শের।। এ, টি, এম, মোস্তফা কামাল

১.

জীবনটা ফুল, পাখি, কবিতায় ব্যয় হবে, কথা তো এটাই ছিলো।
অথচ, কামাল, কাজের বাহানা করে শেষ হলো তোমার জীবন!

২.

সভয়ে তাকিয়ে দেখো, হে কামাল, চুল জুড়ে শুভ্রতার খেলা-
অথচ বাজারে দেখো,ছেলে বুড়ো আর কারো চুলই পাকে না!

৩.

ফুলের খবর পেয়ে উড়ে আসে প্রজাপতি আর মৌমাছি;
হাজার প্রেমিক আসে, সেই ভীড়ে লীলাময়ী, আমিও যে আছি!

৪.

যে মুখ গড়িনি আমি, খোদাতালা করেছেন দান।
সেই দোষে দিনরাত জোটে কেন এতো অপমান?

৫.

হায় খোদা, কতো তুচ্ছ আমি, পিঁপড়াও আড়ালে ফেলে রাখে;
এতো বড় মহামতি হাতী আমাকেই শত্রু ভেবে থাকে!

৬.

নগরীর কোনো রাত প্রকৃত রাতের মতো নীরবতা শরীরে মাখে না।
প্রকৃত রাতের রঙে ডুবে গিয়ে আঁধার চাদর দিয়ে নিজেকে ঢাকে না।

৭.

নাগরিক অপ্রকৃত রাতেরা যে ভেদ জানে সকল লোকের।
মায়াবী আঁধার মেখে প্রকৃত মুখোশ খোলে সকল মুখের।

৮.

মানুষের সাথে শুধু এ শহরে কাকেরাই থাকে।
কি করে সকাল হবে আর কোনো সুমধুর ডাকে?

৯.

তোমার গানের সুর যতোই সুরেলা হোক, কোনোদিন তুমি তো বাজো না।
যতোই সাজের ছবি মুখে আঁকো, আসল চেহারা পরে কখনো সাজো না!

১০.

চন্দন চিতায় রেখে মুখে আঁকো গর্ব ও শোকার্ত ভাব;
পোড়ার নিয়তি যার কাঠের মাহাত্ম জেনে আছে কোনো লাভ?

১১.

চুলায় যা পোড়ে তার গন্ধ পাখা মেলে;
কথায় পোড়ালে তার আভাস কি মেলে?

১২.

ছোটখাটো পৃথিবীটা জেগে থাকা চরাচরে সরবে জানায়।
অসীম আকাশলোকে নীরবতা মিশে আছে কানায় কানায়।

১৩.

’বড়ো’ তার সব ধার ভরে রাখে খাপে;
’ছোট’ সেই দৈর্ঘ্য প্রস্থ গলা দিয়ে মাপে!

১৪.

ওপরে যে বসে আছে মহিমায় ফুলে-
পতনের নিয়তিতে রয়েছে সে ঝুলে!

১৫.

আমাকে বেস্টিত করে অফুরন্ত জ্ঞানের প্রবাহ;
সেই জ্ঞান বয়ে আনে বেদনার নিরালোক দাহ।

১৬.

সকল নেশাকে যদি বদগুন ভেবে বসে থাকো
তাহলে তুমিই কেন নেশার আগুন সেজে থাকো?

১৭.

চুমুর প্রবল নেশা জেগে আছে মুখে-
কার ঠোঁট এই নিয়ে দ্বিধা নেই বুকে!

১৮.

দিনরাত কবি তুমি ঢুলু ঢুলু চোখে চেয়ে থাকো!
মদিরা, না সোহাগিনী, কাকে তুমি পেয়ালায় রাখো?

১৯.

চিরকাল ভুল চোখে জ্বলে থাকে সবুজ ইশারা;
রঙিন আলোর মেলা মনজুড়ে ফেলে দেয় সাড়া।

২০.

ঝমঝম টিন বাজে অবিরাম ঘোর বরষায়;
বুকের কোথায় যেন হুহু করে কেউ কেঁদে যায়!

২১.

অনেক দূরের কেন্দ্র থেকে ঘটছে ভূমিকম্প;
দূরের ছোট চাউনি থেকে উঠছে হৃদয়-কম্প।

২২.

রক্তরূপী বুকের ক্ষরণ বদলে হলো আগুন!
ঘুমকাতুরে মনকে বলি, জনাব এবার জাগুন।

২৩.

লজ্জা পেলাম হালকা সাজে রঙের মেলায় এসে
অন্য কিছু যায় না ভাবা সাজ-ভরসার দেশে।

২৪.

