পঞ্চপত্র প্রেমঃ পাবলো নেরুদা’র পাঁচটি কবিতা II ভূমিকা ও অনুবাদঃ রেজওয়ান তানিম

“আমি সবসময় কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করে এসেছি। এই শ্রেণিভুক্তকরণে যেখানে তারা আমাকে ফেলতে চায় তা হচ্ছে একটি শত্রুভাবাপন্ন ও বিদ্বেষী শ্রেণিভুক্তকরণ। আমি চাঁদের কবি, ফুলের কবি, সর্বোপরি একজন প্রেমের কবি”। নিজের কবিসত্ত্বা নিয়ে এই কথাগুলো এরিক বকস্টায়েলকে রেডিও কানাডায় প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন পাবলো নেরুদা। বিশ শতকে এসপানিওল ভাষার অন্যতম প্রধান কবি নেরুদা, পুরো বিশ্বেই প্রবল জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত। কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একবার নেরুদাকে “বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি” বলে বর্ণনা করেন। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ ভাষায়। কবিতায় গীতলতা ও অনুভূতির নিপাট সরল প্রকাশ নেরুদা’র কবিতাকে দিয়েছে অন্য মাত্রা, যা শুরু থেকেই জয় করেছে পাঠক চিত্ত। কবি ও রাজনীতিবিদ নেরুদা’র কবিতায় প্রেম ও কাম যেমন এসেছে তেমনি এসেছে মানুষের জীবন সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। আজকের ভাষাবদলের পর যে কবিতাগুলো বাংলায় এলো, তার সবগুলোই প্রেমজ বেদনার কবিতা।

পাবলো নেরুদা’র জন্ম ও বেড়ে ওঠা লাতিন আমেরিকা সদা হাস্য ও স্ফূর্তির দেশ চিলে’তে। লাতিন আমেরিকা’র মানুষেরা তাদের মাতা ও পিতার দুদিকের পারিবারিক নাম বহন করেন তাদের পিতৃদত্ত নামের সাথে, আর তাই নেরুদা’র প্রকৃত নাম ও বেশ দীর্ঘ নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পিতার কঠোর শাসন থেকে নিজের লেখা লুকিয়ে রাখতেই তিনি এই ছদ্ম নাম গ্রহণ করেন এবং সারাজীবন এ নামেই লেখালেখি করেন। নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক জান নেরুদা এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস হলেন পল ভারলেইন। শৈশব থেকেই সাহিত্য চর্চায় তার আগ্রহ প্রকাশ পায়। তার সুবিখ্যাত দুটো প্রেমের কবিতার সংকলন কুঁড়িটি প্রেমের কবিতা ও হতাশার গান (20 poemas de amor y una canción desesperada) এবং শত প্রেমের সনেট (100 soneta cinta) থেকে আজকের ভাষান্তর করা কবিতাগুলো নেয়া হয়েছে। মূলত কুঁড়িটি প্রেমের কবিতা ও হতাশার গান বইটি প্রকাশ হবার পরেই তিনি কবিখ্যাতির শিখরে পৌঁছে যান। আর শত প্রেমের সনেট বইটি প্রকাশ ১৯৫৯ সালে পরিণত বয়সে। প্রথম যৌবন ও পরিণত বয়সের প্রেমের নানা ভাঁজ কবিতাগুলোতে আমরা পাই। সবগুলো কবিতাতেই প্রেম ও কামের চেতনা কাজ করেছে এবং কবিচিত্তে যে এক অনুরণন তুলেছে সে প্রেম, তারই কথকতা। বাংলায় ভাষান্তরের পক্ষে ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর মূল ও ব্যাকরণ গত বিস্তর পার্থক্য থাকায় অনেক সময় অনুবাদকে অনুবাদই মনে হয়, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে তা যত দক্ষ অনুবাদক করুন না কেন। ইউরোপীয় ভাষাবংশের অর্থাৎ এসপানিওল, রুশ, ফরাসি কিংবা ইংরেজির খুব কম কবির অনুবাদ পড়লে মনে হয় এ মূল ভাষারই কবিতা, নেরুদা সেই স্বল্প সংখ্যক কবিদের একজন। নেরুদার কবিতা তাই বাংলাভাষায় বেশ অনুবাদ হয়ে এসেছে আগেও, এখনো হচ্ছে। এখানে কুঁড়িটি প্রেমের কবিতা ও হতাশার গান থেকে কবিতা নারীর শরীর, যে আলো জড়িয়ে রাখে, আজ রাতে আমি লিখতে পারি এই তিনটি কবিতা এবং শত প্রেমের সনেট থেকে সতেরো ও সাতাশতম সনেট দুটো ভাষান্তর করা হল। W. S. Merwin এর অনুবাদে প্রথম গ্রন্থ এবং Stephen Tapscott এর অনুবাদে ২য় গ্রন্থের ইংরেজি তর্জমা থেকে কবিতাগুলো বাংলায় ভাষাবদলের চেষ্টা করা হয়েছে। আমার এসপানিওল এ কোন বুৎপত্তি না থাকায় কিছু কিছু বিষয়ে আমার কবির দেশ, অর্থাৎ চিলে’র বন্ধু ফেলিপে কাস্ত্রো মারতিনেজ আমাকে কিছু কিছু বিষয়ে সাহায্য করেছে, যাতে কবিতার মূল ভাব বজায় রাখতে সুবিধা হয়। এ জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই।

