ত মায়ের কামনা। শশীপ্রভাও তাই দৈবকীর হাত ধরে অনুরোধ করেন –

পাঞ্চ পুত্র মাজে                 জীউ একখানি

সম্যকে মোহোর জীউ

কাবৌ করো হেরা               পালিবা বিহানী

তোমারসে ভৈল জীউ।।

তখন একজন সন্তান বৎসলা মায়ের করুণ আকুতির চিরন্তন ছবিটিই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে।বৈষ্ণব সাহিত্যের সীমা লঙ্ঘন না করে মহাপুরুষ শঙ্করদেব যে কয়েকটি নারী চরিত্র কাব্য এবং নাটকে সৃষ্টি করেছেন সেগুলি তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভা এবং চরিত্রাঙ্কন ক্ষমতার পরিচয় দান করে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ‘কীর্ত্তন পুঁথি’র ঘোর নারীমায়া সর্বমায়াতে কুৎসিত’ অথবা ‘ভক্তিরত্নাকর’এর পরম অনর্থকারী নারী সমস্তয়’আদি কথার প্রমাণস্বরূপ মহাপুরুষের রচনায় একটিও অসৎ বা অনিষ্টকারী মোহিনী রূপের নারী চরিত্র নেই। পত্নী, প্রিয়া, মাতৃ, সখী এবং ধাতৃ প্রায় প্রতিটি চরিত্রই স্নেহ-মমতা, বিশ্বাস, পরোপকার এবং বিশুদ্ধ প্রেম-ভক্তির প্রতিভূস্বরূপ।‘

শঙ্করদেবের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তি মতামত ব্যক্ত করেছেন। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন-‘যে ধর্মকে অবলম্বন করে আমি রাম রাজ্য কল্পনা করেছি তার চেয়ে সুন্দর উদাহরণ শঙ্করদেব অসমবাসীকে দিয়ে গেছেন। আমি কেবল তার অনুশীলন করেছি—তাতে কোনোরকম নতুনত্ব নেই। যে কাজ (অস্পৃশ্যতা বর্জন) আমি এখন করছি,শঙ্করদেব পাঁচশ বছর আগে সেই কাজ সম্পন্ন করে রেখে গেছেন।‘আচার্য বিনোভাভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন-আমি অনেক ধর্মের বিষয়ে অধ্যয়ন করেছি। কিন্তু শঙ্করদেবের ধর্মের মতো উদার ধর্ম আজ পর্যন্ত কোথাও দেখিনি।‘ বিখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন –‘ভারতবর্ষে জন্মলাভ করা সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রশ্নাতীতভাবে শঙ্করদেব ও একজন এবং শংকরাচার্য, রামানুজাচার্য, রামানন্দ, কবীর, চৈতন্য, নানক, তুলসীদাস, বাসাভাপ্পা,মীরাবাঈ আদির সঙ্গে তাঁর নাম সমানভাবে উল্লেখনীয়।

মহাপুরুষ শঙ্করদেবের অসাধারণ,মহৎ প্রতিভার প্রতি লক্ষ্য রেখে বিংশ শতকের একজন প্রাচ্যতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ডঃ বাসুদেব শরণ অগ্রবাল বলেছেন-‘কবি এবং স্রষ্টা অনেক আছে,অনেক আছে সন্ত এবং ধর্মগুরু, সঙ্গীত বিশারদ এবং ধর্ম প্রচারকও অনেক রয়েছে। কিন্তু শঙ্করদেব হলেন এরকম এক মহৎ প্রতিভা যার একক ব্যক্তিত্বের মধ্যে এই সমস্ত গুণের সমাহার হয়েছিল।‘

শঙ্করদেবের ব্যক্তিত্বের এতগুলি দিক থাকা সত্ত্বেও তার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। তা হল অন্যান্য ধর্ম প্রচারকদের মতো তিনি কোনো বিশেষ দর্শন প্রতিষ্ঠা করে যাননি। শংকরাচার্যের অদ্বৈতবাদ, রামানুজাচার্যের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, বল্লভাচার্যের শুদ্ধাদ্বৈতবাদ, চৈতন্যদেবের অচিন্ত্য ভেদাভেদবাদ এর মতো শঙ্করদেব সেরকম কোনো নির্দিষ্ট দর্শন প্রতিষ্ঠা করে যাননি। সেজন্যই শঙ্করদেব অন্যান্য ধর্ম প্রচারকদের মতো ভারতের ইতিহাসে এতটা পরিচিতি লাভ করেননি।

তীক্ষ্ণ সামাজিক চেতনাসম্পন্ন শঙ্করদেব তাঁর সমকালীন সমাজে সাধারণ মানুষের দুঃখ যন্ত্রণা দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু পৃথিবীর অন্য সমস্ত ধর্মগুরুদের মতোই তিনিও ‘বাস্তব জীবনের এই ব্যবহারিক সমস্যাগুলির’ সমাধান ব্যবহারিকভাবে করতে চাননি। তিনি এই সমস্ত সমস্যার এক আদর্শায়িত মনস্তাত্ত্বিক সমাধান চেয়েছিলেন। এই ক্ষেত্রে বুদ্ধের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য রয়েছে। আজ যখন আমরা এক বিশেষ সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছি তখন আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস নতুন করে শঙ্করদেবের চর্চা আমাদের জাতীয় জীবনকে এক ভিন্ন মাত্রা দান করে নতুন উষার আলোকে আলোকিত করে তুলবে।

========

২০১৮ সনের ৯ এবং ১০ ফেব্রুয়ারি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া বিভাগ আয়োজিত জাতীয় আলোচনা চক্রে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে প্রবন্ধটি পাঠ করা হয়। ধূপগুড়ি,উত্তরবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ‘প্রবাহ তিস্তা তোরষা’র শারদীয়া সংখ্যায় লেখাটি বেরিয়েছে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top