আমার দোষের লোভে কারা যেন বের হলো ডুবুরির খোঁজে;
তোমার ঠোঁটের বাড়ি পাশে ছিলো, ভুল পথে সফলতা খোঁজে।

২৫.

অনুযোগ নয় খোদা, সবিনয়ে জানার বাসনা;
আমার উঠানে কেন কোনো ছলে বেড়াতে আসো না?

[শের বাংলা কবিতার আসরে প্রায় শত বছর ধরে সমাদর পাওয়া অতিথি। বহু উমদা শের নানা গুণীর রত্নভাণ্ডার থেকে বাংলায় অনূদিত হয়েছে। আবার অনেক গুণী বাংলা ভাষাতেই শের এর আঙ্গিকে কবিতা লিখেছেন। শের প্রাচ্য সাহিত্যের এক অসাধারণ কীর্তি। আবেগ, ভালোবাসা, দার্শনিকতা আর মিস্টিক চেতনা শেরকে ঋদ্ধ করেছে। বাকচাতুর্য আর রহস্যময়তাও শেরকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বহুদিনের আতিথেয়তার বদৌলতে শের এখন বাংলা কবিতার অংশে পরিণত হয়েছে।

শের-এর চলনের সাথে বাংলা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের চলনের মিলই বেশি। আমার বিবেচনায় বাংলায় শের-চর্চার জন্য অক্ষরবৃত্তই সবচেয়ে মোক্ষম ছন্দ। তবে শের চর্চার সময় আমি মাত্রাবৃত্ত আর স্বরবৃত্ত ছন্দকেও শের-এর বাহন করে তোলার চেষ্টা করেছি। শের অন্ত্যমিল রেখেও লেখা হয়। আবার অমিত্রাক্ষরেও লেখা হয়। স্বয়ং আসাদুল্লাহ খান গালিব শের লিখেছেন অন্ত্যমিল ছাড়া। আমি মিল ছাড়া শের-এর চেয়ে মিল রেখে শের লিখেছি বেশি। সেটা হয়ে গেছে ছন্দের খাতিরে। সে সাথে আবহমান বাংলা কবিতার অন্ত্যমিলের প্রতি আমার দুর্বলতার কথাও স্বীকার করে নিতে চাই।

শের মূলত: গজলের অংশ। উর্দুতে গজল এসেছে প্রতিবেশী ফারসী সাহিত্য থেকে। তবে উর্দু গজল খুব দ্রুতই ফারসী গজল থেকে কিঞ্চিৎ ভিন্ন পথে চলে স্বতন্ত্র চেহারা লাভ করেছে। প্রতিটি শের গঠিত হয় দু’টি পংক্তি বা ’’মিস্রা’’ মিলে। প্রথম পংক্তির নাম ’’মিস্রা-ই-উলা’’ আর দ্বিতীয় পংক্তির নাম ’’মিস্রা-ই-সানি’’। প্রতিটি শের একটি অভিন্ন ভাবের দ্যোতক। শের-এর বহুবচন ’’আশার’’। কিন্তু একই গজলের শেরগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্কের কোন বালাই নেই। একদম স্বাধীন, পারস্পরিক সম্পর্কহীন অনেক শের মিলেমিশে খাসা একখানা গজল হয়ে ওঠে। গরমিলই যেন সেখানে সবচেয়ে বড়ো মিলের ভিত্তি। এ রকম ৫ থেকে ২৫টি শের মিলে হয় একটি গজল। গজলের সূচনা শের-এর নাম ’’মাত্লা’’ আর সমাপনী শের-এর নাম ’’মাক্তা’’। ফারসী আর উর্দু সাহিত্যের সব রথী মহারথীই গজল লেখক হিসাবেও খ্যাতিমান।

গজলের বাইরে আলাদা শেরও রচনা করা হয়। এই সব একাকী শেরকে বলে ’’ফর্দ্’’। শব্দটি আমাদের কাছে খুব চেনা নয় বলে বাংলায় রচিত আমার একাকী শেরগুলোকে ফর্দ্ না বলে শের-ই বলছি। বাংলা কবিতায় নানা মাত্রা যুক্ত হচ্ছে প্রতিভাবান অনেক গুনীর হাতের স্পর্শে। কবিতায় ঘটছে নানা পালাবদল। সেই পালাবদলের সুরে আমি ’মিড়’ হিসাবে নতুন কিছু ’’শের’’ পেশ করলাম গুণীদের দরবারে। সুরসিক পাঠককূলের উমদা উমদা সব কাব্য-ভোজে এ সব শের চাটনী হয়ে একটু স্বাদ বাড়ালেই এই অভাজন কৃতার্থ হবে।]

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top