ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ আর আমি ।। হাইকেল হাশমী

সময়টা ১৯৬২ অথবা ১৯৬৩। আমার মনে আছে আমি আমার বাবার ঘরে কয়েকটা ছবি টাঙানো দেখতাম। নুরানী সুরতের রবি ঠাকুর, ঝাঁকড়া চুলের নজরুল, কালাকালি টুপি আর নকশী জুব্বা পরা মির্জা গালিব এবং আরও একটি অদ্ভূত ছবি ছিল। একটি ভাস্কর্যের মাথার ছবি। পরে জানতে পারলাম যে, ওটা উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ছবি। ফয়েজ’এর সাথে আমার সেই প্রথম পরিচয়৷ পরে আমার বাবা কবি নওশাদ নূরীর,যিনি নিজেও বিখ্যাত উর্দু কবি ছিলেন, কাছ থেকে জানলাম যে ফয়েজ প্রথম এশিয়ান কবি যিনি লেনিন শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৬২ সালে ৷ তাছাড়া ১৯৭৬ সালে ফয়েজকে সন্মানিত করা হয়েছিল “Lotus Prize for Literature” বা লোটাস পুরস্কার দিয়ে যেটা “Afro-Asian Writers’ Association” প্রদান করতো। ১৯৮৪ সালে ফয়েজকে “নোবেল” পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়৷ তিনি ওই বছরই মারা যান৷ তিনি জীবনে চার চার বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, আমার ব্যক্তিগত ধারণা তিনি তার বামপন্থী ধ্যান-ধারনার জন্য এই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত থাকলেন।

ওআইসি’র কনফারেন্স ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২২ – ২৪ ফেব্রুয়ারি৷ পাকিস্তান তখনো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি কিন্তু সদস্য হিসাবে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রিত ছিল৷ পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। OIC’র ওই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাবার জন্য অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এসেছিলেন, যেটুকু আমার মনে পড়ে তার মধ্যে আলজেরিয়ার হুয়ারী বুমাদিন, লিবিয়ার গাদ্দাফী, ইয়াসির আরাফাতের মত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। যা হোক, বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলনের যোগদানের পর জুন ১৯৭৪’এ জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশ সফরে এলেন।

একদিন আমার বাবা আমাকে বললেন,“ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এসেছেন ভুট্টো’র সফর সঙ্গী হয়ে এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে উঠেছেন। আমাকে ফোন করেছেন উনার সাথে দেখা করার জন্য, আমি ওখানে যাচ্ছি”। আমি তখন ফয়েজের কবিতা পড়তে আরম্ভ করেছি এবং উনি আমার একজন প্রিয় কবি হয়ে উঠেছেন। তার একটি গজল মেহেদী হাসান গেয়েছেন যেটা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, “গুলোঁ মেঁ রাঙ ভারে বাদ-এ-নও বাহার চালে”
গানটি শুনতে ক্লিক করুন
আমাদের ফেরদৌসী বেগম গেয়েছেন, “রাঙ পেয়রাহান কা খুশবু জুলফ লেহরানে কা নাম”
গানটি শুনতে ক্লিক করুন
যেটা একটি “মাস্টারপিস” গজল আর গায়কী। প্রসঙ্গত বলে রাখি, পরিচালক আখতার জং কারদার ১৯৫৯ জাগো হু সাবেরা নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ১৯৩৬ সালের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনিস, তৃপ্তি মিত্র, কাজী খালেক, জুরাইন লক্ষ্মী, ও মীনা লতিফ। ছবিটির সুরকার ছিলেন তিমির বরণ আর চিত্রগ্রাহক ওয়াল্টার লাসালি। ছবিটি ১ম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে স্বর্ণ পদক অর্জন করে।

আমি তাঁর গজল আর কবিতা পড়ে মুগ্ধ তাই আমিও বাবার সাথে যাবার জন্য আমার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। আমার বাবা রাজিও হলেন এবং আমি ফয়েজের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য উনার সঙ্গে গেলাম। একজন খুব ধীরস্থির, ভদ্র এবং নম্রভাষী লোকের  সাথে পরিচয় হলো এবং তিনি খুব স্নেহের সাথে আমাকে গ্রহণ করলেন। আমি এক পাশে সোফায় বসে তাঁদের আলাপ, হাসি আর স্মৃতিচারণ শুনলাম, প্রায় এক ঘণ্টা উনার সাথে অতিবাহিত করলাম। দুইজন, ফয়েজ আর আমার বাবা একে অন্যের কবিতা শুনলেন এবং শোনালেন। তারা একে অপরের বন্ধুদের খোঁজখবর নিলেন।

ফয়েজ আমার বাবাকে সৈয়দ মাহমুদ হাসানের একটি চিঠি দিলেন, ওই চিঠিটা এখনো  আমার কাছে আছে, যেখানে উনি আমার বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন উনার পাঞ্জাবির জন্য খাদি কাপড় এবং একটা মুজিবকোট ফয়েজের হাতে করাচী পাঠিয়ে দিতে। এখানে বলে রাখি মাহমুদ চাচা আমার বাবার পত্রিকা “জরিদা”র প্রকাশক  ছিলেন। ওই দিনই আমার বাবা ওই সামগ্রীগুলো কিনে ফয়েজকে দিয়ে এসেছিলেন। ফয়েজের সঙ্গে এটাই ছিল আমার প্রথম এবং শেষ দেখা। ঢাকা থেকে ফিরে ফয়েজ  একটি চমৎকার কবিতা লিখেছিলেন:

