হীরালালের দেশত্যাগ।। খোকন দাস

ধনে পাতা দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি বরাবরই তার পছন্দের; এক কেজি দেশি টেংরা কিনে লম্বা লম্বা পা ফেলে মাছবাজার থেকে বেরিয়ে বিপুলের ডিসপেনসারির দিকে যায় হীরালাল। অন্যদিন হলে মাছ কিনতে আরো কিছুটা সময় ব্যয় করতো।
সদাইপাতির ঝাঁকায় মাছের থলে রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে হীরালাল বলে, ‘কোন খবর আছে বিপুল?’
মোটা ফ্রেমের চশমাটা নাকের উপর ঠেলে দিয়ে ড্রয়ার খুলে লাল মলাটের বইয়ের ভিতর থেকে একটা হলুদ খাম বের করে হীরালালের দিকে বাড়িয়ে দেয় নিঃশব্দে; হীরালালও নীরবে খামটা এগিয়ে নিয়ে ভাঁজ করে বুক পকেটে রেখে দিলে বুকের ধুকধুকানিটা কিছুটা কমে আসে।
হীরালাল বিপুলের দূর সম্পর্কের মামা হলেও মান্যগণ্য করে নিজের মামার চেয়েও বেশি; নানা বিষয়ে হীরালালও বিপুলের উপর নির্ভর করে। কানের দু’পাশে পুরো জুলফি, মোটা ফ্রেমের চশমা, ঘাড় অবধি লম্বা চুল, চোখে মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য; বয়সের চাইতেও বেশি ভারিক্কি দেখা যায় বিপুলকে।
হীরালালের গ্রামে চিঠি আসে কেবল হীরালালের নামেই, তাও মাঝেমধ্যে। একটামাত্র চিঠি, তার জন্য সাইকেল চালিয়ে এতো দূর যাওয়া ডাক পিয়নের পোষায় না, তাই বিপুলের ডিসপেনসারিতে রেখে যায়।
‘মামা আপনি একটু বসেন, নূরজাহানের বাপ, বিমল, গীতার বাপ, শামসুর সদাইপাতি হয়ে গেছে, তারা এক্ষুনি এসে যাবে।’ – এই বলে কাস্টমার সামলাতে মনোযোগী হয় বিপুল।
বাজার থেকে হীরালালের গ্রামের দূরত্ব দেড় কিলোমিটারের বেশি নয়; আজ হাটবার বলে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে, হাটবার ছাড়া বেলা থাকতেই বাড়ি ফেরে, তবু সঙ্গী একজন থাকা চাই। হীরালাল লোকটা ভিতু প্রকৃতির, দিন কিংবা রাত, শীত গ্রীষ্ম কোনকালে সে একা চলাফেরা করতে পারে না।
হীরালাল ক্যাশবাক্সের পাশে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আয়েশ করে চা-বিড়ি খেতে খেতে বিপুলের কাস্টমার সামলানো দেখে আর বাড়ি ফেরার সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষা করে।
নূরজাহানের বাপ, বিমল, গীতার বাপ, শামসুর সদাইপাতি শেষ করে আসতে দেরি হচ্ছে, দোকানও কিছু সময়ের জন্য ফাঁকা। তবু হীরালাল চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে বিপুলের কানের কাছে ঝুঁকে নিচু গলায় বলে, ‘ঘটনা শুনেছিস?’
‘কোন ঘটনা?’
হিরালাল আরো ঝুঁকেপড়ে আরো চাপা গলায় বলে,‘ আমাদের গ্রামের ঘটনা, আরে হারাধনের ..।’
ভ্রু কুচকে চিবুকে হাত রেখে বিপুল কেবল মাথা নাড়ে।
হারাধনের বাড়ির হরিসভায় রাধাগোবিন্দের বিগ্রহ ভাঙচুেরর ঘটনা ঘটেছে কয়েক দিন আগে এবং সেটা সবারই জানা। হীরালাল এমনভাবে কথাটা বলল, বিপুল ভাবলো আবার নতুন কিছু ঘটল বোধ হয়।
‘এভাবে চলতে থাকলে এই দেশে হিন্দুরা থাইকতে পাইরবো নি?’
