পাঠ প্রতিক্রিয়া : আগস্ট আবছায়াঃ আশানুর রহমান খোকন

আগস্ট আবছায়াঃ ‘স্ট্রিম অব কনসাশনেস’ এর এক পরিপূর্ণ ‘ডালিম’।

ভূমিকাঃ

ডালিম। ফলের নাম। পাকা একটা ডালিম ফলের শক্ত খোসাটা ফেলে দিলে পাওয়া যায় দানা। শত শত দানা। সেই দানার ভিতরে থাকে আবার শক্ত বীজ। আগস্ট আবছায়া নামের উপন্যাসটি পড়ে আমার ডালিম ফলটির কথায় প্রথমে মনে এলো। আর এমনটি মনে হবার epigraph হলো দু’জন। প্রথমজন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর অন্যজন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

সাহিত্যে ‘চৈতন্যপ্রবাহ’ বলে একটা কথা আছে, ইংরেজিতে যাকে ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ বলে। বাংলা উপন্যাসে সর্বপ্রথম এই তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন বোধ করি ধূর্জটিপ্রসাদই। তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী উপন্যাস অন্তঃশীলা (১৯৩৫), আবর্ত (১৯৩৭) এবং মোহনা (১৯৪৩) তে। ধূর্জটি বাবু ‘অন্তঃশীলা’ দিয়ে একটি বিন্দু থেকে শুরু করে নানা চড়াই-উৎরাই এর মধ্যে ‘আর্বতন’ শেষে ‘মোহনা’য় এসে বৃত্তটি পূর্ণ করেন। আর এটা তিনি করেন সার্থকভাবে। আর এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাস অন্তঃশীলা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন,
“দাড়িমের শক্ত খোলার মধ্যে শত শত দানা, আর প্রত্যেক দানার মধ্যেই একটি করে বীজ। ‘অন্তঃশীলা’ সেই দাড়িম (ডালিম অর্থে) জাতীয় বই। বীজ-বাণীতে ঠাসা। তুমি এতো বেশী পড়েছো, এবং এত চিন্তা করেছো যে, তোমার আখ্যানকে শতধা বিদীর্ণ করে বিস্ফুরিত হতে থাকে। আমার বোধ হচ্ছিল তোমার এই গল্পটিই তোমার চরিত কথা, গল্পের দিক থেকে নয়, আচরণের দিক থেকে। তোমার গল্পের পাত্রগুলি জীবনযাত্রায় একটু ঠোকর খেলেই তাদের মাথা থেকে ভাবনা ছিটকে পড়তে থাকে। –তোমার পাত্ররা তোমার মতোই চিন্তাশীল।”

‘আগস্ট আবছায়া’ পড়া শেষে তাই আমারও ডালিমের কথাটাই কেন জানি প্রথম মাথায় এলো।

এক।

‘আগস্ট আবছায়া’ কি একটি ‘অন্তর্বাস্তবতা’ নির্ভর উপন্যাস? ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Interior Monologue’। হয়তো পুরোপুরি বলা যাবে না তবে অনেকটা যেন তাই। কেন? আগস্টের এক সন্ধ্যায় লেখক যিনি উপন্যাসটির নায়কও বটে, যাকে সবাই ডাকে প্রফেসর নামে, তাকে আমরা দেখি কাফকার গল্পের ২য় খণ্ড অনুবাদের প্রস্তুতি নিতে নিতে মার্সেল প্রুস্তু’র উপন্যাসের চতুর্থ খণ্ড নিয়ে ভাবছেন। আবার সেটা ভাবতে ভাবতে অবলীলায় চলে যাচ্ছেন দু’দিন আগে মুম্বাই সফরে তার ড্রাইভার আয়ারের কাছে। এই যে বর্তমান থেকে অতীত, অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসা, এরকম ঘটনা আমরা দেখতে থাকি গোটা উপন্যাস জুড়ে। আর এভাবেই মনে হতে থাকে উপন্যাসটি ‘অন্তর্বাস্তবতা’। আমরা লেখকের বর্ণনায় মার্সেল এর মধ্যেও যেন তেমনটাই দেখতে থাকি, যেমনটা ‘অন্তঃশীলা’র নায়ক খগেন বাবু তার মৃত (আত্মহত্যাকারী) স্ত্রী সবিতা’র চিতায় পোড়া গন্ধ নাকে নিয়ে অবলীলায় ভাবতে পারেন উতলানো ভাতের হাড়ির গরম মাড়ে পুড়ে যাওয়া স্ত্রীর হাত নিয়ে, কিংবা চুল না বাঁধা স্ত্রী’র সাথে কথোপকথন চালিয়ে যেতে।

