লেনিন-পর্ব ১৪ ।। আশানুর রহমান

 কাজান বিশ্ববিদ্যালয়

২৫শে আগস্ট, ১৮৮৭। দিনটি বিষ্যুদবার। ক্রেমলিভস্কায়া স্ট্রিটের লবাচেভস্কোগো স্ট্রিট থেকে প্রফেসর স্ট্রিট পর্যন্ত চওড়া সড়কের দু’ধারে ব্যস্ত মানুষজনের আনাগোনা। এদের অনেকেই বয়সে তরুণ, বয়স আঠার থেকে উনিশ। প্রফেসর স্ট্রিট ধরে তেমনি এক তরুণ দৃপ্ত পায়ে হেঁটে এসে ক্রেমলিভস্কায়া স্ট্রিটটি দ্রুত পার হলো। তার বয়স আঠার। পরনে ধুসর রঙের একটি প্যান্ট, সাদা শার্টের উপর গলাবন্ধ কোট, যার প্রত্যেকটি বোতাম লাগানো। মাথায় একটি কালো হ্যাট, হ্যাটটি যেন তরুণের মাথায় একটু ঢল ঢল করছে যদিও খুব কাছ থেকে খেয়াল না করলে সেটা বোঝা যায় না। হ্যাটটি ছিল তরুণের বাবার। বাবার মৃত্যুর পর এই হ্যাটটি সে সযত্নে ব্যবহার করে। হয়তো প্রয়োজনের পাশাপাশি, বাবার প্রতি আবেগ থেকেও। অথবা এমনও হতে পারে বাবার মৃত্যুর পর সংসারের খরচ বাঁচাতে বাড়তি একটি হ্যাট সে কিনতে চায়নি।

তরুণটি সড়ক পেরিয়ে মূল রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে ১৮ নং ক্রেমলিভস্কায়া স্ট্রিটে। এটাই কাজান ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে মূল গেটের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। মূল গেটে ১২টি স্তম্ভের উপর বিশাল ছাঁদ। রাস্তা থেকে বারান্দায় যেতে সিঁড়ির ২/৩ টি ধাপ উঠতে হয়। মূল ফটকের উপরের প্রশস্ত দেয়ালে রুশ ভাষায় লেখা কাজান ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়। সেই লেখাটার আরেকটু উপরে বামদিকে আরবি হরফে টার্কিশ ভাষায়ও লেখা আছে কাজান ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়। গেটের বাম দিকে একটি পাইন গাছ। রাস্তায় ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলছে। যাত্রীবাহী গাড়িগুলোর প্রায় সবই চার চাকার। পিছনের চাকাগুলো সামনের দু’টো চাকা থেকে বড়। মানুষজন যারা চলাচল করছে, তাদের অধিকাংশই ছাত্র। তাদেরও অনেকেরই মাথায় হ্যাট বা টুপি। মূল গেট দিয়ে ভিতরে ঢোকার আগে সেই তরুণটি লম্বা করে একটা শ্বাস নিল। এ তরুণের নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ।

কয়েক সপ্তাহ আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি দিয়ে ভ্লাদিমিরকে জানানো হয়েছিল যে, তার ভর্তির আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। ভ্লাদিমির নিজে খুব খুশি হল। এতদিন সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগই নিতে না পারায় মনের মধ্যে তার যে চাপা একটা ক্ষোভ ছিল, রাগ ছিল, সেটা যেন দূর হয়ে গেল। মনে মনে সে ভাবলো – এটা বোধ হয় ভালই হল এখন পরিবারের সবাই কাছাকাছি থাকতে পারবো। এই সংবাদে ককুশকিনোর উলিয়ানভ পরিবারে যেন একটা খুশীর হাওয়া বয়ে গেল। কিন্তু সব খুশীর শেষে যেমন একটা দুঃখ থাকে, যেমন থাকে দুঃখের শেষেও আনন্দ, ভ্লাদিমিরের ভর্তির আনন্দের খবরের পরেও মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভাবলেন আবার তাঁর পরিবারটি ভাগ হয়ে যাবে। আন্নার নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হয়নি, ফলে পরিবারের অন্যদের সাথে সে কাজানে যোগ দিতে পারবে না। তবু ভ্লাদিমিরের ভর্তির পাশাপাশি ছোট দু’টো ছেলে-মেয়ের স্কুলে ভর্তি নিয়ে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার মনে যে শংকা ছিল সেটা দূর হওয়াতে তিনি আন্নাকে ছাড়া অন্য সবাইকে নিয়ে কাজানে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিছুটা মন খারাপ হলেও নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন যে, কাজান থেকে ককুশকিনোর দূরত্ব মাত্র ২৫ মাইল। তিনি মাঝে মাঝে এসে আন্নাকে দেখে যেতে পারবেন। সাশার ফাঁসি হয়ে যাওয়া এবং আন্নার ককুশকিনোতে নির্বাসনে আসার পর গত কয়েকটা মাস যে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণা উলিয়ানভ পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে, ভ্লাদিমিরের কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগের খবরে আগের দুঃখময় স্মৃতিগুলো ভুলে, পূর্বের ঘটনার সাথে একটা ছেদ ঘটিয়ে, পরিবারকে নিয়ে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে, লড়াই করে যাবার এক বুক আশা নিয়ে মারিয়া আলেজান্দ্রাভনা কাজানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