‘কিন্তু পালিয়ে যাওয়া ..।’ — আরো কি যেন বলতে চায়, একজন কাস্টমার এসে যাওয়ায় বিপুলের কথাটা এখানেই আটকে যায়।
কথা শেষ করতে না পারলেও বিপুল কি বলতে চায় হীরালাল জানে। ছেলেটার বাস্তব জ্ঞানের বড়ই অভাব, সারাক্ষণ কি এক কমিউনিস্ট রাজনীতির ঘোরের মধ্যে থাকে; দু’চারটা চটি বই পড়ে আর নেতাদের গরম গরম বুলি আওড়ানো আর বাস্তবতা রিড করতে পারা এক জিনিস নয়। কমিউনিস্টরা যদি দেশের বাস্তবতাই রিড করতে পারতো দেশটার অবস্থা কি এ রকম থাকে? সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আন্দোলন কম করলো না, ফলাফল কি হলো? কোন কারণে হীরালাল বিপুলের উপর বিরক্ত হলে বিপুলকে তাবৎ কমিউস্টদের প্রতিনিধি বানিয়ে তার বাস্তব জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে উপহাস করে আর বাম রাজনীতির বিপুল ব্যর্থতার মূল্যায়ন দাঁড় করায়, তবে তা কখনোই প্রকাশ করে না।
‘কি বলব দাদা, চারটা হাত চারদিকে পড়ে আছে, মুণ্ডুটা সোজা করে বসিয়ে রাখা হয়েছে; লাল জিহ্বাটা ঠিকই আছে, আর দেহটা ফেলে রেখেছে সিঁড়ির পাশে। এক নজর দেখে আর দাঁড়াতে পারলাম না, ভয়ে দৌড়ে চলে এলাম। মা কালির মন্দিরে হামলা, এই গেরামে কি আর শান্তি আইবো..? হীরালাল সবে বাড়ির পূবদিকের ধান ক্ষেতগুলো দেখে এসে পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে সোজা হয়ে উপরের সিঁড়িতে পা দেবে সেই সময় কান্ত এসে খবরটা দেয়।
‘শোন মামা, পালিয়ে যাওয়া কোন সমাধান নয়’ – কাস্টমার চলে গেলে বিপুল আগের বাক্যটা সম্পন্ন করলে হীরালালের ভাবনায় ছেদ পড়ে। কথাটা যে হীরালাল মানতে পারেনি তার চোখেমুখে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
হীরালালের বাড়ি ফেরার সঙ্গীদের সবার বাড়ি জসিমের দোকানের আগে; জসিমের দোকান থেকে হীরালালের বাড়ির দূুরত্ব অতি সামান্য, তবু এইটুকু রাস্তা নিয়ে চিন্তিত। জসিমের দোকানে উঁকি দিয়ে দেখে মোস্তফা মাস্টার ঝুলন্ত লাইটারে সিগারেট ধরাচ্ছে। দোকানে ভিড়ভাট্টা নেই। হীরালালকে এক নজর দেখে, ‘আরে হীরাদা যে, তোমার লগে কথা আছে’- বলে বেরিয়ে আসে, এক হাতে বাজারের থলে, অন্য হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে জলন্ত সিগারেট। দুজন পাশাপাশি হাঁটে, মোস্তফা মাস্টার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে কিন্তু কোন কথা বলে না। হিরালালের বাড়ির দরজার সামনে এসে দুজনে থামে; হীরালাল মোস্তফা মাস্টারের কথার অপেক্ষায় থাকে। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে কিছুটা সময় চুপ থেকে ধীরে ধীরে বলে,‘ তোমারে একটা কথা বলতে চাই হীরাদা, কথাটা উড়া উড়া শুনি, শুনে বিশ্বাস হইতে চাইল না, ভাবলাম সরাসরি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেই দেখি। শুনতেছি তুমি নাকি ইন্ডিয়া চলি যাইবা? ’
না মাস্টার, না হীরালাল – কারো চোখের মুখের অভিব্যক্তি বুঝা যায় না; অন্ধকারও যে কখনো কখনো জীবনের বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে হীরালাল তার ঊনসত্তর বছর জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করল।
‘শুন হীরাদা, কিছু সমস্য হচ্ছে জানি কিন্তু বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়া কোন সমাধান না।’
জিহ্বা দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট চেটে নিয়ে হীরালাল কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই স্কুলের পাশের বাড়ির দিনেশ আর মসজিদওয়ালা বাড়ির আকবর এসে হাজির। মাস্টারের বাড়ি গ্রামের শেষ মাথায়।
‘কি মাস্টার সাব, যাইবেন না?’
মাস্টার, দিনেশ আর আকবর চলে যাওয়ার পরও কিছু সময় হীরালাল অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে, মনে হয় অন্ধকারটাই এখন সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য।


সদাইপাতি কোনমতে বিমলাকে বুঝিয়ে দিয়ে হীরালাল হারিকেনের সলতে উসকে দিয়ে হলুদ খামের ঠোঁট খুলে চিঠিটা বের করে। সেই অতিপরিচিত হাতের লেখা, এমন লেখা সচারচর দেখা যায় না। আগে চিঠি আসতো পোস্টকার্ডে, তখন প্রায় নিয়মিতই আসতো। এখন দিন পাল্টে গেছে, পোস্টকার্ডে কেউ আর চিঠি লেখে না। এক নিশ্বাসে চিঠিটা পড়া শেষ করে হীরালাল মুক্তার দানার মতো লেখার উপর এমনভাবে আঙ্গুল বুলায় যেন ছোটভাই মতিলালের গালে যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে; ভাইয়ের কথা ভীষণ মনে পড়ে ।
স্বাধীনতার পর শরণার্থী জীবন শেষে যখন দেশে ফিরে আসে তখন মতিলালের বয়স আর কতো হবে, বড় জোর নয় দশ, হীরালাল তখন আইএর ছাত্র। সে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে সংসারে মন দেয় বৃদ্ধ পিতার সঙ্গে দুই বোন আর এক ভাইয়ের দায়িত্ব নিতে; ছোটবেলা থেকে মতিলাল লেখাপড়ায় ভালো বলে সবাই বলতো, ‘দেখিস হীরা, তোর ভাই মতি তোর দুখ দূর করবে, সংসারের মুখ উজ্জ্বল করবে, তোর আর কোন কষ্ট থাকবে না সেদিন।’
রান্নাঘর থেকে আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে আরতি এসে হীরালালের পাশে বসে, নূপুর আর ঝিনুক বসে নিচে। এ সময় বিধবা বোন চারু এসেও বসে ভাইয়ের পাশে। চারুর মুখভর্তি পান, সিঁথিতে দগদগে সিঁদুর নেই, একসময় যে ছিল তার চিহ্ন বিদ্যমান, ‘ওই হীরা আমাদের মতি কি লিখেছে বল না?’ চার জোড়া কৌতূহলী চোখ হীরালালকে বিদ্ধ করে চলে।
‘ঠাকুরপোর চিঠি, আমি দেখেই বুঝেছি। কি লিখেছে বল না গো।’
হীরালালের হৃষ্টপুষ্ট তেল চকচকে গাল, দু’পাশে সামান্য চুল মাঝখানে টাক, গোলগোল ফ্রেমের চশমার ভিতরে কুতকুতে চোখ, হাসলে দারুণ লাগে। চশমাটা উসকে দিয়ে গালভর্তি হাসি নিয়ে একবার চারু আর একবার আরতির দিকে তাকিয়ে হীরালাল বলে, ‘মতি লিখেছে পুকুর কাটানো হয়ে গেছে, বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে পাড়ে গাছ লাগাবে, পুকুরে মাছ ছাড়বে।’
ঝিনুক বলে, ‘আমাদের পুকুরের মতোই বড় পুকুর?’
