চিনুয়া আচেবের সাক্ষাৎকার।। অনুবাদ: মহসীন আলম শুভ্র

আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের পুরোধা চিনুয়া আচেবের জন্ম ১৯৩০ সালে পূর্ব নাইজেরিয়ায় । বাবা-মায়ের  ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম । তিনি ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতকদের  একজন। লেখাপড়া শেষে  নাইজেরিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে রেডিও প্রযোজক ও এক্সটারনাল ব্রডকাস্টিং এ পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া, তিনি ডেভিড এন্ড মারিয়ানা ফিশার বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তাঁর লেখালেখির শুরুটা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময়। গ্রন্থের সংখ্যা বিশটিরও বেশি। রচনা করেছেন বহু ছোট গল্প, প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্য আর পাঁচটি উপন্যাস । উপন্যাসগুলোর মধ্যে থিংস ফল এ্যাপার্ট (১৯৫৮), নো লংগার এট ইজ (১৯৬০),  এ্যারো অব গড (১৯৬৪) অন্যতম। ২০০৭ সালে থিংস ফল এ্যাপার্ট উপন্যাসের জন্য পান ম্যান বুকার পুরস্কার। মোটাদাগে তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে  ঔপনেবেশিক সময়ে ইবো সমাজের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, নাইজেরিয়াতে খ্রিস্টীয় আগ্রাসন, আফ্রিকা ও পশ্চিমাদের মধ্যে প্রথাগত দ্বন্দ্ব এবং কীভাবে পশ্চিমারা আফ্রিকানদের চিত্রিত করত সে বিষয়টি। আফ্রিকান সাহিত্যে তাঁর মূল অবদান ধরা হয় একটি সাহিত্যিক মানদণ্ড তৈরি যা তার পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্য চর্চায় বড় ভূমিকা রেখেছে। তিনি ২০১৩ সালের ২১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ইন্তেকাল করেন।

আচেবের এই সাক্ষাৎকারটি নেন জেরমি ব্রুকস্। ১৯৯৪ সালের শীতকালে। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় দুই কিস্তিতে। প্রথমটি জানুয়ারি মাসের এক ঠাণ্ডা ও বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় উনটেনবার্গ পোয়েট্রি সেন্টারে। আর দ্বিতীয়টি লেখকের বাড়িতে। সাক্ষাৎকারটির একাংশ এখানে তরজমা করা হলো।

আপনি কি আমাদের আচেবে পরিবার, ইগবো গ্রাম, আপনার প্রথমিক শিক্ষা এবং এমন কিছু যা লেখালেখির শুরুটাতে প্রেরণা দিয়েছিল সে সম্পর্কে বলবেন?

আমি মনে করি যে জিনিসটি আমায় প্রেরণা দিয়েছিল তা হল গল্পে আমার আগ্রহ; নেহাত গল্প লেখা না।  কারণ ঐ ক্ষেত্রে গল্প লেখা সত্যিকার অর্থে টেকসই না। তাই এটা সম্পর্কে তুমি ভেবো না। কিন্তু আমি জানতাম যে আমি গল্প ভালবাসি, গল্প আমার পরিবারেও বলা হতো। প্রথমে আমার মা, তারপর আমার বড় বোন বলত। যেমন, কচ্ছপের গল্পটি। তাদের গল্পের অংশগুলো যাই হোক, আমি তাদের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে আর অতিথিরা আসলে তাদের পাশে বসে কথোপকথন থেকে বিষয়গুলো জমাতাম। যখন আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করি তখন আমি গল্প পড়তে ভালবাসতাম। গল্পগুলো একটু ভিন্নতর হলেও তা ভালবাসতাম । আমার এলাকায় আমার পরিবার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারীদের মধ্যে  প্রথমদিককার। তারা শুধু ধর্মান্তরিত নন, আমার বাবা ধর্মপ্রচারক ও ধর্মের শিক্ষক ছিলেন। বাবা ও মা পঁয়ত্রিশ বছর ইগবোল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে “গসপেল” এর বাণী প্রচার করেছেন। ছয় সন্তানের মধ্যে আমি ছিলাম পঞ্চম। যখন আমি বড় হচ্ছিলাম তখন আমার বাবা এ কাজ থেকে অবসর নিয়ে পরিবারসহ পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরে আসেন। যখন আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করি এবং পড়তে শিখি, তখনই  অন্যদের গল্প ও ভূমির সম্মুখীন হই। আমি আমার এক রচনায় লিখেছি যেগুলো আমায় আকর্ষণ করত। এমনকি আফ্রিকাতে বসবাস করা একজন যাদুকরের অদ্ভুত কর্মকাণ্ড যেমন একটি চেরাগ খুঁজতে চীন দেশে যাওয়া। এসব আমায় আকর্ষণ করতো কারণ এগুলো ছিল দূরের আর অলৌকিক।

