অসমিয়া কবিতা II মূল অসমিয়া থেকে অনুবাদ : বাসুদেব দাস

অসমিয়া কবিতা II মূল অসমিয়া থেকে অনুবাদ : বাসুদেব দাস

দেবপ্রসাদ তালুকদার 

অন্য একজন

প্রতিবারই নিপুণ সৈনিকের মতো
বিশ্বাসের হাতে হাত রেখে
ফিরে আসি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে
বিজয় পতাকার নিচে
ক্ষণিক বিশ্রামের সময়
কী এক কৌতূহলে
সবাই তাকায় আমার দিকে
আসলে আমি কতটা নিপুণ সৈ্নিক
জবাব দিতে পারি না
আমি আমার কাছে
বারবার লজ্জিত হই
আমি আমার কাছে
অন্য একটি আয়নার সামনে নিজেকে
নিবিঢ় ভাবে দেখার সময়

পাওয়ার সময়

পাওয়ার সোনালী সময়ের চেয়ে
খোঁজার পরিক্রমা দীর্ঘ হয়
যদিও না পাওয়ার হাতে সমর্পিত হয়
অনেকের জীবনের বহু সময়

ক্ষণিকের আনুষ্ঠানিকতার জন্য
পার করি সময়ের পরে সময়

একটা ফুল ফোটার জন্য
একটা ফল পরিপুষ্ট হওয়ার জন্য
যতটুকু সময়
ফলটা পেকে খসে পড়া
ফুলটা শুকিয়ে ঝরে পড়া পর্যন্ত
কতটুকু আর সময়।।

জোনমণি দাস

কবিতা

দুবেলার দুমুঠো ভাতই আমার কবিতা।
কবিতায় জীবন। সকালের আলো প্রতিদিন প্রতিনিয়ত আমাকে
যুদ্ধে ডাকে।দিনটির মজুরি দুসের চাল—
ক্যারিবেগে নিয়ে বিকেলে ফিরে আসি ঘরে।

বিছানায় মশারি উঠিয়ে রাত আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

হৃদয় কলমটাকে ডাকে –কলমটা আমাকে ।
কিছুই নেই আমার। অথচ সব আছে।তৃষ্ণায় জল ,
জলে আলো …..
দুর্দিনে ও শব্দ আমাকে ধনী করে রেখেছে।
জীবন প্রতিদ্বন্দ্বী । সময় যুদ্ধ। আমি যোদ্ধা।
চলার সারথি দুঃখ। দুঃখের সঙ্গী আমার ছায়া।
সময়ের শিলাস্তরে ভাতই আমার প্রথম কবিতা…

স্বপ্ন আমার দুই চোখকে দেখায় নি ধোয়া-ধূলির উপকূল।

সবকিছু বলার পরেও

সবকিছু বলার পরেও
না বলা থেকে যায় অনেক কথা
না বলা কথাগুলি তুমি কেন
বার বার জিজ্ঞেস কর

কীভাবে বলব কীভাবে বলি
পাথরের বুকেও যে আগুনের ভ্রূণ আছে
মাটির বুকেও যে উত্তাপ আছে
স্বপ্নের পাখির বাসাও একটা আছে
অন্ধের চোখে
সহজভাবে বলতে না পারা কথাগুলিই কবিতা
লিখতে না পারা অক্ষরগুলিই নীরবতা
মানুষই মানুষের প্রেম
রক্তই রক্তের শিকড়
কীভাবে বোঝাই তোমাকে
মাঠে ঢেউখেলা ধানের সাগর
মানুষের ঘাম ঝরে জন্মান

অর্চনা পূজারী

লেটার বক্ম

অনেকদিন ধরে ক্ষুধায় আতুর হয়ে আছে সে
নীরব নিঃসঙ্গতায়
করুণ হয়ে পড়েছে তার মুখ
বাড়ির যুবক হতে চলা ছেলেটি
একদিন একশোবার খুলেছিল
মুক্তোর মতো কয়েকটি অক্ষর
আছে নাকি গভীরে
চাকরিতে ঢোকার আগে
ছেলেটির পিতাও
প্রতিদিন একবার
স্নেহের চোখে দেখত তাকে
ঠোঁট জোড়া শুকিয়ে নীরস হয়ে
গায়ের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছিল
বাড়ির বুড়ো বারান্দায় বসে থাকার মতো
সেও ঘরের সামনে বসে ঝিমোয়
পথিকেরা উপহাস করে
কার এত সময় আছে
সাদা কাগজের বুকে
নীল কালিতে ভালোবাসার সাগর রচনা করে
আজকাল সবাই বোতাম টিপেই
আনন্দ অনুভব করে