 

নারীর শরীর

শুভ্র ঊরুদেশ, শ্বেত বুকপাহাড় সমন্বিত নারীদেহ কোন
সমর্পণে নত হলে মনে হয়, যেনো সে উপমা ধরিত্রীর!
নিয়ত খুঁড়ে যায় তাকে বুনো এক কৃষক শরীর,
আর মাটির গহীন থেকে তুলে আনে এক আশ্চর্য শিশু!

পড়েছিলাম সুড়ঙ্গের মত, একা। পাখিরা ফেলে গেল
আর প্রবল পেষণে আমায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধল নগ্ন রাত
আত্মরক্ষায় তোমায় গড়েছি আমি তুমুল হাতিয়ার করে
যেন ধনুকের তির তুমি কিংবা আমার গুলতির পাথর

অথচ প্রতিহিংসার প্রহর নামে আর তোমায় ভালবেসে যাই।
চর্মজ তনুদেহ, শৈবাল ছাওয়া, সমন্বিত আর দুগ্ধবতী স্তন
স্তনের ওই পানপাত্রেরা, আহা! আনমনা ওই চোখেরা, আহা!
গোলাপি ওই জঙ্ঘা-দুটো! মৃদু ও বিষাদী তোমার ওই স্বর!

আমার নারীটির শরীর, চারুতায় তার দেবো উদ্বেল ডুবসাঁতার।
আমার পিপাসার গান, অগুনতি ইচ্ছেরা, আমার অনিশ্চিত পথ!
মিশকালো নদীদেশে, যেখানে তৃষ্ণার গান বেজে চলে নিরবধি
আর একরাশ শ্রান্তি নামে, যেন অসহ ব্যথার গাঁথা সহযোগে।

যে আলো জড়িয়ে থাকে

যে আলো তোমাকে জুড়ে থাকে, নশ্বরতার ঝলকে।
সে পথে অন্যমনস্ক ম্লান শোকার্তরা দাঁড়িয়ে থাকে
আর গোধূলিবেলায় জীর্ণ ঘূর্ণিচাকার বিরুদ্ধস্রোতে
আবর্তিত হয়, তোমাকে কেন্দ্রে রেখে।