কিন্তু তিনি দেখলেন হাতে সময় বড্ড কম। হঠাৎ করে বাসা ভাড়া পাওয়া কঠিন। বাসার বিষয়ে তাঁর ছোট বোনকে জানাতেই তিনি জানালেন যে, তারা যে বাসায় ভাড়া থাকেন তার বেজমেন্টটি এখন ফাঁকা আছে। মারিয়া চাইলে সাময়িকভাবে সেখানে উঠতে পারেন। পরামর্শটা মারিয়া আলেকজান্দ্রাভার মনে ধরলো। তিনি তার ছোট বোন লুবভ আরদাসেভাকে দিয়ে ‘পারভায়া স্ট্রিটে’ বাড়ির বেজমেন্টেটি ভাড়া নিলেন। আগস্টের মাঝামাঝি এক রৌদ্র ঝলমল দিনে সন্তানদের জন্য এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি কাজানের পথে পা বাড়ালেন।

পারভায়া স্ট্রিটের বাড়িটা খুব বড় নয়। ভ্লাদিমির, ওলগা, মারিয়া এবং দিমিত্রি ছাড়াও ন্যানী বারবারা সারবারতোসহ ছয়জন মানুষের জন্য বেজমেন্টেটি যেন বড্ড ছোট মনে হলো। ওলগা খুঁতখুঁত করলেও মুখে কিছু বলল না। বিষয়টি বুঝতে পেরেই লুবভ আরদেসভা প্রস্তাব দিলেন,

-ভ্লাদিমির এবং ওলগা উপরে আমার বাসায় থাকুক, আমাদের দু’টো ঘর বলতে গেলে ফাঁকায় পড়ে আছে।

প্রচণ্ড আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা একটু ভাবলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য কোন উপায় না দেখে তিনি সম্মতি দিলেন। কিন্তু পরের দিন থেকেই কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি বাড়ি খুঁজতে লাগলেন। সপ্তাহখানেকের মধ্যে তিনি একটা বাড়ি পেয়েও গেলেন। বাড়িটা কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই ‘কমিশনার স্ট্রিটে’। বাড়িটা যেমন বড়, আর বিশ্ববিদ্যালয়েরও খুব কাছে। তিনি দেখলেন ভলোদিয়া চাইলে দুপুরে বাসায় এসে খেয়ে যেতে পারবে, আবার একই সাথে মিত্তিয়া ও দিমিত্রির স্কুলটাও কাছে হবে। আর সেই বিবেচনায় তিনি তাই তাদের দু’জনকেই কাজান জিমনেঝিয়াতে ভর্তি করে দিলেন।

ভ্লাদিমির বাসা থেকে হেঁটেই ক্লাসে যায়। দুপুরের খাবারটা খায় বাসায়। ইলিয়া উলিয়ানভ মারা যাবার আগে যেরকম স্বাভাবিক জীবনে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা অভ্যস্ত ছিলেন কাজানের এই কমিশনার স্ট্রিটের বাড়িতে উঠে আসার পর সেরকম একটা জীবনের প্রত্যাশায় তিনি যেন আবারও সংসার পাতলেন। মারিয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেন প্রতিদিন। কিন্তু ঈশ্বরের অভিপ্রায় মারিয়া জানবেন কীভাবে?

