লেনিন।। পর্ব ১৫ : আশানুর রহমান খোকন

লেনিন পর্ব-১৫। ‘ডাস ক্যাপিটাল।।

ককুশকিনোতে শীতটা যেন একটু বেশি। শহর আর গ্রামের শীতের মধ্যে পার্থক্যও অনেক। গত তিনদিনের টানা তুষারপাতে প্রকৃতি যেন সাদা চাদর দিয়ে চারপাশ ঢেকে রেখেছে। অসংখ্য গাছ-গাছালী আর বিস্তৃর্ণ ফাঁকা মাঠ, পাহাড়-টিলা সবকিছু শীতটাকে আরো জাঁকিয়ে তুলেছে। গত রাতে ভ্লাদিমিরের ভাল ঘুম হয়নি। তাই খুব সকালে নানা বাড়ির সদর দরজাটি খুলে সে বের হয়ে আসে। তুষারপাত বন্ধ হয়েছে খানিকক্ষণ আগে। বাড়ির সামনেই বড় লাইম গাছটি পাতা হারিয়েছে সেই হেমন্তেই। পাতাহীন গাছের ডালগুলো তুষারে এমনভাবে ঢেকে আছে তাতে বুঝাই যাচ্ছে না এটা লাইম গাছ না অন্যকিছু। ভ্লাদিমির বাড়ির সামনের কোমর সমান লম্বা বেড়াটা পার হয়ে তুষার ঢাকা লাইম গাছের নীচে এসে দাঁড়াতেই উঁচু একটা ডাল থেকে তুলোর মত নরম কিছুটা তুষার এসে ভ্লাদিমিরের গালের উপর পড়ে। হাতমোজা খুলে নিজের গালের তুষারটুকু হাতে নিয়ে লাইম গাছের মগডালের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে গলার মাফলারটি একটু টাইট করে। তারপর হাতমোজাটা আবার পরে নিয়ে গায়ের লম্বা ওভারকোটের কলারটা কান সমান উঁচু করে সে তুষার ঢাকা পথ দিয়ে হাঁটতে থাকে। কিছুদূর যেতেই একটা উঁচু বার্চ গাছের ছোট্ট একটা কুঠুরিতে দেখতে পেল তুষারমাখা দু’টো হুতোম পেঁচা জড়সড় হয়ে গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে। হয়তো এই ঠাণ্ডায় নিজেরা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ওম নিচ্ছিল। ভ্লাদিমিরের দিকে চোখ যেতেই তারা তাদের গোল গোল চোখগুলো আরো বড় বড় করে পলকহীন চেয়ে থাকে। সে নিজেও তুষারমাখা ধুসর দু’টো হুতোম পেঁচাকে ভাল করে দেখতে লাগলো। গাছের ডাল থেকে এক দলা তুষার এসে পড়লো পায়ের জুতার সামনে দিকে। পা’টা একটু ঝাড়া দিয়ে জুতার উপরের তুষারটুকু সরিয়ে ভ্লাদিমির হাঁটতে হাঁটতে যে দিকটায় উঁচু টিলা ও বন, সেই দিকে এগিয়ে গেল।

কাজান বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাজান শহর থেকে বহিস্কৃত হবার পর থেকেই ভ্লাদিমির ককুশকিনোতে। আর সে কারণে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা কাজানের সংসার গুটিয়ে সবাইকে নিয়ে এই প্রথম কোন শীত শহরের বাইরে কাটাচ্ছেন। এখানে ভ্লাদিমিরের দিনগুলো শুরু এবং শেষ হয় যেন একইভাবে। আবহাওয়া ভাল থাকলে দিনের একটা বড় সময় সে কাটায় বাড়ির সামনে লাইম গাছের নীচে টেবিল পেতে বই পড়ে। তা না হলে সে থাকে নানার লাইব্রেরি ঘরে। অধিকাংশ দিন সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত সে বই পড়ে। মাঝে মাঝে আন্নার সাথে গল্প করে। সেই গল্পগুলোর অনিবার্য বিষয় হয়ে আসে সাশা, সেন্ট পিটার্সবার্গ, পিটার এন্ড পল দূর্গ, এবং গোপন রাজনীতি। সন্ধ্যাবেলাটা সে মিত্তিয়া ও দিমিত্রিকে পড়াশুনা করায়। কোন কোন দিন সে ওলগার সাথে দাবাও খেলে। সেই সব মূহুর্তে কোন কোন দিন দ্রিমিত্রিও এসে যোগ দেয়। দাবা খেলায় তারও ঝোঁক মারাত্মক। দিমিত্রি দেখে দাবা খেলায় ভ্লাদিমিরের প্রচণ্ড একাগ্রতা। কোন একটা গুটি চালার আগে সেটার সম্ভাব্য ফল, ওলগার পাল্টা চালের সম্ভাব্যতা এবং সেটার পরিণতির হিসাবে নিয়ে ভ্লাদিমিরকে বিড়বিড় করতে দেখে। কোন কোন দিন সবাই মিলে স্কেটিং করতে বের হয়। আইস স্কেটিং। জমাট বাঁধা তুষারের উপর দিয়ে ঢালু টিলা বেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে তারা স্কেটিং করে। স্কেটিং করতে গেলেই আন্নার মনটা বিষন্ন হয়ে ওঠে। সিমবিরস্কিতে সাশা দলনেতা হয়ে সবাইকে নিয়ে হৈচৈ করে স্কেটিংয়ে যেত। স্কেটিংয়ের দিনগুলোতে আন্নার তাই সাশাকে আরো বেশি মনে পড়ে। সাশার সাথে আন্নার সখ্যতা ও স্মৃতি বেশি-একারণে তার মনটাই বেশি খারাপ হয়। কাজান থেকে প্রত্যেক সপ্তাহে কাগজের বাক্স ভরে বই আসে। পরের সপ্তাহে ডাকপিয়ন যখন আবার বই দিতে আসে, আগের সপ্তাহের দেয়া বইগুলো বাক্সভর্তি করে ফেরত নিয়ে যায়। কোন ধরনের ঝামেলা ছাড়াই উলিয়ানভ পরিবার ককুশকিনোতে তাদের শীতকালটা কাটাতে থাকে। শুধু উপদ্রবের মতো প্রত্যেক সপ্তাহে নিয়মমাফিক একজন পুলিশ ইনসপেক্টর আসে আন্না ও ভ্লাদিমিরের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে। ঝড় হোক, তুষার হোক সপ্তাহের সেই নির্দিষ্ট দিন লোকটির আসা চাই। কাজান থেকে ককুশকিনোর দূরত্ব বেশি না হওয়ায় মাঝেমাঝে তাদের খালাতো ভাই আলেকজান্ডার আরদাসেভ আসে। ভ্লাদিমিরকে তখন দেখা যায় বন্দুক হাতে শিকারে বের হতে। তবে সব সময় সে ফেরে খালি হাতে। আন্না এবং ওলগা এটা নিয়ে প্রায় হাসাহাসি করে।

