এলিজি: শামীম কবীর II নভেরা হোসেন

১. কবিতা; শব্দের অন্তর্গত বোধ, নীরবতা, উড্ডীয়মানতা-এসবের মধ্য দিয়েই হয়তো কবিতার পৃথিবীতে ঝঞ্ঝারত কবিকে অনুভব করা যায়, তার সময়কে দেখতে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকের প্রয়োজন হয় না, কবিতার পাঠ খুঁড়ে নেয় মমি হয়ে যাওয়া ভাষাকে। ভাষা তার কালকে শব্দ দিয়ে বেঁধে নেয় কবিতায়। কোনো একজন কবির দু-একটা শব্দ, কবিতার চরণ মাথা ভেদ করে চলে যায়। পাঁজরে বিঁধে থাকে ত্রিশুল হয়ে অনন্তকাল। শামীম কবীর তেমন একজন কবি যার শব্দে শব্দে ইস্পাতের ধার,কেড়ে নেয় চোখের ঘুম, রাত্রির নিকষতা। নব্বইয়ের আগুনঝরা এপ্রিলে জারুল, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়ারা যখন ফুটছিল শহরের অন্ধগলিতে তেমন এক সময়েই শামীম কবীরের সাথে দেখা, পরিচয়। তরুণ বয়সে বন্ধু হয় অনেকেই, তাদের ভেতরকার ক্ষুরধার, পেলবতা, নির্মাণ করে চলে মানবিক সম্পর্কের স্থাপত্য। দুজন মানুষ পরস্পরের সান্নিধ্যে আসার পর যখন তাদের অন্তস্থ মানস স্ফুলিঙ্গ নিয়ে জ্বলে ওঠে, সৃষ্টি করে কবিতা, গান,চিত্রকলা তা এক অনুপম বিস্ময় সৃষ্টি করে, যার মূল্য সময়কে ছাপিয়ে যায়, বেঁচে থাকে মানুষের মনে। এক ঝাঁক তরুণ কবির স্বপ্ন দিয়ে তৈরি নদী পত্রিকার সংস্পর্শে যখন আসি তার আগেই শার্ল বোদলেয়ারের শহুরে ফ্যাকাশে নারীর অবয়ব মাথায় ঢুকে পড়েছিল। তার সাথে ফ্রানৎস কাফকা, আলবেয়ার কামু, সিলভিয়া প্লাথ,জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে সব একাকার হয়ে মিশেছিল মন মগজে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত নদী পত্রিকার কবি হিসেবেই শামীমকে প্রথম পড়ি। তাঁর কবিতা-শামীম কবীর, খোঁড়া নর্তকী, যাওয়া, এখানে একজন কবি, ইকারুস,শাসনচিত্র পড়তে পড়তে নতুন এক ঝড়ের সাথে দেখা হয়, যার বসবাস সমুদ্রের নিচের আলোহীন প্রস্তর খণ্ডের হৃদপিণ্ডে। সকলের মধ্যে অনন্য সাধারণ হয়ে শামীম আমার বন্ধু হয়ে ওঠে। রায়েরবাজারের টালি অফিস রোডে আমার আর বন্ধু আব্দুল্লাহ আল মামুনের বাসা মুখোমুখি। সেও এক সময় কবিতা লিখত, নদী পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিল। মামুনের বাসায় চলে বন্ধুদের আড্ডা। ঐ আড্ডায় তখন অনেকেই আসত। আদিত্য কবীর,ইকবাল এহসানুল কবীর জুয়েল, তাজুল হক, ওয়াদুদ র‌্যানি, তানজিয়া জাহান পলি, স্থাপত্যের ছাত্র বায়েজীদ মাহবুব, মামুনসহ অনেকেই। আর দশটা আড্ডা যেমন নানা ঘটনা আর দুর্ঘটনায় পূর্ণ থাকে টালি অফিসের এই আড্ডাটাও ছিল তেমন, তার চেয়ে বেশি কিছু।

২. বন্ধুদের মধ্যে তখন শামীম, বায়েজীদ, তাজুল, আদিত্য, অভী, মামুনসহ আরো অনেকেই কবিতা লিখত। প্রথম পাঠেই শামীমকে একজন মেধাবী কবি হিসেবে পড়ি। সমসাময়িক অনেক কবি সেসময়ে তার দ্বান্দ্বিক কবিসত্তার পরিচয় পান। অনেককে আড্ডায় দেখা যায় অনেকেই লেখে,সহযাত্রী হয় কিন্তু কেন্দ্রে থাকে একজন। সেই আড্ডা থেকে বেরিয়ে আসে একজন বা দুজন কবি, লেখক, শিল্পী যারা পোড়া মদ আর সেঁকোবিষ গলায় ঠেলে হয়ে ওঠে নীলকণ্ঠ, পাহাড় কেটে বানায় অজন্তা, ইলোরা। শামীমও আমাদের আড্ডার প্রাণ হয়ে ওঠে। ভেতরে ভেতরে অশান্ত কবির অবয়ব কিন্তু বাইরেটা শান্ত, ক্যাটসআই চোখের গৌরবর্ণ ছেলে। কথা বলত খুব কম,কিন্তু খুব ক্ষুব্ধ সে কথা। স্বভাবে কোমল আর কঠিনের সমন্বয়। দু-একদিন মামুনদের উঠানঘেরা টিনের ঘরে রাত হয়ে গেলে শামীম গলা ছেড়ে গান করত-আমার রাজা ঘোরে বনবাসে গো, তারে কেমনে ফেরাই আমার প্রেমেরও নগরে...অথবা বন্ধু রঙ্গিলা, রঙ্গিলা রঙ্গিলারে…আমারে ছাড়িয়া বন্ধু কই গেলা রে…। শামীমের গানের গলা চমৎকার, মাঝে মাঝে সাগর সেন শুনতে শুনতে শামীমের মতো লাগত আবার শামীমের গান শোনার সময় সাগর সেনের কথা মনে পড়ত। রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে আটাশি সালে বিজ্ঞান বিভাগ হতে এসএসসি তারপর রাজশাহী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক এর পাঠ। পরে একানব্বই সালে এইচএসসি (পরীক্ষা অবশ্য এ কলেজ থেকে দেয়া হয়নি)। তবে শামীম কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিল না। অনেকটা পারিবারিক আর সামাজিক কারণেই যতটুকু করতে হয় করত। অল্প বয়স থেকেই সে ভাবতো কবিতা লিখবে আর এই তার একমাত্র কাজ। অল্প কয়েক বছরের লেখালেখির জীবনে বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে সে। বাংলা অঞ্চলের নব্বুই দশকের কবিদের মধ্যে শামীমের কবিতা অন্যতম। অবশ্য কবিকে দশক ধরে দেখাটাও খুব খণ্ডিত একটি বিষয়। সে অর্থে বলতে গেলে শামীম নতুন কাব্যভাষা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। আধুনিক নিঃসঙ্গ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করেছে সে মর্গের দমবদ্ধ ঘরে। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে ‘ম্যান সাইজ আরশি কিংবা আত্মহত্যা বিষয়ক গল্প’র মতো কবিতা।

