লেনিন-পর্ব ১৬।। আশানুর রহমান

লেনিন-পর্ব ১৬। ওলগা।।

মে মাসের তিন তারিখ। দিনটি শুক্রবার। কাজানের ভেরেটেননিকভ ও আরদাসেভদ নামক দু’টি আত্মীয় পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উলিয়ানভ পরিবারটি যখন শহর থেকে চার মাইল দূরের স্টিমারঘাটে পৌঁছালো তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলেছে। মালপত্র সব স্টিমারে তুলে সবাই থিতু হয়ে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাপ্টেন স্টিমারটি ছেড়ে দিলেন। কাজান থেকে সামারার দূরত্ব প্রায় ৩০০ মাইল। ভলগা ধরে তাদের যেতে হবে দক্ষিণে। শুরুতে স্টিমার চললো যেন নৌকার গতিতে। তীরে পানির গভীরতা কম, তাছাড়া পানির নীচে ছোট ছোট দ্বীপের মতো উঁচু ঢিবি আছে-সেই সব জায়গা এড়িয়ে স্টিমারটি ভলগা নদীর কিছুটা গভীরে গিয়ে পড়তেই ক্যাপ্টেন গতি বাড়িয়ে দিলেন।

স্টিমারের জানালা দিয়ে দিমিত্রি ও মিত্তিয়া মাছ ধরা নৌকা দেখছিল, কখনো কখনো দল বেঁধে উড়ে যাওয়া এক ঝাঁক পাখি; সেই ঝাঁকে কোন ধরনের পাখি সেটা নিয়ে তারা তর্ক করছিল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা উঠে গিয়ে যেখানে মালামাল রেখে এসেছিলেন সেই জায়গাটা একবার ঘুরে এসে মিত্তিয়া ও দিমিত্রির কাছাকাছি কাঠের বেঞ্চে গিয়ে বসলেন। ভ্লাদিমিরের পাশেই বসেছিল ওলগা, যাকে পরিবারের সবাই আদর করে ডাকে ওলিয়া। ওলগার অন্য পাশে বসে আছে আন্না-পরিবারের বড় সন্তান।

আন্না ভিতরে ভিতরে বেশ খুশী। তার খুশীর কারণটা পরিবারের সবাই এখন জানে। মার্কের সাথে তার বিয়ের কথাটা পাকা হয়ে গেছে তবে এই বিয়েতে সব চেয়ে খুশী যেন মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা নিজেই। মার্ক চাকরি করে সামারায়। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশে নিজেদের একজন মানুষ থাকলে সুবিধা। তাছাড়া, মিত্তিয়া ও দিমিত্রিকে সামারা জিমনেসিয়ামে ভর্তি করতে হবে। মার্ক সামারায় থাকায় দেখাশুনাটা সেই করতে পারবে। আন্নার বিয়ে যখন পাকা হয়ে গেছে সে সময় একদিন আন্নার কাছে ওলিয়া জানতে চেয়েছিল,

-অ্যানিউটা, মার্ক এলিজারভ কী কৃষক পরিবারের?

‘হ্যা। কেন বলো তো?’- নিজের ঘরে কাপড়গুলো আলমারিতে তুলতে তুলতে আন্না প্রশ্ন করেছিল। ওলিয়া বোনের কাপড় তুলতে হাত লাগিয়ে বলেছিল,

-তুমি ওনার পরিবারের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে?

ওলিয়ার প্রশ্ন শুনে আন্না চুপ করে গিয়েছিল। তার নিজের তো এই কথাটা একবারও মাথায় আসেনি। মার্কদের পরিবারও স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত। যদিও তারা কৃষির উপর নির্ভরশীল। মার্কের এক ভাই একটা এস্টেটেরও মালিক। সে জমি কেনাবেচার ব্যবসাও করে শুনেছে। তবু আন্নার কখনো মনে হয়নি যে এটা কোন সমস্যা। ওলিয়ার কথায় আন্নার মনে হয়েছিল, তাইতো ওলিয়া কেন এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছে? আন্না ভেবেছে মার্ক চাকরি করবে শহরে, সে নিজেও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে চায়-এর মধ্যে একটি কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলের সাথে বিয়ে হওয়ার সাথে তার পরিবারের সাথে বোঝাপড়ার কি সমস্যা হতে পারে? সেটা সত্যিই তার মাথায় আসেনি। রাশিয়ার ধনী পরিবারগুলো, এমনকি যে সব পরিবারের লোকজন কয়েক পুরুষ ধরে চাকুরী বা অন্য পেশায় যুক্ত তাদেরও তো কৃষির সাথে কোন না কোন ভাবে একটা সম্পর্ক আছে। তাদের পরিবারেরও একটা সম্পর্ক আছে। এবার তো সামারায় তারা একটা এস্টেটই কিনছে। তাহলে? এটাই এখানকার বাস্তবতা। ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সাথে এখানেই রাশিয়ার একটা বড় পার্থক্য আছে। তবু সেদিন ওলিয়ার কথাটা শুনে তার চট করে মার্কের একটা কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সে মার্কের সাথে কখনো কখনো জার্মান বা ফ্রেঞ্চে কথা বলতো। একদিন এরকম কথোপকথনের মাঝখানে মার্ক তাকে বলেছিল,

-আমার পরিবারের লোকজনের সামনে ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলো না। ওরা কেউ ফ্রেঞ্চ জানে না।

রাশিয়ার উঠতি বা স্বচ্ছল পরিবারগুলোতে একের অধিক ভাষায় কথা বলার প্রচলন আছে। এমনকি উলিয়ানভ পরিবারের সকলেই কয়েকটা করে ভাষা জানে। ভ্লাদিমির যেমন ল্যাটিন, জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি জানে। সেদিন মার্কের কথায় একটু অবাক হলেও সে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ওলিয়া তাকে যখন ঐ কথা বলেছিল তখন মার্কের সেদিনের কথাটা মনে করে সে একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছিল বৈকি। তার মধ্যে এমন একটা ভাবনা তৈরি হয়েছিল-সত্যিই তো, সে কি মানিয়ে নিতে পারবে?

