কাহিনী-শিল্প:তিন ।। মুন্সী প্রেমচন্দ ।।মূল হিন্দী থেকে তর্জমা: সফিকুন্নবী সামাদী

কাহিনী সর্বদাই জীবনের এক বিশেষ অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের বাল্যকালের গল্প মনে থাকবার কথা যা সে মায়ের বা বোনের কাছে শুনেছে। গল্প শোনার জন্য সে কতটা উৎসুক ছিল, গল্প শুরু হতেই সে সবকিছু ভুলে কেমন তন্ময় হয়ে যেত, কুকুর এবং বিড়ালের গল্প শুনে সে কত প্রসন্ন হয়ে উঠত—এসব বোধ করি সে কখনোই ভুলতে পারবে না। বাল্যকালের মধুর স্মৃতিসমূহে গল্প সম্ভবত মধুরতম। সে খেলনা, মিষ্টান্ন এবং তামাশা সব ভুলে গেছে; কিন্তু সেই সব গল্প আজ অবধি মনে রয়েছে এবং সেইসব গল্পই আজ তার মুখ থেকে তার সন্তানেরা ঐরকম ঔৎসুক্য এবং আনন্দ নিয়ে শোনে হয়তো। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় লোভ এই যে তার জীবন কাহিনী হয়ে যাক এবং তাঁর কীর্তি প্রত্যেক মুখে ঘুরে ফিরুক।

গল্পের জন্ম তখনই হয়েছে যখন থেকে মানুষ বলতে শিখেছে; কিন্তু প্রাচীন কাহিনী-সাহিত্য সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি তা এসেছে ‘কথাসরিৎসাগর’, ‘ঈশপের গল্প’, ‘আলিফ লায়লা’ ইত্যাদি থেকে। এসব সেইসময়ের সাহিত্যের উজ্জ্বল রত্ন। এদের প্রধান লক্ষণ ছিল এদের কাহিনী-বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্যের প্রতি আকর্ষণ মানবহৃদয়ে সর্বদাই ছিলো। অনন্য ঘটনা আর প্রসঙ্গ শুনে পিতা-পিতামহের মতো আমরা আজও প্রসন্ন হই। আমাদের বিবেচনা, জনরুচি যতটা সহজে আলিফ লায়লার কাহিনী শুনে আনন্দ উপভোগ করে ততটা সহজে নতুন যুগের উপন্যাসের গল্প থেকে আনন্দ পায় না। আর যদি কাউন্ট টলস্টয়ের মত অনুসারে জনপ্রিয়তাকে শিল্পের আদর্শ হিসেবে মানা হয়, তাহলে আলিফ লায়লার সামনে স্বয়ং টলস্টয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এবং হুগোর ‘লা মিজারেবল’ দাঁড়াতেই পারে না। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমাদের রাগ-রাগিনী, আমাদের সুন্দর চিত্রকলা এবং শিল্পের অনেক রূপ, যে বিষয়ে মানব জাতির গর্ব অনেক, শিল্পকলার চৌহদ্দি থেকে বাইরে চলে যাবে। জনরুচি পরজ এবং বেহাগের তুলনায় বিরহ এবং দাদরাকে বেশি পছন্দ করে। বিরহ এবং পল্লীগীতিতে অনেক উচ্চশ্রেণীর কবিতা হয়ে থাকে, তবুও এ কথা অসত্য নয় যে বিদ্বান এবং আচার্যগণ শিল্পের যে মান তৈরি করেছেন তাতে শিল্পের রূপ অধিক সুন্দর এবং সংযত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিতে যে শিল্প রয়েছে তা প্রকৃতির, মানুষের নয়। মানুষকে তো সেই শিল্প মোহিত করে, যাতে মানুষের আত্মার ছাপ থাকে, যা নরম মাটির মতো মানব-হৃদয়ের ছাঁচে পড়ে সংস্কৃত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য নিজের বিস্তার এবং বৈভব দিয়ে আমাদেরকে পরাভূত করে। তাতে আমাদের আধ্যাত্মিক উল্লাস মেলে; সেই দৃশ্যই যখন মানুষের তুলি, রঙ এবং মনোভাবের দ্বারা রঞ্জিত হয়ে আমাদের সামনে আসে, তা যেন আমাদের আপন হয়ে যায়। তার মধ্যে আমরা আত্মীয়তার বার্তা পাই।