জানুয়ারির মাঝামাঝি একদিন আলেকজান্ডার আরদাসেভ কাজান থেকে ককুশকিনোতে এলে তাকে নিয়ে পরের দিনই ভ্লাদিমির গেল শিকারে। কয়েক ঘন্টা পর দু’জনেই খালি হাতে ফিরলে আন্না হেসে হেসে জিজ্ঞেস করে,
-আজও খালি হাতে ফিরলে?

আলেকজান্ডার আরদাসেভ বেশ উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করে,
-জানো, আজ আমরা না একটা খরগোশ দেখেছিলাম।

সে কথায় আন্না রীতিমত ঠাট্টাচ্ছলে বলল,
-ঐ একই খরগোশটা ভলোদিয়া বোধহয় গত গ্রীষ্মেও দেখেছিল।

আন্নার কথায় ভ্লাদিমির রাগ করে না। তার বন্দুক হাতে বের হতে ভাল লাগে। তেমনি ভাল লাগে জঙ্গলের ভিতর বিচিত্র গাছপালা, পশুপাখি দেখতে। আজকেও ঐ খরগোসটিকে দেখে আলেকজান্ডার আরদাসেভ যখন বলেছিল গুলি চালাতে, ভ্লাদিমিরের কেন জানি কোন ইচ্ছে করেনি। তুষার ঢাকা একটি টিলার উপরে সূর্যের তাপে গলতে থাকা ভেজা ঘাস খেতে এসেছিল খরগোসটি। ভীত-সন্ত্রস্ত খরগোসটি যখন ঘাস খাচ্ছিল তখন আলেকজান্ডার আরদাসেভ বলা সত্বেও ভ্লাদিমির গুলি চালাতে পারেনি। ভ্লাদিমিরের মনে হয়েছিল প্রকৃতির এই সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে গুলির শব্দটি বড্ড অসুন্দর ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কিন্তু এই কথাটুকু কি আরদাসেভকে বলা যাবে? না বোঝানো যাবে? তাই সে চুপ করে থাকে। কোন কোন সময় মুখ বন্ধ রেখেও তো অনেক কিছু বলা যায়!

এভাবেই একদিন ফেব্রুয়ারি মাস এসে পড়ে। সেদিন ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখ। সিমবিরস্কিতে জিমনেসিয়া গ্রামার স্কুলে ভ্লাদিমিরের এক বন্ধু ছিল-পাভেল ইয়াকোভেলেভিচ। সে ভর্তি হয়েছিল খারকভ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা, নিজের বহিস্কারসহ ককুশকিনোতে এখনকার অবস্থা সব জানিয়ে ভ্লাদিমির তাকে একটি চিঠি লিখতে বসলো। অদূরে আন্না বসে নিজের কাজ করছে। চিঠিতে ভ্লাদিমির তার ক্ষোভের বিষয়টিও গোপন করলো না। ভ্লাদিমির যখন চিঠি লেখা প্রায় শেষ করে এনেছে আন্না তখন জানতে চাইলো,
-কি করো?

-পাভেলকে একটি চিঠি লিখছি।

– কোন পাভেল?

-তুমি তো পাভেলকে চিনতে। আমাদের সিমবিরস্কির। সে এখন খারকভে থাকে।

-কি লিখছো?

-কাজান থেকে এখন পর্যন্ত যা যা হয়েছে সব। এই শেষ করলাম। কাল সকালে পিয়ন আসবে বই দিতে, তখন তার কাছে দিয়ে দেব।

আন্না তার বসার জায়গা থেকে একটু সরে এসে ভ্লাদিমিরের চেয়ারের পিছনে এসে দাঁড়ায়।

-তুমি কি ভুলে গেছো? কিছুদিন আগেই আমি তোমাকে বলেছিলাম যে সাশারা কিভাবে ধরা পড়েছিল। বলিনি?

ভ্লাদিমির আন্নার একথায় একটু থমকে গেল। চিঠিটি পরেরদিনের ডাকের জন্য ফেরত পাঠানো বইয়ের বাক্সের উপর রেখে সে আন্নার মুখের দিকে তাকায়। আন্না ভ্লাদিমিরের চোখের চাহনিকে উপেক্ষা করে বলতে থাকে,
-সাশাদের গ্রুপের একটি ছেলেও কিন্তু তার এক বন্ধুকে উৎসাহে ও আবেগে এমনই একটি চিঠি লিখেছিল। ঘটনাক্রমে তোমার বন্ধুটির মতো সেও থাকতো খারকভে। ‘ব্ল্যাক অফিসে’র হাতে পড়েছিল সেই চিঠিটি। ফলে সাশাদের গোটা গ্রুপটাকে পুলিশ নজরদারীর মধ্যে রেখেছিল।

আন্না কথা বলতে বলতে যেন একটু আনমনা হয়ে পড়ে। সেভাবেই সে ভ্লাদিমিরের চেয়ারের পিছন থেকে সরে গিয়ে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসে। ভ্লাদিমির তখন নিজের চেয়ার ছেড়ে আন্নার মুখোমুখি গিয়ে বসলো। আন্না ভ্লাদিমিরের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করে,
-দেখো ভ্লাদিমির, তুমি আর আমি, আমরাও কিন্তু এখানে আছি পুলিশের নজরদারীর মধ্যে। তোমার লেখা যে কোন চিঠিই ‘ব্ল্যাক অফিস’ চেক করতে পারে। সেক্ষেত্রে তুমি নিজেই শুধু বিপদে পড়বে না, যে বন্ধুটিকে চিঠিটি লিখেছো সেও কিন্তু বিপদে পড়তে পারে। তুমি বোধহয় বিষয়টি ভাল করে ভেবে দেখোনি?

