অন্তরাত্মায় মওলানা ।। ফাতিমা জাহান

যে শহর গোলাপে প্রাণ ধরে রাখে সে শহর মওলানার। যে শহরে সুবাসের মূল্যে মানুষ কাব্য করে সে শহর মওলানার। মওলানাকে ভালোবাসি বলেই পার হয়ে এসেছি কয়েক হাজার আফিম বাগান। কতশত কাঁটা ঘেরা বনভূমি। সেখানে প্রান্তর জুড়ে রঙ বিলোয় কমলা আর ডালিম বাগান। মওলানাকে প্রাণ সমর্পন করার সুযোগ হবে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি।


তুরস্কের আপাদমস্তক ঘুরে বেড়ানোর ছল করলে, মওলানা কি মুছে যায় হৃদয় থেকে! মওলানা তো থাকে অন্তরাত্মায়, সমস্ত আবেগ জড়িয়ে অন্তরালে।
এবারে মওলানার শহর ডিঙ্গিয়ে গিয়েছিলাম অন্য এক শহরে, সাহস হয়নি সে শহর সফর করার। মনে হয়েছিল কাউকে দেখার সাধনা এখনো অনেক বাকি। এত তাড়াতাড়ি মিলন হয় না চাঁদ ও চকোরে।
আগের দিন মওলানার একজন ভক্তের সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি বললেন, ‘মওলানার দেখা পাওয়া যেন আত্মশুদ্ধি। ‘
কিন্তু দেখা হবার আগে নিজেকে শুদ্ধ করি কোন বাহানায়!

তবুও পাপী মন মানেনি বাধা। পরদিন মওলানার শহর কোনইয়া বা কোনিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম আনতালইয়া শহর থেকে।
খুব ভোরে চললাম মওলানার শহরের উদ্দেশ্যে। সে এক অধীর অপেক্ষা, সময় পেরোতে চায় না। পথের দু’ধারে সারি সারি আপেল, কমলা, ডালিম বাগান। আর যে পথ মওলানার দিকে ধায় সে পথটা জুড়ে যে ফুল বাগানের ঝালর থাকবেই। গোলাপ দিয়ে পথ আঁকা। পুরো পথ মওলানার নাম ধরে গায়।
অসীমে বালুকণা আমি। মওলানা এই সংগীত শুনতে কি পায়!
এক ক্রোশ, পাঁচ ক্রোশ, এক ঘন্টা, ছ’ ঘন্টা অপেক্ষায় আসে তার শহর। শহর তো নয় যেন রূপোর পরত। সব রূপোলী মায়া, সাথে রয় লাল, গোলাপী গোলাপের বিহার।
সারা শহর জুড়ে স্থাপত্যকলার কী অপূর্ব কারুকাজ। প্রাচীন শহর। বলা হয়ে থাকে এ শহর নাকি খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০ সাল থেকে বিরাজ করছে। কত রাজ্যপাট এল আর গেলো।
শহরে প্রাচীনকালের ছাপ প্রকট। পথে পথে ফারসি লেখা কবিতা দেয়ালে খোদিত। পথের দু’ধারে গোলাপ বাগান মাইলের পর মাইল শোভা বাড়ায়।
মওলানার আবাস পাথরের পাঁচিলে মোড়া। ঢুকতে হয় পেছনের দরজা দিয়ে। মওলানার সামনে দিয়ে প্রবেশ করার ধৃষ্টতা কেনই বা দেখাবো। মওলানা যে ঘরটায় আছেন তার বাইরের প্রাঙ্গণে অনেকগুলো সমাধি, সাদা রঙের এপিটাফে লেখা তাদের হৃদয় গাথা। তারা ঘুমোচ্ছেন লাল টকটকে গোলাপ বাগানে। অনিন্দ্য সুন্দর সমন্বয়!
মওলানার আঙিনায় গোলাপ বাগান। পূণ্যবানেরা থাকে তার মাঝে।
মাথার ওপরে কারো আরশ থেকে মেঘ ঢাকে কোন অস্থির পথিককে।


মওলানার আবাসের ভেতরে ঢুকতে দ্বিধা হয়, কি জানি কি হয়!
বুকে ডামাডোল, শরীর জুড়ে অবাধ্য এক আকুলতা, ঝমঝম করে।
এক পা, দু’ পা করে ধীরে ধীরে চললাম মওলানার সাক্ষাতে। কি অপরূপ কারুকাজ তাঁর ঘরে! দেখলে প্রাণ সেখানে রেখে আসতে ইচ্ছে হয়, হাহাকার জাগে। দেয়াল আর ছাদের নকশা হওয়াও কতই না ভাগ্যের!