দুই।।

মুম্বাইয়ের ড্রাইভার আইয়ারের সাথে চমৎকার একটি কর্মক্লান্ত দিন কাটিয়ে হোটেলে নেমে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যাবার আগে আইয়ার যখন বকশিস দেবার কথা প্রফেসরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই মুহুর্তে আইয়ারের সাথে লেখকের ব্যবহারের মধ্যে যে ‘নিষ্ঠুরতা’টুকু পাঠকের চোখে লাগে সেখানে এসে মনে হয় আলবেয়ার কামুর ‘আউটসাইডার’ ‘মুরসল্ট’ আর ‘আগস্ট আবছায়া’র নায়ক যেন হাত ধরাধরি করে চলে গেলো। কারণ দু’জনের মধ্যেই আবেগ আছে কিন্তু সেই আবেগ নিয়ে কোন ভান নেই, ভণিতা নেই। তাই মুরসল্ট যখন বলে “মা মারা গেছেন আজ। হয়তো গতকাল, আমি ঠিক জানি না”, এই কথার মধ্যে যেমন কোন ভান নেই। ঠিক তেমনি দু’জন কর্মক্লান্ত মানুষের একজন, ড্রাইভার, অন্যজন তার যাত্রীর কাছে বকশিস চাইলে সে যখন বলে, ‘নো, থ্যাংক ইউ’ তখন মুরসল্ট আর আগস্ট আবছায়া’র প্রফেসরের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। তারা যেন একাকার হয়ে যায় তাদের চরিত্রের আপাততঃ নিষ্ঠুরতা নিয়ে ভণিতাহীন হয়ে।

তিন।।।

আইয়ারের সাথে আচরণে, সরফরাজ নওয়াজের সাথে বিতর্কে, কিংবা মেহেরনাজ বা সুরভী ছেত্রির সাথে রাগ-বিরাগ-অভিমানে যে ভণিতাহীন, আপাত শীতল আচরণের প্রফেসরকে দেখি, সে যেন একই সাথে ‘অস্তিত্ববাদী’ আবার একই সাথে একান্তই ‘প্রুস্তুীয়’। অস্তিত্ববাদীদের মতো প্রফেসর যেন নিজের কাজে, সমাজের কাজে এবং দুনিয়ার সব মানুষ ও প্রকৃতির কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ মনে করে। আর করে বলেই একদিকে যেমন সব হত্যা, খুন ও ক্ষমতার উৎসের সন্ধান শেষে নিজের মধ্যে প্রতিশোধের লিপ্সা জাগিয়ে রাখে, আবার একই সাথে প্রকৃতি, ফল, ফুল, পাখি এবং মানুষের এই পৃথিবী নিয়ে ক্ষমতাশালীদের যে দ্বন্দ্ব, তার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না বরং নিজের ঝুঁকি বাড়ায়, বান্ধবী মেহেরনাজ এবং সুরভীকেও হারিয়ে ফেলে। আবার একই সাথে সে ভীষণ রকম প্রুস্তুীয় অর্থাৎ ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। অর্থাৎ সে কেবলই যেন চিন্তা করে। আর চিন্তা করতে করতে, হয় তার ক্ষমতা ক্ষয় করতে থাকে অথবা ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিতে থাকে। ‘আলবারতাইন চলে গেলে মার্সেল তাকে ফিরে আসার জন্য চিঠি লিখবে কি লিখবে না সেটা ভাবতে থাকে। চিন্তা করে চিঠি লিখলে কি কি ঘটতে পারে। এভাবে ভাবতে ভাবতে সে সময়ক্ষেপণ করে আর একদিন খবর আসে আলবারতাইন মারা গেছে’। অর্থাৎ ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। চৈতন্যপ্রবাহী উপন্যাসের যেমনটা বৈশিষ্ট্য। আর এভাবেই প্রুস্তুের উপন্যাসের মতো ‘আগস্ট আবছায়া’ও আমাদের মনে কেবলই অসংখ্য সম্ভাবনা তৈরি করেও, একটা সম্ভাবনা যেন আরেকটা সম্ভাবনাকে নাকচই করতে থাকে। তাই উপন্যাসের নায়কের ১৫ই আগস্ট নিয়ে যে ‘অবসেশন’ সেখানেই যেন কাহিনি ঘুরপাক খেতে থাকে। গল্পের বিস্তার তাই তেমন ঘটে না কিন্তু ক্রমাগত গভীরতা বাড়ে।

