আরো মাতৃভাষার কবিতা

ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়।।
—আবদুল লতিফ
মাতৃভাষায় কথা বলবার অধিকার আদায়ের জন্য আত্মত্যাগ, সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে বাঙালিসহ ঔপনিবেশিক শাসনে পিষ্ট নানান ভাষার জনগোষ্ঠীর। তবে, ১৯৫২ সালে বাঙালিদের ভাষা আন্দোলন, পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলনে উত্তীর্ণ হয়ে অনন্যতা অর্জন করেছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অন্তর্গত প্রেরণা ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষার অধিকার সুপ্রতিষ্ঠার। রাষ্ট্রভাষা হয়ে ওঠার কালে সে আন্দোলনে নানান বাকবদল ঘটেছে। এই চেতনার পূর্ণতর উদ্ভাস ঘটুক এই জনপদের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা উদযাপনের মাধ্যমে। মাতৃভাষায় ব্যক্ত হোক জীবনের যত আলাপন! আজ, ২১শে ফেব্রুয়ারি’কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনকালে বাংলাদেশের ছয়টি ভাষার কবিদের তাঁদের মাতৃভাষায় রচিত ছয়টি কবিতা নিয়ে নিবেদিত হল ভাষা দিবসের অঞ্জলি!

কোচ ভাষার কবিতা
মিঠুন কোচ

নিং কচ
১.
ফায় ফায় নানদারা
চায় লায় নিন্দেনে,
বিতিং দেখে তংয়ো নিং
বিতিং তংলায়তেনে।।
২.
বন দাক্কান নিনি নক
ভাঙ্গা রুঙ্গা ছে,
ফায়হা ববন্ সানি নিংনি
মানমা লাখানে।।
৩.
বেগাল ছে সায়ো নিং
দংচা নান্দা হানা,
কাননি চৃুননি আপান তাগো
নিনি কচদা।।
৪.
বাবা ববন নিং কদচা
তংয়ো আমুদসি,
পূজা পালী সবান দেয়ো
তাইবন কচছি।।
৫.
সাখে নিংখে তংয়ো নিং
বাবা জাসিনী,
গনছে নকনি মরৎ হানা
কাম লাও ছানি।।

অনুবাদ
১.
এসো এসো তোমরা
আমাদের যাও দেখে,
মন করে থাকি আমরা
কেমন থেকে গেছে।।
২.
পাহাড়ের ধারে মোদের ঘর
নড়বর করে,
এলেও পরে খাবার দাবার
পারবো না দিতে।।
৩.
অন্য রকম খাই মোরা
নয় তোমার মত
পোশাক আশাক নিজেই বুনি
আমরা কোচরা।।
৪.
নেই তবু আমরা
থাকি আমুদে,
পূজা পার্বণ সবই করি
এখনও কোচদের মধ্যে।
৫.
খেয়ে দেয়ে থাকি মোরা
নেইতো নিন্দুনি,
একই ঘরের মানুষের মত
কাজ করে খাই।

***

চাকমা ভাষার কবিতা
প্রমেশ্বর চাকমা

বিগিদি
অ-ম অ-দ অ-ম অ-দ
পড়া নয় ব-দ ব-দ
জ-দে ব-দে জ-দে ব-দে
পড়া পরিম অ-দে অ-দে
ওমাদু হ-দা ওমাদু হ-দা
লেগা পড়া ছাড়া মন ভদা
পাততুরু তু পাততুরু তু
পিত্থিমি মা-দি দিগ দে-গে দু
হঅ গুলু চরবেগ গুলু
গোদা পিত্থিমিত ছিদি দু

অনুবাদ
ফাজলামি
হৈ হৈ রৈ রৈ
পড়া নয় হৈ চৈ
জোর যার মল্লুক তার
পড়া নয় তালুক তার
তন্ত্র মন্ত্র তন্ত্র মন্ত্র
পড়া হলো শাস্ত্রের যন্ত্র
মায়ের দিব্যি মায়ের দিব্যি
পড়ালেখা ছাড়া মন ঘিঞ্জি
সুস্বাগতম সু স্বাগতম
কাঁপিয়ে দাও পৃথিবীর ভূমিতল
জ্ঞানের শস্য চিন্তার দস্য
ছড়িয়ে দাও পৃথিবীর জন্য

***

মণিপুরি (বিষ্ণুপ্রিয়া) ভাষার কবিতা
শুভাশিস সিনহা

আকমু চিকারি দিয়া
আকমু চিকারি দিয়া হাবিরে হারপুয়া-মিয়ৌ আছু
জি¦গত বরনে রোদে জ¦রিয়া তিঙিয়া দখে দখে!
ডাকাতি করিয়া মর হবা হবা মিকুপ অহানি
নেনার আগেতে মিয়ৌ খৌনু বুজে থছিলু থৌরাং।
সময় তোমার আতে হংকরা পুতুলগনাই
চাবি দিলে তুমার অগদে ইমে ফির,ক বুলের
মোরে নাউ চিনেদের, হারারাতি মেইকখুগ ইয়া
বুলিছিল শালহান বেরাদিয়া যারগা মাটিৎ।