৩. একানব্বই সাল। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট তখন সবে তৈরি হচ্ছে। পাঠকসমাবেশ, সন্দেশ কয়েকটি বইয়ের দোকান গড়ে উঠেছে। মার্কেটের দোতলা আর তিনতলা উঠবার সিঁড়িতেই ছিল মূল আড্ডা। মাঝে মাঝে এমন হতো, সিঁড়ির শুরু থেকে মাথা পর্যন্ত ভর্তি হয়ে যেত অসংখ্য কবি এবং কবিতায়। আসত বিষ্ণু বিশ্বাস, সাজ্জাদ শরীফ,ব্রাত্য রাইসু, মাশরুর আরেফিন, শাহেদ শাফায়েত, আয়শা ঝর্না,জুয়েল মাজহার, ফরিদ আহমেদ অনেকেই। আড্ডাগুলোতে শামীম সব সময় থাকলেও অনেক সময়েই আত্মমগ্ন হয়ে থাকত,পকেটে দু-একটা কবিতা। ভিড়ের মধ্যে সে লিখে যেত। শামীম কবিতা লিখে বন্ধুদের পড়ে শোনাতে পছন্দ করত। আজিজ মার্কেট তখন ছিল আমাদের বাড়ি-ঘর। পাবলিক লাইব্রেরিও। সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে যেতাম। বন্ধু তাজুলের বড় ভাই আর্টিস্ট সাইদুল হক জুইসের বাসা ছিল ধানমন্ডি পনেরো নম্বর। সেখানেও আড্ডা হতো। মাঝে মাঝে শাহবাগে মার্কেটের সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকত শামীম, তখন তাকে দেখাত একটা লম্বা নাকওয়ালা ধনেশ পাখির মতো। গরম শামীমের সহ্য হতো না, লাল হয়ে যেত, পানি খেত খুব। বুয়েটের তিতুমির হলের ২০৮ নম্বর রুমে বন্ধুদের সাথে অনেক সময় কাটিয়েছে শামীম। তিতুমির হলের গেস্ট রুমেও আড্ডা চলত। বুয়েটের মামুন ভাই, জয়ন্ত ভাই এদেরকে মনে পড়ছে। শামীমের ক্যাডেটের এক বন্ধুও বুয়েটের হলে থাকত, সেখানেও মাঝে মাঝে থাকত শামীম। সোবাহানবাগের ডেন্টাল হোস্টেলে বগুড়ার ও ক্যাডেট বন্ধুদের সাথে বহু সময় কাটিয়েছে শামীম। ৯১-৯৩ এর দিনগুলোতে শামীম এবং আমাদের বন্ধুরা সকলেই চরম বোহেমিয়ান দিন কাটিয়েছি, যা এক দুর্লভ সময়- হয়ে মিশে আছে রক্ত-মগজে। সমসাময়িক কবিদের মধ্যে মাসুদ খান, বিষ্ণু বিশ্বাস, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মজনু শাহ, রায়হান রাইনসহ আরো অনেকের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল; সে সময়ে একাডেমিক ডিগ্রী না নেওয়ার বিষয়ে শামীম মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল আর সকল ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকে বাইরে থাকতে চেষ্টা করত। সাহিত্যও সে করতে চাইত যেখানে খুব স্বাধীনভাবে লেখা যায়, যা শিল্পোত্তীর্ণ তেমন কাগজে, লিটল ম্যাগাজিনে। কবিতার ধ্যানে নিমজ্জিত হয়ে থাকত সে,ভাষার প্রেমে, শব্দের প্রেমে। নিবিড়ভাবে তা ঘটে চলত তাঁর ভেতরে এবং খুব স্বাভাবিকভাবে। কোনো আরোপণ নয়, এমনকি কবিতা লেখাকে সে বিশেষ কিছু ব্যাপার মনে করত না। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, কেউ কাঠ ছাঁচে, কেউ রান্না করে এরকমই বা কেউ পদ্য লেখে। মানুষের মৌলিক ঘটনাগুলোর একটি। শিল্প নিয়ে কচকচানি শামীম সহ্য করতে পারত না বলে লোকসমাগম থেকে দূরে থাকত। লেখালেখির পুরো বিষয়টাই তার কাছে খুব সাধারণ ও সহজাত এবং তা আবহমান গ্রন্থি থেকে গ্রন্থিতে ও বিষয থেকে বিষয়ান্তরে বিরাজমান-এই ছিল তার অভিপ্রায়। বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলোতে শামীমের মধ্যকার বোহেমিয়ান শিল্পীর সাথে দেখা হয় যে ভেতরে ভেতরে নরম তুলোর মতো উড্ডীয়মান, নিমগ্ন নিজস্ব কল্পনার জগতে- যেখান থেকে উঠে আসত শব্দ, বিভাস, বিভাসিতধ্বনী।
অতর্কিত একটি পিছল কাঁখ
আমাকে বহন করে
যুদ্ধের বাহিরে একা অনবদ্য কন্যকায়
মিঠা সংগঠন
একটি অচল মগজের মোম আজ আরো
সত্যি সত্যি জ্ঞানী হ’য়ে ওঠে
এইসব চিত্রকল্প তাঁর কবিতায় তৈরি হতে থাকে। যা শুধু শব্দ নয়, বাক্য নয় এর মধ্যে কবি সন্তরণরত, আকন্ঠ নিমজ্জিত। করাত দিয়ে পা কাটবার দৃশ্য দেখবার মতো ঋজু কবি অনন্তর যাত্রা করেছিল অধরা কবিতার পৃথিবীতে আর তাই বুঝি কবিতার সাথে ক্ষণিকের বিচ্ছেদ তাঁকে করে তোলে নৃশংস। হ্যাঁ নিজের প্রতি।
কী ভীষণ অস্থিরতা যে নিজেকে এখনও স্থির কাঠির মতো দেখে নিয়ে মাপতে পারলাম না
আর একটা বিশাল করুণ ঘণ্টার মতো একটা মহা কৌতুক লেগে আছে আমার চোয়ালে, কণ্ঠায় বুকের ওপর দুই পাঁজরে
যাকে প্রাণপনে ভালোবাসি তাকে ভালোবাসতে না পারা
এই ছিল কবির নিদারুণ যন্ত্রণার উৎস।