ঢাকা সে ওয়াপসী পর
হাম কে ঠাহারে আজনবী ইতনি মাদারতোঁ কে বাদ
ফির বনেঙগে আশনা কেতনি মোলাকাতোঁ কে বাদ
কব নজর ম্যেঁ আয়্গী বেদাগ সাবজে কি বাহার
খুন কে ধব্বে ধুলেঙ্গে কেতনি বরসাতোঁ কে বাদ
থে বহুত বেদর্দ লামহে খতমে দরদে ইশক কে
থিঁ বহুত বেমেহের সুবহেঁ মেহরবাঁ রাতোঁ কে বাদ
দিলতো চাহা পর শিকাসতে দিল নে মুহলাত হি না দি
কুছ গিলে শিকওয়ে ভি কর লেতে মুনাজাতোঁ কে বাদ
উনসে জো কাহনে গায়ে থে ফয়েজ জাঁ সদকা কিয়ে
অন্কাহী হি রহ গায়ী ওহ বাত সব বাতোঁ কে বাদ

ঢাকা থেকে ফিরে
এত অন্তরঙ্গ হয়েও আমরা এখন পরস্পর অপরিচিত
জানি না আর কত সাক্ষাতের পর পুনরায়
বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে ৷
কবে দেখতে পাব দাগহীন সবুজ বসন্ত,
কত বর্ষণের পর ধুয়ে মুছে যাবে
ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ৷
মন চেয়েছিল কিছু বলতে কিন্তু পরাজিত হৃদয় সময় দেয় নাই
কিছু অভিযোগ অনুযোগ করে নিতাম ক্ষমা প্রার্থনার পর ৷
প্রাণ উৎসর্গ করে তোমাদের যা কিছু বলতে গিয়েছিল ফয়েজ,
অনেক কিছু বলার পরও বলা হয়নি আমার না-বলা কথা ৷
অনুবাদ: জাফর আলম

আর একটি কবিতা “হাজর কারো মেরে তান কো” ফয়েজ লিখেছিলেন মার্চ ১৯৭১ সালে:

হাজর কারো মেরে তান কো (বাংলাদেশ – ১)
সাজে তো কইসে সাজে কাতল-এ-আম কা মেলা
কিসে  লুভায়েঙ্গে মেরে লাহু কা ভাভেলা
মেরে নাজার বদন ম্যেঁ লাহু হি কিতনা হ্যায়ে
চারাঘ হো কই রোশান না কই জাম ভারে
না ইস সে আগ হি ভারকে না উসসে পিয়াস বুঝে
মেরে ফিগার বদন ম্যেঁ লাহু হি কতিনা হ্যায়ে

আমার শরীর থেকে দুরে থেকো (বাংলাদেশ – ১) 
আমার শরীর থেকে দুরে থেকো
অলঙ্কৃত করবো তবে কি ভাবে করবো গণহত্যার শোভাযাত্রা
আমার রক্তের চিৎকার কাকে করবে আকর্ষিত
আমার দুর্বল দেহে কতটুকুই বা রক্ত আছে?
এতে জ্বলবে না একটি প্রদীপ
এতে ভরবে না একটি মদের পেয়ালা৷

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এর মেয়ে সেলিমা হাশমী ও লেখক হাইকেল হাশমী

মার্চ ২০১৩ সালে সেলিমা হাশমী, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের মেয়ে ঢাকা এলেন এবং ওই একই হোটেল শেরাটনে উঠলেন যার নাম বর্তমানে আবার পরিবর্তন করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল রাখা হয়েছে৷ উনার আগমনের খবর আমাকে উর্দু কবি আহমেদ ইলিয়াস দিলেন ৷ সেলিমা একজন নামকরা চিত্রকর, লেখিকা এবং একজন সচেতন সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী ৷ আমি উনার সাথে দেখা করার জন্য গেলাম এবং উনার শত ব্যস্ততার মধ্যেও উনি প্রায় এক ঘন্টা সময় আমাদের দিলেন৷ আমি উনাকে জানালাম যে আমি উনার বাবার সাথে একই স্থানে দেখা করেছি ১৯৭৪ সালে, তা শুনে উনি অনেক অবাক এবং খুশী হলেন৷

কিছু দিন আগে ফয়জের জন্মশত বার্ষিকী পালন করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে,বাংলাদেশেও  অনেকগুলো অনুষ্ঠান হয়েছে ৷ “কালি ও কলম” কয়েকটি প্রবন্ধ এবং কবির কবিতা দিয়ে এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল ৷ বিখ্যাত চিত্রকর মুর্তজা বশীর একটি বিরাট প্রবন্ধ লিখে ছিলেন যেটা ওই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ৷ মুর্তজা বশীর, ফয়েজের একজন খুব কাছের বন্ধু ছিলেন৷ আমি সেলিমাকে জিজ্ঞাসা করে ছিলাম যে, উনি ওই প্রবন্ধের সম্বন্ধে জানেন কি না? উনার উত্তর ইতিবাচক ছিল৷ ফয়েজের সাথে সাক্ষাতের সময় কোনো ক্যামেরা ছিল না তাই ছবি তোলা হয় নাই কিন্তু সেলিমার সাথে সাক্ষাতে আর এই ভূল করিনি, উনার সাথে অনেক ছবি তুলেছি এবং অনেক আলাপও করেছি৷

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top