‘আলথুসার’- দর্শন, রাজনীতি ও জটিল জীবনের নিটোল বয়ান।। আশানুর রহমান খোকন

এক।

লুইস আলথুসারের সাথে আমার পরিচয় খুবই সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। কিছুদিন আগে লেখক, অনুবাদক ও বিশিষ্ট ব্যাংকার মাসরুর আরেফিন বললেন যে, এই ঈদ মানে ২০১৯ সালে প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় তাঁর একটি উপন্যাস বের হচ্ছে, যার নাম-‘আলথুসার’। আমি বড় বড় চোখ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তিনি মাত্র দু’মিনিটেই তাঁর উপন্যাসের কাহিনিটুকু আমাকে শুনালেন এবং সেই চৌম্বক অংশটুকু শোনার পর আমি ভীষণ রকম আগ্রহী হই, কৌতুহলী হই স্বয়ং ‘আলথুসার’ ও তাঁর নামের উপন্যাসটির প্রতি।

গত দু’টো বছর আমি প্রধানত লেনিন নিয়ে পড়াশুনা করছি। আর এই সূত্রে ‘মার্কসিস্ট আর্কাইভে’ লেনিনের উপর লুইস আলথুসারের লেখা একটা প্রবন্ধ পড়ার সুযোগ পেলাম। সেই প্রবন্ধটির নাম ”Lenin and Philosophy”। অনেকদিন ধরে একটা প্রশ্ন আমার মগজে বাসা বেঁধে ছিল, উত্তর পাচ্ছিলাম না। আলথুসারের ঐ প্রবন্ধে সেই প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে গেলাম। এবার আমার প্রশ্নটি কি ছিল সেটা সংক্ষেপে বলা যাক।

১৯০৪ সালে লেনিন যখন জেনেভাতে তখন নিকোলাই ভ্যালেনতিয়েভ নামের এক তরুণ রুশ বিপ্লবীর সাথে লেনিনের বিরোধ বাঁধে। বিরোধের অন্যতম কারণ ছিল-ভ্যালেনতিয়েভের আগ্রহের কেন্দ্রে যতটা না ছিল রাজনীতি, তার থেকে বেশি ছিল দর্শন। তিনি লেনিনের সাথে দর্শন নিয়ে, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলাপে আগ্রহী ছিলেন, আর অন্যদিকে লেনিন তাকে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করতে চেয়েছিলেন। ফলাফল হিসাবে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ এবং ভ্যালেনতিয়েভ ১৯৬৮ সালে ‘Encounter with Lenin’ নামে যে বইটি লেখেন সেখানে অভিযোগ করেন যে, লেনিন দর্শন বা ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন না। আমার প্রশ্ন ছিল-লেনিন কেন দর্শন বা ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন না? সেই প্রশ্নটি আরো জোরালো হয়ে দেখা দিল, যখন জানলাম ১৯০৮ সালে লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি ক্যাপ্রিতে একটি স্কুল গড়ে তুলেছিলেন এবং সেখানে লেনিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বক্তব্য রাখতে। বামপন্থী এবং বলশেভিকদের নিয়ে গঠিত যে গ্রুপটির জন্য গোর্কি লেনিনকে আমন্ত্রণ জানান ইতিহাসে তারা ‘অটঝোভিস্ট’ নামে পরিচিত৷ আমন্ত্রণের উত্তরে লেনিন গোর্কিকে লেখেন,
‘প্রিয় আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ, আমি আপনার সান্নিধ্য পেতে ইচ্ছে করি কিন্তু আমি দর্শন নিয়ে কোন আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী নই’।

উপরের ঐ দু’টো ঘটনা আমার মধ্যে যে প্রশ্নের উদ্রেক করেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন লুইস আলথুসার মাত্র দুই লাইনে। তিনি বললেন যে, ‘দর্শন মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে, রাজনীতি বা বিজ্ঞান মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। আর লেনিন সেটা জানতেন খুব ভাল করেই, আর সে কারণেই দলীয় পরিমণ্ডলে তিনি দর্শন নিয়ে কথা বলতে চাইতেন না’। আলথুসার নিয়ে আমার আগ্রহের বাড়তি কারণ বোধ করি এটাও।

