লেনিন-পর্ব ১১।।আশানুর রহমান খোকন

লেনিন-পর্ব ১১। নাদিয়া।।

ওক কাঠের বিশাল বড় ড্রেসিং টেবিলটির প্রায় পুরোটা জুড়ে বৃত্তাকার একটি আয়না। তার সামনে ছোট্ট একটা বসার টুল। একটু দূরে দাঁড়ালে আয়নায় পুরো শরীরটা দেখা যায়। বেশ বড়সড় এই শোবার ঘরটিতে ঢুকলে দেয়ালের মাঝখানে রাখা ড্রেসিং টেবিলটিই প্রথমে চোখে পড়ে। শীতকাল হওয়ায় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। জানালায় ভারী পর্দা ঝুলছে। দুপুর বেলায় বাইরে কড়া রোদ থাকলেও পর্দার কারণে ঘরটিতে আলো খুবই কম। সেই স্বল্প আলোয় নিজের চেহারাটুকু আয়নায় দেখা গেলেও সবটুকু পরিষ্কার বোঝা যায় না। অনেকক্ষণ ধরে ছয় বছরের একটি মেয়ে আয়নাটির সামনে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।

গত পনেরদিন ধরে মেয়েটির মা কাজে যাবার আগে তাকে এই বাড়িতে রেখে যায়। বাড়ির চৌদ্দ বছরের মেয়েটি, যার নাম নাতালি এ সময়টুকু মেয়েটিকে দেখাশুনা করে। একজন বয়স্ক মানুষকে দিয়ে দেখভাল করাতে যে আর্থিক সঙ্গতি দরকার, মেয়েটির বাবা-মায়ের সেটা নেই। তার বাবার চাকরী চলে যাবার পর ১৮৭৪ সালে পোল্যান্ডের ওয়ারশ থেকে তারা পাঁচ বছরের মেয়েটিকে নিয়ে রাশিয়ার কিয়েভে চলে এসেছে। এই শহরে তার মা গভর্নেসের একটি চাকরী যোগাড় করতে পারলেও, বাবা কোন পেশায় স্থায়ী হতে পারছে না। নাতালির এক বন্ধু আজ তার সাথে খেলতে আসায় সে তার সাথে বাড়ির বাইরে গেছে। যাবার আগে ছোট্ট মেয়েটিকে বলে গেছে,

-খবরদার, ঘরের বাইরে যাবে না। আর এই যে আয়নাটি দেখছো এটার সামনে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলে তুমি কি দেখতে পাবে জানো?

মেয়েটির বয়স কম। কথা বলে আরো কম। নাতালির কথায় সে শুধু মাথা নাড়ে।

-তুমি যদি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো তবে বড় হলে তোমার সাথে যার বিয়ে হবে, বুঝতে পারছো? মানে, তোমার যে বর হবে তাকে তুমি এই আয়নার মধ্যে দেখতে পাবে।

মেয়েটি অবাক হয়ে নাতালির কথা শোনে। বিয়ে, বর এসব কথার মানে ভাল না বুঝলেও কিছু একটা দেখা যাবে এই আশায় সে চুপ করে থাকে। নাতালির বন্ধু তখনই বাইরে থেকে নাতালিকে আবার ডাকতে শুরু করে। নাতালি অস্থিরভাবে জানতে চায়,

-তুমি তোমার হবু বরকে দেখতে চাও না?

মেয়েটি মাথা নাড়ে। নাতালি তখন তাকে আয়নার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বলে,

-আয়নার দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি না আসা পর্যন্ত চোখ খুলবে না। চোখ খুললেই কিন্তু সর্বনাশ। তোমার মহাবিপদ হবে।

মেয়েটি নাতালির নির্দেশ মতো আয়নার সামনে দাঁড়ালে নাতালি আস্তে করে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে বন্ধুর সাথে খেলতে চলে যায়।

তখন থেকে মেয়েটি দাঁড়িয়েই আছে। নাতালি বন্ধুর সাথে খেলায় মগ্ন থাকায় ছোট্ট মেয়েটির কথা তার আর খেয়াল থাকে না। কতক্ষণ মেয়েটি এভাবে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেও জানে না। এক সময় তার পা ব্যথা করতে থাকে। সে কী করবে বুঝতে পারে না। নাতালি বলে গেছে চোখ খুললেই সর্বনাশ! তার বিপদ হবে। কি বিপদ সেটা অবশ্য বলেনি। তাহলে সে কী করবে? নাতালিও তো এখনো আসছে না? মেয়েটির ভীষণ ভয় করতে থাকে। চোখ বন্ধ থাকায় ভয়টি যেন আরো বেড়ে যায়। তার গলা শুকিয়ে আসে, হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। সে প্রবলভাবে উসখুস করতে করতে এক পর্যায়ে আর কোনভাবেই চোখ বন্ধ রাখতে না পেরে চোখ খোলে। অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিল বলে প্রথমে সে প্রায় কিছু দেখতে পায় না। দু’হাত দিয়ে চোখ কচলিয়ে আবার চোখ খুলতেই প্রথমেই তার চোখ পড়ে আয়নায়। আর তখনই সে দেখে একটি লোমশ ভাল্লুক তার পিছনে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি ‘মাগো’ বলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