আন্না তাই স্টিমারে বসে থাকতে থাকতে  মার্কের সাথে তার আসন্ন সাক্ষাত ও বিয়ে, নতুন জায়গা, সেখানকার পরিবেশ এসব নিয়ে চিন্তা করছিল। অন্যদিকে ভ্লাদিমির এবং ওলিয়া তখন গল্প করছিল তাঁদের সদ্য পড়া এস এম সলোভের ‘রাশিয়ার ইতিহাস’ বইটি নিয়ে। তাদের বয়সের পার্থক্য দেড় বছর হলেও দু’জনের বোঝাপড়াটা খুব ভাল। কিছুদিন হলো ভ্লাদিমির এবং ওলগা দু’জন মিলে একই বই পড়ছে। কখনো ভ্লাদিমির পড়ে, কখনো ওলিয়া। ইতোমধ্যে তারা গুঁইজোটের ‘ফ্রান্সের ইতিহাস’, বাকলের ‘ইংল্যান্ডের সভ্যতার ইতিহাস’, মার্কসের ‘দর্শনের দারিদ্র্যতা’ পড়ে ফেলেছে। বই পড়ার পর ওলিয়ার মনে যে সব প্রশ্ন তৈরি হয় ভ্লাদিমির সে সব প্রশ্নের উত্তর খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। শুরুতে বিষয়গুলোতে ওলিয়া তেমন আগ্রহ না পেলেও ক্রমশঃ এধরনের বই তার ভাল লাগতে থাকে। আর এই ভাললাগার কথাটা জানিয়ে সে তার বন্ধু শেহেরবোকে লিখেছিল, “সিরিয়াস বই ছাড়া অন্য বই-বিশেষতঃ উপন্যাস পড়তে আমার ভাল লাগে না।’

সারারাত স্টিমার চললো। পরেরদিন বিকাল নাগাদ স্টিমারটি যখন সিমবিরস্কি ঘাটে থামলো তখন উলিয়ানভ পরিবারের সকলের মনে হল দু’বছর আগেও তারা এই শহরে ছিল; ৬৪ নম্বর মস্কো স্ট্রিটে তাদের চমৎকার একটা বাড়ি ছিল-তাছাড়া ইলিয়া ইলিচ উলিয়ানভ এখনও সিমবিরস্কির সিমেট্রিতে শায়িত আছেন। স্টিমারটি যাত্রী নামানো ও উঠানোর জন্য থামতেই মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভলোদিয়াকে বললেন,

-ভলোদিয়া, ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে জেনে এসো তো এখানে বিরতি কতক্ষণের।

  মায়ের প্রশ্নেই ভ্লাদিমিরের খেয়াল হলো সত্যিই তো তারা এখন সিমবিরস্কিতে। সে খবর নিয়ে ফিরে এসে বলল,

-মাত্র দু’ঘন্টা।

ভ্লাদিমির তখনও জানে না তার মা কেন বিরতির সময়টুকু জানতে চাইলেন। ওলিয়া সেসময় বসে ছিল মায়ের পাশেই। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা যেন অনেকটা স্বগতোক্তির মত বললেন,

-না, দু’ঘন্টার মধ্যে ফেরা যাবে না।

কথাটা ওলিয়া শুনে ফেলে। আর তখনি তার মনে হলো মা বাবার কবরটা হয়তো একবার দেখার কথা ভাবছেন। আর কথাটা মনে হতেই তার বুকের ভিতরে একটা কষ্ট যেন দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করলে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। মারিয়া তাঁর স্বামীর কথায় ভাবছিলেন বটে কিন্তু মেয়ের কান্না দেখে তাঁর চিন্তাস্রোতে বাঁধা পড়ে। ওলিয়ার চোখে এত জল কোত্থেকে আসে? মেয়েটা এত কাঁদে কেন? তাঁর নিজের চোখ দুটোও ছলছল করে উঠছিল বটে তবে ছেলেমেয়েদের সামনে তিনি নিজের আবেগের প্রকাশ ঘটাতে চান না। নিজেকে সামলে নিলেন। ওলিয়া মায়ের কাঁধে মাথাটা রাখতেই সে অঝোরে তার চোখের পানি ফেলতে থাকে। মা এবং মেয়ে দু’জনেরই কষ্টের উৎস এক হলেও কেউ কারো কাছে সেটা প্রকাশ করলো না।