MAC2_4:ALTHUS.TIF

দুই।।

এবার অন্য কারণটি বলি। মাসরুর আরেফিন কিছুদিন আগেই তাঁর প্রথম উপন্যাসটি লিখেছেন, এটা তাঁর দ্বিতীয় প্রয়াস । আলথুসার নামের একজন দার্শনিকের নাম নিয়ে লেখা উপন্যাস, তাই বিস্মিত হই। নিজের পড়াশুনার পরিধিও যে অনেক ছোট সেটাও আরেকবার আবিস্কার করি। উপন্যাসের মধ্যে যে গল্পটি আছে, লেখক সেই গল্পটি আমাকে বলেছিলেন মাত্র দুই মিনিটে। সেই দুই মিনিটে বলা গল্পের মধ্যে অসংখ্য বাঁক ছিল, ছিল দার্শনিক-রাজনৈতিক অনেক প্রশ্ন। আগ্রহ তাই ডালপালা মেলছিল। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যাটা কিনলাম ‘প্রথমা’ থেকেই আরো কিছু বইয়ের সাথে। শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠি একটু দেরি করে। তারপর লেখাটি পড়তে শুরু করি। কিন্তু উপন্যাসটি পড়া শুরু করে আমি শেষ না করে উঠতে পারিনি। আমাকে লেখাটি ভীষণভাবে টেনে রেখেছিল, একই জায়গায় ঠাঁই বসে উপন্যাসটি শেষ করি। আমি বহুদিন পর একটি উপন্যাস পড়লাম এক নিঃশ্বাসে। ফলে মনে হল এমন একটা উপন্যাস পাঠের প্রতিক্রিয়াটা শেয়ার করা যেতেই পারে।

তিন।।।

উপন্যাসের মধ্যে যে গল্পটি আছে সেই গল্পের শুরু লন্ডনের কেনট্রি স্টেশন থেকে। লেখক, তার শ্যালিকা ফারজানা এবং তার স্বামী জোসেফের ট্রেন যাত্রা দিয়ে। তাদের গন্তব্য অক্সফোর্ড সার্কাস স্টেশন। সেখান থেকে তারা যাবেন লুইস আলথুসার লন্ডনের যে বাড়িতে থাকতেন, সেই বাড়িটি দেখতে।