‘ না, আরো বড়, আমাদের এই পুকুরের চাইতেও বড় পুকুর।’
আম জাম সারিকেল, সুপারি সব গাছ লাগাতে বলো ঠাকুরপোকে; আর একটা বেল গাছ লাগাতে বলবে; ঘাটের পাশে কয়েকটা জবা ফুলের গাছ লাগাইতে বলো, গিয়ে পূজার জন্য ফুল-বেলপাতা আবার কোথায় খুঁজবো?’
বেল গাছের কথা শুনে আরতির চোখাচোখি হয় আর হাসে হীরালাল। আরতি যেদিন বউ হয়ে এই বাড়িতে আসে সেদিনই ঘরের পিছনে বেল গাছটা লাগায় হীরালাল; সেটা এখন অনেক বড়, শাখা-প্রশাখায় অনেক বিস্তৃত।
‘ও ছেলে মানুষ যে কয়টা পারে লাগাক, কয়দিন পরে আমরা যাচ্ছি, আমরা পছন্দ মতো গাছ লাগাবো।’
দেয়ালে ঝুলানো দুর্গার ছবির দিকে দুই হাত তুলে আরতি ঠাকুরপোকে মন খুলে আশীর্বাদ করে; প্রথম দফা জমি বিক্রির টাকা পেয়ে মতি যে চিঠি দিয়েছিল তখন থেকে আশীর্বাদ করে আসছে; দফায় দফায় জমি বিক্রির টাকা পাঠিয়েছে, আর সেই টাকায় দফায় দফায় জমি কেনার সংবাদ নিয়ে এসেছে চিঠি; হলুদ খাম দেখলেই মনটা চনমনিয়ে উঠে। ‘ঠাকুরপো আমাদের জন্য অনেক করছে, আজকাল ভাই ভাইয়ের জন্য এতো কিছু করে না। শুনেছি যারা ওপারে যায় তারা সবাই স্বার্থপর হয়ে যায়, আমাদের মতি মোটেই পাল্টায়নি, পাল্টাবে কি করে তার শরীর থেকে এখনো এই দেশের গন্ধ যায়নি, চোখের সামনেই তো দেখছি..’
কথা শেষ করার আগেই চারু বলে, ‘মতি করবে না কেন হীরা কি তার জন্য কম করেছে? নিজে না পড়ে ভাইকে পড়ালেখা শেখালো, তার জমিজমা কড়াইগণ্ডায় বুঝিয়ে দিলো।’
‘আমাদের উঠান কি এই উঠানের মতো বড় হবে?’
‘আমাদের এই বাড়িটা যেমন দেখছ সেরকম, এই উঠান এই ঘর, তুলশীতলা রান্নাঘর, গোয়াল ঘর সব থাকবে। তবে পার্থক্য কেবল এটা পুরাতন বাড়ি, গাছগাছালিতে ভরা, সেটা নতুন বাড়ি।
‘রান্নাঘরটা বড়সড় করে কইরবা বলে দিলাম, জিনিসপত্র রাখার পর শরীর ঘোরানো যায় না।’
‘করবো করবো, তোমাকে স্কুল ঘরের সমান রান্না ঘর বানিয়ে দেব।’
নূপুর ঝিনুক চারু একে একে সবাই উঠে যায়। নতুন বাড়ি নিয়ে আরতির উচ্ছ্বাস কিছু সময়ের মধ্যে গোধুলীর আলোর মতো দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে যায়; এই ঘরদ্বোর, চোকাঠ, উঠান, তুলসীতলা, ঠাকুরঘর, গোয়ালঘর, উঠানে ধানের স্তূপ, জোড়া খড়ের গাদা, ঘাটের পাশে জবাফুলের ঝোপ, নুয়ে পড়া ডুমুরগাছ, তার সংসারের বয়সি বেলগাছ, এই বাড়ির সব ধুলিকণার সঙ্গে তার অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। এইসব ছেড়ে যেতে হবে ভাবতেই বুকের ভিতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে; দেয়ালে ঝুলানো ঠাকুরের ছবির দিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকতে থাকতে – ঠাকুর, তোমারও কি দেশকাল ভাগ আছে? জানি তুমি সর্বত্র বিরাজমান, তুমি সহায় হলে দেশ ছেড়ে যেতে হয় না; নিরাপত্তার জন্য যদি দেশই ছেড়ে চলে যেতে হয় তবে তোমার মহিমা রইল কোথায় ঠাকুর? – এইসব দুর্বোধ্য প্রশ্ন আরতির মনে ঘুরপাক খেতে থাকে।
সহসা আরতি বড় ধরনের ধাক্কা খায়; ঠাকুর দেবতা নিয়ে এমন প্রশ্ন কখনো মনে উদয় হওয়া দূরে থাক উঁকিঝুঁকিও দেয়নি, আজ কেন দিচ্ছে? এটা কি মনের দুর্বলতা নাকি বিক্ষিপ্ত মনের প্রকাশ, নিজের মনকে নিজে শাসন করে, মতিভ্রমের জন্য মাথা ঠুকে ঠাকুরের কাছে আবার ক্ষমা চায়।


বাজারে যাওয়ার পথে দেখা করে যাওয়ার জন্য আগের দিন বিপুলকে জানিয়ে রেখেছিল হীরালাল; বলল জরুরি আলাপ আছে। হীরা মামার জরুরি আলাপ মানে সেই একই কাসুন্দি, তাই দু’দিন পরে গেলেও অসুবিধা নেই, তবু লোকটাকে উপেক্ষা করা যায় না।