দিমিত্রি এবং মিত্তিয়া দু’জনেই তখন তাদের চেনা জায়গাটা নিয়ে বেশ উত্তেজিতভাবে গল্প করছিল। তাদের গল্প অন্যরা শুনতে পেলেও তাদের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আন্না তখন সিমবিরস্কির বাড়ি, সাশা, বাবা এবং তার স্কুল বন্ধুদের স্মৃতি হাতড়াতে ব্যস্ত। ভলোদিয়া দেখছিল মানুষের ব্যস্ততা, উঠা-নামা, কুলিদের হাঁক-ডাক। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাপ্টেন যখন স্টিমার ছাড়ার বাঁশি দিল, তখন ভ্লাদিমের চোখ গেল ওলিয়ার দিকে। ওলিয়ার ফোলা চোখের দিকে তাকাতেই ভ্লাদিমিরের যেন স্মরণ হলো-তাইতো! আমরা এখনই আবার সিমবিরস্কি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর তখনই ভ্লাদিমিরের মনে পড়লো সাশার একটা কথা। সাশাদের বিচারের রায়ের পুরো কপিটি সে সদ্য পড়ে শেষ করেছে। আন্নাই তাকে দিয়েছিল। সেই রায়ের কপির ২৮৯ পৃষ্ঠায় লেখা আছে সাশা আদালতে দেয়া তার বক্তৃতার এক জায়গায় বলছে, “আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি-সমাজটা পাল্টাতে গেলে, মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে গেলে আমার কোন পথ বেছে নেয়া উচিত? কোন সন্দেহ নেই-সঠিক পথ হল মানুষের মধ্যে যাওয়া, তাদেরকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো এবং তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে তোলা- সেটা শব্দে, বই, পত্রিকা এবং ভাষণে।”

তখন বিচারক তাকে প্রশ্ন করেছিল, “বিষভর্তি বুলেট নিশ্চয় সভ্য আলোচনার উপায় হতে পারে না। যেটা তোমরা করেছো। পারে কি?”

উত্তরে সাশা যা বলেছিল সেটা মনে করে ভ্লাদিমির নিজের মধ্যে একটা উত্তেজনা অনুভব করলো। সাশা বলেছিল, “রাশিয়ায় কোন সভ্য আলোচনার সুযোগ নেই। এটাই একমাত্র জায়গা যেখানে শেষ পর্যন্ত আমাকে এই কথাগুলো বলার সুযোগ দেয়া হল-যখন ফাঁসির দড়ি পড়তে আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আপনি এবং আপনার পুলিশ বিভাগ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা একটি নতুন কবিতা প্রকাশ করতে পারি না, অরাজনৈতিক পত্রিকাও ছাপাতে পারি না, একটা নাটক মঞ্চস্থ করতে পারি না-যে ধরনের নাটক মানুষ দেখতে চায়।”

ভ্লাদিমির যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সাশা বলে চলেছে- “আমরা দশ জন এই আসামীর কাঠগড়ায় বলে নিজেরা আত্মতৃপ্তিতে ভুগবেন না। এদেশে এমন অনেক দশজন মানুষ পাওয়া যাবে যারা তাদের আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারে। আর আমরা সব সময় আমাদের সাথে তেমন কিছু মানুষ রাখি। কোন কিছুই আমাদের রুখতে পারবে না। দূর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যর্থ অভিযানের পক্ষে আমি কোন নৈতিক ব্যাখ্যা দিতে চাই না। আমি অনুমান করি আমাদের এই কাজটি হয়তো এখনই কোন রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে না। আমি এটাই ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করলাম যে, যেমনটা চলছে এভাবে চলতে থাকলে এই ধরনের হত্যাচেষ্টা, বিষের বুলেট ব্যবহার বন্ধ হবে না। যদি আপনি সন্ত্রাস বন্ধ করতে চান, আমি এতক্ষণ যা বললাম সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা। ধন্যবাদ।”

সাশার সেই বক্তৃতাটুকু ভ্লাদিমিরের মুখস্থ হয়ে গেছে। ঠিক এই মুহূর্তে, এতদিন বাদে সিমবিরস্কির এই স্টিমারঘাট ছেড়ে যেতে যেতে সাশার উদ্দেশ্যে তাই সে মনে মনে বলল,

-সাশা, তোমাকে ভালবাসতাম। প্রচণ্ড সে ভালবাসা। কিন্তু আজকের মত করে আগে কোনদিন তোমার জন্য নিজের মধ্যে এতটা গর্ব অনুভব করিনি।

উলিয়ানভ পরিবার যখন সামারা পৌঁছাল তখন মাত্র ভোর হয়েছে। আগে থেকে ঘাটে গাড়ি ঠিক করে অপেক্ষা করছিল মার্ক। সবার আগে আন্না নেমে গিয়ে মার্ককে আলিঙ্গন করলো। একে একে সবার সাথে কুশল বিনিময় শেষে, কুলিদের সাহায্যে জিনিষপত্র গাড়িতে তোলা হল। আলাকায়েভকাতে পৌঁছাতে তাদেরকে সামারা শহর থেকে পূর্ব দিকে ৩৫ মাইল যেতে হবে। দীর্ঘ স্টিমার যাত্রায় ক্লান্ত পরিবারটি তাদের নতুন ঠিকানায় পৌঁছাতে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসে।