কিন্তু খাবার যেখানে সামান্য মসলাতেই অধিক রুচিকর হয়ে যায় সেখানে এও খেয়াল রাখা আবশ্যক মসলার মাত্রা যাতে বাড়তে না পারে। যেরকম মসলার বাহুল্যে খাবারের স্বাদ এবং উপযোগিতা হ্রাস পায়, ঠিক তেমনি সাহিত্যও অলঙ্কারের অপব্যাবহারে বিকৃত হয়ে যায়। যা কিছু স্বাভাবিক তাই সত্য আর স্বাভাবিক থেকে দূরে গিয়ে শিল্প নিজের আনন্দ হারিয়ে ফেলে এবং তাকে বুঝতে পারে হাতে গোণা কয়েকজন শিল্পকলা-বিশারদ; তার মধ্যে জনতার মর্ম স্পর্শ করবার মতো শক্তি থাকে না।

পুরানো কথা-কাহিনী তার ঘটনা বৈচিত্র্যের কারণে মনোরঞ্জক ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে সেই রসের ঘাটতি থাকে সাহিত্যের মধ্যে শিক্ষিত রুচি যার খোঁজ করে। এখন আমাদের সাহিত্যিক রুচি খানিকটা পরিশীলিত হয়েছে। আমরা অন্য সকল বিষয়ের মত সাহিত্যের মধ্যেও বুদ্ধিবৃত্তির সন্ধান করি। এখন আমরা কোনো রাজার অলৌকিক বীরত্বে, হাওয়ায় উড়ে রাজার কাছে রাণীর পৌঁছানোতে বা ভূত-প্রেতের কাল্পনিক চরিত্র দেখে খুশি হই না। আমরা তাদের বাস্তবের মানদণ্ডে মেপে নিই এবং সামান্য এদিক-ওদিক দেখতে চাই না।

আজকালকার উপন্যাস এবং আখ্যায়িকায় অস্বাভাবিক বিষয়ের অবতারণার কোনো অবকাশ নেই। তাতে আমরা আমাদের জীবনের প্রতিবিম্ব দেখতে চাই। তার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি চরিত্রকে বাস্তব রূপে দেখতে চাই। তাদের মধ্যে যা কিছুই থাকুক, তা যেন ঠিক তেমন করেই লেখা হয় যাতে সাধারণ বুদ্ধি তাকে বাস্তব মনে করে। বর্তমানে ঘটনা গল্প বা উপন্যাসের মুখ্য বিষয় নয়। উপন্যাসের চরিত্রের কেবল বাহ্য রূপ দেখে আমরা সন্তুষ্ট হই না। আমরা তার মানসিক বোধ অব্দি পৌঁছতে চাই এবং যে লেখক মানবহৃদয়ের রহস্য উদ্ধারে সফল হন তাঁর রচনাকেই সফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা কেবল এটুকু জেনে সন্তুষ্ট হই না যে অমুক ব্যক্তি অমুক কাজ করেছে। আমরা দেখতে চাই কোন মনোভাবের প্রেরণায় সে এই কাজ করেছে; সুতরাং মানসিক দ্বন্দ্ব বর্তমান উপন্যাস-গল্পের প্রধান অঙ্গ।

প্রাচীন শিল্পে লেখক একেবারে নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতেন। আমরা তার বিষয়ে সেটুকুই জানতাম, যেটুকু তিনি তার চরিত্রের মুখ দিয়ে ব্যক্ত করতেন। জীবন বিষয়ে ধারণা কী, ভিন্ন-ভিন্ন পরিস্থিতিতে তার মনোভাবের কী পরিবর্তন ঘটে সেই বিষয়ে আমরা কিছুই জানতে পারতাম না; কিন্তু আজকাল উপন্যাসে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আমরা স্থানে-স্থানে পাই। আমরা তাঁর মানসিক বিবেচনা এবং ভাবের দ্বারা তাঁর রূপ দেখতে থাকি এবং ভাব যতটা ব্যাপক, গভীর ও অভূতপূর্ব হয় লেখকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ততটাই বাড়তে থাকে। বলা উচিত, আধুনিক আখ্যায়িকা বা উপন্যাসের আধার মনোবিজ্ঞান। সেই মনোবৈজ্ঞানিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে ঘটনা এবং চরিত্র নিয়ে আসা হয়। তাদের স্থান একেবারেই গৌণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমার ‘সুজন ভগৎ’, ‘মুক্তি মার্গ’, ‘শতরঞ্জ কী খিলাড়ী’, এবং ‘মহাতীর্থ’ নামক গল্পসমূহে কোনো না কোনো মনোবৈজ্ঞানিক রহস্য আবিষ্কারের চেষ্টা করা হয়েছে।