স্টেশনে দেখা ‘সাকুরা গাছ’ যাকে অনেকে বলেন ‘ওরিয়েন্টাল চেরি’, সেই চেরি ব্লসম এর সৌন্দর্য এবং কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই সৌন্দর্যের পরিণতির বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসে যে ন্যারেটিভটি তিনি শুরু করলেন সেটা এক কথায় দূর্দান্ত। আর সেই সাথে লেখক যেন মানুষের জীবনের সেই চরম সত্যটি আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলেন যে-মানুষের সৌন্দর্য, ক্ষমতা সে সবও তো সেই চেরি ব্লসমের মতই, আজ যার সৌন্দর্যে সবাই মাতাল, দু’দিন পরই সেটাই যেন সাদা ও গোলাপি রঙের এক মৃত্যু আতঙ্ক। কিন্তু সেই ‘সাকুরা’ গাছই লেখকের মনে আতঙ্ক তৈরি করে, কারণ এই ‘সাকুরা গাছ’কেই মহাপবিত্র জ্ঞানে জাপানিরা-যার জন্য তারা মানুষও বলি দিয়ে থাকে! আর উপন্যাসের এইখানে এসে আমি ভাবতে থাকি মানুষের ‘ভালবাসা’- তা সে ব্যক্তিক হোক, ধর্ম হোক, বা কোন আদর্শই হোক- কি অবলীলায় না সেই ভালবাসাও মানুষকে খুনী বানাতে পারে? ইতিহাস তো সেই সাক্ষই দেয়। তাই ‘সাকুরা গাছ’ দেখে, আর স্টেশনে-স্টেশনে অগণিত মানুষের ট্রেনে উঠতে দেখে, তাদের ভিড়ে-ঠাসাঠাসিতে যখন লেখকের মধ্যে ভীতির জন্ম হতে থাকে- বিশেষত ঢিলেঢালা নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে, যেখানে কয়েকদিন আগেই নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে জঘন্য হত্যকাণ্ড ঘটে গেছে; আর সে কথাগুলোই লেখক যখন জোসেফকে বলতে শুরু করে-লেখকের মুখে বোমা, নাশকতা, এই সব শব্দ শুনে জোসেফ অস্বস্তি সহকারে এসব নিয়ে আলোচনা করতে নিষেধ করে, কারণ বলা তো যায় না লন্ডন পুলিশ তাদেরকেও তো সন্দেহ করতে পারে! মানুষ যখন একটা ভয়ের মধ্যে বসবাস করে, একটা ভয়ের চাপ যখন তাকে ক্রমাগত গ্রাস করতে থাকে, তখন সেই সব মানুষদের অভিজ্ঞতাটুকু যেন লেখকের বর্ণনায় বাঙ্ময়ী হয়ে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ভয় শুধু পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী দিয়ে নয়, ভয়ের একটা সংস্কৃতি যেন মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হয়-তার জন্য পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সিনেমা-নাটক, সিভিল সোসাইটি সব কিছুই সেই ভয়ের সংস্কৃতির পরিপূরক করে তৈরি করতে হয়, কেননা তাতে যেন শাসন করা, ক্ষমতায় থাকাটা কিছুটা নিশ্চিত করা করা যায়। আর এখানেই যেন অনিবার্যভাবে এসে পড়েন ‘আলথুসার’ এবং তাঁর দার্শনিক ভাবনা। ফলে অক্সফোর্ড স্টেশন থেকে লেখককে যখন লন্ডন পুলিশ সন্দেহজনকভাবে ধরে নিয়ে যায়, তার মোবাইলে তোলা অসংখ্য গাছের ছবি দেখে-পুলিশ যখন লেখককে হঠাৎ করে গোটা লন্ডন অচল করা ‘Extinction Rebellion’ এর সমর্থক ধরে নেয়, তাকে জেরা করতে থাকে, আর দার্শনিক আলথুসার এভাবেই যেন ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে পড়েন এবং তাই লেখককে একসময় বলতেই হয় তার লন্ডনের অক্সফোর্ড স্টেশন আসার সত্যিকারের কারণ।

