সেলুন ।। নাহার তৃণা

১.
অসংখ্য ছিদ্র বিশিষ্ট, আর কাঠের গোড়ায় ঘুণ ধরা দোকানের ঝাপটা খুলতে খুলতে মফিজ মিয়া নিজের মনেই বিড়বিড় করে, ‘উই যুদিল আবারও দিগদারি করে এক্করে হান্দাইয়া…’ আচমকা ছুটে আসা হিন্দি গান ‘ইউ আর মাই ছাম্মাক ছাল্লো’র চিল চিৎকারে থতমত খেয়ে স্বগোক্তির মাঝ পথেই থেমে যেতে হয় মফিজ মিয়াকে। গানের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা থাকায় মুখটা কেমন এক ক্রোধে বিকৃত হয়ে যায় মফিজের। ‘নাটকির পুত তোর মায়েরে ****’ কুৎসিত গালিটা মোক্ষম জায়গায় পৌঁছে দেবার ইচ্ছায় খানিকটা ঘুরে দাঁড়ায়। বিপরীত দিকের নতুন সেলুন ‘রঙিলা’র মালিকের মা কে খিস্তিতে যথার্থ সম্মানিত করে, শকুন দৃষ্টিতে সেদিকে খানিক তাকিয়ে থাকে। সে মুহূর্তে মফিজ মিয়ার ব্রণের দাগে ভরা মুখটাতে খিস্তিখেউড় উগলানোর তৃপ্তির পাশাপাশি, খানিকটা বেদনাও বুঝি সন্তর্পণে খেলা করে যায়। পিচ্ করে একদলা থুথু ফেলে মফিজমিয়া দোকানে ঢুকে।

গত রাতে ছাল্লু সরদারের লোক এসে আবারও দোকানটা বিক্রির প্রস্তাব ফয়সালার তাগাদা দিয়ে গেছে। দোকান বিক্রি না করে নাকি উপায় নাই মফিজের। তার পক্ষে এই এলাকায় ব্যবসা করা আর সম্ভব না। এমন একটা প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়ে গেছে ছাল্লুর পা চাটা গোলামেরা। মফিজ সপাটে জানিয়ে দিয়েছে, জান থাকতেও এই দোকান সে বিক্রি করবে না। সে ও ‘দেইখা নিবার চায় এই এলাকায় কারবার কবার পারে কি পারেনা।’ চিড়বিড়ানি এক ক্ষোভে প্রায় সারা রাত ডাঙায় তোলা মাছের মতো বিছানায় শুয়ে তড়পেছে মফিজ মিয়া। ঘুম আর হয়নি। সকাল সকাল তাই মেজাজ বিলা। ছাল্লু সরদার যত যাই করুক, এই দোকান সে কিছুতেই বেচবে না। বাপ দাদার আমল থেকে রুজি রোজগারের যোগানদার এই দোকান এখন পড়তির দিকে তো কী হইছে! এই বেগতিক অবস্হা চিরদিন থাকবো না। এক বাপের পুলা যদি হয়া থাকে মফিজ মিয়া, তাইলে ঠিক বেঁকে যাওয়া কোমর সোজা করে দাঁড়াবে। কছম খুদার!

হাজী চান্দু সেলুনের ঠিক বিপরীত দিকের কোণ বরাবর, ছাল্লু সরদারের ঝাঁ চকচকে সেলুন ‘রঙিলা’ হালে চালু হয়েছে। ভারত থেকে আমদানীকৃত ফ্যাশনদার যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত সেলুনটা পুরান ঢাকার নোংরা এই গলির ভেতর যেন ‘হংস মাঝে বক যথা।’ এমন কেতাদুরস্ত হাল ফ্যাশনের দোকান ইতোপূর্বে চাক্ষুষের অভিজ্ঞতা যে এলাকাবাসীর হয়নি তা নয়। কিন্তু সে রকম একটা দোকান তাদেরই চিপাগল্লিতে, এবং সেদিনের ছোকরা ছাল্লু সরদার তার মালিক, এটা তাদের জন্য চমকই বটে। আগে এখানে রফিক খলিফার দোকানটা টিম টিম করে চলতো। সেখানেই বেশ তাড়াহুড়োয় অতীত কাঠামো দুরমুশ করে ‘রঙিলা’র আর্বিভাব, যা এলাকাবাসীর জন্য শুধু বিস্ময়ের না, একই সাথে কৌতূহলেরও। এক্ষেত্রে কোনটার মাত্রা বেশি, সে ধন্দের মীমাংসায় পৌঁছানোর তাগিদেই বুঝি প্রথম প্রথম উৎসাহী এলাকাবাসী ছাল্লু সরদারের ‘রঙিলা’র সামনে জটলা পাকাতো।