ঠক্ ঠক্ শব্দ হচ্ছে অনেকক্ষণ। কে যেন নাদিয়া, নাদিয়া বলে ডাকছে। সেই শব্দে নাদিয়ার স্বপ্ন ও ঘুম দু’টোই ভেঙে যায়। চোখ বন্ধ রেখেই শব্দটি ঠিক কোথায় হচ্ছে সে বুঝে উঠতে চেষ্টা করে। শব্দটি আবার শুনতে পেয়ে সে চোখ খুললো। সে নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে। নিজেকে বিছানার উপর আবিস্কার করে সে একটু অবাক হলো। তার গায়ে তখনও স্কুলের পোষাক। সে কি তবে ঘুমিয়ে পড়েছিল? সেই একই স্বপ্ন সে আজও দেখছিল? নাদিয়া ভাবলো, মা কি তবে বাসায় ফিরলো? বাইরে তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। তাহলে মা এসেছেন বোধ হয়। গভর্নেসের কাজ শেষে মা যান টিউশনিতে। বাবা মারা যাবার পর সংসার চালাতে মাকে এভাবেই পরিশ্রম করতে হয়। মাকে সাহায্য করতে সে নিজেও টিউশনি করে। কিন্তু আজ সোমবার, তার ছাত্রীটির তো আসার কথা নয়। ঠিক তখনই দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলে সে ধড়মড় করে উঠে বসে। সে তড়িঘড়ি করে গেলো দরজা খুলতে।

নাদিয়ার মা এলিজাবেতা ক্রুপ্সকায়া অনেকক্ষণ ধরে দরজায় কড়া নাড়ছিলেন। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। নাদিয়া সাধারণতঃ স্কুল শেষে আগেই বাসায় ফেরে। নাদিয়া চমৎকার একটি মেয়ে তবে মাঝে মাঝে এলিজাবেতার চিন্তা হয় মেয়েটির স্বাস্থ্য নিয়ে। মেয়েটি মাঝে মাঝে অসুস্হ্য হয়ে পড়ে। ডাক্তার ঠিক অসুখটা ধরতে পারছেন না। সর্বশেষ যে ডাক্তারকে দেখানো হয়েছিল তিনি বলেছেন থাইরয়েডের কোন সমস্যা থাকতে পারে। নাদিয়ার বাবা কনস্তান্তিন ইগনাটয়েভিচ ক্রুপস্কি মাত্র ৪৫ বছর বয়সে হঠাৎ করে একদিন মারা গেলেন। স্বামী মারা গেলে এলিজাবেতা প্রথমে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। তার নিজের একটা চাকরী ছিল। আর সেই চাকরীটাই সেই দুঃসময়ে তাকে ভীষণ সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিল। সেই অবস্থায়ও তাই নিজেকে তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেননি । সেদিন তিনি ভেবেছিলেন তাঁকে বাঁচতে হবে নাদিয়ার জন্য। তাকে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। আর নিজের জীবন থেকেই তিনি সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়াটা কেন জরুরি।

এলিজাভেতা তাদের স্টারি নেভেস্কির ভাড়া বাসার দরজায় অপেক্ষা করতে করতে নিজের স্বামীর কথাই ভাবছিলেন। তার স্বামী ক্রুপস্কির জীবনটাও খুব একটা সুখের ছিল না। তাঁর বয়স যখন মাত্র নয় বছর তখন তিনি একই সাথে বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন। সময়টা ১৮৪৭ সাল। জার সরকার অন্য অনেক এতিম ছেলেদের মতো ক্রুপস্কিরও দায়িত্ব নিলে নিজের জন্মস্থান কাজান থেকে তাকে পাঠানো হয়েছিল সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেখানে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল কনস্তান্তিনোভস্কি ক্যাডেট কর্পসে। এগার বছর পর অর্থাৎ বিশ বছর বয়সে গ্রাজুয়েট হয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁকে পোস্টিং দেয়া হয়েছিল রাশিয়ার দখলে থাকা পোল্যান্ডে। কিন্তু ১৮৬২ সালে পোলিশরা বিদ্রোহ শুরু করলে রুশ সৈন্যরা চরম নিষ্ঠুরতার সাথে সে বিদ্রোহ দমন করতে শুরু করে। যার সাথে ক্রুপস্কি নিজেকে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। রেজিমেন্টের কমান্ডারের কাছে বদলির আবেদন করে তিনি সে সময় একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন,

“আমার নিজের জন্মস্থানে ফিরে যাবার জন্য আমার মন-প্রাণ আকুল হয়ে পড়েছে এবং এই ব্যাকুলতা আমার সমস্ত বোধশক্তিকে লোপ করে দিচ্ছে।”

বদলির আবেদনপত্রটি পড়ে কমান্ডারের মনে হয়েছিল চিঠিটি সামরিক সূলভ তো নয়ই বরং যেন নেক্রাসভের কোন কবিতার পংক্তিমালা । এসব কথা বিয়ের পর ক্রুপস্কিই এলিজাবেতাকে বলেছিলেন। কমান্ডার যখন ভাবছিলেন এই অসৈনিকসূলভ লোকটিকে নিয়ে কি করা যায় ঠিক তখনই তার হাতে একটি তালিকা আসে।