চার।।।।

সেই নাটকীয় মুহূর্তে আমরা আরেকটু জানতে পারি লুইস আলথুসারকে। যিনি একাধারে ফরাসী দার্শনিক; জ্যাঁক দেরিদা ও মিশেল ফুঁকোর শিক্ষক, চে গুয়েভারার সাথে বলিভিয়ার জঙ্গলে যুদ্ধ করা রেজি দেব্রেরও শিক্ষক ছিলেন তিনি। সেটাই কি সব? না, তিনি ছিলেন স্ট্রাকচারাল মার্কসিস্ট। তার বিখ্যাত বই ‘For Marx’। আলথুসার বললেন-রাষ্ট্র দু’ভাবে তার নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করে-‘রিপ্রেসিভ স্টেট এ্যাপারেটাস (নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র)’ এবং ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট এ্যাপারেটাস (আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র)’ দিয়ে। যারা গ্রামসিকে জানেন তাদের কাছে আলথুসারের উপরের কথাগুলো গ্রামসির মত শোনালেও তাঁর এবং গ্রামসির মধ্য পার্থক্য ছিল বিস্তর। গ্রামসি ও আলথুসার দু’জনেই মার্কসিস্ট আবার একই সাথে মার্কসের তত্ত্বের অসম্পূর্ণতার আবিস্কারক। গ্রামসির যেমন হেজিমনি তত্ত্ব, আলথুসারের তেমনি ‘রিপ্রেসিভ স্টেট এ্যাপারেটাস’ এবং ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট এ্যাপারেটাস’। আলথুসার এবং গ্রামসির তত্ত্বের মধ্যকার মিল বা অমিল আমার আলোচনার বিষয় নয়, তবু মাসরুর আরেফিনের ‘আলথুসার’ পড়তে গেলে অনিবার্যভাবেই যেন এই ভাবনাটা উঠে আসে। অথচ লেখক একটা রাষ্ট্রের টিকে থাকা, থাকার পদ্ধতি এবং তার উৎসগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে, ক্ষমতার কাঠামো-রুপরেখা নিয়ে বলতে গিয়ে সেই কথাগুলো এনেছিলেন খুব সাবলীলভাবে, এতটা দক্ষতার সাথে যা বিস্ময়কর মনে হয়। আর একই সাথে লেখকের নিটোল গল্পের বয়ানে পাঠক হিসাবে আমার মাথায় যেন গিজগিজ করতে থাকে আলথুসার এবং গ্রামসি দু’জনই।

পাঁচ।।।।।

পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে রাস্তায় নামতেই লেখক দেখতে পেল গোটা লন্ডন শহর অচল করে দিয়ে ‘Extinction Rebellion’ আন্দোলনের কর্মীরা রাস্তা দখল করে বসে আছে। মুল মঞ্চটি করা হয়েছে নুহের নৌকার মত করে যেন এটা বোঝাতেই যে, নুহের নৌকায় না উঠে যেমন সেদিন কেউ বাঁচেনি ঠিক তেমনি আজকে, এই পরিবেশ বাঁচানো ছাড়া, এই আন্দোলনে শরিক হওয়া ছাড়া পৃথিবীকে বাঁচানো যাবে না।

সেই ভিড়ের মধ্যেই তার পরিচয় হয় মেগান নামের এক তরুণী, স্যামুয়েল নামের এক অধ্যাপক-যে কিনা তিমি প্রেমিক, তাদের সাথে।

পরিবেশ নিয়ে তাদের ভিন্ন এজেন্ডা থাকলেও তারা এখানে জড় হয়েছে, অচল করে দিয়েছে লন্ডন শহর। তারা পরিসংখ্যান দিয়ে জানাচ্ছে- যেভাবে পৃথিবী চলছে, এভাবে চলতে থাকলে সেটা টিকবে মাত্র ১২ বছর। তাদের এই সব তথ্য-বক্তব্য লেখকের কাছে বড্ড বাড়াবাড়ি লাগে, পরিবেশবাদী আন্দোলনের প্রতি যথেষ্ট সম্মান, গাছের প্রতি তার নিজের প্রচণ্ড ভালবাসা সত্ত্বেও লেখক ভাবে-লাখ লাখ বছরের পৃথিবী মাত্র ২৫০ বছরে ধবংস হয়ে যাবে? গ্রিনপিসের মত সংগঠন তিমি শিকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে, যার জন্য টাকা দেয় আমেরিকা, সেই গ্রিনপিস নামক সংগঠনটিই আবার হাঙর হত্যার বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করে না, কারণ আমেরিকা হাঙর পছন্দ করে না। তাহলে পরিবেশবাদী আন্দোলনের পিছনে কি কোন বিশেষ মোটিভ থাকে? সেটা কি শুধুই প্রকৃতি বা পৃথিবী নামক এই গ্রহের প্রতি ভালবাসা? নাকি অন্য কিছু? লেখকের মত তখন যেন আমার মনেও হাজারো প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। আমিও সংশয়ের দোলনায় দুলতে থাকি। ‘ডিপ ইকোলজিস্টরা একদিকে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে বর্ডার পার হয়ে আসা গরীব মানুষকে ঠেকাতে চায়-আমেরিকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথা বলে; অন্যদিকে তারাই ফড়িং হত্যার বিরোধীতায় নামে। তখন তাদের কার্যকলাপের নৈতিক দিকটি ঠিক কোথায় সে সংশয় যেন দূর হতে চায় না। মানুষের থেকেও কি পরিবেশ বড়? প্রশ্নটি লেখকের মত আমার মধ্যেও তৈরি হতে থাকে। এ প্রশ্নের উত্তর মেলে না-কেন একটা ‘থানকুনি’ পাতার জীবন মানুষের জীবনের চেয়েও মুল্যবান হবে’?