দোকানটা চালু হবার প্রথম সপ্তাহে ছাল্লু সরদার এলাকার মুরুব্বিদের বিনা পয়সায় চুল দাড়ি কাটার ব্যবস্হা রেখেছিল। প্রকাশ্য ব্যবসায় নেমেই ছক্কা হাঁকানোর এ কৌশলটা তার পক্ষে পরবর্তীতে কাজে দেবে সে ব্যাপারে ছাল্লু নিশ্চিত। বয়স কম হলেও ধুরন্ধর ছাল্লুর ব্যবসায়িক বুদ্ধি পরিষ্কার। পক্ষে লোক টানার জন্য পকেটের হিসাব কিছু সময়ের জন্য ভুলে যেতে হয়, এটা ছাল্লু খুব ভালো জানে। সেলুনে নিত্য নতুন সুবিধা, যেমন চুল কাটলে শ্যাম্পু ফ্রি, শেভ করলে আফটার শেভ লোশন ফ্রি, ইত্যাদির প্রলোভন লোকজন ভালোই টানছে ‘রঙিলা’। ইদানিং এলাকাবাসী মফিজের সেলুনের পথ মাড়াচ্ছে না তেমন। শুধু তাই না, মফিজ যেন বাধ্য হয়ে তার সেলুন ব্যবসার চটেবাটি গুটিয়ে নেয়, সে ব্যবস্হায় কোমর বেঁধেই নেমেছে ছাল্লু সরদার। মফিজের ফুটাফাটা দোকানটার কারণে, তার সেলুনের সৌন্দর্য্যের হানি ঘটছে,
এই বিষয়টা চাউর হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। মফিজ মিয়ার কাছে দোকান বিক্রির প্রস্তাবও রেখেছে ছাল্লু সরদার। ঘাউরা মফিজ এত সহজে রাজী হবে না। তাকে নানান দিগদারিতে ফেলে দেবার কুবুদ্ধির অভাব নাই ছাল্লু সরদারের। দেখা যাক কতদিন মফিজ মিয়া বেঁকে যাওয়া কোমর নিয়ে এ ব্যবসায় টিকে থাকে।

২.
পুরান ঢাকার কসাইটুলির ‘হাজী চান্দু’ সেলুনটা বর্তমানে মফিজ মিয়া চালাচ্ছে। দোকানের মালিকানা পাওয়ার বিষয়ে সে অধীর ছিল ঠিকই, কিন্তু এমন তুরন্ত আর ক্যাওয়াসের মধ্যে হাত বদলে মালিকানা তার হাতে আসবে ভাবেনি। ঠিক এগারো মাস, তেরো দিন আগে মফিজ মিয়া এ দোকানের দায়িত্বে বসেছে। দোকানটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। দাদাজান চান্দু মিয়া বউয়ের গহনা বিক্রিবাট্টার টাকায় শুরু করেছিল চুলকাটার এই দোকান। নাপিতের কাজে চান্দু মিয়ার তেমন কোনো প্রশিক্ষণ না থাকলেও আশেপাশে সেলুন না থাকায় এবং পরিচিত ইয়ার দোস্তদের উৎসাহ আর সহযোগিতায় ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে যেতে সময় লাগেনি।

চান্দু মিয়ার মৃত্যুর পর মফিজের বাবা মজিদ মিয়া যখন দোকানের মালিকানা পায়, তখন ব্যবসার রমরমা অবস্হা। আশপাশের দোকানের মাথাগুলো বাবদ, কসাইটুলি মহল্লার একটা বিরাট অংশ তার হাতের জাদুতে লাট্টু প্রায়। ততদিনে বাজারের কোণ ঘেঁষে আরো একটা সেলুন চালু হয়েছে। কিন্তু মজিদের পসারে সেটা তেমন প্রভাব ফেলেনি। লোকজন খোলা খাবারের মাছির মতো তার দোকান ঘিরেই ভনভন করতো। মাথা বানানোর কাজে মজিদ মিয়ার হাতে জাদু ভর করতো বুঝি। চুল দাড়ি কামানোর পাশাপাশি মাথা বানানোর চাহিদা নেহায়েত কম ছিল না। বলা ভালো ওটার কারণেই মজিদ মিয়ার নামডাক। বাপের মতো মিষ্টভাষী ছিল না মজিদ মিয়া। বরং বাপজানের উল্টা, প্রচণ্ড রগচটা আর স্পষ্টভাষী। বস্তুত স্বভাবের কারণেই এ ব্যবসাটা ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারেনি মজিদ মিয়া। ফুপাতো ভাই সালাম মিয়ার সাথে শেয়ারে কাটা কাপড়ের যে ব্যবসাটা আছে সেটাও খুব লাভজনক অবস্হায় নাই। ব্যবসায়িক আর সামাজিক নানান টানাপোড়েনে মজিদ মিয়ার অবস্হান বর্তমানে খানিক বিপদের মুখেই।

মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো জুম্মন সরদারের ছেলে ছাল্লু সরদার মফিজের বোন, অর্থাৎ মজিদ মিয়ার একমাত্র কন্যা ছালহাকে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়ে বিপদকে আরো ফেনিয়ে তোলে। জুম্মনের সাথে গেলো বারের কর্পোরেশনের ভোটের সময় থেকে মজিদ মিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। জুম্মন সরদারের মনোনীত প্রার্থী, তার চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে রাজাকার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে মজিদ মিয়া পক্ষের ব্যাপক প্রচারণায় ক্ষিপ্ত জুম্মন তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে। ছালহার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সে সম্পর্ক আরো তিক্ততায় পৌঁছায়। বিষয়টা কেন্দ্র করে খুনোখুনি হতে হতেও বেঁচে যায় দু’পক্ষের অনেকেই। অথচ জুম্মন কসাই এককালে মজিদের জানি দোস্ত লাগতো।

মেয়েকে নিজেই লুকিয়ে রেখে মজিদ মিয়া চালাকি করছে, এমন একটা ধারণা পাবলিকের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার ইচ্ছায় জুম্মন সরদার সেটা উপস্হিত জনগণের সামনে বেশ দৃঢ়তার সাথে উপস্হাপন করতে দ্বিধা করে না। ‘প্যায়ার মুহাব্বতের চক্কর বক্কর চাউরের চিপায় হালার পুত মজিদের অন্য মতলব ছুপায় আচে। লাগে ছেই কারণে অয় মাইয়ার গপ বানায়া আমার পোলারে ফাঁছাইবার তাল করচে। আছল কথা হইল গিয়া পরতি কারবারের হাল ফিরানিই অর মতলব। মজিদ চো*** ছখ কত! মনে কয় আমি অর মতলবমুতলব কিচু বুঝবার পারিনাই, ইবলিচের বাচ্চা।’

জুম্মনের চালটা বেশ কাজ দেয়। বিপুল সংখ্যক হুজুগে জনগণ সে রটনায় আস্হা রাখে এবং খুব খারাপ বাপের নজির রাখবার জন্য মজিদ মিয়ার উদ্দেশ্যে ধিক্কার ধ্বনির সাথে মুফতে উপদেশ বর্ষণে অনেকেই কার্পণ্য করে না।

জুম্মন কসাইয়ের প্রচার করা ধারণার কোনো ভিত্তি নাই, পুরোটাই বানোয়াট। আদতে মেয়ের হদিশ মজিদ মিয়ার জানা নাই। কানাঘুষায় ছালহা-ছাল্লুর মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের কথা ভেসে বেড়ালেও, সেরকম কিছু তার চোখে পড়েনি। উপরন্তু, সে সম্পর্ক সংক্রান্ত কোনো সাক্ষ্য প্রমাণও মজিদ মিয়ার হাতে নাই। সে রকম সম্পর্ক থাকলে কেন ব্যাপারটা সে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলো না, তা নিয়ে নিজের ভেতর চিড়বিড়ে এক রাগ তৈরি হয়। নিজের অক্ষম ক্ষোভ কিংবা অজ্ঞতা ঢাকতেই বুঝি, একবার বউ করিমুন নেছার উপর, আরেকবার ছেলে মফিজের উপর, যাবতীয় ক্ষোভ ঝেড়েঝুড়ে উপস্হিত আত্মীয় পরিজনদের সাক্ষী রেখে ঘোষণা দিয়ে বসে, ‘কছম খুদার, যুদিল কেউ ছালহারে আইনা দিবার পারে, অরে আমি দুকানটা লেইখ্যা দিমু।’ উপার্জনের একটা বড় ভরসার জায়গা হাতছাড়া হবার আশঙ্কায়, ছালহার শোক কিছু সময়ের জন্য স্হগিত রেখে, মফিজ আর তার মা খানিক কাইকুই করলেও মজিদের বাজখাই ধমকের কাছে তারা বিশেষ সুবিধা করতে পারে না। ‘জবান দিছি আর ফিরত নিবার পারুম না।’ মজিদের এক কথা।