তারপর আমি বড় হয়ে এডভ্যাঞ্চার ধরনের লেখা পড়তে শুরু করি যেখানে আমি জানতাম না যাদেরকে শেতাঙ্গরা বুনো পশু বলে শিকার করতো আমি সেই পক্ষের। আমি অবচেতনে শেতাঙ্গদের পক্ষ নেই কারণ তারা সুন্দর! অসাধারণ! বুদ্ধিমান! অন্যরা না। অন্যরা বোকা আর কুৎসিত। এভাবেই আমি আমার নিজের গল্প না থাকার বিপদের সাথে পরিচিত হই। একটা বিখ্যাত প্রবাদ আছে যে, সিংহের যখন নিজের ঐতিহাসিক নেই, তখন শিকারের ইতিহাসই শিকারিকে মহামান্বিত করে। এটা আমি বুঝেছি অনেক পরে। এক সময় আমি বুঝতে পারলাম আমাকে লেখক হতে হবে; আমাকে সেই ইতিহাস নির্মাতা হতে হবে। এটা একজন মানুষের কাজ না, একজন ব্যক্তিরও কাজ না। কিন্তু আমাদের কিছু একটা করতে হবে যেন শিকারের গল্পটা শিকারের বেদনা-যন্ত্রনার কথা বলে আর সিংহের বীরত্বের কথাও বলে।

আপনি ছিলেন ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েটদের একজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিককার সময়গুলো আপনার কেমন ছিল আর কী পড়েছিলেন? সেগুলো আপনার লেখালেখিতে কাজে লেগেছিল কিনা?

ঐ সময়ের দিক থেকে ইবাদান এক বিশাল প্রতিষ্ঠান। একদিকে এটি উপনিবেশিক অবস্থার প্যারাডক্স প্রকাশ করেছিল। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নাইজেরিয়াতে ব্রিটিশ কলোনির শেষের দিকে। যদি তারা কোনো ভাল কাজ করে থাকে তার মধ্যে ইবাদান একটি। ইবাদান শুরু হয়েছিল লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে। কারণ ব্রিটিশদের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কিছু করার সাহস তুমি দেখাবে না। তুমি শুধু কারো অধীনে লেগে থেকে শুরু করো। এক সময়ের অভিভাবকত্বের মধ্য দিয়ে যাও। আমরা ছিলাম ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ইবাদান অব লন্ডন। সেকারণে আমার ডিগ্রিটি লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে পাওয়া।  এভাবেই ঐ দিনগুলোতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যখন ইবাদান স্বায়ত্তশাসিত হলো, এটি হলো স্বাধীনতার একটি প্রতীক।