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা কাজান শহরটি যতটা শান্ত হবে ভেবেছিলেন, শহরে বাস করতে গিয়ে দেখতে পেলেন আসলে তা নয়। পনের শতকে কাজান ছিল রাশান ও তাতারদের যুদ্ধক্ষেত্র। ভৌগলিক ও বাণিজ্যিক দু’দিক থেকেই শহরটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখনও ব্যবসা-বাণিজ্যই হলো শহরটির প্রাণ। ভলগার তীরবর্তী হওয়ায় নদী পথে, তারপর সেখান থেকে রেলপথে পণ্য যায় মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গে। এই শহরের প্রতিটি রাস্তায় একটি করে গির্জা আছে। এই সব গির্জা তৈরিতে জার সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতাও আছে। কারণ কাজান এমন একটি শহর যেখানে গোটা রাশিয়ার মধ্যে খ্রিস্টান নয় এমন জনসংখ্যাই প্রচুর। শহরের এক দশমাংশ মানুষ মুসলিম। এখানে মসজিদ আছে, এমনকি আরবী ভাষার প্রেসও আছে। ভ্লাদিমিরও তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুল ফটকে আরবী হরফে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখতে পেয়েছিল। গোটা প্রদেশের ৩১ শতাংশ মানুষ তাতার। এর বাইরে আছে বাসকিরস্, চুভাষ ও অন্যান্য উপগোষ্ঠী। যে কারণে সরকার কাজানকে দেখে সন্দেহের চোখে। জার সরকারের কাছে কাজান যেন রাশিয়ার একটি উপনিবেশ। আর এসব কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটা অস্থিরতা সব সময়েই ছিল। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাতার ছাত্র ছিল না বললেই চলে। ছাত্রদের রাজনীতি করার কোন অনুমতি তো ছিলই না বরং ভিন্ন মতের শিক্ষকদের বহিস্কার, ছাত্রদের হয়রানি ও গ্রেফতার ছিল নিত্যকার ঘটনা। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও সীমিত পরিসরে অঞ্চলভিত্তিক ছাত্র সমিতি করার অনুমতি ছিল। যেগুলোকে বলা হয় ‘জেমলিয়াচেস্টভা’। ক্লাস শুরু হবার কিছুদিনের মধ্যেই ভ্লাদিমির বিশ্ববিদ্যালয়ের সিমবিরস্কি-সামারা জেমলিয়াচেস্টভাতে যোগ দিল। এ যেন ঠিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। একদিন সাশা এবং আন্নাও সেন্ট পিটাসবার্গে এরকমই এক ছাত্র-সমিতিতে যোগ দিয়েছিল। আলেকজান্ডার উলিয়ানভের ভাই হবার কারণে ভ্লাদিমির এখানে যেন বাড়তি গুরুত্ব পেল। আলেক্সান্ডার উলিয়ানভের ফাঁসির ঘটনা শুধু রাশিয়া নয়, গোটা ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী রুশ বিপ্লবীরাও জানত। ফলে আগস্টে ছাত্র সমিতিতে যোগ দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই ভ্লাদিমির সমিতির সম্পাদক পদে নির্বাচিত হল। এখানকার সমিতিগুলোতেও সেন্ট পিটার্সবার্গের সমিতিগুলোর মত বিতর্কসভা, সাহিত্যসভা, অর্থনীতিসভার আড়ালে গোপনে অনেকে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। আলেকজান্ডার উলিয়ানভ ও তার সতীর্থদের ফাঁসির প্রতিবাদে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কাজান বিশ্ববিদ্যালয়েও যে বিক্ষোভ হয়েছিল সেটার আয়োজনে সিমবিরস্কি-সামারা জেমলিয়াচেস্টভার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার প্রার্থনা শুনে ঈশ্বর বোধকরি একটু হাসেন!

ইতোমধ্যে ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাশানদের মধ্যে জার হত্যা প্রচেষ্টার দায়ে আলেকজান্ডার উলিয়ানভসহ পাঁচজনের ফাঁসির খবর ছড়িয়ে পড়েছিল গভরুখিন ও রুডেভিচের মাধ্যমে। সে সময় ‘জেনারেল কজ’ নামের প্রবাসী বিপ্লবীদের একটি পত্রিকা, সাশার ‘পারগোলভোর ল্যাবরেটরি’কে বোমার কারখানা হিসাবে অবিহিত করেছিল। জারকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য রানী মারিয়া ফেদোরোভনা পুলিশ প্রধান গ্রেসারকে এক লাখ রুবল পুরস্কার এবং জার নিজে তাকে বছরে ছয় হাজার রুবল পেনশন দেবার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেই খবরটিও এই পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিল খুব গুরুত্ব দিয়ে। সেই পত্রিকার কিছু কপি গোপনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হাতে আসতে থাকে। জেনেভায় বসে ভেরা জাসুলিস, যিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ পুলিশ প্রধানকে প্রকাশ্য আদালতে গুলি করার এবং কার্ল মার্কসকে রাশিয়া বিষয়ে চিঠি লিখে বিপ্লবী মহলে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন, সেই তিনি বর্তমানে রাশিয়ার মার্কসবাদের জনক গ্রেগরি প্লেখানভের অন্যতম সহযোগী, তিনি গভরুখিনের কাছ থেকে সব শুনে প্রবাসী আরেক বিপ্লবী স্টপনিয়াক কিরাভচিনস্কিকে লিখলেন, “It shows very distinctly that the dreadful nature of our reality literally forced an idealistic youth like Ulyanov to resort to bombs after a long struggle with his conscience”.