লন্ডন থেকে তখন হার্জেন ‘দ্য বেল’ নামের একটি রেডিক্যাল পত্রিকা বের করতেন। ইতোমধ্যে তাঁর বিখ্যাত ‘Who is to Blame ?’ বইটি রাশিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বইটি জার সরকার নিষিদ্ধও করেছে। আর তাঁর নিষিদ্ধ পত্রিকা ‘দ্য বেল’ রাশিয়ায় আসে গোপনে। হার্জেনের এক সহযোগী যিনি নিজেও একজন কবি, নাম ওগারেভ, তিনি ‘দ্য বেল’ পত্রিকার গ্রাহকদের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। যেখানে ক্রুপস্কির নামও ছিল এবং সেই তালিকাটি ঘটনাক্রমে ক্রুপস্কির কমান্ডারের হাতে পড়ে। এক বছর পরে ক্রুপস্কিকে কাজানে বদলি না করে কমান্ডার সেন্ট পিটার্সবার্গের মিলিটারি জুডিসিয়ারি একাডেমিতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে ক্রুপস্কি আইন নিয়ে পড়াশুনা করেন এবং নিজেকে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে তৈরি করতে থাকেন। তিনি ‘কলেজিয়েট এ্যাসেসর’ হিসাবে নিয়োগ পান পোল্যান্ডে ওয়ারশে। আর সে সময় অর্থাৎ ১৮৬৭ সালে তিনি এলিজাবেতাকে বিয়ে করেন। বছর না ঘুরতেই নাদিয়া তার গর্ভে আসে। ১৮৬৯ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি নাদিয়ার জন্ম হয় ওয়ারশেই। নাম রাখা হলো নাজেদদা কনস্তান্তিনভা ক্রুপস্কায়া। মা আদর করে ডাকে নাদিয়া। নাদিয়া মানে ‘আশা’।

ওয়ারশের একজন প্রশাসক হিসাবে সে সময় ক্রুপস্কি স্থানীয় জনগণের জন্য অনেক কিছু করার চেষ্টা করেন। সেখানে তিনি একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি নির্যাতিত ইহুদীদের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন। কারখানার মালিকদের শ্রমিক নিয়োগকালে নাম নিবন্ধনের বিধিমালা বাধ্যতামূলক করেন। ফলে অনেকে তাঁর উপর ক্ষুব্ধ হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওয়ারশের সর্বোচ্চ আদালতে নালিশ করে। সেটা ১৮৭৪ সাল। আদালতের সমন পেয়ে ক্ষুব্ধ ক্রুপস্কি সেদিন বাসায় ফিরে রাগে গজ গজ করছিলেন। কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পেরে এলিজাবেতা জানতে চেয়েছিল,

-তোমার কী হয়েছে?

ক্রুপস্কি আদালতের সমনের বিষয়টি জানালে এলিজাবেতা বলেছিল,

-তোমার দোষটা কী?

-সেটা তো আমিও জানি না। ক্ষুব্ধ ক্রুপস্কি বলে ওঠে।

-তুমি কোন অপরাধ করেছো?

-আমি না জেনে ভুল করতে পারি কিন্তু অপরাধ করতে যাবো কেন? আর সেটা তুমিও জানো।

ক্রুপস্কির এমন উত্তরে এলিজাবেতা নিজেও লজ্জা পায়। মানুষটা বড্ড ভাল। যেচে মানুষের উপকার করে। আরো অনেকে মানুষই হয়তো অন্য মানুষের উপকার করে। তবে নিজের ক্ষতি স্বীকার করে অন্য মানুষদের উপকার কয়জন করে? পোলিশদের সাথে রুশদের আচরণেও তিনি ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত ছিলেন। সেটা তিনি গোপনও করতেন না। এলিজাবেতা ভাবলো সে কারণেও তাঁর কিছু শত্রু তৈরি হতে পারে। তবু স্বামীকে সাহস দিতে এলিজাবেতা বলেছিল,

-আমি জানি, জ্ঞানতঃ তুমি কোন অপরাধ করতে পারো না। ঈশ্বর সবই জানেন এবং দেখেন। দেখবে, তোমার কিছু হবে না!

এলিজাবেতার কথা শুনে ক্রুপস্কি ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে বলেছিলেন,

-ঈশ্বর! থাকলে তো মন্দ হতো না।

অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ান এলিজাবেতা স্বামীর সে কথায় সেদিন কষ্ট পেয়েছিল। স্বামী চলে গেলে ক্রুশ ছুঁয়ে তিনি ঈশ্বরের ক্ষমা ও করুণাভিক্ষা চেয়েছিলেন।

পরেরদিন আদালতে ক্রুপস্কির বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহারসহ ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। আরো যে সব অভিযোগ আনা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ক্রুপস্কি নাকি কোন এক অনুষ্ঠানে পোলিশ নাচ ‘মাজুরকা’ নেচেছিল। অভিযোগ করা হলো তাঁর ৫ বছরের কন্যা নাদিয়া কেন পোলিশ ভাষায় কথা বলে। আরেকটি অভিযোগ ছিল তাঁর স্ত্রী এলিজাবেতা ক্রুপস্কায়া কেন এক বছর আগে পোলিশ ভাষায় ‘The Child’s Day-A Gift to Children in Poetry with Twelve Pictures’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে? এসব অভিযোগ তুলে সরকার পক্ষের আইনজীবী বললেন,

‘একজন কলেজিয়েট এ্যাসেসর’ হিসাবে জনাব ক্রুপস্কির ব্যবহার একান্তই অরুশ সূলভ। তাঁকে চাকুরী থেকে বাদ দেয়া হোক, তাঁর পদবী কেঁড়ে নেয়া হোক এবং আদালতের সমস্ত খরচ তাঁর কাছ থেকে আদায় করা হোক!’