একথা তো সকলেই মানেন যে আখ্যায়িকার প্রধান ধর্ম মনোরঞ্জন; কিন্তু সাহিত্যিক মনোরঞ্জন সেই বস্তু, যার দ্বারা আমাদের কোমল এবং পবিত্র ভাবনা উৎসাহ পায়—আমাদের মধ্যে সত্য, নিঃস্বার্থ সেবা, ন্যায় ইত্যাদি দেবসুলভ যেসব অংশ আছে তা জাগ্রত হয়। বস্তুত এটা মানবাত্মার সেই প্রচেষ্টা, যা আসলে তার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা নিজেকে পূর্ণরূপে দেখবার আকাঙ্খার মতো। অভিব্যক্তি মানবহৃদয়ের স্বাভাবিক গুণ। মানুষ যে সমাজে বাস করে, তার সাথে মিশে থাকে সে, যে সকল মনোভাবের সাহায্যে সে নিজের মিলনের ক্ষেত্র বাড়াতে পারে, অর্থাৎ জীবনের অনন্ত প্রবাহে মিলিত হতে পারে, তাইতো সত্য। যে জিনিস ভাবনার এই প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, তা সর্বদা অস্বাভাবিক; কিন্তু যদি স্বার্থ, অহংকার এবং ঈর্ষার এ সকল বাধা না থাকতো, তাহলে আমাদের আত্মার বিকাশের শক্তি কোথায় পেতাম? শক্তি তো সংঘর্ষের মধ্যেই থাকে। আমাদের মন এই সকল বাধাকে পরাস্ত করে নিজের স্বাভাবিক কর্ম সম্পন্ন করতে সর্বদা চেষ্টা করতে থাকে। এই সংঘর্ষ থেকেই সাহিত্যের উৎপত্তি। এই সাহিত্যের উপযোগিতাও রয়েছে। সাহিত্যে গল্পের স্থান এই জন্য উঁচুতে যে তা স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘুরিয়ে পেচিয়ে না বলে আত্মার কোনো না কোনো ভাব প্রকাশ করে ফেলে। এবং স্বল্প মাত্রায় হলেও তা আমাদের পরিচয়, অন্যের মধ্যে নিজেকে দেখার, অন্যের সুখ-দুঃখকে নিজের করে নেবার ক্ষেত্র বাড়িয়ে দেয়।
হিন্দীতে নতুন শৈলীর গল্পের প্রচার কিছুদিন হলো শুরু হয়েছে; কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই এই আঙ্গিক সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিকের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যে কোনো পত্রিকা তুলে নিন, তাতে গল্পের প্রাধান্য দেখা যাবে। হ্যাঁ, যে পত্রিকা কোনো বিশেষ নীতি বা উদ্দেশ্যের জন্যে বের করা হয় তার মধ্যে গল্পের স্থান থাকে না। যখন ডাকপিয়ন কোন পত্রিকা নিয়ে আসে, সবার আগে আমরা তার গল্পটি পড়তে শুরু করি। এতে আমাদের সেই ক্ষিধে নিবারণ হয় না, যা ইচ্ছেমতো খাবার প্রত্যাশা করে। কিন্তু ফলার আর মিষ্টান্নের জন্যে যে ক্ষিধে আমাদের মনে সর্বদা থাকে তা অবশ্যই গল্পের দ্বারা তৃপ্ত হয়। আমাদের বিবেচনায় গল্প তার সার্বভৌম আকর্ষণের কারণে সংসারের মানুষ একে অপরের সাথে এমনভাবে মিলিয়েছে, তাদের মধ্যে এমন একাত্মভাব উৎপন্ন করেছে, তেমনটা আর কিছুই করতে পারেনি। আমরা অস্ট্রেলিয়ার গম খেয়ে, চীন দেশের চা পান করে, আমেরিকার মোটরের উপর বসেও এদের উৎপাদক মানুষের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত থাকি, কিন্তু মোপাসাঁ, আনাতোল ফ্রাঁস, চেখভ এবং টলস্টয়ের গল্প পড়ে ফ্রান্স এবং রাশিয়ার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেছি। আমাদের পরিচয়ের ক্ষেত্র সাগর এবং পাহাড় অতিক্রম করে ফ্রান্স এবং রাশিয়া অব্দি বিস্তৃত হয়ে গেছে। আমরা সেখানেও নিজের আত্মারই প্রকাশ দেখতে শুরু করি। সেখানকার কৃষক-মজুর-শিক্ষার্থীকে আমাদের নিকট এমন মনে হয় যেন তাদের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় রয়েছে।