ফলে এইসব খবর ছাড়াও ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকার, আবাসিক সুবিধা, খাবারের মান, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও নানা ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিক্ষোভ শুরু হল তার ঢেউ এসে পড়লো কাজানেও। কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারটির নাম এন জে পটাপভ। কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে কোন সময়-যে কোন ঘটনা ঘটাতে পারে সেটা জানিয়ে তিনি রেক্টর এন এ ক্রেমলেভকে আগে থেকে সতর্ক করে দিলেন। কিন্তু হলে হবে কি? কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আগে থেকেই পটাপভের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা ঠিক করলো বিক্ষোভের প্রথম দফায় তারা পটাপভকে শারিরীকভাবে প্রহার করবে।

সেদিন ডিসেম্বরের ৪ তারিখ। বেশ শীত পড়েছে। রাস্তা, মাঠ-ঘাট সব তুষারে ঢাকা। কিন্তু দিনটি ঝলমলে। সূর্য তখন মাথার উপরে। পূর্ব পরিকল্পনা মত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবনের কাছে ছাত্ররা জড় হতে শুরু করল। পটাপভ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল। সে ছাত্রদের উদ্দেশ্য বলল,

’আপনার কোথায় যাচ্ছেন? কোথায়? আপনারা যাবেন না, প্লিজ’!

ছাত্ররা কেউ তার কথা শুনলো না। ছাত্রদের সংখ্যা বাড়তেই থাকলো। ছাত্রদের ভিড়ে দেখা গেল ভ্লাদিমিরকেও। তার সাথে প্রথম বর্ষের আরেকটি ছাত্র, যার নাম পলিনস্কি, সেও আছে। উত্তেজিত ছাত্ররা শ্লোগান ধরলো। পটাপভকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে এগোতে থাকে। খবর পেয়ে রেক্টর ক্রেমলেভ একদিকে অধ্যাপকদের সাহায্য চাইলেন অন্যদিকে সেনাবাহিনীকে ডেকে পাঠালেন। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে গেল। রাস্তায় নামার আগে নেতৃস্থানীয় এক বক্তার আহ্বানে নব্বই জন বিক্ষুব্ধ ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেয়া পরিচয়পত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে ছুঁড়ে দিল। তারা পরিচয়পত্র ছুঁড়ে দিয়ে যেন বিশ্ববিদ্যালয়কেই অস্বীকৃতি জানাল। আর সেই সাথে তারা যেন বড্ড বেশি বোকামী করে ফেলল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেয়া পরিচয়পত্র খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে ফেলে যাওয়ার অর্থ হল বিশ্ববিদ্যালয় বা পুলিশ প্রশাসনের হাতে সহজে একটি হাতিয়ার তুলে দেয়া। তারা বুঝতেই পারল না এই পরিচয়পত্র দিয়েই কর্তৃপক্ষ তাদেরকে সহজেই সনাক্ত করতে পারবে। সেই নব্বই জনের একজন ভ্লাদিমির। মিছিলটি কিছু দূর যেতে না যেতেই প্রচুর সংখ্যক পুলিশ তাদের বাঁধা দিল এবং লাঠিচার্জ করল। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেমনভাবে পারে পালাতে শুরু করে। অন্যদের মত ভ্লাদিমিরও পালাতে থাকে কিন্তু পথ-ঘাট ভাল না চেনায় সে গেল ঘুর পথে। এই ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে দিল এবং ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করল। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কসাক সৈন্য নেমে গেল এবং সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পুলিশ ধড়পাকড় শুরু করল।