আন্নার কথা শেষ হলে ভ্লাদিমিরের মনে হল সে আসলেই তো বিষয়টি ভাবেনি। কিন্তু চট করে সিদ্ধান্ত বদল করার মানুষও সে নয়। তাই সে পাল্টা প্রশ্ন করে,
-তাহলে যোগাযোগ করার কী উপায়?

-অন্যভাবেও চিঠি লেখা যায়। তুমি অদৃশ্য কালি ব্যবহার করতে পার।

-তাইতো। ব্যাপারটি আমার এতক্ষণ মাথায়ই আসেনি। ছোটবেলায় মা একবার আমাকে শিখিয়েছিলেন।

-মা তোমাকে শিখিয়েছিলেন? কেন?

-আমি আন্না খালাকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। সে অনেকদিন আগের কথা।

আন্না আর কোন প্রশ্ন করে না। ভলোদিয়া আন্নার সামনে থেকে উঠে গেল। চিঠিটি সে পরের দিনের ডাকে দেবে ভেবেছিল। ডাকে দেবার বইয়ের বাক্সের উপর থেকে পাভেলকে লেখা চিঠিটি সে সরিয়ে রাখলো।

দেখতে দেখতে মে মাস চলে এল। মারিয়া এবং আন্না দু’জনেই চাচ্ছিলেন ভ্লাদিমির পড়াশুনাটা শেষ করুক। কথাটা খাবার টেবিলে উঠতেই ভ্লাদিমির বলল,
-আমি বিদেশে পড়তে যেতে চাই।

-বিদেশে? কোথায়?

কথাটা জানতে চাইলো আন্না। মারিয়া আলেজান্দ্রাভনা তখন টেবিলের এঁটো বাসনগুলো গোছাচ্ছিলেন। কাজের ফাঁকেই তিনি দুই ভাইবোনের কথোপকথন মন দিয়ে শুনছিলেন। ভ্লাদিমির উত্তর দিল,
-ইউরোপের যে কোন দেশে এমন কি সুইডেনও হতে পারে।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা এবার কথা বললেন,
-কিন্তু আমার ইচ্ছে নয় তুমি দেশের বাইরে যাও। তাছাড়া আমার মনে হয় না সরকার তোমাকে সেই অনুমতি দেবে। তার থেকে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবার অনুমতি চেয়ে একবার আবেদন করে দেখতে পারো!

ভ্লাদিমির মুখে কিছু না বলে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেল। আন্না বুঝতে পারলো কথাটা ভ্লাদিমিরের মনঃপুত হয়নি।

ভ্লাদিমিরের ভবিষ্যত নিয়ে মারিয়া ও আন্না ভীষণ চিন্তিত। নানা কারণে আন্নার নিজের মনের অবস্থাও ভাল নয়। সেদিন রাতে তাই সে তার এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখলো, ”আমরা ভলোদিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাকে যে কোন জায়গায় পাঠানো মায়ের জন্য সহজ নয়। কিন্তু ভলোদিয়া এই সব ছোট শহরে থাকতেও চায় না”।

বিদেশে পড়তে যাবার বাসনাটুকু ত্যাগ করে অবশেষে মায়ের পরামর্শ মত ভ্লাদিমির মে মাসের ৯ তারিখে মিনিস্ট্রি অব এন্টারটেইনমেন্টে চিঠি লিখলো কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবার অনুমতি চেয়ে। সেই চিঠিতে সে কাজানে তার সম্ভাব্য অবস্থান হিসাবে তার খালু মি. ভেরেটেননিকভের প্রফেসরস্কি স্ট্রিটের ঠিকানাটি দিল। মন্ত্রী মহোদয় ভ্লাদিমিরের বর্তমান পরিস্থিতি, আচার-আচরণ ইত্যাদি জানতে একটি রিপোর্ট চেয়ে পাঠালেন। রিপোর্টটি তার হাতে এলে তিনি সেটা পুরোটা না পড়েই রিপোর্টের মার্জিনের মধ্যে লিখলেন,
“এই ছেলেটিই আরেক উলিয়ানভের ভাই না? সেও তো সিমবিরস্কি জিমনেসিয়াম থেকে এসেছিল, তাই না? আমি রিপোর্টের নীচে সেটাই দেখলাম। ফলে কোন অবস্থাতেই তার অনুরোধ গ্রাহ্য হতে পারে না”।

অনুমতি না পেয়ে পুরো পরিবার আবারও একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে লাগলো। ক্ষুব্ধ ভ্লাদিমির। ককুশকিনোতে তার সময় কাটে শুধু বই পড়ে। কোন কোন দিন ডিনার শেষে সব ভাইবোন মিলে হাঁটতে বের হয়। আবার কখনো কখনো সবাই মিলে বেরিয়ে পড়ে শিকারে, সাঁতার কাটতে অথবা নৌকায় করে ঘুরতে। ভ্লাদিমির নিজেও দূর্দান্ত নৌকা চালাতে পারে। কিন্তু দিন শেষে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত ভ্লাদিমিরের সময় কাটে সেই বই পড়ে। ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য কোন কিছুই বাদ পড়ে না। কোন কোন দিন কাজান থেকে তার খালাত ভাইয়েরা আসে কিন্তু তাদের সাথে ভ্লাদিমিরের মন বা মতের কোন মিল নেই। তাদের সাথে খুব বেশি সময় তার কাটানো হয় না। ফলে বইগুলোই তার প্রধান সঙ্গী হয়ে ওঠে।

এভাবেই গরমকালটা শেষ হয়ে গেল। এ সময় মারিয়া সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রভাবশালী আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে সরকারের উপর মহলে চিঠি লিখতে লাগলেন। কিন্তু কোনখান থেকেই কোন আশাব্যঞ্জক খবর পেলেন না। নিরুপায় হয়ে সেপ্টেম্বর মাসে ভ্লাদিমির মিনিস্ট্রি অব ইনটেরিয়রকে আবার চিঠি লিখলো, “যেহেতু আমাকে দেশের ভিতরে কোথাও পড়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না, তাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে আমার বিদেশ যাওয়াটা একান্তই দরকার”।

কিন্তু তার এই অনুরোধও প্রত্যাখ্যাত হলো, তবে একটা ভাল খবর হলো সরকার তাদেরকে সপরিবারে কাজানে ফিরে যাবার অনুমতি দিল, আন্নাসহ।

তাই আর দেরি না করে সবাইকে নিয়ে মারিয়া ফিরে এলেন কাজানে। বাসা নিলেন শহরের একদম প্রান্তে, পাহাড়ের পাদদেশে পারভায়া গোরা স্ট্রিটে। এই বাড়িতে চমৎকার একটি বারান্দা আছে। সেখানে দাঁড়ালে নীচের সবুজ বাগান দেখা যায়। বাড়িটি বেশ বড় এবং অদ্ভুতভাবে বাড়ির নীচতলায় দু’টো রান্নাঘর। মারিয়া যেহেতু একটা রান্নাঘরই ব্যবহার করবেন বলে ঠিক করলেন তাই ভ্লাদিমির বলল,
-মাম্মাচুকা, আমি কি অন্য রান্নাঘরটি আমার মত করে ব্যবহার করতে পারি?

