জাভেদ আখতারের কবিতা ।। উর্দু থেকে তর্জমা: সফিকুন্নবী সামাদী

ক্ষুধা

চোখ খুলে গেছে আমার
জীবিত হয়েছি আমি আবার
পেটের অন্ধকার থেকে
মগজের কুয়াশা অব্দি
সাপের মতো এক
শিরশিরে অনুভব আসে মনে
আজ তৃতীয় দিন
তৃতীয় দিন আজ

আশ্চর্য এক নৈঃশব্দ্য
জমাট বেঁধে আছে ঘরে
কেবল এক মেঝে আর এক ছাদ
আর চারিদিকে দেয়াল
আমার সাথে সম্পর্কহীন যেন সব
সকলেই দর্শক হয়ে কেবল দেখছে আমাকে
সামনের জানালা গলিয়ে
তপ্ত রোদের রশ্মি
পড়ছে বিছানার ওপর
বিঁধে যাচ্ছে আমার চেহারায়
এতোটা সূঁচালো এই কিরণ
যেন আমার আত্মীয়দের
তামাশা আমার গরীবী নিয়ে
চোখ খুলে গেছে আমার
আজ আমি ফাঁপা শূন্য
কেবল আবরণটুকু রয়েছে আমার
আজ আমার বিছানায়
শুয়ে আছে আমার কঙ্কাল
নিজের মৃত চোখে
দেখছি কামরাটাকে
আজ তৃতীয় দিন
তৃতীয় দিন আজ

দুপুরের তপ্ত হাওয়ায়
উদ্দেশ্যহীন পায়ে
এক সড়কের ওপর চলেছি
সরু সড়কের
দু’দিকেই দোকানের সারি
শূন্য-শূন্য চোখে
প্রতিটি দোকানের ফলক
দেখতে পাই কেবল
এখন আর পড়তেও পারছিনে সেসব
মানুষজন আসছে যাচ্ছে
পাশ দিয়ে চলে যায়
কেমন যেন কুয়াশাচ্ছন্ন সব
মানুষগুলো যেন চেহারাবিহীন
এইসব দোকানের শোরগোল
পথ চলতি গালাগাল
রেডিওর আওয়াজ
যেন দূরের শব্দ
আসছে যেন মাইল-মাইল দূর থেকে
যাকিছুই শুনছি আমি
যাকিছুই দেখি আমি
স্বপ্নের মতো মনে হয়
যেন আছেও আবার নেইও
দুপুরের তপ্ত হাওয়ায়
উদ্দেশ্যহীন পায়ে
এক সড়কের ওপর চলেছি
উল্টোদিকের পথের কোণে
পানির কল দেখা যায়
এই পানি এতো শক্ত কেন
আটকে যাচ্ছে কেন গলায়
আমার পেটে যেন
ঘুষি মারছে কেউ
মাথা ঘুরছে আমার
শরীরে ঘামের ধারা
শক্তি নেই আর শরীরে
আজ তৃতীয় দিন
তৃতীয় দিন আজ

চতুর্দিকে কেবল অন্ধকার
নির্জন ঘাটে আমি একা
পাথরে বাঁধানো সিঁড়ি
সিঁড়ির ওপর আছি শুয়ে
এখন আর উঠতে পারছিনে আমি
আকাশের দিকে তাকাই
আকাশের থালায়
চাঁদ এক রুটির মতো
চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে
ডুবে যাচ্ছে দৃশ্যাবলী
সমস্ত দুনিয়া ঘুরছে যেন

আমার ঘরে চুলো ছিল
রোজ খাবার তৈরি হত সেখানে
রুটি যেন ঝলকে ওঠা সোনা
গরম গরম এই খাবার
চোখ আর খুলতে পারছিনা
আমি কি তবে মরে যাচ্ছি
অনন্য ছিলেন আমার মা
প্রতিদিন নিজের হাতে
আমাকে খাওয়াতেন তিনি
কে শীতল হাতে
স্পর্শ করছে আমার চেহারা
‘এই এক গ্রাস হাতির
এই এক গ্রাস ঘোড়ার
এই এক গ্রাস ভালুকের’
একি মৃত্যু নাকি অচৈতন্য
যা-ই হোক এই তো আশীর্বাদ
একি মৃত্যু নাকি অচৈতন্য
যা-ই হোক এই তো আশীর্বাদ
আজ তৃতীয় দিন ছিল
তৃতীয় দিন ছিল আজ