নির্বাক, বন্ধুগণ
মৃত্যুময় নিঃসঙ্গতার এই মুহূর্তটুকুতে আমি একা!
আর ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে অগ্নিবাণে,
বোধয় নষ্ট সময়ের প্রকৃত উত্তরাধিকার আমি।

ধূসর বস্ত্রাঞ্চলে ঝরে পরে সূর্য থেকে, ফলভারে নত বৃক্ষশাখা।
প্রকাণ্ড শেকড় সমেত কালরাত্রি
অকস্মাৎ বেড়ে ওঠে তোমার হৃদয় থেকে,
আর যা তুমি লুকাও, তোমার মাঝে, সে বেড়িয়ে আসে
যেন সে এক নীল পাণ্ডুর মানুষ,
নবজাতক আগামীর, পুষ্ট হয় তোমার আশীর্বাদে!

আর বিস্তীর্ণ ও বহুপ্রজ সেই, চুম্বকের অনুসারী এক
চক্রাকারে আবর্তিত হয় স্বর্ণ ও কৃশকায় রঙে;
সে জেগে ওঠে, পথ দেখায় নবসৃষ্টির!
এমন প্রাচুর্যময় জীবনের ছবি সে আঁকে যেন
বেদনার ভারে নত ফুলেরা ঝরে যায় প্রান্তরে।

নগ্নতায় তুমি অনাড়ম্বর

নগ্নতায় তুমি অনাড়ম্বর, তোমার হাতের মতন
মিহি, মাটিময় আর নির্মল সুডৌল,
তোমার আছে চন্দ্ররেখা, আপেলের সরু পথ আঁকা
বসনহীনা তুমি অনুদেহী, যেন নগ্ন গমের শীষ।

নগ্নতায় তুমি ক্যু’বার নীল শান্ত রাত,
তোমার আছে আঙুরলতার মত চুল, যা নক্ষত্র সমন্বিত।
গীর্জাচূড়ায় গ্রীষ্মের সোনালি আভার মত
বসনহীনা তুমি বিস্তৃত সোনারঙা।

নগ্নতায়, তুমি ঠুনকো, তোমার যে কোন নখের মতন,
বাঁকানো, সূক্ষ্ম, গোলাপী, সূর্যোদয়ের পূর্ব যেন
এরপর, নিজেকে গুটিয়ে তুমি কেমন অতলে হারাও।

যেন দীর্ঘ এক ধূমনালী জুড়ে পোশাক আর গৃহকাজে
ফিকে হয়ে আসে তোমার উজ্জ্বল আভা, পোশাকের ভিড়ে
পাতা ঝরে যায় আর হয়ে পরে সে কেবল নগ্ন দু’হাত।

সেভাবে ভালবাসি না আমি

সেভাবে ভালবাসি না আমি, যেনো তুমি কেবলি নুন গোলাপ*,
পোখরাজ কিংবা আগুন ছড়ানো কোনো কাঁটাময় কারনেশন।
তোমাকে ভালবাসি নিভৃতে, ছায়া ও কায়ার মাঝে
যেভাবে অশ্রুত জিনিসের রূপ ভালবাসে মানুষ।

তোমাকে ভালবাসি সে গাছটির মত, গহীন ভিতরে
যার, হৃদয় আলো করে লুকিয়ে থাকে অনাগত ফুলটি।
আর ধন্য তোমার প্রেম, মাটির গভীর থেকে আসা
সতেজ সৌরভ দিয়ে যা আমায় ঘিরে রাখে।

কেন ভালবাসি তার জানা নেই কারণ, নিয়ম বা ক্ষণ
তবু ভালবাসি তোমার দ্বিধাহীন, সংকটে ও অভিমানে।
এ ছাড়া ভালবাসার আর কোন পথ জানা নেই
কেবল এভাবেই, যেখানে তুমি ও আমি মিলে মিশে একাকার।

বুকের ওপর রাখা তোমার হাতটি আমার, খুব কাছের,
স্বপ্ন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া তোমার নয়নও আমার, খুব কাছের!