মারিয়া জানতে চাইলেন,
-তোমাকে তো উপরে একটা ঘর দেয়া হয়েছে। এটা তুমি কি করবে?

-মা, আমি এটা আমার পড়ার ঘর বানাতে চাই।

মারিয়া একটু চুপ করে গেলেন। ভাবলেন, রাজনীতিতে জড়ানোর থেকে পড়াশুনা নিয়ে থাকলে খারাপ কি? তাছাড়া একটা যুবক ছেলে সারাদিন বাসায় থেকে করবেই বা কী? তিনি এটাও ভাবলেন, ছেলেটা যদি পড়াশুনা নিয়ে নীচেই থাকে অন্ততঃ তার চোখের সামনে থাকবে। তাই তিনি মৃদু হেসে বললেন,
-ঠিক আছে।

ভ্লাদিমির অনুমতি পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো। আর তার সব বই এনে সেদিনই সেখানে জড় করলো।

কাজানে আবার ফিরে আসার পর মারিয়া আলেকজান্দ্রেভনা মিত্তিয়া ও দিমিত্রিকে কাজান জিমনেসিয়ামে ভর্তি করে দিলেন। ওলগা গানের স্কুলে ভর্তি হল। এদিকে আন্না বাড়িতে মায়ের কাজে সাহায্য করে। ভ্লাদিমির মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরে যায়। কোথায় যায়, কি করে কেউ জানে না। আন্না খেয়াল করে তাদের বাসায় একদিন বিকালে একটা ছেলে ভ্লাদিমিরের সাথে দেখা করতে এলো। মারিয়া ভাবলেন ভলোদিয়ার কোন বন্ধু হবে হয়তো। তিনি বিষয়টি নিয়ে তেমন একটা ভাবলেন না। কিন্তু আন্নার মনে হলো ভলোদিয়া সম্ভবত নতুন কোন গ্রুপের সাথে মেলামেশা করতে শুরু করেছে। তার এই ধারনা দৃঢ় হলো সেদিন যখন সে দেখলো মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা এলো ভ্লাদিমিরের সাথে দেখা করতে। তখনও সন্ধ্যা হতে কিছুটা বাকী। আন্না বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় সে দেখলো প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স এক ভদ্রমহিলা তাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। একবার চারপাশটা ভাল করে দেখে নিলেন। তারপর তাদের বাড়ির দরজায় ঠকঠক আওয়াজ করতেই ভ্লাদিমির নিজেই দরজা খুলে বের হয়ে এল। সেও এদিক-ওদিক ভাল করে করে দেখে নিয়ে হাসিমুখে সেই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। আন্নার সন্দেহ হল। কে এই ভদ্রমহিলা? তাদের কোন আত্মীয় তো নয়? তবে কি ভলোদিয়া রাজনীতিতে জড়ালো? ভলোদিয়া কি বুঝতে পারছে না সে কোন বিপদ ডেকে আনছে? মা যদি জানতে পারেন?

আন্না যখন এত সব ভাবছে তখন সেই ভদ্রমহিলা যার নাম শেতভারগোভায়া, তাঁকে নিয়ে ভ্লাদিমির বসার ঘরে গিয়ে বসেছে। ভলোদিয়ার চোখে-মুখে প্রচণ্ড আবেগ ও উচ্ছ্বাস। এমন একজন মানুষের সাথে এতদিন পর তার দেখা হলো যিনি কিনা চেরনিশেভস্কির খুবই ঘনিষ্ঠ এবং ‘নারোদনায়া ভলিয়া’র সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভদ্রমহিলা বর্তমানে নির্বাসনে আছেন কাজানে। নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হলে ফিরে যাবেন উফা’য়। সেখানে তার একটা বইয়ের দোকান আছে। আসলে বইয়ের দোকানের আড়ালে তিনি দলের কাজ-কর্ম দেখাশুনা করেন। তার কাছ থেকেই ভ্লাদিমির জানতে পারলো চেরনিশেভস্কির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সরকার তাকে সাইবেরিয়া থেকে তাঁর নিজ বাড়ি ‘সারাতভে’ ফেরার অনুমতি দেওয়ায় তিনি এখন সারাতভেই আছেন। চেরনিশেভস্কি বেঁচে আছেন এই খবরটুকু ভ্লাদিমিরের কাছে অনেক বড়। সে উচ্ছ্বাসে তাঁর হাত দু’টো চেপে ধরে। ভ্লাদিমির সাধারণত এ রকম আবেগ প্রকাশ করে না। কিন্তু কেন জানি আজ তার স্বভাববিরুদ্ধভাবেই সে কাজটি করে ফেলে। হাত ধরা অবস্থায় সে জানতে চাইলো,
-আপনি কি আমাকে এন জে চেরনিশেভস্কির ঠিকানাটা দেবেন?

শেতভারগোভায়া এই যুবকটির এমন উচ্ছ্বাসের কারণটি ঠিক ধরতে পারেন না। তাই জানতে চাইলেন,
-ঠিকানা দিতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু তাঁর ঠিকানা নিয়ে তুমি কি করবে?

