উর্দু সাহিত্য পরম্পরা সিরিজ -৩ ।। জাভেদ হুসেন

আসরারুল হক মাজায:  ছায়াপথ পার হওয়া কবি

১৯৩৫ সাল। লক্ষৌ শহরের গোমতী নদীর পাড়। রাত বেশ গভীর। জনাপাচেক তরুণ কবি নদীর পাড় ধরে হাঁটছেন। সবারই বয়স পঁচিশ কী ছাব্বিশ, সবারই পা কিছুটা টলমল করছে। এই বন্ধুরা এবার এক হয়েছেন একটা কারণে। সে কারণ পরবর্তীতে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অসাধারণ প্রভাব ফেলবে। কিছুদিন পর লক্ষৌ শহরে প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন হবে। সেই কাজেই তারা আলীগড়, লাহোর, হায়দারাবাদ থেকে এসেছেন। এর মধ্যে যিনি সবচেয়ে প্রাণোচ্ছ্বল তিনি তাঁর নতুন কবিতা সুর করে পড়ে শোনাচ্ছেন গলা ছেড়ে।উর্দুতে কবিতা সুর করে পড়ে শোনানোর রেওয়াজ আছে। কবিরাই শোনান। একে বলে ‘তারান্নুম কে সাথ পড়না’।  তো সেই তরুণ কবির কবিতাটির নাম ‘আওয়ারা’।

গোমতী নদীর পারে বাঁধানো পথ হাওয়ায় সুর তুলছে:

য়ে রুপ্যাহলি ছাও মেঁ আকাশ পে তারোঁ কা জাগ
জ্যায়সে সুফি তাসাব্বুর জ্যায়সে আশিক কা খায়াল

আহা লেকিন কওন সামঝে কওন জানে জি কা হাল
এয় গমে দিল কেয়া করূ এয় ব্যাহশতে দিল কেয়া করুঁ

(এই রুপোলি ছায়ায় আকাশে তারাদের জেগে থাকা
যেন কোন সুফির ধ্যান, যেন ভাবনা কোন প্রেমিকের

কিন্তু হায়! কে বোঝে কে জানে এই হৃদয়ের কী হাল
হৃদয় বেদনা, কী করি, বলো হে হৃদয়ের পাগলামি, কী করি!)

মাজায সম্পর্কে আরও জানতে এই ভিডিও দেখতে পারেন

শুনতে শুনতে থমকে গেলেন যে কবি বন্ধুরা, তাদের মধ্যে আছেন লাহোর থেকে আসা ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, আলীগড় থেকে আলী সরদার জাফরি, হায়দারাবাদের মখদুম মহিউদ্দিন আর মুয়িন হাসান জাযবি। আর কবিতা পড়ছেন মাজায। এই চার বন্ধুকে মাজায তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আহংগ’ উৎসর্গ করেছিলেন। বলেছিলেন আমার ‘দিল ও জিগার’ সরদার আর ফয়েজ আর আমার দুই হাত মখদুম আর জযবীকে। উর্দুতে হৃদয় ভালোবাসার আর জিগার সেই ভালোবাসায় পাগল হতে পারার সাহসের প্রতীক।

পরিবারের দেয়া নাম আসরারুল হক। জন্মেছেন লক্ষৌর কাছে রুদৌলিতে ১৯ অক্টোবর ১৯১১ সনে। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় তিনি ছিলেন লক্ষৌর সবার প্রিয়, আজকের ভাষায় সেলিব্রিটি। ইসমত চুঘতাই ষাটের দশকে ‘মাজায’ নামে ষাট পৃষ্ঠার একটা ছোট বই লিখেছিলেন। তাতে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছিলেন লক্ষৌর গার্লস হোস্টেলে কেমন করে মেয়েরা মাজাযের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানের অভিনয় করতো।