আজব কাহিনী

আজব কাহিনী আমাদের
যখন এই দুনিয়া বুঝেছিল
তুমি তোমার দুনিয়ায় বাস করছ
আমি আমার দুনিয়ায় বাস করছি
তখন আমরা সমস্ত দৃষ্টি থেকে দূরে
এক দুনিয়া গড়েছিলাম
যা আমার ছিল
তোমারও ছিল
যেখানে পরিবেশের মধ্যে
দুজনের স্বপ্ন জেগে ছিল
যেখানে বাতাসের মধ্যে
আমাদের ফিসফিসে কথা মিশে ছিল
যেখানে ফুলের গায়ে
দুজনের আকাঙ্ক্ষার সব রঙ
নিজেদের মেলে ধরেছিল
যেখানে দুজনের স্পর্ধার
হাজার ঝরনা টগবগ করছিল
না আশঙ্কা ছিল না দুঃখ-বেদনা ছিল
শান্ত নিস্তব্ধতার গভীর এক সমুদ্র ছিল
আর আমরা ছিলাম

আজব কাহিনী আমাদের
সমস্ত দুনিয়া
যখন জানতে পারল
যে আমরা সমস্ত দৃষ্টি থেকে দূরে
এক দুনিয়া গড়েছি তো
প্রতিটি চোখের ভ্রু যেন আমাদের দিকে ধনুক তাক করে দাঁড়াল
সকল কপালে দেখা দিল
দুঃখ আর ক্রোধের গভীর রেখা
কারো মুখ থেকে কটুবাক্য বেরিয়ে এল
কারো কথায় ছিল নির্জলা তিক্ত স্বর
কেউ কেউ চাইল
দেয়াল তুলে দিতে আমাদের মাঝখানে
কেউ কেউ চাইল
আমাদের দুনিয়াটাকেই মুছে দিতে
কিন্তু দুনিয়াকে হারতেই হত
দুনিয়া হেরে গেল
পুরো দুনিয়াকে মানতে হল
আমাদের বিবেচনার জমিন একই রকম
আমাদের স্বপ্নের আকাশও ছিল এক
কিন্তু এই কাহিনী অনেক পুরানো
দুনিয়া আমাদের ওপর
এখন কিছুকাল মেহেরবান আছে
আজব কাহিনী আমাদের
যখন দুনিয়া
সেই কবে স্বীকার করে নিয়েছে
আমরা একই দুনিয়ায় থাকব
সত্য তো আসলে এই
তুমি তোমার দুনিয়ায় বাস করছ
আমি আমার দুনিয়ায় বাস করছি