চার।।।।

‘আগস্ট আবছায়া’ কি পরাবাস্তববাদী বা জাদুবাস্তবতাবাদী উপন্যাস? উভয় ক্ষেত্রেই যেমনটা জাদু ও বাস্তবতার মিশেল থাকে? Obsessed প্রফেসর যখন অস্ত্র ব্যবসায়ী ইব্রাহিমের কাছে যায় অস্ত্র কিনতে তখন নানাভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেক্ষাপট ও কারণ বর্ণনা করতে করতে থাকা ইব্রাহিম হয়ে যায় ‘সরীসৃপ’। ৩২ নম্বর বাড়ির হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে প্রফেসর হয়ে যায় ‘অদৃশ্য মানব’। মার্কিন দূতাবাসে ইন্টারোগেশনের সময় প্রফেসরের নিজের শরীর পেটের ভিতর ঢুকে যায় আর তার পুরুষাঙ্গটি বের হয় মুখ দিয়ে। কিংবা যেভাবে মেহেরনাজ কোরিয়ানদের পক্ষ নেয়। বসুন্ধরা আবাসিকে কোরিয়ানদের নেতৃত্বে বিশ্বসংঘে ১০০/১০০ গজ প্রস্থ এবং ১৫০/১৫০ গজ দৈর্ঘ্যের সমান লম্বা প্রান্তরে বিশাল মহিষের ভূড়ির বর্ণনা শুনি সেটা সেই জাদুবাস্তবতায়। এই বর্ণনাও আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে থাকে যেমনটা হয়ে থাকে সব সফল জাদু বাস্তবতার গল্পে-উপন্যাসে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বা শহীদুল জহিরের উপন্যাসে। মার্কেজের কথারই যেন সত্যতা দেখি লেখকের বর্ণনায়। জাদু বাস্তবতা বুঝাতে মার্কেজ যেমন বলেন-’ আকাশে হাতি উড়ছে বললে মানুষ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন ৪২৫টি হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ বিশ্বাস করলেও করতে পারে’। ‘আগস্ট আবছায়া’র লেখক যখন সংখ্যা দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বর্ণনা করেন তখন পাঠক হিসাবে আমরাও যেন বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক দোলনায় দুলতে থাকি।