ভদ্রমহিলার হাত ছেড়ে দিয়ে ভ্লাদিমির বলে,
-আমি তাঁকে একটা চিঠি লিখবো।

শেতভারগোভায়া হেসে একটা কাগজে চেরনিশেভস্কির ঠিকানাটা লিখে দিল। ভ্লাদিমির ঠিকানাটা হাতে নিয়ে একবার ভাল করে দেখলো তারপর সেই কাগজটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল।

শেতভারগোভায়া ভ্লাদিমিরের এমন আচরণে ভীষণ অবাক হলো এবং সেই সাথে কিছুটা বিরক্তও। ভ্লাদিমির যেন সেটা বুঝতে পারলো। তাই সে হেসে ফেলে। শেতভারগোভায়া ভ্লাদিমিরের হাসিটি লক্ষ্য করলেন এবং নিজেও হেসে ফেললেন। তিনি বুঝলেন এই যুবকটির হাসিটি ভীষণরকম সংক্রামক। ভ্লাদিমির তখন বলল,
-ঠিকানাটা আমার মুখস্থ হয়ে গেছে এবং আমি এই কাগজটির কোন প্রমাণ রাখতে চাচ্ছি না।

শেতভারগোভায়া তখন ভ্লাদিমিরের কথায় শুধু চমৎকৃতই হলেন না, সেই সাথে মুগ্ধও। তার মনে হল বহুদিন বাদে একই সাথে বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান কারো সাথে তার দেখা হল। ভ্লাদিমির যখন তার সাথে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করে তখনই ছেলেটিকে তার সাহসী মনে হয়েছিল। তিনি নিজে নির্বাসনে, পুলিশের চর সবসময় তাকে অনুসরণ করে। ভ্লাদিমির নিজে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত, এক বছর আগে জার হত্যা চেষ্টায় তার ভাইয়ের ফাঁসি হয়েছে। ককুশকিনোতে এই কিছুদিন আগেও প্রত্যেক সপ্তাহে পুলিশ তাদেরকে পরিদর্শন করেছে; কিছুদিন হলো তাদেরকে আবার কাজানে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে; এমতাবস্থায় তার মত একজন নির্বাসিত ও পুলিশের নজরদারীতে থাকা মানুষের সাথে নিজের বাড়িতে দেখার ঝুঁকিটা যে কত সেটা তিনি আন্দাজ করে অবাক হলেন। গত এক ঘন্টা ছেলেটির সাথে কথা বলে তার মনে হলো ছেলেটির পড়াশুনার পরিধিও অনেক বড়। কিন্তু শুধু সেটার জন্য নয়, তিনি অবাক হলেন ছেলেটির চিন্তার স্বচ্ছতা এবং যে কোন কিছু বিশ্লেষণে দ্বান্দ্বিকতার ব্যবহারে। সাহস, বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা এবং প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি, এই চারটি গুণের সমাবেশ ছেলেটির মধ্যে দেখতে পেয়ে তাঁর মনে হলো ভ্লাদিমির কোন সাধারণ ছেলে নয়। তাই তিনি আবার ভ্লাদিমিরের সাথে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন তবে তার বাসায় নয়, অন্যত্র। এবং একই সাথে উফা’য় তাকে কোথায় পাওয়া যাবে সেই ঠিকানাটাও বলে গেলেন মুখে মুখে। কারণ এতক্ষণে তার এই বিশ্বাস জন্মেছে যে নাম এবং ঠিকানা মনে রাখায় ছেলেটি অনন্য। একটা প্রচণ্ডরকম ভাল লাগা নিয়ে তিনি যখন বিদায় নিলেন, তখন বাইরে ঘন অন্ধকার।

শেতভারগোভায়া চলে গেলে ভ্লাদিমির রান্নাঘর কাম পড়ার ঘরে বসে এন জে চেরনিশেভস্কিকে চিঠি লিখতে শুরু করল। তার যেন দেরী সহ্য হচ্ছিল না। কোন একটা কাজ করতে মনস্থ করলে সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটা অস্থিরতা তার মধ্যে সব সময় কাজ করে। বাইরে থেকে সেটা অন্যরা না বুঝলেও তার কাছের মানুষরা ঠিকই বুঝতে পারে। ইতোমধ্যে আন্না দু’বার উঁকি দিয়ে দেখে ভলোদিয়া অখণ্ড মনোযোগে কি যেন লিখছে। আন্না বুঝতে পারে এটা তার সেই অস্থিরতা। সে কোন কথা না বলে আবার ফিরে যায়।

চেরনিশেভস্কিকে লেখা চিঠিটি পরেরদিন ডাকে ফেলে ভলোদিয়া অপেক্ষা করে উত্তরের। অপেক্ষা সারাতভ থেকে চিঠি আসার। একদিন, দু’দিন করে সপ্তাহ গড়ায়, তারপর মাস। সে হতাশ হতে থাকে। ভ্লাদিমির ভাবে তবে কি তিনি চিঠিটি পাননি? চিঠিটি কি পুলিশের হাতে পড়লো? আবার ভাবে তিনি ঠিকানা বদলাননি তো? অথবা এমনও কি হতে পারে তিনি বেঁচে নেই, কারণ শেতভারগোভায়া বলেছিল তিনি খুব অসুস্থ!

এদিকে কিছুদিনের মধ্যেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা বুঝতে পারলেন ভলোদিয়া গোপন বা নিষিদ্ধ কোন গ্রুপের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। ভলোদিয়া প্রায় বাইরে যায়, প্রচুর বইপত্র সাথে করে আনে। ইতোমধ্যে দু’জন অপরিচিত মানুষকে সে বাসায় নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একজন আবার বয়স্কা মহিলা। একটি তরুণ ছেলের সাথে একজন বয়স্কা নারীর যোগাযোগের কি কারণ থাকতে পারে? তিনি আন্নাকে প্রশ্ন করেও সদত্তুর পাননি। ভ্লাদিমিরকে জিগ্যেস করলে সে মিথ্যা বলবে না সেটা মারিয়া জানেন কিন্তু কথাটা ভলোদিয়াকে তিনি বলবেন না বলেই ঠিক করলেন। এদিকে প্রায় দেখা যায় বইপত্র ও কিছু খাবার-দাবার নিয়ে ভলোদিয়া চার/পাঁচ দিনের জন্য বাড়ি থেকে চলে যায়। যদিও মারিয়া জানতে চাইলে ভলোদিয়া বলে,
-মা, ভলগা ধরে নৌকায় ঘুরবো। ফিরতে চারদিন লাগবে।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা ভাবলেন যুবক ছেলে বাসায় বসে থাকে আর রাতদিন বই পড়ে, সন্দেহজনক কিছু লোকজনের সাথে মেলামেশা করে, তার থেকে যদি নৌকা চালিয়ে আনন্দ পায় তবে তাই করুক। কিন্তু কিছুদিন বাদে আবার যেতে চাইলে মারিয়া আপত্তি না করলেও তাঁর বিষয়টা ভাল লাগে না। তিনি ভয় পেতে শুরু করেন। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার কেবলই মনে হতে থাকে ভলোদিয়া সাশার পদাঙ্কই অনুসরণ করছে এবং সেও হয়তো গোপন কোন দলের সাথে যুক্ত হয়েছে। মারিয়ার দিন কাটে চরম আতঙ্ক ও ভয়ে। কিন্তু কথাটা কাউকে বলতেও পারছেন না। আন্নাকে বলা যায়, কিন্তু মারিয়ার সন্দেহ হয় ভলোদিয়ার কাজে আন্নার যেন প্রচ্ছন্ন একটা সায় আছে। মারিয়া ভাবলেন সন্তানরা তাকে দু’দণ্ড শান্তি দেবে না।