পক্ষে-বিপক্ষে যু্ক্তি-তর্কের মধ্যেই লেখকের কথোপকথন চলে মেগান ও স্যামুয়েলদের সাথে। লেখকের বাড়ি বাংলাদেশ জেনে পরিবেশবাদীরা আরও উৎসাহিত হয়ে পড়ে, কেননা বাংলাদেশে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেশি, বিশেষত সেখানকার গার্মেন্টস্ শিল্প, তার কাঁচামাল, বর্জ্য সব কিছু নিয়ে এক বিরাট ঝুঁকির মুখে দেশটি। কিন্তু লেখক যখন পরিবেশবাদী আন্দোলনের অন্তঃসারশূন্যতার কথা বলে তাদের সাথে তর্ক করে এবং সেখান থেকে উঠে পড়ে তখন স্যামুয়েল লেখক সম্পর্কে বলে বসে যে “সে (লেখক) আসলে আলথুসারের প্রতি আগ্রহী না। সে আসলে আমাদের ঘৃণা করে। সে এই সমাবেশকেও ঘৃণা করে কারণ এর মধ্য সে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের মৃত্যু দেখছে”।

ছয়।।।।।।

সেই ভিড় ঠেলে, মেগান ও স্যামুয়েলদের রেখে লেখক এগিয়ে গেল একটা বড় ‘ক্যান্ডি এন্ড কনফেকশনারি’র দোকানে। দোকান চালায় করিম ও কাহহার নামের দুই আফগান, সম্পর্কে তারা ভাই। গত কয়েকদিনের অচল করা আন্দোলনে তারা ক্ষতিগ্রস্ত আর সেই কারণেই করিম ও কাহহার ক্ষিপ্ত ছিল আন্দোলনকারীদের উপর। তীব্র সমালোচনা করে এই সব গাঁজা খাওয়া, দুনিয়ার তাবৎ নেশা গ্রহণকারী পরিবেশবাদীদের। একে তো আন্দোলনের কারণে বিক্রি-বাটা বন্ধ, অন্যদিকে আন্দোলনের এক তরুণী কিছুক্ষণ আগে তাদের বুঝিয়েছে যে লন্ডন থেকে আফগানিস্তান যেতে বিমানে যে পরিমাণ তেল পোড়ে তার বিনিময়ে তাদের উচিত ৬০ হাজার গাছ লাগানো। অথচ সেই আফগান দুই ভাইয়ের মনে হয় এত সব নীতি কথার পরে, বড়লোকের এই সব ছেলেমেয়েরা বিমানে করে ছুটি কাটাতে যাবে আল্পসে, আর সেখান থেকে ইনস্টাগ্রামে ছবি আপলোড করবে-এমনই সব ভণ্ড এরা! সেই আফগান ভাইদের দোকানে কিছুটা নাটকীয়ভাবে পুলিশ, পরিবেশবাদী এবং আফগান ভাইদের মারামারির মাঝে করিমের নির্দেশে লেখক পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে একটু ঘুরে ‘শেফ একাডেমির’ সামনে এলে লেখকের মনে হয় ‘এই ভবনের ভিতরে মন খারাপ করে, এক মাস্টার শেফ নিয়ম ভেঙে নাক মুছতে মুছতে তাদের শেফ হওয়া শেখাচ্ছে। আর ঠিক তখনি সেই বাড়ির ভিতর থেকে কে যেন চিৎকার করে কাকে বলছে,
“ডোন্ট বদার,জাস্ট ডোন্ট বদার। ওরা (নাকি ওটা হবে?) কখনোই ব্রিটিশ ফুড হবে না। ব্যবসা আর রন্ধন শিল্প এক জিনিস না, কুকুরের বাচ্চারা”।

