মানিক বৈরাগীর কবিতা

লুট হয়ে যায় আমার শহর

প্রতিদিন লুট হয়ে যায় আমার প্রাণের শহর
প্রতিদিন লুট হয়ে যায় আমার প্রাণের সৈকত
প্রতিদিন কেটে নেয় আমার প্রশান্তির ঝাউবীথি
প্রতিদিন লুট হয়ে যায় সৈকত-সকাল
প্রতিদিন লুট হয়ে যায় ভাটফুল বালিয়াড়ি
প্রতিদিন নি:শ্বাস হারায় রূপসী লাল কাকড়া

প্রতিটি ঢেউয়ে ভেসে আসে ব্যবহৃত লুব্রিকেন্ট কনডম
প্রতিটি ঢেউয়ে ভেসে আসে প্লাস্টিক জার পলিব্যাগ
প্রতিটি ঢেউয়ে ভেসে আসে ভাঙ্গা কাকন চুঁড়ি
প্রতিটি ঢেউয়ে ভেসে আসে এমন সব খোসা নাম অজানা
আমার প্রাণের সৈকত আর আমার নাই

ফড়িয়াপতি,ফড়িয়া নেতা,ফড়িয়া আমলা
আরো কত পেশার পেশিজীবীর যৌথতায়
এ শহর আর আমার নাই
এ শহর আর মানুষের নাই
এ শহরে আর পাহাড় নাই
এ শহরে আর ছড়া নাই
এ শহরে আর খাল নাই
এ শহরে আর নদী নাই
সবই গেছে লুটের দখলে

এ শহরে আর মৌসুমী ফলের আবাদ নাই
এ শহরে আর মৌসুমী সবজি আবাদ নাই
এ শহরে আর ফলজ বৃক্ষের ফলন নাই
এ শহরে হলুদ ফুলের সমারোহ নাই
এ শহরে কাশবন শনফুল তারিবন নাই
বার্মিজ মার্কেটে রাখাইন তরুণীর হাসি নাই
নাই নাই নাই কিছুই নাই

সবই গেছে লিজ উপলিজ নালিশের দখলে
রাজনীতি নাই,নেতা নাই,আমার মতো মেরুদণ্ডও নাই,সবই পড়েছে নুইয়ে নীতিহীনতার কাছে।

কলাতলী হিমছড়ি বড়ছড়ার পাহাড়ে চুড়া নাই,গাছ নাই তাই ঝর্ণাও নাই
আমার শহরে হোটেলের ফাঁক দিয়ে দূর সমুদ্র দেখা যায়
আমাদের শহরে যায় না দেখা সৈকত
হোটেল মোটেল মার্কেট যায় দেখা

আমার শহরে নেতা আছে রাজনীতি নাই
আমার শহরে রাজনীতি আছে নীতির নেতা নাই
আমার শহরে সাংবাদিক আছে সংবাদ নাই
আমার শহরে সংবাদ আছে সাংবাদিক নাই
আমার শহরে সংবাদপত্র আছে সম্পাদকীয় নাই
আমার শহরে গল্প আছে ইতিহাস আছে চর্চা নাই
আমার শহরে গান আছে গায়ক আছে গাছ নাই
আমার গাল আছে ভুরি ভুরি আওয়াজ নাই
আমার শহরে আওয়াজ আছে ওয়াজও আছে শোনা-বোঝার লোক নাই

প্রতিদিন নাই হয়ে যায় চেনা সৈকত
প্রতিদিন নাই হয়ে যায় সাজানো ঝাউ
প্রতিদিন নাই হয়ে যায় মাঠঘাট বালিয়াড়

আমার শহরে প্রতিদিন দালান উঠে
আমার শহরে প্রতিদিন দেয়ালও উঠে
হারিয়ে যায় আমার ঘুড়ির আকাশ
হারিয়ে যায় আমার ভাবনার কবিটং
হারিয়ে যায় আমার রাজনীতি মাঠ
হারিয়ে যায় লালদীঘি জেলে ময়দান
হারিয়ে যায় আমার সাতার কাটার পুকুর
বিজ্ঞাপনে ভাসে সুইমিংপুলের টিকিট
হারিয়ে আমার ঢেউ খেলানো মিষ্টি বাতাস
রঙিন দেখায় ঢেউ ছড়ানো সফেদ সফেন
হারিয়ে হারিয়ে যায়
লুট হয়ে যায়
লুট হয়ে যায়
বিবেকিরা কি অফিয়াম মর্ফিন?