আমি শুরু করেছিলাম সাইন্স দিয়ে, তারপর ইংরেজি, ইতিহাস এবং ধর্ম। এই বিষয়গুলো আমার জন্য ছিল দরকারি আর রোমাঞ্চকর। ধর্ম অধ্যয়ন আমার জন্য ছিল নতুন ও উপভোগ্য। কারণ এতে শুধু খ্রিস্ট ধর্ম নয়; পশ্চিম আফ্রিকার ধর্মগুলোও আমরা পড়েছি। সেখানে আমার শিক্ষক ছিলেন ড. পারিন্দার যিনি বর্তমানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এ্যামেরিটাস প্রফেসর এবং এ বিষয়ে একজন পাওনিয়ার। তিনি দাহমি ও আফ্রিকাতে প্রচুর রিসার্চ করেছেন। এই প্রথম আমি সিস্টেমসমুহ আর তুলনাবিচার পাশাপাশি রেখে দেখতে সক্ষম হয়েছিলাম। সত্যিকার অর্থে তা ছিল উদ্দীপনামূলক। আমি ঐ ধর্ম বিভাগের একজন প্রফেসরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলাম। তার নাম জেমস ওয়েলস, যিনি রাজা পঞ্চম জর্জের ধর্মোপদেষ্টা, বিবিসির ধর্মোপদেষ্টা ও বাগ্মী ধর্মপ্রচারক। একবার তিনি আমায় বললেন, তোমরা যা চাও ও প্রয়োজন তা আমরা তোমাদের দিতে সক্ষম নই; আমরা যা জানি তা তোমাদের শেখাতে পারি। আমি ভাবলাম যে এটা অসাধারণ। সত্যি আমার শিক্ষার মধ্যে এটি সেরা ছিল। এ ধরনের ভাব ছাড়া আমি প্রয়োজনীয় আর কিছু শিখতে পারিনি; আমি নিজে নিজেই এর পিছনে ছুটেছি। আমি যেদিকে ইঙ্গিত করছি তার একটা ভাল উদাহরণ হতে পারে ইংরেজি বিভাগ, যারা যে কেউ লেখক হতে পারে এমন ধারণায় হাসত। মনে পড়ে একবার বিভাগীয় পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হল, তারা একটা নোটিশ দিল যে, বিভাগীয় পুরষ্কারের জন্যে লম্বা ছুটির উপর একটা ছোট গল্প লেখো। আমি আগে কখনো ছোট গল্প লেখিনি। যখন আমি বাড়ি গেলাম, আমি ভাবলাম, ভালোইতো; লেখা যায়। আমি একটা লিখলাম তারপর জমা দিলাম। কয়েক মাস গেল, শেষে বোর্ডে রেজাল্ট ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, কোনো জমা লেখাই স্ট্যান্ডার্ড না, তাই কোনো পুরষ্কার দেওয়া হবে না। তবে তারা আমার গল্পের উল্লেখ করল। এক হাতে কুপি ধরে নাচতে নামার মতো ইবাদান ঐ সময়ে ছিল না, এটা ছিল পুরো শরীর দুলিয়ে নাচার মতো। কাজেই ইবাদান (বিশ্ববিদ্যালয়) যখন তোমাকে বলেছে উল্লেখ করার মতো কিছু, সেটাই অনেক কিছু। যে পুরষ্কার প্রদান পরিচালনার দায়িত্বে আছে, আমি সেই লেকচারারের কাছে গেলাম। বললাম, আপনি বলেছেন আমার গল্পটি বেশি ভাল না তবে ইন্টারেস্টিং; এখন সমস্যাটি কোথায়? সে বলল, সেটা হলো, গল্পের আঙ্গিক। তখন আমি বললাম, আচ্ছা! আপনি কি আমায় এটি সম্পর্কে বলতে পারবেন? সে বলল, হুম, তবে এখন না। পরে আমায় মনে করিয়ে দিও, বলব। এটা পুরো সময় নিয়ে নিল; যখন তার সাথে দেখা হয়, আমি বলি, আমাকে কি আঙ্গিক সম্পর্কে বলবেন? সে বলে, এখন না; আমরা পরে কথা বলব। তারপর একেবারে শেষের দিকে সে আমায় বলল, আমি তোমার গল্পটি পড়েছি আবার; সত্যিকার অর্থে আমি কোনো ভুল খুঁজে পাইনি। তাহলে যা হলো! তা হলো আমরা ছোট গল্প সম্পর্কে যা শিখেছি তাই। তুমি তোমার মতো চলো এবং লেখে যাও।

যখন আপনি লেখাপড়া শেষ করলেন,তখন  নাইজেরিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের সাথে জড়িয়ে যান।

আমি এটা প্রফেসর ওয়েলস এর সহায়তায় পেয়েছি। আমি ক্যাম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে একটা স্কলারশিপ খুঁজছিলাম কিন্তু তা হলো না। তারপর হলো ব্রডকাস্টিং ডিপার্টমেন্ট যা নাইজেরিয়াতে নতুন শুরু হয়েছে, যার অনেক শ্রোতা। এভাবেই আমি সেখানে ঢুকি। এটা একারণে না যে আমি ব্রডকাস্টিং এর চিন্তা করছিলাম বরং কলেজ ছাড়ার পর আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আজ যখন আমি এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভাবি, বিস্মিত হই যে, তারা প্রথম দিন থেকে জানে কী হচ্ছে। আমরা জামতাম না। শুধু কচ্ছপের মতো হেঁটেছি। ভাগ্যিস, কাজ হয়েছিল। সেখানে আমাদের বেশি জন ছিল না। তুমি কাজটা আজ হলে করতে না, টিকতেও পারতে না। আমি ঢুকলাম; তারপর আবিষ্কার করলাম আমি যে বিভাগে কাজ করি- বাচিক বিভাগ তা সত্যিই অনুকূল ছিল। এটাই আমি চেয়েছিলাম। আমি স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা করতাম। গণকথন, তারপর ছোট গল্প সম্পাদনা। সত্যি আমি সম্পাদনা আর ছোট গল্পে মজে গিয়েছিলাম। বিষয়গুলো নব্য স্বাধীন হওয়া দেশটাতে দ্রুত ঘটছিলো আর আমার এই উৎসাহ শীঘ্রই তদারকিতে উন্নীত হলো।