৪. মালিনীকে জল তুলে দিতে হলে বাগানেই রাত্রপাত হবে। সহস্র বছর আর তারও অধিককাল নিদ্রা গেলেও রাত্রি জেগে থাকে, অনন্তকাল তার ডানা ঝাপটানো। মাথার ভেতর খেলা করে লক্ষ লক্ষ উঁইপোকা। তাদের অন্ধ হওয়ার গল্প সবার জানা। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে রাতের সকাল, সকালের রাত্রি। শামীম কবীর কবিতায় যে ভূ-খণ্ডে বাস করেছেন তা খানিকটা লবন দিয়ে পোড়া কিন্তু তিতকুটে নয় মুখে দিলে সাই করে একটা তড়িৎ-প্রবাহ শিরা-উপশিরায় রক্ত-সঞ্চালন, একঝলক উষ্ণতা। তবে গ্লাসিয়ারের নির্মম শীতলতাও ভর করে তার কবিতায়। এটা অনেকটা যুদ্ধের দিনে ট্রেঞ্চের নীচে পথ খুঁজে বেড়ানোর মতো। হাঁটছো, হাঁটছো চারদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি, মড়কলাগা ইঁদুর,পচা দুর্গন্ধময় গলিত মানুষ। এভাবেও চলতে থাকে কালের চাকা, সে কখনো নিজের ডানায় জুড়ে দেয় বিদ্যুতের আলো কখনো ভেঙে ফেলে কাঁচের তৈরি হাতদুটো, যে হাত তাকে লাঙলের ফলা ধরতে শেখায়। রং রং নয় রক্ত ঝরিতেছে। এই রং লাল,এই রং সবুজ, এই রং বর্ণহীন। হ্যাঁ শামীমের কবিতায় সে রঙের দেখা পাওয়া যায়। পাতার নীচে যে অন্তর্জাল সে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে শিল্পীর আঁচড়ে কখনো কবিতার অক্ষরে। জন্ম এবং মৃত্যৃ। এ দুটোই অপরিহার্য মানে এটা একটা চক্র, চক্রায়ন, চক্রমন। ছোট শিশু একদিন পক্ককেশ তারপর তার এপিটাফে লেখা থাকে এমন সব ঠিকানা যা ঐ মুহূর্তের তাকে চেনায় না। শামীম কবীরের কবিতায় এই ঘূর্ণন খুব নির্বিকারভাবে সন্তরণশীল। তাকে বলতে দেখি-

একটি পাতার একটি জীবন
গজায় বা ফোটে
তারপর বাতাস থেকে কয়লা বনের গ্যাস নেয় গ্যাস
উড়ন্ত ঝিরিঝিরি বল্লম ফলার মতো
প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী আড়াআড়ি দেখে
তারপর মূল পথে পানি টানে
আর স্ফীত হয় (প্রাকৃতিকদৃশ্যাবলী)

অন্যত্র-

একদা সেখানে ছিলো নীরবতা
(এবং)ছিলো নিবিড়তা
একজন দুইজন আর কিংবা তিনজন
ক্রমে লোকালয় সরে গ্যাছে।(আরো এক টুর্নামেন্ট)

এই হচ্ছে শামীমের কবিতার দ্যোতনা। একই সাথে সময়ের ভেতর সময়ের মন্ত্রণা। কুঁজো খেজুর গাছের স্মৃতি ভাসে তার মনে যেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে ঠনঠনিয়ার এপিটাফ। যেখানে লেখা আছে-

জ্ঞানী কবরের স্কন্ধে চরে ফিরে এখানে এলাম
ছোটো ছোটো অট্টহাস্য মাখা ধুলা ঘাস ও বাতাস
এখানের এই নাম অন্যপুর নিহিত রেখেছে
থাবন্ত আগুনে ছাওয়া এ যে সেই খাঁ খাঁ পারগেটরী। (মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)

শামীমের কবিতায় শব্দ নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে, ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের ভেতরের দুয়েন্দে শব্দ ফুঁড়ে অন্য এক অর্থের ডাইকোটমিতে পরিভ্রমণশীল –

তুমি কি জ্যান্ত? তোমাকে বলেছি চমকাও।
আলতার দাগে ভরে গেছে নীল মুখটা
চারদিকে ওড়ে উদ্ধোধনের ঝিলমিল তাতে ছটা নেই
চারদিকে ভাসে নাকি বমোন

এমন সব কথার জালে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে কবির পৃথিবী যেখানে সে নিজেই তৈরি করে চক্রবূহ্য। এই চক্রে আবর্তিত হতে হতে কবি হয়ে ওঠেন ধারাল পৃথিবীর মতো সর্পিল। তার ভাষা আর কবিতা কেটে ফেলে গত শতকের লাল গালিচাকে যেখানে পশমের ভাঁজে লুকানো থাকে গোলাপ পাপড়ি, তারাখচিত বসরাই ঝালর। নিজের তৈরি চক্রবূহ্যকে ভেঙে কবিকে হাঁটতে দেখি খোলা প্রান্তরে যেখানে রেডিয়োতে গান বাজছে-