আর পাঠক হিসাবে আমি ধাক্কা খাই এই ভেবে যে ‘প্যাশন’ ছাড়া, ভালবাসা ছাড়া, ভাল কিছু নির্মাণ করা যায় কি? ব্যবসা আর শিল্প কি কখনও এক জিনিস হতে পারে? লেখকের উপরের ঐ শেষ বাক্যটি, ঐ স্ল্যাঙটি যেন মগজে গেঁথে যায়।

আবার সেই মঞ্চের কাছটায় ফিরে গেলে লেখকের পরিচয় হয় চার্লস বেরেসফোর্ড নামের চুরুট টানা এক লোকের সাথে যে কিনা মনে করে ব্রেক্সিটের লজ্জ্বা এড়াতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পরিবেশবাদীদের দিয়ে এই নাটক করাচ্ছে। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মেগানদের জটলার দিকে এগোলে মিলিন্ডা নামের একটি মেয়ে কবিতা পড়তে শুরু করে, যে কিনা মেগানেরই বোন। সেই বোনের সাথে মেগানের দু’বছর কথা হয় না; তাদের বাবা তাদের কোন খোঁজ নেয় না। সেই সব কথা ভেবেই মেগান কাঁদতে শুরু করলে তার প্রতি স্যামুয়েলের মধ্যে যেন একটা পিতৃস্নেহ তৈরি হয়। তার প্রতি লেখকের পূর্ব ক্ষোভ থাকার পরও লেখকের এই জিনিসটা ভাল লাগে এবং তার মনে হয় স্যামুয়েল যতই নিজেকে মার্কসিস্ট বলে দাবি করুক না কেন-সে আসলে হিউম্যানিস্ট। আর আলথুসার যেহেতু এন্টি-হিউম্যানিস্ট মার্কসিস্ট, ঠিক সে কারণেই স্যামুয়েল তাকে পছন্দ করে না। আর এইখানে এসে পাঠক হিসাবে আমার প্রশ্ন জাগে- দেশের বামপন্থীদের যদি প্রশ্ন করা হয় তারা কেন সমাজতন্ত্র চান? আমি নিশ্চিত তাদের অধিকাংশই উত্তর দিবেন সেই হিউম্যানিস্ট মার্কসিস্ট পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই-যাদেরকে আলথুসার মনে করেন তারা মার্কসবাদী নন-সংশোধনবাদী। আর সেই একই কারণে আমি ভাবি লেনিনও তবে নিশ্চয় ‘এন্টি-হিউম্যানিস্ট মার্কসিস্ট’। আর এভাবেই লেখক তার চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে যেন আমাকে পরিচয় করাতে থাকেন কয়েক দশক ধরে চলা মার্কসবাদ নিয়ে বিতর্কের মূল সুত্রগুলোতে।

সাত।।।।।।।

সব কিছু মিলিয়ে যে দুঃখী মেগানের চিত্র লেখক আমাদের সামনে নিয়ে আসেন, আর সেখানে মেগান যখন তার শুন্য বাবার জায়গায় লেখককে জায়গা দিতে প্রস্তুত হয়, লেখকও তাকে ‘মা’ (কন্যা অর্থে) বলে সম্বোধন করে, তখনও লেখক যে তরুণী মেগানের প্রতি এক ধরনের যৌন টান অনুভব করতে থাকেন, পাঠকের কাছে লেখক সেটা লুকায় না। আর তাই মেগানের প্রতি লেখকের আপাত মায়া-মমতাটুকুও যেন সরল না হয়ে জটিল আকার নিতে থাকে, আর আমরা বুঝতে পারি সব ভালবাসা যেন ‘ভালবাসা’ নয়, তার পিছনেও থাকতে পারে ভিন্ন কিছু। একুশ শতকের জটিল রাজনীতির সমীকরণের সাথে মানুষে মানুষে সম্পর্কও যেন এমনই জটিল হয়ে উঠেছে!