আপনার প্রথম দুই বইয়ের নাম “Things Fall Apart” ও “No Longer At Ease” একজন আইরিশ আর আমেরিকান কবির থেকে নেওয়া। অন্য যারা ব্ল্যাক লেখক; ধরুন, পল মার্শাল ইয়েটস থেকে নিয়েছেন। আমার মনে হয়, ইয়েটস ও ইলিয়ড আপনার প্রিয় কবিদের অন্যতম।

হুম, তারা। আসলে আমি বেশি একটা নেইনি। অন্য কিছুর চেয়ে আমি লোক দেখিয়েছিলাম বেশি। যেমন তোমায় বলতে পারি, আমি একটা ডিগ্রি নিয়েছি, ইংরেজি বিভাগ থেকে। আর তুমি প্রমাণ হিসেবে তাই দেখাতে। কিন্তু আমি ইয়েটসকে পছন্দ করি- বুনো আইরিশম্যান। সত্যি আমি তার ভাষার মোহ আর প্রবাহে মোহিত থাকতাম। আমার কাছে মনে হতো তার বিশৃঙ্খল আইডিয়া একজন কবির জন্যে ঠিক। তিনি সবসময় ঠিক জায়টায় ছিলেন। তিনি একগুঁয়ে, কিন্তু তার মন ছিল সবসময় ঠিক। তিনি সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখেছেন। আমি যে ধরনের যাদু দেখেছি, এটা ছিল সে ধরনের। আমার মাথায় যা আসতো, যা শুনতে ইন্টারেস্টিং লাগত তাই লাইন আকারে সাজাতাম। ইয়েটস ছিল আমার কাছে সে ধরনের মানুষ। তার অনেক পরে আমি আবিষ্কার করলাম তার “Theory of Circle” বা “ Circle of Civilization” তত্ত্ব। যখন নাম দেওয়ার সময় এলো আমি এটার কথা একেবারেই ভাবিনি। “Things Fall Apart” শব্দবন্ধনী আমার কাছে ঠিক আর যথার্থ মনে হলো।

টি.এস. ইলিয়ড ছিলেন পুরোপুরি ভিন্নরকম। ইবাদনে তাকে আমার পড়তে হয়েছিল। তার ছিল এক ধরনের যাজকিয় পাণ্ডিত্য-বাগ্মিতা। কিন্তু তা অন্য ধরনের। একটা ভ্রমের প্রতি পাণ্ডিত্য। কিন্তু আমার মনে হয় আমি “No Longer at Ease’’ কাব্যনামটি যে কবিতা থেকে নিয়েছি, Three Magi সিরিজের একটি, তা ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি। যে মানুষগুলো দেশ ছেড়ে গেল আবার ফিরে আসলো তারাই “No Longer at Ease’’। আমি মনে করি সাধারণ ভাষা ব্যবহার করাই বড় কিছু; এমনকি যখন বিস্তৃত, ধাবমান আর ধারালো বিষয়ও বলা হয়। তুমি লক্ষ্য করবে এই দুইটা নামের পরে আমি আর এমন করিনি।

আমি আপনার ইংরেজ প্রকাশক অ্যালেন হিলকে বলতে শুনেছি কীভাবে আপনি “Things Fall Apart” এর পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছিলেন।