যে মতে ধুলার স্মৃতি হলো ছারখার
সে মতে ফিরিলা তুমি ফিরিলা আবার
অশরীরী পুড়ে খাক শরীরী অনলে
আর তার বায়ুঘের ধিকি ধিকি জ্বলে (রেডিয়োতে গান)

৫. নির্বাচিত কবিতা: শামীম কবীর সম্পাদনা করতে গিয়ে কবির মূল পাণ্ডুলিপি এবং দ্রষ্টব্য থেকে প্রকাশিত শামীম কবীর সমগ্র বহুবার পড়েছি। এছাড়া কবির সতেরো বছর বয়সে লেখা একটা বেগুনি রঙের ডায়েরি, বেগুনি মলাটের পাণ্ডুলিপি, বন্ধুদেরকে লেখা চিঠি এসব কবির মনস্তত্ত্ব বুঝতে অনেক ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। বেগুনি ডায়েরি আর পাণ্ডুলিপির খাতাটা কবি নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। মানসিক জগতে দুরন্ত ঘোড়ার তারুণ্য নিয়ে লেখা আর তা সংরক্ষণের বিষয়ে কবি অনেকটাই নিঁখুত। তার হাতের লেখায় যেমন শিল্পীর ছোঁয়া আছে প্রতিটি কাজে এবং কথায়ও। সে কথা অন্য কোথাও কোনোদিন লিখবো হয়তো। একজন কবির কবিতাকে পড়তে গেলে যেমন সেই কবিকেও পড়তে হয় কথাটা যেনো এই কবির ক্ষেত্রে অনেক বেশি সত্য। মনে পড়ে যাচ্ছে মা’র সঙ্গে বাক্যালাপের কথোপকথন, যেখানে কবি মাতাকে সমোদরা জেনে তার যৌবন ছুঁয়ে যান –

মা আমার যেরকম লাগে
চক্রাকারে সে রকম মূর্ছা
সিড়ি হারিয়ে আর কে কোথায় পেয়েছিলো কবে (মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)

এই সব বাক্যে কবিকে মা অর্থাৎ নারীর মনন ও দেহের নৈকট্য অনুভব করতে দেখা যায়। পুরুষতান্ত্রিক বাঙালী সমাজে কবির উচ্চারণ তার মনস্তাত্ত্বিক গঠনকে বুঝতে অনেকটা সহজ করে দেয়, এখানে মা অনেক সময় চিরায়ত বন্ধনী ছেড়ে অন্য সত্ত্বাকে প্রকাশ করে। কবিতায় কবি নিজের আত্মকে প্রকাশ করেছেন। জানিনা কথাটা কতোটা গ্রহণযোগ্য হবে কিন্তু শামীমের কবিতা পাঠে তার অন্তর্গত অশান্ত আত্মা বা সেই সত্ত্বাকে পাওয়া যায় যে ধুলিঝড়ের শরীর থেকে খসে পড়ে যাচ্ছে ধুলায় ধুলায়। এই অনুভব একজন কবির নিজেকে যেকোনো লিভিং বিয়িং অথবা অবজেক্টের সাথে একাকার হয়ে যাবার চিন্তন প্রক্রিয়ার সাথে দেখা করিয়ে দেয় –

তোমার বিপুল গড়নের মধ্যে
কোনোখানে
এক টুকরো জটিল উল্লাস আছে
তার স্পর্শে বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণ
আর আমি ভয়ে ভয়ে
মানুষ হয়ে
উঠে দাঁড়াই
কিন্তু পা কোথায়
হা হরতন হো ক্যুইট (মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)

শামীমের কবিতায় ক্লাসিক কবিদের ধারাবাহিকতায় নিজস্ব এক স্বর শুনতে পাওয়া যায় যা একান্তই তার নিজস্ব, যা ভাসিয়ে দেয় পূর্বের অনেক লেখনীকে। চর্যার কাহ্নুপার প্রতীকি পুত্রবধু সবাক হয়ে ওঠে কবির কবিতায় –

কী যে ভুল ঘোর লাগে কাহ্নু বাঁশি শুনে দুর্বল গাছের ডালে আমার যে প্রাণ-পাখি বাঁধা
আহা আগাই পিছাই শুধু হৃৎপিণ্ডে খুন্তি ছ্যাঁকা পুরান কাঁথার নক্সা কতো আর চক্ষে
সয় জানালায় টিয়া ডাকে তীরন্দাজ কোন সে দূর থেকে বুকে মারে বাণ আমার…

.. শান্তি মনে নাই আমার যে প্রাণে বিষ কেউ
জানলে সর্বনাশ হবে ওলো সই তোকে কই কাহ্নু প্রিয় এলে বলে দিস পোড়ামুখী কলস
নিয়ে যমুনা গিয়েছে (অবলা সংলাপ)

যে সকল কবিরা বাংলা ভাষায় নতুন চিন্তা ও ভাষার সূচনা করেছেন কবি সেখানে নতুন কিছু যোগ করেছেন। সমসাময়িক বাংলা কবিতায় ভাষা নিয়ে যে এক্সপেরিমেন্ট চলছে শামীমের কবিতা সেখানে অগ্রবর্তী। ইনডিভিজ্যুয়্যালি অনেকেই সে কাজটি করে যাচ্ছেন। শামীম নব্বুইয়ের সূচনাতেই ভাষা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন এবং স্বতস্ফূর্তভাবে যার ধারাবাহিকতায় অনেক কবিই লিখে যাচ্ছেন। সময়ের সেলাই কলে এসব পোশাক তৈরি হচ্ছে, হবে। নতুন দিন ও মানুষ সে পোশাক পড়ছে, পড়বে। এটা ঘটে অনেকটা এককালচারেশনের মতো করে। সংস্কৃতির প্রপঞ্চগুলো যেমন স্বতস্ফূর্ত এবং চাপানো দু-প্রক্রিয়াতেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাতায়াত করে তেমন লেখার ভাষা, মুখের ভাষা, কবিতার ভাষা,গদ্যের ভাষাকে তৈরি করে দেয় সংস্কৃতির সোসিওফ্যাক্ট, আর্টিফ্যাক্ট,ম্যান্টোফ্যাক্ট। সেখানে একজন শামীম কবীর একটা ভূমিকা রাখে যেমন রাখে চর্যাপদের কাহ্নুপা, রামায়নের চন্দ্রাবতী, ধূসর পাণ্ডুলিপির জীবনানন্দ, পুলিপোলাওয়ের সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। তালিকাটা খুব ক্লিশে হয়ে গেল হয়তো। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। আর প্রত্যেক কবিই তার লেখার সময়কালে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট, অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান। আলোচিত কবির লেখার সময়কালটা যেহেতু আক্ষরিক অর্থেই সীমিত সেক্ষেত্রে তার কবিতা নিয়ে কথা বলতে গেলে সময়ের একটা মাপের মধ্যে থাকতে হয়। ত্রিশ বছর বয়সে কবি কি লিখতেন বা চল্লিশে বা পঞ্চাশে তা দেখার সুযোগ আমাদের হয়নি, হবে না কিন্তু সাড়ে চব্বিশ বছর বয়সে তার লেখার যে ভলিউম তা অনেক সময় আমাদেরকে বিস্মিত করে, বিশেষত তার অন্তর্নিহিত চিন্তা আর ভাষার ব্যঞ্জনা, সর্বোপরি সেই কাব্যিকতা, কাব্যময়তা –

এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাথা গালিচায় শুয়ে
কুয়াশার মতো- তার নিদ্রামগ্ন ভাসমান চোখে ধীর লয়ে
শীর্ণ এক নদীর প্রতিমা ফ্যালে সুরময় ছায়া, শতাব্দীর
শুদ্ধতম শিলাখ- শিয়রে তার- ঠিক একগুঁয়ে
ধীবরের মতো : ছিন্নভিন্ন-ছেঁড়া জালে কৌশলে মরা নদীর
শ্রোণী থেকে অপরাহ্নে রূপালী ইলিশ ছেঁকে নেবে: পঁচা ঘায়ে
গোলাপের মধু ঢালা অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে য্যান। ভীষণ অস্থির
হাতে সে ক্যাবল বিষন্ন খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির। (এইঘরে একজন কবি)

এই ঘরে একজন কবি কবিতায় কবিকে এতো পরিণত আর বিচিত্র অনুসঙ্গের সাথে পরিভ্রমণ করতে দেখি যা প্রকৃত কবির আত্মার সাথে পরিচয় ঘটায়। গোলাপের পাপড়ি হতে শীর্ণ নদীর গহবরে কবির যে পরিভ্রমণ। কোথায় দেবো রাজস্ব পাণ্ডুলিপির অন্যান্য কবিতা- শামীম কবীর, সমুদ্র দণ্ড, পৃথক পালঙ্কে সব যেন এক একটা কাঁচের টুকরো। সয়ম্ভূ আবার বিচ্ছিন্ন। ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা যায় আর তা একজন ধীবরের, একজন দাবদপ্তরীর, একজন চোর, ব্যাধ,গজারি গাছ সকলের। এরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে কাচের টুকরায় উদ্ভাসিত হয়। বিভিন্ন এবং ব্যাপ্ত। এই প্রবণতা কবির সতেরো বছর বয়সে প্রকাশিত কবিতাতেই দেখা গেছে। কবির প্রথমদিককার কবিতায় রোমান্টিকতার সাথে বিষন্নতা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ, আনন্দ একাকার হয়ে আছে। তবে সে কবিতাগুলোতেও প্রচ্ছন্নভাবে দেখবার একটা বিমূর্ত চোখ আছে;যে মূলত দর্শক, ভ্রমণ-পিপাসী। জার্নি করছে শরীর হতে অশরীর, সেগুনের কাঁচা ঘ্রাণ হতে নক্সী কাঁথার ভাঁজে,বসন্তের তরুণী জারুলে। তরুণীর চন্দ্রীল স্তনের স্তাবক, শঙ্খীল যোনি, ছুটন্ত ষ্টারলেট, নোম্যানসল্যন্ড, ঘামের সমুদ্র এসবই কবির চলাচলের জায়গা। প্রথম দিককার কবিতায় শামীম কবিতায় অনেক সহজবোধ্যভাবে ভাষাকে ব্যবহার করেছেন যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমান্তরাল ব্রিজ তৈরি করেছে, মৃত্যুর শিহরণ পেয়েছে সে প্রেমিকার স্পর্শে।

বিরানব্বই পরবর্তী কবিতায় কবির ভাষা আক্ষরিক অর্থেই বদলে যেতে দেখি। ক্রমশ শীতের পোশাক ছেড়ে সে গায়ে জড়িয়ে নেয় নানা রঙের উদগ্র আকৃতিআলা ফাটাফাটি গান। কবিকে বলতে দেখি-

আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়েছি আর
আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়ে ফেলেছি
শুধু আর তোমার আঙুল
হেঁটে বেড়ায় আমার থ্যাতলানো গরম চাঁদিতে
আর
আর