পরাজয়

কালো টিলার ওপর একাকী দাঁড়িয়ে সে শোনে
হাওয়ায় গুঞ্জরণ করছে তার পরাজয়ের সুর
দৃষ্টির সম্মুখে
রণভূমি যেখানে
ভয়হীন স্বপ্নদের দলিত আর জখম শরীর
পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চারিদিকে
বিশৃঙ্খল
অনেকেই নিহত হয়েছে
আর যাদের শ্বাস চলছে
ফোঁপাচ্ছে তারা
যে কোনো মুহূর্তে নিহত হবে
তার স্বপ্নেরা
তার সিপাহীরা
তার বীরপুরুষেরা
ঘর থেকে বেরিয়ে কত দেশ জয় করেছে
ঝুঁকিয়েছে কত আত্মাভিমানী বাদশাহর মস্তক
দুর্গের দেয়াল ভেঙে পড়ে সালাম করত তাকে
শুধু পৌঁছুবার প্রয়োজন ছিল
থর থর করে খুলে যেত সকল দুর্গের
সমস্ত মহলের দরজা
তার চোখে সেসব দিনের দৃশ্য ছিল সজ্জিত
জমিন সোনালী ছিল
আর আসমান ছিল নীল
কিন্তু এই স্বপ্নের বাহিনীতে কে জানত একথা
প্রত্যেক কাহিনীরই একটা শেষ থাকে
হাজার লেখা হোক বিজয়ের কথা তিল তিল করে
কিন্তু পরাজয়েরও কোনো এক ঠিকানা আছে
দিগন্তে হামাগুড়ি দেয় পিঁপড়ের দল
সত্রুর সেনানী তা দেখতে পায়
পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে
শিকারী বেরিয়েছে তার শিকারের জন্য
জমিন বলছে
এই চক্র নিকটতর হচ্ছে
হাওয়া বলছে
এখন ফিরে যাবার সময়
কিন্তু ফিরে যাবার রাস্তা তো বানানো হয়নি
যখন আসছিল এ খেয়াল আসেনি কখনো
ফিরে দেখে
সামনে সমুদ্র
কিনারায় তো কিছুই নেই
কেবল এক ছাইয়ের স্তূপ
এ তো তারই জাহাজ
কাল যাকে নিজেই জ্বালিয়েছিল সে

হন্তারকদের আওয়াজ কাছে আসতে থাকে
কালো টিলার ওপর একাকী দাঁড়িয়ে সে শুনতে পায়।

বৃক্ষে জড়ানো লতা

এক পুরানো
আর ঘন বৃক্ষের শাখায় জড়িয়ে থাকা
লতায়
পুরো বৃক্ষের রঙ
তার সুগন্ধ
লেপ্টে ছিল
ওই লতাও বৃক্ষের এক অংশ হয়ে ছিল
বৃক্ষটি বিষয়ে
কাহিনী ছিল অনেক
লতার কোনো উল্লেখ ছিলনা সেখানে
তার ছিল এক নীরব কাহিনী

বৃক্ষে রঙীন বসন্ত ছিল
লতায়ও যেন ছিল
মৃদু মুচকি হাসি
সুকুমার ফুল ফুটেছিল
কিন্তু
একদিন সেই মৌসুম বদলায়
আর দুরন্ত বিষ-বায়ু
বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে
চারদিক থেকে যখন আছড়ে পড়ে
এমন মনে হয়েছিল
বদ-হাওয়ায় বৃক্ষ
পাতা অব্দি ধ্বংস হবে
এমন মনে হয়েছিল
সমস্ত শাখা ভেঙে পড়বে
এমন মনে হয়েছিল
সমস্ত শেকড় উপড়ে আসবে
দুয়েক মুহূর্তে
বৃক্ষ জমির ওপর
মুখ থুবড়ে পড়বে
কিন্তু যা ঘটল
সেই কাহিনী শোনার মত

বৃক্ষ যখন কেঁপে ওঠে
লতার দেহ-মনে যেন
এক বিজলি দৌড়ে যায়
রেশমের মত লতার প্রতিটি তন্তু
যেন লোহার তার হয়ে ওঠে
আর লতা
সমস্ত ভঙ্গুর শাখাকে
এমন ভাবে বাঁধে
বৃক্ষের সমস্ত ঘায়েল শরীরে
এমন ভাবে জড়িয়ে থাকে
বৃক্ষের সমস্ত জখম ডালকে
এমন ভাবে ধরে রাখে
যতই বিষ-বায়ু হোক
বৃক্ষের গায়ে মাথা ঠুকে ঠুকে
পরাজিত হয়
হাঁপিয়ে ওঠে
পেরেশান হয়ে
হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকে

সময়ের খেলা সত্যি আশ্চর্য
লতা নিজের বাহুতে এখন বৃক্ষকে সামলায়
ধীরে-ধীরে
ঘায়েল শাখায় শাখায়
আবার পাতা বেরুচ্ছে
ধীরে-ধীরে
নতুন মূল গজাচ্ছে
আর জমির গভীরে প্রবেশ করছে তারা
লতায় যেন
এক নতুন মৃদু হাসির সুকুমার ফুল ফুটে উঠেছে