বিচারকের প্রশ্নের উত্তরে ক্রুপস্কি নিজেই তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ খণ্ডন করে বলেছিলেন,

-’জনাব, মহামান্য জারের বলরুমেও তো‘মাজুরকা’ নাচ হয়। এটা রুশদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই নাচের কারণে আমার আচরণ কিভাবে অরুশীয় হয়? আমি এবং আমার স্ত্রী দু’জনেই কাজ করি। আমার কন্যাটিকে পোলিশ এক নারী বেবী সিটিং করেন। তার কাছে থেকেই সে পোলিশ ভাষা শিখেছে। কোন একটি বিশেষ ভাষায় কথা বলা বা সেই ভাষা শিক্ষা কী অপরাধ হতে পারে? আমার স্ত্রী গভর্নেসের কাজ করেন এবং শিশু শিক্ষায় সে পারদর্শী। শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় করে সে ঐ বইটি লিখেছে এবং বইটি শিশুরা ভীষণ পছন্দ করে। সে যেহেতু পোলিশ শিশুদের সাথে কাজ করে তাই পোলিশ ভাষাতেই বইটি লিখেছে। এটাকে কেন অরুশীয় আচরণ বলা হবে সেটা আমার বোধগম্য নয়।’

এভাবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত ২০টি অভিযোগ খণ্ডন করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরলেও অন্য ১৯টি অভিযোগ থেকে তাঁকে সেদিন অব্যাহতি দিলেও ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে সরকারি আইনজীবীর আবেদন অনুযায়ী তিনি চাকুরীচ্যুত হলেন। একই সাথে আদালতের খরচ তাঁকে বহন করতে হলো এবং তিনি তাঁর পদবী ‘কলেজিয়েট এ্যাসেসর’ হারালেন।

ক্রুপস্কি চাকুরী হারালে এলিজাবেতরা ফিরে এসেছিলেন রাশিয়ায়। প্রথমে কিয়েভে। যাবার আগে আদালতের কাছে সুবিচারের জন্য তখন ক্রুপস্কি আপিল করেছিলেন। ১৮৮০ সালে অর্থাৎ ৬ বছর পর তিনি পদবী ও আদালতের খরচ হিসাবে প্রদত্ত অর্থ ফিরে পেলেও চাকুরী আর ফিরে পাননি। এলিজাবেতা কিয়েভে গভর্নেসের চাকরী যোগাড় করতে পারলেও ক্রুপস্কি কখনো কারখানার ম্যানেজার, কখনো বেকার। এভাবে কয়েক বছর কাটিয়ে নানা জায়গা ঘুরে অবশেষে তারা ফিরে আসেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। হতাশ, ক্ষুব্ধ ক্রুপস্কি এসময়ই ‘পিপলস্ উইলে’র সাথে কিছুটা জড়িয়ে পড়েন। জার-২ হত্যার সাথে জড়িতদের কাউকে কাউকে তিনি ব্যক্তিগতভাবেও চিনতেন। তারপর হঠাৎ করে একদিন মারা গেলেন। নাদিয়ার বয়স তখন চৌদ্দ। তার কিছুদিন পর এই এপার্টমেন্টটি ভাড়া নিয়ে তারা চলে আসে। নিজের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে নাদিয়া অসময়ে ঘুমাচ্ছে ভেবে তিনি আবারও দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন।

প্রিন্স অবলেনস্কি জিমনেজিয়াম। মেয়েদের সেকেন্ডারি প্রাইভেট স্কুল। কিছুক্ষণ আগে স্কুলের ক্লাস শেষ হয়েছে। স্কুল গেটের সামনে কয়েকজন তরুণী তখনও গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সবারই বয়স ১৭ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। স্কুলের প্রিন্সিপাল এ. ইয়া. গার্ডের মেয়ে নিনা গার্ড নিজেই কথা বলছে বেশি। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আরিয়াডনে তাইকোভা, এক পাশে লিডিয়া ডেভিডোভা আর অন্যপাশে নাদিয়া ক্রুপ্সকায়া। নাদিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে দুই বোন আলেকজান্দ্রা ও ওলগা গ্রিগোরেভা। সামনে তাদের সবার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু তারা কেউই আসন্ন পরীক্ষা নিয়ে কথা বলছে না। তারা কথা বলছে সম্প্রতি কে কোন বই পড়েছে সেটা নিয়ে। কয়েকদিন আগে নাদিয়া নিনার কাছ থেকে নেক্রাসভ ও লারমনতভের কবিতার বই ধার নিয়েছিল। ব্যাগ থেকে সে বই দু’টো বের করে নিনার হাতে দিল। নিনা জানতে চাইলো,

-নেক্রাসভের কোন কবিতা তোমার বেশী ভাল লাগলো?

-’রাশিয়ার নারী’।

-সত্যি? আমারও খুবই প্রিয় একটি কবিতা।

নিনার কথা শেষ না হতেই ওলগা একটু সামনে এগিয়ে এসে বলে,

-নাদিয়া, তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হয় না এই কবিতাটি তোমার বেশি ভাল লাগবে?