এই অদৃষ্টহীন কবি কি খোঁজেন নিজেই হয়তো জানেন না। কখনো টক্সিনের মৃদু মিষ্ট ক্রিয়ায় আক্রান্ত হন, কখনো ঘুমের সরবত খেয়ে বেঁচে থাকাটাকেই ফুলে ফেঁপে উঠতে দেখেন। শামীমের দেখবার চোখ অনেকগুলি, লাল কালো অনেকগুলো চোখ চেয়ে থাকে নলাকার কাঠ থেকে। এই যে দ্রষ্টা,এই যে দেখবার ইচ্ছে, ক্ষমতা,ভ্রমণ এটাই তাকে চেনায় হয়তো। ক্লাসিক ঘরানার সাথে রোমান্টিসিজমের সংমিশ্রণ ঘটেছে কবিতায়। আবার নাগরিক পৃথিবীর একক নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা দেখা যায় কবিতায়। এই বিষন্নতা, বিচ্ছিন্নতা কখনো কখনো তার মধ্যে অনিচ্ছা তৈরি করেছে। বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে। কোনো তৃষ্ণাই যেন নেই কবির, কোনো ক্ষুধা। আবার অগাধ লবনের সাগরে তৃষ্ণার্ত কবি স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান সুমিষ্ট পানীয়র আকাঙ্খায় যা ততোদিনে গ্লাসিয়ারে পরিণত হয়ে গেছে। বাস্তব পৃথিবীর অভিজ্ঞতা ছেড়ে তিনি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন সুররিয়াল পৃথিবীতে। যেখানে বাস্তব,অবাস্তব আর প্রতিবাস্তব পরস্পরকে বিদ্ধ করে আড়াআড়িভাবে, লম্বাভাবে। এই অতিবাস্তব পৃথিবী তাকে হয়তো নেশা, বন্ধুত্ব,মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। অধরা কবিতার পৃথিবীতে যাপন করতে করতে কখনো তাকে ছুঁড়ে ফেলতে দেখি সেই কবিতাকেই। একমাত্র কবিতার পৃথিবীতেই শামীম কবীরের সন্তরণ যেখানে আছে ব্যাধ,হিজড়ে, সমকামী, রানীমা, আরো একটি চাঁদ, তার প্রেতাত্মা,পঙ্খীরাজ, রক্ত, বীর্য যোনি। একজন দ্রষ্টা কবি সময়ের অতীতে, বর্তমানে, ভবিষ্যৎ ভ্রমণ করেন আর মর্গের বাহির থেকে শুনতে পান হাতুড়ি ছেনির বিচরণ।

শামীম কবীরের কবিতা

ভোরবেলার স্বপ্ন নিয়ে ভাসা

যা কিছু প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
জীবন যা কিছু ধরে রাখে
এবং যা কিছু সাঙ্গ করে
রেখে যাই পাহাড়ী মদের ধারা
আজ রেখে ঢেকে যাই
অন্যদিকে শোঁ শোঁ শোঁ বাতাস কাঁপে
মনে হয় ভ্রাতার হাতে যে ভগ্নিধাম
তার কথা
এই যে এতোটা পথ
এসবই নকল
তবে পড়া যায় মৌসুমী সাপের সাঁটলিপি
আমার প্রত্যয় আজ ভেসে যায় আধখানা পা
খণ্ড ধাবনের যতো সুরেলা প্রতীক ছিলো
ভুলে গেছি ঢলের পুরান ভাষা
কী এক ভাষার লোভে বেঁচে থাকি
কী এক প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
যা কিছু সকল শংকা যা কিছু স্বচ্ছল
জীবনের কে কোথায় ঊষর মলের ভাণ্ড ত্যাগ করে
উদরে পুরেছে কালো গোলগাল অপোক্ষার বীজ
তার ধাবনাঙ্ক মনে করি
অন্য আধা তর্কে বেঁচে থাকে
মাথা ভেদ করে আছে শীতের গহ্বর
ঐ পথে ঝেড়ে ফেলি বিদেহী ভষ্মের কারুকাজ
তরল আগুনে ঢাকা মেঠো পথ
তাক করা জীবনের মধ্যে দিয়ে চ’লে যাওয়া
সোজা
ও বক্রল সরল চাকার তুমি অণ্ডকাম
আর ভেস্তে যাওয়া আধখানা ভরের সহগ
উলো আমন্ত্রণক্রমে আমি আজ সীমায় এসেছি
যাহার প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
সারাটা গায়ের সঙ্গে প্রলেপিত দাফন পোড়ার ঘ্রাণ
দিগ্বিদিক ঘ্রাণের আঘ্রাণে
ভেসে যাওয়া পৃথিবীতে একা আছি
পরমাংশ শোধনের কাটা ছেঁড়া সৈকতশালায়
কী এক আকুল লোভে বেঁচে থাকি ছদ্ম প্রতিদানে
এমন আতপ মৃত্যু মাটি শুধু
মৃত্তিকাই পুঁতে রাখা জানে

দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান

অস্থায়ী

সারাক্ষণ হাতে চাই চাই গানের বাকশো
কতো রঙের ঢঙের আকৃতিঅলা ফাটাফাটি গান
আর সাবেক প্রভুত নামে শৌচপর্ব সেরে
দেহ খুলে ফেলে তারা বাদসঙ্গী
সদ্য হ’লো তাদের তা পরিচয় ভুল
মনে করি ভুল আমি তাই ভুল করে সকলেই
সহজে সহজ ভুলে ভ’রে যায় রাফ খাতা
মাথাটি গোবর ভরা যদি হয় আর
সোজা যেও মুনমুন ফার্মেসী
এবং সঠিক মাপে মাপে খাপে খাপে
চাঁদ ভরে দেবে তারা
তবে আমি যা কল্পনা করি
নষ্ট হলে পুনরায় সারাবার সহজাভ
পথ থাকা চাই
আকৃতি বিশেষ নয়
যখন তা মনে হয় তাই হয়
প্রথাভাঙ্গা দেহ পেয়ে গাইবার জন্য যা যা গান
যে সবই সতেজ হবে
কাঁখে বাকশো ও আকণ্ঠ পান
সারাক্ষণ হাতে চাই গানের বাক্শো খান

স্থায়ী

ফের ওঠে ভেসে ভেসে খড়ের ভেতর বুনোফল
বৈশ্যদের অধিকারে আরও দিন দিন
দিবাগত রাত্র বেলা বিকিরিত কাটা তান শুনে
পুড়ে যেতে যেতে সোনাভান
বলেছিলো ‘এই চাঁদ আঁটো হয় গলে
অন্য একটা ছোটো বদলে দেবে?’ বলে বলে
তবু আমি চাঁদে চাঁদে গান নিয়ে আরও যাবো চ’লে