হঠাৎ করে একদিন আলেকজান্ডার আরদাসেভ এলো দুপুর বেলায়। এসেই বললো,
-ভলোদিয়া, আজ তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যেতে এসেছি।

-কোথায়?

-কাজান দাবা ক্লাবে।

-কেন? আমি সবার সাথে দাবা খেলতে পছন্দ করি না।

-আমি জানি কিন্তু আজ তোমাকে এমন একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব যার সাথে পরিচিত হতে পেরে তুমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবে?

-কে তিনি?

-তাঁর নাম ব্যারিস্টার আন্দ্রেই খারদিন।

-আমি জীবনেও নাম শুনিনি।

-আহা, তুমি বিখ্যাত দাবাড়ু এম আই চিগোরিনের নাম শুনেছো তো?

-হ্যাঁ, কে না তাঁর নাম শুনেছে?

– ব্যারিস্টার আন্দ্রেই খারদিন তাঁর সাথে দাবা খেলেছেন।

-বল কি? তিনি কি কাজানেই থাকেন?

-আরে না। তিনি থাকেন সামারায়। কাজে এসেছেন। আমার সাথে আলাপ আছে। তিনি আজ দাবাক্লাবে যাবেন। তুমি যেতে চাও কিনা বল?

সেদিন কাজান দাবাক্লাবে ব্যারিস্টার আন্দ্রেই খারদিনের সাথে পরিচয় হতেই সে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করে। তিনিও রাজী হলেন। প্রথম রাউন্ডে ভ্লাদিমির হেরে গেল সহজেই। দ্বিতীয় রাউন্ডেও সে হেরে গেল। ভ্লাদিমির তৃতীয় রাউন্ড খেলতে চাইলে তিনি হাসিমুখে আবার গুটি সাজাতে লাগলেন। ভ্লাদিমির প্রতিবারই হারলো কিন্তু তার মনে হলো এই প্রথম সে কোন শক্ত প্রতিপক্ষের সাথে খেলছে। তাই তার খেলার আগ্রহ কমে না। খেলার ফাঁকে ফাঁকে তারা পরস্পরকে বুঝতে চায়, কথা চলে। ভ্লাদিমির জেনে যায়, চিন্তা-ভাবনায় ব্যারিস্টার আন্দ্রেই খারদিন প্রগতিশীল। হেরে গেলেও গভীর আনন্দ নিয়ে সে বাড়ি ফেরে। সেদিনই ব্যারিস্টার আন্দ্রেই খারদিন ভ্লাদিমিরকে সামারায় যেতে আমন্ত্রণ জানান।

তাদের কাজানের এই বাসায় হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে হাজির হলো এক যুবক। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা তখন রান্নাঘরে কাজ করছেন। বারবারা সারাতভা তাঁকে সাহায্য করছে। কিছুক্ষণ বাদেই পরিবারের সবাইকে ডিনারে ডাকা হবে। ভলোদিয়া নৌকায় না থাকলে ডিনারের আগেই বাসায় ফিরে আসে। এমন সময় দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ। শব্দটি অপরিচিত জনের মনে হওয়ায় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা নিজেই গেলেন দরজা খুলতে। দরজা খুলেই দেখলেন বছর ২৫ বয়সের এক সুদর্শন যুবক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। যুবকটির ঠোঁটের উপরে এক চিলতে গোঁফ, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি, মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা। মারিয়া যুবকটিকে চিনতে পারলেন না। যুবকটি মারিয়াকে না চিনলেও কিছুটা হয়তো অনুমান করে নিল। ছেলেটি ফরাসী কায়দায় মাথা ঝুঁকিয়ে মারিয়াকে বলল,
-শুভ অপরাহ্ন! আমার নাম মার্ক তিমিওভিয়েচ এলিজারভ। আমি সামারা থেকে আসছি।

এতক্ষণে যেন মারিয়া বুঝতে পারলেন। তিনি দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বললেন,
-উলিয়ানভ পরিবারের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। ভিতরে আসুন!

দরজা বন্ধ করে মারিয়া মার্ককে নিয়ে এলেন বসার ঘরে। বারবারাকে বললেন সামোভারটা চড়িয়ে আন্নাকে খবর দিতে। মার্ক হাতের ছোট্ট ব্যাগটি রেখে সোফায় বসে।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা উল্টোদিকের সোফায় বসে জানতে চাইলেন,
-পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো?

মার্ক হেসে বলল,
-আমার কোন অসুবিধা হয়নি।

কিছুটা দ্বিধা ও জড়তা নিয়ে মার্ক বলে ওঠে,
-মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা, আন্না এখানে এসে পৌঁছানোর আগে আপনি অনুমতি দিলে আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।

তার কথা শুনে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা হাসি মুখে তাকায়। সেই হাসির মধ্যে সম্মতি দেখতে পেয়ে সে বলল,
-আপনাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে তবে আন্নাকে আমি সত্তর বিয়ে করতে চাই।

কথাটা শুনেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার চোখে-মুখে আনন্দের একটা ছায়া খেলে গেল। তিনি মনে মনে ভীষণ খুশী হলেন। প্রথম দেখায় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার যেমনটা মনে হয়েছিল যে ছেলেটির উপর আস্থা রাখা যায়, নির্ভর করা যায়, আন্নাকে বিয়ের প্রস্তাবটি প্রথম সাক্ষাতে এইভাবে দেয়ায় মারিয়ার সেই ধারনা আরো পাকাপোক্ত হল। তাঁর মনে হল এই মুহূর্তে উলিয়ানভ পরিবারের পাশে একজন মানুষ দরকার যে দায়িত্বশীল। তাই তিনি মুখে বললেন,
-এ তো খুশীর খবর মার্ক তিমিওভিয়েচ এলিজারভ। আপনার প্রস্তাবে আমার আপত্তির তো কারণ নেই। আন্না আপনার কথা আমাকে বলেছে।

-আপনি আমাকে দুঃশ্চিন্তা মুক্ত করলেন। সামারা থেকে কাজান আসার এই পথটুকুতে কতবার যে ভেবেছি যে আপনি যদি সম্মতি না দেন। আপনি আমাকে ভারমুক্ত করলেন। আপনাকে আমি একটি অনুরোধ করবো?