আরো এক পা, দু’ পা এগোই। মওলানাকে দেখতে পাই না, দেখি তার সহচরদের, ঘিরে রয়েছেন মওলানাকে। কী শান্ত, কী স্থির, কী সকরুণ ধ্যান তাদের!
তাঁদের সমাধি ভারী মখমলে ঢাকা সুচারু সোনালীকাজ তাতে, যেন মওলানার জন্য ভালোবাসা ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে।
অবশেষে তাঁর দেখা পাই। সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সবচেয়ে সাবলীল। প্রাণ ভরে দেখি, আর দেখি। হাত কাঁপতে থাকে, পা টলে যায়। তবুও প্রাণ ভরে না।
আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন,
‘তোমার কাজ ভালোবাসা খুঁজে ফেরা নয়।
তোমার কাজ তোমার ভেতরের দেয়ালের খোঁজ করা এবং ভাঙা যার জন্য ভালোবাসা তোমার কাছে আসতে পারে না।’
মওলানা আপনাকে ভালোবাসি। আমার সকল প্রশ্নের উত্তর আপনি দিয়ে গেছেন। আমার অন্য কারো কাছে যাবার প্রয়োজন হয় না।
আপনার রেখে যাওয়া দর্শন আমাকে ওড়ায়, ভাসায় কিন্তু বেঁধে রাখে না।
মওলানা জড়িয়ে আছেন খয়েরী মখমল। সেখানে ভারী সোনার কাজে লেখা তার কবিতা, গজল। সেই মুহূর্তে আমার প্রিয় রঙ খয়েরী। ভালোবাসার রঙ খয়েরী।
মওলানার দেয়ালে লাল, নীল, সাদা, সোনালী হরফে লেখা কোরানের বাণী আর মওলানার কবিতা। তা শোভা পায় পারস্যধাঁচ নকশায়। সে দেয়ালে যেন আমার প্রাণ আটকে আছে। আমার মন, কল্পনা, শরীর থেকে রঙ তুলে তুলিতে বসিয়ে করেছে আমার পাপমোচন।
মওলানার কাছেই ঘুমোচ্ছেন তাঁর বাবা, ভাই, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
আমি শুনি মওলানার বাজানো রুবাবের তালে তালে তার গান সামা আর তাঁর বাঁশি, যেন ভূমধ্যসাগর ভেদ করে আমায় নিয়ে যায় সেই ঐন্দ্রজালিক পারাপারে যেখানে তিনি গাইছেন,
‘হৃদয় ভাঙতে থাকো,
যতক্ষন অবধি না তা খোলে।’

ফিরে আসা বেদনাদায়ক। কিন্তু এ ফেরা যেন শেষ ফেরা না হয়। কারণ প্রাণ ফেলে আসা খুব বিচক্ষণের কাজ নয়।