সে এক লম্বা কাহিনি। প্রথমত কীভাবে পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে গেল সেটা। ১৯৫৭ সালে আমি লন্ডন গিয়ে বিবিসিতে স্টাডি করার একটা স্কলারশিপ পেলাম। আমার Things Fall Apart এর একটা ড্রাফ্‌ট ছিল, আমি সাথে নিয়ে গেলাম। যখন আমি বিবিসিতে গেলাম, আমার বন্ধুদের থেকে একজন বলল, কেন তুমি এটা ফিলিপ্সকে দেখাচ্ছ না? বন্ধুদের মধ্যে দু’জন ছিল নাইজেরিয়া থেকে আসা। তো গিলবার্ট ফিলিপ্স ছিলেন বিবিসির সেরা উপদেষ্টাদের একজন। আমি বললাম, কী? না! এভাবেই কিছু সময় চলে গেল। ঘটনাক্রমে আমি বাধ্য হলাম এবং পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে ফিলিপ্সের হাতে দিলাম। তিনি সত্যিকার আগ্রহী ছিলেন না। তিনি কেনই হবেন? কোনভাবেই হোক এটা তিনি নিলেন, খুব মার্জিত ভাবেই নিলেন। আমার বাইরে তিনিই প্রথম ব্যক্তি বলা চলে; এটা খুব ইন্টারেস্টিং। মূলত তিনি এটা পড়ে এমন বোধ করলেন যে, তিনি আমাকে তা বলতে খুঁজলেন। আমি লন্ডনের বাইরে ভ্রমণ করছিলাম তখন। আমি কোথায় ছিলাম তিনি খুঁজে বের করলেন, হোটেলে ফোন করলেন, আমায় ফোন ব্যাক করতে বললেন। যখন আমি তা জানলাম, আমি মাটিতে পড়লাম। আমি ভাবলাম, মনে হয় সে পছন্দ করেননি। তারপর ভাবলাম তিনি যদি পছন্দ না করে থাকেন তাহলে কেন ফোন করলেন। সুতরাং তিনি পছন্দ করেছেন এমনটা হবে। যাইহোক, আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। যখন আমি লন্ডনে পৌঁছই, তিনি আমায় বললেন, এটা অসাধারণ! তুমি কি আমায় এটা আমার প্রকাশকদের দেখাতে দিবে? আমি বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই; তবে এখন নয়। কারণ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, এটার ফর্মটা ঠিক না।  তিনটা পরিবারের কাহিনি দেখাতে গিয়ে আমি প্রথম ড্রাফট বেশি গ্রাউন্ড কভার করে ফেলেছিলাম। সুতরাং আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার চূড়ান্ত কিছু করা উচিৎ, সত্যিকারে এটাকে আরো কিছু দেয়া উচিৎ। তাই আমি ফিলিপ্সকে বললাম, আচ্ছা আমি খুবই আনন্দিত, কিন্তু আমি এটাকে নাইজেরিয়াতে নিয়ে যেতে চাই এবং আবার চোখ বোলাতে চাই। আমি তাই করেছিলাম।