-কি?

-আপনি জানেন যে সাশা আমার বন্ধু ছিল। আপনি আমাকে মার্ক বলে ডাকবেন এবং আমাকে তুমি করেই বলবেন।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা খুশী হয়ে বললেন,
-ঠিক আছে, তাই হবে।

সেদিন রাতে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা, আন্না ও মার্ক এলিজারভ ডিনার শেষে যখন গল্প করছিল, কথা প্রসঙ্গে ভ্লাদিমিরের বর্তমান ব্যস্ততা, সক্রিয়তা এবং সেই সাথে মারিয়া তার উদ্বিগ্নতার কথাও বললেন। তিনি এটাও বললেন যে তিনি পারিবারিক শান্তি চান, তিনি চান না পুলিশ তাঁর বাড়িতে আসুক, ভলোদিয়াকে পুলিশ আর কখনও গ্রেফতার করুক কিংবা আরো খারাপ কিছু হোক। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা এটাও বললেন যে, তাঁর ইচ্ছে ভলোদিয়া পারিবারিক কিছু দায়িত্ব পালন করুক। একই সাথে কাজানে ভলোদিয়ার গতিবিধি নিয়ে তিনি যে চিন্তিত সেটাও বললেন। সব শুনে মার্ক এলিজারভ বলল,
-আপনি কিছু মনে না করলে আমি একটা কথা বলতে পারি।

কথাটা বলার আগে মার্ক অবশ্য আন্নার মুখের দিকে চেয়ে যেন একটা অনুমোদন নিয়ে নিল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা বললেন,
-হ্যাঁ, স্বাচ্ছন্দ্যে। আমি তোমাকে আমাদের পরিবারের একজনই মনে করছি।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার এ কথায় আন্না ও মার্ক পরস্পরের চোখের দিকে তাকালো এবং বুঝা গেল মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার কথায় দু’জনেই খুশী হয়েছে। মার্ক একটু সামনে ঝুঁকে বলল,
-আমার ভাই কয়েক বছর আগে সামারায় একটা স্টেট কিনেছে। কাছাকাছি আরেকটা স্টেট বিক্রি হবে বলে শুনেছি। আপনি ইচ্ছে করলে সেটা কিনতে পারেন এবং ভ্লাদিমিরকে স্টেট দেখাশুনার কাজে লাগাতে পারেন। এছাড়া স্টেটের ভিতরে বড় একটা বাড়ি আছে, পুকুর আছে, গরুর খামার আছে। আপনারা সেখানে সবাই মিলে থাকতেও পারবেন।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা এবং আন্না দু’জনেই মনোযোগ দিয়ে মার্কের কথা শুনছিল। তার কথা শেষ হলে সে দেখলো মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা যেন গভীর কিছু চিন্তা করছেন। তাই সে চুপ করে আন্নার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আন্নার চোখে মুখে সে দেখছে এক রাশ ভালবাসা ও আস্থা। এমন সময় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা জিজ্ঞেস করলেন,
-জায়গাটা কোথায়?

-সামারার আলাকায়েভকাতে।

-কতটুকু জায়গা?

-২২৫ একর। ঐ স্টেটের পাশের স্টেটটির মালিক আমার ভাই। তার স্টেটটি অবশ্য ছোট, মাত্র ১২০ একর।

-কেমন দাম পড়তে পারে?

-এই স্টেটের বর্তমান মালিক গ্লেভ উসপেনস্কি। এটাই তার বিশাল স্টেটের সর্বশেষ অংশ। তিনি বাকীগুলো আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি এখন থাকেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। তিনি চাচ্ছেন এমন কারো কাছে বিক্রি করতে যারা নিজেরাই স্টেটটি সরাসরি তদারকি করবেন। এবং তেমন কাউকে পেলে তিনি কিছুটা কমেই ছেড়ে দেবেন বলে শুনেছি। তবু আমার ধারনা ৭৫০০ থেকে ৮০০০ রুবল পড়বে।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা কিছু একটা দ্রুত ভাবলেন। তারপর বললেন,
-আমি বিষয়টি নিয়ে সত্যিই ভাবছি। আন্না, তোমার অমত নেই তো?

আন্না মাথা নেড়ে তার অনাপত্তি জানালে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভা বললেন,
-তোমরা একটু কথা বলো, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা গেলেন ভ্লাদিমিরের ঘরে। তিনি সরাসরি তাকে কথাটা বললেন। শুধু বললেন না যে তিনি তাড়াতাড়ি কাজান ছাড়তে চান ভলোদিয়ার নিরাপত্তা এবং তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই। ভ্লাদিমির প্রথমে না করলেও মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা পরিবারের আয়-ব্যয়, আন্নার বিয়ে, ভবিষ্যতে ওলগার পড়ার খরচ, ছোট দু’ভাই-বোনের পড়াশোনা-সব বললেন তখন কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে রাজী হলে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ফিরে গেলেন মার্ক ও আন্নার কাছে। তিনি বসতে বসতে বললেন,
-মার্ক, তুমি আমার হয়ে জায়গাটা কেনার বিষয়ে কথা বলতে পারবে?

– সেটা কোন সমস্যা না, কিন্তু আপনি অন্তত জায়গাটা একবার দেখুন।

-দরকার হবে না। তুমি যখন বলছো, আমি নিশ্চিত যে সেটা ভালই হবে। তুমি কথা বলো।

-ঠিক আছে। আমি আগামীকালই ফিরে গিয়ে কথা বলবো।

আন্না মার্কের কথা শুনে বলল,
-তুমি কালকেই চলে যাবে?

মার্ক কিছু বলার আগেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা বললেন,
-তোমরা কথা বলো, আমি যাচ্ছি। শুভ রাত্রি!