এমন তৈরি ব্যবসা পাওয়ার লোভেই হোক বা মজিদের প্রতি সহানুভূতি থেকেই হোক, অনেকেই ছালহার খোঁজে বিস্তর দৌঁড়ঝাপ শুরু করে দেয়। ছালহার নাগাল বা কোনো হদিশ পাওয়া না গেলেও , ড্রেনের পাশে ব্যবহৃত একপাটি মেয়েদের স্যাণ্ডেলের খোঁজ পায় সুরুত আলী। ছালহার মা সেটা তার মেয়ের স্যাণ্ডেল বলে সনাক্ত করে বুক চাপড়ে কান্না জুড়ে। মজিদ মিয়ার ক্রন্দনরত নজরকারা রূপসী এবং পর্দানশীন স্ত্রীকে আরেকটু আলুথালু দেখবার বাসনায় খাইষ্টা গোত্রীয় কেউ কেউ মনগড়া তথ্য নিয়ে মফিজের বাড়ির উঠানে হাজির হয়। ‘ক্যাঠায় জানি অরে উরি কওয়াকওয়ি করচে, ছাল্লু আর ছালহা অই রাইতে এক লগে মোড়ের থে রিকসায় উইঠ্যা পলাইচে।’ আগুনে ঘি পড়বার মতো কাজ দেয় এমন উড়ো মন্তব্যে। মেয়ের শোকে দিগ্বিদিক ভুলে করিমুন নেছা কাঁদতে বসে। সে কান্নার ছুতো ধরে কেউ দেখে সন্তান হারানোর যাতনা, কেউ বা দেখে অনেকটা বয়স পেরনো বউটার শরীরের অটুট বাঁধন!

উপস্হিত সমবেত জনতার মধ্যে থেকে অতি উৎসাহী হয়ে কেউ কেউ মতামত দিতে ভুলে না, ‘থানা পুলিছ করো নাই কেল্লায়? পুলিছ আয়া ছেমরিরে বিচরায় দিবো। গেচেনি কেউ থানায়?’ এমন মন্তব্যে গুরুত্ব থাকলেও সঙ্গত কারণেই মজিদের ঘনিষ্ঠ জনেরা উত্তর দেবার তেমন উৎসাহ দেখায় না। থানার দালাল কানা সিদ্দিক জুম্মনের পকেটস্হ, সে থানাকে প্রভাবিত করবে এটা নিশ্চিত। কাজে, ওদিক থেকে এ বিষয়ে কোনো সুবিধা পাওয়ার আশা রাখে না মজিদ মিয়া বা তার ঘনিষ্ঠজনেরা।

৩.
এক পাটি স্যাণ্ডেলের আবিষ্কারস্হল ড্রেনটা পাশের গলি সংলগ্ন, যেখান থেকে জুম্মন কসাইয়ের এলাকা শুরু। কাজেই দুইয়ে দুইয়ে চারের হিসাব মিলে যাওয়ায় মজিদ পক্ষ জনসম্মুখে ছাল্লু সরদারের উপস্হিতি দাবী করে। জুম্মন পক্ষ থেকে আড়াই দিন নীরবতা পালন শেষে জানানো হয় ছাল্লু ব্যবসার কাজে ইন্ডিয়া গেছে। উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অভাব থাকা সত্বেও মজিদ পক্ষ জুম্মন পক্ষের দিকে আঙ্গুল তোলার সাথে সাথে গলাও তুলে। হাঙ্গামা যখন খুনোখুনির উপক্রম, এমন পর্যায়ে এসে উত্তেজনাটা থেমে যায়। বলা ভালো থামতে বাধ্য করা হয়।

জুম্মন সরদারের টাকা-পয়সার জোর বেশি, উপরন্তু স্হানীয় ওয়ার্ড কমিশনার তার পয়সার জোরেই এলাকায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। কাজেই সব দিকেই জুম্মন এগিয়ে। মজিদের লোকেরা খামোখাই প্রমাণ ছাড়া চিল্লাপাল্লা করে এলাকার শান্তি নষ্ট করলে ওয়ার্ড কমিশনারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্হার হুমকি আসায় মজিদ পক্ষের লোকদের গলার ফুলোনো রগ প্যাতানো মুড়ির মতো নেতিয়ে পড়তে সময় লাগে না।