তিনি মওলানা জালালুদ্দিন রুমি,
আমাদের ভালোবাসা।

( মওলানা জালালুদ্দিন রুমির জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর, ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে, বালখ্ নামক স্থানে যা বর্তমানে আফগানিস্তানে বা মতান্তরে ওয়াখস্, তাজাকিস্তানে অবস্থিত। মাতৃভাষা ছিল ফারসি। বালখ সে সময়ে পারস্য আর সুফি সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র ছিল। পিতা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ ছিলেন একজন বিচারক এবং সাধক। মা মুমিনা খাতুন। ১২১৫ সালের দিকে মঙ্গল রাজা মধ্য এশিয়া আক্রমণ করলে রুমির পিতা তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে ইরানে চলে যান। সেখানে রুমির পরিচয় হয় ফারসি কবি আত্তারের সাথে। আত্তার রুমির অন্তরাত্মাকে পড়ে ফেলেন। ভবিষ্যতে রুমির কবিতায় কবি আত্তারের প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায়। ইরান থেকে বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ এরপর হিযরত করে বাগদাদে। বাগদাদ থেকে মক্কা।
এই কাফেলা সাত বছর দামেস্ক, মালাতিয়া, সিভাস, কায়সারি পার হয়ে থিতু হয় কারামান নামক স্থানে। কারামানে রুমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন গওহর খাতুনের সাথে ১২২৫ সালে।
বাহাউদ্দীন ছিলেন মাদ্রাসা প্রধান। তাঁর মৃত্যুর পর রুমি মাত্র ২৫ বছর বয়সে মাদ্রাসাপ্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। টানা ৯ বছর বাবার কাছ থেকে সুফিবাদের দীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সামাজিক যোগাযোগের ব্যাপ্তি বাড়ে। তিনি একাধারে কোনিয়া শহরের বিচারক ও মসজিদের ফতোয়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মওলানা শব্দের অর্থ পথপ্রদর্শক বা শিক্ষক। রুমি তখন থেকেই মওলানা।
১২৪৪ সালে দামেস্কে মওলানা রুমির পরিচয় হয় দরবেশ শামস এ তাবরিজির সাথে। সে সাক্ষাৎ রুমির জীবনকে আমূল পালটে দেয়। রুমির পরিচয় তখন সাধক।
রুমি ক্রমাগত গজল আর কবিতা লিখতে থাকলেন যা লিপিবদ্ধ হয় ‘দিওয়ান শামস এ তাবরিজি’ গ্রন্থে।
মওলানা রুমি ইসলামিক দার্শনিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ইসলাম ছিল তাঁর আরাধনা। তাঁর ছাত্ররা ধর্মগ্রন্থের সাথে সাথে তাঁর লেখা দর্শন পড়ত। তিনি মানুষে মানুষে বন্ধনে বিশ্বাসী ছিলেন, জাতি, ধর্ম, গোত্র ভেদ করে। মানুষের ভালোবাসার খোঁজ ছিল চিরকালের।
তাঁর কবিতা আত্মার মুখোমুখি হতে বলে, অহংকার ত্যাগী হতে শেখায়, ভালোবাসা শেখায় যা শুধু ভালোবাসাতেই বেড়ে ওঠে।
তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক দৃষ্টি মানব চরিত্রের ক্ষুদ্রতা, দৈন্যতা ছাপিয়ে আরো বিস্তৃত হতে শেখায়।


‘এসো, এসো
তুমি যেই হও না কেন,
ভবঘুরে, মূর্তিপূজারি, অগ্নি উপাসক,
তবুও এসো, যদি তুমি হাজারবার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে থাকো।
এসো, বারবার এসো।
আমাদের এ কাফেলা হতাশার নয়।’

রুমির প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ছিল রুবাব আর বাঁশি। এই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ‘সামা’ গাইতে গাইতে তিনি চলে যেতেন আধ্যাত্মিক জগতে। তাঁর কবিতা, গজল সবচেয়ে বেশি পঠিত হয়েছে ইরান, তুরস্ক, দক্ষিণ এশিয়া, আমেরিকা, আজারবাইজান ইত্যাদি দেশে।
ঘুর্ণায়মান দরবেশ নাচের ধারনা মওলানা রুমি প্রথম প্রচলন করেছিলেন। দু’ চোখ বন্ধ করে, মাথা খানিকটা আকাশের দিকে মেলে ধরে, দু’ হাত বুকের কাছাকাছি রেখে শুরু হয় এ নৃত্য আরাধনা।
মওলানা রুমি আমাদের ছেড়ে চলে যান ১৭ ডিসেম্বর, ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে। তাঁকে সমাহিত করা হয় তুরস্কের কোনিয়া শহরে যেখানে তিনি কাটিয়েছেন জীবনের বেশিরভাগ সময়।
তাঁর সমাধির পাশেই রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মিউজিয়াম।)

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top