নির্বাচিত বই ।। ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন ও অংশুপট উপাখ্যান ।। সাধনা আহমেদ

ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন ও অংশুপট উপাখ্যান
বইয়ের ধরনঃ নাটক
প্রকাশকঃ বেহুলাবাংলা
প্রচ্ছদ শিল্পীঃ ধ্রুব এষ

নাট্যকারের কথা
পৃথিবীর আদিমানবের মনে প্রথম যে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছিল-আমি কে-অনন্তকাল ধরে সেই একই আত্মজিজ্ঞাসা নানাভাবে নানা আঙ্গিকে মানুষকে তাড়িত করে চলেছে। কিন্তু প্রশ্নের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে অন্তর্গত তাড়নায় ছুটে চলা মানবপ্রকৃতির এক অবধারিত অন্বেষণ সে অন্বেষণ নিজের ভেতরে নিজেরই অন্বেষণ। জিজ্ঞাসু মানুষ নানাভাবে তার নামকরণ করেছে। ভগবান-ঈশ্বর-খোদা-মনের মানুষ-জীবনদেবতা-মানুষরতন-কিংবা অন্য কোনো বিশেষ্য বা বিশেষণে অথবা ভিন্ন কোনো অভিধায়। এরই মাঝে মুক্তি খুঁজেছে মানুষ-সেই মুক্তিতে চিনতে চেয়েছে নিজেকে।
জীবনভর সাধনায় রবীন্দ্রনাথ এক সর্বমানবিক দার্শনিকতায় মুক্তির পথ অন্বেষণ করেছিলেন। সেই পথ সহজিয়া সাধনার পথ-মরমি অনুভব আর উপলব্ধির পথ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন-নানা দ্বন্দ্বে নানা ধোঁয়াশায় আমরা সত্যসাধনার পথ আচ্ছন্ন করে রেখেছি। অতিসহজেই যাকে শনাক্ত করার কথা-দ্বন্দ্বদীর্ণ নানা সংঘাতে নানা সংক্ষোভে তাকে আমরা কণ্টকিত করে তুলেছি।
‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থটির সূচনা বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-‘আমার অন্তর্যামী আমাকে দিয়ে যা বলাতে চান আমি তাই বলি। কিন্তু চিত্রায় আমার যে উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে সেটি অন্য শ্রেণির। আমার একটি যুগ্মসত্তা আমি অনুভব করেছিলুম যেন যুগ্ম নক্ষত্রের মতো… এই সাধনায় এক আমি যন্ত্র এবং দ্বিতীয় আমি যন্ত্রী…।’ সেই দ্বিতীয় যন্ত্রী আসলে কে?
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হলে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ পর্বের রবীন্দ্রনাথের দিকে চোখ ফেরাতে হয়। শিলাইদহের বাউলধর্ম সাধকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আত্মিক সংযোগ সাধিত হয়েছিল-বাউল সাধক লালনের চিন্তাধারা ও দর্শনের সঙ্গে তিনি একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। বাউলদের মনের মানুষ-সহজ মানুষ-অথবা মরমি সাধনা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। লালনের মনের মানুষ আর রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা-এ দুটি কি স্বতন্ত্র নাকি একই ধারণা? স্বতন্ত্র হলে কোথায় তাদের স্বাতন্ত্র্য-আর এক হলে কোথায় এসে সেই ঐক্যটি সাধিত হয়েছিল?
শিলাইদহের ‘সর্বক্ষেপী বোষ্টমি’র সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এন ইন্ডিয়ান ফোক রিলিজিয়ন প্রবন্ধে বোষ্টমির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। এই সর্বক্ষেপী বোষ্টমিকে নিয়ে লেখা ‘বোষ্টমি’ গল্পের এক জায়গায় তিনি বলেছেন-‘এতদিন পরে নিজের দৃষ্টির অহংকার ত্যাগ করিয়া এই শাস্ত্রহীনা স্ত্রীলোকের দুই চক্ষুর ভিতর দিয়া সত্যকে দেখিলাম।’ বোষ্টমির মাধ্যমে কী সত্যোপলব্ধি ঘটেছিল তাঁর? বোষ্টমি রবীন্দ্রনাথকে ‘গৌরসুন্দর’ বলে সম্বোধন করতেন। কেমন ছিল তাঁদের সেই সম্পর্ক? নাট্যদৃষ্টিতে তা দেখাই নাট্যকারের গভীর প্রয়াস।
সংসারে থেকেও বাউলপনায় কেঁদে মরেছেন যে রবীন্দ্রনাথ-আলখাল্লা পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন-একতারা হাতে বাউলরূপে এঁকেছেন নিজেকে-কেমন ছিলেন তাঁর ভেতরের সেই বাউল রবীন্দ্রনাথ? ধর্ম কি শুধুই প্রাতিষ্ঠানিকতা? যদি প্রাতিষ্ঠানিকতাই ধর্ম হয়-তবে বিশ্ব জুড়ে যে এত এত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম-ধর্মালয়- সেগুলো মানুষকে কতটা মানবিক করতে পেরেছে? বাউল ও সুফিমতাবলম্বী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তখনকার ধর্মধ্বজীদের যে অমানবিক বর্বরতা-সেই আলেখ্যকে আমাদের মৌলবাদলাঞ্ছিত সমকালের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করতে চেয়েছি যাতে অচেতন বোষ্টমির চেতনলোক দেখতে পায়-কত জনপদে কতবার বাউলের দিঘল কেশ হয়েছে ধর্মের ধ্বজাধারীর বিজয়পতাকা। এখানে চেতনলোক শব্দটি ব্যবহার করে সারা পৃথিবীতে ভিন্ন মতের প্রতি যে আগ্রাসন তার দিকে ইঙ্গিত করার চেষ্টা করেছি। মানুষের অন্তর্গত মুক্তি কোথায়? ধর্মের নামে যে সমূহ অধর্ম চলছে তারই-বা কোথায় সমাপ্তি? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণেরই অপর নাম ‘ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন’। সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অন্তর্গত বাউল রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করার চেষ্টা।

সাধনা আহমেদ পরিচিতি
সাধনা আহমেদ একাধারে নাট্যকার- কবি- গল্পকার- আবৃত্তি ও অভিনয় শিল্পী। শৈশবেই যুক্ত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-কেন্দ্রিক ‘স্রোত আবৃত্তি সংসদ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছন। এরপর থিয়েটার আরামবাগ’র সঙ্গে যুক্ত হয়ে মঞ্চে অভিনয় এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট-এ সম্পৃক্ত থাকেন। ১৯৯৭ সালে টেলিভিশন নাটক লেখার মাধ্যমে নাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সেই সাথে বিজ্ঞাপনচিত্র ও টিভি-নাটক নির্মাণ এবং একই সাথে হাল ধরেন ‘ঢাকা নাট্যনিকেতন’ নামের একটি থিয়েটার দলের। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান আয়োজিত নাট্যকার কর্মশালা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভারত সরকারের আয়োজন ও অর্থায়নে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত নাট্যকার কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। মঞ্চের জন্য লিখেছেন- দমের মাদার- ফাগুনশেষে- মাতব্রিং- ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন- অংশুপট উপাখ্যান- বিরাঙ্গনার আঁচল- প্রজন্ম’১৩- বিপুল তরঙ্গ- সপ্তপর্ণী ও গাঙকুমারী। বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশলাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ কেন্দ্রের সাথে যুক্ত আছেন।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top