হিন্দীতে কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেও গল্পের কোনো চর্চা ছিলো না। কখনো কখনো বাংলা এবং ইংরেজি গল্পের অনুবাদ ছাপা হতো। কিন্তু আজ এমন কোন পত্রিকা নেই, যাতে প্রতি মাসে দু-চারটি গল্প ছাপা হয় না। গল্পের ভালো ভালো সংকলন বেরুচ্ছে। বেশিদিন হয়নি যখন গল্প পড়াকে সময়ের অপব্যবহার মনে করা হতো। ছোটবেলায় আমরা যদি কোনো কাহিনী পড়তে গিয়ে ধরা পড়তাম তাহলে কঠিন শাসনের সম্মুখীন হতে হতো। ধারণা করা হতো যে কিচ্ছা-কাহিনীতে চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। আর সেই ‘ফিসানা অজায়ব'(ফাসানা-এ-অজায়াব:রজব আলী বেগ সুরূর) আর ‘শুক-বাহাত্তরী’ (শুক বাহাত্তরী: পি.ভি. ভানুশালী) ‘তোতা-ময়না’র(কিসসা তোতা ময়না-বেওয়াফা মর্দ) সময় এরকম ধারণা হওয়া স্বাভাবিকই ছিল। সে সময়ে কোনো গল্প স্কুলের কারিকুলামে রাখা হলে সম্ভবত অভিভাবকদের এক ডেপুটেশন তার বিরুদ্ধে শিক্ষা বিভাগের অধ্যক্ষ বরাবর পৌঁছে যেতো। আজ ছোট-বড় সকল ক্লাসেই গল্প পড়ানো হয় এবং পরীক্ষাতে তাদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এ কথা মেনে নেয়া হয়েছে যে সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্যে সরস সাহিত্যের চেয়ে উত্তম কোনো সাধন আর নেই। এখন মানুষ এও স্বীকার করতে শুরু করেছে যে গল্প নির্জলা গপসপ নয়, আর তাকে মিথ্যে ভাবা ভুল। আজ থেকে দুহাজার বছর আগে গ্রীসের বিখ্যাত দার্শনিক আফলাতুন বলেছিলেন, প্রত্যেক কাল্পনিক রচনায় মৌলিক সত্য লুকিয়ে থাকে। রামায়ণ, মহাভারত আজও ততোটাই সত্য যতোটা আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে ছিল। যদিও ইতিহাস বিজ্ঞান এবং দর্শন সর্বদাই পরিবর্তিত হতে থাকে। কতো সিদ্ধান্ত এক যুগে সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে, আজ অসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু কাহিনী আজও ততোটাই সত্য, কারণ তার সম্পর্ক মনোভাবের সাথে এবং (মৌলিক)মনোভাব কখনো পরিবর্তিত হয় না। কোনো একজন সত্যি কথাই বলেছিলেন, গল্পে নাম এবং সাল ছাড়া সবকিছুই সত্য এবং ইতিহাসে নাম এবং সাল ছাড়া কোনো কিছুই সত্য নয়। গল্পকার নিজের রচনাকে যে ছাঁচে ইচ্ছে করেন তাতেই ঢালতে পারেন; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি সেই মহান সত্যকে অবহেলা করতে পারেন না, যাকে জীবন-সত্য বলা হয়।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top