ভলোদিয়া অন্যদিন দুপুরের খাবারের জন্য বাসায় আসলেও আজ দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল কিন্তু তার দেখা না পেয়ে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ন্যানী বারবারা সারাতোভা গিয়েছিল মোড়ের দোকানে। ফিরে এসে খবর দিল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণ্ডগোল হয়েছে। প্রচুর পুলিশ নাকি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে রেখেছে। কসাক সৈন্যরা রাস্তায় টহল দিচ্ছে। বারবারার মুখে খবরটি শুনে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার মনটা কু গাইতে থাকে। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছে ভলোদিয়াও এই ঝামেলায় জড়িয়েছে। সেও কি তবে সাশার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে? কথাটা মনে হতেই মারিয়ার বুকটা ধক্ করে ওঠে। তিনি কোনভাবেই চান না ভলোদিয়া রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ুক। তবে কি সাশার কথাই ঠিক? সাশা যে বলেছিল ‘আমার স্বপ্ন যদি তাদেরও স্বপ্ন হয়ে ওঠে তাহলে কোন বাঁধাই তাদেরকে আটকে রাখতে পারবে না, মা। সেটা আমি জানি। আমি এটাও জানি, কেউ না কেউ আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে আসবেই।’ ভলোদিয়া কী তবে সাশার স্বপ্ন পূরণের হাঁটতে শুরু করেছে? না, এটা কোনভাবেই তিনি হতে দেবেন না। মুখ থেকে তার মনের কথাটা যেন অজান্তেই বাক্য হয়ে বের হয়ে এল। কাছে দাঁড়ানো বারবারা স্পষ্ট শুনতে পেল মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা বলছেন,

-না, এটা হতে দেয়া যাবে না।

বারবারা অবাক হয়ে জানতে চাইলো,

-আপনি কি বলছেন? কি হতে দেয়া যাবে না?

বারবারার প্রশ্নে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। কিন্তু চিন্তার রেশ তখনও শেষ হয়নি, তাই সে কথার কোন জবাব না দিয়ে তিনি বারবারার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এমন সময় ঝড়ের বেগে ভ্লাদিমির বাড়িতে ঢুকল। মারিয়া দেখল এই ঠাণ্ডার মধ্যেও ভলোদিয়ার কপালে যেন ঘামের চিহ্ন। তিনি ভলোদিয়ার মুখের দিকে তাকালেন কিন্তু ভলোদিয়া কারো সাথে কোন কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেল। মারিয়া যেন একটা ঝড়ের আভাস পেলেন। কিছুক্ষণ আগেও তিনি যেমনটা ভাবছিলেন ‘এটা হতে দেবেন না’, কিন্তু ভলোদিয়ার চোখ-মুখ দেখে বুঝলেন তিনি আসলে কোন কিছুই আটকাতে পারবেন না। যা ঘটতে যাচ্ছে, বা ঘটে চলেছে, সেটার উপর তাঁর নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাই তিনি বারবারাকে বললেন,

-ভলোদিয়াকে খেয়ে নিতে বলো।

রাত তখন গভীর। চারিদিকে শুনশান।

কাছের কোন গীর্জা থেকে ১২টা বাজার ঘন্টা বাজলো রাতের শুনশান এবং স্তব্ধতাটুকু যেন ভেঙে দিয়ে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেছে। এমনকি ভলোদিয়াও। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার ঘুম আসছে না। রাজনৈতিক কারণে বড় মেয়ে আন্না ককুশকিনোতে নির্বাসনে। বড় ছেলের ফাঁসি হয়েছে।সিমবিরস্কি ছেড়ে কাজানে এসে ভেবেছিলেন আবার হয়ত একটা শান্ত ও সুখী জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।কিন্তু আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এবং পরবর্তীতে ভলোদিয়ার সাথে কথা বলে তিনি বুঝলেন ভলোদিয়া ভালমতোই জড়িয়ে গেছে।এসব ভাবনায় আর দুঃশ্চিন্তায় তাঁর ঘুম আসছিল না।তিনি বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলেন। এমন সময় বাড়ির দরজায় দুমদাম শব্দে তিনি বিছানা থেকে উঠে বসেন। উঠে গিয়ে বসার ঘরে টিমটিম করা জ্বলা বাতিটির আলোটা বাড়িয়ে দিলেন।উজ্জ্বলতায় অন্ধকার কেটে গেলে, বারবারারও ঘুম ভেঙে যায়।সেও বিছানা থেকে উঠে মারিয়ার পিছ নিল। মারিয়া এক অজানা আশঙ্কায় দরজা খুলতেই দেখে একদল পুলিশ দরজায় দাঁড়িয়ে।

দরজায় পুলিশ দেখে প্রথমে একটু ভড়কে গেলেও কন্ঠে যথেষ্ট বলিষ্ঠতা এনে এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে  তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

-কি চাই?

সামনেই যে পুলিশটি দাঁড়িয়ে ছিল সে হয়তো ইনস্পেক্টর। সেই এক পা সামনে এগিয়ে এসে বলল,

-এখানে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ থাকে?

-হ্যাঁ থাকে। কিন্তু তাকে কেন দরকার?

-ভ্লাদিমিরকে ডেকে দিন, আমরা তাকে গ্রেফতার করতে এসেছি।

-আমি তার মা। আপনারা কেন তাকে গ্রেফতার করতে চান সেটা জানতে পারি? তার অপরাধ কী?