আলাকায়েভকা এস্টেটের বিশাল কাঠের বাড়িটির সামনে এসে ঘোড়ার গাড়িগুলি একে একে যখন থামছে তখন বেলা ডুবে যাচ্ছে। দূর আকাশে রক্তিম সূর্যটাকে সন্ধ্যার অন্ধকার যেন গিলে খেতে চুপচাপ অপেক্ষা করছে। বাড়ির বারান্দাওয়ালা ঘরটির সামনে মাঝারি একটা লাইম গাছ। ভ্লাদিমির দেখলো গাছের দীর্ঘ লম্বা ছায়াটা যেন অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। এখানে, এই বাড়িতেও লাইম গাছ দেখে ভ্লাদিমির মুগ্ধ হল। আর ঠিক এই কারণেই প্রথম দেখাতেই তার বাড়িটি পছন্দ হয়ে গেল। বাড়িটার চার পাশে অসংখ্য গাছ। আপেল, আঙুর, ম্যাপল ট্রি, বার্চ-কি নেই? বাড়ির একটু দূরে বিশাল একটি পুকুর। ভ্লাদিমির এগিয়ে সেখানে যেতেই টলমলে জল দেখতে পেল। আরেকটু এগিয়ে পুকুরের পাড়ে জলের কাছাকাছি পৌঁছালে টুপ করে অন্ধকার নামার আগেই একটা মাছ লাফ দিয়ে যেন ভ্লাদিমিরকে স্বাগত জানিয়ে আবার জলের ভিতরে মিশে গেল।

ভ্লাদিমির ফিরে এলে দেখতে পেল মা প্রত্যেকের জন্য ঘর ভাগ করে দিচ্ছেন। আন্না বার্চ গাছ পছন্দ করে বিধায় যে ঘরটির পিছনে বড় বার্চ গাছটি আছে সেই ঘরটিই আন্নাকে দেয়া হল। আন্না ঘরে ঢুকেই দেখতে পেল ঘরের জানালায় নেভী-ব্লু পর্দা। সে পর্দা সরিয়ে জানালা খুলতেই কানে এলো কতকগুলো পাখির কিচিরমিচির শব্দ। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা জানালা বন্ধ করতে বললেন- কারণ মশা-মাছি আসতে পারে। ওলগা পেল মাঝারি ধরনের একটা ম্যাপল ট্রি সংলগ্ন ঘর। সে নিজেই সেটা পছন্দ করলো কারণ ম্যাপল ট্রি তার পছন্দের। ভ্লাদিমিরকে দেয়া হলো সামনের বারান্দা সংলগ্ন ঘরটি। ভ্লাদিমির নিজেও খুব খুশী হল কারণ বারান্দাটা তার দরকার, সে সিগারেট খায়। সে মনে মনে ভাবলো, ‘মা কি জানেন সে সিগারেট খায়’। এছাড়া ঘরের সামনে লাইম গাছটি থাকায় সে বাড়তি খুশী। সেখানে চেয়ার-টেবিল পেতে ককুশকিনোর মত পড়াশুনা করা যাবে। বাড়িতে এত ঘর যে দিমিত্রি এবং মিত্তিয়াও আলাদা ঘর পেল। এছাড়া গেস্ট রুম তো আছেই। রাত হয়ে যাচ্ছে বিধায় মার্ক সে রাতে থেকে গেল। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভীষণ খুশী এবং তিনি মার্ককে ধন্যবাদ দিলেন অকৃত্রিমভাবে । তিনি না দেখেই এই এস্টেটটি কিনেছিলেন। তিনি যতটা ভেবেছিলেন, দেখলেন বাড়িটি তার থেকেও সুন্দর। সে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে তিনি বাড়ির বারান্দাগুলোতে আলো জ্বালিয়ে রাখলেন যাতে পোকামাকড় ঘরে ঢুকতে না পারে।

আলেকায়েভকা এস্টেটে মোট ৮৪টি পরিবারের বাস। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন কৃষক আছে। পরিবারগুলোর অনেকেরই নিজেদের বাড়ি, ঘোড়া ও গরু আছে। ককুশকিনোতে তার খালাত ভাই আরদাসেভ এস্টেটের কাজ দেখাশুনা করতো। ভ্লাদিমির কয়েকবার তার সাথে এস্টেটের কাজ-কর্ম দেখতে গিয়েছিল-এস্টেট সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা অতটুকুই। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা চাইলেন ভ্লাদিমির এই এস্টেটের দায়িত্ব নিক এবং ব্যবস্থাপনার সব ভার বহন করুক। পরেরদিন নাস্তার টেবিলে তিনি সে কথা বলতেই ভ্লাদিমির চমকে উঠলো। বিস্মিত গলায় সে বলল,

-আমি? আমি কেন?

সে এমনভাবে প্রশ্নটি করলো যে কথাটা সবার কানে বেশ রূঢ় শোনালো। আন্না এবং মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা অসন্তুষ্ট মুখে তার দিকে তাকালো। কিন্তু মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভ্লাদিমিরের কথার উত্তরে বেশ কর্তৃত্বের সুরে বললেন,