সেই মাজায গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ১৯৩৬ সালে সবে প্রতিষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া রেডিওর জার্নালে সম্পাদক হবার আমন্ত্রণ পেয়ে যোগ দিলেন। দিল্লিতে মাজায নিজে এবার প্রেমে পড়লেন। মেয়েটি আগেই বিবাহিত। অনেক বড় ঘরের বউ। কবিতা আর কবির মাঝে মেয়েটি কবিতাকেই বেছে নিলো। কবি চাকরিতে মন বসাতে পারলেন না। লক্ষৌ ফিরে এলেন মাজায।

আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বা থেকে মাজায, জিগার মুরাদাবাদী, আলী সরদার জাফরী ও রাহী মাসুম রাজা

বিপ্লব আর হৃদয়বেদনা এক হলো। এর মধ্যে মাজায তরুণদের মাঝে বিপ্লবের কবি হিসেবে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁর ‘আওয়ারা’ নজমটি বিপ্লব পিয়াসী তরুণদের কাছে নিজেদের কবিতা হয়ে গেছে:

লে কে ইক চাংগেয কে হাথোঁ সে খনযর তোড় দুঁ
তাজ পর উসকে দাময়াকতা হ্যায় জো পাত্থার তোর দুঁ

কোয়ি তোড়ে য়া না তোড়ে ম্যায়ঁ হি বাঢ়কর তোড় দুঁ
এয় গমে দিল কেয়া করূ এউ বেহশতে দিল কেয়া করূঁ

(চেংগিজের হাত থেকে তলোয়ার নিয়ে ভেঙে ফেলি
তার মুকুটে ঝলমল করে যে রত্ন, ভেঙে ফেলি

আর কেউ ভাঙুক না ভাঙুক, আমিই গিয়ে ভেঙে ফেলি
হৃদয় বেদনা, কী করি, বলো হে হৃদয়ের পাগলামি, কী করি!)

উর্দু কাব্যের প্রথা ছেড়ে মাজায নারীকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখলেন। যে লড়াই তিনি নিজের বলে মানতেন, সেই লড়াইয়ে তিনি প্রিয়তমাকে সঙ্গে চলার ডাক দিলেন:

তেরি নিচি নযর খুদ তেরি ইসমত কি মুহাফিয হ্যায়
তু ইস নশতর কি তেযি আযমা লেতি তো আচ্ছা থা

তেরি মাথে কি য়ে আঁচল বহোত হি খুব হ্যায় লেকিন
তু ইস আঁচল সে ইক পরচম বানা লেতি তো আচ্ছা থা

(তোমার এই নত দৃষ্টি তোমার রক্ষক, মানলাম
দৃষ্টি তুলে যদি এর ধার যাচাই করে নিতে, ভালো হতো

তোমার মাথার এই আঁচল খুব সুন্দর, তবে
যদি একে এক পতাকা বানিয়ে নিতে, ভালো হতো)

আরেক ট্র্যাজিক চরিত্র গুরু দত্তের কথা যাদের মনে আছে, তারা তাঁর ‘পিয়াসা’ ছবির কথা ভুলতে পারবেন না। সেই ছবিতে এক দৃশ্যে দেখা যায় মাজায আর জিগার মুরাদাবাদি আসরে বসে আছেন। হাতে পানপাত্র। মাজায পড়ছেন:

এয় শওকে নাযারা কেয়া কহিয়ে নযরোঁ মেঁ কোয়ি সুরত হি নেহিঁ
এয় যওকে তাসাব্বুর কেয়া কহিয়ে হাম সুরতে জানাঁ ভুল গ্যায়ে

(হে দেখবার বাসনা, কি বলি, দৃষ্টির সামনে কোন দৃশ্যই নেই
ওগো ভাবনার স্পৃহা, কী বলি, আমি যে প্রিয়র চেহারাই ভুলে গেছি)