ক্রমশ

কাজল রঙের পাহাড়টিতে
দিন প্রতিদিন
গুঞ্জরিত হয় সবুজ অরণ্য
যেভাবে
অমাবস্যার অন্ধকার গ্রাস করে নেয়
উজ্জ্বল জ্যোৎস্না
যেভাবে অসংখ্য পাতা ঝরে পড়ে -প্রতিটি ফাল্গুনে
বৈশাখে অসংখ্য ফুল ফোটে
আহ্নিক আসে
বার্ষিক আসে
পৃ্থিবীতে গতি আসে
নিরবচ্ছিন্ন সংঘর্ষে
দুটো পাথরের মধ্যে আগুনের ফুল ফোটে

বিরিঞ্চি রাভা

কী অপরাধ ছিল তার

একদিন দুপুরবেলা বোমা বিস্ফোরণে
তার মাথাটা খসে
রিকশায় ঝুলে রইল
স্থানীয় কায়দায় জনঅরণ্য ভেদ করে
ব্যাঙের মতো গলা-মুখ বাড়িয়ে
সে সকাল বিকেল আর রিকশা চালায় না
কী অপরাধ ছিল তার
লবণাক্ত ভেজা ছিল ঘাড়
দুচোখে ছিল উজ্জল সংগ্রামের আগমনী
পেটে ছিল ক্ষুধার কলকলনি
তার স্বপ্নগুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল
সে আবার গাইতে পারবে কি ফসলের গান
বেচারার মৃত্যুতে কেঊ দিল না শ্লোগান
শ্রমিকের সভাতেও উড়ল না শোকের নিশান

একদিন অরণ্যে

একদিন অরণ্যে
বন্য শুয়োরের মতো
গান গাইতে থাকার সময় ভুলে গেলাম
অরণ্যের সবুজ
অরণ্যের নিঃসঙ্গ দুঃখ
অনুভব করলাম
বুকের ভেতরে বাইরে
খণ্ড খণ্ড মেঘের আড়ালে
ঊড়ে যেতে দেখলাম
অরণ্যের একঝাঁক
স্মৃতির আহত বাতাস
শিকড়ের গন্ধে মাতাল হয়ে
অরণ্যে হারিয়ে এলাম
স্বপ্নের অঘরী প্রেমিকা

প্রাণজিৎ বরা

সমস্ত নীরবতার ওপারে

সেই যে বলেছিলে চোখে একটি সাগর আছে বলে
তারপর থেকে
ঠিকইতো,তারপর থেকেই
তোমার অদভুত নীরবতায়
শুকোতে শুরু করেছিল সাগর
তা নয়তো কি
তখনইতো মাণিকের অনুসরণ করে করে
এসে পৌছেছিলাম
এই মরুভূমির মধ্যভূমিতে
এখনও আরও আছে কি কিছু
সাগর সাগর মনে হওয়া?
দেবকান্তের মতো মিষ্টি ?
চোখের ঘুম তিতো।
তুমিও মিথ্যা।
জুগতের সমস্ত নীরবতার ওপারে
সত্যি কেবল কবিতা।।

বীজ

আরও একবার হঠাৎ সেই মরা নদীর তীরে আমি
দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার পায়ের নিচে
জল ভেঙে নেওয়া এবড়ো খেবড়ো
গ্রামের পথ, হাত আর পায়ের আঙ্গুলগুলি ধুলোয় ধূসরিত
চুলে শনশনে বাতাসের একটি নির্জন দূপুর

আমি অপেক্ষা করেছিলাম।
আমার দিকে তাকিয়েছিল নদীতীরের শিমূলের
লাল লাল বড় বড় ফুলগুলি।
এবার হঠাৎ যখন আমাকে ঘিরে ধরল
সমস্ত ফুলগুলি
লাল হয়ে গেল আমার সমগ্র বুক
আর আমি ঝুলে রইলাম
ফুল হয়ে পাতা না থাকা গাছের ডালে ডালে
এখন অধীর হয়ে অপেক্ষা করছি কেবল সেই দিনটির জন্য
যেদিন বসন্তের বাউল বাতাস
আমার মাঝে বপন করবে একটি কালো বীজ

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top