-হ্যাঁ, আমি চাই তুমি এই এস্টেটের ম্যানেজারের দায়িত্ব নেবে।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার কথার সুর ও ধরনে সবাই চুপ করে গেল। খুব সকালে মার্ক সামারা ফিরে গেছে কারণ তার অফিস আছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মায়ের নির্দেশ ও পরামর্শ মত ভ্লাদিমির ম্যানেজারের দায়িত্ব নিতে রাজি হল। সে প্রথম দিনই গেল কৃষকদের সাথে পরিচিত হতে। আর সেদিন দুপুরেই আন্না জানালো যে শিক্ষক হবার জন্য যে পরীক্ষা দেয়া লাগে সে সেটা দিতে চায়। তার কথা শুনে ওলগা বললো, সেও ডাক্তার হতে চায়। আর তাই আজ থেকেই সে ভর্তির জন্য পড়াশুনা শুরু করবে। আগেই ঠিক ছিল দিমিত্রি ও মিত্তিয়াকে সামারা জিমনেসিয়ামে ভর্তি করা হবে। সেদিন দুপুরের খাবার শেষে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে মনে মনে আরো একবার শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী একটি পরিবারের কল্পনায় মানসিক শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন।

এদিকে কয়েকমাস না যেতেই ভ্লাদিমির এস্টেট ব্যবস্থাপনার কাজে সব ধরনের আগ্রহ হারিয়ে ফেললো। এই কাজের থেকে কৃষকদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়ানো কিংবা আধুনিক উপায়ে চাষাবাদ বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিতে সে বরং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। কিন্তু সে সব বিষয়েও তার কোন আগ্রহ ছিল না। সে দেখলো- কৃষকরা যেমন একদিকে দরিদ্র অন্যদিকে ক্ষুব্ধও। আসলে এই গোটা ভলগা অঞ্চলের কৃষকদের মনোভাবই এমন ছিল। ১৮৬১ সালের ভূমিদাস প্রথা বিলোপ আইনের সুযোগে স্হানীয় জমির মালিকরা চিন্তা করলো এই সুযোগে যতটা সম্ভব জমির মালিক হওয়া যায়। তাই তারা সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কৃষকরাও যেন জমির মালিক হতে মরিয়া। জমি কেনাবেচা চলছে দেদারসে। আবার এখানকার কৃষকদের মধ্যে একটা প্রবাদ চালু আছে যে, “আমরা জমিদারের কিন্ত জমি ঈশ্বরের”। এর অর্থ হল, যারা জমিতে চাষ করবে, ফসলের উপর তাদেরই ন্যায্য অধিকার। তাদের এমন মনোভাব ও ক্ষুব্ধ মনের পরিচয় পেয়ে অনেকে তাদের এস্টেট বিক্রি করে কারখানায় বা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করছে। ফলে প্রচুর কলকারখানা তৈরি হচ্ছে। এই সব এস্টেট মালিকদের কেউ কেউ মনে করে তাদের এস্টেটগুলোতে সমাজতন্ত্রের মতো একটা কিছু তারা চালু করতে পারবে। কিন্তু কৃষকদের অনীহা এবং অসহযোগিতায় সেগুলো ব্যর্থ হতে লাগলো। এদেরই একজন হলেন আলেজান্ডার ব্রেয়েব্রাজহেনস্কি। তাঁর এস্টেটটি ভ্লাদিমিরদের এস্টেটের কাছেই। তাঁর কথা শুনে, তাঁর সাথে দেখা করে ভ্লাদিমির বুঝলো যে তিনি এখনও বিশ্বাস করেন যে রাশিয়ার গ্রামগুলিতে কৃষকদের দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করা যাবে। অন্যদিকে কৃষকদের সাথে মিশে ভ্লাদিমিরের এই ধারনা হয়েছিল যে বিপ্লব অন্তত এই শ্রেণির নেতৃত্বে সম্ভব না। তাই তার সাথে দেখা করে ফিরে আসতে আসতে ভ্লাদিমির মনে মনে তার উদ্দেশ্যে বলল, “রোমান্টিক সমাজতন্ত্রী”।

কৃষকরা ছিল বুূদ্ধিমান। কিছুদিনের মধ্যে তারাও বুঝে গেল নতুন ম্যানেজারের কাজে কোন আগ্রহ নেই, মনোযোগও নেই। তারা এটার সুযোগ নিতে চাইলো। প্রথমে তারা উলিয়ানভদের গোয়াল থেকে একটা ঘোড়া চুরি করলো। ভ্লাদিমির ও মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভাবলেন এটা বোধ হয় একটা দূর্ঘটনা। দিন কয়েকবাদে একটা গরু চুরি হলো। সপ্তাহ না পেরোতেই আরো একটা। এবার মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভ্লাদিমিরের ব্যবস্থাপনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি দেখলেন এভাবে এস্টেট চালানো সম্ভব নয়। তিনি মার্কের সাথে পরামর্শ করলেন। গত জুলাই মাসে মার্কের সাথে ঘরোয়াভাবে আন্নার বিয়ে হয়ে গেছে। মার্ক পরামর্শ দিল- জমিগুলো কৃষকদের কাছে বর্গা দিয়ে সেগুলো আদায় করার জন্য স্থানীয় একজনকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। আর তাই কিছুদিনের মধ্যে বাড়ি, পুকুর ও নিজস্ব গোয়ালটুকু রেখে বাকী সবকিছু ক্রুশভিটস নামের একজনের তদারকিতে ছেড়ে দেয়া হল।