নাদিয়া ওলগার এই কথায় একটু অবাক হলো। বন্ধুরা তার সম্পর্কে এমন ধারণা কেন পোষণ করে? ওদের ভাল লাগা কবিতাগুলো কি তার ভাল লাগতে পারে না? তাছাড়া ঐ কবিতাটি ভাল লাগার পিছনে অন্য একটি কারণ আছে। কবিতাটি সে প্রথম শুনেছিল যখন তার বয়স ১১ বছর। নাদিয়ার বাবা সেনাবাহিনীর চাকরী হারিয়ে একটার পর একটা চাকরীতে যোগ দিচ্ছেন কিন্তু কোন চাকরীই তিনি বেশি দিন করতে পারছেন না। এমন সময় তিনি চাকরী নিলেন কারখানার একজন ম্যানেজার হিসাবে। নাদিয়া ও তার মা গরমের সময় পিসকভে বেড়াতে গিয়েছিল তার বাবার কারখানার মালিকের অতিথি হিসাবে। সেখানে থাকার সময় নাদিয়া জীবনের প্রথম ইঁদুর পোষে আর সেই সাথে একটি মনগ্রিল কুকুর। নাদিয়া কুকুরটির নাম দিয়েছিল ‘কারসন’। সেই পল্লী এলাকার এক স্কুল শিক্ষিকার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল, যাঁর নাম তিমিওফেয়কা। এগারো বছরের নাদিয়া তিমিওফেয়কার বড্ড ভক্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি গ্রামের বয়স্কা মেয়েদের নিয়ে প্রত্যেক রবিবার ক্লাস নিতেন। সেই ক্লাসে নানা বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলতেন। নাদিয়া সে সব কথা যে সব বুঝতো তাও নয়। সে রকম এক রবিবারের সভায় তিনি নেক্রাসভের কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। তিমিওফেয়কার কণ্ঠে সেই প্রথম নাদিয়া নেক্রাসভের ‘রাশিয়ান নারী’ কবিতাটি শুনেছিল। নাদিয়ার জন্য সেটা ছিল অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। তিমিওফেয়কার কণ্ঠে কবিতাটি অসাধারণ লেগেছিল। কবিতাটি শুনতে শুনতে নাদিয়ার নিজেকে যেন কবিতাটির প্রধান দুই নারী চরিত্র ‘প্রিন্সেস ট্রুবেটস্কয়া ও ভলকোনস্কয়া’ মনে হয়েছিল। সেদিনের পর কতদিন কতবার নাদিয়া নিজেকে ‘প্রিন্সেস ট্রুবেটস্কয়া ও ভলকোনস্কয়া’র মতো করে ভেবেছে তার হিসাব নেই। এত বছর বাদে নেক্রাসভের ‘রাশিয়ান নারী’ কবিতাটির দু’টো অংশই নিজে পড়ে নাদিয়ার যে অনুভূতি হয়েছে সেটা সে বন্ধুদের কিভাবে বোঝাবে? নেক্রাসভের ‘লাল-নাক তুষার’ নামের কবিতাটিও তার অসম্ভব প্রিয়। ওলগার কথায় তাই নাদিয়া একটু মনক্ষুন্ন হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে,

-কেন তোমার এমন মনে হলো?

ওলগা নাদিয়ার প্রশ্নে একটু বিব্রত বোধ করে। কারণ সে যে খুব সিরিয়াসলি ভেবে কথাটা বলেছে তা নয়। তাই একটু ইতস্ততঃ করে সে বলে,

-এই, তুমি কি রাগ করলে? আমি তেমন কিছু ভেবে কথাটা বলিনি। তুমি সব সময় তলস্তয় তলস্তয় করো কিনা তাই আমি ভেবেছিলাম নেক্রাসেভের মতো কবির কবিতা তোমার ভাল নাও লাগতে পারে। তবে তোমার যদি সত্যিই তাঁর কবিতা ভাল লেগে থাকে তবে আমি তোমাকে অন্য একটি বই পড়তে দিতে পারি।

ওলগার একথায় সবাই বেশ আগ্রহী হয়ে তাকে ঘিরে ধরে। কিন্তু আলেকজান্দ্রা চোখ দিয়ে ইশারা করতেই ওলগা কথা ঘুরানোর চেষ্টা করে বলে,

-আজ না, আরেকদিন বলবো। আমাদের বাসায় ফিরতে হবে।

কথাটা বলে তারা দু’বোন বাড়ির পথে পা বাড়ায়। কিছুটা এগিয়ে গেলে আলেকজান্দ্রা ওলগাকে বলে,

-তুমি কি চেরনিশেভস্কির ‘কী করিতে হইবে?’ বইটি নাদিয়াকে দিতে চাচ্ছিলে?

-হ্যাঁ। কেন?

-এটা ভাল হতো না। প্রথমতঃ বইটি মায়ের। তুমি মায়ের সাথে কথা বলোনি। দ্বিতীয়তঃ বইটি নিষিদ্ধ, সে কথা তুমি জানো। তাহলে এমন একটি বই তুমি সবার সামনে দেবার কথা কিভাবে বলতে পারলে?