পাঁচ।।।।।

উপন্যাসের নায়ক প্রফেসরের দু’জন বান্ধবী আছেন। তিনি অবিবাহিত। দু’জনের সাথেই তার সম্পর্ক একই সাথে, এবং কোনটাই ‘প্লেটোনিক লাভ’ নয়। একজন তার কাছাকাছি থাকেন, তার ছাত্রী এবং বয়সের পার্থক্যও অনেক। একই সাথে দু’জন নারীর সাথে একই জনের সম্পর্ক থাকাকে ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া বুর্জোয়া মূল্যবোধের সাথেই যেখানে সঙ্গতিহীন, সেখানে বামপন্থী সাহিত্য বোদ্ধারা যে ভুরু তুলে, নাক কুঁচকে, প্রফেসরকে তুলোধুনো করবেন তাদের ‘নৈতিকতার চাবুকে’ সেটা অনুমেয়। ‘আগস্ট আবছায়া’র লেখকের ‘ইভান তুর্গেনেভ’ প্রীতি তার লেখায় বিবৃত। সেই তুর্গেনেভের একটি কম পঠিত বা অখ্যাত একটি ছোট গল্পের নাম ‘আন্দ্রেই কলোসভ’। লেনিন নিয়ে লেখালেখির কারণে এই গল্পটি আমাকে পড়তে হয়েছিল। কলোসভ একটি মেয়েকে ভালবাসতো। ভাল সম্পর্ক থাকতেই সে মেয়েটিকে ছেড়ে যায় এবং আরেকটি সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু লেনিনের স্ত্রী নাজেদদা ক্রুপ্সকায়ার ধারণায় লেনিন কলোসভের প্রেমকে ‘বিপ্লবী’ মনে করতেন। কেননা কলোসভের এই প্রেমের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন ‘প্রেমের শুচীতা’। কেন? কারণ কলোসভ তার নতুন ভালবাসার জন্য যে বদনাম বা কলঙ্ক তাতে দমে যায়নি। যখন একজন বুঝতে পারে পুরাতন সম্পর্ক তার হৃদয়কে পূর্ণ করতে পারছে না, তখন সেই সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে আসতে পারলেই সে কেবল বুঝতে পারে ‘প্রেমের শুচিতা’ জিনিষটি কেমন। ম্যাড়মেড়ে, একঘেয়ে সম্পর্ক যারা টেনে চলে তাদের পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। আর এই কারণেই লেনিন ও ক্রুপস্কায়া গল্পটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। কিন্তু এখানেও তো সেই এক পুরুষ, এক নারীর সম্পর্ক, একই সময়ে। অথচ ‘আগস্ট আবছায়া’র নায়কের একই সাথে সম্পর্ক দুই নারীর, আর আমরা জানতে পারি সেই দুই নারীর একজন, মেহেরনাজও বহুগামী আর সুরভী তার শারিরীক উত্তেজনা মেটায় ‘সেক্সটয়’ দিয়ে। নারী-পুরুষ সম্পর্কে উপন্যাসের কোথাও তাই ফরাসী বিপ্লব প্রসূত এক নারী এক পুরুষ বা বিপ্লবী ‘প্রেমের শুচীতা’ রক্ষিত হয়নি। আর ধর্মীয় মূল্যবোধের দিক থেকে উপন্যাসের আরেক চরিত্র সরফরাজ নেওয়াজদের শাসানি, সামাজিক শাসনে প্রফেসর-মেহেরনাজ নিয়ে বসুন্ধরায় পোস্টারিং তো আছেই। কিন্তু প্রফেসর নিজেও কি নারী পুরুষ সম্পর্কের ধারণায় সেই মূল্যবোধের প্রভাব থেকে মুক্ত? নাকি প্রেমের সম্পর্কের সূতো ঢিলা হবার মূহুর্তে একটি অসফল এবং আপাত নিরানন্দ যৌনক্রিয়া শেষে অসুখী মেহেরনাজকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আমাদের সেই ধারণাকে শক্ত ভিত্তি দিলেন? নাকি প্রফেসর নিজেও মনে করেন একই সাথে বহু নারীর সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে? আর সেটাই যদি হবে তবে মেহেরনাজের বহুগামিতায় প্রফেসর বিমর্ষবোধ করেন কেন? আমরা দেখি লেখক যেন প্রফেসরের সম্পর্ক কোন নৈতিকতা বা মূল্যবোধের দঁড়ি দিয়ে বাঁধতে চাননি। আর তাই দেখি মেহেরনাজের সাথে বিছানায় যাওয়া আর সুরভীর সাথে ফোনসেক্স চলে কাছাকাছি সময়ে ।