৪ নভেম্বর ২০১৮

মাতোয়ারা শরতে

শারদ চাঁদ জোছনার প্রহরে আলোয় টলোমলো চারদিক
কাশবনের আড়ালে লুকিয়েছিলেম
হই হই রবে মেঘ গুড়ুম গুড়ুম রব

সাদা ইলশা মেঘের কামার্ততায় আমরা
সবুজ ঘাসেই আমাদের বাসর গালিচা
গভীর কামোষ্ণ অন্তহীন যুতসই রাত

মুখভর্তি যোনিরসে সাতার কাটছি হালদায়
পাড়ায় মাতম করছে বুড়াবুডি ও কাঠমোল্লা
তরুণ তরুণীরা মাতোয়ারা বুধি-পূর্ণিমায়
ফানুস উড়ছে উদ্দাম আকাশে জ্বলজ্বলে

ঝিরঝির হাওয়ার রাতে গড়াগড়ি খায় কাশফুল তুলো,
অবাধ বাতাসে দোল খায় কামিনী সুরভি
এমনি ইলশে জীবন আর কি আসবে ফিরে এই শরতে?

শারদ ভাদরে
চিড়িয়াখানার আহত হিংস্রপ্রাণীর মতো পাহারা সমেত ঘিরে থাকে সফেদ শাড়ী
ফর্সা নার্সের শাড়ি ব্লাউজ ছিঁড়ে ডুব উরুসন্ধির মোহনায়
সাতার কাটবো মোহনা থেকে নদীতে
সরু পথ বেয়ে উঠে যাবো পাহাড়ের উচাটন টিলায়
কালো কালো রেশম ছিড়ে বানাবো শংকা চিহ্ন
পুরুষ্ট গোলাবী ঠোঁটে কামুক কামড়ে একে দিব দ্রোহের পতাকা

অনায়সে দখলে নিয়েছে পূর্ণিমাতিথী ছাদের আড়াল
পূর্ণিমা যতই রূপ জোসনার শৃঙ্গার করুক
তুমি ঐ জোসনার চেয়ে কম না
তুমিতো চিরযৌবনা ক্ষীণ আয়ু শারদ জোসনা
হাসপাতালের ধপধপে ফর্সা নার্সরা কখনো প্রৌঢ় হয় না, তুমিও তেমন মন মাতোয়ারা
জানো
গোমড়ামুখো দাম্ভিক ডাক্তারনীর চাইতে
নার্সকে ভালো লাগে,নার্স আপারা কখনো প্রৌঢ়া হয় না।
ওরা ছুঁয়ে দিলেই আমার অসুখ ভালো হয়ে যায়।

বোধন

কাঁইদা ফুলে ভরে না মন, শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি
ঠোঁট রঙবিহীন অধর লিখনে,পীড়ায় কাতরায় না আর
রসে ভরা কালো জামে,মুখ গহবরে তৃপ্তির ঢুকুর উঠে আহ্লাদে
কবিতা লিখবো না আর
শারদ প্রভাতে কৈলাশ হতে আসছে,শ্যামল সাঁজে পুষ্পকরথে
কবিতাকে দেখেছি, মহালয়ার পাশে
জয় মা দুগ্গা, জয় জয় কবিতা।
 

নভেরা

মানুষের অভিজ্ঞতাই মানুষকে করেছে
অকৃতজ্ঞ কৃতঘ্ন স্বার্থপর
মানুষের জীবনাচরণই মানুষকে শিখিয়েছে
খুন ধর্ষণ নিপীড়ন
মানুষ পারে না এমন কিছুই নাই
প্রকৃতি ভোগ দখল উজাড় ধ্বংস
সব মানুষই পারে
মানুষ মানুষকেই কামড়ায় খোঁচায়
মানুষের কাছে অন্য প্রাণীও নিরাপদ নয়
মানুষ মানুষের কাছেও অনিরাপদ