যখন আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম, আমি টাইপিং এজেন্সিগুলোর বিজ্ঞাপন দেখলাম; আমি জানতাম যে যদি তুমি একটা ভাল ইম্প্রেশন তৈরি করতে চাও, তাহলে তোমার পাণ্ডুলিপিটা ভাল করে টাইপ করা থাকা উচিৎ। তাই বোকার মতো আমি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটা মুড়িয়ে বিজ্ঞাপনে দেখা সেই টাইপিং এজেন্সিতে পাঠালাম। এটা ছিল সারা দুনিয়ায় থাকা একমাত্র কপি। তারা জবাব পাঠিয়ে বলল, আপনার পাঠানো পাণ্ডুলিপির জন্য ধন্যবাদ; আমরা এর জন্য বত্রিশ পাউন্ড মজুরি নেব। ঐ টাকাটা ছিল দুই কপির জন্য, এটা তাদের কাজ শুরু করার আগেই দিতে হতো। কাজেই আমি ব্রিটিশ পোস্টালে করে তাদের কাছে বত্রিশ পাউন্ড পাঠালাম। তারপর আমি আর সাড়াশব্দ পাইনি। সপ্তাহ যায়, মাস যায়। আমি তাদের শুধু লিখে যাই; উত্তর পাই না, একটা শব্দও না। আমি বেশ কাহিল হচ্ছিলাম। শেষে, আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম। আমার ব্রডকাস্টিং হাউজের বস ছুটিতে লন্ডন যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন অদম্য ইংরেজ মহিলা। আমি তাকে ব্যাপারটা বললাম। তিনি বললেন, আমাকে তাদের ঠিকানা ও নাম দাও। যখন তিনি লন্ডন পৌঁছলেন, তিনি সেখানে গেলেন। তিনি বললেন, এসব হচ্ছেটা কী! তারা বিস্মিত হলো। তাদের ধারণা ছিল, একটা পাণ্ডুলিপি এসেছে আফ্রিকা থেকে- ভাল! এটাকে নজরে রাখার মতো কেউ নেই। ব্রিটিশরা সাধারণত এমন আচরণ করে না। তুমি দেখবে এমনটা হয় না। কিন্তু  আফ্রিকা থেকে আসা কিছুকে অন্যভাবে ট্রিট করা হতো। কাজেই যখন Mrs. Beattie তাদের অফিসে গেলেন এবং বললেন যে কী হচ্ছে! তারা অবাক হয়ে গেলো। তারা বলল যে তারা এটা পাঠিয়েছিল কিন্তু কাস্টমস থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি বললেন, আমি কি চালান মেমোটা দেখতে পারি? তাদের কাছে কোনো চালান মেমো ছিল না। তখন তিনি বললেন, তাহলে এটা টাইপ করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে পাঠিয়ে দেন নইলে এটার জন্যে আপনাদের কথা শুনতে হবে। এই ঘটনার পরই আমি টাইপ করা “Things Fall Apart” পাণ্ডুলিপিটা হাতে পাই। দুই কপি না; এক কপি। কী ঘটেছিল তা জানিয়ে একটা চিঠিও না। আমার প্রকাশক আলেন হিল বিশ্বাস করতেন যে এটা শুধু অবহেলা ছিল। ঐ লোকগুলো এটা আমায় দিতে চায়নি আর তাদের দেওয়ার ইন্টেনশনও ছিল না। যাই হোক, যখন আমি এটা পেলাম, আমি হেইন্ম্যান প্রকাশনীতে পাঠালাম। তারা কখনো এর আগে আফ্রিকান নোবেল দেখেনি। তারা এ নিয়ে কী করবে তাও জানত না। কেউ একজন তাদের বলল, আচ্ছা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিকাল সায়েন্সের একজন অর্থনীতির প্রফেসর আছে যিনি সবেমাত্র এসব জায়গা থেকে ঘুরে এসে এসেছেন। তিনি এ ব্যপারে তোমাদের পরামর্শ দিতে পারবেন। ভাগ্যক্রমে, Don Macrae ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ প্রফেসর এবং একজন অসাধারণ মানুষ। আমি পরে তাকে জেনেছি। তো তিনি যে কোনও উপন্যাসের উপর এযাবৎ কালের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট লিখেছিলেন- মাত্র সাতটি শব্দে: যুদ্ধ থেকে সেরা প্রথম উপন্যাস। এভাবেই আমার শুরুটা হয়।

হেইন্ম্যান প্রকাশনী বিহ্বল ছিল যে কত কপি ছাপানো উচিৎ….. 

ও হ্যাঁ, তারা খুব খুবই কম ছেপেছিল। এটা একটা রিস্ক ছিল। এমন কিছু তারা আগে করেনি। তাদের ধারণা ছিল না যে কেউ এটা পড়তে চাইবে কিনা (আদৌ)। খুব দ্রুতই এটার প্রিন্ট আউট হয়ে গেল। এটা এভাবেই পড়ে থাকতো যদি না এলেন হিল সিদ্ধান্ত নিতেন যে তিনি জুয়ার চেয়েও বেশি কিছু খেলছেন এবং এই বইটির পেপারব্যাক এডিশন বের করছেন। অন্য প্রকাশকরা ভাবল এটা খ্যাঁপামো, এটা পাগলামো। কিন্তু সেটা ছিল কীভাবে আফ্রিকান লেখকের লেখাগুলো দৃশ্যত হলো। শেষের দিকে এলেন হিল সাহিত্যে একটা ফেরকা তৈরির জন্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একজন কমান্ডার হলেন। যেটা ছিল এই শতকে ব্রিটিশ সাহিত্যে সবচেয়ে বড় ডেভেলপমেন্টের একটি। কাজেই এটা ছিল একটা ছোট সূচনা কিন্তু এটা আগুন জ্বালিয়ে দিলো।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top