দু’জন মানুষ ভালবাসলেই কি এক হয়ে যেতে পারে? কোন Gap কি থাকে না? সেই গ্যাপ কি শুধু স্থানিক যেমনটা সুরভীর সাথে? আমার ব্যক্তিগত মত পাশাপাশি বিছানায় থাকা দু’টো মানুষের মধ্যেও একটা গ্যাপ বা ফাঁকা জায়গা থাকে। সেটা যেমন একটা ‘বাফার’, কিছুটা স্বাস্থ্যকর, আবার একই সাথে সেই গ্যাপটাও মাঝে মাঝে ভরতে হয়। তাই সুরভী সেই ‘গ্যাপ’ পূরণের উপায় হিসাবে ব্যবহার করে গান, পাশ্চাত্যের গান। আর মেহেরনাজ ও প্রফেসর ব্যবহার করে ফুল, লতা, পাখি, বিভূতিভূষণ, কাফকা, প্রুস্তু, বোর্হেসকে।

ছয়।।।।।।

‘আগস্ট আবছায়া’র লেখক মাসরুর আরেফিন বলেছেন যে ১৫ই আগস্ট নিয়ে তাঁর obsession গত ৩০ বছরের। উপন্যাসটি লিখে সেই ‘ঘোর’ বা ‘আবিষ্টতা’ থেকে তিনি মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু যে মানুষ ত্রিশ বছর ধরে একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ রকম ‘ঘোর বা আবেশের’ মধ্যে থাকে তাঁর সংবেদনশীলতা সাধারণ মাত্রার নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। সেই ঘোর কাটাতে, নিজের ভিতরের অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতে যে উপন্যাসটি তিনি লিখলেন, অথবা বলি যে লেখাটা একদিন শুরু হয়ে শেষ হলো তার মধ্য দিয়ে তিনি কী সেই obsession থেকে মুক্তি পেলেন? আমার মনে হয় এই আপাত মুক্তি অন্য একটি ‘ঘোর’ বা obsession এর মধ্যে লেখককে ঠেলে দিয়েছে। আর দিয়েছে বলেই ‘আগস্ট আবছায়া’র মধ্যেই লেখক বলছেন ‘টুঙ্গিপাড়ার সেই বিদ্রোহের’ কথা। যার নেতৃত্বে ছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে বৈকুন্ঠ। ইতিহাসের কোন একটি ঘটনা যাঁকে obsessed করে, তিনি সেই obsession থেকে মুক্ত হন আরেকটিতে আবিষ্ট হতে। তাই লেখককে লিখতেই হবে ‘টুঙ্গিপাড়ার বিদ্রোহ’। আর আমরা প্রতীক্ষা করবো বৈকুন্ঠের পাশাপাশি মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমের জন্য, যিনি সেনাবাহিনীর বেয়নটের মুখেও বঙ্গবন্ধুকে পাকছাপ ও জানাজা না পড়িয়ে দাফন করতে দিবেন না। নিশ্চিতভাবেই আমরা জানবো সেই ১৫ই আগস্ট রাতে হারিকেনের স্বল্প আলোয় বুক ভাঙা কান্না নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতাটি লেখা হবে। লিখবেন মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম। আর এটাও জানবো যে, কবিতাটি তিনি লিখবেন আরবীতে। আমরা আরো জানবো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দ্বিতীয় কবিতাটি লিখবেন আরেক বাংলাদেশী উর্দু কবি, যিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে জহরলাল নেহরুকে নিয়ে ‘ভিক্ষুক’ নামের একটি কবিতা লিখে হুলিয়া মাথায় নিয়ে ইন্ডিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৫১ সালে। আমরা দেখবো কবি আসাদ চৌধুরীর অনুবাদে কবি নওশাদ নূরী ১৯৭৫ সালের ১৭ই আগস্ট তাঁর ‘নজমে টুঙ্গিপাড়া’য় লিখবেন,

“সহজ সরল গাঁয়ের মানুষ

মতলব-পাঁকা ঝানু বিশারদ

বস্তিতে থাকা বস্তিবাসীরা

রাজনীতি-বিশেষজ্ঞবৃন্দ

তোমরা কি জানো, তোমরা কি জানো?

পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,

পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে।

হে আমার প্রিয় অবোধ শিশুরা

যুদ্ধ-মাঠের অবোধ সেনানী

শক্ত বাজুর নৌকার মাঝি

মুক্ত দেহাতি নওজোয়ানেরা

তোমরা কি জানো, তোমরা কি জানো?

এইখানে থির ভূমিকম্পের গাছ

অগ্নিগিরির চারা আছে সাথে বোনা।”

সাত।।।।।।।

আপনি যদি পপকর্ণ খেতে ভালবাসেন তবে আমার সাথে একমত হবেন যে সেই ভাললাগাটার জন্য আপনার ‘চোয়াল’ এক সময় ব্যথা করবে। কারণ পপকর্ণ তো আর গিলে খাওয়া যায় না, চিবোতে হয়। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের গদ্যটাও গিলে খাবার নয়, উপন্যাসের ভাষার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেই চিবানোতে। পাঠককে আরাম দেয় না বটে তবে চিবানো শেষ হলে খাওয়ার পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায়। কমা, সেমিকোলন দিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার কখনও এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেকটা জুড়ে যে দীর্ঘ বাক্য তাতে ‘লিটল ম্যাগ’ চর্চার কিছুটা গন্ধ থাকলেও ভাষার উপর লেখকের গভীর দখলই নির্দেশ করে। আবার একই সাথে রবীন্দ্রনাথ যেমন ধূর্জটিপ্রসাদের উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তোমার পাত্ররা তোমার মতই চিন্তাশীল’, ঠিক তেমনি এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোও চিন্তাশীল এবং শিক্ষিত। সরফরাজ নেওয়াজের মতো মানুষগুলোকেও তাই বিদেশী ডিগ্রিধারী হতে হয়। উইলিস বার্নস্টেইনও কাব্যমোদী হয়, মার্সেল প্রুস্তু পড়ে। আর তার পাঠানো এলিজাবেথ বিশপের কবিতাটির তাৎক্ষণিক অনুবাদটি দেখে ব্রাত্য রাইসু কমেন্ট করে ‘ভয়ংকর’ বলে। আবার অস্ত্র ব্যবসায়ী ইব্রাহিমও সেখানে কোন হেলাফেলার নয়।

উপসংহারঃ

এভাবেই গোটা উপন্যাসটিকে আমার ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ এর আরেকটি সফল দলিল মনে হলো। আর সেই উপন্যাস পাঠের আনন্দ পেতে পাঠক হিসাবে আমাকে ডালিমের শক্ত খোসা ছাড়িয়ে শত শত দানা, আবার দানার ভিতরে শক্ত বীজের সন্ধান করতে হলো। মাসরুর আরেফিন এর এই উপন্যাস তাই টুক করে গিলে ফেলার নয়, উপন্যাসটি পাঠ করতে পাঠককে হয়তো চিবানোর প্রস্তুতি লাগতে পারে। চোয়াল ব্যথা হতে পারে তবে সব শেষে পাঠক ডালিম খাবার পরিপূর্ণ আনন্দ পাবেন বলেই বিশ্বাস করি। বাংলা সাহিত্যে ‘চৈতন্যপ্রবাহী’ উপন্যাসের ধারায় ধূর্জটিপ্রসাদের ঐ তিনটি লেখা এবং বুদ্ধদেব বসু ‘তিথিডোর’ এর পর ‘আগস্ট আবছায়া’ নিঃসন্দেহে আরেকটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আর তাই কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো করে বললে বলতে হয়, এরকম একটি লেখা এই সময়ে শুধুমাত্র মাসরুর আরেফিন এর পক্ষেই লেখা সম্ভব।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top