এরই মধ্যে ভ্লাদিমিরের সাথে পরিচয় হল পিপলস্ ফ্রিডমের বিখ্যাত সন্ত্রাসবাদী নেতা এম পি চেতভারগোভার সাথে। তিনি তখন কাজানেই বাস করছিলেন। একই সময় তার পরিচয় হলো এন ই ফেদোসেভের গ্রুপের ছেলেদের সাথে। ফেদোসেভ নিজে একটা পাঠচক্র চালান কাজানে এবং নিজেকে মার্কসিস্ট দাবি করেন। যদিও রুশ বিপ্লবী ও মার্কসীয় পণ্ডিত গ্রেগরি প্লেখানভের তৈরি দলের চিন্তার সাথে তার সুস্পষ্ট মতভেদ আছে। তিনি এ্যাগারিয়ান স্যোসালিস্টদের মত মনে করেন যে রুশ বিপ্লবে কৃষকের ভূমিকা হবে উল্লেখযোগ্য। এই গ্রুপের সাথে পরিচিত হয়েই ভ্লাদিমির প্লেখানভের লেখা, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো, ডেভিড রিকার্ডো, চার্লস ডারউইন, হেনরি বাকলে, কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের লেখার সাথে পরিচিত হলো এবং সে সব লেখা গ্রোগ্রাসে পড়তে লাগলো। এই গ্রুপের সাথে পরিচিত হয়েই সে এমিলি জোলার ‘জারমিনাল’ বইটি পড়ে এবং তাঁর অন্য আরো লেখার সাথে পরিচিত হতে শুরু করে। সে এতটাই প্রভাবিত হয় যে জোলা’র একটি ছবি কেটে তার মানিব্যাগে রাখে। তার মানিব্যাগে এখন দু’জনের ছবি-চেরনিশেভস্কি ও এমিলি জোলার। তখনও তার সাথে ফেদোসেভের দেখা হয়নি কিন্তু তাদের গ্রুপেরই একটি ছেলে একদিন তাকে কার্ল মার্কসের ‘পুঁজি’র প্রথম খণ্ডটি পড়তে দিল।

পুঁজি’র প্রথম খণ্ডটি বাড়িতে এনে সেই রাতেই সে পড়তে শুরু করে। বইটি যখন সে পড়া শেষ করে তখন সবেমাত্র ভোর হচ্ছে, আলো তখনও ফুটতে শুরু করেনি। আর্কিমিডিস যেমন তাঁর আবিস্কারে আনন্দিত হয়ে বলেছিল ‘ইউরেকা’, ভ্লাদিমিরও যেন এতদিন যা খুঁজছিল তেমন কিছু খুঁজে পেয়ে অস্থির হয়ে পড়লো-তার সদ্য আবিস্কারের কথাটা কাউকে বলার জন্য। এই ভোরে কথাটা কাকে বলা যায়? ভাবতেই প্রথম যার কথা তার মনে হলো সে আন্না। আন্না এত ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে কিনা সেটা চিন্তা না করেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ছুঁটলো আন্নার ঘরে। কয়েক ধাঁপ উঠতেই দেখে সিঁড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে আন্না। ভ্লাদিমির অনেকটা লাফিয়ে আন্নার কাছে পৌঁছে তার হাত ধরে নীচে নামতে নামতে আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের সাথে বলল,
-অ্যানিউটা, আমি এই মাত্র কি পড়ে শেষ করেছি সেটা জানলে তুমি অবাক হয়ে যাবে?

আন্না ভ্লাদিমিরের উচ্ছ্বাসের কারণ ধরতে না পারলেও তার ভাইটিকে সে ঠিকই চেনে। তাই যতটা সম্ভব বিস্মিত গলায় জানতে চাইলো,
– কি পড়েছো?

ততক্ষণে তারা যে রান্নাঘরটি ভ্লাদিমির নিজের পড়ার ঘর বানিয়েছে সেখানে এসে পড়েছে। আন্না দেখলো ভ্লাদিমির রান্নাঘরের স্টোভের পর কাগজ দিয়ে সেখানে বসার জায়গা বানিয়েছে। সেটা উপর বসে হাত-পা নেড়ে সে বলতে শুরু করলো,
-এতদিন ধরে যে সূত্রটি আমি ধরতে পারছিলাম না, কার্ল মার্কসের পুঁজি পড়ে আজ আমি সেটা ধরতে পারলাম। আজ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে একমাত্র শ্রমিকের হাতই ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ তৈরি করে- আর সেই উদ্বৃত্ত মূল্যের উপর তারই একমাত্র অধিকার আছে। আহ্ অ্যানিউটা! তোমাকে কি বলবো? কার্ল মার্কস অংক করে তাঁর বইয়ে এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমার চোখ তিনি খুলে দিয়েছেন। আমি এতদিন এই সূত্রটি খুঁজে পেতে কত দিকেই না হাতড়াচ্ছিলাম!

আন্না ভ্লাদিমিরের এতটা উচ্ছ্বাসের কারণটা যেন কিছুটা ধরতে পারে। সে নিজেও সাশার অনুপ্রেরণায় মার্কসের পুঁজির প্রথম খণ্ডটি পড়তে চেষ্টা করেছিল কয়েক বছর আগে। কিন্তু সে ভাল করে বুঝতেই পারনি। সে কথাটা ভ্লাদিমিরকে বলতেই ভ্লাদিমির বললো,
-অ্যানিউটা, এটা পানির মত সোজা। এসো, বস এখানে। আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।

কথা বলেই সেই রান্নাঘরের স্তুপকৃত বইয়ের কিছুটা একদিকে সরিয়ে রেখে, হাত ধরে আন্নাকে সেখানে বসিয়ে ভ্লাদিমির তাকে মার্কসের ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ তথা ‘উদ্বৃত্ত মুল্য’ বুঝাতে শুরু করে। দুটি পাহাড়ের ফাঁক গলিয়ে সকালের ঝলমলে আলোটা ততক্ষণে তাদের রান্নাঘরের দেয়ালে এসে পড়েছে। সূর্যের আলোর ছটা ক্রমশ বাড়তে থাকে, কিন্তু ভ্লাদিমির বা আন্না কারো সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ছোট ভাই মার্কসের ‘পুঁজি’ বুঝিয়ে চলেছে বড় বোনকে।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top