-আমি আসলে এত কিছু ভাবিনি।

-ওলগা, তোমার কথা-বার্তা একটু ভেবেই বলা উচিত।

আলেকজান্দ্রার কথায় ওলগা মন খারাপ করে চুপচাপ হাঁটতে থাকে।

ওলগার এমন তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়া এবং আলেজান্দ্রার চোখের ইশারার অর্থ বুঝতে ব্যর্থ হয়ে নাদিয়া তাইকোভার মুখের দিকে তাকায়। তাইকোভাও ওদের চলে যাওয়া পথের দিকেই তাকিয়ে ছিল। আড্ডার সুর কেটে গেছে বুঝতে পেরে তাইকোভা ঘাড় ফিরিয়ে বলে ওঠে,

-নাদিয়া, চলো যাওয়া যাক। এই, তোমরা থাকো, কাল আবার দেখা হবে।

নাদিয়া ও তাইকোভা একই পথে বাড়ি, ফেরে। তাইকোভাদের বাসাটা নাদিয়াদের ফ্ল্যাটের খুব কাছে। নাদিয়ার মন খারাপ দেখে তাইকোভা জানতে চায়,

-’রাশিয়ার নারী’ কবিতাটি তোমার কেন ভাল লেগেছে আমাকে একটু বলবে?

নাদিয়া অন্যদের থেকে তাইকোভার সাথে অনেক সহজভাবে মিশতে পারে। সে হাঁটতে হাঁটতে পিসকভে গরমের ছুটি কাটানো, তিমিওফেয়কা, কারসন সবার গল্প করতে থাকে। তাইকোভা নাদিয়ার গল্প শুনতে শুনতে বেশ অবাক হলো। এমন চুপচাপ স্বভাবের এবং নরম প্রকৃতির মেয়েটির একটি পোষা কুকুর ছিল অথচ সে গল্প সে আগে কখনো করেনি। তাদের বন্ধুদের মধ্যে নাদিয়া একটু অন্যরকম। সে বা অন্যরা যখন ছেলেদের নিয়ে ঠাট্টা বা হালকা বিষয় নিয়ে গল্প করে নাদিয়া কখনো সে সব গল্পে যোগ দেয় না। তাই সে প্রশ্ন করে,

-তোমার সাথে তিমিওফেয়কার কোন যোগাযোগ নেই?

-আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গ চলে আসি ১৮৮০ সালের হেমন্তকালে। সেই শীতকালে শুনতে পেয়েছিলাম পুলিশ তিমিওফেয়কাকে ধরে নিয়ে গেছে ‘নারোদনিক’ সন্দেহে । আরো পরে শুনেছিলাম ১৮৮১ সালে তাঁকেও ফাঁসি দেয়া হয়েছিল।

-বলো কি? কেন?

-আমি তো অত কিছু জানতাম না। বাবা বলেছিলেন তিনি নাকি বিপ্লবী ছিলেন।

-আমি তো দারুণ আকর্ষণ বোধ করছি। আমি তাঁর গল্প আরো শুনতে চাই।

-আরেকদিন বলবো।

-আর তোমার পোষা কুকুরটা? কি যেন নাম বলেছিলে?

-কারসন।

-হ্যাঁ, কারসন। তার কি হয়েছিলো?

-শুনেছিলাম আমরা চলে আসার পর সেই শীতেই বাঘে তাকে খেয়ে ফেলেছিল।

-কি সাংঘাতিক!

-হ্যাঁ। সে বছরের শীতকালটা আমার জন্য খুব কষ্টের ছিল।

তিমিওফেয়কা এবং কারসনের জন্য নাদিয়ার মনটা আবার বিষন্ন হয়ে উঠলে তাইকোভা নাদিয়ার মন ভাল করার জন্যই বলে ওঠে,

-তোমার জন্য আমার কাছে দারুণ একটা খবর আছে।

নাদিয়া তাইকোভার দিকে না চেয়েই বলে,

-কী?

-তোমার মনে আছে টিফলিসের একদল তরুণী খোলা চিঠি দিয়ে লেভ তলস্তয়ের কাছে জানতে চেয়েছিল কিভাবে তারা জনগণের কাজে লাগতে পারে?

-হ্যাঁ। মনে আছে। তোমাদের বাসায় তো আমরা পত্রিকাটি পড়েছিলাম।

-জানো, লেভ তলস্তয় তাদের সেই চিঠির জবাব দিয়েছেন আরেকটি খোলা চিঠি দিয়ে।

-তাই নাকি?

নাদিয়ার মুখখানি খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তার যদিও নেক্রাসভ এবং লারমন্তভের কবিতা ভাল লাগে তবে সবচেয়ে ভাল লাগে লেভ তলস্তয়কে। নেক্রাসভের প্রায় সব কবিতাই তার মুখস্ত। কিন্তু তলস্তয়ের গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি তাঁর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধও তার খুব ভাল লাগে। তলস্তয় যে তাকে কি ভীষণভাবে টানে! বিশেষতঃ তলস্তয় যখন বলেন ‘জনগণের কাছে যাও’ তখন নাদিয়ার মনে হয় তার সব কিছু ফেলে সেটাই করা উচিত। কিন্তু কি করলে জনগণের কাছে যাওয়া হবে সেটা নাদিয়ার কাছে পরিস্কার নয়। আর এরকম একটি প্রশ্নই টিফলিসের তরুণীরা করেছিল তলস্তয়কে খোলা চিঠি দিয়ে।

তাইকোভা নাদিয়ার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে বলে,

-সত্যি।

তাইকোভার এ কথায় নাদিয়া প্রবল আগ্রহ নিয়ে বললো,

-পত্রিকাটি কোথায়? আমি পড়তে চাই।

নাদিয়ার এমন আগ্রহে তাইকোভা তখন মুচকি হেসে বলে,

-এখনই দিতে পারি, তবে শর্ত আছে।

-কি শর্ত?