তবু পরিবেশ আন্দোলনের প্রতি সংশয়ী লেখকের সহানুভূতি পেতে স্যামুয়েল তাকে একরকম জোর করেই নিয়ে যায় এমন একটা জায়গায় যেখানে পরিবেশ দূষণজনিত কারণে মৃত্যুবরণকারী এক তিমি রাখা হয়েছে। সেইখানে সেই পরিবেশে মৃত তিমি’র শরীরের নানা দাগ দেখতে দেখতে মেগান লেখকের বাহু জড়িয়ে ধরে তার বাবার সাথে তার ও মিলিন্ডার স্মৃতি মনে করে কাঁদতে থাকে, তখন লেখকের মনে হয় আলথুসার যে বলেছেন-‘পরিবার বড় আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র’, সেটা যেন তার কাছে আরো সত্য বলে মনে হতে থাকে। মানসিকভাবে বিপর্যন্ত মেগান লেখক থেকে কিছুটা দূরে, তিমিটার লেজের দিকে চলে গেলে, মেগানের প্রতি সহানুভূতিশীল লেখক তখন মৃত তিমির চোখের দিকে চেয়ে থাকে। আর তখন লেখক যেন শুনতে পান-“ক্ষীণবল ও কিছুটা মন-কষাকষি ভরাট কণ্ঠে তিমিটা বলছে, ‘মেয়েটার জন্য তো দেখি তোমার ভারি কুটিল মায়া। সব তাহলে একই রকম”।

আর এই সেই চরম মূহুর্ত, যেখানে এসে সমগ্র পরিবেশবাদী আন্দোলনকে লেখক যেন একটা বিশাল প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলতে চাইলেন -তাদের এই পরিবেশ প্রেমও কুটিল কোন মায়া নয়তো? তিমির প্রতি, বৃক্ষের প্রতি, থানকুনি পাতার প্রতি পরিবেশবাদীদের ভালবাসা এবং মায়াটাও কি তাহলে এমনই কুটিল?

আর একই সাথে পাঠক হিসাবে আমার মনে হল-যারা সমাজতন্ত্রের কথা বলছেন, শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির কথা বলছেন, সেই শ্রমজীবী মানুষের প্রতি বামপন্থী নেতাদের অনেকের ভালবাসাও কি এমনি কুটিল?

কিন্তু একই সাথে এটাও তো সত্য যে তিমি হত্যা, হাঙর হত্যা, আমাদের ঘুঘু পাখিগুলো, সুন্দরবনের বাঘগুলো, বেজী, খরগোশ, শেয়াল, পশুর-রূপসা নদীর শুশুক কত কিছুই তো বিলুপ্ত হয়ে গেল, সেও তো সেই পরিবেশের কারণেই। আর একারণেই কি লেখক মৃত তিমির শরীর দেখে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় উপন্যাসের শেষ প্যারায় মৃত তিমির টেবিলের বর্ণনা দিতে গিয়ে একবার কমপক্ষে ৫০ ফুট বলে, পরক্ষণেই বলতে থাকে কমপক্ষে ৫২ ফুট? স্যামুয়েল কি তবে লেখককেও শেষ পর্যন্ত পরিবেশ আন্দোলনের কারণটি বুঝাতে সক্ষম হলো?