আজব মানুষ ছিলেন তিনি

আজব মানুষ ছিলেন তিনি
ভালোবাসার গান ছিলেন
প্রতিবাদের সুর ছিলেন
কখনো তিনি কেবলই ফুল ছিলেন
কখনো তিনি শুধুই আগুন ছিলেন
আজব মানুষ ছিলেন তিনি

তিনি দরিদ্রকে বলতেন
দিন বদলাতেও পারে
তিনি জালিমকে বলতেন
তোমার মাথায় যে সোনার মুকুট রয়েছে
তা একদিন গলেও যেতে পারে

তিনি বন্ধনকে বলতেন
আমি তোমাকে ছিঁড়ে ফেলতে পারি
তিনি আয়েশকে বলতেন
আমি তোমাকে ত্যাগ করতে পারি
হাওয়াকে তিনি বলতেন
আমি তোমাকে ঘুরিয়ে দিতে পারি

তিনি স্বপ্নকে বলতেন
তোমাকে সত্য বানাবো আমি
তিনি আকাঙ্ক্ষাকে বলতেন
আমি তোমার সহযাত্রী
তোমার সাথে চলবো আমি
তুমি যত দূরই ঠিক করো না কেন তোমার গন্তব্য
কখনো ক্লান্ত হবো না আমি

তিনি জীবনকে বলতেন
তোমাকে আমি সাজিয়ে তুলবো
তুমি আমার কাছে চাঁদ চেয়ে দেখো
আমি চাঁদ নিয়ে আসবো

তিনি মানুষকে বলতেন
মানুষকে ভালোবাসো
ধ্বংসোন্মুখ এই মানবজমিন
একে একটু সুন্দর করে তোলো

আজব মানুষ ছিলেন তিনি

তিনি জীবনের সমস্ত বেদনা
সকল দুঃখ
প্রতিটি অত্যাচারকে বলতেন
আমি তোমাদের সঙ্গে জিতবোই
তোমাদের তো মিটিয়ে দেবে
একদিন মানুষ
ভুলিয়ে দেবে এই দুনিয়া
কিন্তু আমার কাহিনী তো অন্যরকম
সেইসব চোখ যেখানে রয়েছে স্বপ্ন
সেইসব হৃদয় রয়েছে যেখানে আকাঙ্ক্ষা
সেই সব বাহু রয়েছে যাতে শক্তি
সেই সব ঠোঁট রয়েছে যাতে ভাষা
থাকবো আমি তাদের মাঝে
যখন চলে যাবো

আজব মানুষ ছিলেন তিনি

 

জাভেদ আখতার: হিন্দী সিনেমার চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা এবং গীতিকার হিসেবে বিখ্যাত জাভেদ আখতারের জন্ম ১৯৪৫ সালে গোয়ালিয়রে। শৈশব কেটেছে লখ্নৌতে, উর্দু সাহিত্যিক সংস্কৃতির পীঠস্থান বলা চলে যে শহরকে। পিতা জাঁ নিসার আখতার উর্দু কবি এবং চিত্রনাট্যকার ছিলেন। মা সাফিয়া আক্তার ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী, শিক্ষক এবং লেখক। সাহিত্যশিল্পের সঙ্গে জাভেদদের পরিবারের সংযোগ আরো পুরনো। পূর্বপুরুষদের মধ্যে কবি ছিলেন, ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন, ছিলেন স্বাধীনতাসংগ্রামী। উর্দু কবিতার ক্ষেত্রে জাভেদ এক নতুন সুর নিয়ে আসেন। তার কবিতায় প্রেম এবং সামাজিক অবিচারের প্রকাশ উভয়ই সুস্পষ্ট। আরো আছে মানবজীবন এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে গভীর-জটিল প্রশ্ন। ‘তরকশ’ এবং ‘লাভা’ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। উর্দু কবিতা হলেও দেবনাগরী হরফে এদের সংস্করণ রয়েছে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top