ম্যানেজারির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে ভ্লাদিমির যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে আবার পড়াশোনায় মনোযোগী হলো। সামারায় কিছু গ্রুপের সাথে তার কমবেশী যোগাযোগ তৈরি হল। তাদের কাছ থেকেই সে জার্মান ভাষায় ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ হাতে পেল। ভ্লাদিমির লেখাটি জার্মান থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদের কাজে হাত দিল। একদিন অনুবাদের কাজটি করতে করতে সিগারেট খাবার ইচ্ছে হলে বারান্দায় না গিয়ে ঘরে বসেই সে সিগারেট টানতে শুরু করে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা কি একটা কাজে ভ্লাদিমিরের ঘরে ঢুকেই দেখলেন ভ্লাদিমির সিগারেট টানছে। ভ্লাদিমির তখনও টের পায়নি যে মা এসেছেন। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা সরাসরি বললেন,

-ভলোদিয়া, তুমি কি জানো না সিগারেট খাওয়াটা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়।

ভ্লাদিমির সিগারেট লুকালো না। সেটা হাতেই ধরা। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,

-মাম্মাচুকা, সিগারেট আমাকে কাজ করতে সাহায্য করে, এমন কি চিন্তাও।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভ্লাদিমিরের কথায় প্রচণ্ড বিরক্ত প্রকাশ করে বললেন,

-তুমি বাজে তর্ক করছো। আমি বলেছি এটা তোমার স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। তুমি এটা ছেড়ে দাও।

তখনও দু’ আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। ভ্লাদিমির সেই অবস্থায় বলল,

-আম্মা, সেটা সম্ভব নয়।

ভ্লাদিমিরের একথায় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা তার স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ভীষণ রেগে গেলেন। তারপর যে কথাটি কোনদিন কোন ছেলেমেয়েকে তিনি বলেননি সেটাই বললেন ভ্লাদিমিরকে।

-ভলোদিয়া, আমি আগে কখনও টাকা পয়সা নিয়ে এতটা চিন্তা করিনি, যেমনটা আমাকে এখন করতে হচ্ছে। আন্নার বিয়েতে আমাদের অনেকগুলো টাকা খরচ হল, সামনে ওলিয়ার পড়ার খরচ, এছাড়া তোমার ছোট দু’টো ভাই বোন পড়াশুনা করছে। আমাকে এখন এক কোপেক খরচেরও হিসাব করতে হয়। তুমি তো কোন আয় করো না। তোমার সিগারেটের জন্য আমি একটি কোপেকও দিতে রাজি না।

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা তার কথা শেষ করেও রাগে কাঁপছেন। ভলোদিয়া হাতের আধ পোড়া সিগারেটটি বারান্দা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিল। তারপর মায়ের কাছে এসে তার হাত দু’টো ধরে বলল,

-মাম্মাচুকা, আমি কথা দিচ্ছি, আর কখনও সিগারেট খাব না।

ভ্লাদিমিরের এ কথায় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনার রাগটুকু যেন সাথে সাথে পড়ে গেল। তিনি ভ্লাদিমিরকে জড়িয়ে ধরে তার চিবুকে চুমু খেলেন।

এস্টেটের দায়িত্ব ক্রুশভিটসের উপর ন্যস্ত করার পর মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা দেখলেন আলাকায়েভকাতে থাকার কোন অর্থ হয় না। আন্নার বিয়ে হয়েছে, মার্ক থাকে সামারায়, দিমিত্রি এবং মিত্তিয়াও পড়াশুনা করে ওখানে, তাছাড়া ভ্লাদিমির নিজেও এখানে থাকতে চায় না, তাই  তিনি ১৮৮৯ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর সামারার ভসক্রিসেনস্কায়া স্ট্রিটে একটি বাড়ি ভাড়া করে উঠে গেলেন। ভ্লাদিমির সামারায় ফিরতে পেরে ভীষণ খুশী হলো এবং পরের দিন থেকেই লাইব্রেরি এবং সমমনা লোকজনের খোঁজ শুরু করলো। দিন কয়েকবাদে তার সাথে পরিচয় হলো আলেস্কই স্কালায়ারেনকোর সাথে। যে সামারাতে সিরিয়াস বিষয় নিয়ে একটি পাঠচক্র চালায়। সে দু’রুমের একটি বাসা ভাড়া করে থাকে। সাথে তার মা থাকে। ভ্লাদিমির সেখানে যায় আর মনে মনে ভাবে, ‘আহা, আমি কোনদিন কি আমার বাসায় এমন পাঠচক্রের আয়োজন করতে পারবো?’ ভ্লাদিমির এ সময় রাশিয়ার অর্থনীতির উপর তার লেখা খসড়া একটি প্রবন্ধ এদের পাঠচক্রে পড়ে শোনায়। সেই পাঠচক্রে তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে বক্তা আনে। একবার কাজান থেকে বজোরাজ গ্রুপের এম ভি সাবুনায়েভ এল। সামারায় এসে ভ্লাদিমির ব্যাপকভাবে তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করলো। গোটা শীতকালটা সে মার্কসের পুঁজির দ্বিতীয় খণ্ড, এঙ্গেলসের ‘এন্টি ডুরিং’ এবং ‘ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’, প্লেখানভের ‘আমাদের পার্থক্যসমূহ’ পড়লো। প্লেখানভ তাঁর লেখায় রাশিয়ার বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের বিশেষত হারজেন, চেরনিশেভস্কি, তাকায়েভ এদের সবার সাথে মার্কসের চিন্তার পার্থক্য এবং তাঁদের চিন্তার ভুলগুলোকে সূত্রবদ্ধ করেছিলেন। ভ্লাদিমির প্লেখানভ পড়ে রীতিমতো মুগ্ধ হল।