মজিদ পক্ষ কর্তৃক ছালহা নিখোঁজের জন্য দায়ী সাবস্ত্য জুম্মনপুত্র ছাল্লুকে ঘটনার ছাব্বিশ দিনের মাথায়, নয়া ছাঁটের চুল আর বাহারি শার্ট গায়ে এলাকায় ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। এতদিন সে লাপাত্তা ছিল। স্বভাবতই নেতিয়ে পড়া গলাগুলোতে আবার আওয়াজ ফুটে, স্তিমিত লোকজন নড়েচড়ে ওঠে। প্রথমে যথাসম্ভব হুমকি ধমকি দিয়ে ছাল্লুর কাছে ছালহার খোঁজ দাবী করা হলে, সে সোজাসাপ্টা জানায় এ বিষয়ে তার কিছু জানা নাই। নতুন দোকানের জিনিসপত্তর কেনার কাজে সে এতদিন ইন্ডিয়া ছিল। গতকাল ফিরেছে, ছালহার খবর তার পক্ষে জানা কীভাবে সম্ভব! নিখুঁত জবানবন্দীতে পরাস্ত মজিদ পক্ষ তখন অসহায় কাকুতি মিনতিসহ ছালহার কোনো খোঁজ ছাল্লুর কাছে আছে কিনা তা জানানোর নিবেদন করে। তাতেও না বোধক জবাব দেবার পাশাপাশি, দরকারে নিজ এলাকার নিখোঁজ মেয়ের তালাশে সে তার সর্বশক্তি লাগাবে এমন প্রতিশ্রুতি দেয়। পক্ষ বিপক্ষের অনেকের মনে এতদিন ছাল্লুকে ঘিরে যে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল এইসব আপাত নির্দোষ কথার তোড়ে সব উবে যায়। ছাল্লুর প্রতি আস্হাবানদের সহায়তায় ছালহা অজানা কোনো নাগরের সাথে ভাগলবা হয়ে পরিবারের মুখে চুনকালি দিয়েছে, এমন একটা খবর মহল্লায় চাউর হয়ে যায় দ্রুত। মজিদ পক্ষের অনেকেই পক্ষ বদল করে জুম্মনের মতো মানী লোকের সম্মানহানির জন্য মজিদ মিয়ার নিন্দামন্দে মুখর হয়।

অসহায়-অক্ষম ক্ষোভ, আর মেয়ের শোক সামলাতে ব্যর্থ মজিদ মিয়া ছালহা নিখোঁজ হবার আঠাশ দিনের মাথায় পক্ষাঘাতে বিছানা নেয়। ছেলে মফিজের কাঁধে শুধু ব্যবসা না, পরিবার সামলানোর দায়ও এসে পড়ে। চর্তুমুখি বিপদে নাকাল মজিদ পরিবারের দুর্দশার কথা জেনে আড়ালে জুম্মন সরদার পিশাচ হাসি হাসে। সে হাসিতে জুম্মনের পূর্বপুরুষের প্রেতাত্মাও এসে যোগ দেয়। জুম্মন সরদার নিশ্চিত, আটচল্লিশ বছর আগে তার স্বাধীনতা বিরোধী বাপ-চাচাদের হাতে ঘটে যাওয়া নিরীহ মানুষ হত্যার সমস্ত কাণ্ডকীর্তির প্রমাণ দিব্যি গিলে নিয়ে আজও যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাদের পারিবারিক কসাইখানা। ছালহা নামের অবলা মেয়েটার হাড়গোরের উপর অতি স্বল্প সময়ে গজিয়ে ওঠা বিল্ডিংয়ে ছাল্লুর নয়া সেলুন ‘রঙিলা’ও সেভাবে বহুদিন গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকবে!

‘… নাটকির পো’র ছাহছ কত্ত! আর কইবি রাজাকারের বংছ? এইবার বুঝ ঠ্যালা! পোলার তেমুন দুছ নাইক্কা। ছাল্লু আরো কিছু ছেমরিগো লগে কলকাতার মাগীপট্টিতে ছালহারেও বিক্রির বন্দোবছ নিছিলো। আতকা ফুনের বাতচিত ছুইন্যা ছিয়ানাগিরি করতে গিয়াই তো চুনিচু* ছেমরি মরলো! কিন্তু তার কোন পরমান আছেনি তাগো কাচে? পারবোনি আমার পোলারে ফাছের দড়ি পরাইতে? পারলে দেহাক।
হা হা হা…’

জুম্মন কসাইয়ের পিশাচ হাসির দম্ভ বুক পেতে নেয় বিবাগী বাতাস।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top