হিন্দি চলচ্চিত্র পিয়াসায় কবি মাজায এবং জিগার মুরাদাবাদী

চলচ্চিত্রের অংশটুকু দেখতে ক্লিক করুন

মাজায লক্ষৌ ফিরে বন্ধু সরদার জাফরি আর সিবতে হাসানের সঙ্গে ১৯৩৯ সনে উর্দু প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনের জার্নাল ‘নয়া আদব’ (নতুন সাহিত্য) সম্পাদনা শুরু করলেন। এই প্রভাবশালী পত্রিকাটিকে উর্দু প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনের তাত্ত্বিক ভিত্তি বলে গণ্য করা হয়। পত্রিকা এক যুগ টিকে ছিলো। রুশ বিপ্লবকে মাজায অনেক নির্মোহভাবে দেখেছিলেন। ‘খোয়াবে স্যাহের’ কবিতায় বলছেন:

যেহেনে ইনসানি নে আব উহাম কি যুলমাত মেঁ
যিন্দেগি কি সখত তুফানি আন্ধেরি রাত মেঁ

কুছ নেহিঁ তো কম সে কম খোয়াবে স্যাহের দেখা তো হ্যায়
জিস তরফ দেখা না থা আব তক উধার দেখা তো হ্যায়

(মানুষের মন শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের গভীর ঘুম থেকে
জীবনের এই নির্মম ঝঞ্ঝাময় রাতে জেগে তো উঠেছে

আর কিছু না হোক, ভোরের স্বপ্ন তো দেখেছে
যেদিকে তাকায়নি আগে, সেদিকে তো তাকিয়েছে)

উর্দু কবিরা প্রিয়ার কালো চুলের ফাঁদে নিজেদের জগতের সব রহস্য দেখতে পেতেন। মাজায ভিন্ন মত পোষণ করলেন:

বহোত মুশকিল হ্যায় দুনিয়া কা সাঁওয়ারনা
তেরি যুলফোঁ কা পেচ ও খাম নেহিঁ হ্যায়

(এই এলোমেলো দুনিয়াকে সাজানো অনেক কঠিন
এতো তোমার কালো চূলের কুঞ্চন নয়!)

মাজায উর্দুর কীটস বলে খ্যাত হলেন। সেই প্রক্রিয়া শুরু হলো ১৯৪৬ এর দাঙ্গার পর। দাঙ্গার বিভৎসতায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেরে উঠে সেই প্রাণোচ্ছ্বল মাজায চিরতরে হারিয়ে গেলেন। পানাভ্যাস আগে ছিলো। এখন আসক্তি হলো। জোশ মালিহাবাদী নিজে পানরসিক ছিলেন। মাজাযকে বলেছিলেন – একটু কম পান করো, আমি তো সামনে ঘড়ি রেখে এক ঘন্টায় এক পেগ পান করি। মাজায হাসি মুখে উত্তর দিয়েছিলেন – জোশ সাহাব, আর আমি সামনে ঘড়া (কলস) রেখে পান করতে বসি।

১৯৫০ এর দিকে মাজাযের মানসিক সন্তুলন খারাপ হতে লাগলো। সেই সময় নেশা ছাড়ানোর জন্য মানসিক হসপিটালে ভর্তি করা হতো। মান্টোও ভর্তি হয়েছিলেন। মাজাযও রাঁচিতে দাখিল হলেন। সেখানে দেখা হলো কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। একটু সামলে ফিরলেন। কিন্তু দ্রুত আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলেন। মাজায হয়ে রইলেন আগের মাজাযের ছায়া। কবিতায় শব্দ নিয়ে অনটনে ভুগতে লাগলেন। সেই সময় লিখেছিলেন:

ও রেগযারে খায়াল মে হ্যায় কাভি কাভি হামখিরাম মেরি
(সেই ভাবনার পোড়োজমি এখনো কখনো কখনো আমার সঙ্গে চলে)

১৯৫৫ সনে এক ছাত্র সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সরদার জাফরি লক্ষৌ এলেন ডিসেম্বর মাসে। পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে মাজায উচ্ছ্বসিত হলেন। তখন বলা এই শের বিখ্যাত:

হামদম য়েহি হ্যায় রাহগুযারে য়ারে খুশখিরাম
গুযরে হ্যায় লাখ বার ইসি কাহকাশাঁ সে হাম

(এই লীলাময় চলার পথে সেই তো সঙ্গী
লক্ষ বার এই ছায়াপথ পার হয়েছি আমি)

গজল অ্যা গাম-ই-দিল কেয়া কারু শুনতে ক্লিক করুন

মুশায়রায় আবার সেই পুরোনো মাজাযকে যেন পাওয়া গেল। সেই দিন মাজায বন্ধু সরদার আর সাহিরের সঙ্গে হোটেলেই ছিলেন। দিনের বেলায় তারা সতর্ক করে গেলেন বন্ধুকে, যেন অন্য কারো সঙ্গে বের হয়ে মদ খাওয়া শুরু না করেন। মাজায বার বার বললেন – একটু পরে যাও, আর কিছুক্ষণ একসঙ্গে থাকি। কাজ ছিলো। তাঁরা বের হয়ে পড়লেন। সন্ধ্যায় ফিরে দেখলেন মাজায কার সঙ্গে যেন বের হয়ে পড়েছেন। খোঁজ করে জানা গেল মাজায হাসপাতালে আছেন। সম্মেলন স্থগিত হলো। সবাই হাসপাতালে ছুটলেন।

মাজাযের সঙ্গে পান করবার লোকের অভাব ছিলো না। এমনই কেউ মাজাযকে নিয়ে লালবাগের এক পানশালায় খোলা ছাদে মাঝরাত পর্যন্ত পান করে তাঁকে উত্তর প্রদেশের তীব্র শীতে খোলা ছাদে একা রেখে চলে গেছে। সকালে ডাক্তার বললেন – ব্রেইন হেমারেজ আর নিউমোনিয়া। যার প্রেমে দিল্লি ছেড়েছিলেন, সেই নামেরই এক ভক্ত সারা রাত মাজাযের পাশে বসেছিলেন। সকালে আসরারুল হক মাজায গত হলেন। তখন বয়স ৪৪।

আসরার মানে রহস্য। মাজায নিজেকে চিনতেন। মানুষকে নিতান্ত যন্ত্র মনে করে যে বুদ্ধির ব্যবস্থা, তার বিরুদ্ধে ছিলেন বলেই বিপ্লবের পক্ষে ছিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে গেছেন এই বলে:

খুব প্যাহচান লো আসরার হুঁ ম্যায়
জিনসে উলফত কা তলবগার হুঁ ম্যায়

ইশক হি ইশক হ্যায় দুনিয়া মেরি
ফিতনায়ে আকল সে বেযার হুঁ ম্যায়

(ঠিক মতো চিনে নাও, আসরার আমি
আমি প্রেমের বাজারের খরিদ্দার

আমার জগতে প্রেম শুধু, আর কিছু নেই
বুদ্ধি নামের আপদের সাথে দুশমনি আমার)

নজম ইজনে-খিরাম লেতে হুয়ে শুনতে ক্লিক করুন

জোশ মালিহাবাদী বলেছিলেন – মাজায, তুমি এক ঝলকে জগতের সব সৌন্দর্য আর এক চুমুকে জগতের সব মদিরা পান করতে চাও! এ কথা মাজায নিজেও মানতেন। নইলে কেন লিখবেন:
ইস ম্যাহফিলে ক্যায়ফ ও মস্তি মে ইস অনজুমানে ইরফানি মেঁ
সব জামে বাকফ ব্যায়ঠে হি রহে হাম পি ভি গ্যায়ে ছলকা ভি গ্যায়ে

(এই আনন্দের, উচ্ছ্বলতার আসরে, এই বুদ্ধিমানদের ভীড়ে
সবাই পানপাত্র হাতে বসেই রইলো, আমি পানও করলাম, ছলকেও গেলাম)

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top