গাছগাছালি ঘেরা সুবিশাল বাড়ি, রাস্তা থেকে বাড়িতে ঢুকতেই ডান দিকে পুকুর, আম, জাম, নানা ধরনের বহু বয়সের গাছ পুকুরের দিকে নুয়ে আছে; গাছের শিকড় বেরিয়ে আছে বহুদিন গাছের গোড়ায় মাটি না পড়ার কারণে। এই পড়ে কি সেই পড়ে অবস্থা! সবুজ শ্যাঁওলাপড়া শানবাঁধানো পুকুরের সিঁড়িটা মাঝখান দিয়ে বিপজ্জনকভাবে ভেঙে হা হয়ে আছে, একটা অংশ যে কোন সময় উগরে পড়ে যেতে পারে। এইসব ফাটলে নির্ঘাত সাপঘোপের নিরাপদ বসবাস। জংপড়া টিনের চোচালা ঘর, উঠানের এক কোণে তুলসীতলার শানও কাত হয়ে আছে; সর্বত্র অযত্ন-অবহেলা আর সংস্কারের অভাবের ছাপ। এইসব খুঁটিনাটি দেখতে দেখতে বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে আজও পুকুরপাড়ে ফজলু মুন্সিকে দেখতে পায় বিপুল। হীরালালের পুকুরের পাড়টা ঘুরে দেখে আর ঝুঁকে পড়ে টলটলে পানিতে নিজের চেহারা দেখে, পানির মধ্যে বড় বড় রুই কাতলার বিচরণ অনুভব করে। পুকুর প্রদক্ষিণ শেষ করার পর প্রথম যে দিন ফজলু মুন্সির সঙ্গে বিপুলের দেখা আকস্মিকভাবে সেদিন মুন্সি কি বলেছিল তা স্পষ্ট মনে আছে।
বিপুলকে প্রায় টানতে টানতে পুকুরপাড় একবার ঘুরিয়ে এনে নারিকেল গাছের গোড়ায় লাঠি ঠুকতে ঠুকতে বলে, ‘কি বুঝলা বিপুল? তুমি পলিটিক্স কর, তোমার পলিটিক্সের জ্ঞান কি বলে?’
‘কি বলতে চাইছেন চাচা? ’
‘কিছু বুঝনি? কিছু চোখে পড়েনি?’
বিপুলের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মুন্সি।
লাঠি উঠিয়ে মুন্সি বলে, ‘গাছগুলোর গোড়ায় কোন মাটি আছে? নাই, শিকড়বাকড় বেরিয়ে আছে, যখন তখন পড়ে যেতে পারে। সিঁড়িটার দিকে একবার তাকাও, আর ঘরের টিনগুলা দেখ – এগুলো কিসের আলামত? তোমার মামা তলে তলে হিন্দুস্থান যাওয়ার লাইন কইরছে, সময় বুঝে উড়াল দিবো, এই দেশে থাইকবো না; এই দেশে খাইবো ডিম পাইড়বো হিন্দুস্থানে।’
দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে আবার বলে, ‘বড় আফসোস দেশটাকে এখনো নিজের দেশ ভাবতে পাইরলো না, দেশপ্রেম জন্মায়নি এতোদিনেও।’
তোমার মামাকে বইলো হিন্দুস্থান যাওয়ার আগে বাড়িটা যেন আমার কাছে বেঁচে যায়, উপযুক্ত দাম পাবে, ঠকাবো না। বেঁচেই যখন দেবে আমাকে দিতে অসুবিধা কিসের?’
‘মামা যে ইন্ডিয়া যাবে এ কথা আপনাকে কে বলেছে?’
‘কেউ বলেনি, ওই যে আলামত দেখালাম সেগুলাই বলে দিচ্ছে।’
‘আপনার অনুমান জ্ঞান দেখছি প্রখর।’
‘রাগ করছ কেন?’- বলে মুন্সি বিপুলের কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় বলে, ‘আমার দুই ছেলে বিদেশ আছে তুমি জানো, কয়েক মাস পর দেশে ফিরবে, বিয়ে শাদি করাবো, পাত্রীও দেখে রেখেছি, মাশাল্লা পাত্রী দেখতে একেবারে হুরের মতো।’ কথাটা বলে এমনভাবে হাসলেন যেন হুরের সঙ্গে মুন্সির প্রায় দেখা সাক্ষাত হয়।
‘আপনি হুর দেখেছেন?’
হঠাৎ এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে কিছুটা দম নিয়ে মুন্সি গম্ভীর হয়ে বলে, ‘এই রকম নিরিবিলি একটা বাড়ি আমার দরকার ছেলে দুইটার জন্য।’
কথাগুলো বলে নারিকেল গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে কাতল মাছের মতো হা করে দম নেয় মুন্সি। ‘বুঝলা হাঁপানি বড় খারাপ রোগ দম নিতে পারি না, সারারাত বসে কাটিয়ে দিই।’
তখন মুন্সিকে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করেছিল বিপুলের, এই যে দম নিতে পারছেন না, দম বন্ধ হয়ে গেলে কয় হাত জমি লাগবে?
আজ আবার পুকুরপাড়ে মুন্সির সঙ্গে দেখা; তাকে দেখে মুন্সি কিছুটা শরমিন্দা হয়ে সোনালু গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে উদাস দৃষ্টিতে।
বিপুল বলে, ‘চাচা সোনালু খুব সুন্দর, না?’
‘সবই আল্লাহর নেয়ামত।’
বিপুল উঠানে পা দিতেই বারান্দা থেকে হীরালাল হাঁক দেয়, ‘মুন্সি কি চলে গেছে?’
‘হ্যাঁ, চলে গেছে, আপনি ক্যামনে জানলেন মুন্সি এসেছিলে?’