তবুও আমি মানুষের কথা বলি
তবুও আমি মানুষকে একেছি
তবুও আমি মানুষের গঠন গড়েছি
তবুও আমি মানুষ নিয়েই চলেছি

অ মানুষ আমাকে মুক্তি দাও
অ মানুষ আমাকে মুক্তি দাও
মুক্তি দাও মুক্তি চাই
আমাকে আমার মতো থাকতে দাও

মানুষ আমাকে তাড়িত করেছে
মানুষ আমাকে প্রতারিত করেছে
মানুষ আমার কৃতিত্ব চুরি করেছে

কেউ বুঝেনি আমারে,মানুষ আমাকে চেয়েছে, তার ইচ্ছার পুতুলের মতো
আমি নীরব দ্রোহ করেছি, হয়েছি নির্বাসিতা।

একদিন খুব বেদনার নীলে নীলাক্ততায়
কে যেনো কাছে এসে বুকে বুক ঘষলো
জোনাকির আলোয়, দেখিনি তার মুখ চোখ
শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসে ঠোঁট, চার জোড়া ঠোঁট
পরস্পর পরম্পরা, বুকে বুক নাকে নাক
গভীর কালোচুল উর্ধ্বমুখী কুন্তল
কপোলে দেবীর আলপনা
গ্রীবায় কালো মুক্তোর মালা
ধপধপে সাদা পরীর মুখ
দু:খ মোড়ানো জামা
স্বপ্ন জড়ানো বেঘোর ঘুমের গোঙানিতে
চিৎকারে বলি ইউরেকা ইউরেকা
ভাস্কর জননী নভেরা
আমাদের নভেরা আহমদ।

 

অনু কবিতা


মেধা ও ক্ষমতায় তখনি কুৎসিত হয়
যখন বংশগত দরিদ্রতায় লালিত হয়

বংশগত দরিদ্র লোক যদি হয় ধনী
প্রতিবেশী অহংকারে পিষ্ট হয় জানি

অক্ষরবিহীন পিতার ছেলে শিক্ষিত হলে
তার বউয়ে বাবা-মাকে চাকর বলে ডাকে

বিরহ তখনই মধুময় হয়
ঝগড়া বিবাদ শিল্পময় হয়


পেট-পটের ক্ষুধাও  বুঝে না খোদা
এক ছাদে একি খাটে আমরা জুদা

আদর্শ দর্শন জ্ঞান নৈতিকতা বিবেক
মনোদৈহিক সক্ষমতা যদি থাকে এক
রসযশ শিল্পে রুশ্নির মৌতাতে এক।

বেখেয়ালে যায় চলে দিন
আমার অপেক্ষা সীমাহীন

প্রতীক্ষা আর অপেক্ষা জমজ
দিল দরিয়ায় ঝাঁপ দেয়া কি সহজ?

একলা হাঁটি একলা চলি একলা করি কাজ
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি অনেকেই বেলাজ
১০
কোলাহল কলরবেও তোমায় ডাকি খোদা
নামাজ কালাম না হোক ঠিক তোমারি বান্দা
পরপারে তরাই করো আমি তোমারি বান্দা
১১
রবের ভাবে সাতার কেটে না পাই কিনার কুল
নবীর নিশান গাউস কুতুব পীরিতে মশগুল
১২
হারাম হালাল জেনে করো ফিকির
হারাম হালাল মেনে করো জিকির
পেরেশান অপমানে হয় না দ্বীন সংসার
বেহালালে বিফল হবে ইবাদত আখেরাত।

Facebook Comments

comments

১ Reply to “মানিক বৈরাগীর কবিতা”

  1. মানিক বৈরাগী বলেছেন:

    ধন্যবাদ উঠান পরিবার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top