প্রশ্নটি করেই নাদিয়া ফুটপথের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে তাইকোভাকে বামের রাস্তা ধরে বাসায় ফিরতে হবে।

-আজ আমার সাথে আমাদের বাসায় চলো।

-না, আজ পারবো না। আজ আমার টিউশনি আছে। তুমি তো জানো আমি ছাত্রী পড়াই।

-ওহ্! আমি সত্যিই দুঃখিত। তুমি তো লিডিয়ার ছোট বোনকে পড়াও, তাই না?

-হ্যাঁ।

-তবে এই নাও সেই পত্রিকা। কাল দেখা হবে।

কথাটা বলেই দেরী না করে ব্যাগ থেকে পত্রিকাটি বের করে তাইকোভা নাদিয়ার হাতে দিয়ে সে বাড়ির পথ ধরে।

নাদিয়া পত্রিকাটি হাতের মুঠোয় নিয়ে স্টারি নেভেস্কি ধরে বাড়ির দিকে যেতে থাকে। স্টারি নেভেস্কির বরফ গলা রাস্তাটি দেখে নাদিয়ার মনে হলো প্রকৃতি যেন এই মাত্র রাস্তাটিকে গোসল করিয়েছে। ফুটপথটি ধরে একাকী নাদিয়া হেঁটে যেতে থাকে। বয়সের তুলনায় সে বেশ লম্বা। তার মুখটা দেখলে সব সময় বিষন্ন মনে হলেও তার চোখ দু’টো বড্ড মায়াবী এবং বুদ্ধিদীপ্ত । মাথার লম্বা চুলগুলো বেণী করে বাঁধা। বয়সের তুলনায় বেশ গম্ভীর নাদিয়া প্রতিদিন এই পথদিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে। তবে কেউ যদি ভাল করে আজ লক্ষ্য করে তবে দেখতে পাবে শান্তভাবে হাঁটলেও আজকে যেন তার একটু তাড়া আছে। সে পা ফেলছে অন্যদিনের চেয়ে দ্রুত গতিতে। নাদিয়ার মুখের দিকে আরেকটু ভাল করে খেয়াল করলে দেখা যাবে চুপচাপ স্বভাবের এই গম্ভীর মেয়েটির মধ্যে কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা।

নাদিয়া তালা খুলে তাদের এপার্মেন্টে ঢোকে। এই বিল্ডিংটির একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো কেউ চাইলে সদর রাস্তা দিয়ে ঢুকে পিছন দিয়ে অন্য আরেকটি রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। তাদের বাসায় দরজার দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে যে ঘরটা তার এক পাশে একটা ডাইনিং টেবিল পাতা। দু’পাশে দু’টো মাত্র চেয়ার। ডান দিকের দেয়াল বরাবর একটা বেড। এখানে তার মা থাকে। এই বেডের পাশে কাঠের ছোট্ট একটি সোফা। সোফাটিকে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বেড হিসাবে ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে যখন কোন অতিথি আসে। এই রুমটির অন্যপাশে ছোট্ট রান্নাঘর। আর তার পাশেই একটি লম্বা সরু ঘর। সেই ঘরটি নাদিয়ার। ঘরে একটা সিঙ্গেল বেড, একটা ওয়্যারড্রোব, একটি কমোড, বইয়ের একটি আলমারী, একটা পড়ার টেবিল এবং সেই টেবিলে সাথে দু’টো চেয়ার বেশ ঠাসাঠাসি করে রাখা। পড়ার টেবিল বরাবর দেয়ালে একটি ছবি ঝুলানো। সেই ছবিটির সাথে একটি ক্রুশও ঝুলছে। ছবিটি নাদিয়ার বাবা কনস্তান্তিন ক্রুপস্কির।

নাদিয়া জুতো খুলে তার নিজের ঘরে এসে ঢুকলো। স্কুল ব্যাগটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে হাতের কাগজটি খুলে সে পড়তে বসে। লেভ তলস্তয়ের খোলা চিঠিটি পড়ে নাদিয়া এতটাই উত্তেজিত হয়ে যে সে পড়ার টেবিলে বসেই একটি কাগজে লিখতে শুরু করে-

পঁচিশে মার্চ ১৮৮৭

স্টারী নেভেস্কি, সেন্ট পিটার্সবার্গ।

প্রিয় লেভ নিকোলায়েভিচ,

আপনি টিফলিসের তরুণীদের কাজের সুযোগের অনুরোধের প্রেক্ষিতে জানিয়েছেন যে, তাদের জন্য আপনার কাছে কাজ আছে। জনসাধারণের জন্য ‘সাইটিন’ নামের প্রকাশনা সংস্থাটি যে সব বই বের করেছে সেই সব বইগুলো যতটা সম্ভব নির্ভুল করা।

আমার অনুরোধ এমন কাজে আমাকেও আপনি সুযোগ দিয়ে বাধিত করবেন।

সম্প্রতি আমি আরো বেশি বেশি করে অনুভব করি যে আমার ভাল থাকার পেছনে কত মানুষের শ্রম, ঘাম ও অবদান রয়েছে। আমি যে জ্ঞান অর্জন করছি সেটা তাদেরই দান। আমি ভাবি সেই জ্ঞানের কিছুটা তাদের জন্য ব্যয় করবো কিন্তু আমি দেখছি যে আমার যে জ্ঞান সেটা অন্য কারোর কোন প্রয়োজন নেই এবং এই জ্ঞান আমি জীবনের কোন কাজেই লাগাতে পারছি না। তাই আমি জানি না কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবো…..।

টিফলিসের তরুণীদের উদ্দেশ্যে আপনার লেখা চিঠিটি পড়ে যে কী খুশী হয়েছি!