আর এমন অসাধারণ উপমায় লেখক যেন এমন এক প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন, যার উত্তর ছাড়া, যার মীমাংসা ছাড়া আজকে আমাদের সামনে এগোনো বোধ করি বন্ধ। লন্ডনের বন্ধ রাস্তা-ঘাট যেন আমাদেরকেও বলছে -tell the truth, অন্যথায় রাস্তা বন্ধ, এগোনো যাবে না।

আট।।।।।।।।

আর তাই দেখি আলথুসারের বাড়ি লেখকের আর যাওয়া হয় না, যাওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না, কারণ গোটা উপন্যাসে আমরা আলথুসারকে দেখতে থাকি নানা ভাবে। লেখক যেতে চেয়েছিলেন তাঁর সেই বাড়িতে যেখানে আলথুসার দিনের পর দিন স্লিপওয়াক করতেন। আর সেরকম মানসিক অসুস্থতা নিয়ে তিনি বালিশচাপা দিয়ে নিজের স্ত্রীকে হত্যা করেছিলেন ১৯৮০ সালে। হত্যার কারণ হিসাবে তিনি বলেছিলেন-স্ত্রীকে ভালবেসে, নরক যন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্তি দিতেই তিনি কাজটি করেছেন। স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা আলথুসারকেও অবশেষে খুনী বানিয়ে ফেলে! সাকুরা গাছের প্রতি ভালবাসা জাপানিদেরকেও খুনী করে তোলে! থানকুনি বা তিমিকে ভালবেসেও তৃতীয় বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাপনের উপায়-অবলম্বনটুকু পরিবেশবাদীরাও বন্ধ করে দিতে চায়-পরিবেশের দোহাই দিয়ে! এই যে জটিল সব বিষয়, তত্ত্ব এবং তার নানাদিক, সেগুলোকে একটা নিটোল গল্পে, অসাধারণ দক্ষতায়, এই ছোট্ট উপন্যাসে লেখক তুলে এনেছেন।

লেখকের প্রথম উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া’ পড়ে প্রতিক্রিয়ায় লেখকের গদ্য শৈলী নিয়ে বলেছিলাম-“লেখকের এই উপন্যাস টুক করে গিলে ফেলার নয়, উপন্যাসটি পাঠ করতে পাঠককে হয়তো চিবানোর প্রস্তুতি লাগতে পারে। চোয়াল ব্যথা হতে পারে তবে সব শেষে পাঠক ডালিম খাওয়ার পরিপূর্ণ আনন্দ পাবেন বলেই বিশ্বাস করি।”

কিন্তু তাঁর এই দ্বিতীয় উপন্যাস পড়ে মনে হল লেখকের গদ্যরীতি যেন তার নিজস্বতা নিয়েই আরো সাবলীল এবং বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। এই উপন্যাসেও সেই একই দীর্ঘ লাইনে, কমা, সেমিকোলন যোগে অসাধারণ সব উপমায় লেখক যেন ভাষার উপর তাঁর মুন্সিয়ানা দেখালেন। আর তাই, তাঁর এই দ্বিতীয় উপন্যাস একদিকে যেমন সাবলীল, উপমাবহুল, এবং গল্পের ঠাসবুননে অনন্য হয়ে উঠেছে, একই সাথে গভীর, জটিল রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্নগুলো অবলীলায় তুলে এনেছেন অসাধারণ চরিত্র চিত্রনে, যা কিনা পাঠক হিসাবে আমার মগজে কিলবিল করতে থাকে আর জন্ম দিতে থাকে নানা প্রশ্নের।

মাসরুর আরেফিন তাঁর নিজস্ব গদ্য শৈলী, ভাষার কারুকাজ এবং নিটোল গল্প বয়ানে রাজনৈতিক ও দার্শনিক জটিল প্রশ্নগুলোকে উপন্যাসের বিষয়বস্তু করে, উপন্যাসের চৈতন্যপ্রবাহী ধারাকে নিঃসন্দেহে পুষ্ট ও শক্তিশালী করে চলেছেন সে কথা দ্যর্থ কন্ঠে বলতে পারি।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top