‘এই আর নতুন কি, মাঝেমাঝে এসে পুকুরপাড়টা ঘুরে যায়, এই বাড়ি দেখে লোল পড়ে বুড়ার, বুঝলি লোল পড়ে।’
‘শোন তোর সঙ্গে একটা জরুরি আলাপ আছে’ চাপা গলায় কথাটা বলে চোখের ইশারায় এমনভাবে বিপুলকে পাশে বসার ইঙ্গিত করে যেন ঘরের মধ্যেও কথাটা বলতে ভয়; ‘দেশের পরিস্থিতি কি বুঝতেছস, সার্বিক পরিস্থিতি আর কি।’
‘সার্বিক পরিস্থিতি কি বলবো, সারাদেশ উত্তাল, স্বৈরাচারের দিন বোধ হয় ঘনিয়ে আসছে ..।’
‘পুরো গ্রাম আতঙ্কে রয়েছে, পরশু হারাধনের বাড়িতে ঢিল ছুঁড়লো; হারাধনের মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে, কয়দিন আগে ভূইঞাদের কালিমন্দিরে হামলা হলো, যখন তখন বড় কিছু হয়ে যেতে পারে। তুই বলছিস স্বৈরাচারের দিন শেষ, স্বৈরাচারের পতন হইলে কি না হইলে কি?’
‘দেশে স্বৈরাচারী শাসন যতোদিন থাকবে এইসব ফুটফাট কম্যুনাল ডিসটারভও ততোদিন কমবেশি থাকবে..। এগুলা বড় করে দেখলে আর চলা যাবে না। ’
এর মধ্যে আরতি চা মুড়ি দিয়ে যায়, গরম চায়ের কাপে ঠেসে ঠেসে মুড়ি দেয় হীরালাল।
তোরা ভাবছিস এতো সহজে স্বৈরাচারের পতন হবে, হবে না। আর হলেই কি, স্বৈরাচারের পতন হলে দেশে সুখ-শান্তি এসে যাবে; স্বৈরাচারের রক্তবীজ এই মাটির প্রতি ধুলাবালিতে মিশে আছে, কয়দিন পর দেখবি মাটি ফুঁড়ে এক একটা গজিয়ে উঠছে।’


কয়দিন থেকে আরতির মনে শান্তি নেই। মাঝরাতে কুকুর কান্না করে তাও একটা দু’টা নয় অনেকগুলো কুকুর; মনে হয় কান্নার জন্য কুকুরগুলো মাঝরাতে জড়ো হয়। প্রতিরাতে কুকুরের কান্নায় ঘুম ভেঙে গেলে অজানা এক ভয়ে শরীরটা অবশ হয়ে আসে। গ্রামটার উপর দিয়ে কি যে বিপদ অপেক্ষা করছে কে জানে-এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে আরতি। আজ আর কুকুরের কান্নার শব্দে নয়, গভীর রাতে মটরসাইকেলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ভয়ে কিছুক্ষণ সেধিয়ে থেকে শেষেবার কয়েক ধাক্কা দিয়ে হীরালালকে জাগিয়ে তোলে। ভয়ে দুশ্চিন্তায় গলা শুকিয়ে যাওয়ায় বারবার চেষ্টা করেও আরতির মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না, কয়েকবার ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নিয়ে চাপা গলায় বলে, ‘কারা, কারা এসেছে এতো রাতে?’
হীরালাল চকিতে পা ঝুলিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার পর টলতে টলতে দরজার দিকে এগিয়ে যায়, প্রথমে অতি সতর্কতার সঙ্গে উপরের সিটকানিতে হাত রেখে ভীরু গলায় প্রশ্ন করে, ‘কে? কে আপনারা এতো রাতে?’
বাইরে থেকে মোটা গলার ভেজা ভেজা একটা স্বর ভেসে আসে, ‘হীরাদা দরজা খোল, ভয় নাই, আমি নেজাম চেয়াম্যানের ভাই।’
সিটকানির পর খিল খোলার সঙ্গে সঙ্গে দরজার একটা পাল্লা হুমড়িখেয়ে খুলে গেলে হীরালাল গলা বাড়িয়ে দেয়। ততোক্ষণে আলুথালু কাপড়ে আরতি নূপুর আর ঝিনুককে একবার দেখে আসে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে হীরালাল, তার পিছনে আরতি। চাঁদের ম্লান আলোয় দেখা যায় উঠানে ধবধবে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরা নেজাম চেয়ারম্যানের ছোট ভাই শিহাব মোটর সাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাশে আর একটা ছেলে, দূরে আরো একটা ছেলে সিগারেট টানছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় হীরালালের মধ্যে যে অস্থিরতা দেখা দেয় তা তখনো শেষ হয়নি, তাই তার মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না। এতো রাতে নিজাম চেয়ারম্যান লোক পাঠানোর মতো কি এমন জরুরি প্রয়োজন থাকতে পারে।
‘বাড়ি ছেড়ে দেয়ার কথা কয় দিনের মধ্যে?
‘ সাত দিনের মধ্যে।’
‘কয়দিন পার হয়ে গেছে?’
‘পনের দিন, আমার ছেলেটা এখনো ফিরেনি, ফিরে এলেই ছেড়ে দেব। পোলাপান মানুষ, প্রথম গেল তার কাকা হয়তো আসতে দিচ্ছে না।’
‘তোমার ছেলের গুষ্টি কিলাই..’ ছেলেটা উত্তেজিত হয়ে উঠলে তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে সিহাব আবার বলে, ‘বাড়ি বিক্রির টাকা কি পাঠাই দিছ?
হীরালাল কিছু সময় নীরব থেকে বলে, ‘ হ্যাঁ।’
‘ভালো, টাকা পাঠাই দিলা জায়গা মতো নিরাপদে, কিন্তু বাড়ি ছাড়তে মন চাইছে না। আরো কয়টা দিন থাকতে দিলে অসুবিধা ছিল না কিন্তু তোমাদের তো বিশ্বাস নাই, তলে তলে আবার কার কাছে বিক্রি করে দাও তার কোন ঠিক আছে?’