টীকাঃ Rosa rugosa বা Rose of Salt, স্প্যানিশ উপকূলবর্তী এলাকায় জন্মানো গোলাপের একটি জাত, যার সৌরভ ও বর্ণ আকর্ষণীয়।

আজ রাতে আমি লিখতে পারি

আজ রাতে আমি লিখে ফেলতে পারি সেই বিষণ্ণ পঙক্তিমালা
যেমন ধরো, লিখতে পারি, ‘অজস্র নক্ষত্র সমন্বিত এ রাত-
আর এই নীলাভ তারাগুলো বহুদূরে কাঁপছিল মিটমিট করে!
রাতের বাতাসটা পাক দিচ্ছে আকাশে আর গাইছে গান।

আজ রাত্রে আমি লিখতে পারি, বিষণ্ণতম পঙক্তিদের।
আমি ভালবাসতাম তাকে আর সেও আমাকে, হয়ত কখনো।

অগুনতি নক্ষত্রের এরকম এক রাতে, বেঁধেছি বাধনে তাকে
আর অগণন চুম্বনস্পর্শ দিয়েছি তাকে, সীমানাহীন আকাশের নীচে।

সে আমায় ভালবেসেছিল আর আমিও কখনো কখনো।
তার সমুদ্রগভীর চোখের চাউনি’র প্রেমে কে না পরে থাকতে পারে ?

আজ রাতেই আমি লিখতে চাই বিষাদের সব পঙক্তিগুলো
ভাবলেই, সে পাশে নেই আর মনে পড়ে, হারিয়ে ফেলেছি তাকে।
দীর্ঘ এ রাতের নিস্তব্ধতা তাকে ছাড়া আরও প্রগাঢ় মনে হয়।
আর চরণগুলো ঝরে পড়ে তার হৃদয়ে, যেমন শিশির ঝরে ঘাসের জমিনে।

তবু কি এসে যায় তাতে, যখন আমার ভালবাসা পারেনা রাখতে তাকে
অগুনতি নক্ষত্রের এই রাত আর সে নেই আমার পাশে।

এইত শেষকথা। দূর থেকে ভেসে আসছে কারও আওয়াজ। বহুদূর থেকে
আমার হৃদয় ভুলতে পারে না, তাকে হারানোর বেদনা।

এ চোখদুটো খোঁজে শুধু তাকে, যেন কাছে পেতে চায়
আর এ হৃদয় তার আশা করে, যদিও সে নেই কাছেপিঠে।

সেই দীর্ঘ রাত, আর শাদা হতে থাকা একই গাছগুলো
তখন ছিলাম দুজনে দুজনার, আজ আর নেই কেউ কারো।

আর ভালবাসি না তাকে, এ সত্য; তবুও ভালবেসেছি কি গভীর আবেগে।
আমার কণ্ঠস্বর এখন বাতাস খুঁজে মরছে ওর কানে চুমু লিখে দিতে।

অন্য কারও। সে হবে আর কারও। যেমন ছিল আমাদের চুম্বনের আগে।
কোমল আওয়াজ, তার তনু দেহ। তার সমুদ্র গভীর চোখ

আমি আর ভালবাসি না তাকে, এ দিব্য সত্য, কিন্তু তবুও ভালবাসি হয়ত।
প্রেম কত ক্ষুদ্র, সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিস্মৃতি দীর্ঘ, প্রগাঢ়।

হয়ত এ কারণেই যে, এরকম এক দীর্ঘ রাতে, তাকে বেধেছি বাঁধনে
শুধু আফসোস জেগে ওঠে হৃদয়ে, হারিয়েছি বলে ওকে।

হয়ত এই শেষ বেদনার ঝাঁপি যা আমায় দিল তার প্রেম
আর শেষ কাব্যগাঁথা এই, আমি লিখে যাচ্ছি তার স্মৃতিতে ।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top