Perfect ice, when they call, O Machine

কচ্ছপের খোলার নিচে

কচ্ছপের খোলার নিচে কাটালাম, দুই হাজার বৎসর, তারপর আজ,মাথা বের করব। আমার মনে পড়ছে সেই বটগাছটির কথা, যার তলায় আমি, পড়ে আছি,তার, বিশাল প্রসন্ন ডালপালা ছড়ানো,চূড়াটি তো অনন্ত উঁচুতে উঠে গেছে, না, তা হয় না, কিন্তু ভেবে, আমার বুকে আনন্দ চমকাল। আমি এর বিশালত্ব দেখে আত্মহারা। যেবার প্রথম,এ অঞ্চলে আসলাম, চারদিকে কেবল কমলা রঙের কর্কশ,ধুলোটে মাটির, ছোটোবড় টিলা আর গড়ের বেষ্টনিঅলা,একরের পর একর, ধানক্ষেত, উঠান, আংড়া, তেতালামাটির ঘর, প্রতিটাঘরের পাশে একটা করে তেজপাতাগাছ, নদীনালা, খালআর মাঠশেষে, গাড়িয়ালের সুলিখিত, স্বপ্নপ্রকোষ্ঠ, সূত্রশালীচাকার ঘর্ঘরস্পৃষ্ট বহরের নিচ থেকে,চাকচাক গোধূলি, আকাশ, অস্তরেখা ইত্যাদির সম্মিলিত, রহস্য ও লোভ ঠিকরে পড়া, সাতাশশো’টিগ্রাম, তার মধ্যে,মহাপ্রাণ এক বৃক্ষ। দেখে, আমি, কিছুকাল তন্ময় তার প্রেমে, তারপর আত্মহারা। আমি ঘুরেফিরে, এসে, এর নিচে রোদ পোহাতে লাগলাম, প্রতিদিন। প্রতি সন্ধ্যাবেলায়, তার আবছা, ছাতার শীর্ষের দিকে, আমার ছোট্ট, বিষণ্ণ দেহ, তুলে ধরে বলতাম, চমৎকার,আজ যাই। এদিক সেদিক,ঘরে বেড়াতাম, তারপর ধীরে ধীরে, চেনা হয়ে গেল,বাগানের আলো লাগা কাচে, দিন শেষের আনন্দিত মুখ, দেখতে দেখতে, শেষ চা, টাটকা পোস্টার, টিনেরহরিণ, সিফিলিসের জীবাণু, পুলিশের ভ্যান– সব, চেনা হয়ে গেল, সবাই।

আমার ঘর

এখন সময় হ’লো
আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে ফেরার
আমি দুপায়ের হাড় বাজিয়ে ফিরবো
আমার ঘরে
না কোনো ফুলের ঝাড়
কেবল মৃত্যু
আমার ঘরে কী সুন্দর সাজানো

কাঁপন

বৃত্তের সূত্র :
বৃত্তের পাশ ছুঁয়ে থাকা হাত
আলগোছে সরে এসে একটু একটু কাঁপলো
তাকে কী বলা যায়
আমি বাহান্নজন বালকের মুখ তৈরি করি
আদলে আদলে বিদ্যুৎ স্পৃহা চমকায়
আর হাত নিচু করে যখন সরে আসি
সন্ধ্যার সুবাস রেখে চলে যাওয়া রুমালের
অগোচরে জীয়ে থাকা অজস্র কাণ্ডের সাথে
গলাগলি আর খাড়া থাকবার উন্মাদনা
শেকড়ের গুপ্ত স্ফিতির চেয়েও
উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে
আমি এই পৃথিবীর নই

গোলকের সূত্র :
কব্জা খুলে ছুটে ছুটে যাওয়া প্লীহার গন্ধ
ভরাপেট উগরে গিয়ে বিকেলের হিম মাখানো রোদ
গায়ে মেখে ক্রমশ উদাস হয়ে যায়
যা ভাবায়
যা কাতর করবার জন্য আনাগোনা করে
কবিতাকে আঁকড়ে থাকতে হয় এক ছোটো
পীত রঙের হুকের সাথে
আর হাত ফসকে পড়ে যাওয়া কাঁধের গল্প
আজ মনে পড়ে যায়
যার কাছে গচ্ছিত রাখার বেদনা
এক বোতল উগ্র জেদ আর পাশবালিশের
কান ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের আঁকাবাঁকা রেখা
আজ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে
যার কাছে আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে
ফেরার সময় হয়
হয় হয় হয়
সেই গন্ধে আকুল চেতনার একপাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া
এখন এই বিলয়ের বিনির্মাণ কালে
বৃত্ত ও গোলকের সমন্বয় সূত্র :
ডাক পাড়ে ডাকে
খালি ডাকে
একটু একটু ঠুকরে বেড়ানো ঠোঁটের পিনবিন্দু
স্থায়ীভাবে একবার বসতে চায়
তোমার অন্দরের ভিতর
ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি
অথচ রাজ্যের বিস্ময় চিহ্ন মাখানো ছাতুর পিণ্ড
আকাশ জুড়ে করতাল বৃষ্টির সাথে ঝরে
ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি
ক্ষুধা আমি ভুলে গেছি
মেশিনের বরপুত্র আমি

একটি নোম্যানসল্যান্ডের স্বপ্ন

একটি নোম্যানসল্যান্ডের পথ বেয়ে বসে আছি
অন্য এক দোল খাওয়া মাঠে
মাঠের উত্তরে আছে উঁচু এক বিম্বনাশী টিলা
সে টিলার খাঁজে ভাঁজে ফুটে থাকে দোদুল ফুলেরা
দক্ষিণের বায়ু এসে পরগায়নের সাথে
পাখি ও প্রজাপতির দীর্ঘশ্বাস মেশায়
অন্য সকলও
পূর্বে আছে পিত্রালয়
পথের কিনারগুলো কেটে ছেঁটে কুরতি
সেই পথে বহু মৃদু শ্যাফ্ট্-এর সুরে
ভেসে আসে মায়েদের ব্যথা
অমরার নিভু নিভু বিচ্ছুরণ কালে
সে আসবে পশ্চিমের প্রকাণ্ড পশ্চিমগুলি ভেঙ্গে
আর আমি সেই নোম্যানসল্যান্ডেতে শুয়ে ব’সে
হস্তমৈথুনের জন্য ঝোপ ঝাড় তৈরি ক’রে নেবো
আর আজ আমি উষ্ণ উজ্জ্বল কাঠের জুতোয় ঢুকে
মজা লুটি সাত-রশ্মি দিবস রজনী