আমি জানি বই সংশোধন করা, যে বইগুলো মানুষ পড়বে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ, যার জন্য সামর্থ ও বিশেষ জ্ঞান থাকা দরকার। এবং আমার এই আঠারো বছর বয়সে আমি এত কম জানি…..।

কিন্তু আমি আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি এই কারণে যে কাজটির প্রতি আমার ভালবাসা ও আন্তরিকতা দিয়ে আমি আমার দূর্বলতা ও জানার ঘাটতিটুকু কাটিয়ে তুলতে পারবো।

তাই, লেভ নিকোলােভিচ, আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ আমাকেও আপনার এরকম একটি বা দু’টি বই দিন। আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজটি করবো। আমি অন্য বিষয়ের চেয়ে ইতিহাস ও সাহিত্যটা ভাল জানি।

এই অনুরোধ জানিয়ে আপনাকে যদি বিরক্ত করে থাকি, আপনার মুল্যবান সময় নষ্ট করে থাকি তবে আমাকে মাফ করবেন, যদিও জানি আমি বেশী সময় নেইনি।

ইতি,

নাদেজদা ক্রুপ্সকায়া।

চিঠিটি পাঠিয়ে নাদিয়া প্রতিদিন অপেক্ষা করে তলস্তয়ের চিঠির জন্য। একদিন, দু’দিন যায়। কোন উত্তর আসে না। প্রায় দু’সপ্তাহ পর একদিন সে স্কুল থেকে ফিরছে। পিয়নকে দেখে সে কোন চিঠি আছে কিনা জানতে চাইলে লোকটি হেসে তার হাতে একটি প্যাকেট ও একটি চিঠি দেয়। উত্তেজনায় বাসায় না ঢুকে সেখানে দাঁড়িয়েই সে চিঠিটি খুলে ফেলে। চিঠিটি যদিও তলস্তয়ের ঠিকানা থেকে লেখা তবে যিনি লিখেছেন তিনি তলস্তয় নন। তাঁর কন্যা তাতিয়ানা। তবুও নাদিয়া খুশী। প্যাকেটটি খুলতেই দেখতে পেলো আলেকজান্ডার দ্যুমা’র লেখা ‘The Count of Monte Cristo’ বইটি।

নাদিয়া অনেকটা দৌঁড়ে বাসায় ঢোকে। গভীর আনন্দ ও মনোযোগ দিয়ে তখনই বইটি পড়তে শুরু করে। সামনে তার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। তার মধ্যেও সে গভীর মনোযোগে বইটি সংশোধনের কাজটি চালিয়ে যায়। এভাবে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে নাদিয়া বইটি সংশোধনের কাজ শেষ করে। জুন মাসের চার তারিখে সে আবার তলস্তয়কে চিঠি লেখে। চিঠির সাথে সংশোধিত বইটিও পাঠায়। চিঠিতে সে নতুন বই পাঠানোর অনুরোধ জানায়। একদিন, দুইদিন করে সপ্তাহ শেষ হয়। এক সপ্তাহ, দু’সপ্তাহ করে মাস গড়ায় কিন্তু সেই চিঠির কোন উত্তর আসে না। না তলস্তয়, না তাতিয়ানা কেউ তাকে চিঠি লেখে না। স্টারি নেভেস্কি ধরে নাদিয়া যখন বাড়ি ফেরে প্রথম প্রথম সে ডাক পিয়নের কাছে জানতে চাইতো কোন চিঠি আছে কিনা। এখন আর জিজ্ঞাসা করে না। তবুও মাঝে মাঝে পথে ডাক পিয়নের সাথে দেখা হলে নাদিয়ার বুকটা দূরু দূরু করে। পিয়নটি নিজে থেকেই বলে ‘কোন চিঠি নেই’। নাদিয়া বিষন্ন মনে বাড়ি ফেরে। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার পর নাদিয়া অধিকাংশ সময় বাসায় কাটায়। পিয়ন আসার সময় হলে সে জানালায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পিয়নকে চলে যেতে দেখে। পরের দিন শুরু হয় আরো একটি অপেক্ষা দিয়ে। একটি চিঠির জন্য অপেক্ষা। যে চিঠিটি আসবে লেভ তলস্তয়ের ঠিকানা থেকে!

পর্ব ১০ঃ http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4717

পর্ব ৯ঃ http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4655

পর্ব ৮ঃ http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4533

পর্ব ৭: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4441

পর্ব ৬: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4368

পর্ব ৫: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4281

পর্ব ৪: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4155

পর্ব ৩: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/4027

পর্ব ২: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3868

পর্ব ১: http://www.uthon.com/%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AD/3491 

 

Facebook Comments

comments

১ Reply to “লেনিন-পর্ব ১১।।আশানুর রহমান খোকন”

  1. শশাঙ্ক বরণ রায় বলেছেন:

    সিরিজটি অসাধারণ হচ্ছে। প্রতিটি পর্ব অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়ি এবং পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।
    অনৈক ধন্যবাদ লেখক এবং পত্রিকাকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top