আকমু চিকারি দিয়া কথা এতা মাতিস ইত্তাউ
নিবে যারগা হাকহানদে তরকথাতারাগি শাতক
কতা দিয়া না- থসিলা মান লাজে আহিগি জিপাগা
আধারর তলে আজি খংচেলগ বেদিশা মিঙালে
বাজিস হে খঞ্জনিগ হৃৎনর্তনর তালে তালে।

অনুবাদ:
একবার চিৎকার করে
একবার চিৎকার করে জানাও তুমিও আছো
আগুনে বৃষ্টিতে রোদে জ্বলে ভিজে খাক খাক হয়ে
ডাকাতি করে আমার সুন্দর মুহূর্তগুলো সব
নেবার আগে আমিও কন্ঠ ভরে রেখেছি পিপাসা।
সময় তো তোমাদের হাতে হাতে বানানো পুতুল
চাবি দিলে তোমাদের দিকে শুধু মুখ ঘুরিয়ে রাখে
আমাকে চেনে না মোটে, সারারাত হন্যে হয়ে বোনা
চাদরটি অকারণে ফেলে দিয়ে পালায় মাটিতে।

একবার চিৎকার করে কথাগুলো বলো বন্ধু
নিভে যাওয়া আকাশে তোমার কথানক্ষত্র ফুটুক
কথা দিয়ে না রাখা মানুষ চোখ ঝিমাক লজ্জায়
আঁধারের তলে আজ দিশাহারা কন্ঠের আলোয়
বেজে ওঠো হে খঞ্জনি হৃৎনর্তনের তালে তালে।

***

সাদরি ভাষার কবিতা
পরিমল সিং বাড়াইক

কেইসান আহ?
জানেক লগিন চিঠি লেইখে
উদালিয়া চা বাগানকের শ্রী মোহন্ত মাঝি।
চিঠি পইড়কে ভাবথ, কা উত্তর লেখবু!
গণতিশালকের ঘন্টা ঢঙ ঢঙ কইরকে বাজথে
আট বাজেকের ঘন্টা,
হাঁকালাক নন্দিয়া, কারে ভায়া কামে নি যাবে?
কোম্পানীকের কাম নি গেলে কাটা যাওই
তলপ, রেশম, বোনাস
গরহাজিরি হলে তো চার্জসীট হওই।
জলদিমলদি কইরকে চেইল গেল নম্বরে
চিঠিকের উত্তর দেয়ক পারবু না নাইরে বেনসিব!
দিনমান নম্বরকের কাম,
ঘারে আতে আতে হয় গেলাক সানজ্
বাঁশকের মাচাঙমে হেলায় দেলো দেহিটা
ভাবথ কা উত্তর লেখবু।
ও: হঁওে চুক্তিমাফিক তলপ, বোনাস
রেশনকের আটা, গম, চাউর, যাখান যনটু মিলেলা
কোম্পানীকের দেওল লাইন কোয়াটারমে
দুইচালা শনকের ঘারে,
যাহা বারো মাস ছেন্দাচালা দেইকুন
রাইতকের চান তেরগুন করেলা লুকালুকি খেল
বরিষাকের বুন্দ রাইতকের নিন্দ উড়ায় দেইল।
বউ ছোয় পোতা, নাত-নাতনি, গরু, ছাগরী লেইকুন
কনমতে কাটথে দিল কাল।
তহার আয়-আবাকের আশিরবাদে
ভায়া ম্যঁই ভালোই আহ,
ভওওয়ান তহনিকে ভালায় রাখুক
ইতি- সুখরাম সাঁওতাল।

অনুবাদ:
কেমন আছি?
জানতে চেয়ে পত্র লিখেছে
উদালিয়া চা বাগানের শ্রী মোহন্ত মাঝি।
পত্র পড়ে ভাবছি, কি উত্তর লিখবো!
গণতিশালে ঢঙ ঢঙ করে বাজলো
আটটার ঘন্টি, হাঁকে নন্দিয়া, কিরে ভায়া
কামে নাই যাবি?
কোম্পানির কাজ, না গেলে কাটা যাবে মজুরি
রেশন, বোনাস
গরহাজিরা হলে চার্জশিট তো হবেকেই।
হুড়াহুড়ি করে চলে যায় নম্বরে,
পত্রের উত্তর দেওয়া হবে নারে অভাগা!
দিন মান নম্বরের কাজ
ঘরে ফিরতে হয়ে গেল সাঁঝ
বাঁশের মাচাঙটায় এলিয়ে দিয়ে গা
ভাবছি কি উত্তর লিখবো।
ও হ্যাঁ, চুক্তিমতো মজুরি, বোনাস
রেশনে আটা, গম, চাল, যখন যেটা মিলে
কোম্পানির দেয়া লাইন কোয়ার্টারে
দু’চালা ছনের ঘরটায়,
যেখানে বারোমাস ছেঁন্দাচালা দিয়ে
চাঁদ তারা করে লুকোচুরি খেলা, বৃষ্টির ফোঁটা
রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
বউ ছানাপোনা নাত-নাতনি, গরু, ছাগল নিয়ে
কোনমতে কাটছে দিনকাল,
তোমার বাপ মায়ের আশির্বাদে
ভায়া ভালোই আছি।
ভগবান তোদের ভালই রাখুক
ইতি- সুখরাম সাঁওতাল।