এভাবে ১৮৯০ সাল এসে গেল। ভ্লাদিমির পাঠচক্র, রাশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং রাশিয়ায় যে ইতোমধ্যে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে তার পক্ষে ব্যাপক পড়াশোনায় সময় দিতে থাকে। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভ্লাদিমিরের এই সব পাঠচক্রে যুক্ত হয়ে পড়ায় আবার চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এদিকে, মেডিকেল পড়তে হেলসিংকি যেতে হবে এবং সে কারণে সেখানকার ভাষা শিক্ষাটা জরুরি বিধায় ওলগা সেন্ট পিটার্সবার্গের ওমেন বেস্টুহেজ প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য আবেদন করলো।-সেই একই উলিয়ানভ পরিবারের সদস্য হওয়ায় কর্তৃপক্ষ পুলিশ রিপোর্ট চেয়ে পাঠালে পুলিশ জানালো,

“ দৃশ্যত সে কোন ধরনের রাজনীতির সাথে সংযুক্ত নয়”। ওলগার ভর্তি চূড়ান্ত হলে ঠিক হল সে আগস্টের শেষ সপ্তাহে রাজধানী যাবে। সেখানে আগে থেকেই তাদের আত্মীয়-স্বজন থাকে। এ সময় মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা ভ্লাদিমিরের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড্ড চিন্তিত হয়ে তাকে বললো আবার আবেদন করতে যদি তাকে পরীক্ষার সুযোগ দেয়। অক্টোবর মাসে সে মিনিস্টার অব ইন্ট্রাকশনকে লিখলো, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছাড়া কোন একটি সম্মানজনক পেশা গ্রহণ বা পরিবারের দায়িত্ব নেয়া কঠিন। আমার মায়ের বয়স এখন ৫২, পরিবারে আমার ছোট ভাই বোন আছে। এমতাবস্থায় যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনিয়মিত ছাত্র হিসাবে আমাকে পরীক্ষা দেবার সুযোগ দিন।”

একই সাথে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা নিজে গেলেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। সাথে করে নিয়ে গেলেন তাঁর মৃত স্বামীকে এ যাবৎ সরকারকে দেয়া সকল সার্ভিসের সনদপত্র। সেখানে গিয়ে তিনি আবেদনপত্রে লিখলেন- “একজন মা হিসাবে আমাকে দেখতে হচ্ছে কীভাবে আমার সন্তান তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো নষ্ট করছে”।

এবার কাজ হল। মন্ত্রী জানালেন রাশিয়ার যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভ্লাদিমির অনিয়মিত ছাত্র হিসাবে পরীক্ষা দিতে পারবে। অনুমতি পেয়ে ভ্লাদিমির সিদ্ধান্ত নিল সে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকেই পরীক্ষা দেবে।

এদিকে ওলগার রাজধানীতে যাবার সময় হলে মারিয়া তাকে একদিন আলাদা করে ডেকে বললেন,

-তুমি ওখানে গেলে একটি কাজ করতে পারবে?

-কি কাজ মা?

-তোমার সাথে যদি সাশার পুরাতন বন্ধুদের দেখা হয় তাদের কাছে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করতে পারবে?

-কি মা?

-তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো-সাশার যদি কোন ছবি থাকে তাদের কাছে, সেটা তারা দিতে পারবে কিনা।

এ কথা শুনে ওলিয়া কেঁদে ফেললো। মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনাও চোখের পানি ফেললেন। সেটা সাশার কথা মনে করে না ওলিয়াকে বিদায় দিতে সেটা অবশ্য বুঝা মুশকিল।

ওলিয়া রাজধানীতে গিয়ে নিয়মিত চিঠি লেখে। ভ্লাদিমির ১৮৯১ সালের এপ্রিল মাসে দু’টো পরীক্ষা দেবার জন্য রেজিস্ট্রেশন করলো। ঠিক হলো সে যাবে মার্চ মাসে। এমন সময় ওলিয়া ভ্লাদিমিরকে লিখলো, “তোমার কাছে আমার যে কত যে প্রশ্ন আছে। সেই সব প্রশ্ন নিয়ে তোমার সাথে আলোচনা করতে ভাল লাগবে। কিন্তু চিঠিতে সব সম্ভব না। পরে সেগুলো জানাবো, অবশ্য তুমি তো এপ্রিলের আগেই চলে আসছো”।

তিন দিন তিন রাত ভ্রমণ শেষে ভ্লাদিমির পৌঁছাল সেন্ট পিটার্সবার্গে। স্টেশন থেকে সে একটা ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিল। তার গন্তব্য নেভা নদীর তীরে পেসকোভিচ। পরীক্ষা পর্যন্ত সে ওখানেই থাকবে। গাড়িতে যেতে যেতে তার মনে পড়লো সে রাজধানীতে আসছে পরীক্ষা দিতে শুনে সামারার দু/একজন সমাজতন্ত্রী তাকে টিপ্পনী কেটে বলেছিল,

-কমরেড, যে রাষ্ট্র কাঠামো ভাঙতে চান আবার সেই রাষ্ট্র কাঠামোর একজন হতে চান? এটা কি শত্রুর সাথে হাত মেলানো হয়ে গেল না? জারের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ডিগ্রির কী দরকার?