পুলিশ অফিসারটি মারিয়া আলেকজান্দ্রাভার ব্যক্তিত্বের সামনে একটু বিচলিত হলেও গলায় গাম্ভীর্য এনে বলল,

-আমি দুঃখিত। আপনাকে কিছু জানাতে পারছি না। আপনি আগামীকাল সকালে থানায় গিয়েই না হয় জেনে নেবেন।

দরজায় দুমদাম শব্দে ভলোদিয়ারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। হয়তো ঘুমটুকু গাঢ় ছিল না। মায়ের সাথে পুলিশের যখন কথোপকথন চলছিল ততক্ষণে চাইলে সে পালাতেও পারতো। কিন্তু তেমন ভাবনা ভ্লাদিমিরের মনেই জাগেনি। তাই নিজের ঘর থেকে বের হয়ে সে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। গভীর বেদনায় এবং স্নেহভরা চোখে তিনি ভ্লাদিমিরের দিকে তাকালেন। ভ্লাদিমির মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

-মাম্মাচুকা, চিন্তা করবেন না। আমি যাচ্ছি।

কথাটা বলেই মাকে পাশ কাটিয়ে সে এগিয়ে গেলে দু’জন পুলিশ এগিয়ে এসে দু’পাশ দিয়ে বগলদাবা করে ধরে ভ্লাদিমিরকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রওনা দিল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা একটা কথাও বললেন না। তাঁর শরীর তখন কাঁপছে। তিনি চোখের পানি ফেললেন না, নিজের শরীরের কাঁপুনি সহ্য করতে এক হাত দিয়ে দরজার চৌকাঠটি ধরলেন। সেই অন্ধকারে, ভলোদিয়ার চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে থাকলেন যতক্ষণ না সেই অন্ধকারের মধ্যেও তাদের অস্পষ্ট ছায়াগুলো মিলিয়ে গেল। বারবারা এসে মারিয়ার গা ঘেষে দাঁড়াল।

ভ্লাদিমিরকে নিয়ে পুলিশ যখন থানায় ঢুকলো রাত তখন ১টা। ভ্লাদিমির দেখল তার পরিচিত আরো অনেককে নিয়ে পুলিশের ভিন্ন ভিন্ন টিম তখন থানায় ঢুকছে। তারা যখন নীরবে থানার করিডোর দিয়ে হলরুমের দিকে যাচ্ছে, তার সঙ্গের পুলিশ অফিসারটি পথে কোন কথা না বললেও, হঠাৎ করে নীরবতা ভেঙে জানতে চাইলো,

-বিদ্রোহ করে কী লাভ? তোমার কি মনে হয় না তোমরা পাথরের দেয়ালে মাথা ঠুকছো?

ভ্লাদিমিররা ততক্ষণে থানার বড় হল রুমটায় ঢুকে পড়েছে। হল রুমের মধ্যে দেখতে পেল মিছিলের সেই পরিচিত মুখগুলো। তাকে নিয়ে আসতে দেখে সবাই যেন একসাথে চোখ তুলে তাকালো। ঠিক তখনই পুলিশ অফিসারের প্রশ্নের উত্তরে একটু উঁচু গলায় ভ্লাদিমির বলল,

-’হ্যাঁ, দেয়াল বটে। তবে পুরো দেয়ালটাই ঘুণে ধরা। একটা ভাল রকম ধাক্কা দিলে সেটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।’

ভ্লাদিমিরের কথাগুলো সেই হল রুমে অপেক্ষারত ছাত্রদের অনেকেই শুনে ফেলল। আর সেই মূহুর্তে কয়েকজন ছাত্র কোরাসের মতো করে বলে উঠল,

“দেয়াল ভাঙো! দেয়াল ভাঙো!! ভাঙো দেয়াল”!!!

৫ই ডিসেম্বর সকাল ১০ টা। থানার যিনি কর্মকর্তা সেই পুলিশ অফিসারটির সামনের চেয়ারে বসে আছেন মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা। গতকাল বাকি রাতটুকু তিনি নির্ঘুম কাটিয়েছেন। তাঁর চোখ দু’টো বেশ ফোলা ফোলা এবং চোখের নীচে গভীর কালো দাগ। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার চেহারাটা এমনিতেই সম্ভ্রম জাগানোর মত। পুলিশ অফিসারটি তাঁর মুখের দিকে খুব ভাল করে খেয়াল করেও অবশ্য বুঝতে পারলেন না তাঁর চোখ কেন ফুলে আছে? কান্নায়? নাকি নির্ঘুমে? নাকি দু’টোই? তিনি সোজা হয়ে চেয়ারে বসে জানতে চাইলেন,

-অফিসার, ভ্লাদিমিরের অপরাধটা কি?