স্বামী-স্ত্রী শিহাবের গনগনে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, এতো তাড়াতাড়ি লোকটা পাল্টে যাবে ভাবতেও পারে না, হীরালালের স্ত্রী আরো লম্বা করে ঘোমটা টেনে দিতে বলে, ‘আমাদের উপর বিশ্বাস রাখেন ভাই, অধর্মের কাজ আমরা কোন দিন করিনি, আর করবোও না।’
জলন্ত সিগারেট আঙ্গুলের টোকা দিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে মোটর সাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে –‘তোমাদের বিশ্বাস করি কি করে, রাধামোহন সাহা কি করলো জানো না? এমন নামিদামি একটা মানুষ এক বাড়ি দুই জনের কাছে বেচে চম্পট দিলো’-বলে সিগারেট ধরায়। ‘যারা নিজের বাপদাদার ভিটেবাড়ি বেচে ভিন দেশে চলে যেতে পারে তাদের বিশ্বাস করা যায় না।’
‘কথাটা মন দিয়ে শোন হীরাদা, সাত দিন সময় দিলাম, এর মধ্যে বাড়ি ছেড়ে না দিলে কি পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে বুঝতেই পারছ..।’
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা কাছে এসে বলে,‘মেয়ে দুইটাকেও পাঠাই দিছ?’
আরো কি যেন বলতে যাবে এমন সময় তাকে থামিয়ে দেয় শিহাব।
মেয়ে দু’টার কথা শুনে হীরালালের পায়ের নিচের মাটি টলে উঠে, কয় দিন আগেও আরতির হাতের পান মুখে পুরতে পুরতে নিজাম চেয়ারম্যাম বললো, ‘বউদি, বাপদাদার বাড়ি, ছেড়ে যেতে মন চাইবে না বুঝি, সাত দিনের জায়গায় দরকার হইলে পনের দিন, পনের দিনের জায়গায় একমাস থাকবেন, অসুবিধা কিসের।’
চোখ ধাঁধানো তীব্র আলো ফেলে, রাতের নির্জনতা ভেদ করে মটরসাইকেল চলে গেলে দ্রুত দরজায় খিল দিয়ে এসে বিছানায় ধপাস বসে পড়ে হীরালাল, পাশে আরতি। মুখে আঁচল গুঁজে ভয়ার্ত চোখে কুপির নিষ্কম্প আলোয় হীরালালের দিকে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থাকে।
হীরালাল ধীরে ধীরে মুখ তুলে আরতির দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে, ‘দেখেছ ছেলেটা কি বিপদে ফেলে দিলেন?’
দ্রুত পায়ে নূপুর আর ঝিনুকের ঘরের দিকে ছুটে যায়। দুই মেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে হাত পা ছড়িয়ে।


সেদিন বিড়ালের গুটিগুটি পায়ের মতো সন্ধ্যা নামে; হীরালাল উঠানের এক কোণে নড়বড়ে একটা চেয়ারে বসে সন্ধ্যানামা দেখে, দেখতে দেখতে তার কি যেন হয়ে যায় এবং এক সময় কালো বিড়ালের মতো সন্ধ্যাটা তার মগজে ঢুকে যায় আর তখনই বিপুল এসে তার সামনে দাঁড়ায়।
‘তরণি মাস্টারের দেশ ছাড়ি চলি যাওনের কতা তোর মনে আছে?’
বিপুল হা করে থাকে, ‘কোন তরণি মাস্টার?’
প্রশস্ত কপালে হাত বুলিয়ে হীরালাল বলে, ‘তোর চেনার কথা নয়, তুই তখন প্যান্ট ছেড়ে সবে লুঙ্গি ধরেছিস সেই সময়ের স্কুলের নামকরা অংকের মাস্টার, বাড়িতে পাকা দালানকোটা, ভাইগুলোও শিক্ষিত। কতো নামী পরিবার, শেষ পর্যন্ত থাকতে পারলো না।’
ঠোঁটের কোনে মজুদরাখা চুন প্রয়োজন মতো জিহ্বার ডগা গিয়ে চেটে নিয়ে আবার বলে, ‘প্রচুর জমিজমা বুঝলি, প্রতি বছর মাগ মাসে বাড়িতে রামায়ণ কীর্তন হতো, পালদের একটা ছেলে ছিল কীর্তন গাইতো, আহা কি মধুর সুর, বড় শান্তি লাগতো, এখনো কানে লেগে আছে। তরণী মাস্টারের একটা পোষা কুকুর আছিলো বুইঝলি; কুকুরটা মাস্টারের প্রতীক্ষায় ছয় দিন দরজায় শুয়েছিল, মুখে একদানা খাবারও তোলেনি; সপ্তম দিন কাজীর ছোট ছেলেটা কি করলো জনিস, বিষ খাইয়ে কুকুরটা মারি ফেলল।’
‘কিভাবে গেল তারা?’
‘এই কথা এখনো কইনি তোরে? বউ, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাইকে আগের দিন পাঠাই দিলো, কইলো মেয়ের শ্বশুর বাড়ি প্রতাপপুর গেছে। তরণি মাস্টার ছিল একা কয়দিন। একদিন বিকেলে তরণি মাস্টার হাতে সরিষার তেলের বোতল ঝুলাতে ঝুলাতে বাজারে গেল, সবাইকে নিয়ে চা খাইল আড্ডা দিল, মাটির পাতিলে জিয়ল মাছ কিনে রাখল রাখালের ডিসপেনসারিতে, বললো পরদিন সকালে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাবে। সেই যে গেল ..।
‘তারপর ?’