কিন্তু

ভেবেছিলাম যে কোনো স্রোতের মধ্যেই এইভাবে নির্বিকার
ভাবলেশহীন যাবো আলাভোলা বাতাসের মতো, যে-রকম
জন্মগ্রহণেরও আগে, অনেক আগেই আমি মায়ের জঙ্ঘার
খুব গোপন জানালা দিয়ে দেখেছিলাম রৌদ্রের বিভ্রম
প্রতীক্ষার ভঙ্গি নিয়ে-ভেবেছিলাম পার হোয়ে যাবো ইহকাল
কোনো মতে,মাঝে মধ্যে ঘুমন্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে হয়তোবা শুধু
ধরাশায়ী হোতে হবে, পথে ঘাটে ভীষণ নাকাল
তাতে কী-বা এসে যায় (রক্তের মধ্যেই আছে কাতরতা-ধূধূ
মনোহর ইয়ার্কি সখ্যতা) আমার উচিত ছিলো শ্মশানের শীত
থেকে পোড়া কাঠ-কয়লার নিরপে আঁধার জমানো কিংবা ধুলো
আর নর্দমার গড়াগড়ি দেয়া, সন্ধে হোলে সাচ্চাপুরোহিত
সেজে উলুকভুলুক মন্ত্রে দুনিয়া কাঁপানো যেতো, নৈশভোজে খাঁটি দেশী মূলো
ভেবেছিলাম এভাবেই-নিজস্ব কল্কিতে দেবো কষে টান, হঠাৎ ধাঁধার
সমাধান পেয়ে গেলে চৌরাস্তায় উবু হোয়ে বোসে খুব প্রবীণ
ভূতের মতো ভেল্কিতে দেবো চু ছানাবড়া কোরে আমি নিজেই সবার
কিন্তু–থেমে দাঁড়াতেই, কেয্যান ভেতর থেকে প্রাণপণে
বোলে উঠলো- এভাবে কদ্দিন ওহে এভাবে কদ্দিন

অবলা সংলাপ

কী যে ঘোর লাগে কাহ্নু বাশি শুনে দুর্বল গাছের ডালে আমার যেপ্রাণপাখি বাঁধা
আহা আগাই পিছাই শুধু হৃদপিন্ডে খুন্তি ছ্যাঁকা পুরান কাঁথার নক্সা কত আর চক্ষে
সয় জানালায় টিয়া ডাকে তীরন্দাজ কোন সে দূর থেকে বুকে মারে বাণ আমার
চোখের জলে বন্যা নামে বুঝি আমি কি ফ্যালানি ছাই প্রাণসখা আমাকে পোছে না
কতজন আসে যায় হাট ভাঙে করল্লার লতাটাও কঞ্চিমাচা জড়িয়ে ধরেছেওই কলাঝারে
হাঁটে বুঝি কেউ মর ছাই আলতা গাই ওটা কী যে ভুল নিঁদ নাই গলায়শাদা নলা নামতে
না চায় হায় প্রাণনাথ কোন বনে ঘোরে ঘরে শান্তি আমার নাই আমার যে প্রাণে বিষ কেউ
জানলে সর্বনাশ হবে ওলো সই তোকে কই কাহ্নু পিয়া এলে বলে দিস পোড়ামুখি কলস
নিয়ে যমুনা গিয়েছে

শামীম কবীর

খুব ক্রুর মুখোশের মতো মনে হয় এই নাম । অতিকায়
রূপালী তিমির মতো- আমার মর্মমূলেএই খুব নিবিড়
আপন নাম নিদ্রিত রেখেছে এক বিশুদ্ধ আগুন (তন্দ্রায়
নিবে গ্যাছে তার সব তুখোড় মহিমা)-এই প্রিয় সশরীর
নাম এক দাঁতাল মাছির মতো অস্তিত্বের রৌদ্র কুঁরে খায়
রাত্রিদিন; আষ্টেপৃষ্টে কাঁটাতার হোয়ে আছে- শামীমকবীর
এই তুচ্ছতর নাম : গোপনে,ত্বকের নীচে খুব নিরুপায়
এক আহত শিকারীর নামের মোহন ফাঁসে জড়ায় তিমির।
ইতিহাসে অমরতা নেই; পরিবর্তে রাশি রাশি বুলেটের
দক্ষ কারুকাজ করোটিতে, দগ্ধ লাশময় দীর্ঘ উপত্যকা
আর নীলিমার বোঁটা থেকে অনর্গল-নির্ভার নি:স্বাদের
জাতীয় সঙ্গীত ঝ’রে পড়ে। ক্যাবল কুচক্রী এই নাম- পাকা
নিকারীর মতো রোয়েছে অমর য্যান, আমার সকল পথে
অয় জালের ব্যুহ কোরেছে আরোপ কোন দুর্বার শপথে।

এই ঘরে একজন কবি

এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাখা গালিচায় শুয়ে
কুয়াশার মতো-তার নিদ্রামগ্ন ভাসমান চোখে ধীরলয়ে
শীর্ণ এক নদীর প্রতিমা ফ্যালে সুরময় ছায়া, শতাব্দীর
শুদ্ধতম শিলাখণ্ড শিয়রে তার-ঠিক একগুঁয়ে
ধীবরের মতো: ছিন্নভিন্ন-ছেঁড়া জালে কৌশলে মরা নদীর
শ্রোণী থেকে অপরাহ্নে রূপালী ইলিশ ছেঁকে নেবে;পঁচাঘা-য়ে
গোলাপের মধু ঢালা-অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে য্যান। ভীষণ অস্থির
হাতে সে ক্যাবল বিষন্ন খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির।
কবির আঙ্গুল থেকে অনর্গল রক্ত ঝরে আর মূর্তিবৎ
অন্ধকারে প’ড়ে থাকে সে-ক্যামন মর্মন্তুদ অদৃশ্য বল্কলে
ঢেকে অস্তিত্বের ক্ষত। অবশ্য মাঝে মাঝেই বদ্ধ ঘরময়
গলিত বাতাস কাঁপে-অন্তর্গত সজীব গর্জনে:বাঁধা গৎ
ভুলে গিয়ে-নিদ্রিত কবির বীণা সহসা কী প্রখর আদলে
গড়ে সুরের প্রতিমা, অথচ খোলে না তার অন্ধচক্ষুদ্বয়।।

 

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top