পুলিশ অফিসারটি বেশ শান্ত এবং ঠাণ্ডা প্রকৃতির। তিনি শুরু থেকে মারিয়ার সাথে বেশ ভাল ব্যবহার করছেন। তাই তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বললেন,

-ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভের বিরুদ্ধে পুলিশ পরিদর্শকের রিপোর্টটি বরং আপনাকে পড়ে শোনাই?

কথাটা বলে তিনি মারিয়ার মুখের দিকে তাকালেন যেন অনুমোদন চাচ্ছেন। মারিয়া কোন উত্তর না দিয়ে অফিসারটির  চোখের দিয়ে চেয়ে থাকলেন। পুলিশ অফিসারটি ততক্ষণে অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই রিপোর্টটি পড়তে শুরু করে-

“ভ্লাদিমির তার স্বল্প সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চাপা স্বভাব, পড়াশুনায় অমনোযোগীতা এবং খারাপ ব্যবহারের জন্য বেশ পরিচিতি পেয়েছে। ছাত্রসভার এক/দু’দিন আগে সন্দেহ করা হয়েছিল সে ছাত্রদের প্ররোচিত করছে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ সময় কাটাতো সিগারেট খাওয়ার জন্য নির্ধারিত রুমে এবং সে সব সময় মেলামেশা করতো সন্দেহভাজন ছাত্রদের সাথে। সেদিন সে ধুমপানের রুমটি থেকে বের হয়ে বাসায় যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যে অন্যদের অনুরোধে বাসা থেকে কিছু একটা নিয়ে আসে। তখন থেকে সে সন্দেহজনক আচরণ করতে থাকে। ডিসেম্বরের ৪ তারিখে সেই প্রথম পলিনেস্কিকে সাথে নিয়ে করিডোর দিয়ে দৌঁড়ে প্রধান ভবনের দিকে যেতে শুরু করে এবং হাত তুলে অন্যদের ডাকতে থাকে। সেদিনই সমাবেশ থেকে সে তার আইডি কার্ডটিও ছু্ঁড়ে ফেলে। উলিয়ানভ পরিবারটিকে ঘিরে যে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে এবং সেদিন ছাত্রসভায় ভ্লাদিমিরের আচরণে পুলিশ পরিদর্শক এই ধারনায় উপনীত হয়েছে যে, সে যে কোন ধরনের অবৈধ ও মারাত্বক বিপদ ঘটাতে পারে।”

পুলিশ অফিসারটি এ পর্যন্ত পড়ে একটু থামতেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা বললেন,

-মিথ্যা কথা। আপনারা পূর্বধারনার বশবর্তী হয়ে তার সম্পর্কে এমন বানোয়াট অভিযোগ এনেছেন।

পুলিশ অফিসারটি বেশ দক্ষ এবং চৌকষ। মারিয়ার এমন অভিযোগে রেগে যাবার বদলে বরং হেসে হেসে বেশ ঠাণ্ডা মাথায় বলল,

-আমি অস্বীকার করছি না যে পুলিশ পরিদর্শক পূর্ব ধারনার বশবর্তী হতে পারে না। কিন্তু আপনি মা, আপনি নিশ্চয় ভাল করেই জানেন যে আপনার সন্তানটি সাধুপুরুষ নয়।

পুলিশ অফিসারের একথায় মারিয়া একটু যেন হোঁচট খেলেন। তাঁর নিজের আত্মবিশ্বাসে যেন একটু চিড় ধরে। ছোটবেলা থেকেই ভলোদিয়া জেদী এবং একগুঁয়ে। সে যদি সাশার পথ অনুসরণ করে তবে হাজার চেষ্টা করেও তাকে ঠেকানো যাবে না। পুলিশ অফিসারের ঐ কথায় তাই তিনি একটু নরম হয়ে জানতে চাইলেন,

-ভ্লাদিমিরের শাস্তি কি হতে পারে?

পুলিশ অফিসারটি বেশ প্রশান্তির একটি হাসি দিয়ে বললেন,

-আপনি এখন বুঝতে পেরেছেন। ভ্লাদিমিরের অপরাধ গুরুতর শাস্তিযোগ্য। কিন্তু তার বয়স, আপনাদের পরিবারের সম্মান, এসব বিবেচনায় নিয়ে আমরা শুধু তার কাজানে আবাসিক বৈধতা বাতিল করছি।

মারিয়া বেশ অবাক হয়ে বললেন,

-মানে? ভ্লাদিমির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না?

-মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা, সে সিদ্ধান্ত কি পুলিশ নিতে পারে? আপনি বুঝমান মানুষ। আপনি নিশ্চয় জানেন যে সেই সিদ্ধান্ত নেবেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আমাদের এখতিয়ার শুধুমাত্র তার আবাসিক অবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত।

-তাহলে সে কোথায় যাবে? সে কী ককুশকিনোতে তার বোনের সাথে বাস করতে পারে?

পুলিশ অফিসারটি এবার একটু গম্ভীর হলেন। কি যেন ভাবলেন। তারপর গম্ভীরমুখেই সামনের দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললেন,

-আপনি এই মর্মে যদি গ্যারান্টি দেন যে সেখানে ভ্লাদিমির ভাল আচরণ করবে এবং আপনি নিজে তার সাথে সেখানেই বাস করবেন তবে আমরা সেটা বিবেচনা করে দেখতে পারি।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনাকে খুব দ্রুত কতকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তিনি যদি ককুশকিনোতে গিয়ে বাস করেন তবে দিমিত্রি ও মারিয়ার পড়াশুনার ক্ষতি হবে। আবার তিনি যদি সেখানে না যান তবে ভলোদিয়াকে অন্য কোথাও পাঠাতে পারে। সেক্ষেত্রে ভলোদিয়া চোখের আড়াল হবে এবং তাকে দেখভাল করার কোন সুযোগ থাকবে না। সে হয়তো সাশার পথেই পা বাড়াবে। ককুশকিনোতে গেলে আন্না ও ভলোদিয়া দু’জনকেই চোখে চোখে রাখা যাবে। একই সাথে তার পরিবারও খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে না। মিত্তিয়া বা দিমিত্রি এখনও ছোট। ওদের বিষয়ে না হয় পরে একটা বিহিত করা যাবে। চকিতে বিষয়গুলো একবার মনে মনে ভেবে নিয়ে তিনি পুলিশ অফিসারটিকে বললেন,

-আমি গ্যারান্টি দিতে রাজি আছি।

পুলিশ অফিসারটি এক গাল হেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,

-আপনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিচ্ছেন।

তারপর একটি কাগজ ও কলম মারিয়ার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,

-এই কাগজে আপনার গ্যারান্টির কথাটা উল্লেখ আছে। কাগজটি পড়ে স্বাক্ষর করুন। আমরা আগামীকাল দুপুর নাগাদ জানাব, আর তখনই না হয় আপনি ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভকে নিয়ে যাবেন!

ডিসেম্বরের ৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্যান্যদের সাথে ভ্লাদিমিরকেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা দুপুরের দিকে থানায় গেলে তাঁকে সেই সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশি পুলিশ অফিসারটি এটাও জানাল যে, ডিসেম্বরের ৭ তারিখ থেকেই কাজানে ভ্লাদিমিরের আসাবিক বৈধতা বাতিল বলে গণ্য হবে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভ্লাদিমিরকে নিয়ে থানা থেকে যখন বের হলেন তখন সূর্য হেলে পড়েছে। থানার গেটে এসে ভ্লাদিমির মাকে বললো,

-মাম্মাচুকা, আপনি বাসায় যান, আমি সন্ধ্যার আগেই ফিরবো।

-তুমি এখন কোথায় যাবে?

-মা, কাল সকালেই তো আমাকে শহর ত্যাগ করতে হবে। আমার জরুরি একটা কাজ আছে। আমি চট করে শেষ করেই ফিরবো।

অনিচ্ছা সত্বেও মারিয়া বাড়ির পথ ধরলেন। একা একা। ভ্লাদিমির দ্রুত হাঁটতে থাকে। তার গন্তব্য পাবলিক লাইব্রেরি। পাবলিক লাইব্রেরির লাইবেরিয়ান ভদ্রলোকটি এক সময় নারোদিকদের সমর্থক ছিলেন। ভ্লাদিমিরের সাথে লাজার বগেরাজ নামের একজন এ্যাগারিয়ান সমাজতন্ত্রীর পরিচয় হয়েছিল। তিনিই এই লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকের সাথে ভ্লাদিমিরের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। মানুষটির সাথে কথা বলে ভ্লাদিমিরের ভাল লেগেছিল। ভ্লাদিমিরের ইচ্ছে আজ লাইব্রেরি বন্ধ হবার আগেই তার সাথে একবার দেখা করা। ককুশকিনোতে গেলে এখান থেকে ডাকে বই পেতে যেন কোন অসুবিধা না হয়, সেই বন্দোবস্ত করতেই তার সাথে আজ দেখা করা দরকার। ভ্লাদিমির দ্রুত পা চালাতে থাকে। লাইব্রেরি বন্ধ হবার আগেই তাকে পৌঁছাতে হবে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top