‘তারপর কি হইবো, পরদিন সকালে ভোরে হাজি সাহেব নিমের ডাল দিয়ে মেসোয়াক কইরতে কইরতে বাড়িতে ঢুকলো, তরণি মাস্টারের বাড়ি হই গেল লোকমান কাজীর বাড়ি, সাহা বাড়ি হইলো কাজী বাড়ি; যদিও লোকজন এখনো তরণি মাস্টারের বাড়ি বলেই ডাকে।’
দু’দিন আগেও যে বাড়ি থেকে প্রতিবেশিরা কীর্তনের সুর শুনতে পেয়েছে সেদিন দুপুরের পর সে বাড়ি থেকে সমবেত কষ্ঠে শুনতে পেল ‘ইয়া নবী সালাইমালাইকা, ইয়া রসুল.. ..।’
‘জিয়ল মাছের কি হলো?’
‘জিয়ল মাছের কি হলো জানি না।’
‘আইচ্ছা দেবেন্দ্র মাস্টারের কথা মনে আছে তোর?’
‘থাকবো না কেন তার ছোট ভাই পরিমল পড়ত আমাদের সঙ্গে, খেলাধুলায় সে ছিল পটু।’
‘তাইলে চিনতে পাইরছস, তার পরিবার গেল কিভাবে জানিস?’
‘দেবেন্দ্র মাস্টার চাকরি করতেন চট্টগ্রামে এক ব্যাংকে, ম্যালা বড় অফিসার; ছেলেমেয়েরা সেখানেই পড়ালেখা কইরতো। ভারতে বাবরি মসজিদে হামলা হলো, আর আমগো গেরামে হইলো দেবেন্দ্র মাস্টারের বাড়িতে হামলা, এবার বুঝ ক্যনানে বাবরি মসজিদ আর ক্যনানে দেবেন্দ্র মাস্টার, পলিটিক্সের কি মহিমা; ওই রাতে যে তারা গ্রাম ছাইড়ল এক বস্ত্রে আর ফিরি আইলো না। কয়দিন পর দেইখলাম মিয়াদের বড় পোলা, যেটা সৌদি আরব থেকে আইলো হেতে দেবেন্দ্র মাস্টারের ঘরবাড়ি ভেঙে পাকা বিল্ডিং করছে; শহরে বসেই তারা নাকি সব বিক্রি করি দিছে, হাচামিচা কে জানে।’
‘তা হলে মামা তুমি কিভাবে দেশত্যাগ করইবা ভাইবছনি কিছু?’
‘ভাবতেছি, এখনো ঠিক করতে পারিনি- এই কথা বলতে যাবে এমন সময় বিপুল হারিয়ে যায়।
একা থাকলে বিড়বিড় করার অভ্যাস হীরালালের অনেক দিনের, কিছুদিন হয় এই অভ্যাস বেড়েছে। বিকেল থেকে স্থির হয়ে বসে থাকা হীরালালের বিড়বিড়ানিতে গুরুত্ব দেয়নি আরতি। তুলসি তলায় বাতি জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকতেই আরতির মাথায় বিষয়টা হঠাৎ ঘাই মারে। লোকটা এত সময় স্থানু হয়ে থাকার কথা নয়,‘ ঝিনুক দেখতো তোর বাপের আবার কি হইছে? – রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে হাঁক দেয় আরতি।
কপালে হাত রেখে ঝিনুক চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, ‘মা, বাবার প্রচণ্ড জ্বর, বাবার কোন হুস-জ্ঞান নাই।’ রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসে নূপুর, সঙ্গে আরতি।
মা মেয়ে ধরাধরি করে হীরালালকে ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। খবর পেয়ে বাজার থেকে ঔষধ পথ্য নিয়ে আসতে আসতে বিপুলের রাত দশটা বেজে যায়, ততোক্ষণে হীরালালের জ্বর আরো বেড়ে যায়।
বিপুলের উপস্থিতিতে চোখ খুলে তাকানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারে না, জড়ানো গলায় শুধু বলে,‘রতন, রতন এখনো আসেনি?’


দ্রুত হীরালালের শরীরের অবনতি হতে থাকে; যেদিন থেকে পুরোপুরি শয্যা নেয় তার ঠিক দু’দিন পর রতন ফেরে। তার চোখেমুখে হতাশা। রতন ভেবেছিল মা-বাবা,পিষি, নূপুর, ঝিনুক তার জন্য মুখিয়ে থাকবে, তাদের চোখের মুখের উচ্ছ্বাসের মধ্যে সে কীভাবে নিজেকে লুকাবে, কিভাবে সত্যটা প্রকাশ করবে সেই নিয়ে চিন্তিত।
বাড়ি ফিরে রতন প্রথম ধাক্কাটা খায় বিছানার সঙ্গে লেপটে থাকা তার বাবা হীরালালকে দেখে; কি একটা তরতাজা মানুষ রেখে গেল মাত্র কয়দিন আগে সে এখন শয্যাশায়ী। ওপারের বাড়িঘর জমিজমা নিয়ে কারো মধ্যে কোন উচ্ছ্বাস নেই, উপরন্তু সবগুলো চোখ কটাক্ষ নিয়ে তাকে বিধে চলেছে যেন সে একটা দাগী আসামি।
এদিকে বাড়ির সবাই ভেবেছিল রতন এলেই নতুন বাড়ি নতুন জায়গাজমি, কাকা-কাকীর আতিথেয়তা নিযে মুখে খই ফুটবে; কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো, রতনের উসকোখুসকো চুল, চোখেমুখে হতাশা, বুকের ভেতর কি যেন একটা গোপন কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে, যেটা বলাও যায় না, আবার সহ্যও করা যায় না।
হিরালাল চোখ খুলে দেখে কতোগুলো উদ্বিগ্ন চোখ তাকে ঘিরে আছে; এরা তার স্ত্রী, বিধাব বোন, দুই মেয়ে এক ছেলে।
সামন্য আগে স্বপ্নে দেখা লোকগুলোকেও একসারিতে এনে দাঁড় করায়; সে দাঁড় করায় বললে ভুল হবে, সবাই এসে দাড়িয়ে যায়। স্বপ্নের মানুষ আর বাস্তবের মানুষের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলে হিরালাল। হিরালাল স্বপ্নে দেখে, শেষ রাতে নিশব্দে উঠানে এসে দাঁড়িয়ে আছে সে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে জোছনা এসে পড়ছে উঠানে, চালতা, জলপাই, বেল, নিম, পেয়ারা, কাঁঠাল, আম, সুপারি, জাম, গাব গাছের পাতা বেয়ে শিশির নেমে আসে। বিশাল বিশাল গাছের নিবিড়তা ভেদ করে আসা রহস্যময় জোছনায় অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হয়, এমন মনোরম দৃশ্য হিরালাল তার দীর্ঘ জীবনে কোনদিন দেখেনি। বা দেখার প্রয়োজন হয়নি। এই জোছনায় সাদা পোশাকের কারা যেন একজন তাকে ডেকে বলছে, ‘হিরা, ও হিরা সোনার থালার মতো জমিগুলো খুঁইয়ে ফেললি? শেষে বাড়িটাও!’