ভ্লাদিমির দেখলো যে তাকে এই প্রশ্নটি করছিল এবং আরো কয়েকজন যারা সেই প্রশ্নকারীর সমর্থক তাদের অনেকেই সারাদিন এই ক্যাফেতে আড্ডা মারে, বিকালে ঘুমায় এবং পেশাগত জীবনেও তাদের অনেকেই ব্যর্থ। তাই তার মনে হয়েছিল এই প্রশ্নের একটা কড়া জবাব দেয়া দরকার। সে বলেছিল,

– হ্যাঁ, দরকার আছে। আমি যখন সমাজ পাল্টাতে চাইবো কেউ যেন না বলে যে আমি সেটা করছি এই কারণে যে এই সমাজে আমি ব্যর্থ-আমার অন্ততঃ সেটা সহ্য হবে না।

ভ্লাদিমিরের মনে পড়লো তার সে কথা শুনে তাদের মুখের চেহারা এমন হয়েছিল যেন মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাদের মুখে ঝামা ঘঁষে দিয়েছে।

এদিকে ভ্লাদিমির আসার আগেই মা চিঠি লিখে ওলগার কাছে বলে পাঠিয়েছিল সে যেন প্রত্যেক সপ্তাহে নিয়ম করে চিঠি লিখে জানায় ভলোদিয়া ঠিক মত পড়াশুনা করছে কিনা, খাওয়া-দাওয়া করে কিনা, ঘুমায় কিনা এই সব। মায়ের এক চিঠির উত্তরে এপ্রিল মাসের ৮ তারিখে ওলিয়া লিখলো, “ আপনি অকারণে চিন্তা করছেন যে ভলোদিয়া তার শরীরের প্রতি যত্ন নিচ্ছে না। প্রথমতঃ সে বিচক্ষণ এবং শরীরের প্রতি যত্নশীল, দ্বিতীয়ত, তার কাছে পরীক্ষা খুব সহজ একটা বিষয়। সে এরই মধ্যে দুটো পরীক্ষা শেষ করেছে এবং সর্বোচ্চ গ্রেড ৫ পেয়েছে। গত শুক্রবার পরীক্ষা শেষ করে শনিবার সকালে সে নেভেস্কি প্রসপেক্টে হেঁটে বেড়িয়েছে। দুপুরের পর আমার এখানে এলে আমরা একসাথে নেভা নদীর তীরে ঘুরলাম। আমি বরফ ভাঙা কল দেখলাম। তারপর আমাকে পৌঁছে দিয়ে সেও পেসকোভিচে ফিরে গিয়েছিল।

সে রাতে ঘুমানো বন্ধ করেনি এবং তার কোন প্রয়োজনও পড়েনি। তাছাড়া কারো পক্ষে ২৪ ঘন্টা জেগে থাকা সম্ভব না, মগজেরও বিশ্রামের দরকার আছে। সে প্রতিদিন তার দুপুরের খাবার ঠিক মতোই খায়।”

মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা তবু ভ্লাদিমিরের জন্য চিন্তা করেন। ওলগাকে বলেন সপ্তাহে দু’টো করে চিঠি লিখতে।

এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করে একদিন ওলগা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ভ্লাদিমির তার সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখে তার প্রচণ্ড জ্বর। জ্বরের প্রচণ্ডতায় সে ভুল বকছে। ভ্লাদিমির দেরী না করে তাকে নিয়ে গেল আলেকজান্ডার হাসপাতালে। ডাক্তার বলল-টাইফায়েড। ডাক্তার ঔষধ দিলে ওলগা ঘুমিয়ে পড়ে। ওলগা যখন ঘুমাচ্ছে ভ্লাদিমির গেল মাকে টেলিগ্রাম করতে। সে লিখলো, “ওলিয়ার টাইফয়েড, হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, ভাল সেবা-যত্ন চলছে, ডাক্তার আশা করছেন সব ঠিক হয়ে যাবে”।

ভ্লাদিমির তখনও কিন্তু ভাবেনি ওলিয়ার শরীরটা কতটা খারাপ বা মাকে এসময় এখানে আসতে বলা দরকার। দিন দুয়েক পর ওলিয়ার শরীর আরো খারাপ হয়ে পড়ল। তার শরীরের চামড়ায় ইনফেকশন দেখা দিল। দেখলে মনে হল চামড়া পুড়ে গেছে। ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন এটাকে ‘সেন্ট এ্যান্টিনস ফায়ার’ বলে। ভ্লাদিমির তৎক্ষণাৎ মাকে টেলিগ্রামে জানাল,

“ ওলিয়ার অবস্থা খারাপ। আম্মা, আপনি কি আগামীকাল রওনা দিতে পারবেন?”

টেলিগ্রাম পেয়ে মারিয়া আলেকজান্দ্রাভনা রওনা দিলেন কিন্তু ভলগা নদীর উপরের স্তরের বরফ পুরোপুরি না গলায় তিনি যখন মস্কো হয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে এলেন ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে। তিনি যখন হাসপাতালে পৌঁছালেন তখন ওলিয়ার নিথর শরীর ভলোদিয়ার হাতের উপর। তিনি ওলিয়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ভলোদিয়া তখন হাসপাতালের দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে খেয়াল করলো আজ ৮ই মে। আজ থেকে চার বছর আগে এই দিনেই সাশার ফাঁসি হয়েছিল!

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top