***

উর্দু ভাষার কবিতা
আহমদ ইলিয়াস

কাগজ কা মাকান
ম্যায়ঁ জাব কাভি
সাদাহ কাগজ কা টুকড়া কাহিঁ পাতা হু
মেরি উংলিয়ো মেঁ খুদ বাখুদ জুমবিশেঁ হোনে লাগতি হ্যায়
অওর ফির কাগজ পর লকিরোঁ কে বননে কা আমল
শুরু তো জাতা হ্যায়
শুরু হো জোতি হ্যায় ইক খায়ালি মাকাঁ কি তামির
ম্যায় কাগজ পর দর ও দিওয়ার উঠাতা হুঁ
দরওয়াযে বানাতা হু
বাম ও দরিচে সাজাতা হুঁ
ঘর কে সামনে
বাগ মে ফুল খিলাতা হুঁ

অওর জাব দেখতা হুঁ আপনে মাকাঁ কি তসবির
মুঝে খওফ আতা হ্যায়
জিস তরহা ম্যায়ঁনে আপনা মাকান খোয়া হ্যায়
যমিন ও আসমাঁ খোয়া হ্যায়
কাগজ কা য়ে টুকড়া ভি খো না জায়ে
অওর ম্যায়ঁ ফির সে বে ঘর হো জাউ

অনুবাদ : জাভেদ হুসেন

কাগজের বাড়ি
যখনই আমি
সাদা কাগজের কোন টুকড়ো পাই
নিজেই নড়ে ওঠে আঙ্গুল আমার
তারপর কাগজে রেখা আঁকা
শুরু হয়ে যায়
শুরু হয়ে যায় কল্পনার বাড়ি বানানোর কাজ
আমি কাগজে দেয়াল ওঠাই
দরজা বানাই
জানালা, অলিন্দ সাজাই
ঘরের সামনে
বাগানে ফুল ফোটাই

এরপর, নিজের বাড়ির ছবি দেখে
আমার ভয় লাগে
যেমন করে আমি নিজের বাড়ি হারিয়েছি
হারিয়েছি আসমান ও জমিন
কাগজের এই টুকরোও হারিয়ে না যায়
আমি আবার যদি গৃহহীন হয়ে যাই

***

রোহিঙ্গা ভাষার কবিতা
মৌলানা জাফর

আঁরা অইলাম রোহিঙ্গা জাতি
আঁরা অইলাম রোহিঙ্গা জাতি, আঁরা আরাকান দেছ অর বাগি,
হাজার বছর হইতে লতি, আঁরা আরাকান দেছত তাকি।
মুরাফেরা হাছি কুছি, রুহাং ছহর আবাদ গরি,
আঁরা অইলাম গরে বারি, কেনে যাইয়ুম অতুন সারি।
আরাকান দেছর সুনার মেডি, আঁরা তোরে আদর গরি,
তাইক্কুম তর বুকত এ বাযি, তোরে ফেলাই তাআই ন ফারি।
তর বুকঅতত্তুন জনম লইলাম, ফালি ফুলি বড় অইলাম,
আইজু আঁরা ন ফারিলাম, তর হন হক আদা গরি।
হত ফরান চহিত গরি, তর বাগানত ফানি দি,
আঁরা এহন আছা গরি, তুই হন দিন ন ফুরাইবি।

অনুবাদ: মাসউদুর রহমান
জাত আমাদের রোহিঙ্গা
জাত আমাদের রোহিঙ্গা, আরাকানের আদিবাসি,
হাজার হাজার বছর ধরে, এই আরাকানে আমরা থাকি।
জঙ্গল কেটে করেছি সাফ, রুহাং শহর করেছি আবাদ,
কেমনে ছেড়ে যাই বলো যেথায় গড়েছি বসতবাড়ি।
আরাকান দেশের সোনার মাটি, তোরে বড়ই ভালোবাসি
তোরই বুকে থাকবো মোরা, তোরে ছেড়ে কেমনে থাকি।
তোর বুকেতেই জন্ম নিলাম, তোর ছায়াতেই বড় হলাম,
আজো তো হায় তোর সে দানের, কোন কিছুই শোধ না দিলাম।
কত শত প্রাণ শহীদ করে, তোর বাগানে দিলাম পানি,
আশা এখন তুই কোনদিন, আমাদের ভুলবি নারে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top