হীরালালের বিস্ফোরিত চোখ জোড়া তাকে ঘিরে থাকা চার জোড়া চোখ ঘুরে এসে রতনের চোখে এসে স্থির হয়। আরতি মুখে আঁচল চেপে ভেতর থেকে উঠে আসা কান্না ঠোঁট কামড়ে চাপা দিয়ে রাখে। অসহ্য নীরবতা চূর্ণ করে রতনই প্রথম বলে উঠে, ‘বাবার কি হয়েছে, বাবার এই অবস্থা কেন?’
সবার সতর্ক চাহনি আরতির দিকে; চারু একবার আরতি আর একবার রতনের চোখের দিকে তাকায়। ঝিনুক নীরবে এসে রতনের হাত ধরে দাঁড়ায়, নূপুর গিয়ে দাঁড়ায় মায়ের গা ঘেঁষে। হীরালাল কিছু একটা বলাল জন্য মাথা তোলার চেষ্টা করে।
‘তোর জন্যই লোকটার আজ এই অবস্থা হলো।’
‘আমার জন্য?’
আরতি চিৎকার করে উঠে, ‘হ্যাঁ, তোর জন্য।’
অনেকক্ষণ কান্না আটকিয়ে রাখলেও আর আটকাতে পারে না। একের পর এক কান্নার প্রচণ্ড ঢেউ আছড়ে পড়ার পর নিজেকে সামলে নিয়ে আরতি বলে, ‘তোর জন্য সবাই অপেক্ষা কইরছি, তুই এলেই চলি যামু। একটা ভিতু লোক জানিস না? নিজাম চেয়ারম্যানের লোক এসে বাড়ি ছাড়ার জন্য শাসিয়ে গেল তারপর থেকে লোকটা ভেঙে পড়ল। এখন মাঝেমাঝে এসে উৎপাত করছে, ঘরে দুই দুইটা ডাঙ্গর মেয়ে, কোন একটা অঘটন ঘটি গেলে কি করবি তখন শুনি? গেরামের অবস্থাও ভালো নয়; তুই যখন এলি লোকটা পড়ি গেল বিছনায়, অসুস্থ লোকটাকে নিয়ে কিভাবে বাড়ি ছেড়ে যাবো?’
মায়ের ভেজা চোখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে রতন, ‘বাড়ি ছেড়ে দিলে থাকবো কোথায়?’- কথাটা অস্ফূস্টভাবে বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে। যত আস্তে বলুক না কেন অস্বাভাবিক নীরবতায় শব্দটা কারো কানে পৌঁছাতে অসুবিধা হয় না।
রতনের কথার কোন অর্থ বুঝতে পারে না কেউ, সবাই বিহ্বল তাকিয়ে থাকে রতনের মুখের দিকে, পাল্টা প্রশ্ন করার শক্তিও যেন সবাই হারিয়ে ফেলেছে। এক এক করে মুহুর্ত কেটে যায় নীরবতার দুর্বিসহ ভার বাড়তে থকে; হঠাৎ রতন আবার বলে উঠে, ‘কাকা আমাদের জন্য এক ইঞ্চি জমিও কেনেনি বাবা, আমাদের পাঠানো সব টাকা দিয়ে কলকাতায় বাড়ি কিনেছে বড় মেয়ের নামে।’
‘সে যে চিঠিতে লিখেছে ধানি জমি কিনেছে, বাড়ি কিনেছে সেই বাড়ির পুুকুর আমাদের পুকুরের মতো বড়, আমাদের এই বাড়ির উঠানের মতো বড় উঠান, গাছপালা সব আছে সেই বাড়িতে।’ -আরতি চিৎকার করে বলে।
‘মিথ্যা কথা, সব মিথ্যা মা, সব মিথ্যা, কাকা আমাদের ঠকিয়েছে।’
মুখে আঁচল গুঁজে বিস্ময়ভরা বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে একবার ছেলে দিকে একবার স্বামীর দিকে তাকায়। হীরালালের বিধবা বোন চারু রানিও পাথরের মতো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ভাইয়ের দিকে।
‘তুই ঠিক বলছিস রতন, ঠিক বলছিস?’
ঘাড় কাত করে রতন ।
‘শুনলেন, শুনলেন আপনার ভাই.. .,আপন ভাই, একই রক্তের, এই কাজ করতে পারলো? শত্রু, শত্রু, সবাই শত্রু; আপন লোক আরো বেশি শত্রু।’ – –বলতে বলতে লুটিয়ে পড়ে আরতি; বহু কষ্টে ঘাড় উঠিয়ে আরতির গ্যাজলাউঠা মুখের দিকে মৃত মাছের চোখের মতো নিষ্ফলক চেয়ে থাকে; তার চারপাশের ভিড় করা মানুষগুলো আর স্বপ্নে দেখা মানুষের মধ্যে আবারও তালগোল পাকিয়ে ফেলে হীরালাল।

Facebook Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

scroll to top